পরিবর্তনের পর বাংলাদেশ: আমরা কি সত্যিই বদলেছি?
একটি দেশের ইতিহাসে কিছু সময় আসে, যখন মানুষ নতুন দিনের প্রত্যাশায় পুরোনো বাস্তবতাকে পেছনে ফেলে সামনে এগিয়ে যেতে চায়। পরিবর্তনের আকাঙ্ক্ষা তখন কেবল রাজনৈতিক অঙ্গনে সীমাবদ্ধ থাকে না; তা ছড়িয়ে পড়ে রাষ্ট্র, সমাজ, অর্থনীতি, শিক্ষা, সংস্কৃতি ও মানুষের ব্যক্তিজীবনে। বাংলাদেশও এমন এক পরিবর্তনের প্রত্যাশা ও বাস্তবতার মধ্য দিয়ে অতিক্রম করেছে। কিন্তু এই পরিবর্তনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নটি হল- আমরা কি সত্যিই বদলেছি? সরকার, ক্ষমতা কিংবা নেতৃত্বের দৃশ্যমান পরিবর্তন হতে পারে; কিন্তু একটি জাতির প্রকৃত পরিবর্তন তখনই ঘটে, যখন মানুষের চিন্তা, চরিত্র, মূল্যবোধ ও কর্মপদ্ধতিতে পরিবর্তন আসে। চেয়ার বদলালেই রাষ্ট্র বদলায় না; আইন পরিবর্তন করলেই নৈতিকতা পরিবর্তিত হয় না। বাহ্যিক কাঠামোর পরিবর্তনের সঙ্গে যদি মানুষের অন্তর্গত চরিত্রের পরিবর্তন না ঘটে, তাহলে এক সংকটের জায়গায় আরেক সংকট এসে দাঁড়ায়।
বাংলাদেশের বর্তমান বাস্তবতায় আমরা যেনা-ব্যভিচার, হত্যা, ধর্ষণ, দুর্নীতি, মাদক, চাঁদাবাজি, প্রতারণা, সহিংসতা, সামাজিক বিভাজন ও মূল্যবোধের অবক্ষয়ের নানা চিত্র দেখতে পাই। এসব সমস্যার বিরুদ্ধে আমরা প্রায় সবাই কথা বলি। কিন্তু প্রশ্ন হল-এসবের বিরুদ্ধে কথা বলার পাশাপাশি আমরা কি নিজেদেরও পরিবর্তন করছি? যে ব্যক্তি রাষ্ট্রের দুর্নীতির সমালোচনা করেন, তিনি কি সৎ? যে ব্যক্তি সুশাসনের দাবি করেন, তিনি কি নিজের দায়িত্ব পালনে আমানতদার? যে ব্যক্তি অন্যের অন্যায়ের বিচার চান, তিনি কি ন্যায়পরায়ণ? পরিবর্তনের সবচেয়ে কঠিন জায়গাটি এখানেই। ইসলাম মানুষের পরিবর্তনের সূচনা করেছে অন্তর থেকে। মহান আল্লাহ বলেন, اِنَّ اللّٰہَ لَا یُغَیِّرُ مَا بِقَوۡمٍ حَتّٰی یُغَیِّرُوۡا مَا بِاَنۡفُسِہِمۡ ‘নিশ্চয় আল্লাহ কোন জাতির অবস্থা পরিবর্তন করেন না, যতক্ষণ না তারা নিজেদের অবস্থা পরিবর্তন করে’ (সূরা আর-রা‘দ : ১১)। এই আয়াত আমাদের সামনে পরিবর্তনের একটি মৌলিক দর্শন তুলে ধরে। সমাজ পরিবর্তনের আগে মানুষকে পরিবর্তিত হতে হবে; রাষ্ট্রের সংস্কারের পাশাপাশি নাগরিকের চরিত্রও সংস্কার করতে হবে। কারণ রাষ্ট্র গঠিত হয় মানুষ দিয়ে, আর মানুষের চরিত্রই রাষ্ট্রের চরিত্রকে প্রভাবিত করে।
আমরা যদি একটি ন্যায়ভিত্তিক বাংলাদেশ চাই, তাহলে আমাদের প্রয়োজন আমানতদারি, ন্যায়বিচার ও জবাবদিহি। মহান আল্লাহ বলেন, اِنَّ اللّٰہَ یَاۡمُرُکُمۡ اَنۡ تُؤَدُّوا الۡاَمٰنٰتِ اِلٰۤی اَہۡلِہَا ۙ وَ اِذَا حَکَمۡتُمۡ بَیۡنَ النَّاسِ اَنۡ تَحۡکُمُوۡا بِالۡعَدۡلِ ‘নিশ্চয় আল্লাহ তোমাদের নির্দেশ দেন যে, তোমরা আমানতসমূহ তার হক্বদারদের কাছে পৌঁছে দেবে এবং যখন মানুষের মধ্যে বিচার করবে, তখন ন্যায়বিচার করবে’ (সূরা আন-নিসা : ৫৮)। মহান আল্লাহ আরো বলেন, وَ لَا یَجۡرِمَنَّکُمۡ شَنَاٰنُ قَوۡمٍ عَلٰۤی اَلَّا تَعۡدِلُوۡا ؕ اِعۡدِلُوۡا ۟ ہُوَ اَقۡرَبُ لِلتَّقۡوٰی ‘কোন সম্প্রদায়ের প্রতি বিদ্বেষ যেন তোমাদেরকে ন্যায়বিচার না করতে প্ররোচিত করে। তোমরা ন্যায়বিচার কর; এটাই তাক্বওয়ার অধিক নিকটবর্তী’ (সূরা আল-মায়িদাহ : ৮)। রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব থেকে শুরু করে অফিসের দায়িত্ব, ব্যবসা-বাণিজ্য, শিক্ষা, সাংবাদিকতা, নেতৃত্ব প্রতিটি ক্ষেত্রেই আমানতদারি ও ন্যায়বিচারের প্রয়োজন।
