রবিবার, ১১ অক্টোবর ২০২৬, ০৫:১৭ পূর্বাহ্ন

সালাফী মানহাজ ও রাজনৈতিক চিন্তার উৎস 

- ড. মুহাম্মাদ বযলুর রহমান 


১. ভূমিকা 

একবিংশ শতাব্দীর তৃতীয় দশকে প্রযুক্তিগত উন্নয়নের যুগে রাজনীতি পূর্বের যেকোন সময়ের চেয়ে গভীর সংকটে পড়েছে। এখন ‘ক্ষমতা কার হাতে থাকবে’ এই প্রশ্নটি গৌণ বিষয়ে পরিণত হয়েছে। পক্ষান্তরে ‘ক্ষমতা কোন্ নৈতিক ও জ্ঞানতাত্ত্বিক উৎস থেকে গ্রহণ করা হবে’, ‘রাষ্ট্র কীভাবে কর্তৃত্ব প্রয়োগ করবে’ এবং ‘রাজনৈতিক পরিবর্তন কোন্ সীমারেখার মধ্যে পরিচালিত হবে’ বিষয়গুলো মৌলিক হয়ে দাঁড়িয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশে স্বৈরাচারের পতনের মাধ্যমে রাজনৈতিক রূপান্তর, রাষ্ট্রসংস্কারের বিতর্ক এবং রাষ্ট্র কাঠামোয় প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহিতা পুনর্গঠনের প্রশ্ন এই মৌলিক বিষয়গুলোকে বিশেষভাবে সামনে এনেছে। তবে এই অভিজ্ঞতা বিচ্ছিন্ন কোন ঘটনা নয়। দক্ষিণ এশিয়ার বিভিন্ন রাষ্ট্রে জনপ্রিয় রাজনৈতিক পরিবর্তনের আকাঙ্ক্ষা, তরুণ প্রজন্মের নেতৃত্বাধীন আন্দোলন, দুর্নীতিবিরোধী জনদাবি এবং নতুন রাজনৈতিক নেতৃত্বের উত্থান দেখা গেলেও পরিবর্তনের পর রাষ্ট্র পরিচালনা, প্রতিষ্ঠান সংস্কার ও টেকসই জবাবদিহি প্রতিষ্ঠা করা সমানভাবে কঠিন প্রমাণিত হয়েছে।

২০২৬ সালে বাংলাদেশ, নেপাল ও শ্রীলঙ্কার রাজনৈতিক পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করলে সুস্পষ্টরূপে প্রতিভাত হয় যে, এ তিন রাষ্ট্র সুন্দর ও কল্যাণকর পরিবর্তনের এক সন্ধিক্ষণে এসে দাঁড়িয়েছিল। কিন্তু তিন রাষ্ট্র-ই সুবর্ণ সুযোগ পেয়েও মৌলিক পরিবর্তনের পথে অগ্রসর না হয়ে তথাকথিত চেতনা, ঐতিহ্য, দলীয় আদর্শ, দুর্নীতি ও ক্ষমতার অপব্যবহারকে জিইয়ে রাখার বন্দোবস্ত করল। যদিও যৎসামান্য পরিবর্তন দৃষ্টিগোচর হয়। কিন্তু সাধারণ জনগণের প্রত্যাশা ও রাষ্ট্রের সামগ্রিক উন্নয়নের ক্ষেত্রে তা কোন ক্রমেই তুলনীয় নয়। বরং বরাবরের ন্যায় এবারও জনগণ প্রতারিত হয়েছে, শতশত তরুণের জীবন চলে গেছে, অগণিত পিতা-মাতার বুক খালি হয়েছে, অসংখ্য বোনের ইজ্জত নষ্ট হয়েছে, হাজার হাজার মানুষ পঙ্গুত্ব বরণ করেছে এবং দেশের কোটি কোটি অর্থ-সম্পদ ও রাষ্ট্রীয় কাঠামো ধ্বংস হয়েছে। জাতি হিসেবে বাংলাদেশের জনগণ প্রকৃতপক্ষেই অসহায়, প্রতারিত, বঞ্চিত ও কপাল পোড়া জাতি। 

বিশ্বপরিসরে রাজনৈতিক পরিস্থিতি আরও জটিল। তথাকথিত গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার দুর্বল ও ভঙ্গুর পরিস্থিতি, কর্তৃত্ববাদী ও সাম্রাজ্যবাদী প্রবণতার বিস্তার, রাজনৈতিক মেরুকরণ, যুদ্ধ ও অভ্যন্তরীণ সংঘাত, ভ্রান্ত তথ্যের বিকাশ এবং নাগরিক আস্থার সংকট সমকালীন রাষ্ট্রচিন্তাকে নতুন করে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে। সাম্প্রতিক বৈশ্বিক গবেষণাগুলোতে বিশ্বব্যাপী গণতন্ত্রের ব্যর্থতা ও অসহায়ত্ব, ইসলাম থেকে পশ্চাদপসরণ, সংঘাত ও ধ্বংস্তূপে পরিণত হওয়া রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানসমূহের মাঝে পারস্পরিক সম্পর্কের প্রতি বিশেষ দৃষ্টি দেয়া হয়েছে। ফলে আজকের রাজনৈতিক গবেষণার প্রশ্ন কেবল ‘কোন্ শাসনব্যবস্থা উত্তম’ এতটুকুতেই সীমাবদ্ধ থাকতে পারে না; বরং প্রশ্ন হল- কোন্ নীতিগত ভিত্তি রাজনৈতিক ক্ষমতাকে ন্যায়বিচার, সততা, আমানত, জবাবদিহি, জনকল্যাণ এবং মানবিক মর্যাদার অধীন রাখতে পারে? এই বাস্তবতার মধ্যেই ইসলামী রাজনৈতিক চিন্তার উৎসের প্রশ্ন নতুন করে গুরুত্ব লাভ করে। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য যে, মুসলিম সমাজে বর্তমান রাজনৈতিক অস্থিরতায় শারঈ রাজনৈতিক পরিভাষা যেমন: কুরআন-সুন্নাহ, শরী‘আহ, খিলাফাহ, শূরা, আনুগত্য, বিরোধিতা ও জিহাদের মত পরিভাষাগুলো প্রায়ই হারিয়ে গেছে কিংবা দলীয় স্বার্থ উদ্ধারে বা স্লোগান ও লোগোতে ব্যবহৃত হচ্ছে। অন্যদিকে কখনো ইসলামী রাজনৈতিক চিন্তাকে কেবল রাষ্ট্রক্ষমতা অর্জনের মতবাদে সীমাবদ্ধ করা হয়; কখনো আবার দ্বীনের সামগ্রিক নির্দেশনা থেকে রাজনীতিকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন করার প্রবণতা লক্ষ্য করা যায়। এই দুই বিপরীত প্রবণতার মধ্যে মধ্যমপন্থা সালাফী মানহাজের উৎসগত অনুসন্ধান বর্তমান রাজনৈতিক অস্থিরতার যুগে একটি প্রয়োজনীয় ও মৌলিক গবেষণার বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।

