কুরআন ও সুন্নাহকে আঁকড়ে ধরা এবং মুসলিম জীবনে তার প্রভাব
-আবূ মাহদী মামুন বিন আব্দুল্লাহ *
ভূমিকা
সকল প্রশংসা আল্লাহ তা‘আলার জন্য। আমরা তাঁর প্রশংসা জ্ঞাপন করি, তাঁর নিকট সাহায্য প্রার্থনা করি, তাঁর নিকট ক্ষমা প্রার্থনা করি। দরূদ ও শান্তি বর্ষিত হোক প্রিয় নবী মুহাম্মাদ (ﷺ)-এর উপর। কুরআন ও সুন্নাহ মুসলিম জীবনের মূল ভিত্তি। এই দু’টিই মুসলিমদের জন্য পথনির্দেশক, যা তাদের জীবনকে সঠিক পথে চালিত করে। কুরআন ও সুন্নাহ ছাড়া মুসলিমদের জীবনযাত্রা অসম্ভব। এই দু’টির অনুসরণে মুক্তি আর অবাধ্যতায় লাঞ্ছনা ও অপমান। মানবজীবনের সকল সমস্যার সমাধান এ দু’টির মধ্যে বিদ্যমান। মুসলিম জীবনে কুরআন ও সুন্নাহকে আঁকড়ে ধরা খুবই যরূরী। তাই আজকের প্রবন্ধে ‘কুরআন ও সুন্নাহকে আঁকড়ে ধরা এবং মুসলিম জীবনে তার প্রভাব’ সম্পর্কে তথ্যবহুল আলোচনা করা হল।
আল-কুরআনের পরিচয়
আল-কুরআন (الْقُرْآنُ) শব্দটি আরবী। যা قَرْأٌ বা قَرْنٌ শব্দমূল থেকে নির্গত। قَرْأٌ (পড়া) শব্দ থেকে আসলে قُرْاَنُ শব্দের অর্থ হয় অধিক পঠিত। আর قَرْنٌ (মিলিত থাকা) শব্দ থেকে আসলে قُرْاٰنُ শব্দের অর্থ হয়; পরিপূর্ণভাবে মিলিত ও সংযুক্ত। যেহেতু কুরআন সর্বাধিক পঠিত গ্রন্থ এবং এর আয়াত অর্থ ও বিষয়বস্তুর মাঝে পরিপূর্ণ মিল রয়েছে, তাই আল-কুরআন (اَلْقُرْاٰنُ) নাম রাখা হয়েছে। ইসলামী পরিভাষায়,
هو كلام الله المعجز المنزّل على النّبي محمد ﷺ باللفظ العربي المكتوب في المصاحف المتعبّد بتلاوته المنقول بالتواتر المبدوء بسورة الفاتحة المختوم بسورة الناس
‘আল-কুরআন আল্লাহর চিরন্তন বাণী, যা নবী মুহাম্মাদ (ﷺ)-এর উপর আরবী ভাষায় অবতীর্ণ করা হয়েছে, মাছহাফে যা লিপিবদ্ধ, যার তেলাওয়াত ইবাদত এবং বর্ণনা মুতাওয়াতির পর্যায়ের, যা বর্ণনাকৃত এবং যার শুরু সূরা আল-ফাতিহা ও শেষ সূরা আন-নাস দ্বারা’।[১]
সুন্নাহর পরিচয়
সুন্নাহ (سُّنَّةُ) শব্দটি আরবী, যা (سَّنَّ) থেকে নির্গত। সুন্নাহ (سنة) শব্দটি একবচন, বহুবচনে (سنن) সুনান। সুন্নাহ হল বিদ’আতের বিপরীত। সুন্নাহ অর্থ হল- পথ, নিয়ম, পন্থা ইত্যাদি। এটি মূলত এমন একটি বিশেষ আচরণ বা প্রথাকে বোঝায় যা একটি বিশেষ সমাজ বা ব্যক্তি অনুসরণ করে। ইসলামী পরিভাষায় সুন্নাহ বলতে,
السنة هي ما نُقل عن النبي ﷺ من قول أو فعل أو تقرير أو صفة خَلْقية أو خُلُقية
‘সুন্নাহ হল নবী মুহাম্মাদ (ﷺ) থেকে বর্ণিত তাঁর কথা, কর্ম, অনুমোদন, অথবা শারীরিক ও চারিত্রিক গুণাবলী’।[২] ইমাম ইবনুল কাইয়্যিম (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন, السُّنَّةُ هِيَ مَا كَانَ عَلَيْهِ رَسُوْلُ اللهِ ﷺ وَأَصْحَابُهُ اِعْتِقَادًا وَاقْتِصَادًا وَقَوْلًا وَعَمَلًا ‘সুন্নাহ হল, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) ও তাঁর ছাহাবীগণ আক্বীদা, মধ্যমপন্থা, কথা ও কর্মগত দিক দিয়ে যার উপরে ছিলেন’।[৩]
সুন্নাহ ইসলামের দ্বিতীয় প্রধান উৎস, যার মাধ্যমে মুসলিমরা রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর জীবনযাপন ও তাঁর নির্দেশনা অনুসরণ করেন।
কুরআন ও সুন্নাহকে আঁকড়ে ধরার অর্থ
