রবিবার, ১১ অক্টোবর ২০২৬, ০৫:১৫ পূর্বাহ্ন

ইসলামী দৃষ্টিতে বিয়ে ও দাম্পত্য জীবন 

- আবূ মাহদী মামুন বিন আব্দুল্লাহ* 


(৬ষ্ঠ কিস্তি)  

(৩) কন্যার অধিকার ও সম্মান রক্ষা করা

অভিভাবকের উচিত কন্যাকে এমন স্বামীর হাতে তুলে দেওয়া, যে তাকে সম্মান করবে, স্নেহ করবে এবং ইসলামী সীমার মধ্যে তার স্বাধীনতাকে মর্যাদা দেবে। নবী করীম (ﷺ) বলেছেন, استوصوا بالنساء خيرًا، فإنهن عوان عندكم ‘নারীদের সঙ্গে ভালো আচরণ করো, কারণ তারা তোমাদের অধীনে বন্দিনীর মতো’।[১] এ হাদীছ নারীর প্রতি সদ্ব্যবহার ও সুরক্ষার গুরুত্ব স্মরণ করিয়ে দেয়।

(৪) ধর্মীয় কর্তব্য পালনে তাড়াহুড়া বা প্রলোভন থেকে বিরত থাকা

অনেক সময় অভিভাবক সামাজিক চাপ, আর্থিক সুবিধা কিংবা প্রভাবশালী সম্পর্কের প্রলোভনে কন্যার বিয়ের সিদ্ধান্ত তাড়াহুড়ো করে নিয়ে ফেলেন। অথচ রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেন, التَّأنِّي من اللهِ والعجَلَةُ من الشيطانِ ‘ধীরস্থিরতা (বিবেচনা করে কাজ করা) আল্লাহর পক্ষ থেকে, আর তাড়াহুড়ো শয়তানের পক্ষ থেকে’।[২]

বিয়ে ইসলামে একটি গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত এবং জীবনব্যাপী দায়িত্বের সূচনা। তাই এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণে আবেগ, সামাজিক চাপ বা পার্থিব স্বার্থ নয়; বরং কন্যার দুনিয়া ও আখিরাতের কল্যাণই অভিভাবকের প্রধান বিবেচ্য হওয়া উচিত।

কোনো অভিভাবকের জন্য এমন ব্যক্তির সঙ্গে কন্যার বিয়ে দেওয়া সমীচীন নয়, যে তার দ্বীনি জীবনকে দুর্বল করে দিতে পারে বা তাকে অধর্ম ও গুনাহের পথে প্রলুব্ধ করতে পারে। বরং প্রকৃত কল্যাণ নিহিত রয়েছে এমন একজন দ্বীনদার ও চরিত্রবান স্বামীর মধ্যে, যিনি স্ত্রীকে আল্লাহর আনুগত্যে দৃঢ় থাকতে সহায়তা করবেন, তার ঈমান ও আমলকে সমৃদ্ধ করবেন এবং পারিবারিক জীবনে শান্তি, ভালোবাসা ও প্রশান্তি প্রতিষ্ঠা করবেন।

বিয়ের সঠিক পদ্ধতি

(ক) বিয়ের খুতবা পাঠ

ইসলামে বিয়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত ও সামাজিক বন্ধন। বিয়ের পূর্বে খুতবা পাঠ করা সুন্নাহসম্মত আমল। এই খুতবায় আল্লাহর প্রশংসা, তাঁর কাছে সাহায্য ও ক্ষমা প্রার্থনা করা হয় এবং তাক্বওয়া অবলম্বনের নির্দেশনা দেওয়া হয়। পাশাপাশি কুরআনের কিছু আয়াত তেলাওয়াত করা হয়, যা দাম্পত্য জীবনে ন্যায়পরায়ণতা, সততা ও দায়িত্ববোধ জাগ্রত করে। খুতবা আরবী ভাষায় হওয়ায় সাধারণত একজন আলেম এটি পাঠ করে থাকেন, যাতে সঠিকভাবে সুন্নাহ অনুযায়ী তা সম্পন্ন হয়। যদিও শারী‘আতের দৃষ্টিতে আলেমের উপস্থিতি বাধ্যতামূলক নয়, তবুও আমাদের সমাজে তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। উল্লেখ্য, সুন্নাহ অনুযায়ী খুতবা ইজাব-কবুলের আগে প্রদান করা উত্তম। তাই বিয়ের গুরুত্ব ও পবিত্রতা স্মরণ রেখে খুতবা পাঠের এই আমলটি যথাযথভাবে পালন করা মুসলিম সমাজের জন্য একটি সুন্দর ও তাৎপর্যপূর্ণ অনুশীলন। বিয়ের খুতবা নিম্নরূপ:

إِنَّ الْحَمْدَ لِلَّهِ نَحْمَدُهُ وَنَسْتَعِينُهُ وَنَسْتَغْفِرُهُ وَنَعُوذُ بِاللهِ مِنْ شُرُورِ أَنْفُسِنَا وَمِنْ سَيِّئَاتِ أَعْمَالِنَا مَنْ يَّهْدِهِ اللهُ فَلاَ مُضِلَّ لَهُ وَمَنْ يُضْلِلْ فَلاَ هَادِىَ لَهُ وَأَشْهَدُ أَنْ لاَ إِلَهَ إِلاَّ اللهُ وَحْدَهُ لاَ شَرِيكَ لَهُ وَأَشْهَدُ أَنَّ مُحَمَّدًا عَبْدُهُ وَرَسُولُهُ – یٰۤاَیُّہَا الَّذِیۡنَ اٰمَنُوا اتَّقُوا اللّٰہَ حَقَّ تُقٰتِہٖ وَ لَا تَمُوۡتُنَّ  اِلَّا وَ اَنۡتُمۡ  مُّسۡلِمُوۡنَ (آل عمران ١٠٢) یٰۤاَیُّہَا النَّاسُ اتَّقُوۡا رَبَّکُمُ الَّذِیۡ خَلَقَکُمۡ مِّنۡ نَّفۡسٍ وَّاحِدَۃٍ وَّ خَلَقَ مِنۡہَا زَوۡجَہَا وَ بَثَّ مِنۡہُمَا رِجَالًا کَثِیۡرًا وَّ نِسَآءً ۚ وَ اتَّقُوا اللّٰہَ الَّذِیۡ تَسَآءَلُوۡنَ بِہٖ وَ الۡاَرۡحَامَ ؕ اِنَّ اللّٰہَ کَانَ عَلَیۡکُمۡ  رَقِیۡبًا (النساء ١) یٰۤاَیُّہَا الَّذِیۡنَ اٰمَنُوا اتَّقُوا اللّٰہَ وَ قُوۡلُوۡا  قَوۡلًا  سَدِیۡدًا  . یُّصۡلِحۡ  لَکُمۡ  اَعۡمَالَکُمۡ وَ یَغۡفِرۡ لَکُمۡ ذُنُوۡبَکُمۡ ؕ وَ مَنۡ یُّطِعِ اللّٰہَ  وَ رَسُوۡلَہٗ  فَقَدۡ  فَازَ  فَوۡزًا عَظِیۡمًا (الأحزاب ٧٠-٧١(

অতঃপর ইমাম সাহেব পাত্র-পাত্রীদেরকে সংক্ষিপ্তভাবে নসীহা প্রদান করবেন। তিনি তাদেরকে আল্লাহভীতি অবলম্বন, পারস্পরিক সম্মান, ভালোবাসা ও ধৈর্যের সাথে দাম্পত্য জীবন পরিচালনা করা এবং ইসলামী আদর্শ অনুযায়ী একে অপরের হক্ব আদায় করার উপদেশ প্রদান করবেন।