সালাফী রাজনৈতিক চিন্তা আধুনিক অর্থে কোন একক রাজনৈতিক দলীল, নির্বাচনী ইশতেহার বা নির্দিষ্ট রাষ্ট্রকাঠামোর নাম নয়। এর ভিত্তি অনুসন্ধান করতে হয় ইসলামের উৎসসমূহে। অর্থাৎ আল-কুরআনের নীতিমালায়, রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর সুন্নাহ ও রাষ্ট্রীয় নেতৃত্বে, ছাহাবায়ে কেরামের রাজনৈতিক ইজতিহাদে এবং প্রাথমিক মুসলিম প্রজন্মের শারঈ বুঝ ও অনুধাবনের পদ্ধতিতে। মহান আল্লাহ বলেন, إِنِ الْحُكْمُ إِلَّا لِلَّهِ ‘বিধান দেয়ার অধিকার কেবল আল্লাহর’ (সূরা ইউসুফ, ১২/৪০)। কিন্তু কুরআনিক এ নীতির অর্থ অনুধাবনের ক্ষেত্রে যথেষ্ট গবেষণাগত সতর্কতা অপরিহার্য। আল্লাহর সর্বোচ্চ বিধানিক কর্তৃত্ব স্বীকার করার অর্থ এই নয় যে, রাষ্ট্রের প্রতিটি প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত ও পরিবর্তনশীল নীতিকে সরাসরি অহীর নির্দিষ্ট পাঠে খুঁজে পাওয়া আবশ্যক। বরং ইসলামী রাজনৈতিক ঐতিহ্যে অপরিবর্তনীয় শারঈ নীতি এবং পরিবর্তনশীল মানবীয় ব্যবস্থাপনার মধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য বিদ্যমান। ন্যায়বিচার, আমানত, পরামর্শ, যুলুম-নিষেধ ও চুক্তিপালনের মত মৌলিক নীতিগুলো অহীভিত্তিক; অন্যদিকে রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান ও প্রশাসনিক পদ্ধতির বহু বিষয় ইজতিহাদ, শূরা, অভিজ্ঞতা এবং মাছালিহ (কল্যাণ) বিবেচনার অন্তর্ভুক্ত। সালাফী মানহাজ এই উৎস-অনুসন্ধানে প্রথম প্রজন্মের জ্ঞানগত মর্যাদাকে বিশেষভাবে গুরুত্ব দেয়। রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেন,

خَيْرُ النَّاسِ قَرْنِيْ، ثُمَّ الَّذِيْنَ يَلُوْنَهُمْ، ثُمَّ الَّذِيْنَ يَلُوْنَهُمْ

‘সর্বোত্তম মানুষ আমার যুগের মানুষ; অতঃপর যাঁরা তাঁদের পরবর্তী; অতঃপর যাঁরা তাঁদের পরবর্তী’।[১] এই হাদীছের আলোকে রাজনৈতিক ক্ষেত্র, আক্বীদা ও ব্যবহারিক সহ সকল ক্ষেত্রে সালাফী মানহাজ প্রথম তিন শ্রেষ্ঠ প্রজন্মের দ্বীনিবুঝকে একটি গুরুত্বপূর্ণ মানদণ্ড হিসাবে বিবেচনা করে। তবে এর অর্থ তাঁদের প্রতিটি ব্যক্তিগত রাজনৈতিক পদক্ষেপকে সর্বকালীন ও অপরিবর্তনীয় রাষ্ট্রব্যবস্থা হিসাবে স্থির করে দেয়া নয়। বরং সালাফী রাজনৈতিক চিন্তার সূক্ষ্ম অনুসন্ধান দাবি করে যে, কোন্ সিদ্ধান্ত শরী‘আতের প্রত্যক্ষ বিধান, কোন্টি ইজমা বা ঐকমত্যভিত্তিক নীতি, কোন্টি ইজতিহাদী বা গবেষণাগত সিদ্ধান্ত এবং কোন্টি নির্দিষ্ট ঐতিহাসিক বাস্তবতার প্রশাসনিক প্রতিক্রিয়া। এই পার্থক্য উপেক্ষা করলে সালাফী রাজনৈতিক দর্শন ইতিহাসের নর্দমায় হারিয়ে যেতে পারে অথবা সমকালীন মতাদর্শের সুবিধাজনক ভাষ্যকারে পরিণত হয়ে কারো তল্পীবাহকে পরিণত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।

বাংলাদেশ, উপমহাদেশ এবং বিশ্বরাজনীতির বর্তমান পরিস্থিতি এই পার্থক্যকে আরও তাৎপর্যপূর্ণ করেছে। ক্ষমতার কেন্দ্রীয়করণের বিপরীতে যথাযথ জবাবদিহিতা, রাজনৈতিক প্রতিহিংসার বিপরীতে ইনছাফ ও ন্যায় প্রতিষ্ঠা, সংঘাতের বিপরীতে স্থিতিশীলতা, মেরুকরণের বিপরীতে ন্যায়সঙ্গত মতভেদ এবং জনআকাঙ্ক্ষা ও রাষ্ট্রের স্থায়িত্বের মধ্যে ভারসাম্য এসব প্রশ্ন আজ কেবল রাজনৈতিক বিজ্ঞানের প্রশ্ন নয়, বরং মুসলিম বুদ্ধিবৃত্তিক পরিমণ্ডলেও এগুলো শারঈ ও মানহাজগত অনুসন্ধানের বিষয়। বাংলাদেশের সাম্প্রতিক রাষ্ট্র-সংস্কার বিতর্কও রাজনৈতিক ক্ষমতার ভারসাম্য, স্বাধীন প্রতিষ্ঠান, দুর্নীতি প্রতিরোধ এবং জনজবাবদিহির মত বিষয়কে কেন্দ্রীয় আলোচনায় নিয়ে এসেছে। অতএব, সালাফী রাজনৈতিক চিন্তার উৎস অনুসন্ধানের প্রয়োজন কেবল অতীতের কোন মতবাদ বোঝার জন্য নয়; আবার বর্তমানের রাজনৈতিক প্রশ্নকে সঠিক পদ্ধতিতে স্থাপন করার জন্যও গুরুত্বপূর্ণ। এ অনুসন্ধান পূর্বনির্ধারিত কোন সমকালীন রাজনৈতিক দল, রাষ্ট্রব্যবস্থা বা আন্দোলনকে শারঈ বৈধতা দেয়ার প্রচেষ্টা নয়। এর উদ্দেশ্য হল- আল-কুরআন ও সুন্নাহ থেকে রাজনৈতিক নীতির উৎস নির্ণয়, এক্ষেত্রে সালাফী মানহাজের পথ ও প্রদ্ধতির প্রয়োগের প্রকৃতি বোঝা, আক্বীদা ও রাজনীতির সম্পর্ক বিশ্লেষণ করা এবং পরিবর্তনশীল রাজনৈতিক বাস্তবতায় ইজতিহাদ ও শারঈ সীমারেখার ভূমিকা নির্ধারণ করা।

