শনিবার, ০৭ মার্চ ২০২৬, ০১:০০ অপরাহ্ন

প্রশ্নোত্তরে নাজাতপ্রাপ্ত দলের আক্বীদাসমূহ

- মূল: শায়খ হাফিয ইবনু আহমাদ আল-হাকামী
- অনুবাদ: হাফীযুর রহমান বিন দিলজার হোসাইন*


ভূমিকা

গ্রন্থটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ, উপকারী ও বিপুল উপকারে পরিপূর্ণ। এটি দ্বীনের মূলনীতিসমূহকে অন্তর্ভুক্ত করেছে এবং তাওহীদের মূল বিষয়সমূহ তুলে ধরেছে। যার প্রতি সকল রাসূল আহ্বান করেছেন এবং যেটির জন্য আসমানী কিতাবসমূহ নাযিল হয়েছে। আর এ কথা স্বতঃসিদ্ধ যে, তাওহীদ ব্যতীত অন্য কোন পথে চললে নাজাত পাওয়া সম্ভব নয়।

এই গ্রন্থটি সঠিক পথ ও স্পষ্ট সত্যের পথে চলার নির্দেশনা ও দিকনির্দেশনা প্রদান করে। এতে ঈমান ও তার শাখাসমূহ এবং কী কী জিনিস ঈমানকে সম্পূর্ণরূপে ধ্বংস করে দেয় তার বিশ্লেষণ করা হয়েছে। প্রতিটি বিষয়ের সাথে দলীল সংযুক্ত করা হয়েছে, যাতে করে বিষয়টি পরিষ্কারভাবে বুঝা যায় এবং প্রকৃত সত্য স্পষ্ট হয়। এ গ্রন্থে কেবল আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামা‘আহর মতামতের ওপর নির্ভর করা হয়েছে এবং প্রবৃত্তি ও বিদ‘আতপন্থীদের মতামত ছেড়ে দেয়া হয়েছে। কেননা সেগুলো কেবল খণ্ডন করার জন্যই উল্লেখযোগ্য এবং যেগুলো কেবল সুন্নাহর তীর দিয়ে ভেঙ্গে চূর্ণ-বিচূর্ণ করে দেয়া হয়। প্রখ্যাত ইমামগণ এই ভ্রান্ত মতবাদগুলোর ভ্রান্তি স্পষ্ট করেছেন এবং সেগুলো খণ্ডনে স্বতন্ত্র গ্রন্থ রচনা করেছেন। তদুপরি, কোন কিছু তার বিপরীতের মাধ্যমে চেনা যায় এবং তার সংজ্ঞা ও সীমারেখার মাধ্যমে তা স্পষ্ট হয়। সূর্য উদিত হলে দিনের অস্তিত্ব প্রমাণের জন্য আর কিছু প্রয়োজন হয় না। যখন সত্য স্পষ্ট হয়, তারপর যা থাকে তা শুধু ভ্রান্তি।

গ্রন্থটি প্রশ্নোত্তর আকারে সাজানো হয়েছে, যাতে করে শিক্ষার্থী মনোযোগী হয় এবং জাগ্রত থাকে। অতঃপর এমনভাবে উত্তর দেয়া হয়েছে, যাতে বিষয়টি পরিষ্কার হয়ে যায় এবং সন্দেহ না থাকে। মাননীয় লেখক গ্রন্থের নাম দিয়েছেন ‘আ‘লামুস সুন্নাহ আল-মানশূরাহ লি-ই‘তিকাদিত ত্বাইফাতিল নাজিয়্যাতিল মানছূরাহ’ অর্থাৎ সাহায্য ও নাজাতপ্রাপ্ত দলের আক্বীদা বর্ণনায় সুন্নাতের বিস্তৃত ঝাণ্ডা। বিষয়টির গুরুত্ব বিবেচনায় ‘মাসিক আল-ইখলাছ’- পাঠক সমীপে সহজ ভাষায় ও বোধগম্য উপায়ে উপস্থাপনের জন্য এ বিষয়টি ‘প্রশ্নোত্তরে নাজাতপ্রাপ্ত দলের আক্বীদাসমূহ’ শীর্ষক শিরোনামে উপস্থাপন করা হল- [অনুবাদক]।

প্রশ্ন (১): বান্দার উপর সর্বপ্রথম ওয়াজিব কোনটি?