দুনিয়া ও আখেরাতে মুক্তির প্রধানতম উপায় কুরআন ও সুন্নাহকে আঁকড়ে ধরা। আঁকড়ে ধরাকে আরবীতে الإِعْتِصَامُ বলা হয়। যার শাব্দিক অর্থ اَلْاِسْتِمْسَاكُ ‘মযবুতভাবে আঁকড়ে ধরা’।[৪] ইবনে মানযূর (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন, الإِعْتِصَامُ অর্থ হল اَلْاِسْتِمْسَاكُ بِالشَّيءِ ‘কোন জিনিসকে শক্তভাবে আঁকড়ে ধরা’।[৫] সুতরাং الْإِعْتِصَامُ অর্থ হল কোন জিনিসকে শক্তভাবে আঁকড়ে ধরা।[৬] আল্লাহ তা’আলা বলেন, وَ اعۡتَصِمُوۡا بِحَبۡلِ اللّٰہِ ‘তোমরা আল্লাহর রজ্জুকে শক্তভাবে আঁকড়ে ধর’ (সূরা আলে ‘ইমরান : ১০৩)। ‘আল্লাহর রজ্জুকে শক্তভাবে আঁকড়ে ধরার অর্থ হল, اَلْإِعْتِصَامُ بِعَهْدِ اللهِ ‘আল্লাহর অঙ্গীকারকে শক্তভাবে আঁকড়ে ধরা’। কেউ বলেন, এর অর্থ হল, يَعْنِي الْقُرْآن ‘কুরআনকে আঁকড়ে ধরা’।[৭] সুতরাং যে ব্যক্তি কুরআনুল কারীমকে শক্তভাবে আঁকড়ে ধরল সে আল্লাহকেই শক্তভাবে আঁকড়ে ধরল। মহান আল্লাহ বলেন,وَ مَنۡ یَّعۡتَصِمۡ بِاللّٰہِ فَقَدۡ ہُدِیَ اِلٰی صِرَاطٍ مُّسۡتَقِیۡمٍ ‘যে ব্যক্তি আল্লাহকে সুদৃঢ়ভাবে গ্রহণ করে, নিঃসন্দেহে সে সরল পথের দিকে পরিচালিত হবে’ (সূরা আলে ‘ইমরান : ১০১)। আল্লাহ তা‘আলা কুরআনের অনেক আয়াতে তাঁর রজ্জুকে শক্তভাবে আঁকড়ে ধরার নির্দেশ দিয়েছেন।
কুরআন ও সুন্নাহকে আঁকড়ে ধরার আবশ্যকতা
ইসলামে কুরআন ও সুন্নাহকে আঁকড়ে ধরা প্রতিটি মুসলমানের জন্য অপরিহার্য। আল্লাহ তা‘আলা কুরআন ও সুন্নাহকে আঁকড়ে ধরার নির্দেশ দিয়েছেন। আর মানুষ যা কিছু অনুভব করে এবং যে বিষয়ে মতবিরোধে জড়িয়ে পড়ে সেগুলোকেও কুরআন ও সুন্নাহর দিকে ফিরিয়ে দিতে নির্দেশ দিয়েছেন। আল্লাহ তা‘আলা বলেন,
فَاِنۡ تَنَازَعۡتُمۡ فِیۡ شَیۡءٍ فَرُدُّوۡہُ اِلَی اللّٰہِ وَ الرَّسُوۡلِ اِنۡ کُنۡتُمۡ تُؤۡمِنُوۡنَ بِاللّٰہِ وَ الۡیَوۡمِ الۡاٰخِرِ ؕ ذٰلِکَ خَیۡرٌ وَّ اَحۡسَنُ تَاۡوِیۡلًا.
‘যদি কোন বিষয়ে তোমাদের মধ্যে মতভেদ ঘটে, তাহলে সেই বিষয়কে আল্লাহ তা‘আলা এবং তাঁর রাসূলের দিকে ফিরিয়ে দাও যদি তোমরা আল্লাহ এবং আখেরাতের প্রতি ঈমান এনে থাক; এটাই উত্তম এবং সুন্দরতম সমাধান’ (সূরা আন-নিসা : ৫৯)।
ইমাম ইবনু কাছীর (রাহিমাহুল্লাহ) বলেছেন,
أَيْ إِلَى كِتَاب الله وَسُنَّة رَسُوْلُهُ ﷺ وَهَذَا أَمْر مِنَ اللهِ عَزَّ وَجَلَّ بِأَنَّ كُلُّ شَيْء تَنَازَعَ النَّاس فِيْهِ مِنْ أُصُوْلِ الدِّيْن وَفُرُوعِهِ أَنْ يُرَدّ التَّنَازَع فِيْ ذَلِكَ إِلَى الكِتَاب وَالسُّنَّة كَمَا قَالَ تَعَالَى وَ مَا اخۡتَلَفۡتُمۡ فِیۡہِ مِنۡ شَیۡءٍ فَحُکۡمُہٗۤ اِلَی اللّٰہِ
‘আল্লাহর কিতাব এবং তাঁর রাসূল (ﷺ)-এর সুন্নাহর দিকে ফিরিয়ে দেয়া। এটাই আল্লাহর পক্ষ থেকে নির্দেশ। কেননা মানুষ শরী‘আতের মৌলিক এবং শাখাগত যে সকল বিষয়ে মতবিরোধ করে এরকম সকল বিষয়ের মতবিরোধকে কুরআন ও সুন্নাহর দিকে ফিরিয়ে দিতে হবে’। যেমনটি মহান আল্লাহ বলেছেন, ‘তোমরা যেসব বিষয়ে মতভেদ কর না কেন তার মীমাংসা তো আল্লাহর উপরই সোপর্দ’ (সূরা আশ-শূরা : ১০)।[৮]
