রবিবার, ১১ অক্টোবর ২০২৬, ০৫:১৭ পূর্বাহ্ন

সূরা আল-ফাতিহা ও জাদু 

- শায়খ আব্দুল গাফফার মাদানী* 



মানুষের জীবনে এমন কিছু বিপদ আছে, যার আঘাত শরীরে প্রকাশ পায়; আবার এমন কিছু বিপদ আছে, যার অস্তিত্ব অনুভূত হয়, কিন্তু যার কারণ ও প্রকৃতি সাধারণ দৃষ্টিতে সহজে ধরা পড়ে না। জাদু সেই অদৃশ্য বিপদগুলোর অন্যতম—যার উল্লেখ কুরআন ও ছহীহ সুন্নাহতে এসেছে এবং যার ক্ষতি থেকে বেঁচে থাকা ও প্রতিকার গ্রহণের জন্য শরী‘আতসম্মত পথনির্দেশও রয়েছে। কিন্তু জাদুর চিকিৎসার আলোচনা উঠলেই মুসলিম সমাজে দু’টি বিপরীত প্রবণতা চোখে পড়ে। একদল জাদুকে কেন্দ্র করে এমন সব আমল, সংখ্যা, মন্ত্র ও পদ্ধতি প্রচলন করে, যেগুলোর শরী‘আতসম্মত ভিত্তি অনুসন্ধান করলে অনেক ক্ষেত্রেই তা পাওয়া যায় না। অন্যদিকে কেউ কেউ জাদুর মত অদৃশ্য বিষয়ের চিকিৎসায় কুরআনের আয়াত ও শরী‘আতসম্মত রুকইয়ার ভূমিকা নিয়েই সংশয় প্রকাশ করেন। ফলে প্রয়োজন হয় আবেগের নয়, দলীলের আলোকে একটি মধ্যপন্থী ও সুসংহত পর্যালোচনা। কুরআন ও সুন্নাহ তার প্রকৃতি, ক্ষতিকর প্রভাব এবং তা থেকে আত্মরক্ষার পথ সম্পর্কে সুস্পষ্ট দিকনির্দেশনা দিয়েছে। আল্লাহ তা‘আলা বলেন, وَ مَا ہُمۡ  بِضَآرِّیۡنَ بِہٖ مِنۡ اَحَدٍ  اِلَّا بِاِذۡنِ اللّٰہِ ‘আল্লাহর অনুমতি ছাড়া তারা এর মাধ্যমে কারও কোন ক্ষতি করতে পারে না’ (সূরা আল-বাক্বারাহ : ১০২)। এই আয়াত মুমিনের হৃদয়ে এক গভীর সত্য প্রোথিত করে—জাদু যতই ভয়ংকর হোক, তার ক্ষমতা সীমাহীন নয়; অদৃশ্য জগতের কোন শক্তিই আল্লাহর ইচ্ছা ও অনুমতির বাইরে নয়। তাই বিপদ-আপদে মুমিনের আশ্রয় কোন জাদুকর, গণক, তান্ত্রিক কিংবা রহস্যময় পদ্ধতির কাছে নয়; তার আশ্রয় সর্বশক্তিমান আল্লাহর কাছে এবং তাঁর নাজিলকৃত কালামের মধ্যে। আল্লাহ তা‘আলা কুরআন সম্পর্কে ঘোষণা করেছেন, *

وَ نُنَزِّلُ مِنَ الۡقُرۡاٰنِ مَا ہُوَ شِفَآءٌ وَّ رَحۡمَۃٌ  لِّلۡمُؤۡمِنِیۡنَ

‘আমি কুরআনে এমন বিষয় নাযিল করি, যা মুমিনদের জন্য শিফা ও রহমত’ (সূরা বানী ইসরাঈল : ৮২)।