উত্তর: বান্দার উপর সর্বপ্রথম ওয়াজিব হচ্ছে, তাদেরকে আল্লাহ তা‘আলা যে উদ্দেশ্যে সৃষ্টি করেছেন, তাদের থেকে যে বিষয়ের অঙ্গীকার নিয়েছেন, যে বিষয় দিয়ে রাসূল প্রেরণ করেছেন এবং কিতার নাযিল করেছেন, সে সম্পর্কে জ্ঞানার্জন করা। এজন্যই আল্লাহ তা‘আলা দুনিয়া-আখেরাত, জান্নাত-জাহান্নাম সৃষ্টি করেছেন। আর এর জন্যই ক্বিয়ামত প্রতিষ্ঠিত হবে, দাঁড়িপাল্লা স্থাপিত হবে, আমলনামা প্রদান করা হবে। একারণেই কেউ সৌভাগ্যবান হবে আবার কেউ হবে হতভাগ্য। এ অনুযায়ী ক্বিয়ামতের দিন নূর (আলো) বণ্টিত হবে। আল্লাহ তা‘আলা বলেন, وَ مَنْ لَّمْ يَجْعَلِ اللّٰهُ لَهٗ نُوْرًا فَمَا لَهٗ مِنْ نُّوْرٍؒ ‘সেদিন আল্লাহ যাকে নূর (আলো) দান করবেন না, তার কোন নূর (আলো) থাকবে না’ (সূরা আন-নূর: ৪০)।

প্রশ্ন (২):  আল্লাহ তা‘আলা কোন্ জিনিসের জন্য সৃষ্টিকে সৃষ্টি করেছেন?

উত্তর: আল্লাহ তা‘আলা বলেন,

وَ مَا خَلَقْنَا السَّمٰوٰتِ وَ الْاَرْضَ وَ مَا بَيْنَهُمَا لٰعِبِيْنَ۰۰۳۸ مَا خَلَقْنٰهُمَاۤ اِلَّا بِالْحَقِّ وَ لٰكِنَّ اَكْثَرَهُمْ لَا يَعْلَمُوْنَ   .


‘আমরা নভোমণ্ডল ও ভূমণ্ডল এবং এ দু’য়ের মধ্যস্থিত কোন কিছুকেই খেলাচ্ছলে সৃষ্টি করিনি। আমরা এ দু’টিকে যথার্থভাবেই সৃষ্টি করেছি। কিন্তু অধিকাংশ এটা জানে না’ (সূরা আদ-দুখান: ৩৮-৩৯)। আল্লাহ তা‘আলা বলেন,

وَ مَا خَلَقْنَا السَّمَآءَ وَ الْاَرْضَ وَ مَا بَيْنَهُمَا بَاطِلًا١ؕ ذٰلِكَ ظَنُّ الَّذِيْنَ كَفَرُوْا.


‘আমরা আকাশ, পৃথিবী ও এ দু’য়ের মধ্যবর্তী কোন কিছুকে বৃথা সৃষ্টি করিনি। এটি হল অবিশ্বাসীদের ধারণা মাত্র’ (সূরা ছোয়াদ: ২৭)। আল্লাহ তা‘আলা আরো বলেন,

وَ خَلَقَ اللّٰهُ السَّمٰوٰتِ وَ الْاَرْضَ بِالْحَقِّ وَ لِتُجْزٰى كُلُّ نَفْسٍۭ بِمَا كَسَبَتْ وَ هُمْ لَا يُظْلَمُوْنَ.


‘আর আল্লাহ নভোমণ্ডল ও ভূমণ্ডল সৃষ্টি করেছেন যথাযথভাবে। যাতে প্রত্যেককে তার কৃতকর্ম অনুযায়ী ফলাফল দেয়া যায়। বস্তুতঃ তারা অত্যাচারিত হবে না’ (সূরা আল-জাছিয়া: ২২)। মহান আল্লাহ আরো বলেন,

وَ مَا خَلَقْتُ الْجِنَّ وَ الْاِنْسَ اِلَّا لِيَعْبُدُوْنِ

‘আর আমি জিন ও মানুষকে সৃষ্টি করেছি কেবল আমার ইবাদত করার জন্য’ (সূরা আয-যারিয়াত: ৫৬)।

প্রশ্ন (৩): ‘আব্দ (العبد) অর্থ কী?

