শাহ ওয়ালীউল্লাহ মুহাদ্দিছ দেহলভী: মুসলিম বিশ্বে তার অবদান
- ড. মুকাররম বিন মুহসিন মাদানী*
(৩য় কিস্তি)
খ. শাহ ওয়ালীউল্লাহর জীবন পরিক্রমা
❖ শৈশব
ইমাম শাহ ওয়ালীউল্লাহ মুহাদ্দিছ দেহলভী কাল প্রবাহে একটি বিস্ময়ের নাম। স্মৃতির প্রখরতা, জ্ঞানের গভীরতা, চিন্তার বিশালতা, চারিত্রিক দৃঢ়তা, অটুট সততা আর বিশাল পর্বত সম হিম্মতের এক মূর্ত প্রতীক এই মহাপুরুষ। তিনি ইলমে হাদীছের এক বিজয়ী সম্রাট। তার সংকলিত ও রচিত কুরআন-সুন্নাহর মহামূল্যবান কিতাবগুলোর মাধ্যমে কিয়ামত পর্যন্ত সমগ্র মুসলিম উম্মাহ উপকৃত হবে। সমকালীন মুহাদ্দিছদের ইমাম, হাফেযে কুরআন শাহ ওয়ালীউল্লাহ ভারতের দিল্লীতে অবস্থিত ফুলতে[১] ৪ শাওয়াল ১১১৪ হিজরী মোতাবেক ১৭০৩ সালের ২১ ফেব্রুয়ারী সূর্যোদয়ের সময় জন্মগ্রহণ করেন। শাহ ওয়ালীউল্লাহ’র যখন পাঁচ বছর বয়স, তখন তাকে মক্তবে ভর্তি করা হয়। সাত বছর বয়সে সুন্নতী ইবরাহীমী তথা খাতনা সম্পন্ন করা হয়। সে বয়স থেকেই ছালাত আদায়ের অভ্যাস গড়ে তোলা হয়। এই শৈশবেই তিনি কুরআনুল কারীমের হিফয শেষ করেন। এরপর তিনি ফারসী কিতাবাদি ও আরবীর ছোট ছোট কিতাবাদি পড়তে শুরু করেন। এই বয়সেই পিতামাতার সাথে তাহজ্জুদ ছালাতে শরিক হন। আর দু’হাত তুলে আল্লাহর দরবারে দু‘আও করতেন মাত্র এই সাত বছর বয়সেই।[২]
জ্ঞান-বিজ্ঞানের বিভিন্ন শাখার প্রতি শৈশব থেকেই শাহ ওয়ালীউল্লাহর আগ্রহ ছিল ভীষণ। প্রাথমিক পর্যায়ে দিল্লীতে তাঁর পিতা শাহ আব্দুর রহীম কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত মাদরাসায় তিনি প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা ও আধ্যাত্মিক দিকনির্দেশনা লাভ করেন। মাত্র ১৫ বছর বয়সেই পিতার প্রতিষ্ঠিত দিল্লীতে মাদরাসা রহীমিয়াতে পিতার অধীনে শিক্ষক হিসাবে কর্মজীবন শুরু করেন। একই বছর পিতার মৃত্যুর পর ১৭১৮ সালে পিতার স্থলাভিষিক্ত হিসাবে মাদরাসার প্রধানের দায়িত্বভার গ্রহণ করেন। এভাবে তিনি সেখানে দীর্ঘ ১২ বছর কাটিয়ে দেন। ব্যাতিক্রম বিষয় ছিল তিনি প্রধান শিক্ষক হিসাবে দারস এবং দায়িত্ব পালন করলেও ছাত্রত্ব থেকে দূরে ছিলেন না; বরং পূর্বের ন্যায় তিনি তার পড়া-শোনা নিয়মিত চালিয়ে যেতেন। স্বল্প বয়সে মুহতামিম ও শিক্ষক হিসাবে কৃতিত্বের স্বাক্ষর রাখেন আবার ছাত্র হিসাবেও তার জ্ঞান আরো বৃদ্ধি পেতে থাকে।
❖ নাম, জন্ম ও বংশ পরিচয়
