রবিবার, ১১ অক্টোবর ২০২৬, ০৫:১৫ পূর্বাহ্ন

তাওহীদের স্বরূপ 

- ড. আব্দুল্লাহ বিন আব্দুর রহীম* 


(৩য় কিস্তি)  

তাওহীদুর রুবূবিয়্যাহর পরিচয় 

তাওহীদুর রুবূবিয়্যাহ হলো আল্লাহকে তাঁর যাবতীয় কাজের ক্ষেত্রে একক বলে স্বীকৃতি দেয়া। ইবনু তাইমিয়াহ (৬৬১-৭২৮ হি.) (রাহিমাহুল্লাহ) বলেছেন, ‘আল্লাহ ব্যতীত কোন সৃষ্টিকর্তা নেই। তিনি ব্যতীত সৃষ্টির ব্যাপারে কেউ স্বনির্ভর নয়। বরং তিনি যা ইচ্ছা করেন তা সঙ্ঘটিত হয় এবং তাঁর ইচ্ছার বিপরীত কোন কিছু সঙ্ঘটিত হয় না।[১]

(ক) ইমাম ইবনে আবী ইয্ আল-হানাফী (৭৩১-৭৯২ হি.) (রাহিমাহুল্লাহ) বলেছেন, ‘তাওহীদুর রুবূবিয়্যাহ হলো এ স্বীকারোক্তি প্রদান করা যে, আল্লাহ তা‘আলাই সবকিছুর স্রষ্টা। সৃষ্টিজগতের এমন একাধিক স্রষ্টা নেই, যারা গুণাবলি ও কর্মসমূহে পরস্পর সমপর্যায়ের। এ প্রকার তাওহীদ সত্য। এতে কোনো সন্দেহ নেই’।[২]

(খ) আব্দুর রহমান নাছির আস-সা‘আদী (১৩০৭-১৩৭৬ হি.) (রাহিমাহুল্লাহ) বলেছেন, ‘সৃষ্টি করা, রিজিক দেয়া এবং সমগ্র সৃষ্টি জগৎ নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে আল্লাহ তা‘আলাই হচ্ছেন এক ও অভিন্ন রব বা প্রতিপালক। যিনি অফুরন্ত নে‘মতের মাধ্যমে গোটা সৃষ্টি জগৎকে প্রতিপালন করছেন। তাঁর বিশেষ সৃষ্টি তথা আম্বিয়ায়ে কেরাম এবং তাঁদের অনুসারীগণকে ছহীহ আক্বীদা, উত্তম চরিত্র, কল্যাণমূলক জ্ঞান এবং নেক আমলের মাধ্যমে সমৃদ্ধ ও দীক্ষিত করেছেন। ইহকালীন ও পরকালীন সুখ শান্তি লাভের ক্ষেত্রে সৃজনশীল মন ও আত্মার জন্য এটাই হচ্ছে কল্যাণময় শিক্ষা। বান্দার এ আক্বীদা পোষণের নামই হচ্ছে তাওহীদুর রুবূবিয়্যাহ’।[৩]

(গ) মুহাম্মাদ ইবনু আব্দুল ওয়াহহাব ইবনু আলী আল-ইয়ামানী (১১১৪-১২০৬ হি.) (রাহিমাহুল্লাহ) বলেছেন, هو إفراد الله في أفعاله  ‘আল্লাহর কর্মে আল্লাহকে একক গণ্য করা’।[৪] এর অর্থ হলো, আল্লাহ তা‘আলা কোন সাহায্যকারী এবং অংশগ্রহণকারী ছাড়াই সৃষ্টি, আদেশ, নির্দেশ, মালিক, পরিচালনা, আবিষ্কার এবং সৃষ্টিজগতকে অস্তিত্বহীনতা থেকে অস্তিত্বে আনয়ন করার একমাত্র অধিকারী। তিনিই সৃষ্টিকর্তা, তিনিই আদেশদাতা, তিনিই মালিক, তিনিই পরিচালক, তিনি একক, তাঁর কোন শরীক নেই।[৫]

(ঘ) মুহাম্মাদ ইবনু ছালিহ ইবনু মুহাম্মাদ আল-উছায়মীন (১৩৪৭-১৪২১ হি.) (রাহিমাহুল্লাহ) বলেছেন, ‘তাওহীদুর রুবূবিয়্যাহ হলো আল্লাহ তা‘আলাকে সৃষ্টি, কর্তৃত্ব ও পরিচালনায় একক নির্ধারণ করা’।[৬]

আল্লাহ তা‘আলা বলেন, اَلۡحَمۡدُ لِلّٰہِ رَبِّ الۡعٰلَمِیۡنَ  ‘সমস্ত প্রশংসা আল্লাহর জন্য যিনি জগতসমূহের প্রতিপালক’ (সূরা আল-ফাতিহা, ১ : ২)। মহান আল্লাহ বলেন, اَللّٰہُ  خَالِقُ کُلِّ شَیۡءٍ ۫ وَّ ہُوَ عَلٰی کُلِّ شَیۡءٍ  وَّکِیۡلٌ ‘আল্লাহই সবকিছুর সৃষ্টিকর্তা এবং তিনি সবকিছুর দায়িত্বশীল’ (সূরা আয-যুমার, ৩৯ : ৬২)। মহান আল্লাহ বলেন, اِنَّ اللّٰہَ ہُوَالرَّزَّاقُ ذُو الۡقُوَّۃِ الۡمَتِیۡنُ ‘নিশ্চয়ই আল্লাহই মহা রিযিকদাতা, তিনি শক্তির অধিকারী, পরাক্রমশালী’ (সূরা আয-যারিয়াত, ৫১ : ৫৮)। মহান আল্লাহ বলেন, وَ مَا مِنۡ دَآبَّۃٍ  فِی الۡاَرۡضِ  اِلَّا عَلَی اللّٰہِ  رِزۡقُہَا وَ یَعۡلَمُ مُسۡتَقَرَّہَا وَ مُسۡتَوۡدَعَہَا ؕ کُلٌّ  فِیۡ  کِتٰبٍ مُّبِیۡنٍ ‘পৃথিবীতে বিচরণকারী এমন কোনো প্রাণী নেই, যার রিযিকের দায়িত্ব আল্লাহর ওপর নেই। তিনি তার অবস্থানস্থল ও সংরক্ষণস্থল সম্পর্কে জানেন। সবকিছুই সুস্পষ্ট কিতাবে রয়েছে’ (সূরা হূদ, ১১ : ৬)। আল্লাহ তা‘আলা বলেন,