উত্তর : ‘আব্দ’ (العبد) দ্বারা যদি অনুগত (المعبد) তথা অধীনস্ত (المذلل المسخر) উদ্দেশ্য হয়, তাহলে আসমান-যমীনের সকল জ্ঞানবান ও জ্ঞানহীন, তাজা-শুকনা, চলমান-স্থির, প্রকাশ্য-অপ্রকাশ্য, কাফের-মুমিন, সৎ-অসৎ সব কিছুই উদ্দেশ্য। সবই আল্লাহর সৃষ্টি, আল্লাহ কর্তৃক প্রতিপালিত, তাঁর অধীনস্ত, তাঁর পরিচালনাধীন। প্রত্যেক সৃষ্টির জন্য নির্দিষ্ট একটি গন্তব্যস্থল রয়েছে, সেখানে গিয়ে তার যাত্রা শেষ হবে। প্রত্যেকেই নির্দিষ্ট একটি সময়ের উদ্দেশ্যে চলমান। তার জন্য নির্ধারিত সীমা ছেড়ে একটি সরিষার দানা পরিমাণ স্থানও অতিক্রম করতে পারবে না। আল্লাহ তা‘আলা বলেন, ذٰلِكَ تَقْدِيْرُ الْعَزِيْزِ الْعَلِيْمِؕ ‘এটা হল মহাপরাক্রান্ত ও প্রজ্ঞাময়ের নির্ধারণ’ (সূরা ইয়াসীন: ৩৮)। আর ব্যবস্থাপনায় ন্যায়নীতিপূর্ণ ও প্রজ্ঞাময়। আর ‘আব্দ’ দ্বারা যদি ইবাদতকারী, অনুগত ও প্রিয় উদ্দেশ্য হয়, তাহলে ‘আব্দ’ অর্থ হবে: আল্লাহর সম্মানিত মুমিন ব্যক্তিগণ। তাঁরা হবেন আল্লাহ তা‘আলার তাক্বওয়াশীল বন্ধু। তাঁদের কোন ভয় নেই। আর তারা চিন্তিতও হবে না।

প্রশ্ন (৪) : ‘ইবাদত’ (العبادة) কাকে বলে?

উত্তর : ‘ইবাদত’ হল-

اَلْعِبَادَةُ هِيَ اِسْمٌ جَامِعٌ لِكُلِّ مَا يُحِبُّهُ اللهُ وَيَرْضَاهُ مِنَ الْأَقْوَالِ وَالْأَعْمَالِ الظَّاهِرَةِ وَالْبَاطِنَةِ وَالْبَرَاءَةِ مِمَّا يُنَافِيْ ذَلِكَ وَيُضَادُّهُ

‘আল্লাহ তা‘আলা বান্দার যেসমস্ত প্রকাশ্য-অপ্রকাশ্য কথা ও কাজকে ভালোবাসেন ও পসন্দ করেন এবং যে সমস্ত বিষয় আল্লাহর ভালোবাসা ও পসন্দের বিপরীত ও পরিপন্থী, তা থেকে সম্পর্ক ছিন্ন করা নাম’।

প্রশ্ন (৫) : বান্দার আমল কখন ‘ইবাদতে’ পরিণত হয়?

উত্তর : আমলের মধ্যে যখন দু’টি বস্তু পরিপূর্ণ অবস্থায় পাওয়া যাবে, তখন তা ইবাদতে পরিণত হবে। (১) আল্লাহকে পরিপূর্ণরূপে ভালোবাসা এবং (২) আল্লাহর সামনে পরিপূর্ণভাবে বিনয় ও আনুগত্য প্রকাশ করা। আল্লাহ তা‘আলা বলেন, وَ الَّذِيْنَ اٰمَنُوْۤا اَشَدُّ حُبًّا لِّلّٰهِ  ‘কিন্তু যারা ঈমান আনয়ন করেছে, তারা আল্লাহর ভালোবাসায় সর্বাধিক দৃঢ়’ (সূরা আল-বাক্বারাহ: ১৬৫)। আল্লাহ তা‘আলা আরো বলেন, اِنَّ الَّذِيْنَ هُمْ مِّنْ خَشْيَةِ رَبِّهِمْ مُّشْفِقُوْنَۙ  ‘নিশ্চয় যারা তাদের পালনকর্তার ভয়ে ভীত’ (সূরা আল-মুমিনূন: ৫৭)। আল্লাহ তা‘আলা আরো বলেন,

اِنَّهُمْ كَانُوْا يُسٰرِعُوْنَ فِي الْخَيْرٰتِ وَ يَدْعُوْنَنَا رَغَبًا وَّ رَهَبًا١ؕ وَ كَانُوْا لَنَا خٰشِعِيْنَ

‘তারা সর্বদা সৎকর্মে আগ্রহী থাকত। তারা আকাঙক ক্ষা ও ভীতির সাথে আমাদের আহ্বান করত। আর তারা ছিল আমাদের প্রতি বিনয়ী’ (সূরা আল-আম্বিয়া: ৯০)।

প্রশ্ন (৬) : বান্দা যে আল্লাহকে ভালোবাসে, তার আলামত বা নিদর্শন কী?