নাম কুতুবুদ্দীন আহমাদ ইবনু আব্দুর রহীম। আরবীতে قطب الدين أحمد ابن عبد الرحيم বলে। ভারত উপমহাদেশের একজন ইসলামী পণ্ডিত, সংস্কারক এবং আধুনিক ইসলামী চিন্তার একজন প্রতিষ্ঠাতা কুতুবুদ্দীন আহমাদকে ‘শাহ ওয়ালীউল্লাহ’ও বলা হয়। অবশ্য ‘শাহ ওয়ালীউল্লাহ’ উপাধিতেই তিনি বেশি পরিচিতি লাভ করেন। মোঘল সম্রাট আওরঙ্গজেবের মৃত্যুর মাত্র চার বছর পূর্বে ১১১৪ হিজরী মোতাবেক ১৭০৩ খৃষ্টাব্দে দিল্লীর এক ঐতিহাসিক ও সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন।
তার বংশ পরম্পরা বলা যায় এভাবে- কুতুবুদ্দীন আহমাদ ইবন (২) আব্দুর রহীম ফারূকী ওরফে শাহ ওয়ালীউল্লাহ আহমাদ ইবন (২) আব্দুর রহীম ইবন (৩) শহীদ আজীহুদ্দীন ইবন (৪) মু‘আযযাম ইবন (৫) আহমাদ ইবন (৬) মুহাম্মাদ ইবন (৭) ক্বাউওয়ামুদ্দীন ওরফে ক্বাযী ক্বাযেন ইবন (৮) ক্বাসেম ইবন (৯) ক্বাযী কবরীরুদ্দীন ওরফে ক্বাযী বুধ ইবন (১০) আব্দুল মালেক ইবন (১১) কুতুবুদ্দীন ইবন (১২) কামালুদ্দীন ইবন (১৩) শামসুদ্দীন মুফতী ইবন (১৪) শের মালেক ইবন (১৫) মুহাম্মাদ আবদে মালেক ইবন (১৬) ফৎহ মালেক ইবন (১৭) মুহাম্মাদ ওমর হাকেম মালেক ইবন (১৮) আদেল মালেক ইবন (১৯) ফারূক ইবন (২০) বারজীস ইবন (২১) আহমাদ ইবন (২২) মুহাম্মাদ শাহরিয়ার ইবন (২৩) ওছমান ইবন (২৪) হামান ইবন (২৫) হুমায়ূন ইবন (২৬) কুরাইশ ইবন (২৭) সুলায়মান ইবন (২৮) আফ্ফান ইবন (২৯) আব্দুল্লাহ ইবন (৩০) মুহাম্মাদ ইবন (৩১) আব্দুল্লাহ ইবন (৩২) ওমর ইবনুল খাত্ত্বাব (রাযিয়াল্লাহু আনহুম)।
ওয়ালীউল্লাহ পরিবারের সুখ্যাতি ও সুনাম নিয়ে নওয়াব ছিদ্দীক হাসান খান ভূপালী (১২৪৮-১৩৭০ হি./১৮৩৩-১৮৯০ খৃ.) এর চমৎকার একটি মন্তব্য পাওয়া যায়। তিনি বলেন,
وكلهم كانوا علماء نجباء حكماء فقهاء كأسلافهم وأعمامهم كيف وهم من بيت العلم الشريف والنسب الفاروقي المنيف
‘তাদের সকলে ছিলেন চাচা ও পূর্বসূরীদের ন্যায় বিদ্বান, উচ্চ সম্মানিত, প্রজ্ঞাবান ও ফক্বীহ। আর কেনইবা হবে না? তারা তো ছিলেন উঁচু ইলমী পরিবারের সন্তান এবং ভদ্র ফারূক্বী বংশের উত্তরসূরী’।[৩] সপ্তম হিজরী শতকের শেষে অষ্টম হিজরী শতকের প্রথমভাগে ভারতবর্ষে আগমন করেন এই বংশের সর্বপ্রথম ব্যক্তি শামসুদ্দীন মুফতী। তিনি রুহিতক[৪] নামক স্থানে এসে বসতি স্থাপন করেন। যখন তাতারীদের আক্রমণে মুসলিমবিশ্বের পূর্বাঞ্চল তছনছ, বংশ-পরিবারগুলোর ইজ্জত-সম্মান ভূলুণ্ঠিত হচ্ছিল। ‘তারীখে ফিরোজশাহী’র ইতিহাস অনুযায়ী এ যুগেই ইরাক-ইরান ও তুর্কিস্তানে অভিজাত পরিবার এবং জ্ঞানী-গুণী সম্প্রদায়গুলো ব্যাপকহারে ভারতবর্ষে আগমন করেন।[৫]