আর এই মহিমান্বিত কুরআনের সূচনায় রয়েছে এমন এক সূরা, যার মর্যাদা ও তাৎপর্য অনন্য, সেটা হল- সূরা আল-ফাতিহা। এটি শুধু কুরআনের প্রথম সূরা নয়; এটি উম্মুল কিতাব, ছালাতের অপরিহার্য অংশ এবং বান্দা ও তার রবের মধ্যে সম্পর্কের এক অনুপম প্রার্থনা। এর প্রতিটি আয়াতে রয়েছে তাওহীদের শিক্ষা, আল্লাহর প্রশংসা, তাঁর ওপর নির্ভরতা, একমাত্র তাঁর কাছেই সাহায্য প্রার্থনা এবং সরল পথের জন্য আকুল আবেদন। ফাতিহার এই অনন্য মর্যাদা আরও উজ্জ্বল হয়ে ওঠে রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর যুগের একটি বিস্ময়কর ঘটনায়। এক ছাহাবী বিষাক্ত প্রাণীর দংশনে আক্রান্ত এক ব্যক্তির ওপর সূরা আল-ফাতিহা পাঠ করে রুকইয়া করলেন। আল্লাহর ইচ্ছায় সে ব্যক্তি সুস্থ হয়ে গেল। ঘটনাটি রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর কাছে পৌঁছালে তিনি সেই রুকইয়াকে প্রত্যাখ্যান করেননি; বরং বললেন,

وَمَا أَدْرَاكَ أَنَّهَا رُقْيَةٌ؟

‘তুমি কীভাবে জানলে যে, এটি রুকইয়া?’[১] এ হাদীছ সূরা ফাতিহার রুকইয়া হিসাবে গ্রহণযোগ্যতার একটি সুস্পষ্ট ও শক্তিশালী ভিত্তি প্রতিষ্ঠা করে। তবে এখানেই একটি সূক্ষ্ম বিষয় রয়েছে, যা না বুঝলে আলোচনাটি সহজেই অতিরঞ্জন কিংবা ভুল ধারণার দিকে চলে যেতে পারে। হাদীছে ‘ফাতিহা’ দ্বারা রুকইয়ার কথা প্রমাণিত হয়েছে; কিন্তু ফাতিহাকে বিশেষভাবে ‘জাদু কাটানোর জন্য নির্ধারিত সূরা’ হিসাবে উল্লেখ করা হয়নি। তাই জাদুর চিকিৎসায় ফাতিহার ব্যবহারকে বুঝতে হলে সাধারণ রুকইয়ার প্রমাণ, জাদুর শরী‘আতসম্মত চিকিৎসা এবং নির্দিষ্ট আমলের জন্য দলীলের প্রয়োজন; এই তিনটি বিষয়কে পৃথকভাবে বিবেচনা করা যরূরী। কারণ দ্বীনের কোন আমল সম্পর্কে কথা বলার ক্ষেত্রে শুধু অভিজ্ঞতা, প্রচলিত রীতি কিংবা মানুষের মুখে মুখে চলে আসা কথা যথেষ্ট নয়; কোন্টি সরাসরি কুরআন-সুন্নাহ দ্বারা প্রমাণিত, কোন্টি সাধারণ শরী‘আতসম্মত মূলনীতির অন্তর্ভুক্ত এবং কোন্টি প্রমাণ ছাড়া মানুষের মধ্যে প্রচলিত— এই পার্থক্যটিই একজন মুমিনের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।

সুতরাং সূরা আল-ফাতিহা ও জাদুর চিকিৎসার সম্পর্ক নিয়ে আলোচনায় আমাদের লক্ষ্য হবে না ফাতিহার মর্যাদাকে অতিরঞ্জিত করা, আর না এর রুকইয়ার বৈধতাকে অস্বীকার করা। বরং কুরআন, ছহীহ সুন্নাহ এবং নির্ভরযোগ্য আলেমদের ব্যাখ্যার আলোকে ফাতিহার রুকইয়া হিসাবে প্রমাণ, জাদুর সঙ্গে এর সম্পর্ক, জাদু আক্রান্ত ব্যক্তির ওপর এর ব্যবহার, প্রমাণিত অন্যান্য রুকইয়া এবং এ বিষয়ে প্রচলিত ভুল ধারণাগুলোকে সুস্পষ্টভাবে পৃথক করে একটি ভারসাম্যপূর্ণ ও দলীলভিত্তিক চিত্র তুলে ধরাই হবে এই আলোচনার উদ্দেশ্য।

জাদুর বাস্তবতা

ইসলাম জাদুর অস্তিত্বকে নিছক কুসংস্কার হিসাবে প্রত্যাখ্যান করেনি। আল্লাহ তা‘আলা বলেন,