উত্তর : বান্দা কর্তৃক আল্লাহকে ভালোবাসার আলামত বা নিদর্শন হল, সে আল্লাহর প্রিয় বস্তুকে ভালোবাসবে এবং আল্লাহ যা অপছন্দ করেন, সে তা অপসন্দ করবে। আল্লাহর আদেশসমূহ মেনে চলবে এবং তাঁর নিষেধসমূহ থেকে দূরে থাকবে। আল্লাহর বন্ধুদেরকে বন্ধু হিসাবে গ্রহণ করবে এবং আল্লাহর শত্রুদেরকে শত্রু মনে করবে। এ জন্যই আল্লাহর জন্য কাউকে ভালোবাসা এবং আল্লাহর জন্যই কাউকে ঘৃণা করা ঈমানের সবচেয়ে মজবুত হাতল।

প্রশ্ন (৭) : বান্দা কিভাবে আল্লাহর প্রিয় ও সন্তোষজনক কাজগুলো জানতে পারবে?

উত্তর : আল্লাহ তা‘আলা যা পসন্দ করেন ও ভালোবাসেন, তা আমাদের জানিয়ে দিয়েছেন আদেশের মাধ্যমে এবং যা অপছন্দ করেন তা জানিয়ে দিয়েছেন নিষেধের মাধ্যমে। সুতরাং রাসূলগণ প্রেরণ এবং আসমানী কিতাবসমূহ নাযিলের মাধ্যমে বান্দাগণ আল্লাহর পসন্দনীয় আমলসমূহ জানতে পেরেছে। এর মাধ্যমেই তাদের নিকট আল্লাহর অকাট্য দলীল প্রতিষ্ঠিত হয়েছে এবং তাঁর পরিপূর্ণ হিকমত প্রকাশিত হয়েছে। আল্লাহ তা‘আলা বলেন,

رُسُلًا مُّبَشِّرِيْنَ وَ مُنْذِرِيْنَ لِئَلَّا يَكُوْنَ لِلنَّاسِ عَلَى اللّٰهِ حُجَّةٌۢ بَعْدَ الرُّسُلِ

‘আমরা রাসূলগণকে জান্নাতের সুসংবাদ দানকারী ও জাহান্নামের ভয় প্রদর্শনকারী রূপে প্রেরণ করেছি। যাতে রাসূলগণের পরে লোকদের জন্য আল্লাহর বিরূদ্ধে কোনরূপ অজুহাত দাঁড় করানোর সুযোগ না থাকে’ (সূরা আন-নিসা: ১৬৫)। আল্লাহ তা‘আলা আরো বলেন,

قُلْ اِنْ كُنْتُمْ تُحِبُّوْنَ اللّٰهَ فَاتَّبِعُوْنِيْ۠ يُحْبِبْكُمُ اللّٰهُ وَ يَغْفِرْ لَكُمْ ذُنُوْبَكُمْ١ؕ وَ اللّٰهُ غَفُوْرٌ رَّحِيْمٌ

‘(হে নবী!) আপনি বলুন, যদি তোমরা আল্লাহকে ভালোবাস, তবে আমার অনুরসরণ কর। তাহলে আল্লাহ তোমাদের ভালোবাসবেন ও তোমাদের গোনাসমূহ মাফ করে দিবেন। বস্তুত আল্লাহ ক্ষমাশীল ও দয়াবান’ (সূরা আলে ইমরান: ৩১)।

প্রশ্ন (৮) : ইবাদতের শর্ত কয়টি?

উত্তর : ইবাদতের শর্ত তিনটি: ১- ‘ছিদকুল আযীমাহ’ (صدق العزيمة)  তথা ইবাদত করার সুদৃঢ় ইচ্ছা পোষণ করা। আর এটি হচ্ছে ইবাদতের অস্তিত্বের শর্ত, (দ্বিতীয়) ‘ইখলাছুন নিয়্যাহ’ (إخلاص النية) তথা ‘নিয়ত বিশুদ্ধ হওয়া এবং (তৃতীয়) আল্লাহ তা‘আলা যে শরী‘আত (দ্বীন) অনুযায়ী ইবাদত করতে বলেছেন, ইবাদতটি সেই শরী‘আত অনুযায়ী হওয়া। শেষ দু’টি হচ্ছে ইবাদত কবুল হওয়ার শর্ত।

প্রশ্ন (৯) : ‘ছিদকুল আযীমাহ’ (صدق العزيمة)  তথা ইবাদত করার সুদৃঢ় ইচ্ছা পোষণ করা বলতে কী বুঝায়?

উত্তর : এটা হচ্ছে ইবাদত করতে গিয়ে সম্পূর্ণরূপে অলসতা পরিহার করা এবং কথা ও কর্মে পরিপূর্ণ মিল থাকা। আল্লাহ তা‘আলা বলেন,

يٰۤاَيُّهَا الَّذِيْنَ اٰمَنُوْا لِمَ تَقُوْلُوْنَ مَا لَا تَفْعَلُوْنَ۰۰۲ كَبُرَ مَقْتًا عِنْدَ اللّٰهِ اَنْ تَقُوْلُوْا مَا لَا تَفْعَلُوْنَ.

