সুন্নাহ বিরোধী ও সংশয় উত্থাপনকারীদের চক্রান্তসমূহ ও তার জবাব
-হাসিবুর রহমান বুখারী*
(৫ম কিস্তি)
পঞ্চম চক্রান্ত
আহলে কুরআন বা হাদীছ অস্বীকারকারীদের ধারণা অনুযায়ী, ‘যেহেতু আল্লাহ তা‘আলা কুরআনকে সহজ করেছেন তাই কুরআনের ভাষাই যথেষ্ট, এর অর্থ বুঝতে আর কোন বাইরের সাহায্যের প্রয়োজন নেই’।
জবাব
লক্ষণীয় বিষয় হল- কুরআনুল কারীমের আয়াত দুই ধরনের। (১) কিছু আয়াত এতটাই সহজ যে, কেবল আরবী ভাষায় পারদর্শী হলেই সেগুলোর মর্ম অনুধাবন করা সম্ভব। সুতরাং এ জাতীয় আয়াতের তাফসীরে মতানৈক্যেরও কোন প্রশ্নই উঠে না। এই প্রকারের আয়াতসমূহ বুঝার জন্য শুধু আরবী ভাষায় দক্ষতা অর্জন করাই যথেষ্ট। (২) পক্ষান্তরে আরো বহু সংখ্যক আয়াত এমন যে, সেগুলোর বর্ণনা একেবারেই সংক্ষিপ্ত ও অস্পষ্ট। এসব আয়াত বুঝতে আয়াতের প্রেক্ষাপট জানা খুবই যরূরী। উল্লেখ্য যে, এ জাতীয় আয়াতের ব্যাখ্যার জন্য শুধু আরবী ভাষার জ্ঞানার্জন করাটাই যথেষ্ট নয়, বরং এ সবের পাশাপাশি আরো অনেক বিষয় জানা প্রয়োজন।
প্রশ্ন হল- সত্যিই কী কুরআনুল কারীম এতটাই সহজ যে, আরবী ভাষা জ্ঞান, নাসিখ-মানসূখের জ্ঞান, উছূলে তাফসীরের জ্ঞান ও শানে নূযুলের জ্ঞান ছাড়াই একজন সাধারণ মানুষ তা তিলাওয়াত করে অনুধাবন করতে পারবে? উত্তর হল- মহান আল্লাহ কুরআনুল কারীমকে সহজ করে দেয়ার অর্থ এই নয় যে, কোন মানুষ কুরআন পড়লেই সবকিছু সহজে বুঝে যাবে। আল্লাহ তা‘আলা বলেন, اَفَلَا يَتَدَبَّرُوْنَ الْقُرْاٰنَ اَمْ عَلٰى قُلُوْبٍ اَقْفَالُهَا ‘তবে কি তারা কুরআন সম্বন্ধে গভীর চিন্তা-ভাবনা করে না? নাকি তাদের অন্তর সমূহ তালাবদ্ধ?’ (সূরা মুহাম্মাদ: ২৪)। যার কারণে কুরআনের অর্থ ও তাৎপর্য তাদের অন্তঃকরণে প্রবেশ করে না।
কুরআনের সবকিছু যদি সহজেই বোঝা যায় তাহলে মহান আল্লাহ কুরআন নিয়ে গভীরভাবে চিন্তা করার কথা কেন বললেন? প্রকৃতপক্ষে কুরআনকে দু’টি ক্ষেত্রে সহজ করে দেয়া হয়েছে। (১) আরবী ভাষায়। (২) উপদেশ গ্রহণে। প্রথমতঃ আরবী ভাষায় কুরআন সহজ করে দেয়া হয়েছে। আল্লাহ তা‘আলা বলেন, فَاِنَّمَا يَسَّرْنٰهُ بِلِسَانِكَ لَعَلَّهُمْ يَتَذَكَّرُوْنَ ‘আমরা তোমার (নাবীর) ভাষায় কুরআনকে সহজ করে দিয়েছি, যাতে মানুষ উপদেশ গ্রহণ করে’ (সূরা আদ-দুখান: ৫৮)। সুতরাং ভাই আমার কুরআনুল কারীমকে সহজভাবে অনুধাবন করার জন্য আরবী ভাষায় পারদর্শী হন। যে ব্যক্তি আরবীর আলিফ চেনে না, তার জন্য নিশ্চয় কুরআন সহজ নয়। যে কোন বইয়ের ক্ষেত্রেই অনুবাদ থেকে ততটা মর্মার্থ বোঝা যায় না যতটা মূল ভাষা থেকে বোঝা যায়। এছাড়াও অনুবাদের ক্ষেত্রে কিছু না কিছু ত্রুটি থেকেই যায়। যেহেতু আল-কুরআন আরবী ভাষায় নাযিল হয়েছে, তাই স্বাভাবিকভাবেই আরবীতে সহজ। কুরআন যদি আরবীতে সহজবোধ্য না হত তাহলে আরবরাই এর মর্মার্থ বুঝত না, ফলে উপদেশ গ্রহণ করা কঠিন হয়ে যেত। কিন্তু আল্লাহ তা‘আলা তাঁর অশেষ রহমতে কুরআনকে আরবী ভাষায় সহজ করে দিয়েছেন। সুতরাং অনুবাদ পড়ে কুরআনকে সহজ বলে দাবী করা নিতান্তই বোকামী।
দ্বিতীয়তঃ উপদেশ গ্রহণের ক্ষেত্রে কুরআনকে সহজ করে দেয়া হয়েছে। আল্লাহ তা‘আলা বলেছেন, وَ لَقَدْ يَسَّرْنَا الْقُرْاٰنَ لِلذِّكْرِ فَهَلْ مِنْ مُّدَّكِرٍ ‘নিশ্চয় আমরা কুরআনকে উপদেশ গ্রহণের জন্য সহজ করে দিয়েছি। অতএব উপদেশ গ্রহণকারী কেউ আছে কি?’ (সূরা আল-ক্বামার: ১৭, ২২, ৩২, ৪০)।