(খ) ওলীর প্রস্তাব ও পাত্রের কবুল

আমাদের সমাজে অনেক সময় বিয়ে সম্পন্ন করার ক্ষেত্রে একটি প্রচলিত রীতি দেখা যায়, যেখানে কাযী বা বিয়ে পরিচালনাকারী আলেম বরকে সাথে নিয়ে সাক্ষীদের উপস্থিতিতে কনের নিকট গিয়ে পর্যায়ক্রমে কবুল বলানোর ব্যবস্থা করেন। সেখানে বরের পরিচয় ও মোহরের পরিমাণ উল্লেখ করে কনেকে কবুল বলতে বলা হয়, এরপর আবার বরের নিকট ফিরে এসে কনের পরিচয় ও মোহরের বিবরণ উল্লেখ করে তাকে কবুল বলানো হয়। এভাবে একাধিকবার কবুল বলানোর মাধ্যমে বিয়ে সম্পন্ন করা হয়। তবে এটি ইসলামের মূল শারী‘আতসম্মত পদ্ধতি নয়, বরং একটি প্রচলিত সামাজিক রীতি।

শারী‘আতের বিধান অনুযায়ী, কনের পিতা বা অভিভাবক (ওলী) বরের সামনে কনের পরিচয় ও নির্ধারিত মোহর উল্লেখ করে সরাসরি বিয়ের প্রস্তাব প্রদান করবেন। এ সময় অবশ্যই দু’জন সাক্ষী উপস্থিত থাকবেন। এরপর বর স্বতঃস্ফূর্তভাবে একবার স্পষ্ট ভাষায় ‘কবুল’ বা ‘আলহামদুলিল্লাহ, আমি গ্রহণ করলাম বা কবুল করলাম’ বলবেন। শারী‘আতের দৃষ্টিতে একবার স্পষ্ট কবুলই বিবাহ সম্পন্নের জন্য যথেষ্ট, যদিও তিনবার বলা উত্তম হিসেবে বিবেচিত হয়।[৩]

এখানে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল, কবুল বলার দায়িত্ব শুধু বরের উপর বর্তায়। কনের পক্ষ থেকে ওলী শুধু প্রস্তাব প্রদান ও অনুমতির ভূমিকা পালন করেন; তিনি কবুল করেন না। যদি বর কথা বলতে অক্ষম হন, তাহলে সাক্ষীদের উপস্থিতিতে ইশারা, লিখিত সম্মতি বা প্রচলিত বোঝাপড়ার মাধ্যমে তার সম্মতি গ্রহণ করলেই বিবাহ সম্পন্ন হয়ে যায়।

ইসলাম বিয়েকে অত্যন্ত সহজ, স্বচ্ছ এবং পারস্পরিক সম্মতিনির্ভর একটি ব্যবস্থা হিসেবে উপস্থাপন করেছে, যেখানে জটিলতা নয় বরং সরলতা ও স্পষ্টতাই মূল ভিত্তি।

(গ) নব দম্পতির জন্য দু‘আ করা

বিবাহ সম্পন্ন হওয়ার পর উপস্থিত সকলে বর-কনের জন্য নিম্নোক্ত দু’আ পড়বে-بَارَكَ اللهُ لَكَ وَبَارَكَ عَلَيْكَ وَجَمَعَ بَيْنَكُمَا فِى خَيْرٍ ‘আল্লাহ তোমার জন্য বরকত দিন, তোমার প্রতি বরকত নাযিল করুন এবং তোমাদের উভয়কে কল্যাণে মিলিত করুন’।[৪]

এটি নবদম্পতির জন্য রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর শেখানো সর্বোত্তম শুভেচ্ছা ও দু‘আ। এতে শুধু সুখ বা সন্তানের জন্য নয়; বরং দাম্পত্য জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে আল্লাহর বরকত, রহমত ও কল্যাণ কামনা করা হয়েছে। এই দু‘আ থেকে শিক্ষা পাওয়া যায় যে, মুসলিম সমাজে নবদম্পতিকে শুভেচ্ছা জানানোর সর্বোত্তম পদ্ধতি হলো রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর শেখানো এই বরকতের দু‘আ পাঠ করা।