আজ আমাদের সমাজে একটি বড় সমস্যা হল- আমরা অন্যায়ের বিরোধিতা করি, কিন্তু অন্যায়কারী যখন আমাদের আপনজন বা স্বার্থসংশ্লিষ্ট ব্যক্তি হয়, তখন আমাদের অবস্থান বদলে যায়। এই দ্বৈতনীতি থেকে বেরিয়ে আসতে না পারলে কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন কখনোই পূর্ণতা পাবে না। মনে রাখতে হবে, ইসলামের দৃষ্টিতে ক্ষমতা কোন ব্যক্তিগত মালিকানা নয়; এটি আল্লাহর পক্ষ থেকে অর্পিত দায়িত্ব। রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেন, كُلُّكُمْ رَاعٍ وَكُلُّكُمْ مَسْئُولٌ عَنْ رَعِيَّتِهِ ‘তোমাদের প্রত্যেকেই দায়িত্বশীল এবং তোমাদের প্রত্যেককেই তার দায়িত্ব সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হবে’ (ছহীহ বুখারী, হা/৮৯৩)।
দায়িত্বশীলতার চেতনা যদি রাষ্ট্রের শীর্ষ নেতৃত্ব থেকে শুরু করে একজন সাধারণ নাগরিকের মধ্যে প্রতিষ্ঠিত হয়, তাহলে সমাজে ব্যাপক পরিবর্তন আসতে পারে। কিন্তু যখন মানুষ মনে করে যে তাকে কেউ দেখছে না, তার কোনো জবাবদিহি নেই, তখন আইন ও শাস্তির ভয় দিয়েও সর্বত্র সততা প্রতিষ্ঠা করা কঠিন হয়ে পড়ে। এজন্য সবচেয়ে বড় প্রয়োজন নৈতিক পুনর্জাগরণের। উন্নত সড়ক, ভবন, আধুনিক প্রযুক্তি, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও অবকাঠামোগত উন্নয়ন অবশ্যই প্রয়োজন। কিন্তু এসবের পাশাপাশি যদি মানুষের নৈতিক শিক্ষা বিলুপ্ত হয় এবং মানুষ আদর্শহীন হয়ে পড়ে, তাহলে উন্নয়নের ভিত দুর্বল হয়ে যাবে। একটি জাতির প্রকৃত সম্পদ কেবল তার প্রাকৃতিক সম্পদ বা অর্থনীতি নয়; তার সবচেয়ে বড় সম্পদ হল ধার্মিক সৎ, দায়িত্বশীল, দক্ষ ও নীতিবান মানুষ। তাদের হাতে যদি জ্ঞান, দক্ষতা, ঈমান, নৈতিকতা ও দায়িত্ববোধ তুলে দেয়া যায়, তাহলে বাংলাদেশ একটি শক্তিশালী ও কল্যাণমুখী রাষ্ট্রে পরিণত হতে পারে। আর যদি তাদের সামনে আদর্শের পরিবর্তে ভোগবাদ, মাদক, অশ্লীলতা, প্রতারণা ও অনৈতিক সাফল্যের মডেল উপস্থাপন করা হয়, তাহলে পরিবর্তনের সব স্বপ্নই একসময় ব্যর্থ হতে পারে। তাই শিক্ষাব্যবস্থার উদ্দেশ্য কেবল চাকরির উপযোগী মানুষ তৈরি করা নয়; বরং সৎ ও দায়িত্বশীল ধার্মিক মানুষ তৈরি করাও শিক্ষার অন্যতম প্রধান উদ্দেশ্য হওয়া উচিত।
আমরা যদি সত্যিই একটি নতুন বাংলাদেশ চাই, তাহলে কেবল রাষ্ট্রের কাছে পরিবর্তন দাবি করলে হবে না; নিজের ভেতরেও পরিবর্তনের সূচনা করতে হবে। এজন্য আমাদের বাহ্যিক পরিবর্তনের পাশাপাশি অন্তরের পরিবর্তন ঘটাতে হবে। তাওহীদ, তাক্বওয়া, আমানতদারি, ন্যায়বিচার, সত্যবাদিতা ও জবাবদিহির মূল্যবোধকে ব্যক্তি, পরিবার, সমাজ এবং রাষ্ট্রীয় জীবনে প্রতিষ্ঠিত করতে হবে। পরিবর্তনের প্রকৃত সূচনা ব্যালট বাক্সে নয়, মানুষের অন্তরে। আর একটি জাতির স্থায়ী পুনর্জাগরণ শুরু হয় তখনই, যখন মানুষ নিজের পরিবর্তনের দায়িত্ব নিজে গ্রহণ করে। বাংলাদেশের সামনে তাই আজ নতুন একটি প্রশ্ন নয়, বরং একটি আহ্বান যে, আমরা কি শুধু পরিবর্তনের দর্শক হব, না-কি পরিবর্তনের অংশীদারও হব? মহান আল্লাহ আমাদেরকে নৈতিক পরিবর্তনের মাধ্যমে বাংলাদেশকে একটি কল্যাণময় রাষ্ট্রে পরিণত করুন-আমীন!!