اِنَّ رَبَّکُمُ اللّٰہُ الَّذِیۡ خَلَقَ السَّمٰوٰتِ وَ الۡاَرۡضَ فِیۡ سِتَّۃِ اَیَّامٍ ثُمَّ اسۡتَوٰی عَلَی الۡعَرۡشِ  یُغۡشِی الَّیۡلَ النَّہَارَ یَطۡلُبُہٗ حَثِیۡثًا  وَّ الشَّمۡسَ وَ الۡقَمَرَ وَ النُّجُوۡمَ مُسَخَّرٰتٍۭ بِاَمۡرِہٖ  اَلَا لَہُ  الۡخَلۡقُ وَ الۡاَمۡرُ   تَبٰرَکَ اللّٰہُ رَبُّ الۡعٰلَمِیۡنَ

‘নিশ্চয় তোমাদের প্রতিপালক হচ্ছেন সেই আল্লাহ, যিনি আসমান ও যমীনকে ছয়দিনে সৃষ্টি করেছেন, অতঃপর তিনি স্বীয় আরশের উপর সমুন্নত হন, তিনি দিবসকে রাত্রি দ্বারা আচ্ছাদিত করেন এমনভাবে যে, রাত্রি ও দিবস একে অন্যকে অনুসরণ করে চলে তড়িৎ গতিতে; সূর্য, চন্দ্র ও নক্ষত্ররাজি সবই তাঁর হুকুমের অনুগত। জেনে রেখো, সৃষ্টির একমাত্র কর্তা তিনিই, আর হুকুমের একমাত্র মালিক তিনিই, সারা জাহানের প্রতিপালক আল্লাহ হলেন বরকতময়’ (সূরা আল-আরা‘ফ, ৭ : ৫৪)। আল্লাহ তা‘আলা বলেন, یُدَبِّرُ الۡاَمۡرَ مِنَ السَّمَآءِ  اِلَی الۡاَرۡضِ ثُمَّ یَعۡرُجُ  اِلَیۡہِ  فِیۡ یَوۡمٍ کَانَ مِقۡدَارُہٗۤ اَلۡفَ سَنَۃٍ  مِّمَّا تَعُدُّوۡنَ ‘তিনি আকাশ থেকে পৃথিবী পর্যন্ত সমুদয় বিষয় পরিচালনা করেন। অতঃপর একদিন সব কিছুই তাঁর সমীপে সমুত্থিত হবে, যে দিনের পরিমাপ হবে তোমাদের হিসেবে হাজার বছরের সমান’ (সূরা আস-সাজ্দাহ, ৩২ : ৫)। মহান আল্লাহ বলেন, وَ رَبُّکَ یَخۡلُقُ مَا یَشَآءُ وَ یَخۡتَارُ ‘আর আপনার রব যা ইচ্ছা সৃষ্টি করেন এবং যা ইচ্ছা নির্বাচন করেন’ (সূরা আল-কাছাছ, ২৮ : ৬৮)। মহান আল্লাহ বলেন, وَ یَفۡعَلُ  اللّٰہُ  مَا یَشَآءُ ‘আর আল্লাহ যা ইচ্ছা করেন, তাই করেন’ (সূরা ইবরাহীম, ১৪ : ২৭)। মহান আল্লাহ বলেন, 

اِنَّمَاۤ  اَمۡرُہٗۤ  اِذَاۤ  اَرَادَ  شَیۡئًا اَنۡ یَّقُوۡلَ  لَہٗ کُنۡ فَیَکُوۡنُ   .فَسُبۡحٰنَ الَّذِیۡ بِیَدِہٖ مَلَکُوۡتُ کُلِّ شَیۡءٍ وَّ اِلَیۡہِ  تُرۡجَعُوۡنَ

‘তিনি যখন কোনো কিছু করার ইচ্ছা করেন, তখন তাঁর ব্যাপারে শুধু এই যে, তিনি তাকে বলেন, ‘হও’; ফলে তা হয়ে যায়। অতএব পবিত্র মহান তিনি, যার হাতে রয়েছে সকল কিছুর রাজত্ব এবং তাঁরই দিকে তোমরা প্রত্যাবর্তিত হবে’ (সূরা ইয়াসীন, ৩৬ : ৮২)।

হাদীছে এসেছে, ইমরান ইবনু হুসাইন (রাযিয়াল্লাহু আনহু) বলেন, নবী (ﷺ)-কে জিজ্ঞেস করা হলো, এই সৃষ্টিজগতের সূচনা কীভাবে হয়েছিল, তিনি বললেন,

كَانَ اللهُ وَلَمْ يَكُنْ شَىْءٌ قَبْلَهُ ، وَكَانَ عَرْشُهُ عَلَى الْمَاءِ ، ثُمَّ خَلَقَ السَّمَوَاتِ وَالأَرْضَ ، وَكَتَبَ فِى الذِّكْرِ كُلَّ شَىْءٍ 

‘আল্লাহ ছিলেন, তাঁর পূর্বে কিছুই ছিল না। তাঁর আরশ পানির ওপর ছিল। অতঃপর তিনি আসমানসমূহ ও পৃথিবী সৃষ্টি করলেন এবং যিকরে সবকিছু লিখে রাখলেন’।[৭]

আবূ যার গিফারী (রাযিয়াল্লাহু আনহু) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) আল্লাহর নাম করে বলেছেন, আল্লাহ তা‘আলা বলেন,