তাই আমরা ‘সালাফী রাজনৈতিক দর্শন: উৎস, মানহাজ ও রাষ্ট্রচিন্তা’ শীর্ষক শিরোনামের অধীনে ‘সালাফী মানহাজ ও রাজনৈতিক চিন্তার উৎস’ বিষয়ে উপরিউক্ত আলোচনাগুলো ধারাবাহিকভাবে করার চেষ্টা করব ইনশাআল্লাহ। নিঃসন্দেহে বিষয়টি অত্যন্ত জটিল ও কঠিন, সূক্ষ্ম বুদ্ধিবৃত্তিক যাত্রা এবং সময়োপযোগী। আল্লাহ তা‘আলা আমাদের এই পিচ্ছিল যাত্রাকে সহজ করুন এবং সকল প্রতিকূলতা উপেক্ষা করে এ গবেষণা শেষ করার তাওফীক্ব দান করুন। আমীন!

উল্লেখ্য, এই আলোচনা একটি মৌলিক প্রশ্নকে কেন্দ্র করে অগ্রসর হবে। অর্থাৎ বিশ্বব্যবস্থা যখন রাজনৈতিক ক্ষমতার সংকট, নৈতিক অবক্ষয়, প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতা এবং মতাদর্শগত সংঘাতে আক্রান্ত, তখন সালাফী মানহাজ রাজনৈতিক চিন্তার জন্য কোন্ উৎস, কোন্ ব্যাখ্যাগত পদ্ধতি এবং কোন্ নীতিগত সীমারেখা প্রদান করে? এই প্রশ্নের উত্তর অনুসন্ধানই সালাফী রাজনৈতিক দর্শনের উৎসসমূহ, জ্ঞানতাত্ত্বিক ভিত্তি এবং ঐতিহাসিক বিবর্তন বিশ্লেষণ করা হবে। এর মাধ্যমে এই গবেষণার পরবর্তী আলোচনাগুলোর জন্য এমন একটি ভিত্তি নির্মিত হবে, যেখানে ক্ষমতার আগে নীতি, কর্তৃত্বের আগে আমানত, রাজনৈতিক আনুগত্যের আগে মহান আল্লাহ ও তাঁর রাসূল (ﷺ)-এর আনুগত্য এবং পরিবর্তনের আগে শারঈ বৈধতা ও পরিণতি-বিবেচনা প্রভৃতি মৌলিক মাত্রাগুলোকে সমন্বিতভাবে বিশ্লেষণ করা সম্ভব হবে। আল্লাহ তা‘আলা কবুল করুন।

১.১ ‘সালাফ’ ও ‘সালাফিয়্যাহ’-এর ধারণাগত বিশ্লেষণ

সালাফী মানহাজ ও তার রাজনৈতিক চিন্তার উৎস বিশ্লেষণের পূর্বে ‘আস-সালাফ’ (السلف) এবং ‘আস-সালাফিয়্যাহ’ (السلفية) পরিভাষা দু’টির ভাষাগত, পারিভাষিক ও পদ্ধতিগত তাৎপর্য নির্ধারণ করা অপরিহার্য। কারণ ‘সালাফ’ একটি প্রাচীন আরবী ও ইসলামী পরিভাষা; অপরদিকে ‘সালাফিয়্যাহ’ শব্দটি পরবর্তী যুগে একটি নির্দিষ্ট পদ্ধতিগত পরিচয় হিসাবে ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত পরিভাষা। উভয়ের মধ্যে সম্পর্ক থাকলেও কিছু ধারণাগত পার্থক্য রয়েছে। এক্ষণে আমরা সে বিষয়গুলো সম্পর্ক আলোচনা করার প্রয়াস পাব।

১.১.১. ‘সালাফ’-এর আভিধানিক অর্থ

আরবী السَّلَفُ শব্দটি পূর্ববর্তী, অগ্রবর্তী বা আগে চলে যাওয়া ব্যক্তি বোঝায়। ইবনু মানযূর (৬৩০-৭১১ হি./১২৩২-১৩১১ খ্রি.) (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন,

السَّلَفُ: مَنْ تقدَّمَك مِنْ آبَائِكَ وَذَوِي قَرابَتِك الَّذِينَ هُمْ فوقَك فِي السنِّ والفَضْل، وَاحِدُهُمْ سَالِفٌ

‘তোমার আগে অগ্রসর হয়ে চলে যাওয়া তোমার পিতা ও আত্মীয়-স্বজন, যারা বয়স ও মর্যাদায় তোমার ঊর্ধ্বে, তাদের প্রত্যেককে ‘সালিফ’ (سَالِفٌ) বলা হয়’।[২] অতএব ‘সালাফ’  শব্দের মূল অর্থ হল- যে ব্যক্তি তোমার আগে চলে গেছে বা অগ্রসর হয়েছে। বিশেষত পূর্ববর্তী পিতা-পিতামহ ও বয়োজ্যেষ্ঠদের বোঝাতেও এ শব্দ ব্যবহৃত হয়। ‘তাহযীবুল লুগাহ’ গ্রন্থাকার আযহারীও ‘সালাফ’ শব্দকে পূর্ববর্তী ব্যক্তি বা পূর্ববর্তী প্রজন্ম অর্থে ব্যবহার করেছেন।[৩] অতএব শাব্দিকভাবে ‘সালাফ’ কোন নির্দিষ্ট মাযহাব, রাজনৈতিক সংগঠন বা ধর্মীয় দলের নাম নয়; বরং যারা সময়ের দিক থেকে পূর্ববর্তী, তাদেরই বুঝানো হয়ে থাকে।[৪]

১.১.২.‘সালাফ’-এর পারিভাষিক অর্থ

ইসলামী পরিভাষায় ‘সালাফ’ শব্দটি সাধারণত রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর ছাহাবীগণ, তাবিঈন এবং তাবে‘ তাবিঈন এই প্রাথমিক শ্রেষ্ঠ প্রজন্মকে নির্দেশ করে। এ ধারণার মূল ভিত্তি রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর নিম্নোক্ত হাদীছ। আব্দুল্লাহ ইবনু মাসঊদ (রাযিয়াল্লাহু আনহুমা) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, নবী (ﷺ) বলেছেন,

خَيْرُ النَّاسِ قَرْنِيْ، ثُمَّ الَّذِيْنَ يَلُوْنَهُمْ، ثُمَّ الَّذِيْنَ يَلُوْنَهُمْ