وَ مَا یُعَلِّمٰنِ مِنۡ اَحَدٍ حَتّٰی یَقُوۡلَاۤ اِنَّمَا نَحۡنُ فِتۡنَۃٌ فَلَا تَکۡفُرۡ ؕ فَیَتَعَلَّمُوۡنَ مِنۡہُمَا مَا یُفَرِّقُوۡنَ بِہٖ بَیۡنَ الۡمَرۡءِ  وَ زَوۡجِہٖ

‘তারা কাউকে শিক্ষা দিত না, যতক্ষণ না বলত— আমরা তো ফিতনা বা পরীক্ষা; অতএব তুমি কুফরি করো না। এরপর তারা তাদের কাছ থেকে এমন বিষয় শিখত, যার মাধ্যমে স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে বিচ্ছেদ ঘটাত’ (সূরা আল-বাক্বারাহ : ১০২)। তবে একই আয়াতে আল্লাহ একটি গুরুত্বপূর্ণ আক্বীদাগত সত্যও ঘোষণা করেছেন। তিনি বলেছেন,

وَ مَا ہُمۡ  بِضَآرِّیۡنَ بِہٖ مِنۡ اَحَدٍ  اِلَّا بِاِذۡنِ اللّٰہِ

‘জাদুর নিজস্ব কোন স্বাধীন ক্ষমতা নেই; আল্লাহর অনুমতি ছাড়া তা কারও ক্ষতি করতে পারে না। এটাই মুমিনের প্রথম নিরাপত্তা।

এক্ষেত্রে জাদুর সঙ্গে ফাতিহার সম্পর্কটি বুঝতে হবে। এখানে দু’টি বিষয় এক করে ফেলা যাবে না।

প্রথম বিষয়: ফাতিহা দ্বারা রুকইয়া করা সুন্নাহ কর্তৃক প্রমাণিত। দ্বিতীয় বিষয়: ফাতিহা বিশেষভাবে ‘জাদু কাটানোর জন্য’ নির্ধারিত— এমন কোন ছহীহ হাদীছ নেই। অতএব, সঠিক বক্তব্য হবে— জাদু আক্রান্ত ব্যক্তির ওপর সূরা ফাতিহা পড়ে রুকইয়া করা বৈধ; কারণ ফাতিহা রুকইয়া হিসাবে ছহীহ হাদীছে প্রমাণিত। কিন্তু ফাতিহাকে জাদু নষ্ট করার জন্য বিশেষভাবে নির্ধারিত আমল বলা যাবে না, যতক্ষণ না তার পক্ষে পৃথক শরী‘আতসম্মত দলীল পাওয়া যায়।

ফাতিহা রুকইয়ার জন্য এত গুরুত্বপূর্ণ কেন?

সূরা ফাতিহা শুধু সাতটি আয়াতের একটি সূরা নয়; এর মধ্যে রয়েছে ঈমান, তাওহীদ, ইবাদত, তাওয়াক্কুল, সাহায্য প্রার্থনা ও হিদায়াতের পূর্ণ আবেদন। যেমন:

ক. আল্লাহর রুবূবিয়্যাতের ঘোষণা : মহান আল্লাহ বলেন, اَلۡحَمۡدُ لِلّٰہِ رَبِّ الۡعٰلَمِیۡنَ  সমস্ত প্রশংসা আল্লাহর, যিনি সমগ্র জগতের প্রতিপালক’। জাদু যতই ভয়ংকর মনে হোক, জগতের প্রকৃত মালিক আল্লাহ।

খ. একমাত্র আল্লাহর কাছে সাহায্য চাওয়া : মহান আল্লাহ বলেন, اِیَّاکَ نَسۡتَعِیۡنُ وَ ‘আমরা একমাত্র আপনারই সাহায্য প্রার্থনা করি’। রুকইয়ার প্রাণ হল- সাহায্য কেবল আল্লাহর কাছ থেকেই চাওয়া।

গ. একমাত্র আল্লাহর ইবাদত করা : মহান আল্লাহ বলেন, اِیَّاکَ نَعۡبُدُ ‘আমরা একমাত্র তোমারই ইবাদত করি’। জাদুর চিকিৎসার নামে যেন মানুষ শিরক, তাবীয, গণক কিংবা জাদুকরের দ্বারস্থ না হয়, ফাতিহার এই তাওহীদী শিক্ষা তাকে সঠিক পথে রাখে।