‘হে বিশ্বাসীগণ! তোমরা এমন কথা কেন বল যা তোমরা কর না? আল্লাহর নিকটে বড় ক্রোধের বিষয় হল, তোমরা যা বল তা কর না’ (সূরা আছ-ছফ্ফ: ২-৩)।

প্রশ্ন (১০): ‘ইখলাছুন নিয়্যাহ’ (إخلاص النية) তথা ‘নিয়ত বিশুদ্ধ হওয়ার অর্থ কী?

উত্তর: নিয়ত বিশুদ্ধ হওয়ার অর্থ হচ্ছে- বান্দা তার প্রকাশ্য-অপ্রকাশ্য সকল কথা ও কর্মের মাধ্যমে একমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টি কামনা করবে। আল্লাহ তা‘আলা বলেন, وَ مَاۤ اُمِرُوْۤا اِلَّا لِيَعْبُدُوا اللّٰهَ مُخْلِصِيْنَ لَهُ الدِّيْنَ ‘অথচ তাদেরকে এছাড়া কোন নির্দেশ দেয়া হয়নি যে, তারা খালেছ অন্তরে একনিষ্ঠভাবে কেবল আল্লাহর ইবাদত করবে’ (সূরা আল-বাইয়েনাহ: ৫)। আল্লাহ তা‘আলা আরো বলেন,

وَ مَا لِاَحَدٍ عِنْدَهٗ مِنْ نِّعْمَةٍ تُجْزٰۤىۙ۰۰۱۹ اِلَّا ابْتِغَآءَ وَجْهِ رَبِّهِ الْاَعْلٰى


‘এবং কারু জন্য তার নিকটে কোন অনুগ্রহ থাকে না যা প্রতিদান যোগ্য। কেবল তার মহান প্রতিপালকের চেহারা অন্বেষণ ব্যতীত’[১] (সূরা আল-লাইল: ১৯-২০)। অন্যত্র তিনি বলেন, اِنَّمَا نُطْعِمُكُمْ لِوَجْهِ اللّٰهِ لَا نُرِيْدُ مِنْكُمْ جَزَآءً وَّ لَا شُكُوْرًا ‘(তারা বলে) আমরা শুধু আল্লাহর চেহারা[২] কামনায় তোমাদেরকে খাদ্য দান করি। তোমাদের নিকট থেকে আমরা কোনরূপ প্রতিদান ও কৃতজ্ঞতা কামনা করি না’ (সূরা আদ-দাহর: ৯)। তিনি আরো বলেন,

مَنْ كَانَ يُرِيْدُ حَرْثَ الْاٰخِرَةِ نَزِدْ لَهٗ فِيْ حَرْثِهٖ١ۚ وَ مَنْ كَانَ يُرِيْدُ حَرْثَ الدُّنْيَا نُؤْتِهٖ مِنْهَا وَ مَا لَهٗ فِي الْاٰخِرَةِ مِنْ نَّصِيْبٍ.


‘যে ব্যক্তি আখেরাতের ফসল কামনা করে আমরা তার জন্য তার ফসল বাড়িয়ে দেই। আর যে ব্যক্তি দুনিয়ার ফসল কামনা করে, আমরা তাকে তা থেকে কিছু দিয়ে থাকি। কিন্তু আখেরাতে তার কোন অংশ থাকে না’ (সূরা আশ-শূরা: ২০)।

প্রশ্ন (১১): যেই শরী‘আত (দ্বীন) অনুযায়ী আল্লাহর ইবাদত করতে বলা হয়েছে, তা কোনটি?