আরবীতে যিকর (ذكر) শব্দটির দু’টি অর্থ হতে পারে। (১) মুখস্থ করা বা স্মরণ করা এবং (২) উপদেশ গ্রহণ করা ও শিক্ষা অর্জন করা। এখানে উভয় অর্থ বোঝানো যেতে পারে। আল্লাহ তা‘আলা কুরআনকে মুখস্থ করার জন্য সহজ করে দিয়েছেন। ইতিপূর্বে অন্য কোন ঐশীগ্রন্থ এরূপ ছিল না। তাওরাত, ইঞ্জীল ও যাবুর মানুষের মুখস্থ ছিল না (তাফসীরে কুরতুবী)।
ক্বুরআনই একমাত্র গ্রন্থ যা লক্ষ লক্ষ মানুষের এমনকি অনেক ৭/৮ বছরের বাচ্চারও মুখস্থ। আরবী ভাষা জানে না এমন অহরহ মানুষেরও কুরআন মুখস্থ। মহান আল্লাহ যদি সহজ করে না দিতেন তাহলে এমনটা কখনোই সম্ভব হত না। অনুরূপভাবে কুরআন উপদেশ গ্রহণ করার জন্যও সহজ, ফলে আলিম, বিশেষজ্ঞ, মূর্খ যারাই উপদেশ গ্রহণ করতে চায় তারা উপদেশ গ্রহণ করতে পারে। হালাল-হারাম, ইবাদত সম্পর্কে সুস্পষ্টভাবে বর্ণিত থাকায় সহজেই আলিম কিংবা সাধারণ মানুষ (যারা উপদেশ গ্রহণ করতে চায়) সহজেই কুরআন থেকে শিক্ষা নিতে পারে। তবে কুরআন থেকে উপদেশ গ্রহণ করা সহজ হওয়ার মানে এই নয় যে, একজন সাধারণ মানুষ সহজে সব বিধি-বিধান বের করতে পারবে! যেমন কুরআনে ছালাত আদায় করতে বলা হয়েছে। কিন্তু কিভাবে ছালাত আদায় করতে হবে, কতটুকু সময়ের মধ্যে করতে হবে ইত্যাদি বিষয় জানার ক্ষেত্রে রাসূল (ﷺ)-এর অনুসরণ করতেই হবে। আর রাসূল (ﷺ)-এর অনুসরণ করা কুরআন বিরোধী নয়, অথবা এর দ্বারা কুরআন অপূর্ণ বলে প্রমাণিত হয় না। কারণ কুরআনেই রাসূল (ﷺ)-কে অনুসরণ করতে বলা হয়েছে। অতএব এ থেকে জানা গেল যে, মুখস্থ করা ও উপদেশ গ্রহণ করার ক্ষেত্রেও কুরআনকে সহজ করে দেয়া হয়েছে। অন্য কোন ক্ষেত্রে মহান আল্লাহ কুআনকে সহজ বলেননি। উপরিউক্ত আলোচনা থেকে স্পষ্ট হয় যে, মহান আল্লাহ কুরআনকে মুখস্থ করা ও উপদেশ গ্রহণের জন্য সহজ করে দিয়েছেন। কিন্তু ইসলামের বিরুদ্ধে অভিযোগকারী আহলে কুরআনরা ও নাস্তিকরা কি মুখস্থ করা কিংবা উপদেশ গ্রহণ করার জন্য কুরআন পড়ে? নিশ্চয় না। তাদের উদ্দেশ্যই হল কুরআনের ভুল ব্যাখ্যা করা, ইসলামের অবমাননা করা। তাহলে কিভাবে কুরআন তাদের জন্য সহজ হতে পারে? কুরআন উপদেশ গ্রহণ করার জন্য সহজ করে দেয়া হয়েছে। সুতরাং যারা উপদেশ গ্রহণ করতে চায় তাদের জন্য কুরআন সহজ। এখন প্রশ্ন হতে পারে যে, কারা উপদেশ গ্রহণ করে? এ কথাও কুরআনে বলে দেয়া হয়েছে। আল্লাহ তা‘আলা বলেছেন,
يُّؤْتِي الْحِكْمَةَ مَنْ يَّشَآءُ١ۚ وَ مَنْ يُّؤْتَ الْحِكْمَةَ فَقَدْ اُوْتِيَ خَيْرًا كَثِيْرًا١ؕ وَ مَا يَذَّكَّرُ اِلَّاۤ اُولُوا الْاَلْبَابِ
‘যাকে ইচ্ছা তিনি হিকমাত (প্রজ্ঞা) দান করেন এবং যে ব্যক্তি এ জ্ঞানপ্রাপ্ত হয়, নিঃসন্দেহে সে মহাসম্পদ প্রাপ্ত হয় এবং উপদেশ তারাই গ্রহণ করে, যারা জ্ঞানী’ (সূরা আল-বাক্বারাহ: ২৬৯)। অন্যত্র তিনি বলেন,
اَفَمَنْ يَّعْلَمُ اَنَّمَاۤ اُنْزِلَ اِلَيْكَ مِنْ رَّبِّكَ الْحَقُّ كَمَنْ هُوَ اَعْمٰى ١ؕ اِنَّمَا يَتَذَكَّرُ اُولُوا الْاَلْبَابِۙ
‘তোমার প্রতিপালক হতে তোমার প্রতি যা অবতীর্ণ করা হয়েছে, তা যে ব্যক্তি সত্য বলে জানে সে আর অন্ধ কি সমান? কেবল জ্ঞানী ব্যক্তিরাই উপদেশ গ্রহণ করে থাকে’ (সূরা আর-রা‘দ : ১৯)। আল্লাহ তা‘আলা আরো বলেন,