يَا عِبَادِى كُلُّكُمْ جَائِعٌ إِلاَّ مَنْ أَطْعَمْتُهُ فَاسْتَطْعِمُونِى أُطْعِمْكُمْ يَا عِبَادِى كُلُّكُمْ عَارٍ إِلاَّ مَنْ كَسَوْتُهُ فَاسْتَكْسُونِى أَكْسُكُمْ يَا عِبَادِى إِنَّكُمْ لَنْ تَبْلُغُوا ضَرِّى فَتَضُرُّونِى وَلَنْ تَبْلُغُوا نَفْعِى فَتَنْفَعُونِى يَا عِبَادِى لَوْ أَنَّ أَوَّلَكُمْ وَآخِرَكُمْ وَإِنْسَكُمْ وَجِنَّكُمْ كَانُوا عَلَى أَتْقَى قَلْبِ رَجُلٍ وَاحِدٍ مِنْكُمْ مَا زَادَ ذَلِكَ فِى مُلْكِى شَيْئًا يَا عِبَادِى لَوْ أَنَّ أَوَّلَكُمْ وَآخِرَكُمْ وَإِنْسَكُمْ وَجِنَّكُمْ كَانُوا عَلَى أَفْجَرِ قَلْبِ رَجُلٍ وَاحِدٍ مَا نَقَصَ ذَلِكَ مِنْ مُلْكِى شَيْئًا يَا عِبَادِى لَوْ أَنَّ أَوَّلَكُمْ وَآخِرَكُمْ وَإِنْسَكُمْ وَجِنَّكُمْ قَامُوا فِى صَعِيدٍ وَاحِدٍ فَسَأَلُونِى فَأَعْطَيْتُ كُلَّ إِنْسَانٍ مَسْأَلَتَهُ مَا نَقَصَ ذَلِكَ مِمَّا عِنْدِى إِلاَّ كَمَا يَنْقُصُ الْمِخْيَطُ إِذَا أُدْخِلَ الْبَحْرَ 

‘হে আমার বান্দাগণ! তোমাদের প্রত্যেকেই ক্ষুধার্ত; কিন্তু আমি যাকে আহার করাই সে ব্যতীত। অতএব তোমরা আমার নিকট খাদ্য চাও, আমি তোমাদেরকে খাওয়াব। আমার বান্দাগণ, তোমাদের প্রত্যেকেই বিবস্ত্র বা উলঙ্গ; কিন্তু আমি যাকে পরিধান করাই সে ব্যতীত। সুতরাং তোমরা আমার নিকট পোশাক চাও, আমি তোমাদেরকে পরাব। আমার বান্দাগণ! তোমরা আমার ক্ষতি করার ক্ষমতা রাখ না যে, আমার ক্ষতি করবে এবং আমার উপকার করারও ক্ষমতা রাখ না যে, আমার কোন উপকার করবে। অতএব আমার বান্দাগণ! যদি তোমাদের পূর্বের ও পরের সমস্ত মানুষ ও জিন তোমাদের মধ্যে সর্বাপেক্ষা অধিক পরহেযগার ব্যক্তির অন্তরের ন্যায় অন্তর নিয়ে পরহেযগার হয়ে যায়, তা আমার রাজ্যের কিছুমাত্র বৃদ্ধি করতে পারবে না। আমার বান্দাগণ! যদি তোমাদের পূর্বের ও পরের সমস্ত মানুষ ও জিন তোমাদের মধ্যে সর্বাপেক্ষা অনাচারী ব্যক্তির অন্তরের ন্যায় অন্তর নিয়ে অনাচার করে এটা আমার রাজ্যের কিছুমাত্র ক্ষতি করতে পারবে না। আমার বান্দাগণ! যদি তোমাদের পূর্বের ও পরের, সমস্ত মানুষ ও জিন একই মাঠে দাঁড়িয়ে একত্রে আমার নিকট চায়, আর আমি তোমাদের প্রত্যেককে তার চাওয়া জিনিস দেই, তা আমার কাছে যা আছে তার কিছুই কমাতে পারবে না, ততটুকু ব্যতীত যতটুকু কমায় একটি সুই যখন সুমুদ্রে ডুবিয়ে দেয়া হয়।[৮]

ইবনু আব্বাস (রাযিয়াল্লাহু আনহুমা) বলেন, কোন এক সময় আমি রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর পিছনে ছিলাম। তিনি বললেন,

يَا غُلاَمُ إِنِّى أُعَلِّمُكَ كَلِمَاتٍ احْفَظِ اللهَ يَحْفَظْكَ احْفَظِ اللهَ تَجِدْهُ تُجَاهَكَ إِذَا سَأَلْتَ فَاسْأَلِ اللهَ وَإِذَا اسْتَعَنْتَ فَاسْتَعِنْ بِاللهِ وَاعْلَمْ أَنَّ الْأُمَّةَ لَوِ اجْتَمَعَتْ عَلَى أَنْ يَّنْفَعُوْكَ بِشَيْءٍ لَمْ يَنْفَعُوْكَ إِلَّا بِشَيْءٍ قَدْ كَتَبَهُ اللهُ لَكَ وَلَوِ اجْتَمَعُوْا عَلَى أَنْ يَّضُرُّوْكَ بِشَيْءٍ لَمْ يَضُرُّوْكَ إِلَّا بِشَيْءٍ قَدْ كَتَبَهُ اللهُ عَلَيْكَ رُفِعَتِ الْأَقْلَامُ وَجَفَّتِ الصُّحُفُ

‘হে তরুণ! তুমি আল্লাহ্র বিধি-নিষেধের রক্ষা করবে, আল্লাহ তা‘আলা তোমাকে রক্ষা করবেন। আল্লাহ তা‘আলার সন্তুষ্টির প্রতি লক্ষ্য রাখবে, আল্লাহকে তুমি কাছে পাবে। তোমার কোন কিছু চাওয়ার প্রয়োজন হলে আল্লাহর নিকট চাও। আর সাহায্য প্রার্থনা করতে হলে আল্লাহর নিকটেই কর। অতঃপর তিনি বলেন, জেনে রেখ, যদি সকল উম্মতও তোমার কোন উপকারের উদ্দেশ্যে ঐক্যবদ্ধ হয় ততটুকু উপকারই করতে পারবে, যতটুকু আল্লাহ তা‘আলা তোমার জন্য লিখে রেখেছেন। অপরদিকে যদি সকল উম্মত তোমার কোন ক্ষতি করার উদ্দেশ্যে একতাবদ্ধ হয়, তাহলে ততটুকু ক্ষতিই করতে পারবে, যতটুকু আল্লাহ তোমার তাক্বদীরে লিখে রেখেছেন। কলম তুলে নেয়া হয়েছে এবং লিখিত কাগজসমূহও শুকিয়ে গেছে’।[৯]