‘সর্বোত্তম মানুষ আমার যুগের মানুষ, তারপর যারা তাদের পরবর্তী এবং তারপর যারা তাদের পরবর্তী’।[৫] ইমাম নববী (৬৩১-৬৭৬ হি.) (রাহিমাহুল্লাহ) উক্ত হাদীছের ব্যাখ্যায় উল্লেখ করেছেন যে, وَالصَّحِيحُ أَنَّ قَرْنَهُ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ الصَّحَابَةُ وَالثَّانِي التَّابِعُوْنَ وَالثَّالِثُ تَابِعُوْهُمْ ‘বিশুদ্ধ মত হল- রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর যুগের ‘প্রথম প্রজন্ম’ হলেন ছাহাবায়ে কিরাম, দ্বিতীয় প্রজন্ম হলেন তাবেঈগণ এবং তৃতীয় প্রজন্ম হলেন তাঁদের অনুসারীগণ (তাবে‘ তাবেঈন)’।[৬] ইবনু হাজার আল-আসক্বালানীও (৭৭৩-৮৫২ হি./১৩৭২-১৪৪৯ খ্রি.) হাদীছটির ব্যাখ্যায় প্রথম তিন প্রজন্মের শ্রেষ্ঠত্বের বিষয়টি উল্লেখ করেছেন। তিনি বলেছেন, রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর বাণী: ثُمَّ الَّذِيْنَ يَلُوْنَهُمْ ‘অতঃপর যারা তাদের পরবর্তী প্রজন্মে রয়েছে’; অর্থাৎ তাঁদের পরবর্তী প্রজন্ম, আর তারা হলেন তাবিঈগণ। আর তাঁর বাণী: ثُمَّ الَّذِيْنَ يَلُوْنَهُمْ ‘অতঃপর যারা তাদের পরবর্তী প্রজন্মে রয়েছে’; আর তারা হলেন তাবে‘ তাবিঈগণ’।[৭] একটু পরে তিনি আরো বলেন,

وَاسْتُدِلَّ بِهَذَا الْحَدِيْثِ عَلَى تَعْدِيْلِ أَهْلِ الْقُرُوْنِ الثَّلَاثَةِ وَإِنْ تَفَاوَتَتْ مَنَازِلُهُمْ فِي الْفَضْلِ وَهَذَا مَحْمُوْلٌ عَلَى الْغَالِبِ وَالْأَكْثَرِيَّةِ فَقَدْ وُجِدَ فِيْمَنْ بَعْدَ الصَّحَابَةِ مِنَ الْقَرْنَيْنِ مَنْ وُجِدَتْ فِيهِ الصِّفَاتُ الْمَذْكُوْرَةُ الْمَذْمُوْمَةُ لَكِنْ بِقِلَّةٍ بِخِلَافِ مَنْ بَعْدَ الْقُرُوْنِ الثَّلَاثَةِ فَإِنَّ ذَلِكَ كَثُرَ فِيْهِمْ وَاشْتُهِرَ

‘এই হাদীছের মাধ্যমে প্রমাণ গ্রহণ করা হয়েছে যে, প্রথম তিন প্রজন্মের মানুষ ন্যায়পরায়ণ ও গ্রহণযোগ্য (আদিল), যদিও মর্যাদার ক্ষেত্রে তাদের মধ্যে পার্থক্য রয়েছে। তবে এটিকে অধিকাংশ ও সাধারণ অবস্থার ভিত্তিতে বোঝানো হয়েছে। কারণ ছাহাবায়ে কিরামের পরবর্তী দুই প্রজন্মের মধ্যেও এমন কিছু ব্যক্তি ছিলেন, যাদের মধ্যে হাদীছে নিন্দিত বৈশিষ্ট্যগুলো পাওয়া গিয়েছিল। তবে তাদের সংখ্যা ছিল অল্প। এর বিপরীতে তিন প্রজন্মের পরবর্তী যুগে এসব নিন্দনীয় বৈশিষ্ট্য ব্যাপক ও প্রসিদ্ধ লাভ করে’।[৮]

আধুনিক যুগের সূক্ষ্ম হাদীছবিশারদ, মুহাক্কিক্ব ও প্রখ্যাত মুহাদ্দিছ শায়খ মুহাম্মাদ নাছিরুদ্দীন আলবানী (১৩৩২-১৪২০ হি./১৯১৪-১৯৯৯ খ্রি.) (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন,

حِيْنَما نَقُوْلُ: نَحْنُ وَالسَّلَفُ، فَإِنَّمَا نَقْصِدُ بِهِ خَيْرَ طَائِفَةٍ وُجِدَتْ عَلَى وَجْهِ الْأَرْضِ بَعْدَ الرُّسُلِ وَالْأَنْبِيَاءِ، وَهُمْ صَحَابَةُ رَسُوْلِ اللهِ ﷺ، الَّذِيْنَ كَانُوا الْقَرْنَ الْأَوَّلَ، ثُمَّ التَّابِعُوْنَ الَّذِيْنَ جَاءُوْا فِي الْقَرْنِ الثَّانِيْ، ثُمَّ أَتْبَاعُ التَّابِعِيْنَ الَّذِيْنَ جَاءُوْا فِي الْقَرْنِ الثَّالِثِ. أَهْلُ الْقُرُوْنِ الثَّلَاثَةِ هُمُ الَّذِيْنَ يُطْلَقُ عَلَيْهِمُ السَّلَفُ، وَهُمْ خَيْرُ أُمَّةٍ

‘যখন আমরা ‘সালাফ’ শব্দ ব্যবহার করব, তখন তার দ্বারা উদ্দেশ্য নিব, নবী-রাসূলগণের পরে ভূপৃষ্ঠের সর্বশ্রেষ্ঠ দল। তাঁরা হলেন, প্রথম যুগের ছাহাবীগণ, দ্বিতীয় যুগের তাবেঈগণ এবং তৃতীয় যুগের তাবে‘ তাবেঈগণ। তাঁরা তিন উত্তম যুগের লোক। তাঁদেরকে বুঝাতে ‘সালাফ’ শব্দ ব্যবহার করা হয়। তাঁরাই উম্মাহর সর্বশ্রেষ্ঠ লোক’।[৯]

মুহাম্মাদ ইবনু ছালেহ আল-উছায়মীন (১৩৪৭-১৪২১ হি.) (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন,

اَلسَّلَفُ مَعْنَاهُ الْمُتَقَدِّمُوْنَ، فَكُلُّ مُتَقَدِّمٍ عَلَى غَيْرِهِ فَهُوَ سَلَفٌ لَهُ، وَلَكِنْ إِذَا أُطْلِقَ لَفْظُ السَّلَفِ فَالْمُرَادُ بِهِ الْقُرُوْنُ الثَّلَاثَةُ الْمُفَضَّلَةُ: الصَّحَابَةُ، وَالتَّابِعُوْنَ، وَتَابِعُوْهُمْ

‘সালাফ’ অর্থ অগ্রজ। যে যার অগ্রজ সে তার সালাফ। তবে ‘সালাফ’ শব্দ প্রয়োগ করা হলে তার দ্বারা উদ্দেশ্য হল, উত্তম তিন যুগ। যথা : ছাহাবী, তাবেঈ ও তাবে‘ তাবেঈগণ’।[১০]