هٰذَا بَلٰغٌ لِّلنَّاسِ وَ لِيُنْذَرُوْا بِهٖ وَ لِيَعْلَمُوْۤا اَنَّمَا هُوَ اِلٰهٌ وَّاحِدٌ وَّ لِيَذَّكَّرَ اُولُوا الْاَلْبَابِؒ
‘এটা মানুষের জন্য এক সতর্ক বার্তা, যাতে এটা দ্বারা তাদেরকে সতর্ক করা হয় এবং তারা জানতে পারে যে, তিনি একমাত্র উপাস্য এবং যাতে জ্ঞানীরা উপদেশ গ্রহণ করে’ (সূরা ইবাহীম: ৫২)। আল্লাহ তা‘আলা আরো বলেন,
كِتٰبٌ اَنْزَلْنٰهُ اِلَيْكَ مُبٰرَكٌ لِّيَدَّبَّرُوْۤا اٰيٰتِهٖ وَ لِيَتَذَكَّرَ اُولُوا الْاَلْبَابِ
‘আমরা এ কল্যাণময় গ্রন্থ তোমার প্রতি অবতীর্ণ করেছি, যাতে মানুষ এর আয়াতসমূহ অনুধাবন করে এবং বুদ্ধিমান ব্যক্তিগণ উপদেশ গ্রহণ করে’ (সূরা ছোয়াদ: ২৯)। এছাড়াও সূরা আয-যুমার: ৯, সূরা আল-মুমিন: ১৩ এবং সূরা ক্বাফ: ৩৭ দ্রষ্টব্য।
সুতরাং বুঝা যাচ্ছে যে, বোধশক্তি সম্পন্ন, বুদ্ধিমান, আল্লাহ অভিমুখী ও মনোযোগ দিয়ে কুরআন শ্রবণকারী লোকেরাই উপদেশ গ্রহণ করে। ফলে তাদের জন্য কুরআন সহজ। কিন্তু আহলে কুরআন, নাস্তিক এবং অপবাদদাতা অমুসলিমদের মধ্যে কী উপরিউক্ত গুণ আছে? তারা কি আল্লাহ অভিমুখী? তারা কি মনোযোগ দিয়ে কুরআন শ্রবণ করে? নিশ্চয় না। আর একজন সুস্থ বিবেক-বোধশক্তি সম্পন্ন মানুষ নিশ্চয় বলবে না যে, ‘সবকিছু আপনা আপনিই অস্তিত্বে চলে এসেছে’! যেমনটা নাস্তিকরা বলে। যারা শুধু নিজেদের অসৎ কামনা পূরণ করতে কুরআন নিয়ে মিথ্যাচার করে তারা আর যাই হোক না কেন, বুদ্ধিমান নয়। সুতরাং উপদেশ গ্রহণকারীদের যে সকল বৈশিষ্ট্য আছে তার কোনটাই আহলে কুরআন, নাস্তিক বা অমুসলিমদের মধ্যে দেখা যায় না। তাই তাদের কাছে কুরআন সহজ হওয়া অসম্ভব। মহান আল্লাহ তাদের ব্যাপারে যথার্থই বলেছেন,
وَ لَقَدْ صَرَّفْنَا فِيْ هٰذَا الْقُرْاٰنِ لِيَذَّكَّرُوْا١ؕ وَ مَا يَزِيْدُهُمْ اِلَّا نُفُوْرًا
‘এই কুরআনে বহু কথাই আমরা বারবার (বিভিন্নভাবে) বিবৃত করেছি, যাতে তারা উপদেশ গ্রহণ করে, কিন্তু তাতে তাদের বিমুখতাই ও পলায়নের মনোবৃত্তিই বৃদ্ধি পায়’ (সূরা বানী ইসরাঈল: ৪১)। অন্যত্র তিনি বলেন,
وَ اِذَا قَرَاْتَ الْقُرْاٰنَ جَعَلْنَا بَيْنَكَ وَ بَيْنَ الَّذِيْنَ لَا يُؤْمِنُوْنَ بِالْاٰخِرَةِ حِجَابًا مَّسْتُوْرًاۙ۰۰۴۵ وَّ جَعَلْنَا عَلٰى قُلُوْبِهِمْ اَكِنَّةً اَنْ يَّفْقَهُوْهُ وَ فِيْۤ اٰذَانِهِمْ وَقْرًا١ؕ وَ اِذَا ذَكَرْتَ رَبَّكَ فِي الْقُرْاٰنِ وَحْدَهٗ وَلَّوْا عَلٰۤى اَدْبَارِهِمْ نُفُوْرًا
‘তুমি যখন কুরআন পাঠ কর, তখন তোমার ও যারা পরলোকে বিশ্বাস করে না, তাদের মধ্যে এক আবরণ পর্দা করে দিই। আমরা তাদের অন্তরের উপর আবরণ দিয়েছি, যেন তারা উপলব্ধি করতে না পারে এবং তাদের কানে বধিরতা দিয়েছি। আর যখন তুমি তোমার প্রতিপালকের একত্বের কথা কুরআনে উল্লেখ কর, তখন তারা পৃষ্ঠপ্রদর্শন করে সরে পড়ে’ (সূরা বানী ইসরাঈল: ৪৫-৪৬)।
وَ اِذَا ذُكِّرُوْا لَا يَذْكُرُوْنَ۪
‘তাদেরকে উপদেশ দেয়া হলে তারা উপদেশ গ্রহণ করে না’ (সূরা আছ-ছাফ্ফাত: ১৩)।
