সুন্নাহ বিরোধী ও সংশয় উত্থাপনকারীদের চক্রান্তসমূহ ও তার জবাব
- হাসিবুর রহমান বুখারী*
(৮ম কিস্তি)
আল্লাহর রাসূল (ﷺ) সত্য কথাই বলেছেন,
عَنْ أَبِيْ هُرَيْرَةَ ﷺ عَنْ النَّبِيِّ ﷺ قَالَ دَعُوْنِيْ مَا تَرَكْتُكُمْ إِنَّمَا هَلَكَ مَنْ كَانَ قَبْلَكُمْ بِسُؤَالِهِمْ وَاخْتِلَافِهِمْ عَلَى أَنْبِيَائِهِمْ فَإِذَا نَهَيْتُكُمْ عَنْ شَيْءٍ فَاجْتَنِبُوْهُ وَإِذَا أَمَرْتُكُمْ بِأَمْرٍ فَأْتُوْا مِنْهُ مَا اسْتَطَعْتُمْ
আবূ হুরাইরা (রাযিয়াল্লাহু আনহু) থেকে বর্ণিত, নবী (ﷺ) বলেছেন, ‘তোমরা আমাকে প্রশ্ন করা থেকে বিরত থাক, যে পর্যন্ত না আমি তোমাদের কিছু না বলি। কেননা, তোমাদের আগে যারা ছিল, তারা তাদের নবীদেরকে বেশি বেশি প্রশ্ন করা ও নবীদের সঙ্গে মতভেদ করার জন্যই ধ্বংস হয়েছে। তাই আমি যখন তোমাদেরকে কোন ব্যাপারে নিষেধ করি, তখন তাত্থেকে বেঁচে থাক। আর যদি কোন বিষয়ে আদেশ করি তাহলে সাধ্য অনুসারে তা মেনে চল’।[১]
এটি কেবল জনস্বার্থ অর্জনের জন্য এবং প্রতিটি ব্যক্তির পরিস্থিতি এবং সময় বিবেচনা করার জন্য। এই সত্যকে যা নিশ্চিত করে তা হল সর্বশক্তিমান আল্লাহর বাণী,
وَ اِذَا جَآءَهُمْ اَمْرٌ مِّنَ الْاَمْنِ اَوِ الْخَوْفِ اَذَاعُوْا بِهٖ١ؕ وَ لَوْ رَدُّوْهُ اِلَى الرَّسُوْلِ وَ اِلٰۤى اُولِي الْاَمْرِ مِنْهُمْ لَعَلِمَهُ الَّذِيْنَ يَسْتَنْۢبِطُوْنَهٗ مِنْهُمْ١ؕ وَ لَوْ لَا فَضْلُ اللّٰهِ عَلَيْكُمْ وَ رَحْمَتُهٗ لَاتَّبَعْتُمُ الشَّيْطٰنَ اِلَّا قَلِيْلًا
‘আর যখন শান্তি অথবা শঙ্কার কোন সংবাদ তাদের কাছে আসে তখন তারা তা প্রচার করে থাকে। যদি তারা তা রাসূল এবং তাদের মধ্যে যারা নির্দেশ প্রদানের অধিকারী তাদেরকে জানাত, তবে তাদের মধ্যে যারা তথ্য অনুসন্ধান করে তারা সেটার যথার্থতা নির্ণয় করতে পারত। তোমাদের প্রতি যদি আল্লাহর অনুগ্রহ ও রহমত না থাকত তবে তোমাদের অল্প সংখ্যক ছাড়া সকলে শয়তানের অনুসরণ করতে’ (সূরা আন-নিসা : ৮৩)।
উপরিউক্ত আয়াতটি আমাদের সাক্ষ্য দেয় যে, আল্লাহ্ তা‘আলা মুসলিমদেরকে তাঁর রাসূল (ﷺ)-এর জীবদ্দশায় এবং তাঁর মৃত্যুর পরে তাঁর সুন্নাহর দিকেই ফিরে যাওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন এবং যাদেরকে আল্লাহ তা‘আলা কুরআন ও সুন্নাহর উচ্চতর নীতি থেকে ফিক্বহী মাস’আলা-মাসায়িল বের করার ক্ষমতা দিয়েছেন, তাদের প্রতিও তিনি একই নির্দেশ দিয়েছেন। যা নিশ্চিত করে যে, সুন্নাহ সময় বা স্থান দ্বারা সীমাবদ্ধ নয়।