আল্লাহ তা‘আলা বলেন, وَ اعۡتَصِمُوۡا بِحَبۡلِ اللّٰہِ جَمِیۡعًا وَّ لَا تَفَرَّقُوۡا ‘তোমরা সবাই আল্লাহর রজ্জুকে দৃঢ়ভাবে ধারণ কর এবং পরস্পরে বিভক্ত হয়ো না’ (সূরা আলে ‘ইমরান : ১০৩)। আল্লাহর রজ্জুকে আঁকড়ে ধরার অর্থ হল, কুরআনকে আঁকড়ে ধরা। অনুরূপভাবে রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর আনীত সকল বিষয়কে আঁকড়ে ধরতে এবং তিনি যা নিষেধ করেছেন তা থেকে বিরত থাকতে নির্দেশ দিয়েছেন। আল্লাহ তা‘আলা বলেন, وَ مَاۤ اٰتٰىکُمُ الرَّسُوۡلُ فَخُذُوۡہُ ٭وَ مَا نَہٰىکُمۡ عَنۡہُ فَانۡتَہُوۡا ‘তোমাদের কাছে রাসূলুল্লাহ (ﷺ) যা দিয়েছেন তা গ্রহণ কর এবং যা থেকে তিনি তোমাদের নিষেধ করেছেন তা থেকে বিরত থাকো’ (সূরা আল-হাশর : ৭)।
নিঃসন্দেহে কুরআন ও সুন্নাহকে আঁকড়ে ধরার মধ্যে রয়েছে একজন মুসলমানের ঈমান, জীবনযাত্রা এবং আখিরাতের সফলতা এবং আল্লাহর নৈকট্য লাভের সবচেয়ে বড় মাধ্যম। কেননা শরী‘আতের দলীল ব্যতীত কারো মতামত গ্রহণ করাটা ধ্বংসের দিকে ধাবিত করে। তাইতো সাহল ইবনু হুনায়ফ (রাযিয়াল্লাহু আনহু) বলেছেন,
اِتَّهِمُوْا رَأْيَكُمْ فَلَقَدْ رَأَيْتُنِيْ يَوْمَ أَبِيْ جَنْدَلٍ وَلَوْ أَسْتَطِيْعُ أَنْ أَرُدَّ عَلَى رَسُوْلِ اللهِ ﷺ أَمْرَهُ لَرَدَدْتُ وَاللهُ وَرَسُوْلُهُ أَعْلَمُ
‘তোমরা তোমাদের নিজস্ব মতামত সম্পর্কে সন্দেহ পোষণ করো। আমি তো আবূ জান্দালের দিনের ঘটনা স্মরণ করি; যদি আমি আল্লাহর রাসূল (ﷺ)-এর সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করতে সক্ষম হতাম, তবে অবশ্যই তা করতাম। কিন্তু আল্লাহ ও তাঁর রাসূলই সর্বাধিক জ্ঞানী’।[৯]
এই উক্তি সাহল ইবনু হুনায়ফ (রাযিয়াল্লাহু আনহু)-এর আত্মসমালোচনার একটি দৃষ্টান্ত। হুদায়বিয়ার সন্ধির সময় তিনি মনে করেছিলেন যে, মুসলমানদের জন্য এই চুক্তি অসম্মানজনক। কিন্তু পরবর্তীতে তিনি উপলব্ধি করেন যে, নবী করিম (ﷺ)-এর সিদ্ধান্তই ছিল সর্বোত্তম। তাই তিনি বলেন, নিজের মতামতের ব্যাপারে সন্দেহ করো, কারণ আল্লাহ ও তাঁর রাসূলই সর্বাধিক জ্ঞানী। সুতরাং আমাদের ব্যক্তিগত চিন্তা ও মতামত সবসময় সঠিক নাও হতে পারে। বরং কুরআন ও সুন্নাহর নির্দেশনাকে সর্বাঙ্গে অগ্রাধিকার দেয়া আবশ্যক।
কুরআন ও সুন্নাহকে আঁকড়ে ধরার উপকারিতা
কুরআন ও সুন্নাহ আঁকড়ে ধরার মাধ্যমে দুনিয়া ও আখিরাতের সফলতা নিশ্চিত করে। এই দু’টিকে আঁকড়ে ধরার মাধ্যমে অনেক উপকার লাভ করা যায়। যেমন-
১. আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন
কুরআন ও সুন্নাহকে অনুসরণ করে আমরা আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন করতে পারি। এ দু’টির অনুসরণের মাধ্যমেই শুধুমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন করা সম্ভব। মহান আল্লাহ বলেন,
قُلۡ اِنۡ کُنۡتُمۡ تُحِبُّوۡنَ اللّٰہَ فَاتَّبِعُوۡنِیۡ یُحۡبِبۡکُمُ اللّٰہُ وَ یَغۡفِرۡ لَکُمۡ ذُنُوۡبَکُمۡ ؕ وَ اللّٰہُ غَفُوۡرٌ رَّحِیۡمٌ
‘হে নবী! আপনি বলুন, যদি তোমরা আল্লাহকে ভালোবাসো, তবে আমাকে অনুসরণ করো, আল্লাহ তোমাদেরকে ভালোবাসবেন এবং তোমাদের পাপসমূহ মাফ করবেন। আল্লাহ নিশ্চয়ই পরম ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু’ (সূরা আলে ‘ইমরান : ৩১)।
২. সঠিক পথে অবিচল এবং ভ্রষ্টতা থেকে বাঁচার নিশ্চয়তা