বাসর রাতে স্বামী-স্ত্রীর করণীয়

ইসলামে বিয়ে সম্পন্ন হওয়ার পর স্বামী-স্ত্রীকে একত্রে থাকার সুযোগ করে দেওয়া এবং তাদের জন্য নিরিবিলি ও স্বাচ্ছন্দ্যময় পরিবেশ সৃষ্টি করা উত্তম। যেমন, বাসর ঘরকে পরিপাটি করে সাজানো। এর মাধ্যমে তারা একে অপরকে জানার, পারস্পরিক ভালোবাসা ও আস্থা গড়ে তোলার সুযোগ লাভ করে। একইভাবে নববধূর জন্য স্বামীর কাছে সুন্দর ও পরিপাটি হয়ে উপস্থিত হওয়াও দাম্পত্য জীবনের সৌন্দর্যের অংশ। ইসলাম স্বামী-স্ত্রী উভয়কেই একে অপরের জন্য পরিচ্ছন্ন, সুগন্ধিময় ও আকর্ষণীয় থাকতে উৎসাহিত করেছে। নিচে বাসর বা বিয়ের রাতে স্বামী-স্ত্রীর জন্য যা করণীয়, তা উল্লেখ করা হলো।

(১) স্ত্রীর মাথার অগ্রভাগে হাত রেখে দু‘আ করা

বাসর রাতে বা স্ত্রীকে প্রথমবার ঘরে আনার পর স্বামীর জন্য সুন্নাত হলো, স্ত্রীর মাথার সামনের অংশে (নাসিয়া) স্নেহের সঙ্গে হাত রেখে আল্লাহর নাম নিয়ে তার জন্য বরকতের দু‘আ করা। এ মর্মে রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেন, তোমাদের কেউ যখন কোনো নারীকে বিয়ে করবে অথবা কোনো চাকর (তৎকালীন বৈধ প্রথা অনুযায়ী) ক্রয় করবে, সে যেন তার কপালের সামনের চুল (নাসিয়া) স্পর্শ করে বিসমিল্লাহ পড়ে বরকতের দু‘আ করে এবং বলে, اَللَّهُمَّ إِنِّى أَسْأَلُكَ خَيْرَهَا وَخَيْرَ مَا جَبَلْتَهَا عَلَيْهِ وَأَعُوْذُ بِكَ مِنْ شَرِّهَا وَشَرِّ مَا جَبَلْتَهَا عَلَيْهِ ‘হে আল্লাহ! আমি আপনার কাছে তার কল্যাণ ও যে কল্যাণের উপর তাকে সৃষ্টি করেছেন, তা প্রার্থনা করছি। আর তার অকল্যাণ ও যে অকল্যাণের উপর তাকে সৃষ্টি করেছেন, তা থেকে আশ্রয় প্রার্থনা করছি’।[৫]

এই দু‘আর মাধ্যমে স্বামী আল্লাহর কাছে স্ত্রীর উত্তম চরিত্র, উত্তম স্বভাব, দ্বীনদারিতা এবং দাম্পত্য জীবনের কল্যাণ কামনা করেন। একই সঙ্গে তিনি এমন সব বিষয় থেকে আল্লাহর আশ্রয় প্রার্থনা করেন, যা সংসার জীবনে অশান্তি বা কষ্টের কারণ হতে পারে। স্ত্রীর মাথায় হাত রাখা কর্তৃত্ব প্রদর্শনের জন্য নয়; বরং এটি স্নেহ, ভালোবাসা ও দু‘আর প্রতীক। এর মাধ্যমে দাম্পত্য জীবনের সূচনা আল্লাহর নাম, বরকত ও তাঁর সাহায্য প্রার্থনার মাধ্যমে হয়। এভাবে বৈবাহিক জীবন শুরু করলে স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্ক আল্লাহভীতি, পারস্পরিক ভালোবাসা ও কল্যাণের ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার শিক্ষা পাওয়া যায়।