মাইমুন ইবনু মিহরান বলেন, ‘আল্লাহর দিকে প্রত্যাবর্তনের অর্থ হল- আল্লাহর কিতাবের দিকে প্রত্যাবর্তন করা এবং যদি তিনি জীবিত থাকতেন, তাহলে তাঁর রাসূলের দিকে প্রত্যাবর্তন করা। অতঃপর পর যখন আল্লাহ তা‘আলা তাঁকে নিয়ে গেলেন, তখন তাঁর সুন্নাতের দিকে প্রত্যাবর্তন করা। সুতরাং এখান থেকে চূড়ান্ত প্রমাণ পাওয়া যায় যে, সুন্নাহ্ কোনও নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এই সময়টি যেমন নবী (ﷺ)-এর জীবনকালে প্রযোজ্য ছিল, ঠিক তেমনি তাঁর পরবর্তী সময়েও বিস্তৃত, তাই আমরা তাঁর মৃত্যুর পরেও সুন্নাহর দিকে ফিরে যেতে বাধ্য’। ইমাম ইবনুল ক্বাইয়্যিম (রাহিমাহুল্লাহ) এই দৃষ্টিভঙ্গিকে শক্তিশালী করে যা বলেছেন, তা আল্লাহ তা‘আলার বাণী দ্বারা প্রমাণিত। তিনি বলেছেন,
اِنَّمَا الْمُؤْمِنُوْنَ الَّذِيْنَ اٰمَنُوْا بِاللّٰهِ وَ رَسُوْلِهٖ وَ اِذَا كَانُوْا مَعَهٗ عَلٰۤى اَمْرٍ جَامِعٍ لَّمْ يَذْهَبُوْا حَتّٰى يَسْتَاْذِنُوْهُ۠
‘মুমিন তো তারাই যারা আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের উপর ঈমান আনে এবং রাসূলের সঙ্গে সমষ্টিগত ব্যাপারে একত্রিত হলে তারা অনুমতি ছাড়া সরে পড়ে না’ (সূরা আন-নূর : ৬২)।
অতএব, যারা দাবি করেন যে, নবী (ﷺ)-এর হাদীছ পরিস্থিতিগত- তাদের কোন বৈধ ভিত্তিই নেই। সর্বকালের এবং স্থানের জন্য সুন্নাহর বৈধতা প্রমাণ করার জন্য কত মেডিক্যাল উপকারিতা প্রমাণিত হয়েছে! সম্ভবত আজ পৃথিবী পারিবারিক, সামাজিক ও শারীরিক উপকার প্রাপ্তির জন্য স্বাচ্ছন্দ্যে তাঁর সুন্নাহর দিকে ফিরে যাবে।
অতএব, নবী (ﷺ) তাঁর সুন্নাহ প্রচার করার ব্যাপারে যত্ন নেয়ার জন্য জাতির মনোযোগ আকর্ষণ করেছিলেন। আবূ বাকরাহ (রাযিয়াল্লাহু আনহু) হতে বর্ণিত, আল্লাহর রাসূল (ﷺ) বিদায়ী হজ্জের ঐতিহাসিক ভাষণে বলেছেন, لِيُبَلِّغِ الشَّاهِدُ الغَائِبَ، فإنَّ الشَّاهِدَ عَسَى أنْ يُبَلِّغَ مَن هو أوْعَى له منه ‘এখানে উপস্থিত ব্যক্তিরা যেন অনুপস্থিত ব্যক্তির নিকট এসব কথা (অর্থাৎ আমার এ বাণী) পৌঁছে দেয়। কারণ উপস্থিত ব্যক্তি সম্ভবত এমন এক ব্যক্তির নিকট পৌঁছাবে, যে এ বাণীকে তার চেয়ে অধিক আয়ত্তে রাখতে পারবে’।