সঊদী আরবের ইমাম মুহাম্মাদ ইবনু সা‘ঊদ ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রখ্যাত অধ্যাপক ড. নাছির আব্দুল কারীম আল-‘আকল বলেন,

اَلسَّلَفُ هُمْ صَدْرُ هَذِهِ الْأُمَّةِ مِنَ الصَّحَابَةِ وَالتَّابِعِيْنَ وَأَئِمَّةِ الْهُدَى فِي الْقُرُونِ الثَّلَاثَةِ الْمُفَضَّلَةِ. وَيُطْلَقُ عَلَى كُلِّ مَنِ اقْتَدَى بِهَؤُلَاءِ وَسَارَ عَلَى نَهْجِهِمْ فِيْ سَائِرِ الْعُصُوْرِ سَلَفِيٌّ نِسْبَةً إِلَيْهِمْ

‘সালাফ হলেন এই উম্মতের প্রথম যুগের লোক যেমন: ছাহাবীগণ, তাবেঈগণ এবং প্রথম শ্রেষ্ঠ তিনযুগের পথপ্রদর্শক ইমামগণ। আর প্রতিযুগে যারা তাঁদের মান্য করেন এবং তাদের পদ্ধতি অনুসরণ করেন তারা সালাফী। কেননা তারা সালাফদের সাথে সম্পৃক্ত’।[১১] শাইখ আহমাদ আস-সাফফারীনী (১১১৪-১১৮৮ হি./১৭০২-১৭৭৪ খ্রি.) (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন,     

اَلْمُرَادُ بِمَذْهَبِ السَّلَفِ: مَا كَانَ عَلَيْهِ الصَّحَابَةُ الْكِرَامُ رِضْوَانُ اللهِ عَلَيْهِمْ، وَأَعْيَانُ التَّابِعِيْنَ لَهُمْ بِإِحْسَانٍ، وَأَتْبَاعُهُمْ، وَأَئِمَّةُ الدِّيْنِ مِمَّنْ شُهِدَ لَهُ بِالْإِمَامَةِ، وَعُرِفَ عِظَمُ شَأْنِهِ فِي الدِّيْنِ، وَتَلَقَّى النَّاسُ كَلَامَهُمْ خَلَفًا عَنْ سَلَفٍ، دُوْنَ مَنْ رُمِيَ بِبِدْعَةٍ، أَوْ شُهِرَ بِلَقَبٍ غَيْرِ مَرْضِيٍّ، مِثْلَ الْخَوَارِجِ، وَالرَّوَافِضِ، وَالْقَدَرِيَّةِ، وَالْمُرْجِئَةِ، وَالْجَبْرِيَّةِ، وَالْجَهْمِيَّةِ، وَالْمُعْتَزِلَةِ، وَالْكَرَّامِيَّةِ، وَنَحْوِ هَؤُلَاءِ مِمَّا يَأْتِيْ ذِكْرُهُمْ عِنْدَ تَعْدَادِ الْفِرَقِ

‘সালাফগণের মাযহাব বলতে ঐ নীতি, যার উপর ছাহাবায়ে কিরাম (রাযিয়াল্লাহু আনহুম) এবং তাঁদের যথাযথ অনুসরণকারী বিশিষ্ট তাবেঈগণ, তাঁদের অনুসারীগণ (আতবাঊত তাবেঈন), ঐ সকল দ্বীনের ইমামগণ যাদের ইমামত সর্বস্বীকৃত, দ্বীনি ক্ষেত্রে যাদের উচ্চমর্যাদা সুবিদিত এবং যাদের কথা যুগপরম্পরায় লোকেরা গ্রহণ করে এসেছেন, যারা বিদ‘আতের অভিযোগে অভিযুক্ত নন এবং আপত্তিকর উপাধিতে পরিচিত হননি, যেমন: খারেজীরা, রাফেযীরা (শী‘আরা), ক্বাদারিয়্যারা, মুরজিয়ারা, জাবারিয়্যারা, জাহমিয়্যারা, মু‘তাযিলারা, কারামিয়ারা ইত্যাদি, যারা বাতিল ফের্কার গণনার মধ্যে অন্তর্ভুক্ত’।[১২]

১.১.৩. শরী‘আতের মানদণ্ডে সালাফে ছালিহীনের অনুসরণের ভিত্তি

আল্লাহ তা‘আলা প্রথম মুহাজির ও আনছার এবং তাঁদের উত্তম অনুসারীদের প্রশংসা করে বলেন,

وَ السّٰبِقُوۡنَ الۡاَوَّلُوۡنَ  مِنَ الۡمُہٰجِرِیۡنَ وَ الۡاَنۡصَارِ وَ الَّذِیۡنَ اتَّبَعُوۡہُمۡ بِاِحۡسَانٍ ۙ رَّضِیَ اللّٰہُ عَنۡہُمۡ وَ رَضُوۡا عَنۡہُ

‘আর যেসব মুহাজির ও আনছার (ঈমান আনয়নে) অগ্রবর্তী এবং প্রথম, আর যেসব লোক একান্ত নিষ্ঠার সাথে তাদের অনুগামী, আল্লাহ তাদের প্রতি সন্তুষ্ট হয়েছেন এবং তারাও তাঁর প্রতি সন্তুষ্ট হয়েছে’ (সূরা আত-তাওবাহ, ৯/১০০)। উক্ত আয়াতের ব্যাখ্যায় ইমাম আত-তাবারী (২২৪-৩১০ হি./৮৩৯-৯২৩ খ্রি.) (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন,

يَقُوْلُ تَعَالَى ذِكْرُهُ: وَالَّذِيْنَ سَبَقُوا النَّاسَ أَوَّلًا إِلَى الْإِيْمَانِ بِاللهِ وَرَسُوْلِهِ، (مِنَ الۡمُہٰجِرِیۡنَ)= الَّذِيْنَ هَاجَرُوْا قَوْمَهُمْ وَعَشِيْرَتَهُمْ، وَفَارَقُوْا مَنَازِلَهُمْ وَأَوْطَانَهُمْ، (وَ الۡاَنۡصَارِ)= الَّذِيْنَ نَصَرُوْا رَسُوْلَ اللهِ ﷺ عَلَى أَعْدَائِهِ مِنْ أَهْلِ الْكُفْرِ بِاللهِ وَرَسُوْلِهِ، (وَ الَّذِیۡنَ اتَّبَعُوۡہُمۡ بِاِحۡسَانٍ)، يَقُوْلُ: وَالَّذِيْنَ سَلَكُوْا سَبِيْلَهُمْ فِي الْإِيْمَانِ بِاللهِ وَرَسُوْلِهِ، وَالْهِجْرَةِ مِنْ دَارِ الْحَرْبِ إِلَى دَارِ الْإِسْلَامِ، طَلَبَ رِضَا اللهِ، (رَّضِیَ اللّٰہُ عَنۡہُمۡ وَ رَضُوۡا عَنۡہُ)