ঘ. সরল পথের প্রার্থনা : মহান আল্লাহ বলেন, اِہۡدِ نَا الصِّرَاطَ الۡمُسۡتَقِیۡمَ ‘আমাদের সরল পথ দেখান’। অর্থাৎ রুকইয়া শুধু রোগমুক্তির আকাঙ্ক্ষা নয়; বরং আল্লাহর দিকে ফিরে যাওয়ারও একটি সুযোগ।

ইবনুল ক্বাইয়িম (রাহিমাহুল্লাহ)-এর দৃষ্টিতে সূরা ফাতিহার শিফা

তিনি তাঁর প্রসিদ্ধ গ্রন্থ ‘মাদারিজুস সালিকীন’-এ সূরা ফাতিহার দু’টি গুরুত্বপূর্ণ শিফার কথা উল্লেখ করেছেন। যথা: (১) অন্তরের রোগের শিফা এবং (২) দেহের রোগের শিফা। প্রথমে তিনি ফাতিহার অন্তর্নিহিত আধ্যাত্মিক শিফা সম্পর্কে আলোচনা করেন। তাঁর মতে, মানুষের অন্তরের রোগ মূলত জ্ঞান ও বিশ্বাসের বিকৃতি এবং ইচ্ছা ও উদ্দেশ্যের বিকৃতির দিকে ফিরে যায়। সূরা ফাতিহার মধ্যে সঠিক জ্ঞান, তাওহীদ, ইবাদত, আল্লাহর ওপর নির্ভরতা এবং সরল পথের হিদায়াতের আবেদন থাকায় এটি অন্তরের এসব রোগের চিকিৎসার উপযোগী। এরপর তিনি বলেন,

وَأَمَّا تَضَمُّنُهَا لِشِفَاءِ الْأَبْدَانِ، فَنَذْكُرُ مِنْهُ مَا جَاءَتْ بِهِ السُّنَّةُ، وَمَا شَهِدَتْ بِهِ قَوَاعِدُ الطِّبِّ، وَدَلَّتْ عَلَيْهِ التَّجْرِبَةُ

‘আর দেহের রোগ নিরাময়ের ক্ষেত্রে ফাতিহার যে শিফাগত বৈশিষ্ট্য রয়েছে, তার কিছু দৃষ্টান্ত আমরা উল্লেখ করব, যা সুন্নাহ দ্বারা প্রমাণিত, চিকিৎসাবিজ্ঞানের নীতিমালা দ্বারা সমর্থিত এবং অভিজ্ঞতার মাধ্যমেও প্রতীয়মান হয়েছে’। অতঃপর তিনি উপরে বর্ণিত সূরা ফাতিহা দ্বারা রুকইয়া করা সম্পর্কিত হাদীছটি উল্লেখ করেন এবং বলেন যে,

فَقَدْ تَضَمَّنَ هَذَا الْحَدِيثُ حُصُولَ شِفَاءِ هَذَا اللَّدِيغِ بِقِرَاءَةِ الْفَاتِحَةِ عَلَيْهِ، فَأَغْنَتْهُ عَنِ الدَّوَاءِ، وَرُبَّمَا بَلَغَتْ مِنْ شِفَائِهِ مَا لَمْ يَبْلُغْهُ الدَّوَاءُ

‘এই হাদীছে প্রমাণিত হয়েছে যে, আক্রান্ত ব্যক্তির ওপর সূরা ফাতিহা পাঠ করার মাধ্যমে তার শিফা লাভ হয়েছিল; ফলে তা তাকে ওষুধের প্রয়োজন থেকে মুক্ত করেছিল। এমনও হতে পারে যে, এর মাধ্যমে এমন শিফা অর্জিত হয়েছিল, যা কোন ওষুধের মাধ্যমে অর্জিত হয়নি’।[২] আর তাঁর নিজের অভিজ্ঞতার অংশটি একই আলোচনায় পরবর্তীতে এসেছে। তিনি মক্কায় অবস্থানকালে ব্যথার স্থানে ফাতিহা পড়ে উপকার পাওয়া এবং জমজমের পানিতে ফাতিহা পড়ে পান করার অভিজ্ঞতাও উল্লেখ করেছেন।