উত্তর: তা হচ্ছে, দ্বীনে হানীফ তথা মিল্লাতে ইবরাহীম। আল্লাহ তা‘আলা বলেন, اِنَّ الدِّيْنَ عِنْدَ اللّٰهِ الْاِسْلَامُ ‘নিশ্চয় আল্লাহর নিকট মনোনীত একমাত্র দ্বীন হল ইসলাম’ (সূরা আলে ইমরান: ১৯)। আল্লাহ তা‘আলা আরো বলেন, اَفَغَيْرَ دِيْنِ اللّٰهِ يَبْغُوْنَ وَ لَهٗۤ اَسْلَمَ مَنْ فِي السَّمٰوٰتِ وَ الْاَرْضِ طَوْعًا وَّ كَرْهًا  ‘তবে কি তারা আল্লাহর দ্বীন বাদ দিয়ে অন্য দ্বীন তালাশ করছে? অথচ আসমান ও যমীনে যা কিছু আছে, সবই স্বেচ্ছায় বা অনিচ্ছায় তাঁর নিকটে আত্মসমর্পণ করেছে ’ (সূরা আলে ইমরান: ৮৩)। আল্লাহ তা‘আলা আরো বলেন, وَ مَنْ يَّرْغَبُ عَنْ مِّلَّةِ اِبْرٰهٖمَ اِلَّا مَنْ سَفِهَ نَفْسَهٗ ‘ইবরাহীমের দ্বীন থেকে কে মুখ ফিরিয়ে নিবে সে ব্যতীত,  যে নিজেকে বোকা প্রতিপন্ন করেছে?’ (সূরা আল-বাক্বারাহ: ১৩০)। অন্যত্র আল্লাহ তা‘আলা বলেন, وَ مَنْ يَّبْتَغِ غَيْرَ الْاِسْلَامِ دِيْنًا فَلَنْ يُّقْبَلَ مِنْهُ١ۚ وَ هُوَ فِي الْاٰخِرَةِ مِنَ الْخٰسِرِيْنَ   ‘আর যে ব্যক্তি ‘ইসলাম’ ব্যতীত অন্য কোন দ্বীন তালাশ করে, তার নিকট থেকে তা কখনোই কবুল করা হবে না এবং ঐ ব্যক্তি আখিরাতে ক্ষতিগ্রস্তদের অন্তর্ভুক্ত হবে’ (সূরা আলে ইমরান: ৮৫)। তিনি আরো বলেন, اَمْ لَهُمْ شُرَكٰٓؤُا شَرَعُوْا لَهُمْ مِّنَ الدِّيْنِ مَا لَمْ يَاْذَنْۢ بِهِ اللّٰهُ ‘তাদের কি এমন কোন শরীক আছে, যারা তাদের জন্য বিধান রচনা করেছে, যার অনুমতি আল্লাহ দেননি?’ (সূরা আশ-শূরা: ২১)।

প্রশ্ন (১২):  দ্বীনের স্তর কয়টি?

উত্তর: দ্বীনের স্তর হচ্ছে তিনটি। যথা: (১) ‘ইসলাম’ (الإسلام) (২) ‘ঈমান’ (الإيمان) (৩) ‘ইহসান’ (الإحسان)। এগুলো থেকে কোন একটি পৃথকভাবে উল্লেখ করা হলে পূর্ণ ইসলামকে বুঝাবে।

প্রশ্ন (১৩):  ইসলাম (الإسلام) কাকে বলে?

উত্তর: ইসলাম হল- اَلْاِسْتِسْلَامُ لِلهِ بِالتَّوْحِيْدِ، وَالْاِنْقِيَادُ لَهُ بِالطَّاعَةِ، وَالْخُلُوْصُ مِنَ الشِّرْكِ ‘তাওহীদ (এককত্ব) ও আনুগত্যের সাথে এক আল্লাহর নিকট পূর্ণ আত্মসমর্পন করা এবং শিরক থেকে সম্পর্কচ্ছেদ ঘোষণা করা’। আল্লাহ তা‘আলা বলেন, وَ مَنْ اَحْسَنُ دِيْنًا مِّمَّنْ اَسْلَمَ وَجْهَهٗ لِلّٰه  ‘তার চাইতে উত্তম দ্বীন কার আছে, যে তার চেহারাকে আল্লাহর উদ্দেশ্যে সমর্পণ করেছে’ (সূরা আন-নিসা: ১২৫)। আল্লাহ তা‘আলা আরো বলেন, وَ مَنْ يُّسْلِمْ وَجْهَهٗۤ اِلَى اللّٰهِ وَ هُوَ مُحْسِنٌ فَقَدِ اسْتَمْسَكَ بِالْعُرْوَةِ الْوُثْقٰى  ‘আর যে ব্যক্তি তার চেহারাকে সমর্পণ করল আল্লাহর দিকে সৎকর্মশীল (মুমিন) অবস্থায়, সে দৃঢ়ভাবে ধারণ করল এক মযবুত হাতল’ (সূরা লুক্বমান: ২২)। আল্লাহ তা‘আলা আরো বলেন, فَاِلٰهُكُمْ اِلٰهٌ وَّاحِدٌ فَلَهٗۤ اَسْلِمُوْا١ؕ وَ بَشِّرِ الْمُخْبِتِيْنَۙ  ‘আর তোমাদের উপাস্য মাত্র একজন। অতএব তাঁর নিকটে তোমরা আত্মসমর্পণ কর এবং তুমি বিনয়ীদের সুসংবাদ দাও’ (সূরা আল-হজ্জ: ৩৪)।

প্রশ্ন (১৪): ‘ইসলাম’ শব্দটি যখন এককভাবে ব্যবহৃত হবে, তখন দ্বীনের সকল স্তরকে অন্তর্ভুক্ত করার দলীল কী?