অতএব আহলে কুরআন ও নাস্তিকরা তাদের নিজের দোষের কারণেই কুরআন বুঝতে পারে না ও তারা উপদেশ গ্রহণ করে না। কুরআন সহজ হওয়ার কোন শর্তই তাদের মধ্যে পাওয়া যায় না। সুতরাং এটা সুস্পষ্টভাবে প্রমাণিত হল যে, আহলে কুরআন, নাস্তিক ও অমুসলিমদের জন্য কুরআন সহজ নয়। কোন একটি বিষয় কুরআন কারীমের কোন আয়াতে সংক্ষিপ্তভাবে বর্ণিত হয়েছে। আবার অন্য স্থানে সেই একই বিষয় বিস্তারিতভাবে বর্ণিত হয়েছে। সুতরাং কুরআনের বিশ্লেষণমুলক আয়াতটি সংক্ষিপ্ত আয়াতের তাফসীর হিসাবে গণ্য হয়। উল্লেখ্য যে, কুরআনুল কারীমের জটিলতার বিভিন্নরূপ হতে পারে। যেমন-
১- কুরআনুল কারীমের এক স্থানে কোন বিষয় অস্পষ্টভাবে বর্ণিত হয়। অন্য স্থানে সেই অস্পষ্টতাকে দুর করা হয়। যেমন আল্লাহ তা‘আলা বলেন,
اِهْدِنَا الصِّرَاطَ الْمُسْتَقِيْمَۙ۰۰۵ صِرَاطَ الَّذِيْنَ اَنْعَمْتَ عَلَيْهِمْ
‘আমাদেরকে সহজ-সরল সোজা পথে তথা তাঁদের পথে পরিচালিত করুন যাদের প্রতি আপনি অনুগ্রহ করেছেন’ (সূরা আল-ফাতিহা: ৬-৭)।
উল্লিখিত আয়াতের মধ্যে ‘যাদের প্রতি আপনি অনুগ্রহ করেছেন’ বাক্যটি অস্পষ্ট। কারণ আয়াতের মধ্যে এটা বলা হয়নি যে, আল্লাহ তা‘আলা কাদের প্রতি অনুগ্রহ করেছেন। এই অস্পষ্টতা দূর করে আল্লাহ তা‘আলা অন্যত্র বলেছেন
وَ مَنْ يُّطِعِ اللّٰهَ وَ الرَّسُوْلَ فَاُولٰٓىِٕكَ مَعَ الَّذِيْنَ اَنْعَمَ اللّٰهُ عَلَيْهِمْ مِّنَ النَّبِيّٖنَ وَ الصِّدِّيْقِيْنَ۠ وَ الشُّهَدَآءِ وَ الصّٰلِحِيْنَ١ۚ وَ حَسُنَ اُولٰٓىِٕكَ رَفِيْقًاؕ
‘আর যে কেউ আল্লাহ এবং রাসূলের আনুগত্য করবে, (শেষ বিচারের দিন) সে তাঁদের সঙ্গী হবে, যাদের প্রতি আল্লাহ তা‘আলা অনুগ্রহ করেছেন, অর্থাৎ নবীগণ, সত্যবাদীগণ (নাবীর সহচর), শহীদগণ ও সৎকর্মশীলগণ। আর সঙ্গী হিসাবে এরা কতইনা উত্তম’ (সূরা আন-নিসা: ৬৯)। এ আয়াতটি পূর্বের অস্পষ্ট বর্ণনার বিশ্লেষক যে, যাদের প্রতি আল্লাহ তা‘আলা অনুগ্রহ করেছেন তাঁরা হলেন: (১) নবীগণ (২) সত্যবাদীরা (৩) শহীদগণ (৪) সৎকর্মশীলগণ। অনুরূপভাবে তিনি বলেন, يٰۤاَيُّهَا الَّذِيْنَ اٰمَنُوا اتَّقُوا اللّٰهَ وَ كُوْنُوْا مَعَ الصّٰدِقِيْنَ ‘হে ঈমানদারগণ! তোমরা আল্লাহকে ভয় কর এবং সত্যবাদীদের সঙ্গী হও’ (সূরা আত-তাওবাহ: ১১৯)।
উল্লিখিত আয়াতে ছাদিক্বীন দ্বারা কারা উদ্দেশ্য সে বিষয়টি অস্পষ্ট। এই অস্পষ্টতার বিশ্লেষক আয়াত হল, ‘পূর্ব এবং পশ্চিম দিকে তোমাদের মুখ ফেরানোতে পুণ্য নেই, কিন্তু পুণ্য আছে আল্লাহ, পরকাল, ফিরিশতাগণ, সমস্ত কিতাব এবং নবীগণকে বিশ্বাস করলে এবং অর্থের প্রতি আসক্তি থাকা সত্ত্বেও আত্মীয়-স্বজন, পিতৃহীন, অভাবগ্রস্ত, (ইয়াতীম-মিসকীন) মুসাফির, সাহায্যপ্রার্থী (ভিক্ষুক)গণকে এবং দাস মুক্তির জন্য দান করলে, যথাযথভাবে ছালাত আদায় করলে ও যাকাত প্রদান করলে, প্রতিশ্রুতি পালন করলে এবং দুঃখ-দৈন্য, রোগ-বালা ও যুদ্ধের সময় ধৈর্যধারণ করলে। এরাই তারা, যারা সত্যপরায়ণ এবং ধর্মভীরু’ (সূরা আল-বাক্বারাহ: ১৭৭)।
২- কুরআনের কোন একটি বিষয় এক ক্বিরাআত অনুযায়ী অস্পষ্ট থাকে এবং অন্য ক্বিরাআত সে অস্পষ্টতার বিশ্লেষণ করে দেয়। যেমন আরবী ব্যকরণের দৃষ্টিকোণ থেকে নিম্নোক্ত আয়াতের দু’টি অর্থ হতে পারে।
ٰۤاَيُّهَا الَّذِيْنَ اٰمَنُوْۤا اِذَا قُمْتُمْ اِلَى الصَّلٰوةِ فَاغْسِلُوْا وُجُوْهَكُمْ وَ اَيْدِيَكُمْ اِلَى الْمَرَافِقِ وَ امْسَحُوْا بِرُءُوْسِكُمْ وَ اَرْجُلَكُمْ اِلَى الْكَعْبَيْنِ