যুক্তিনির্ভর প্রমাণ

আল্লাহ তা‘আলার অস্বিত্ব ও তিনি যে এককভাবে প্রভুত্বের অধিকারী এবং সৃষ্টির উপর যে তাঁর পরিপূর্ণ ক্ষমতা ও কর্তৃত্ব রয়েছে এ সকল কিছুর উপর সুস্থ বিবেক প্রমাণ বহন করে। সেটা  প্রমাণবাহী আল্লাহর আয়াতসমূহে চিন্তাভাবনার মাধ্যমে হবে। এ ব্যাপারে নিম্নোক্ত দু’টি উপায়ে দলীল উল্লেখ করা যায়। যেমন- ১. মানবসত্তাজাত প্রমাণ ২. জাগতিক প্রমাণ।

মানবসত্তাজাত প্রমাণ

মানবসত্তাজাত প্রমাণ হল মানবসত্তা অর্থাৎ মানুষ সৃষ্টির ক্ষেত্রে আল্লাহর নিদর্শনসমূহে চিন্তা-ভাবনা করা। কেননা আত্মা হচ্ছে আল্লাহর সেই মহান নিদর্শনসমূহের একটি, যা এ প্রমাণই বহন করে যে, তিনি প্রভু হিসেবে একক, তাঁর কোন শরীক নেই। আল্লাহ তা‘আলা বলেন,

وَ  فِیۡۤ   اَنۡفُسِکُمۡ   اَفَلَا  تُبۡصِرُوۡنَ

‘আর তোমাদের নিজেদের মধ্যে রয়েছে নিদর্শন, তোমরা কি তা লক্ষ্য করছ না?’ (সূরা আয-যারিয়াত, ৫১ : ২১)।

মানুষ যদি তার নিজের সৃষ্টি ও তাতে আল্লাহর যে আশ্চর্য কীর্তি রয়েছে অর্থাৎ হাত-পা, চক্ষু, কর্ণ, নাসিকা, মুখ, মস্তিষ্ক, দেহ ইত্যাদিসহ সুন্দর অবয়ব দিয়ে বিন্যস্ত করে যে মানুষকে তিনি সৃষ্টি করেছেন, তা গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করে, তবে অবশ্যই তা তাকে দিক-নির্দেশনা দান করে যে, তার এমন একজন প্রতিপালক বা রব আছেন, যিনি সৃষ্টিকর্তা, পালনকর্তা, রিযিকদাতা, বিজ্ঞ, সর্বজ্ঞ এবং অমুখাপেক্ষী।[১০] তখন মানুষের গ্রন্থি বা জোর অর্থাৎ অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ রবের ইবাদতের জন্য নমনীয় হবে।[১১] যখন সে গভীর মনোযোগ দিয়ে চিন্তা-ভাবনা করবে, তখন সে উপলব্ধি করবে যে, তাকে আল্লাহর ইবাদত করার জন্য সৃষ্টি করা হয়েছে।[১২] কেননা যে বীর্য থেকে মানুষের উৎপত্তি হয়েছে, মানুষ নিজে সে বীর্য সৃষ্টি করতে পারে না। বীর্যকে রক্তপিণ্ডেও পরিণত করতে পারে না এবং রক্তপিণ্ডকে মাংসপিণ্ডে পরিণত করতে পারে না। আর মাংসপিণ্ডকে অস্থিতে পরিণত করতে বা অস্থিকে মাংসে আবৃত করতে পারে না। আল্লাহ তা‘আলা বলেন,

اَفَرَءَیۡتُمۡ مَّا تُمۡنُوۡنَ  . ءَاَنۡتُمۡ  تَخۡلُقُوۡنَہٗۤ  اَمۡ  نَحۡنُ  الۡخٰلِقُوۡنَ

‘তোমরা কি ভেবে দেখেছো তোমাদের বীর্যপাত সম্বন্ধে? ওটা কি তোমরা সৃষ্টি কর, না আমরা সৃষ্টি করি?’ (সূরা আল-ওয়াকি‘আহ, ৫৬ : ৫৮)। মহান আল্লাহ বলেন,

فَلۡیَنۡظُرِ الۡاِنۡسَانُ مِمَّ خُلِقَ  . خُلِقَ مِنۡ مَّآءٍ  دَافِقٍ     . یَّخۡرُجُ مِنۡۢ بَیۡنِ الصُّلۡبِ وَ التَّرَآئِبِ

‘অতএব মানুষের চিন্তা করে দেখা উচিৎ, তাকে কী থেকে সৃষ্টি করা হয়েছে? তাকে সৃষ্টি করা হয়েছে দ্রুতবেগে নির্গত পানি থেকে। যা বের হয় মেরুদণ্ড ও বুকের হাঁড়ের মধ্য থেকে’ (সূরা আত-তারিক, ৮৬ : ৫-৭)। অতঃপর দ্রুতবেগে নির্গত পানি থেকেই মহান আল্লাহ মাতৃগর্ভে মানুষের আকৃতি দান করেন যেভাবে তিনি চান। মহান আল্লাহ বলেন, ہُوَ  الَّذِیۡ یُصَوِّرُکُمۡ  فِی الۡاَرۡحَامِ  کَیۡفَ یَشَآءُ ‘তিনিই মাতৃগর্ভে তোমাদেরকে আকৃতি দান করেন যেভাবে তিনি চান’ (সূরা আলে ইমরান, ৩ : ৬)। আল্লাহ তা‘আলা বলেন,