কুরআন ও সুন্নাহকে আঁকড়ে ধরা সত্য ও সঠিক পথে অবিচল থাকার প্রধান মাধ্যম। ইসলামে রাসূলুল্লাহ (ﷺ) আমাদেরকে কুরআন ও সুন্নাহ অনুসরণের মাধ্যমে পথভ্রষ্টতা থেকে রক্ষা পাওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন। রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বিদায় হজ্জের সময় আরাফাতের খুত্ববায় বলেছেন, وَقَدْ تَرَكْتُ فِيْكُمْ مَا لَنْ تَضِلُّوْا بَعْدَهُ إِنِ اعْتَصَمْتُمْ بِهِ كِتَابَ اللهِ ‘হে মানুষ সকল, আমি তোমাদের মাঝে এমন কিছু রেখে যাচ্ছি, যা যদি তোমরা আঁকড়ে ধর, কখনো পথভ্রষ্ট হবে না- আল্লাহর কিতাব।[১০] অন্য বর্ণনায় আছে,تركت فيكم أمرين لن تضلوا ما تمسكتم بهما كتاب الله وسنة نبيه ‘আমি তোমাদের মাঝে দু’টি বিষয় রেখে যাচ্ছি, যতক্ষণ তোমরা সে দু’টিকে দৃঢ়ভাবে ধারণ করবে, কখনো পথভ্রষ্ট হবে না। তাহল আল্লাহর কিতাব ও তাঁর নবীর সুন্নাহ’।[১১]
উক্ত সনদে কিছু দূর্বলতা থাকলেও তথাপি আল্লাহর কিতাব ও রাসূলের সুন্নাহকে অনুসরণ করা ইসলামের মৌলিক শিক্ষা এবং সর্বজনস্বীকৃত সত্য। মুসলিম উম্মাহ সর্বদা এই দু’টি উৎসকে তাদের জীবনযাপনের মূল ভিত্তি হিসাবে গ্রহণ করেছে। আল্লাহ তা’আলা বলেন, اِنَّ الَّذِیۡنَ قَالُوۡا رَبُّنَا اللّٰہُ ثُمَّ اسۡتَقَامُوۡا فَلَا خَوۡفٌ عَلَیۡہِمۡ وَ لَا ہُمۡ یَحۡزَنُوۡنَ ‘যারা বলে আমাদের প্রতিপালক আল্লাহ, তারপর তারা সঠিক পথে অবিচল থাকে, তাদের কোনো ভয় থাকবে না, তারা চিন্তিতও হবে না’ (সূরা আল-আহকাফ : ১৩)।
একজন মুসলিম যদি কুরআন এবং রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর সুন্নাহকে দৃঢ়ভাবে আঁকড়ে ধরে, তবে সে কখনো বিভ্রান্ত হবে না বরং সঠিক পথে অবিচল থাকবে।
৩. আল্লাহর রহমতের মাধ্যমে আখেরাতের সফলতা
কুরআন ও সুন্নাহকে আঁকড়ে ধরার মাধ্যমে একজন মুসলমান তার আখিরাতের সফলতা অর্জন করতে পারে। সুন্নাহ আমাদের শেখায় কিভাবে কুরআনকে সঠিকভাবে বাস্তব জীবনে প্রয়োগ করতে হয়। যেমন, নবী করীম (ﷺ)-এর আচার-আচরণ, ইবাদত, ও জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্র থেকে আমাদের জন্য সঠিক দিকনির্দেশনা পাওয়া যায়। কুরআন ও সুন্নাহ অনুসরণকারী ব্যক্তি পরকালে আল্লাহর রহমত লাভ করবে এবং জান্নাতে প্রবেশ করবে। আল্লাহ তা‘আলা বলেন, وَ اَطِیۡعُوا اللّٰہَ وَ الرَّسُوۡلَ لَعَلَّکُمۡ تُرۡحَمُوۡنَ ‘তোমরা আল্লাহ ও রাসূলের আনুগত্য কর। যাতে তোমরা অনুগ্রহ প্রাপ্ত হতে পার’ (সূরা আলে ‘ইমরান : ১৩২)। মহান আল্লাহ বলেন, وَ مَنۡ یُّطِعِ اللّٰہَ وَ رَسُوۡلَہٗ وَ یَخۡشَ اللّٰہَ وَ یَتَّقۡہِ فَاُولٰٓئِکَ ہُمُ الۡفَآئِزُوۡنَ ‘যে আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের আনুগত্য করবে এবং আল্লাহকে ভয় করবে, তারা সাফল্য লাভ করবে’ (সূরা আন-নূর : ৫২)।
কুরআন ও সুন্নাহ অনুসরণ করলে একজন মুসলমান দুনিয়া ও আখিরাতে সফলতা লাভ করতে পারে। এ দু’টির নির্দেশনা অনুসরণ করে একজন মুসলমান দুনিয়াতে শান্তি এবং আখিরাতে আল্লাহর রহমত ও মাগফিরাত অর্জন করতে পারে।
৪. জান্নাতের নিশ্চয়তা
যারা কুরআন ও সুন্নাহ অনুসরণ করে জীবনযাপন করে, তারা জান্নাতের প্রতিশ্রুতি লাভ করে। আল্লাহ তা’আলা বলেন,
وَ مَنۡ یُّطِعِ اللّٰہَ وَ رَسُوۡلَہٗ یُدۡخِلۡہُ جَنّٰتٍ تَجۡرِیۡ مِنۡ تَحۡتِہَا الۡاَنۡہٰرُ خٰلِدِیۡنَ فِیۡہَا ؕ وَ ذٰلِکَ الۡفَوۡزُ الۡعَظِیۡمُ