(ক) ‘হে মুমিনগণ! যখন তোমরা ছালাতের জন্য প্রস্তুত হবে, তখন তোমরা তোমাদের মুখমণ্ডল ও উভয় হাত কনুই পর্যন্ত ধৌত কর এবং তোমাদের মাথায় মাসাহ কর এবং উভয় পায়ের টাখনু পর্যন্ত ধৌত কর...’ (সূরা আল-মায়িদাহ: ৬)। (এখানে وَ اَرْجُلَكُمْ শব্দটিকে وُجُوْهَكُمْ ও وَ اَيْدِيَكُمْ এর উপর عَطف করে অর্থ করা হয়েছে। তবে কেউ কেউ লামের উপর যবর দিয়ে وَ اَرْجُلَكُمْ না পড়ে লামের নিচে যের দিয়ে وَ اَرْجُلَكُمْ পড়েছে, اَرْجُلَكُمْ শব্দটি رُءُوْسِكُمْ এর নিকটবর্তী হওয়ার কারনে)।
(খ) হে ঈমানদারগণ! যখন তোমরা ছালাতের জন্য প্রস্তুত হবে, তখন তোমরা তোমাদের মুখমণ্ডল ও উভয় হাত কনুই পর্যন্ত ধৌত কর এবং তোমরা তোমাদের মাথা ও উভয় পা টাখনু পর্যন্ত মাসাহ কর। (এখানে وَاَرْجُلَكُمْ শব্দটিকে بِرُءُوْسِكُمْ এর উপর عَطف করে অর্থ করা হয়েছে) (তাফসীরে বাইজাবী)। এখানে اَرْجُلَكُمْ এর ক্বিরাআত অনুযায়ী উভয় অর্থের সম্ভাবনার কারণে আয়াতের অর্থ বুঝতে জটিলতার সৃষ্টি হয়েছে। কিন্তু اَرْجُلَكُمْ শব্দটিতে اَرْجُلِكُمْ ক্বিরাআত ব্যতীত অন্য আরেকটি ক্বিরাআত রয়েছে اَرْجُلَكُمْ। এ ক্বিরাআত অনুযায়ী আয়াতের অর্থ পা ধৌত করা ব্যতীত অন্য অর্থ হতে পারবে না। সুতরাং اَرْجُلَكُمْ এ ক্বিরাআতটি اَرْجُلِكُمْ ক্বিরাআতের জন্য বিশ্লেষক যে, اَرْجُلِكُمْ এর মাঝে যে দুই অর্থের সম্ভাবনা ছিল তন্মধ্য হতে ‘তোমরা পা ধৌত কর’ অর্থই উদ্দেশ্য। এভাবে মুতাওয়াতির ক্বিরাআতের আলোকে কুরআনুল কারীমের যে তাফসীর করা হয় সে তাফসীরটি পূর্ণ আস্থাশীল ও সুস্পষ্ট হয়ে থাকে।
৩- যে আয়াতের তাফসীর করা উদ্দেশ্য হবে সে আয়াতের পূর্বাপর লক্ষ্য করে তাফসীর করা। যেমন আল্লাহ তা‘আলা বলেন,
وَ قَرْنَ فِيْ بُيُوْتِكُنَّ وَ لَا تَبَرَّجْنَ تَبَرُّجَ الْجَاهِلِيَّةِ الْاُوْلٰى
‘তোমরা তোমাদের স্বগৃহে অবস্থান কর এবং (প্রাক-ইসলামী) জাহিলী যুগের মত নিজেদেরকে প্রদর্শন করে বেড়িয়ো না। (সূরা আল-আহযাব: ৩৩)।
শরী’আতের মূলনীতি সম্পর্কে অজ্ঞ কিছু লোক আয়াতের বাহ্যিক অনুবাদ দেখে দাবী করে বসেছে যে, এ আয়াতের মাঝে তো উম্মুল মুমিনদের সম্মোধন করা হয়েছে। সুতরাং আয়াতে আলোচিত পর্দার বিধান শুধু তাঁদের জন্যই প্রযোজ্য হবে। অন্যদের জন্য পর্দার বিধান মানা যরূরী নয়। কিন্তু উল্লিখিত আয়াতের পূর্বাপর তাদের দাবীকে খণ্ডন করে দেয়। কেননা এ আয়াতের পূর্বে ও পরে উম্মুল মুমিনদেরকে সম্বোধন করে আরো কিছু বিধান দেয়া হয়েছে। যেমন
فَلَا تَخْضَعْنَ بِالْقَوْلِ فَيَطْمَعَ الَّذِيْ فِيْ قَلْبِهٖ مَرَضٌ وَّ قُلْنَ قَوْلًا مَّعْرُوْفًاۚ...وَ اَقِمْنَ الصَّلٰوةَ وَ اٰتِيْنَ الزَّكٰوةَ وَ اَطِعْنَ اللّٰهَ وَ رَسُوْلَهٗ
‘পর-পুরুষের সাথে কমল কন্ঠে এমন ভাবে কথা বলো না যে, যার অন্তরে ব্যাধি আছে, সে প্রলুব্ধ হয়ে যায় এবং তোমরা ন্যায়সঙ্গত কথা বলবে (স্বাভাবিকভাবে সতীত্বের রীতি অনুসারে কথা বল) এবং তোমরা ছালাত ক্বায়িম কর ও যাকাত প্রদান কর এবং আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের অনুগতা হও’ (সূরা আল-আহযাব: ৩২-৩৪)।