‘আল্লাহ তা‘আলা বলেন: যারা সর্বপ্রথম মানুষের আগে আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের প্রতি ঈমান আনয়নে অগ্রসর হয়েছে অর্থাৎ মুহাজিরগণ, যারা নিজেদের গোত্র ও আপনজনদের ছেড়ে হিজরত করেছেন এবং নিজেদের বাড়িঘর ও জন্মভূমি ত্যাগ করেছেন। আর আনছারগণ, যারা আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের প্রতি কুফরকারী শত্রুদের বিরুদ্ধে আল্লাহর রাসূল (ﷺ)-কে সাহায্য করেছেন; আর যারা উত্তমভাবে তাদের অনুসরণ করেছে অর্থাৎ যারা আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের প্রতি ঈমান, আল্লাহর সন্তুষ্টির সন্ধানে দারুল হারব থেকে দারুল ইসলামে হিজরত ইত্যাদি বিষয়ে তাদের পথ অনুসরণ করেছে; আল্লাহ তাদের প্রতি সন্তুষ্ট হয়েছেন এবং তারাও তাঁর প্রতি সন্তুষ্ট হয়েছে’।[১৩]

অন্যদিকে ইবনু কাছীর (৭০১-৭৭৪ হি.) (রাহিমাহুল্লাহ) এ আয়াতকে ছাহাবীদের অনুসরণকে কল্যাণের ভিত্তি হিসাবে ব্যাখ্যা করেছেন। তিনি বলেন, ‘মহান আল্লাহ সুস্পষ্টভাবে সংবাদ দিয়েছেন যে, মুহাজির ও আনছারদের মধ্যকার অগ্রগামী প্রথম ব্যক্তিদের এবং যারা উত্তমভাবে তাদের অনুসরণ করেছে আল্লাহ তাদের প্রতি সন্তুষ্ট হয়েছেন। অতএব দুর্ভাগ্য তার জন্য, যে তাদের কাউকে ঘৃণা করে, গালি দেয় কিংবা তাদের কোন একজনকে ঘৃণা বা গালি দেয়। বিশেষত রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর পর ছাহাবায়ে কিরামের মধ্যে যিনি সর্বাধিক মর্যাদাবান, সর্বোত্তম ও শ্রেষ্ঠ অর্থাৎ সর্বশ্রেষ্ঠ ছিদ্দীক ও মহান খলীফা আবু বকর ইবনু আবী কুহাফাহ (রাযিয়াল্লাহু আনহু) তাঁর ব্যাপারে তো আরও বেশি সতর্কতা প্রয়োজন। কারণ, রাফেযীদের বিপথগামী দল শ্রেষ্ঠ ছাহাবায়ে কিরামের বিরোধিতা করে, তাঁদের ঘৃণা করে এবং তাঁদের গালি দেয়। আল্লাহর কাছে আমরা এরূপ ভয়াবহতা থেকে আশ্রয় প্রার্থনা করি। এটি প্রমাণ করে যে, তাদের বুদ্ধি উল্টে গেছে এবং অন্তর বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। তারা আল্লাহ যাদের প্রতি সন্তুষ্ট হয়েছেন, তাদেরই গালি দেয়, তাহলে কুরআনের প্রতি ঈমানের সঙ্গে তাদের অবস্থানের সামঞ্জস্য কোথায়? অন্যদিকে, আহলুস সুন্নাহ তাঁদের জন্য আল্লাহর সন্তুষ্টি প্রার্থনা করেন, যাঁদের প্রতি আল্লাহ সন্তুষ্ট হয়েছেন। আর আল্লাহ ও তাঁর রাসূল (ﷺ) যাদের নিন্দা করেছেন, তারাও তাদের নিন্দা করেন। তারা আল্লাহ যাদের সঙ্গে বন্ধুত্ব রাখেন, তাদের সঙ্গে বন্ধুত্ব রাখেন এবং আল্লাহ যাদের বিরোধিতা করেন, তাদের বিরোধিতা করেন। তারা অনুসরণকারী, বিদ‘আত প্রবর্তনকারী নয়; তারা অনুসরণ করে, নিজেরা নতুন কিছু উদ্ভাবন করে না। এ কারণেই তারা আল্লাহর সফল দল (হিযবুল্লাহ) এবং তাঁর মুমিন বান্দা’।[১৪]

নবী করীম (ﷺ) তাঁর ছাহাবীগণের মানহাজের উপর ভিত্তি করে সার্বিক জীবন পরিচালনার নির্দেশ প্রদান করেছেন। ইরবায ইবনু সারিয়্যাহ (রাযিয়াল্লাহু আনহু) হতে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেন,

صَلَّى بِنَا رَسُوْلُ اللهِ ﷺ ذَاتَ يَوْمٍ ثُمَّ أَقْبَلَ عَلَيْنَا بِوَجْهِهِ فَوَعَظَنَا مَوْعِظَةً بَلِيْغَةً ذَرَفَتْ مِنْهَا الْعُيُوْنُ وَوَجِلَتْ مِنْهَا الْقُلُوْبُ فَقَالَ رَجُلٌ يَا رَسُوْلَ اللهِ ﷺ كَأَنَّ هَذِهِ مَوْعِظَةُ مُوَدِّعٍ فَأَوْحَنَا فَقَالَ ﷺ أُوصِيْكُمْ بِتَقْوَى اللهِ وَالسَّمْعِ وَالطَّاعَةِ وَإِنْ كَانَ عَبْدًا حَبَشِيًّا فَإِنَّهُ مَنْ يَّعِشْ مِنْكُمْ بَعْدِىْ فَسَيَرَى اخْتِلَافًا كَثِيْرًا فَعَلَيْكُمْ بِسُنَّتِىْ وَسُنَّةِ الْخُلَفَاءِ الرَّاشِدِيْنَ الْمَهْدِيِّينَ تَمَسَّكُوْا بِهَا وَعَضُّوْا عَلَيْهَا بِالنَّوَاجِذِ وَإِيَّاكُمْ وَمُحْدَثَاتِ الْأُمُوْرِ فَإِنَّ كُلَّ مُحْدَثَةٍ بِدْعَةٌ وَّكُلَّ بِدْعَةٍ ضَلَالَةٌ