‘যে কেউ আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের আনুগত্য করে, তিনি তাকে জান্নাতে প্রবেশ করাবেন, যার তলদেশ দিয়ে নদী প্রবাহিত, সেখানে তারা চিরস্থায়ী হবে। আর এটাই মহাসাফল্য’ (সূরা আন-নিসা : ১৩)। নবী করীম (ﷺ) বলেন,
كُلُّ أُمَّتِىْ يَدْخُلُوْنَ الْجَنَّةَ إِلَّا مَنْ أَبَى قِيْلَ وَمَنْ أبَى؟ قَالَ مَنْ أَطَاعَنِىْ دَخَلَ الْجَنَّةَ وَمَنْ عَصَانِىْ فَقَدْ أَبَى
‘আমার উম্মতের সবাই জান্নাতে প্রবেশ করবে, তবে যে অস্বীকার করবে, সে প্রবেশ করবে না। ছাহাবীগণ জিজ্ঞাসা করলেন, হে আল্লাহর রাসূল (ﷺ)! কে অস্বীকার করবে? তিনি বললেন, যে আমার আনুগত্য করবে, সে জান্নাতে প্রবেশ করবে। আর যে আমার অবাধ্য হবে, সেই অস্বীকার করবে’।[১২]
৫. উচ্চ মর্যাদার লোকদের সঙ্গী হওয়ার সৌভাগ্য
কুরআন ও সুন্নাহকে আঁকড়ে ধরে জীবন পরিচালনা করলে নবী-রাসূল, ছিদ্দীক, শহীদ এবং সৎকর্মশীল ব্যক্তিদের সাথে জান্নাতে থাকার সৌভাগ্য পাওয়া যাবে। মহান আল্লাহ বলেন,
وَ مَنۡ یُّطِعِ اللّٰہَ وَ الرَّسُوۡلَ فَاُولٰٓئِکَ مَعَ الَّذِیۡنَ اَنۡعَمَ اللّٰہُ عَلَیۡہِمۡ مِّنَ النَّبِیّٖنَ وَ الصِّدِّیۡقِیۡنَ وَ الشُّہَدَآءِ وَ الصّٰلِحِیۡنَ ۚ وَ حَسُنَ اُولٰٓئِکَ رَفِیۡقًا
‘যে কেউ আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের আনুগত্য করে, তারা তাদের সাথী হবে যাদের প্রতি আল্লাহ অনুগ্রহ করেছেন নবী, ছিদ্দীক, শহীদ ও সৎকর্মশীল ব্যক্তিদের। আর এরাই হলেন সর্বোত্তম সঙ্গী’ (সূরা আন-নিসা : ৬৯)।
নবী, ছিদ্দীক, শহীদ এবং সৎকর্মশীল ব্যক্তিদের সাথে জান্নাতে থাকা সাফল্যের চূড়ান্ত স্তর, যেখানে একজন মুমিন আল্লাহর প্রিয় বান্দাদের সঙ্গ লাভ করবে। এটি ইসলামী জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশনা, যা জান্নাতের পথের দিকনির্দেশনা দেয়। এছাড়া আরো অনেক উপকার রয়েছে, কুরআন ও সুন্নাহকে আঁকড়ে ধরার মাধ্যমে যা সাধন করা যায়।
মুসলিম জীবনে কুরআন ও সুন্নাহকে আঁকড়ে ধরার প্রভাব
কুরআন ও সুন্নাহ মুসলিমদের জন্য জীবন চলার সঠিক পথনির্দেশক, যা আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের একমাত্র উপায়। এ দু’টির মাধ্যমে মুসলমানরা তাদের আধ্যাত্মিক, নৈতিক, সামাজিক এবং পারিবারিক জীবনকে সুন্দরভাবে পরিচালিত করতে পারে। কুরআন ও সুন্নাহকে আঁকড়ে ধরার অনেক প্রভাব রয়েছে।
১. আধ্যাত্মিক উন্নতি ও নৈকট্য অর্জন
কুরআন ও সুন্নাহ অনুসরণ করলে একজন মুসলমান আল্লাহর নিকটবর্তী হতে পারে। কুরআন এবং সুন্নাহতে রয়েছে এমন সকল নির্দেশনা, যা মুসলমানদের আধ্যাত্মিক জীবন উন্নত করতে সাহায্য করে। নিয়মিত কুরআন তেলাওয়াত এবং নবী (ﷺ)-এর সুন্নাহ অনুসরণ করে একজন মুসলমান তার ঈমান শক্তিশালী করতে পারে এবং আল্লাহর সাথে সম্পর্ক আরও গভীর করতে পারে। মহান আল্লাহ পাক বলেন, اِنَّ ہٰذَا الۡقُرۡاٰنَ یَہۡدِیۡ لِلَّتِیۡ ہِیَ اَقۡوَمُ ‘এই কুরআন সেই পথ দেখায় যা সবচেয়ে সঠিক’ (সূরা আল-ইসরা : ৯)।
কুরআনই একমাত্র সত্য ও সঠিক পথনির্দেশক। যারা কুরআনের অনুসরণ করে ও সৎকর্ম করে, তারা দুনিয়া ও আখিরাতে মহাপুরস্কার লাভ করবে।
২. নৈতিকতা ও চরিত্রের উন্নয়ন