الَّذِیۡۤ  اَحۡسَنَ کُلَّ شَیۡءٍ خَلَقَہٗ  وَ بَدَاَ خَلۡقَ الۡاِنۡسَانِ مِنۡ طِیۡنٍ   .  ثُمَّ جَعَلَ نَسۡلَہٗ  مِنۡ سُلٰلَۃٍ مِّنۡ مَّآءٍ مَّہِیۡنٍ   .  ثُمَّ سَوّٰىہُ  وَ نَفَخَ فِیۡہِ مِنۡ رُّوۡحِہٖ وَ جَعَلَ لَکُمُ السَّمۡعَ وَ الۡاَبۡصَارَ وَ الۡاَفۡـِٕدَۃَ ؕ قَلِیۡلًا  مَّا  تَشۡکُرُوۡنَ

‘(তিনিই সেই সত্তা) যিনি তাঁর প্রত্যেক সৃষ্টিকে সুন্দর করেছেন এবং কাদামাটি থেকে মানব সৃষ্টির সূচনা করেছেন। অতঃপর তিনি তার বংশধর সৃষ্টি করেন তুচ্ছ পানির নির্যাস থেকে। অতঃপর তিনি তাকে সুষম করেন, তাতে রূহ সঞ্চার করেন এবং তোমাদেরকে দেন চক্ষু, কর্ণ ও অন্তঃকরণ। (অথচ) তোমরা সামান্যই কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে থাক’ (সূরা আস-সাজদাহ, ৩২ : ৭-৯)। মহান আল্লাহ বলেন,

وَ لَقَدۡ خَلَقۡنَا الۡاِنۡسَانَ مِنۡ سُلٰلَۃٍ  مِّنۡ طِیۡنٍ   . ثُمَّ  جَعَلۡنٰہُ  نُطۡفَۃً  فِیۡ قَرَارٍ مَّکِیۡنٍ   . ثُمَّ خَلَقۡنَا النُّطۡفَۃَ عَلَقَۃً  فَخَلَقۡنَا الۡعَلَقَۃَ مُضۡغَۃً فَخَلَقۡنَا الۡمُضۡغَۃَ عِظٰمًا فَکَسَوۡنَا الۡعِظٰمَ لَحۡمًا ٭ ثُمَّ اَنۡشَاۡنٰہُ خَلۡقًا اٰخَرَ ؕ فَتَبٰرَکَ اللّٰہُ  اَحۡسَنُ  الۡخٰلِقِیۡنَ   . ثُمَّ  اِنَّکُمۡ بَعۡدَ ذٰلِکَ لَمَیِّتُوۡنَ

‘আর অবশ্যই আমরা মানুষকে মাটির নির্যাস থেকে সৃষ্টি করেছি। তারপর আমরা তাকে শুক্ররূপে সংরক্ষিত আধারে স্থাপন করেছি। তারপর শুক্রকে আমরা রক্তপিণ্ডে পরিণত করি। তারপর রক্তপিণ্ডকে গোশতপিণ্ডে পরিণত করি। তারপর গোশতপিণ্ডকে হাড়ে পরিণত করি। তারপর হাড়কে গোশত দিয়ে আবৃত করি। অতঃপর তাকে অন্য এক সৃষ্টিরূপে গড়ে তুলি। অতএব সর্বোত্তম স্রষ্টা আল্লাহ কত বরকতময়! এরপর অবশ্যই তোমরা মৃত্যুবরণ করবে’ (সূরা আল-মুমিনূন, ২৩ : ১২-১৫)।

মহান আল্লাহ মৃত্যুর পর মানুষকে পুনরায় জীবিত করবেন। কেউ যদি মনে করে মৃত্যুর পর মানুষের হাড় কীভাবে পুনরায় জীবিত হবে, মহান আল্লাহ তার জবাব দিয়েছেন,

قَالَ مَنۡ  یُّحۡیِ  الۡعِظَامَ  وَ  ہِیَ  رَمِیۡمٌ .  قُلۡ یُحۡیِیۡہَا الَّذِیۡۤ  اَنۡشَاَہَاۤ  اَوَّلَ  مَرَّۃٍ

‘সে বলে, এই অস্থিগুলো যখন পচে-গলে যাবে, তখন কে এগুলোকে জীবিত করবে? বলুন, যিনি এগুলোকে প্রথমবার সৃষ্টি করেছেন, তিনিই এগুলোকে জীবিত করবেন’ (সূরা ইয়াসীন, ৩৬ : ৭৮-৭৯)। মহান আল্লাহ বলেন,

یٰۤاَیُّہَا النَّاسُ  اِنۡ  کُنۡتُمۡ فِیۡ رَیۡبٍ مِّنَ الۡبَعۡثِ فَاِنَّا خَلَقۡنٰکُمۡ مِّنۡ تُرَابٍ ثُمَّ مِنۡ نُّطۡفَۃٍ  ثُمَّ مِنۡ عَلَقَۃٍ  ثُمَّ مِنۡ مُّضۡغَۃٍ مُّخَلَّقَۃٍ  وَّ غَیۡرِ مُخَلَّقَۃٍ  لِّنُبَیِّنَ لَکُمۡ ؕ وَ نُقِرُّ  فِی الۡاَرۡحَامِ مَا نَشَآءُ  اِلٰۤی اَجَلٍ مُّسَمًّی ثُمَّ نُخۡرِجُکُمۡ طِفۡلًا ثُمَّ  لِتَبۡلُغُوۡۤا  اَشُدَّکُمۡ ۚ وَ مِنۡکُمۡ  مَّنۡ یُّتَوَفّٰی وَ مِنۡکُمۡ مَّنۡ یُّرَدُّ  اِلٰۤی  اَرۡذَلِ الۡعُمُرِ لِکَیۡلَا یَعۡلَمَ مِنۡۢ بَعۡدِ عِلۡمٍ شَیۡئًا