[২] অতএব, নবী (ﷺ)-এর সুন্নাহ অর্থাৎ কথা ও কাজের এমন কিছু নেই যা মুসলিমদের জীবন থেকে সুগন্ধিমুক্ত করা যেতে পারে বা বিচ্ছিন্ন করা যেতে পারে এই অজুহাতে যে এটি একটি সাময়িক বিষয় যা নবুওয়াতের যুগের সমাপ্তির সাথে সাথে শেষ হয়ে গেছে। তাদের মধ্যে কেউ কেউ দাবি করেছিলেন, যে দাড়ি বৃদ্ধি সম্পর্কিত হাদীছ- যেমন, আব্দুল্লাহ্ ইবনে ‘উমার (রাযিয়াল্লাহু আনহুমা) সূত্রে নবী (ﷺ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেছেনঃ, তোমরা মুশরিকদের উল্টো করবেঃ দাড়ি লম্বা রাখবে, গোঁফ ছোট করবে’।[৩] এটি হল- সেই হাদীছগুলোর মধ্যে একটি যা রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর সময়ে বিদ্যমান আগ্রহের উপর ভিত্তি করে তৈরি হয়েছিল। তাই হাদীছের শব্দচয়নে এমন কিছু রয়েছে যা মুশরিকদের পোশাক এবং দাড়ি ও গোঁফ একসাথে বাড়ানোর যে রীতিনীতি তাদের ছিল, তার সাথে হুকুমের সংযোগ নির্দেশ করে এবং মানুষের পোশাক এবং সাজসজ্জা এমন বিষয় যার কোনও স্থিতিশীলতা নেই, তাই এটি এমন একটি সাময়িক আইন; যা রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর সেই পরিবেশকে বিবেচনা করা হয়েছিল, যে পরিবেশে রাসূল (ﷺ) উপস্থিত ছিলেন।
আমরা তাদের বলব- যিনি আইনগত বিধানের ঐতিহাসিকতা নির্ধারণ করেন, সেগুলো কুরআনে উল্লেখিত হোক বা সুন্নাহে, তিনি হলেন সেই জ্ঞানী আইন প্রণেতা যিনি সেগুলোকে আইন হিসাবে প্রণয়ন করেছেন। এখানে মানুষের খেয়ালখুশি এবং মেজাজের কোন ভিত্তি নেই। যদি আমরা প্রতিটি মতামতের প্রতি মনোযোগ দিই, তাহলে ধর্ম তার সারবস্তু এবং বিষয়বস্তু থেকে বিলীন হয়ে যাবে এবং এর নাম ছাড়া আর কিছুই অবশিষ্ট থাকবে না, হাদীছের রূপ ছাড়া আর কিছুই অবশিষ্ট থাকবে না, এমনকি মহান কুরআন। এই কারণে, আমরা তাদের কাছে ব্যাখ্যা করছি যে, অতীত ও বর্তমানের মুসলিম পণ্ডিতরা দাড়ি রাখার বাধ্যবাধকতা এবং কামানোর নিষেধাজ্ঞা সম্পর্কে কী সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। সঊদী আরবের স্থায়ী ফাতওয়া কমিটির আলিমগণ বলেছেন, ‘কিছু মানুষ যে দাড়ি মুণ্ডন করে অথবা এর দৈর্ঘ্য ও প্রস্থ থেকে কিছু কেটে থাকেÑ এটি বৈধ নয়। কারণ এটি নবী (ﷺ)-এর হিদায়াত ও তাঁর দাড়ি বাড়তে দেয়ার আদেশের বিরোধিতা করে। আর আদেশ মূলত ফরয হওয়ার অর্থ বহন করে, যতক্ষণ না কোন প্রমাণ পাওয়া যায় যা এ বিধানকে তার আসল অর্থ থেকে সরিয়ে দেয়। অথচ আমরা এমন কোনো প্রমাণ জানি না যা এ বিধানকে সরিয়ে দেয়’।[৪]