কুরআন ও সুন্নাহ মুসলিমদেরকে সর্বদা সৎ, ন্যায়পরায়ণ এবং ভাল আচরণ করতে শিক্ষা দেয়। নবী (ﷺ)-এর জীবন থেকে জানা যায়, তিনি মানুষের সাথে সদাচারী, সহানুভূতিশীল এবং ন্যায়পরায়ণ ছিলেন। কুরআন ও সুন্নাহ আঁকড়ে ধরলে একজন মুসলমান তার চরিত্র উন্নত করতে পারে এবং সমাজে এক ভালো নাগরিক হিসাবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে পারে। আল্লাহ তা‘আলা বলেন, وَ قُوۡلُوۡا لِلنَّاسِ حُسۡنًا ‘আর তোমরা মানুষের সাথে সুন্দর কথা বলো’ (সূরা আল-বাক্বারাহ : ৮৩)।
মানুষের সাথে নরম ও সুন্দর ভাষায় কথা বলা ইসলামের মৌলিক শিক্ষা। কঠোরতা ও রূঢ় ভাষা ব্যবহার করা ইসলাম নিরুৎসাহিত করেছে । সম্প্রীতি ও সৌহার্দ্য বজায় রাখা এবং ভালো আচরণ সমাজে শান্তি ও ঐক্য প্রতিষ্ঠা করে। কটূক্তি, গালমন্দ বা কঠিন কথাবার্তা দ্বন্দ্ব ও শত্রুতা সৃষ্টি করে। নবী করীম (ﷺ) সর্বদা সুন্দর ও মধুর ভাষায় কথা বলতেন।
৩. পারিবারিক জীবনের উন্নতি সাধন
কুরআন ও সুন্নাহতে পরিবার এবং সম্পর্কের উপর অনেক গুরুত্ব দেয়া হয়েছে। সুতরাং পারিবারিক সুসম্পর্ক বজায় রাখতে কুরআন ও সুন্নাহকে আঁকড়ে ধরা আবশ্যক। নবী করীম (ﷺ) বলেছেন,خَيْرُكُمْ خَيْرُكُمْ لِأَهْلِهِ، وَأَنَا خَيْرُكُمْ لِأَهْلِي ‘তোমাদের মধ্যে সবচেয়ে উত্তম সেই, যে তার পরিবারের জন্য উত্তম। আর আমি আমার পরিবারের জন্য তোমাদের মধ্যে সবচেয়ে উত্তম’।[১৩]
একজন মুসলমান তার পরিবারে ভালো আচরণ, শ্রদ্ধা এবং সহানুভূতি প্রদর্শন করে। কুরআন ও সুন্নাহ অনুসরণ করে একজন মুসলমান তার পারিবারিক জীবন সুন্দরভাবে পরিচালনা করতে পারে।
৪. মুসলিম ভ্রাতৃত্ববোধের বিকাশ
কুরআন ও সুন্নাহ শুধু ব্যক্তিগত জীবনের গাইডলাইন নয়, বরং এগুলো সামগ্রিকভাবে উম্মাহর ঐক্য ও ভ্রাতৃত্ববোধ গড়ে তুলতে সাহায্য করে। সুতরাং কুরআন ও সুন্নাহর অনুসরণে সকল মতানৈক্য ভুলে ভ্রাতৃত্ব পূর্ণ সম্পর্কের সূচনা হয়। আল্লাহ তা‘আলা বলেন,اِنَّمَا الۡمُؤۡمِنُوۡنَ اِخۡوَۃٌ ‘নিশ্চয়ই মুমিনগণ একে অপরের ভাই’ (সূরা আল-হুজুরাত : ১০)।
কুরআন ও সুন্নাহ অনুসরণের ফলে মুসলিম ভ্রাতৃত্ববোধে অনেক প্রভাব তৈরি হয়। যেমন-
(ক) পারস্পরিক ভালোবাসা ও দয়া সৃষ্টি হয় : রাসুলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেন, لَا يُؤْمِنُ أَحَدُكُمْ حَتَّى يُحِبَّ لِأَخِيهِ مَا يُحِبُّ لِنَفْسِهِ ‘তুমি ততক্ষণ পর্যন্ত প্রকৃত মুমিন হতে পারবে না, যতক্ষণ না তোমার ভাইয়ের জন্যও সেই জিনিস পছন্দ করো, যা তুমি নিজের জন্য পছন্দ করো’।[১৪] কুরআন ও সুন্নাহ অনুসরণ করলে স্বার্থপরতা দূর হয় এবং পরস্পরের কল্যাণ কামনার মানসিকতা গড়ে উঠে।
(খ) বিভেদ ও শত্রুতা দূর হয় : ইসলামে জাতি, বর্ণ, গোত্র, ভাষা ইত্যাদির ভিত্তিতে বিভেদ করা নিষিদ্ধ। মহান আল্লাহ বলেন, ‘তোমরা সবাই আল্লাহর রজ্জুকে দৃঢ়ভাবে ধারণ কর এবং পরস্পরে বিভক্ত হয়ো না’ (সূরা আলে ‘ইমরান : ১০৩)। সুন্নাহ অনুযায়ী পরস্পরের প্রতি হিংসা, বিদ্বেষ ও অন্যায় করা নিষিদ্ধ, যা ভ্রাতৃত্ববোধের বিকাশ ঘটায়।
(গ) সামাজিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠিত হয় : কুরআন ও সুন্নাহ আমাদের অন্যায় ও অবিচারের বিরুদ্ধে অবস্থান নিতে এবং সমাজে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করতে উৎসাহিত করে। রাসুলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেন, مَنْ كَانَ فِي حَاجَةِ أَخِيهِ كَانَ اللهُ فِي حَاجَتِهِ ‘যে ব্যক্তি তার ভাইয়ের প্রয়োজন পূরণ করবে, আল্লাহ তার প্রয়োজন পূরণ করবেন’।[১৫]