জাদুর চিকিৎসায় ফাতিহার পাশাপাশি আর কী পড়া যায়

শরী‘আতসম্মত রুকইয়ার ক্ষেত্রে কুরআনের বিভিন্ন আয়াত ও সূরা পড়া যায়। বিশেষত—সূরা আল-ফাতিহা, আয়াতুল কুরসি (আল-বাকারা: ২৫৫), সূরা আল-ইখলাছ, সূরা আল-ফালাক্ব, সূরা আন-নাস। জাদুর প্রসঙ্গে সূরা আল-ফালাক্ব ও আন-নাসের গুরুত্ব বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। কারণ উভয় সূরাতেই বিভিন্ন অশুভতা ও অনিষ্ট থেকে আল্লাহর আশ্রয় প্রার্থনা করা হয়েছে।

ফাতিহার নির্দিষ্ট সংখ্যা নির্ধারণ করা যাবে কি

এখানেও সতর্ক থাকা প্রয়োজন। কেউ যদি বলে, ‘জাদু কাটানোর জন্য ফাতিহা অবশ্যই ৭ বার পড়তে হবে’, অথবা ‘৪১ বার পড়তেই হবে’, অথবা ‘৩১৩ বার পড়লে জাদু নিশ্চিতভাবে চলে যাবে’, তাহলে এই নির্দিষ্ট সংখ্যা ও নির্দিষ্ট ফলাফলের জন্য দলীল প্রয়োজন। অথচ ছহীহ হাদীছে ফাতিহা রুকইয়া হিসাবে প্রমাণিত; কিন্তু জাদু নষ্ট করার জন্য নির্দিষ্ট সংখ্যায় ফাতিহা পড়ার কোন ছহীহ নছ জানা যায় না। তাই সাধারণ রুকইয়া করা এক বিষয়, আর দলীল ছাড়া নির্দিষ্ট সংখ্যা ও পদ্ধতিকে শরী‘আত নির্ধারিত আমল মনে করা আরেক বিষয়।

শিফার প্রকৃত মালিক কে?

এটি পুরো আলোচনার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আক্বীদাগত দিক। ফাতিহা পড়া হচ্ছে কিন্তু শিফা দিচ্ছেন কে? আল্লাহ। আল্লাহ তা‘আলা ইবরাহীম (আলাইহিস সালাম)-এর ভাষা পবিত্র কুরআনে উল্লেখ করেছেন। তিনি বলেন,

وَ  اِذَا  مَرِضۡتُ  فَہُوَ  یَشۡفِیۡنِ

‘আমি যখন অসুস্থ হই, তখন তিনিই আমাকে সুস্থ করেন’ (সূরা আশ-শু‘আরা: ৮০)। সুতরাং ফাতিহা শিফার একটি শরী‘আতসম্মত মাধ্যম। কিন্তু শিফাদাতা ফাতিহা নয় বরং শিফাদাতা একমাত্র আল্লাহ।

বিশেষ সতর্কতা

জাদুর চিকিৎসার নামে যেসব কাজ থেকে বেঁচে থাকা যরূরী, তাহল- জাদু আক্রান্ত ব্যক্তির দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে অনেকেই শরী‘আয়তের নামে নানা কুসংস্কার ও শিরকী পদ্ধতি প্রচলন করে। মুমিনকে অবশ্যই সতর্ক থাকতে হবে। যেমন— গণক বা জাদুকরের কাছে যাওয়া; জিনের কাছে সাহায্য চাওয়া; অজানা মন্ত্র ব্যবহার করা; তাবীয-কবচের ওপর নির্ভর করা; শরী‘আতসম্মত প্রমাণ ছাড়া বিশেষ সংখ্যা বা বিশেষ পদ্ধতিকে আবশ্যক মনে করা; রোগীর গায়ে অশোভন বা শয়ী‘আবিরোধী আচরণ করা; জাদুর চিকিৎসার নামে মানুষকে ভয় দেখিয়ে অর্থ উপার্জন করা। রুকইয়া যতই ‘চিকিৎসা’ হোক, তা কখনো শরী‘আতের সীমার বাইরে যেতে পারে না।