শাইখ আব্দুল্লাহ ইবনে বায (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন, ‘ওয়াজিব হল- দাড়ি বৃদ্ধি করা, তা পূর্ণ রাখা, ছেড়ে দেয়া এবং এর সাথে কোন প্রকার হস্তক্ষেপ না করা। আর তিরমিযী (রাহিমাহুল্লাহ) যে হাদীছ বর্ণনা করেছেন যে, নবী (ﷺ) নাকি দাড়ির দৈর্ঘ্য ও প্রস্থ থেকে কিছু ছাঁটতেনÑ এটি বিদ্বানদের মতে একটি পরিত্যাজ্য (মিথ্যা) রিওয়ায়াত। সুতরাং কোন মুমিনের জন্য এ বাতিল হাদীছকে ভিত্তি বানানো বৈধ নয় এবং কিছু আলিম যে এ বিষয়ে সহজ মতামত দিয়েছেন, তার উপর নির্ভর করাও বৈধ নয়। কেননা সুন্নাহ সবার উপরে বিচারক’।[৫]
শাইখ মুহাম্মাদ ইবনু ছালিহ আল-উছাইমীন (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন, ‘দাড়ি ছাঁটা মানে নবী (ﷺ)-এর আদেশের বিরোধিতা করা, কারণ তিনি বলেছেন, ‘দাড়ি বড় করো’, ‘দাড়ি পূর্ণ করো’, ‘দাড়ি বাড়তে দাও’। অতএব, যে কেউ রাসূল (ﷺ)-এর আদেশ মানতে চাইবে এবং তাঁর হিদায়াত অনুসরণ করতে চাইবে, সে যেন দাড়ি থেকে কিছুই না কাটে; কেননা রাসূল (ﷺ)-এর হিদায়াত ছিল দাড়ি থেকে কিছুই না কাটা এবং তাঁর আগের নবীদের হিদায়াতও এমনই ছিল’।[৬]
শাইখ মুহাম্মাদ ছালিহ আল-মুনাজ্জিদ (হাফিযাহুল্লাহ) বলেন, ‘নবী (ﷺ)-এর কথন ও কাজÑ উভয় সুন্নাহ্ই দাড়ি বড় করা ওয়াজিব হওয়ার ওপর প্রমাণ বহন করে এবং তা থেকে কিছু ছাঁটা বা কাটা যে জায়েয নয়, সেটাও প্রমাণ করছে। আর এটিই নবী (ﷺ)-এর বাণীর স্পষ্ট ইঙ্গিত এবং একাধিক ছহীহ হাদীছ দ্বারা এটি নিশ্চিত হয়েছে। যেমন আব্দুল্লাহ ইবনে ‘উমার (রাযিয়াল্লাহু আনহুমা) সূত্রে নবী (ﷺ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেছেন, ‘তোমরা মুশরিকদের উল্টো করবে- দাড়ি লম্বা রাখবে, গোঁফ ছোট করবে’।[৭] হাফিয ইবনে হাজার আসক্বালানী (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন, وفروا اللحى ‘দাড়ি ঘন করো এবং বাড়তে দাও’।[৮] ইমাম নববী (রাহিমাহুল্লাহ) বলেছেন, ‘এই হাদীছের পাঁচটি পৃথক শব্দের রিওয়ায়াত এসেছে, أعفوا ‘দাড়ি বাড়াও’, أوفوا ‘পূর্ণ করো’, أرخوا ‘ছেড়ে দাও أرجوا ’বাড়তে দাও’ এবং وفِّروا ‘ঘন করো’। এ সকল শব্দের অর্থ একইÑ দাড়িকে তার স্বাভাবিক অবস্থায় থাকতে দেয়া। এটাই হাদীছের স্পষ্ট অর্থ, যা তার শব্দাবলী দাবি করে। আমাদের মাযহাবের আলিমগণসহ অন্যান্য বহু আলিমও তাই বলেছেন। আর সঠিক মত হল- দাড়িকে তার স্বাভাবিক অবস্থায় থাকতে দেয়া এবং একেবারেই কিছু কমানো বা ছোট করা থেকে বিরত থাকা’। উপরিউক্ত আলোচনা থেকে পরিস্ফুটিত হল যে, যারা বলে থাকে, ‘দাড়ির