‘রাসূল (ﷺ) একদা আমাদের নিয়ে ছালাত আদায় করলেন। অতঃপর আমাদের দিকে মুখ ফিরিয়ে বসলেন এবং আমাদেরকে এমন মর্মষ্পর্শী ভাষায় ওয়ায করলেন যে, চক্ষুসমূহ অশ্রুসিক্ত হল এবং হৃদয়সমূহ ভীত-সন্ত্রস্ত হল। অতঃপর জনৈক লোক বলে উঠল, হে আল্লাহর রাসূল (ﷺ)! মনে হচ্ছে এটা বিদায়ী উপদেশ। অতএব আপনি আমাদেরকে আরও বেশি উপদেশ দিন। তখন রাসূল (ﷺ) বললেন, আমি তোমাদেরকে আল্লাহভীতির এবং আমীরের আদেশ শুনতে ও মানতে উপদেশ দিচ্ছি, যদি তিনি একজন হাবশী গোলামও হন। কেননা আমার পরে তোমাদের মধ্যে যারা বেঁচে থাকবে, তারা সত্ত্বর বহু মতভেদ দেখতে পাবে। তখন তোমরা আমার সুন্নাতকে এবং সুপথপ্রাপ্ত খুলাফায়ে রাশেদীনের সুন্নাতকে আঁকড়ে ধরবে। তাকে কঠিনভাবে ধরবে এবং মাড়ির দাঁত দিয়ে কামড়ে ধরে থাকবে। সাবধান! দ্বীনের মধ্যে নতুন সৃষ্টিসমূহ হতে দূরে থাকবে। কেননা দ্বীনের ব্যাপারে নতুন সৃষ্টি হল বিদ‘আত এবং প্রত্যেক বিদ‘আতই হল ভ্রষ্ট’।[১৫]

এই হাদীছে ফিতনার সময় খুলাফায়ে রাশেদাকে অনুকরণ করার কথা বলা হয়েছে। সুতরাং প্রমাণিত হয় যে, সালাফ তথা ছাহাবীদের অনুসরণ করা ওয়াজিব। উক্ত হাদীছ উল্লেখ করে ইমাম ইবনুল ক্বাইয়িম (৬৯১-৭৫১ হি./১২৯২-১৩৫০ খি.) (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন,

فَقَرَنَ سُنَّةَ خُلَفَائِهِ بِسُنَّتِهِ، وَأَمَرَ بِاتِّبَاعِهَا كَمَا أَمَرَ بِاتِّبَاعِ سُنَّتِهِ، وَبَالَغَ فِي الْأَمْرِ بِهَا حَتَّى أَمَرَ بِأَنْ يُعَضَّ عَلَيْهَا بِالنَّوَاجِذِ، وَهَذَا يَتَنَاوَلُ مَا أَفْتَوْا بِهِ وَسَنُّوهُ لِلْأُمَّةِ

‘সুতরাং নবী (ﷺ) নিজের সুন্নাহর সাথে তাঁর খলীফাগণের সুন্নাহকে সংযুক্ত করেছেন এবং তা অনুসরণ করার আদেশ দিয়েছেন, যেমন নিজের সুন্নাহকে অনুসরণ করার আদেশ দিয়েছেন। উপরন্তু তাঁর সুন্নাহ অনুসরণ করার ব্যাপারে অধিক তাকীদ দিয়েছেন। এমনকি তা দাঁত দিয়ে মজবুত করে ধরে থাকার নির্দেশ দিয়েছেন। আর তাঁদের সুন্নাহ বলতে তাঁদের দেয়া ফাতাওয়া এবং উম্মতের জন্য তাঁদের চালুকৃত সুন্নাহও শামিল’।[১৬]

‘যাম্মুত তা’বীল’ গ্রন্থকার ইমাম ইবনু কুদামা (১১৪৭-১২২৩ খ্রি.) (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন,

فَأَمَرَ بِالتَّمَسُّكِ بِسُنَّةِ خُلَفَائِهِ كَمَا أَمَرَ بِالتَّمَسُّكِ بِسُنَّتِهِ وَأَخْبَرَ أَنَّ الْمُحْدَثَاتِ بِدَعٌ وَضَلَالَةٌ وَهُوَ مَا لَمْ يُتَّبِعْ فِيْهِ سُنَّةَ رَسُوْلُ اللهِ ﷺ وَلَا سُنَّةُ أَصْحَابِهِ

‘সুতরাং তিনি তাঁর খলীফাগণের সুন্নাহকে ধারণ করার আদেশ দিয়েছেন। যেমন নিজের সুন্নাহকে ধারণ করার আদেশ দিয়েছেন। সেই সাথে অবহিত করেছেন যে, নব উদ্ভাবিত কর্মসমূহ বিদ‘আত ও ভ্রষ্ট। আর তাহল সেই কর্ম, যাতে না রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর সুন্নাহর অনুসরণ করা হয়েছে আর না তাঁর ছাহাবীগণের সুন্নাহর অনুসরণ করা হয়েছে’।[১৭] অন্যত্র ইমাম ইবনুল ক্বাইয়িম (রাহিমাহুল্লাহ) (৬৯১-৭৫১ হি./১২৯২-১৩৫০ খ্রি.) বলেছেন,

وَكُلٌّ مِنْ الصَّحَابَةِ مُنِيْبٌ إلَى اللهِ فَيَجِبُ اتِّبَاعُ سَبِيْلِهِ، وَأَقْوَالُهُ وَأَفْعَالُهُ وَاعْتِقَادَاتُهُ

‘প্রত্যেক ছাহাবীই মহান আল্লাহর অনুবর্তী। সুতরাং তাঁদের পথ এবং তাঁদের কথা, কাজ ও বিশ্বাসের অনুসরণ করা ওয়াজিব’ (এ বিষয়ে বিস্তারিত জানার জন্য লেখক প্রণীত ‘সালাফী মানহাজ অনুসরণের আবশ্যকতা’ বইটি পাঠ করুন)।[১৮]

(ইনশাআল্লাহ চলবে)