পরিশেষে বলতে চাই, জাদুর অন্ধকার যতই গভীর হোক, মুমিনের জন্য তা কখনোই আল্লাহর কালামের ঊর্ধ্বে নয়। তবে কুরআনের কোন সূরা বা আয়াতকে এমন কোন অলৌকিক সূত্রে পরিণত করাও ইসলামের শিক্ষা নয়, যার সঙ্গে দলীলের সম্পর্ক নেই। ফাতিহার শক্তি তার অজানা কোন গোপন মন্ত্রে নয়; বরং তার প্রতিটি শব্দের অন্তর্নিহিত তাওহীদ, বান্দার রবের প্রতি পূর্ণ নির্ভরতা এবং আল্লাহর কাছে আশ্রয় প্রার্থনার মধ্যেই নিহিত। এ কারণেই ফাতিহার রুকইয়া নিছক একটি পাঠ নয়; এটি এক ধরনের ঈমানী প্রত্যাবর্তন— অসহায় বান্দার সর্বশক্তিমান রবের দিকে ফিরে আসা। সে পড়ে, দু‘আ করে, রুকইয়া করে; কিন্তু তার অন্তর কোন পাঠের ওপর নির্ভর করে না, নির্ভর করে সেই সত্তার ওপর, যার অনুমতি ছাড়া কোন ক্ষতিই কাউকে স্পর্শ করতে পারে না। সুতরাং এ আলোচনার শেষ কথা হল- ফাতিহাকে তার প্রমাণিত মর্যাদায় রাখুন, তার ওপর এমন কিছু আরোপ করবেন না, যা শরী‘আত বলেনি; আর শিফার প্রত্যাশা রাখুন একমাত্র আল্লাহর কাছে। কারণ কুরআনের আয়াত বান্দার হাতে একটি আমল, কিন্তু শিফার ফয়সালা একমাত্র আল্লাহর হাতে। এটাই ফাতিহার প্রতি যথার্থ সম্মান, রুকইয়ার ক্ষেত্রে যথার্থ ভারসাম্য এবং তাওহীদের দাবী।


* শিক্ষক, আল-জামি‘আহ আস-সালাফিয়্যাহ, ডাঙ্গীপাড়া, রাজশাহী।

তথ্যসূত্র :
[১]. ছহীহ বুখারী, হা/৫৭৩৬; ছহীহ মুসলিম, হা/২২০১।
[২]. মাদারিজুস সালিকীন, ১ম খণ্ড (বৈরূত: দারুল কিতাবিল ‘আরাবী, ৩য় সংস্করণ, ১৪১৬ হি./১৯৯৬ খ্রি.)  পৃ. ৭৮-৭৯।





প্রসঙ্গসমূহ »: আমল তারবিয়াত
রামাযানের শেষ দশকের গুরুত্ব ও করণীয় - মাইনুল ইসলাম মঈন
ইসলামী উত্তরাধিকার আইন: উৎপত্তি ও ক্রমবিকাশ ধারা (২য় কিস্তি) - ড. মোহাম্মদ হেদায়েত উল্লাহ
বিদ‘আত পরিচিতি (১৬তম কিস্তি) - ড. মুহাম্মাদ বযলুর রহমান
সূদ-ঘুষ ও অবৈধ ব্যবসা (৬ষ্ঠ কিস্তি) - ড. ইমামুদ্দীন বিন আব্দুল বাছীর
ইখলাছ বিহীন আমল ও তার পরিণতি - আব্দুল গাফফার মাদানী
তরুণদের বিদ্রোহ, বিক্ষোভ ও সন্ত্রাসবাদ থেকে সতর্কীকরণ (৫ম কিস্তি) - মাসঊদুর রহমান
কুরআন ও সুন্নাহকে আঁকড়ে ধরা (২য় কিস্তি) - অনুবাদ : হাফীযুর রহমান বিন দিলজার হোসাইন
যাদুটোনার শারঈ সমাধান (শেষ কিস্তি) - মাসঊদুর রহমান
মাতুরীদী মতবাদ ও তাদের ভ্রান্ত আক্বীদাসমূহ (৭ম কিস্তি) - আব্দুল্লাহ বিন আব্দুর রহীম
রামাযানের খুঁটিনাটি - আল-ইখলাছ ডেস্ক
সুন্নাতের আলো বিদ‘আতের অন্ধকার - অনুবাদ : হাফীযুর রহমান বিন দিলজার হোসাইন
যমযমের ইতিহাস ও ফযীলত - ড. ইমামুদ্দীন বিন আব্দুল বাছীর

ফেসবুক পেজ