দৈর্ঘ্য গুরুত্বপূর্ণ নয়, বরং পরিচর্যা ও পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা গুরুত্বপূর্ণ’Ñ তাদের এই কথা সুন্নাহর বিরোধী। কেননা সুন্নাহ দাড়ি বাড়িয়ে দেয়া ও তা অবিকৃত রাখার নির্দেশ দিয়েছে। সুতরাং মুসলিমের জন্য উভয় বিষয়ই যরূরী, দাড়ি বৃদ্ধি করা এবং তা থেকে কিছু না কাটা, একইসাথে তার যত্ন ও পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা রক্ষা করা। অতএব, যে মুসলিম তার দ্বীনের ব্যাপারে সতর্ক এবং রাসূল (ﷺ)-এর পূর্ণ অনুসরণ কামনা করে, তার উচিত এ ধরনের কথার প্রতি কর্ণপাত না করা, যা শরী’আতের সুস্পষ্ট দলীলের বিরোধিতা করে। আল্লাহই সর্বজ্ঞ’।[৯]
সুতরাং দাড়ি কামানো পাপ হওয়ার পাশাপাশি পুরুষত্বকে অস্বীকার করা এবং নারী ও তরুণ ছেলেদের অনুকরণ করা, এবং কাফিরদের অনুকরণ করা। যেমন নবী (ﷺ) বলেছেন, ‘তোমরা মুশরিকদের উল্টো করবে: দাড়ি লম্বা রাখবে, গোঁফ ছোট করবে’।[১০] দাড়ি কামানো মানে আল্লাহর সৃষ্টিকে পরিবর্তন করার নামান্তর। আল্লাহ তা‘আলা বলেছেন,
فِطْرَتَ اللّٰهِ الَّتِيْ فَطَرَ النَّاسَ عَلَيْهَا١ؕ لَا تَبْدِيْلَ لِخَلْقِ اللّٰهِ١ؕ ذٰلِكَ الدِّيْنُ الْقَيِّمُ١ۙۗ وَ لٰكِنَّ اَكْثَرَ النَّاسِ لَا يَعْلَمُوْنَۗۙ
‘আল্লাহর ফিত্বরাত (স্বাভাবিক রীতি বা দ্বীন ইসলাম), যার উপর (চলার যোগ্য করে) তিনি মানুষ সৃষ্টি করেছেন, আল্লাহর সৃষ্টির কোন পরিবর্তন নেই। এটাই প্রতিষ্ঠিত দ্বীন, কিন্তু অধিকাংশ মানুষ জানে না’ (সূরা আর-রূম : ৩০)। পক্ষান্তরে আল্লাহ তা‘আলা শয়তান সম্পর্কে বর্ণনা করে বলেছেন,
وَّ لَاُضِلَّنَّهُمْ۠ وَ لَاُمَنِّيَنَّهُمْ وَ لَاٰمُرَنَّهُمْ فَلَيُبَتِّكُنَّ۠ اٰذَانَ الْاَنْعَامِ وَ لَاٰمُرَنَّهُمْ فَلَيُغَيِّرُنَّ۠ خَلْقَ اللّٰهِ١ؕ وَ مَنْ يَّتَّخِذِ الشَّيْطٰنَ وَلِيًّا مِّنْ دُوْنِ اللّٰهِ فَقَدْ خَسِرَ خُسْرَانًا مُّبِيْنًاؕ
‘আমি অবশ্যই তাদেরকে পথভ্রষ্ট করব; অবশ্যই তাদের হৃদয়ে মিথ্যা বাসনার সৃষ্টি করব, আর অবশ্যই আমি তাদেরকে নির্দেশ দেব, ফলে তারা পশুর কান ছিদ্র করবে। আর অবশ্যই তাদেরকে নির্দেশ দেব, ফলে তারা আল্লাহর সৃষ্টি বিকৃত করবে। আর আল্লাহর পরিবর্তে কেউ শয়তানকে অভিভাবকরূপে গ্রহণ করলে সে স্পষ্টতঃই ক্ষতিগ্রস্ত হয়’ (সূরা আন-নিসা : ১১৯)। হাদীছে এসেছে,
عَنْ عَبْدِ اللهِ قَالَ: لَعَنَ اللهُ الْوَاشِمَاتِ وَالْمُوْتَشِمَاتِ وَالْمُتَنَمِّصَاتِ وَالْمُتَفَلِّجَاتِ لِلْحُسْنِ الْمُغَيِّرَاتِ خَلْقَ اللهِ