উল্লিখিত বিধানাবলী সম্পর্কে কোন বুদ্ধিমান ব্যক্তি এ দাবী করতে পারে না যে, সেগুলো শুধু উম্মুল মুমিনদেরই জন্য। অন্য কোন মহিলার জন্য সে বিধানাবলীর উপর আমল করা যরূরী নয়। কারণ এখানে এমন কিছু বিধান আছে যার উপর আমল করা সকলের উপর ফরয। সুতরাং আলোচিত সকল বিধানাবলীর মধ্য হতে শুধু একটি বিধানের ব্যাপারে দাবী করা যে এটি সকল নারীদের জন্য নয়, বরং কেবল উম্মুল মুমিনদের জন্য। এ দাবী শুধু কুরআনের অন্য আয়াত ও হাদীছই নয়, বরং উল্লিখিত আয়াতের পূর্বাপরেরও বিপরীত। বাস্তব হল এ সকল বিধানাবলীর উপর সকল মুসলিম নারীর জন্য আমল করা যরূরী তবে এখানে বিশেষভাবে উম্মুল মুমিনদেরকে সম্বোধন শুধু এ জন্য করা হয়েছে যে, অন্যদের তুলনায় তাদের উপর শরী‘আত পালনের দায়িত্ব একটু বেশী এবং তাঁদের এ বিষয়টির প্রতি গুরুত্ব দেয়া উচিত।[১]
উল্লেখ্য যে, কোন কোন মুফাসসির তাফসীরুল কুরআন বিল কুরআনের পন্থা অনুসরণে পূর্ণ কুরআনের তাফসীর সম্পূর্ণ করেছেন। অর্থাৎ কুরআনুল কারীমের অধিকাংশ আয়াতের তাফসীর অন্য আয়াত দ্বারা সম্পূর্ণ করেছেন। এ জাতীয় তাফসীর গ্রন্থসমূহের মধ্যে মাদীনাহ মুনাওয়ারার প্রসিদ্ধ মুফাসসির শাইখ আল্লামা মুহাম্মদ আল-আমীন শানক্বীতী (রাহিমাহুল্লাহ) কৃত তাফসীর ‘আযওয়াউল বায়ানি ফী ঈ-যাহিল কুরআনী বিল কুরআন’ বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। উক্ত তাফসীর গ্রন্থের ভূমিকায় তাফসীরুল কুরআন বিল কুরআনের বিভিন্ন প্রকার সর্ম্পকিত বিস্তারিত বর্ণনা আলোচনা করেছেন।
ষষ্ঠ চক্রান্ত
আহলে কুরআনদের মতে, হাদীছসমূহ বিকৃতিযোগ্য এবং অনেক ক্ষেত্রে কুরআনের সাথে সাংঘর্ষিক। তারা যুক্তি দেয় যে, আল্লাহ কুরআনে বলেছেন, ‘কুরআন মানুষের জন্য পথনির্দেশ’ (সূরা আল-বাক্বারাহ: ১৮৫)। তাই অতিরিক্ত উৎসের প্রয়োজন নেই।
জবাব
এটি মুনকিরিনে আহাদীছ বা হাদীছ অস্বীকারকারীদের হাদীছের বিরুদ্ধে একটা গভীর ষড়যন্ত্র। মানুষের অন্তরে হাদীছ সম্পর্কে সন্দেহ সৃষ্টি করার জন্যই এরা মাঝে-মধ্যে এরকম অবান্তর প্রশ্ন উত্থাপন করে থাকে। মূলত কুরআনুল কারীমের তাফসীরের উৎসসমূহের মধ্যে দ্বিতীয় উৎস হল- ‘কুরআনের তাফসীর সুন্নাহ দ্বারা করা’। সাধারণতঃ রাসূল (ﷺ)-এর কথা, কাজ, গুণাবলী ও মৌনসম্মতিকে হাদীছ বা সুন্নাহ বলা হয়।
(ক) সুন্নাতে ক্বাওলিয়্যাহ দ্বারা কুরআনের তাফসীর। আল্লাহ তা‘আলা বলেন,
وَ اَعِدُّوْا لَهُمْ مَّا اسْتَطَعْتُمْ مِّنْ قُوَّةٍ وَّ مِنْ رِّبَاطِ الْخَيْلِ تُرْهِبُوْنَ بِهٖ عَدُوَّ اللّٰهِ وَ عَدُوَّكُمْ
‘আর তোমরা তাদের (কাফিরদের) মুকাবিলার জন্য যথাসাধ্য ‘শক্তি প্রস্তুত রাখ’ ও অশ্ব বাহিনী, তা দিয়ে তোমরা ভীত-সন্ত্রস্ত করবে আল্লাহর শত্রুকে এবং তোমাদের শত্রুকে ...’ (সূরা আল-আনফাল: ৬০)।
প্রশ্ন হল- এখানে ‘শক্তি প্রস্তুত করা’ বলতে কী বোঝানো হয়েছে? উক্ববাহ ইবনু আমির আল-জুহানী (রাযিয়াল্লাহু আনহু) বলেন, আমি রাসূল (ﷺ)-কে মিম্বারের উপরে বলতে শুনেছি,
وَ اَعِدُّوْا لَهُمْ مَّا اسْتَطَعْتُمْ مِّنْ قُوَّةٍ ،أَلَا إِنَّ الْقُوَّةَ الرَّمْيُ، أَلَا إِنَّ الْقُوَّةَ الرَّمْيُ، أَلَا إِنَّ الْقُوَّةَ الرَّمْيُ
‘দুশমনের মুকাবিলার জন্য তোমরা যথাসাধ্য শক্তি অর্জন কর’ (সূরা আল-আনফাল: ৬০)। জেনে রাখ! এখানে শক্তির অর্থ হচ্ছে তীরন্দাজী (ক্ষেপনাস্ত্র), জেনে রাখ! এখানে শক্তির অর্থ হচ্ছে তীরন্দাজী (ক্ষেপনাস্ত্র), জেনে রাখ! এখানে শক্তির অর্থ হচ্ছে তীরন্দাজী (ক্ষেপনাস্ত্র)’।[২]