উত্তর: আল্লাহ তা‘আলা বলেন, اِنَّ الدِّيْنَ عِنْدَ اللّٰهِ الْاِسْلَامُ ‘নিশ্চয় আল্লাহর নিকট মনোনীত একমাত্র দ্বীন হল ইসলাম’ (সূরা আলে ইমরান: ১৯)। নবী করীম (ﷺ) বলেন, بَدَأَ الْإِسْلَامُ  غَرِيبًا وَسَيَعُوْدُ كَمَا بَدَأ ‘ইসলাম শুরুতে অপরিচিত ছিল, অচিরেই তা আবার শুরুর মত অপরিচিত হয়ে যাবে’।[৩] রাসূলুল্লাহ (ﷺ) আরো বলেন, أَفْضَلُ الْإِسْلَامِ إِيْمَانٌ بِاللهِ ‘ইসলামের সর্বোত্তম আমল হচ্ছে, আল্লাহর প্রতি ঈমান আনয়ন করা’।[৪] এ ছাড়াও অনেক স্থানে হাদীছটি বর্ণিত হয়েছে।

প্রশ্ন (১৫): ইসলামকে পাঁচটি রুকনের মাধ্যমে ব্যাখ্যা করার দলীল কী?

উত্তর: জিবরীল (আলাইহিস সালাম) যখন দ্বীন সম্পর্কে নবী করীম (ﷺ)-কে জিজ্ঞাসা করলেন, তখন জবাবে তিনি বললেন,

الْإِسْلَامُ أَنْ تَشْهَدَ أَنْ لَا إِلَهَ إِلَّا اللهُ وَأَنَّ مُحَمَّدًا رَسُوْلُ اللهِ ﷺ وَتُقِيْمَ الصَّلَاةَ وَتُؤْتِيَ الزَّكَاةَ وَتَصُوْمَ رَمَضَانَ وَتَحُجَّ الْبَيْتَ إِنِ اسْتَطَعْتَ إِلَيْهِ سَبِيْلًا

‘ইসলাম হচ্ছে এই, তুমি সাক্ষ্য দিবে যে, আল্লাহ ব্যতীত সত্য কোন ইলাহ (মা‘বূদ) নেই এবং মুহাম্মাদ (ﷺ) আল্লাহর রাসূল, ছালাত আদায় করবে, যাকাত প্রদান করবে, রামাযানের ছিয়াম পালন করবে এবং যদি পথ অতিক্রম করার সামর্থ্য হয় তখন বাইতুল্লাহর হজ্জ করবে’।[৫] নবী করীম (ﷺ) আরো বলেন,

بُنِيَ الإِسْلَامُ عَلَى خَمْسٍ شَهَادَةِ أَنْ لَا إِلَهَ إِلَّا اللهُ وَأَنَّ مُحَمَّدًا رَسُوْلُ اللهِ وَإِقَامِ الصَّلَاةِ وَإِيْتَاءِ الزَّكَاةِ وَالحَجِّ وَصَوْمِ رَمَضَانَ

‘ইসলামের স্তম্ভ হচ্ছে পাঁচটি। (১) এই মর্মে সাক্ষ্য দেয়া যে, আল্লাহ ব্যতীত প্রকৃতপক্ষে কোন ইলাহ (মা‘বূদ) নেই এবং নিশ্চয় মুহাম্মাদ (ﷺ) আল্লাহর রাসূল। (২) ছালাত আদায় করা (৩) যাকাত প্রদান করা, (৪) হজ্জ সম্পাদন করা এবং (৫) রামাযানের ছিয়াম পালন করা।[৬]

প্রশ্ন (১৬):  দ্বীনের মধ্যে শাহাদাতাইন তথা (لاَ إِلَهَ إِلَّا اللهُ وَأَنَّ مُحَمَّدًا رَسُوْلُ اللهِ)-এর মর্যাদা কতটুকু?

উত্তর: এ শাহাদাতাইন তথা আল্লাহ ব্যতীত সত্য কোন মা‘বূদ নেই এবং মুহাম্মাদ (ﷺ)-কে রাসূল হিসাবে সাক্ষ্য দেয়ার বাক্য পাঠ করা ব্যতীত কোন বান্দা ইসলামে প্রবেশ করতে পারে না। আল্লাহ তা‘আলা বলেন, اِنَّمَا الْمُؤْمِنُوْنَ الَّذِيْنَ اٰمَنُوْا بِاللّٰهِ وَ رَسُوْلِهٖ  ‘মুমিন তো কেবল তারাই, যারা আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের উপর বিশ্বাস স্থাপন করে’ (সূরা আন-নূর: ৬২; সূরা আল-হুজুরাত: ১৫)। নবী করীম (ﷺ) বলেছেন,