আব্দুল্লাহ (রাযিয়াল্লাহু আনহুমা) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, আল্লাহ লা‘নত করেছেন ঐ সমস্ত নারীর প্রতি যারা অন্যের শরীরে উল্কি অংকণ করে, নিজ শরীরে উল্কি অংকণ করায়, যারা সৌন্দর্য বৃদ্ধির জন্য ভূরুর লোম অপসারিত করে ও দাঁতের মাঝে ফাঁক সৃষ্টি করে। সে সব নারী আল্লাহর সৃষ্টিতে বিকৃতি আনয়ন করে।[১১]
অতএব, নবীগণ, খালীফাগণ বা হিদায়াতের পথ প্রদর্শনকারী ইমামদের জীবনীতে কেউই দাড়ি কামানোর কথা জানাননি। যারা তাদের অবাধ্যতা করছে, তার মানে এই যে, তারা তাদের পথ ছাড়া অন্য পথ অনুসরণ করছে। আল্লাহ তা‘আলা বলেন,
وَ مَنْ يُّشَاقِقِ الرَّسُوْلَ مِنْۢ بَعْدِ مَا تَبَيَّنَ لَهُ الْهُدٰى وَ يَتَّبِعْ غَيْرَ سَبِيْلِ الْمُؤْمِنِيْنَ نُوَلِّهٖ مَا تَوَلّٰى وَ نُصْلِهٖ جَهَنَّمَ١ؕ وَ سَآءَتْ مَصِيْرًاؒ
‘আর কারো নিকট সৎপথ প্রকাশ হওয়ার পর সে যদি রাসূলের বিরুদ্ধাচরণ করে এবং মুমিনদের পথ ব্যতীত অন্য পথ অনুসরণ করে, তবে যেদিকে সে ফিরে যায় সে দিকেই তাকে আমরা ফিরিয়ে দেব এবং তাকে জাহান্নামে দগ্ধ করাব, আর তা কতই না মন্দ আবাস’ (সূরা আন-নিসা : ১১৫)।
সুতরাং এটা স্পষ্ট যে, দাড়ি কামানো নিষিদ্ধ। কারণ এটি দাড়ি বৃদ্ধি করা এবং বৃদ্ধি করতে দেয়া সম্পর্কে নবীর আদেশের বিরোধী কাজ। নিশ্চিতরূপে এই বিধানটি স্থির এবং নির্দিষ্ট কোন যুগ বা অন্য কোন যুগের জন্য নির্দিষ্ট নয়।
(ইনশাআল্লাহ চলবে)
* মুর্শিদাবাদ, ভারত।
তথ্যসূত্র :
[১]. ছহীহ বুখারী, হা/৭২৮৮; ছহীহ মুসলিম, হা/১৩৩৭।
[২]. ছহীহ বুখারী, হা/৬৭, ১০৫, ১৭৪১, ৩১৯৭, ৪৪০৬, ৪৬৬২, ৫৫৫০, ৭০৭৮, ৭৪৪৭; ছহীহ মুসলিম, হা/১৬৭৯; মুসনাদে আহমাদ, হা/২০৪০৮।
[৩]. ছহীহ বুখারী, হা/৫৮৯২, ৫৮৯৩; ছহীহ মুসলিম, হা/২৫৯।
[৪]. ফাতাওয়া আল-লাজনা আদ-দায়িমাহ, ৫ম খণ্ড, পৃ. ১৩৭।
[৫]. মাজমূঊ ফাতাওয়া ইবনে বায, ১০ম খণ্ড, পৃ. ৯৬-৯৭।
[৬]. মাজমূঊ ফাতাওয়া ওয়া রাসাইল লি ইবনে উছাইমীন, ১১শ খণ্ড, পৃ. ৮২।
[৭]. ছহীহ বুখারী, হা/৫৮৯২, ৫৮৯৩; ছহীহ মুসলিম, হা/২৫৯।
[৮]. ফাৎহুল বারী শারহুল ছহীহ বুখারী, ১০ম খণ্ড, পৃ. ৩৫০।
[৯]. ইসলাম সাওয়াল ওয়া জাওয়াব, ফৎওয়া নং ১৪৫৫১২।
[১০]. ছহীহ বুখারী, হা/৫৮৯২, ৫৮৯৩; ছহীহ মুসলিম, হা/২৫৯।
[১১]. ছহীহ বুখারী, হা/৪৮৮৬, ৫৯৩৯; ছহীহ মুসলিম, হা/২১২৫; আবু দাঊদ, হা/৪১৬৯; ইবনে মাজাহ, হা/১৬৩১।