(খ) সুন্নাতে আমালিয়্যাহ দ্বারা কুরআনের তাফসীর। আল্লাহ তা‘আলা বলেন, وَ اَقِيْمُوا الصَّلٰوةَ وَ اٰتُوا الزَّكٰوةَ وَ ارْكَعُوْا مَعَ الرّٰكِعِيْنَ ‘আর তোমরা ছালাত ক্বায়িম কর ও যাকাত দাও এবং রুকু‘কারীদের সাথে রুক‘ কর’ (সূরা আল-বাক্বারাহ: ৪৩)।
প্রশ্ন হল- ছালাত কিভাবে আদায় করব? কখন আদায় করব? কতবার আদায় করব? কোন ওয়াক্তের ছালাত কত রাক‘আত করে আদায় করব? আবূ সুলাইমান মালিক ইবনু হুওয়ায়রিস (রাযিয়াল্লাহু আনহু) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমরা কয়েকজন নবী (ﷺ)-এর নিকটে (দ্বীন শিখতে) আসলাম। তখন আমরা ছিলাম প্রায় সমবয়সী যুবক। বিশ দিন তাঁর কাছে আমরা থাকলাম। তিনি বুঝতে পারলেন, আমরা আমাদের পরিবারের নিকট প্রত্যাবর্তন করার জন্য উদগ্রীব হয়ে পড়েছি। যাদের আমরা বাড়িতে রেখে এসেছি তাদের ব্যাপারে তিনি আমাদের কাছে জিজ্ঞেস করলেন। আমরা তা তাঁকে জানালাম। তিনি ছিলেন কোমল হৃদয় ও দয়ার্দ্র। তাই তিনি বললেন,
ارْجِعُوْا إِلَى أَهْلِيْكُمْ فَعَلِّمُوْهُمْ وَمُرُوْهُمْ، وَصَلُّوْا كَمَا رَأَيْتُمُوْنِيْ أُصَلِّيْ، وَإِذَا حَضَرَتِ الصَّلَاةُ فَلْيُؤَذِّنْ لَكُمْ أَحَدُكُمْ، ثُمَّ لِيَؤُمَّكُمْ أَكْبَرُكُمْ
‘তোমরা তোমাদের পরিজনের নিকট ফিরে যাও। তাদের (কুরআন) শিক্ষা দাও, (সৎ কাজের) আদেশ কর এবং যে ভাবে আমাকে ছালাত আদায় করতে দেখেছ ঠিক তেমনভাবে ছলাত আদায় কর। ছালাতের ওয়াক্ত হলে, তোমাদের একজন আযান দেবে এবং যে তোমাদের মধ্যে বড় সে ইমামতী করবে’।[৩] অনুরূপভাবে আল্লাহ তা‘আলা বলেন,
وَ لِلّٰهِ عَلَى النَّاسِ حِجُّ الْبَيْتِ مَنِ اسْتَطَاعَ اِلَيْهِ سَبِيْلًا١ؕ وَ مَنْ كَفَرَ فَاِنَّ اللّٰهَ غَنِيٌّ عَنِ الْعٰلَمِيْنَ
‘আর মানুষের মধ্যে যার সেখানে যাওয়ার সামর্থ্য আছে, আল্লাহর উদ্দেশ্যে ঐ ঘরের হজ্জ করা তার জন্য অত্যাবশ্যকীয়। আর যে কেউ কুফরী করল সে জেনে রাখুক, নিশ্চয় আল্লাহ সৃষ্টিজগতের মুখাপেক্ষী নন’ (সূরা আলে ইমরান: ৯৭)।
প্রশ্ন হল- হজ্জ কিভাবে আদায় করব? কখন আদায় করব?
জাবির ইবনু ‘আব্দুল্লাহ (রাযিয়াল্লাহু আনহুমা) বলেন, আমি রাসূল (ﷺ)-কে তাঁর বাহনে সওয়ার অবস্থায় কংকর মারতে দেখেছি। এ সময় তিনি বলেছিলেন,
لِتَأْخُذُوْا مَنَاسِكَكُمْ، فَإِنِّيْ لَا أَدْرِيْ لَعَلِّي لَا أَحُجُّ بَعْدَ حَجَّتِي هَذِهِ
‘তোমরা হজ্জের নিয়ম-পদ্ধতি শিখে নাও। কেননা আমি অবহিত নই আমার এই হজ্জের পর আবার হজ্জ করার সুযোগ পাবো কি-না’।[৪] অন্য বর্ণনায় এসেছে, তিনি বলেন,
يَا أَيُّهَا النَّاسُ خُذُوْا عَنِّيْ مَنَاسِكَكُمْ، فَإِنِّيْ لَا أَدْرِيْ لَعَلِّي لَا أَحُجُّ بَعْدَ عَامِيْ هَذَا
‘হে মানব মণ্ডলী! তোমরা আমার নিকট থেকে হজ্জের নিয়ম-পদ্ধতি শিখে নাও। কেননা আমি অবহিত নই আমার এই বছরের হজ্জের পর আবার হজ্জ করার সুযোগ পাবো কি-না’।[৫] রাসূল (ﷺ) কিভাবে ছালাত আদায় করতেন, কিভাবে হজ্জ করেছেন, তার বিস্তারিত বর্ণনা ছহীহ হাদীছের মধ্যে সংরক্ষিত হয়েছে। এখন যে হাদীছ-ই মানেন না, সে কিভাবে ছালাত আদায় করবে, কিভাবে হজ্জ পালন করবে?! ইয়াহুদীদের মত, না-কি খ্রিস্টানদের মত?