‘হে মানুষ! যদি তোমরা পুররুত্থানের ব্যাপারে সন্দেহে থাক তবে নিশ্চয়ই জেনে রেখো, আমি তোমাদেরকে মাটি থেকে সৃষ্টি করেছি, তারপর শুক্র থেকে, তারপর আলাকা থেকে, তারপর পূর্ণাকৃতিবিশিষ্ট অথবা অপূর্ণাকৃতিবিশিষ্ট গোশত থেকে। তোমাদের নিকট বিষয়টি সুস্পষ্টরূপে বর্ণনা করার নিমিত্তে। আর আমি যা ইচ্ছা করি তা একটি নির্দিষ্ট কাল পর্যন্ত মাতৃগর্ভে অবস্থিত রাখি। অতঃপর আমি তোমাদেরকে শিশুরূপে বের করি, পরে যাতে তোমরা যৌবনে উপনীত হয়। তোমাদের মধ্যে কারে কারো মৃত্যু দেয়া হয় এ বয়সেই, আবার কাউকে কাউকে ফিরিয়ে নেয়া হয় হীনতম বয়সে, যাতে সে জ্ঞান লাভের পরও কিছু না জানে’ (সূরা আল-হজ্জ, ২২ : ৫)।

হাদীছে বর্ণিত হয়েছে, আনাস ইবনু মালিক (রাযিয়াল্লাহু আনহু) হতে বর্ণিত, নবী (ﷺ) বলেছেন,

إِنَّ اللهَ عَزَّ وَجَلَّ وَكَّلَ بِالرَّحِمِ مَلَكًا يَقُولُ يَا رَبِّ نُطْفَةٌ ، يَا رَبِّ عَلَقَةٌ ، يَا رَبِّ مُضْغَةٌ . فَإِذَا أَرَادَ أَنْ يَقْضِىَ خَلْقَهُ قَالَ أَذَكَرٌ أَمْ أُنْثَى شَقِىٌّ أَمْ سَعِيدٌ فَمَا الرِّزْقُ وَالأَجَلُ فَيُكْتَبُ فِى بَطْنِ أُمِّهِ

‘নিশ্চয় আল্লাহ তা‘আলা গর্ভাশয়ের দায়িত্বে একজন ফেরেশতা নিযুক্ত করেছেন। তিনি বলেন, ‘হে আমার রব! নুতফা। হে আমার রব! আলাক্বাহ। হে আমার রব! মুদগাহ’। অতঃপর যখন আল্লাহ তার সৃষ্টি পূর্ণ করার ইচ্ছা করেন, তখন ফেরেশতা বলেন, ‘সে কি পুরুষ হবে, না নারী? সে কি হতভাগ্য হবে, না সৌভাগ্যবান হবে? তার রিযিক কত এবং তার আয়ু কত?’ অতঃপর তার মায়ের গর্ভেই তা লিখে দেওয়া হয়।[১৩]

আব্দুল্লাহ ইবনু মাস‘ঊদ (রাযিয়াল্লাহু আনহুমা) বলেন, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেন,

إِنَّ أَحَدَكُمْ يُجْمَعُ خَلْقُهُ فِى بَطْنِ أُمِّهِ أَرْبَعِينَ يَوْمًا ، ثُمَّ يَكُونُ عَلَقَةً مِثْلَ ذَلِكَ ، ثُمَّ يَكُونُ مُضْغَةً مِثْلَ ذَلِكَ ، ثُمَّ يَبْعَثُ اللَّهُ مَلَكًا ، فَيُؤْمَرُ بِأَرْبَعِ كَلِمَاتٍ ، وَيُقَالُ لَهُ اكْتُبْ عَمَلَهُ وَرِزْقَهُ وَأَجَلَهُ وَشَقِىٌّ أَوْ سَعِيدٌ . ثُمَّ يُنْفَخُ فِيهِ الرُّوحُ

‘তোমাদের প্রত্যেকের সৃষ্টির উপাদান তার মায়ের পেটে চল্লিশ দিন পর্যন্ত একত্রিত করা হয়। অতঃপর সে অনুরূপ সময় ‘আলাকাহ’ (عَلَقَة) অবস্থায় থাকে। অতঃপর অনুরূপ সময় ‘মুদগাহ’ (مُضْغَة) অবস্থায় থাকে। এরপর আল্লাহ একজন ফেরেশতা প্রেরণ করেন। তাকে চারটি বিষয় লিখে দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়। তাকে বলা হয়—তার আমল, তার রিযিক, তার আয়ু এবং সে দুর্ভাগা হবে নাকি সৌভাগ্যবান—তা লিখ। এরপর তার মধ্যে রূহ ফুঁকে দেওয়া হয়’।[১৪]

তবে ছহীহ মুসলিমের বর্ণনায় ৪০ দিনের পরিবর্তে ৪২ দিনের কথা এসেছে। হুযায়ফা ইবনু আসীদ (রাযিয়াল্লাহু আনহু) হতে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেন,

إِذَا مَرَّ بِالنُّطْفَةِ ثِنْتَانِ وَأَرْبَعُونَ لَيْلَةً بَعَثَ اللَّهُ إِلَيْهَا مَلَكًا فَصَوَّرَهَا وَخَلَقَ سَمْعَهَا وَبَصَرَهَا وَجِلْدَهَا وَلَحْمَهَا وَعِظَامَهَا ثُمَّ. قَالَ يَا رَبِّ أَذَكَرٌ أَمْ أُنْثَى فَيَقْضِى رَبُّكَ مَا شَاءَ وَيَكْتُبُ الْمَلَكُ ثُمَّ يَقُولُ يَا رَبِّ أَجَلُهُ. فَيَقُولُ رَبُّكَ مَا شَاءَ وَيَكْتُبُ الْمَلَكُ ثُمَّ يَقُولُ يَا رَبِّ رِزْقُهُ. فَيَقْضِى رَبُّكَ مَا شَاءَ وَيَكْتُبُ الْمَلَكُ ثُمَّ يَخْرُجُ الْمَلَكُ بِالصَّحِيفَةِ فِى يَدِهِ فَلاَ يَزِيدُ عَلَى مَا أُمِرَ وَلاَ يَنْقُصُ