তথ্যসূত্র :
[১]. ছহীহুল বুখারী, হা/৩৬৫০ ‘কিতাবু ফাযাইলি আছহাবিন নাবী’-৬২, অনুচ্ছেদ-১; ছহীহ মুসলিম, হা/২৫৩৩ ‘কিতাবু ফাযাইলিছ ছাহাবাহ’-৪৫, অনুচ্ছেদ-৫২।
[২] ইবনু মানযূর, লিসানুল ‘আরব, ৯ম খণ্ড (বৈরূত: দারু ছাদর, ৩য় সংস্করণ, ১৪১৪ হি.), পৃ. ১৫৯।
[৩] আবূ মানছূর মুহাম্মদ ইবনু আহমাদ আল-আযহারী, তাহযীবুল লুগাহ, ১২শ খণ্ড (বৈরূত: দারু ইহইয়াইত তুরাছিল ‘আরাবী, ১ম সংস্করণ, ২০০১ খ্রি.), পৃ. ২৯৯ ‘سلف’ শব্দমূল।
[৪] লিসানুল ‘আরব, ৯ম খণ্ড, পৃ. ১৫৯ ‘سلف’ শব্দমূল।
[৫] ছহীহুল বুখারী, হা/২৬৫২ ‘কিতাবুশ শাহাদাত’, অনুচ্ছেদ-৯; ছহীহ মুসলিম, হা/২৫৩৩ ‘কিতাবু ফাযায়িলিছ ছাহাবাহ’, অনুচ্ছেদ-৫২।
[৬] ইয়াহইয়া ইবনু শারাফ আন-নববী, আল-মিনহাজ শারহু ছহীহ মুসলিম ইবনিল হাজ্জাজ, ১৬শ খণ্ড (বৈরূত: দারু ইহইয়াইত তুরাছিল ‘আরাবী, ২য় সংস্করণ, ১৩৯২ হি.), পৃ. ৮৫ ‘উক্ত হাদীছের ব্যাখ্যা দ্র.’।
[৭] আহমাদ ইবনু আলী ইবনু হাজার আল-আসক্বালানী, ফাৎহুল বারী শারহু ছহীহিল বুখারী, ৭ম খণ্ড (বৈরূত: দারুল মা‘রিফাহ, ১৩৭৯ হি.), পৃ. ৬ ‘২৬৫২ নং হাদীছের ব্যাখ্যা দ্র.’।
[৮] ফাৎহুল বারী শারহু ছহীহিল বুখারী, ৭ম খণ্ড, পৃ. ৭ ‘২৬৫২ নং হাদীছের ব্যাখ্যা দ্র.’।
[৯]. আমর আব্দুল মুনঈম সালীম, আল-মানহাজুস সালাফী ঈনদাশ শায়খ নাছিরুদ্দীন আলবানী (প্রকাশস্থান ও প্রকাশক বিহীন, তাবি), পৃ. ১৪।
[১০]. মুহাম্মাদ ইবনু ছালিহ আল-উছায়মীন, ফাতাওয়া নূরুন আলাদ দারাব (সঊদী আরব : মুওয়াসসাসাতুশ শায়খ মুহাম্মাদ ইবনু ছালেহ আল-উছায়মীন আল-খায়রিয়্যাহ, ১ম সংস্করণ, ১৪২৭ হি./২০০৬ খ্রি.), ক্যাসেট নং- ১৭৫।
[১১]. ড. নাছির আব্দুল কারীম আল-‘আক্বল, মুজমালু উছূলি আহলিস্ সুন্নাতি ওয়াল জামা‘আহ ফিল-‘আক্বীদাহ (রিয়ায : দারুল ওয়াত্বান, ১৪১১ হি.), পৃ. ৫-৬ দ্র. ভূমিকা।
[১২]. শায়খ আহমাদ আস-সাফ্ফারীনী, লাওয়ামি‘ আল-আনওয়ার আল-বাহিয়্যাহ ওয়া সাওয়াত্বি‘ আল-আসরার আল-আছারিয়্যাহ, শারহ আর্দ্দুরাহ আল-মুযিয়্যাহ (দামেস্ক : মুওয়াস্সাসাতুল খাফেক্বীন, ২য় সংস্করণ, ১৪০২ হি.), ১ম খণ্ড, পৃ. ২০।
[১৩]. আবূ জা‘ফর আত-তাবারী, জামি‘ঊল বায়ান ফী তা’বীলিল কুরআন, ১৪শ খণ্ড (বৈরূত: দারুল ফিকর, ১ম সংস্করণ, ১৪২০ হি./২০০০ খ্রি.), পৃ. ৪৩৪।
[১৪]. ইসমাঈল ইবনু উমর ইবনু কাছীর, তাফসীরুল কুরআনিল ‘আযীম, ৪র্থ খণ্ড (রিয়াদ: দারু ত্বাইবাহ, ২য় সংস্করণ, ১৪২০ হি./১৯৯৯ খ্রি.), পৃ. ২০৩ ‘সূরা আত-তাওবাহ, ৯/১০০-এর তাফসীর’ দ্র.।
[১৫]. আবূ দাঊদ, হা/৪৬০৭, ‘সুন্নাহ’ অধ্যায়, অনুচ্ছেদ-৬; মিশকাত, হা/১৬৪, সনদ ছহীহ।  
[১৬]. ইমাম ইবনুল ক্বাইয়িম আল-জাওযিয়্যাহ, ই‘লামুল মুওয়াক্কিঈন ‘আন রব্বিল আলামীন, তাহক্বীক্ব : মুহাম্মাদ আব্দুস সালাম ইবরাহীম (বৈরূত : দারুল কুতুবিল ইলমিয়্যাহ, ১ম সংস্করণ, ১৪১১ হি./১৯৯১ খ্রি.), ৪র্থ খণ্ড, পৃ. ১০৭।
[১৭]. ইমাম ইবনু কুদামাহ আল-মাক্বদিসী, যাম্মুল তা’বীল, তাহক্বীক্ব: বদর ইবনু আব্দুল্লাহ আল-বদর (কুয়েত: আদ-দারুস সালাফিয়্যাহ, ১ম সংস্করণ, ১৪০৬ হি.), পৃ. ২৮।
[১৮]. ই‘লামুল মুওয়াক্বক্বিঈন আন রাব্বিল আলামীন, ৪র্থ খণ্ড, পৃ. ১০০; আল্লামা আব্দুল্লাহ বুখারী, মা হিয়াস সালাফিয়্যাহ (কায়রো: দারুল ইস্তিক্বামাহ, প্রথম প্রকাশ, ১৪৩৩ হি./২০১২ খ্রি.), পৃ. ২৮।





প্রসঙ্গসমূহ »: মানহাজ মুসলিম জাহান
হেদায়াত লাভের অনন্য মাস রামাযান - আব্দুল্লাহ বিন আব্দুর রহীম
শরী‘আত অনুসরণের মূলনীতি (৫ম কিস্তি) - ড. মুযাফফর বিন মুহসিন
ইমাম মাহদী, দাজ্জাল ও ঈসা (আলাইহিস সালাম)-এর আগমন সংশয় নিরসন (৫ম কিস্তি) - হাসিবুর রহমান বুখারী
জাতীয় শিক্ষা কারিকুলামে ইসলাম শিক্ষার আবশ্যকতা - ড. মুহাম্মাদ বযলুর রহমান
কেমন ছিল রাসূলুল্লাহ (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর রামাযানের দিনগুলো? - শরীফ বিন আব্দুস সামাদ
প্রশ্নোত্তরে নাজাতপ্রাপ্ত দলের আক্বীদাসমূহ (২য় কিস্তি) - অনুবাদ : হাফীযুর রহমান বিন দিলজার হোসাইন
প্রচলিত তাবলীগ জামা‘আত সম্পর্কে শীর্ষ ওলামায়ে কেরামের অবস্থান (৭ম কিস্তি) - অনুবাদ : আব্দুর রাযযাক বিন আব্দুল ক্বাদির
রামাযানের স্বরূপ - আল-ইখলাছ ডেস্ক
ইসলামী রাষ্ট্রে শান্তি ও নিরাপত্তা ব্যবস্থা: একটি পর্যালোচনা - মূসা ইবরাহীম ইবনু রঈসুদ্দীন
ইসলামের দৃষ্টিতে স্বাস্থ্য সুরক্ষা (৪র্থ কিস্তি) - মুহাম্মাদ আযীযুর রহমান
জিহাদ ফী সাবীলিল্লাহ (২য় কিস্তি) - অনুবাদ : মুহাম্মদ ইমরান বিন ইদরিস
শরী‘আত অনুসরণের মূলনীতি (২য় কিস্তি) - ড. মুযাফফর বিন মুহসিন

ফেসবুক পেজ