(২) স্বামী-স্ত্রী জামা‘আতে দু’রাকা‘আত ছালাত আদায় করা

নবদাম্পত্য জীবনের শুরুতে একসঙ্গে আল্লাহর ইবাদতের মাধ্যমে সম্পর্কের সূচনা করা অত্যন্ত সুন্দর ও কল্যাণকর একটি আমল। এর মাধ্যমে স্বামী-স্ত্রী উভয়েই আল্লাহর সাহায্য, বরকত ও হিদায়াত কামনা করেন এবং তাদের সংসার জীবনকে তাক্বওয়া ও ইবাদতের ভিত্তির উপর প্রতিষ্ঠিত করার অঙ্গীকার করেন। এ মর্মে ইবনে মাসঊদ (রাযিয়াল্লাহু আনহুমা) থেকে বর্ণিত, বুজাইলা গোত্রের এক ব্যক্তি আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রাযিয়াল্লাহু আনহুমা)-এর কাছে এসে বললেন, আমি এক কুমারী মেয়েকে বিয়ে করেছি। আমার আশঙ্কা হচ্ছে, সে হয়তো আমাকে অপসন্দ করবে (বা আমার প্রতি বিরূপ হবে)। তখন আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রাযিয়াল্লাহু আনহুমা) বললেন, নিশ্চয় পরস্পরের ভালোবাসা ও সম্প্রীতি আল্লাহর পক্ষ থেকে আসে, আর বিরাগ ও বিচ্ছিন্নতা শয়তানের পক্ষ থেকে আসে। শয়তান তাদের উভয়ের কাছে একে অপরকে অপসন্দনীয় করে তুলতে চায়। তাই তুমি যখন তার কাছে যাবে, তখন তাকে নির্দেশ দিও, যেন সে তোমার পেছনে দুই রাকা‘আত ছালাত আদায় করে।[৬]

আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রাযিয়াল্লাহু আনহুমা) বলেন, স্ত্রী স্বামীর কাছে গেলে স্বামী দাঁড়িয়ে যাবে এবং স্ত্রী তার পিছনে দাঁড়াবে। অতঃপর তারা একসঙ্গে দুই রাকা‘আত ছালাত আদায় করবে এবং বলবে,اَللّهُمَّ بَارِكْ لِىْ فِى أَهْلِىْ وَبَارِكْ لَهُمْ فِىَّ- اَللّهُمَّ اجْمَعْ بَيْنَنَا مَا جَمَعْتَ بِخَيْرٍو فَرِّقْ بَيْنَنَا إِذَا فَرَّقْتَ إِلَى خَيْرٍ ‘হে আল্লাহ! আপনি আমার জন্য আমার পরিবারে বরকত দিন এবং আমার ভিতরেও বরকত দিন পরিবারের জন্য। হে আল্লাহ! আপনি তাদের থেকে আমাকে রিযিক দিন আর আমার থেকে তাদেরকেও রিযিক দিন। হে আল্লাহ! আপনি আমাদের যতদিন একত্রে রাখেন কল্যাণেই একত্রে রাখুন। আর আমাদের মাঝে বিচ্ছেদ ঘটিয়ে দিলে কল্যাণের পথেই বিচ্ছেদ ঘটান’।[৭] এটি রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর মারফূ’ হাদীস নয়; বরং ছাহাবীদের আমল।

(৩) সহবাসের পূর্বে দু‘আ পড়া

স্বামী-স্ত্রীর সহবাসের পূর্বে আল্লাহর নাম নিয়ে নিচের দু‘আ পড়া সুন্নাত। রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেন, ‘তোমাদের কেউ স্ত্রীর কাছে আসলে সে যেন বলে, بِسْمِ اللهِ اللَّهُمَّ جَنِّبْنَا الشَّيْطَانَ وَجَنِّبِ الشَّيْطَانَ مَا رَزَقْتَنَا ‘আল্লাহর নামে শুরু করছি। হে আল্লাহ! আমাদের থেকে শয়তানকে দূরে রাখুন এবং আপনি আমাদের যে সন্তান দান করবেন, তার থেকেও শয়তানকে দূরে রাখুন’।[৮]