(গ) সুন্নাতে তাক্বরিরিয়্যাহ বা মৌন সম্মতি দ্বারা কুরআনের তাফসীর। আমর ইবনুল আছ (রাযিয়াল্লাহু আনহুমা) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন,
اْحْتَلَمْتُ فِيْ لَيْلَةٍ بَارِدَةٍ فِيْ غَزْوَةِ ذَاتِ السَّلَاسِلِ فَأَشْفَقْتُ إِنِ اغْتَسَلْتُ أَنْ أَهْلِكَ فَتَيَمَّمْتُ ثُمَّ صَلَّيْتُ بِأَصْحَابِي الصُّبْحَ فَذَكَرُوْا ذَلِكَ لِلنَّبِيِّ ﷺ فَقَالَ: يَا عَمْرُو صَلَّيْتَ بِأَصْحَابِكَ وَأَنْتَ جُنُبٌ. فَأَخْبَرْتُهُ بِالَّذِيْ مَنَعَنِيْ مِنَ الْاِغْتِسَالِ، وَقُلْتُ :إِنِّيْ سَمِعْتُ اللهَ يَقُوْلُ ( وَ لَا تَقْتُلُوْۤا اَنْفُسَكُمْ١ؕ اِنَّ اللّٰهَ كَانَ بِكُمْ رَحِيْمًا) فَضَحِكَ رَسُوْلُ اللهِ ﷺ وَلَمْ يَقُلْ شَيْئًا.
‘যাতুস সালাসিল বা শিকলের যুদ্ধের সময় খুব শীতের রাতে আমার স্বপ্নদোষ হয়। আমার ভয় হল, আমি যদি গোসল করি তাহলে ক্ষতিগ্রস্ত হব। তাই আমি তায়াম্মুম করে লোকদের ছালাত আদায় করালাম। পরে তারা বিষয়টি রাসূল (ﷺ)-কে জানালো।
রাসূল (ﷺ) বললেন, হে আমর! তুমি নাকি জুনুবী অবস্থায় তোমার সাথীদের সঙ্গে ছালাত আদায় করেছ! তখন আমি গোসল না করার কারণ সম্পর্কে তাঁকে অবহিত করলাম এবং বললাম, আমি আল্লাহর এই বাণীও শুনেছি, ‘তোমরা নিজেরা নিজেদের হত্যা করো না। নিশ্চয় আল্লাহ তোমাদের প্রতি বড়ই দয়াবান’ (সূরা আন-নিসা: ২৯)। একথা শুনে রাসূল হেসে দিলেন এবং কিছুই বললেন না’।[৬]
শাইখুল ইসলাম ইমাম ইবনু তাইমিয়্যাহ (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন, ‘কুরআনের তাফসীর যদি কুরআন দ্বারা সম্ভব না হয় তাহলে কুরআনের তাফসীরের জন্য রাসূল (ﷺ)-এর সুন্নাহর প্রতি মনোনিবেশ করতে হবে’।[৭] ইমাম শাফিঈ (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন,
كل ما حكم به رسول الله ﷺ مما فهمه من القران
‘রাসূল (ﷺ) যা কিছু সিদ্ধান্ত দিয়েছেন তা কুরআনের মর্মানুসারেই দিয়েছেন’। ইমাম আহমাদ ইবনু হাম্বাল (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন, السنة تُفَسِّرُ الكتاب وتُبَيِّنُه ‘রাসূল (ﷺ)-এর সুন্নাহ কিতাবুল্লাহর ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ করে’।[৮]
(ইনশাআল্লাহ চলবে)
* মুর্শিদাবাদ, ভারত।
তথ্যসূত্র:
[১]. ঊলূমুল কুরআন, পৃ. ৩২৭।
[২]. ছহীহ মুসলিম, হা/১৯১৭; আবূ দাঊদ, হা/২৫১৪; ইবনু মাজাহ, হা/২৮১৩; মুসনাদে আহমাদ, হা/১৭৪৩২।
[৩]. ছহীহ বুখারী, হা/৬০০৮; ছহীহ মুসলিম, হা/৬৭৪; নাসাঈ, হা/৬৩৫।
[৪]. ছহীহ মুসলিম, হা/১২৯৭; আবূ দাঊদ, হা/১৯৭০।
[৫]. ছহীহুল জামি‘, হা/৭৮৮২।
[৬]. আবূ দাঊদ, হা/৩৩৪; মুসনাদে আহমাদ, হা/১৭৮৪৬; দিরাসাত ফী ঊলূমিল কুরআনিল কারীম, পৃ. ২১০।
[৭]. বুহূছুন ফী উসূলিত তাফসীর ওয়া মানাহিজুহু, পৃ. ৭৫।
[৮]. বুহূছুন ফী উসূলিত তাফসীর ওয়া মানাহিজুহু, পৃ. ৭৫।
প্রসঙ্গসমূহ »:
সুন্নাত