এই হাদীছ দ্বারা মুসলমানদের পরস্পরের প্রতি সহানুভূতি ও সহযোগিতা করার শিক্ষা পাওয়া যায়। যখন আমরা অন্যের সাহায্যে এগিয়ে আসি, তখন আল্লাহও আমাদের সাহায্য করেন।
(ঘ) ক্ষমাশীলতা ও সহনশীলতা বৃদ্ধি পায় : ভ্রাতৃত্ব বজায় রাখতে ক্ষমাশীলতা ও ধৈর্য অপরিহার্য, যা কুরআন ও সুন্নাহ আমাদেরকে শিক্ষা দেয়। আল্লাহ তা‘আলা বলেন, وَ الۡکٰظِمِیۡنَ الۡغَیۡظَ وَ الۡعَافِیۡنَ عَنِ النَّاسِ ؕ وَ اللّٰہُ یُحِبُّ الۡمُحۡسِنِیۡنَ ‘যারা ক্রোধ দমন করে ও মানুষকে ক্ষমা করে, আল্লাহ তাদের ভালোবাসেন’ (সূরা আলে ‘ইমরান : ১৩৪)। এ আয়াত ধৈর্য, ক্ষমাশীলতা ও উত্তম চরিত্র গঠনের শিক্ষা দেয়, যা মুসলিম উম্মাহর মধ্যে সম্প্রীতি ও শান্তি বজায় রাখে।
(ঙ) একে অপরের বিপদে মুসলিম উম্মাহ ঐক্যবদ্ধ হয় : মুসলিমরা এক দেহের মতো, যেখানে এক অঙ্গ ব্যথা পেলে পুরো শরীর ব্যথা অনুভব করে। রাসুলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেন,
مَثَلُ الْمُؤْمِنِيْنَ فِيْ تَوَادِّهِمْ وَتَرَاحُمِهِمْ وَتَعَاطُفِهِمْ مَثَلُ الْجَسَدِ إِذَا اشْتَكَى مِنْهُ عُضْوٌ تَدَاعَى لَهُ سَائِرُ الْجَسَدِ بِالسَّهَرِ وَالْحُمَّى
‘মুমিনরা পরস্পরের প্রতি দয়া, প্রেম ও সহানুভূতিতে এক দেহের মতো। যখন দেহের কোনো অঙ্গ অসুস্থ হয়, তখন সমগ্র দেহ জ্বর ও অনিদ্রায় কষ্ট পায়’।[১৬]
মুসলমানরা পরস্পরের সুখ-দুঃখের অংশীদার। যখন কোনো মুসলিম কষ্টে থাকে, তখন অন্য মুসলিমদেরও তার সাহায্যে এগিয়ে আসা উচিত। এতে উম্মাহর ঐক্য ও সংহতি বজায় থাকে।
৫. পাপ থেকে দূরে থাকা এবং আত্মশুদ্ধি অর্জন
কুরআন ও সুন্নাহ মুসলমানদের পাপ থেকে রক্ষা করার জন্য নানা নির্দেশনা দিয়েছে। সুতরাং কোনো ধরনের মিথ্যাচার, অহংকার, অপবিত্রতা এবং অন্যায় কাজ থেকে বিরত থাকার জন্য কুরআন ও সুন্নাহর শিক্ষাগুলো অনুসরণ করা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেন,
إِنَّهُ مَنْ يَعِشْ مِنْكُمْ فَسَيَرَى اخْتِلَافًا كَثِيْرًا، فَعَلَيْكُمْ بِسُنَّتِيْ وَسُنَّةِ الْخُلَفَاءِ الرَّاشِدِيْنَ الْمَهْدِيِّيْنَ، تَمَسَّكُوْا بِهَا وَعَضُّوْا عَلَيْهَا بِالنَّوَاجِذِ، وَإِيَّاكُمْ وَمُحْدَثَاتِ الْأُمُوْرِ، فَإِنَّ كُلَّ مُحْدَثَةٍ بِدْعَةٌ، وَكُلَّ بِدْعَةٍ ضَلَالَةٌ
‘তোমাদের মধ্যে যে ব্যক্তি দীর্ঘায়ু লাভ করবে, সে অনেক মতভেদ দেখতে পাবে। তাই তোমাদের জন্য আমার সুন্নাহ এবং সঠিক পথে পরিচালিত খলিফাদের সুন্নাহ অনুসরণ করা আবশ্যক। এটিকে দৃঢ়ভাবে আঁকড়ে ধরো এবং দৃঢ়ভাবে লেগে থাকো। নতুন নতুন বিষয় থেকে সাবধান থাকো, কারণ প্রত্যেক নতুন উদ্ভাবন বিদ‘আহ এবং প্রত্যেক বিদ‘আহ পথভ্রষ্টতা’।[১৭]
রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর সুন্নাহ অনুসরণ করাই মুক্তির পথ। তাঁর অনুসরণের মাধ্যমেই আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন করা যায়। আর কুরআন ও সুন্নাহর অনুসরণেই বিদ‘আত, পথভ্রষ্টতা এবং সকল পাপ থেকে বেঁচে থাকা সম্ভব। সঠিক পথে পরিচালিত খলিফাদের (আবূ বকর, উমর, উসমান, আলী (রাযিয়াল্লাহু আনহুম)) পথ অনুসরণও মুক্তি পেতে সহায়ক। এটি প্রমাণ করে যে, আল্লাহ ও রাসূলের নির্দেশ মেনে চললেই জান্নাতের পথ সহজ হয়, আর তা অমান্য করলে জাহান্নামের ঝুঁকি থাকে।