এই দু‘আর মাধ্যমে স্বামী-স্ত্রী নিজেদের জন্য এবং ভবিষ্যৎ সন্তানের জন্য আল্লাহর বিশেষ হিফাযত কামনা করেন। এই দু‘আ পড়লে হাদীছের ভাষায় ‘শয়তান তার কোনো ক্ষতি করতে পারবে না’ এর অর্থ হলো, আল্লাহর ইচ্ছায় সেই সন্তান শয়তানের বিশেষ অনিষ্ট ও প্রভাব থেকে সংরক্ষিত থাকবে। এর অর্থ এই নয় যে, সে কখনো কোনো গুনাহ করবে না বা জীবনে কোনো পরীক্ষা-নিরীক্ষার সম্মুখীন হবে না; বরং আল্লাহ তাকে বিশেষভাবে হিফাযত করবেন।

(৪) বৈধ স্থানে সহবাস করা

আল্লাহ তা‘আলা বলেন, نِسَآؤُکُمۡ حَرۡثٌ لَّکُمۡ  ۪ فَاۡتُوۡا حَرۡثَکُمۡ اَنّٰی شِئۡتُمۡ ‘তোমাদের স্ত্রীরা তোমাদের শস্যক্ষেত্র; সুতরাং তোমরা তোমাদের শস্যক্ষেতে যেভাবে ইচ্ছা গমন কর’ (সূরা আল-বাক্বারাহ : ২/২২৩)। এ আয়াতে আল্লাহ তা‘আলা স্ত্রীকে ‘শস্যক্ষেত্র’ (حَرْثٌ) এর সঙ্গে উপমা দিয়েছেন। যেমন শস্যক্ষেত্রে বীজ বপনের মাধ্যমে ফসল উৎপন্ন হয়, তেমনি স্ত্রীর গর্ভ সন্তান জন্মদানের স্থান। তাই বৈবাহিক সহবাসের বৈধ স্থান হলো যোনিপথ, যা সন্তান জন্মের স্বাভাবিক পথ।

‘أَنَّى شِئْتُمْ’ (যেভাবে ইচ্ছা) দ্বারা উদ্দেশ্য হলো, স্বামী-স্ত্রী যে কোনো বৈধ পদ্ধতিতে সহবাস করতে পারে; সামনে থেকে, পেছন দিক থেকে বা পাশ ফিরে; যে পদ্ধতিতেই হোক না কেন, শর্ত হলো সহবাস অবশ্যই যোনিপথে হতে হবে।

(৫) সহবাসের ক্ষেত্রে নিষিদ্ধ সময় ও স্থান থেকে বিরত থাকা

ইসলাম সহবাসকে বৈধ করেছে, তবে কিছু সময় ও স্থানকে হারাম ঘোষণা করেছে। তাই ঋতুকালীন সময়ে এবং স্ত্রীর পায়ুপথে সহবাস থেকে অবশ্যই বিরত থাকতে হবে। রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেন, مَنْ أَتَى حَائِضًا أَوِ امْرَأَةً فِى دُبُرِهَا أَوْ كَاهِنًا فَصَدَّقَهُ بِمَا يَقُوْلُ فَقَدْ كَفَرَ بِمَا أُنْزِلَ عَلَى مُحَمَّدٍ ‘যে ব্যক্তি কোন ঋতুবতী মহিলার সঙ্গে কিংবা স্ত্রীর পায়ুপথে সঙ্গম করে অথবা গণকের কাছে যায় এবং তার কথায় বিশ্বাস স্থাপন করে, সে যেন মুহাম্মাদ (ﷺ)-এর প্রতি যা অবতীর্ণ হয়েছে তা অস্বীকার করল’।[৯]

পায়ুপথে সহবাস সম্পর্কে রাসূলুল্লাহ (ﷺ) অন্যত্র বলেন, مَلْعُونٌ مَنْ أَتَى امْرَأَتَهُ فِي دُبُرِهَا ‘যে ব্যক্তি তার স্ত্রীর পায়ুপথে সহবাস করে, সে অভিশপ্ত’।[১০]