أُمِرْتُ أَنْ أُقَاتِلَ النَّاسَ حَتَّى يَشْهَدُوْا أَنْ لَا إِلَهَ إِلَّا اللهُ وَأَنَّ مُحَمَّدًا عَبْدُهُ وَرَسُوْلُهُ

‘আমি লোকদের সাথে যুদ্ধ চালিয়ে যাবার জন্য নির্দেশিত হয়েছি, যতক্ষণ না তারা সাক্ষ্য দেয় যে, আল্লাহ ব্যতীত সত্য কোন মা‘বূদ নেই এবং মুহাম্মাদ (ﷺ) আল্লাহর বান্দা ও তাঁর রাসূল’।[৭]

(ইনশাআল্লাহ চলবে)


* পরিচালক, দারুস সালাম ইসলামী কমপ্লেক্স, পিরুজালী ময়তাপাড়া, গাযীপুর।

তথ্যসূত্র :
[১]. ‘মহান প্রতিপালকের চেহারা অন্বেষণ’ অর্থ জান্নাতে আল্লাহর দর্শন।
[২]. ‘আল্লাহর চেহারা লাভের জন্য’ অর্থ জান্নাতে আল্লাহর দর্শন লাভের জন্য।
[৩]. ছহীহ মুসলিম, হা/১৪৫ ‘ঈমান’ ‘অধ্যায়’; তিরমিযী, হা/২৬২৯; ইবনু মাজাহ, হা/৩৯৮৬, ৩৯৮৭; মিশকাত, হা/১৫৯।
[৪]. হাদীছটি ইমাম মুসলিম (রাহিমাহুল্লাহ) আবূ হুরায়রা (রাযিয়াল্লাহু আনহু) হতে বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-কে জিজ্ঞাসা করা হলো, أَيُّ الْأَعْمَالِ أَفْضَلُ؟ قَالَ إِيمَانٌ بِاللهِ ‘কোন্ আমলটি সর্বোত্তম? তিনি বলেন, আল্লাহর প্রতি ঈমান আনা...’ ছহীহ মুসলিম, হা/৮৩ ‘ঈমান’ ‘অধ্যায়’; ছহীহ বুখারী, হা/২৬; মুসনাদে আহমাদ, হা/৭৫৮০।
[৫]. ছহীহ বুখারী, হা/৫০, ৪৭৭৭; ছহীহ মুসলিম, হা/৮ ‘ঈমান’ অধ্যায়,  ‘শব্দ বিন্যাস তাঁরই’।
[৬]. ছহীহ বুখারী, হা/৮, ৪৫১৪; ছহীহ মুসলিম, হা/১৬; মিশকাত, হা/৪।
[৭]. ছহীহ বুখারী, হা/২৫, ১৩৯৯; ছহীহ মুসলিম, হা/২২; মিশকাত, হা/১২।




প্রসঙ্গসমূহ »: আক্বীদা বা বিশ্বাস
বিদ‘আত পরিচিতি (৩০তম কিস্তি) - ড. মুহাম্মাদ বযলুর রহমান
বিদায় হজ্জের ভাষণ : তাৎপর্য ও মূল্যায়ন - অধ্যাপক মো. আকবার হোসেন
এমফিল ও পিএইচডি : গবেষণার প্রকৃতি ও পদ্ধতি - ড. মোহাম্মদ হেদায়েত উল্লাহ
ইসলামী তাবলীগ বনাম ইলিয়াসী তাবলীগ (২য় কিস্তি) - ড. মুযাফফর বিন মুহসিন
বিদ‘আত পরিচিতি (১৩তম কিস্তি) - ড. মুহাম্মাদ বযলুর রহমান
ইখলাছই পরকালের জীবনতরী (শেষ কিস্তি) - আব্দুল গাফফার মাদানী
যাদের জন্য জান্নাত ওয়াজিব - ড. ইমামুদ্দীন বিন আব্দুল বাছীর
ইসলামের দৃষ্টিতে প্রেম ও ভালোবাসা - আব্দুল গাফফার মাদানী
মুসলিম বিভক্তির কারণ ও প্রতিকার (২য় কিস্তি) - ড. মুযাফফর বিন মুহসিন
আধুনিক যুগে দাওয়াতী কাজের পদ্ধতি (২য় কিস্তি) - ড. মুকাররম বিন মুহসিন মাদানী
সুন্নাতের আলো বিদ‘আতের অন্ধকার - অনুবাদ : হাফীযুর রহমান বিন দিলজার হোসাইন
সুন্নাহ বিরোধী ও সংশয় উত্থাপনকারীদের চক্রান্তসমূহ ও তার জবাব - হাসিবুর রহমান বুখারী

সর্বশেষ প্রবন্ধ

ফেসবুক পেজ