৬. শয়তানের প্ররোচনাগুলো প্রতিরোধ
কুরআন ও সুন্নাহ শয়তানের প্ররোচনা থেকে রক্ষা পেতে সহায়তা করে। যখন একজন মুসলমান কুরআন এবং সুন্নাহকে আঁকড়ে ধরে, তখন সে শয়তানের প্ররোচনার থেকে সতর্ক থাকে এবং তার জীবন সঠিক পথে পরিচালিত হয়। মহান আল্লাহ বলেন, اِنَّ الشَّیۡطٰنَ لَکُمۡ عَدُوٌّ فَاتَّخِذُوۡہُ عَدُوًّا ‘নিশ্চয়ই শয়তান তোমাদের শত্রু, সুতরাং তোমরা তাকে শত্রু হিসাবে গ্রহণ করো’ (সূরা ফাতির : ৬)।
কুরআন ও সুন্নাহর অনুসরণ করলে শয়তানের ধোঁকা ও কুমন্ত্রণা থেকে বাঁচা সম্ভব। ছালাত, কুরআন তেলাওয়াত, আল্লাহর যিকির, সুন্নাহ মেনে চলা ও ইস্তিগফার করা এগুলো শয়তানের প্ররোচনা থেকে রক্ষা করে এবং সঠিক পথে পরিচালিত করে।
কুরআন ও সুন্নাকে আঁকড়ে ধরার মাধ্যমে মুসলিম জীবনে অনেক প্রভাব ফেলে, যা পাপ থেকে বাঁচতে ও পরকালীন জীবনে জান্নাত লাভ করতে সহায়ক।
উপসংহার
কুরআন ও সুন্নাহ মুসলমানদের জীবনে এমন এক অমূল্য পথনির্দেশিকা যা তাদেরকে আল্লাহর সন্তুষ্টি, শান্তি, সাফল্য এবং পরকালীন মুক্তি অর্জনে সহায়তা করে। কুরআন ও সুন্নাহকে আঁকড়ে ধরার মাধ্যমে যেমন সফলতা লাভ করা যায়, অনুরূপভাবে এ দু’টির অবাধ্যতার কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হতে হয়। প্রবেশ করতে হয় চিরস্থায়ীভাবে জাহান্নামে। তাই মুসলমানদের উচিত কুরআন এবং সুন্নাহকে আঁকড়ে ধরে জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে পুঙ্খানুরূপে অনুসরণ করা, যাতে দুনিয়া ও আখিরাতে সফল্য লাভ করা যায়। আল্লাহ আমাদেরকে তাওফীক্ব দিন-আমীন!!
*দাওরায়ে হাদীছ, মাদরাসাতুল হাদীস, নাজির বাজার, ঢাকা। অধ্যয়নরত, আক্বীদা ও দাওয়াহ বিভাগ, মদীনা ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, সঊদী আরব।
তথ্যসূত্র:
[১]. ড. ওয়াবাহ বিন মুছত্বফা আয-যুহাইলী, তাফসীরুল মুনীর ফিল আক্বীদাতি ওয়াশ শারী‘আতি ওয়াল মানহাজ (দারুল ফিকর মা‘আছির, দ্বিতীয় মুদ্রণ ১৪১৮ হি.), ১ম খণ্ড, পৃ. ১৩।
[২]. ইবনু তাইমিয়াহ, মাজমূ‘উল ফাতাওয়া, ১৮তম খণ্ড, পৃ. ৬-৭; ইমাম নববী, আল-মাজমূঊ, ১ম খণ্ড, পৃ. ২৭; ইবনু হাজম, আল-ইহকাম ফি উসূলিল আহকাম, ১ম খণ্ড, পৃ. ১২১।
[৩]. ইবনুল কাইয়্যিম, ই‘লামুল মুআক্কিআইন, ১ম খণ্ড, পৃ. ৮১।
[৪]. ইছফাহানী, মুফরাদাতু আলফাযিল কুরআন, পৃ. ৫৬৯।
[৫]. লিসানুল ‘আরব, ১২তম খণ্ড, পৃ. ৪০৪।
[৬]. ইছফাহানী, মুফরাদাতু আলফাযিল কুরআন, পৃ. ৫৬৯।
[৭]. শাইখুল ইসলাম ইমাম ইবনু তাইমিয়াহ, মাজমূঊ ফাতাওয়া, ১৯তম খণ্ড, পৃ. ৭৬-৮৩।
[৮]. তাফসীরে ইবনু কাসীর, ২য় খণ্ড, পৃ. ৩৪৫।
[৯]. ছহীহ বুখারী, হা/৪১৮৯।
[১০]. ছহীহ মুসলিম, হা/১২১৮।
[১১]. মুওয়াত্ত্বা মালিক, হা/১৬০১; দারেমী, হা/১৬১৮, সনদ হাসান।
[১২]. ছহীহ বুখারী, হা/৭২৮০।
[১৩]. তিরমিযী, হা/৩৯২১; ইবনু মাজাহ, হা/১৯৭৭, সনদ ছহীহ।
[১৪]. ছহীহ বুখারী, হা/১৩।
[১৫]. ছহীহ বুখারী, হা/২৪৪২; ছহীহ মুসলিম, ২৫৮০।
[১৬]. ছহীহ বুখারী, হা/৬০১১; ছহীহ মুসলিম, হা/২৫৮৬।
[১৭]. আবূ দাঊদ, হা/৪৬০৭; তিরমিযী, হা/২৬৭৬, সনদ ছহীহ।