ইসলাম ঋতুকালীন সময়ে এবং পায়ুপথে সহবাসকে নিষিদ্ধ করেছে। তাই স্বামী-স্ত্রীর উচিত, আল্লাহর নির্ধারিত সীমারেখা মেনে বৈধ উপায়ে দাম্পত্য জীবন পরিচালনা করা। এতে দাম্পত্য জীবনে পবিত্রতা, বরকত এবং আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জিত হয়।

(৬) স্ত্রী সহবাসের পর ঘুমানোর পূর্বে ওযূ করা

সহবাসের পর সঙ্গে সঙ্গে গোসল করা উত্তম। তবে কোনো কারণে গোসল বিলম্বিত করে ঘুমাতে, খাওয়া-দাওয়া করতে বা পুনরায় সহবাস করতে চাইলে আগে ওযু করে নেওয়া সুন্নাত। এ মর্মে রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেন,

ثَلَاثَةٌ لَا تَقْرَبُهُمُ الْمَلَائِكَةُ: جِيفَةُ الْكَافِرِ، وَالْمُتَضَمِّخُ بِالْخَلُوقِ، وَالْجُنُبُ إِلَّا أَنْ يَتَوَضَّأَ 

‘তিন ব্যক্তির নিকট ফেরেশতাগণ আসেন না: কাফিরের লাশ,

জাফরান ব্যবহারকারী এবং অপবিত্র ব্যক্তি যতক্ষণ না সে ওযূ করে’।[১১] অনুরূপ রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেন, إِذَا جَلَسَ بَيْنَ شُعَبِهَا الْأَرْبَعِ، ثُمَّ جَهَدَهَا، فَقَدْ وَجَبَ الْغُسْلُ، وَإِنْ لَمْ يُنْزِلْ ‘যখন স্বামী স্ত্রীর চার অঙ্গের মধ্যে বসে সহবাস সম্পন্ন করে, তখন বীর্যপাত না হলেও গোসল ফরয হয়ে যায়’।[১২]

অতএব, সহবাসের পর সঙ্গে সঙ্গে গোসল করা উত্তম। তবে কোনো কারণে গোসল বিলম্বিত করে ঘুমাতে, খাওয়া-দাওয়া করতে বা পুনরায় সহবাস করতে চাইলে আগে ওযূ করে নেওয়া সুন্নাত।

(৭) দাম্পত্য গোপনীয়তা রক্ষা করা

স্বামী-স্ত্রীর পারস্পরিক সম্পর্ক একান্ত ব্যক্তিগত ও আমানতস্বরূপ। তাই সহবাস বা দাম্পত্য জীবনের গোপন বিষয় অন্যের কাছে প্রকাশ করা ইসলামে কঠোরভাবে নিষিদ্ধ। রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেন,

إِنَّ مِنْ أَشَرِّ النَّاسِ عِنْدَ اللَّهِ مَنْزِلَةً يَوْمَ الْقِيَامَةِ، الرَّجُلَ يُفْضِي إِلَى امْرَأَتِهِ، وَتُفْضِي إِلَيْهِ، ثُمَّ يَنْشُرُ سِرَّهَا

‘কিয়ামতের দিন আল্লাহর নিকট সবচেয়ে নিকৃষ্ট ব্যক্তি সে, যে স্ত্রীর সঙ্গে একান্তে মিলিত হওয়ার পর তার গোপন বিষয় মানুষের কাছে প্রকাশ করে’।[১৩]

দাম্পত্য জীবনের গোপনীয়তা রক্ষা করা স্বামী-স্ত্রী উভয়ের দায়িত্ব। সহবাসের বিবরণ, একান্ত আলাপ, শারীরিক বিষয় বা ব্যক্তিগত দুর্বলতা অন্যের কাছে প্রকাশ করা ইসলামে গুরুতর অপরাধ। এতে পারস্পরিক বিশ্বাস নষ্ট হয়, লজ্জাশীলতা বিনষ্ট হয় এবং দাম্পত্য সম্পর্ক ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তাই স্বামী-স্ত্রীর উচিত একে অপরের ব্যক্তিগত বিষয়কে আমানত মনে করা এবং প্রয়োজন ছাড়া তা কারও কাছে প্রকাশ না করা। এর মাধ্যমে দাম্পত্য জীবনের সম্মান, ভালোবাসা ও পারস্পরিক আস্থা অটুট থাকে।