‘যখন নুতফার ওপর বিয়াল্লিশ রাত অতিবাহিত হয়, তখন আল্লাহ তার কাছে একজন ফেরেশতা প্রেরণ করেন। তিনি তার আকৃতি প্রদান করেন এবং তার শ্রবণশক্তি, দৃষ্টিশক্তি, চামড়া, মাংস ও অস্থি সৃষ্টি করেন। অতঃপর ফেরেশতা বলেন, ‘হে আমার রব! সে কি পুরুষ হবে, না নারী?’ তখন তোমার রব যা ইচ্ছা ফায়সালা করেন এবং ফেরেশতা তা লিখে দেন। অতঃপর ফেরেশতা বলেন, ‘হে আমার রব! তার আয়ু কত?’ তখন তোমার রব যা ইচ্ছা ফায়সালা করেন এবং ফেরেশতা তা লিখে দেন। অতঃপর ফেরেশতা বলেন, ‘হে আমার রব! তার রিযিক কত?’ তখন তোমার রব যা ইচ্ছা ফায়সালা করেন এবং ফেরেশতা তা লিখে দেন। এরপর ফেরেশতা তার হাতে সেই লিখিত পত্র নিয়ে বের হয়ে যান। তাকে যে নির্দেশ দেয়া হয়েছে, তিনি তার চেয়ে বেশি করেন না এবং কমও করেন না’।[১৫]

মহান আল্লাহ বলেন, وَ اللّٰہُ اَخۡرَجَکُمۡ  مِّنۡۢ بُطُوۡنِ اُمَّہٰتِکُمۡ لَا تَعۡلَمُوۡنَ شَیۡئًا ۙ وَّ جَعَلَ لَکُمُ السَّمۡعَ وَ الۡاَبۡصَارَ وَ الۡاَفۡـِٕدَۃَ ۙ لَعَلَّکُمۡ  تَشۡکُرُوۡنَ ‘আর আল্লাহ তোমাদেরকে বের করেছেন, তোমাদের মাতৃগর্ভ থেকে এমতাবস্থায় যে, তোমরা কিছুই জানতে না। তিনি তোমাদের জন্য সৃষ্টি করেছেন শ্রবণশক্তি, চক্ষু ও অন্তর। যাতে তোমরা শুকরিয়া আদায় কর’ (সূরা আন-নাহল, ১৬ : ৭৮)।

মহান আল্লাহ মানুষকে সর্বোত্তম আকৃতি দিয়েছেন। তাকে চোখ, কান, নাক, অন্তর, হাত, পা, অন্তর ইত্যাদি দিয়ে সর্বোত্তম গঠনে সৃষ্টি করেছেন। মহান আল্লাহ বলেন, لَقَدۡ خَلَقۡنَا الۡاِنۡسَانَ فِیۡۤ  اَحۡسَنِ تَقۡوِیۡمٍ ‘নিশ্চয় আমরা মানুষকে সর্বোত্তম গঠনে সৃষ্টি করেছি’ (সূরা আত-তীন, ৯৫ : ৪)। অর্থাৎ আল্লাহ তা‘আলা প্রতিটি প্রাণীকে সৃষ্টি করেছেন নিম্নমুখী করে। কেবলমাত্র মানুষকে সৃষ্টি করেছেন আলম্বিত দেহে সোজা করে। মহান আল্লাহর সৃষ্টিসমূহের মধ্যে মানুষের চেয়ে উত্তম আর কোন সৃষ্টি নেই। আল্লাহ তা‘আলা মানুষকে বিবেক বুদ্ধি বোধশক্তি, শ্রবণ, প্রজ্ঞা ও দৃষ্টিশক্তিসম্পন্ন করে সৃষ্টি করেছেন। মহান আল্লাহ বলেন, وَ لَقَدۡ کَرَّمۡنَا بَنِیۡۤ  اٰدَمَ وَ حَمَلۡنٰہُمۡ  فِی الۡبَرِّ وَ الۡبَحۡرِ وَ رَزَقۡنٰہُمۡ مِّنَ الطَّیِّبٰتِ وَ فَضَّلۡنٰہُمۡ عَلٰی کَثِیۡرٍ مِّمَّنۡ خَلَقۡنَا تَفۡضِیۡلًا ‘আর আমরা তো আদম সন্তানদের সম্মানিত করেছি এবং আমরা তাদেরকে স্থলে ও সমুদ্রে বাহন দিয়েছি এবং তাদেরকে দিয়েছি উত্তম রিযক। আর আমরা যা সৃষ্টি করেছি তাদের থেকে অনেকের উপর আমরা তাদেরকে অনেক মর্যাদা দিয়েছি’ (সূরা আল-ইসরা, ১৭ : ৭০)।

উপরিউক্ত আয়াতে মহান আল্লাহ আদম সন্তানের মর্যাদা উল্লেখ করেছেন, তবে এ মর্যাদায় মুমিন, কাফির সকলে শামিল। কারণ এ মর্যদা অন্যান্য সৃষ্টিকুল, জীবজন্তু, জড়পদার্থ, উদ্ভিদ ইত্যাদির তুলনায়। তাহল মানুষকে মহান আল্লাহ উত্তম আকৃতি ও অবয়বে সৃষ্টি করেছেন, তাদেরকে জ্ঞান-বুদ্ধি দিয়েছেন, কথা বলার যোগ্যতা দিয়েছেন, ভাল-মন্দ বিচার করার সক্ষমতা দিয়েছেন। কিন্তু অন্যান্য প্রাণীর ভাল-মন্দ বিচার করার মতো জ্ঞান-বুদ্ধি নেই। দেখা যায় মানুষ দেহ, শক্তি ও অন্যান্য তুলনায় অনেক প্রাণী থেকে নগণ্য ও দুর্বল, তাহলে তাদের থেকে মর্যাদাবান হল কিভাবে? উত্তর, মানুষ জ্ঞান ও বুদ্ধি খাটিয়ে ঐ বিশাল দেহ ও শক্তিশালী প্রাণীকে নিজের করায়ত্ত করে নিচ্ছে। যে পাখি ডানা মেলে ঘন্টার পর ঘন্টা উড়ে হাজার হাজর মাইল চলে যাচ্ছে, মানুষ জ্ঞানের সাহায্যে উড়ো জাহাজ আবিষ্কার করে কম সময়ে আরো বেশি রাস্তা চলে যাচ্ছে। এমনিভাবে বিজ্ঞানের অসংখ্য আবিষ্কার আল্লাহ তা‘আলা কর্তৃক মানুষকে দেয়া জ্ঞানেরই প্রমাণ বহন করে, সেই সাথে প্রমাণ বহন করে তাঁর শ্রেষ্ঠত্বেরও। সুতরাং অন্যান্য প্রাণীর চেয়ে আদম সন্তানের শ্রেষ্ঠত্ব ও মর্যাদা অনেক বেশি। বস্তÍতঃ এই অপূর্ব সৃষ্টি কৌশলের মধ্যেই সৃষ্টিকর্তার অস্তিত্বের প্রমাণ নিহিত রয়েছে।