(ইনশাআল্লাহ চলবে)


* দাওরায়ে হাদীছ, মাদরাসাতুল হাদীস, নাজির বাজার, ঢাকা। অধ্যয়নরত, আক্বীদা ও দাওয়াহ বিভাগ, মদীনা ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, সঊদী আরব।

তথ্যসূত্র :
[১]. তিরমিযী, হা/১১৬৩।  
[২]. সিলসিলা ছহীহাহ, হা/১৭৯৫; ছহীহুল জামি‘, হা/৩০১১।  
[৩]. ছহীহ বুখারী, হা/৯৫; মিশকাতুল মাছাবীহ, হা/২০৮।
[৪]. আবূ দাঊদ, হা/২১৩০; তিরমিযী, হা/১০৯১।
[৫]. আবূ দাঊদ, হা/২১৬০; ইবনে মাজাহ, হা/১৯১৮।
[৬]. মুছান্নাফ ইবনে আবী শাইবাহ, হা/১৭৪৪৪।
[৭]. মু‘জামুল কাবীর, হা/৮৯০০; মুসান্নাফ আব্দুর রাজ্জাক, হা/১০৪৬০; মুসান্নাফ ইবনে আবী শাইবাহ, হা/১৭১৫৬।
[৮]. ছহীহ বুখারী, হা/১৪১; ছহীহ মুসলিম, হা/১৪৩৪।
[৯]. ইবনু মাজাহ, হা/৬৩৯; তিরমিযী, হা/১৩৫।
[১০]. মুসনাদে আহমাদ, হা/১০২০৬; আবূ দাউদ, হা/২১৬২।  
[১১]. আবূ দাঊদ, হা/৪১৮০।   
[১২]. ছহীহ বুখারী, হা/২৯১; ছহীহ মুসলিম, হা/৩৪৮।    
[১৩]. ছহীহ মুসলিম, হা/১৪৩৭।   




প্রসঙ্গসমূহ »: বিবাহ ও তালাক
মাতুরীদী মতবাদ ও তাদের ভ্রান্ত আক্বীদাসমূহ (১৭তম কিস্তি) - আব্দুল্লাহ বিন আব্দুর রহীম
ইসলামী পুনর্জাগরণের প্রতিবন্ধকতা ও উত্তরণের উপায় (৭ম কিস্তি) - ড. মুযাফফর বিন মুহসিন
ইসলামে ব্যবসায়িক মূলনীতি - ড. সাদীক মাহমূদ
জঙ্গিবাদ বনাম ইসলাম (শেষ কিস্তি) - আব্দুল্লাহ বিন আব্দুর রহীম
বিদ‘আত পরিচিতি (২৯তম কিস্তি) - ড. মুহাম্মাদ বযলুর রহমান
কালো কলপ ব্যবহারের শারঈ বিধান - ড. ইমামুদ্দীন বিন আব্দুল বাছীর
ইখলাছই পরকালের জীবনতরী (৩য় কিস্তি) - আব্দুল গাফফার মাদানী
বিদ্রোহ, বিক্ষোভ ও সন্ত্রাসবাদ থেকে তরুণদের সতর্কীকরণ - মাসঊদুর রহমান
ইখলাছই পরকালের জীবনতরী - আব্দুল গাফফার মাদানী
সুখময় সৌভাগ্যের মৃত্যু লাভের উপায় (৬ষ্ঠ কিস্তি) - ওমর ফারুক বিন মুসলিমুদ্দীন
কুরআন ও সুন্নাহকে আঁকড়ে ধরা - অনুবাদ : হাফীযুর রহমান বিন দিলজার হোসাইন
ইসলামী জামা‘আতের মূল স্তম্ভ (৮ম কিস্তি) - ড. মুহাম্মাদ মুছলেহুদ্দীন

ফেসবুক পেজ