 (ইনশাআল্লাহ চলবে)


* সহকারী সম্পাদক, মাসিক আল-ইখলাছ।

তথ্যসূত্র :
[১]. তাকীউদ্দীন আবুল আব্বাস আহমাদ ইবনু আব্দুল হালীম ইবনু তাইমিয়াহ, মাজমূ‘উল ফাতাওয়া, তাহক্বীক্ব : আনওয়ারুল বায, ১০ম খণ্ড (দারুল ওয়াফা, ১৪২৬ হি.), পৃ. ৩৩১।
[২]. শারহুল আকীদা আত-তাহাবীয়া, পৃ. ৭৭।
[৩]. আল কওলুস সাদীদ ফী মাকাসীদিত তাওহীদ, পৃ. ৪২।
[৪]. আল-কওলুল মুফীদ ফী আদিল্লাতিত তাওহীদ, পৃ. ৭৭।
[৫]. আল-কওলুল মুফীদ ফী আদিল্লাতিত তাওহীদ, পৃ. ৭৭।
[৬]. মাজমূ‘উ ফাতাওয়া ওয়া রাসাইল, ৮ম খণ্ড, পৃ. ১৫।
[৭]. ছহীহুল বুখারী, ৯ম খণ্ড, কিতাবুত তাওহীদ, হাদীছ নং-৭৪১৮, পৃ. ১২৪।
[৮]. ছহীহ মুসলিম, ৪র্থ খণ্ড, কিতাবুল বিররি ওয়াছ ছিলাতি ওয়াল আদাবি, হাদীছ নং-২৫৭৭, পৃ. ১৯৯৪।
[৯]. সুনানুত তিরমিযী, ৪র্থ খণ্ড, আবওয়াবু সিফাতিল কিয়ামাহ, হাদীছ নং-২৫১৬, পৃ. ৬৬৭।
[১০]. তায়সীরুল কারীমির রহমান ফী তাফসীরি কালামিল মান্নান, ১ম খণ্ড, পৃ. ৮০৯।  
[১১]. তাফসীরুল কুরআনিল আযীম, ৭ম খণ্ড, পৃ. ৪১৯।  
[১২]. আল-জামি‘উ লি-আহকামিল কুরআন, ১৭তম খণ্ড, পৃ. ৪০।  
[১৩]. ছহীহুল বুখারী, ৪র্থ খণ্ড, কিতাবু বাদইল খলক, হাদীছ নং-৩৩৩৩, পৃ. ১৩৩।
[১৪]. ছহীহুল বুখারী, ৪র্থ খণ্ড, কিতাবু বাদইল খলক, হাদীছ নং-৩২০৮, পৃ. ১১৪।
[১৫]. ছহীহ মুসলিম, ৮ম খণ্ড, কিতাবুল ক্বদর, হাদীছ নং-২৬৪৫, পৃ. ৪৫।





প্রসঙ্গসমূহ »: তাওহীদ
ইসলামী জামা‘আতের মূল স্তম্ভ (৭ম কিস্তি) - ড. মুহাম্মাদ মুছলেহুদ্দীন
আল-কুরআন তেলাওয়াতের ফযীলত (৪র্থ কিস্তি) - আব্দুল্লাহ বিন আব্দুর রহীম
তরুণদের বিদ্রোহ, বিক্ষোভ ও সন্ত্রাসবাদ থেকে সতর্ক করা (৪র্থ কিস্তি) - মাসঊদুর রহমান
ফাযায়েলে কুরআন (৬ষ্ঠ কিস্তি) - আব্দুল্লাহ বিন আব্দুর রহীম
ইসলামী দৃষ্টিতে বিয়ে ও দাম্পত্য জীবন (৬ষ্ঠ কিস্তি) - আবূ মাহদী মামুন বিন আব্দুল্লাহ
কুরআনী প্রবাদ সংকলন : তাৎপর্য ও শিক্ষা - প্রফেসর ড. লোকমান হোসেন
ইসলামে মেহমানদারী : একটি পর্যালোচনা - আল-ইখলাছ ডেস্ক
তওবার গুরুত্ব ও ফযীলত (শেষ কিস্তি) - ড. ইমামুদ্দীন বিন আব্দুল বাছীর
ইসলামের দৃষ্টিতে স্বাস্থ্য সুরক্ষা (৩য় কিস্তি) - মুহাম্মাদ আযীযুর রহমান
আধুনিক যুগে দাওয়াতী কাজের পদ্ধতি (৩য় কিস্তি) - ড. মুকাররম বিন মুহসিন মাদানী
আল-কুরআন এক জীবন্ত মু‘জিযা - আবু আব্দুল্লাহ মুহাম্মাদ ইউনুস
সুন্নাহ বিরোধী ও সংশয় উত্থাপনকারীদের চক্রান্তসমূহ ও তার জবাব (৮ম কিস্তি) - হাসিবুর রহমান বুখারী

ফেসবুক পেজ