অবশ্য তাতারদের ইতিহাসে আমাদের জন্য বহু শিক্ষা রয়েছে। মহান আল্লাহ ইতিহাস পাঠের গুরুত্ব বর্ণনা করে বলেন, ‘নিশ্চয় তাদের কাহিনীতে জ্ঞানীদের জন্য শিক্ষণীয় বিষয়সমূহ রয়েছে’।[৬] তিনি আরো বলেন, ‘অতএব এদের কাহিনী বর্ণনা কর যাতে তারা চিন্তা করে’।[৭] পৃথিবীর ইতিহাসে মানুষ যত ধ্বংসলীলা চালিয়েছে তার সব কিছুকে ছাড়িয়ে যাবে তাতারদের ধ্বংসযজ্ঞ। বাগদাদ ধ্বংসকে কেন্দ্র করে বহু কাব্য রচিত হয়েছে। কেউবা গেয়েছেন শোকগাঁথা। রচিত হয়েছে অনেক ইতিহাস গ্রন্থ। কিন্তু এর ভয়াবহতা এত তীব্র ছিল যে, কেউ তার পরিসমাপ্তি টানতে পারেননি। বাদশাহ বখতে নছর বায়তুল মাকদাস ধ্বংস ও তার অধিবাসী বনু ইসরাঈলদের হত্যা করেছিলেন। কিন্তু বাগদাদ ধ্বংসের সাথে তার তুলনা হবে না। দাজ্জাল পৃথিবীতে এসে মানুষ হত্যা করবে। কিন্তু তার অনুসারীদের রেহাই দিবে। পক্ষান্তরে তাতার এমন এক রক্তপিপাসু জাতি ছিল, যারা নারী-পুরুষ ও শিশু সবাইকে হত্যা করেছে। এমনকি গর্ভবতী নারীদের গর্ভপাত ঘটিয়ে ভ্রুণকেও হত্যা করেছে।[৮]
অনেক ঐতিহাসিক তাদের ধ্বংসযজ্ঞকে ই’য়াজূজ-মা’জূজের ধ্বংসলীলার সাথে তুলনা করেছেন। তারা ছিল সূরে্যর পূজারী। তারা কুকুর-শূকরসহ সকল প্রাণীর গোশত খেত। তাদের বৈবাহিক কোন ভিত্তি ছিল না। ফলে নারী-পুরুষ যে যাকে ইচ্ছা ভোগ করত। সন্তানদের কোন পরিচয় ছিল না।[৯] এ কারণে হয়তো তারা এত হিংস্র ছিল। তাদের নারী সৈন্যরাও শত শত মানুষকে হত্যা করত। তাদের যুদ্ধ কৌশল দেখে লোকেরা তাদেরকে পুরুষ মনে করত।[১০] তাতারদের অপকর্মের বর্ণনা দিয়ে ইবনু তায়মিয়া (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন, একদা আমি তাতারদের শাসন আমলে কতিপয় সাথীসহ তাদের পাশ দিয়ে যাচ্ছিলাম। তখন তারা মদ পান করছিল। আমার সঙ্গী-সাথীরা তাদেরকে তিরস্কার করল। আমি সাথীদের ধমক দিয়ে বললাম, আল্লাহ তো এজন্য মদ হারাম করেছেন যে, এটা আল্লাহর যিকির ও ছালাত আদায়ে বাধা দেয়। আর মদ এ সকল লোককে মানব হত্যা, সন্তানদের বন্দি ও সম্পদ লুণ্ঠন থেকে বিরত রেখেছে।[১১] এই তাতাররা পরবর্তীতে ইসলাম গ্রহণ করে এবং তাদের অনেকে ইসলামের খিদমতে নিজেদের নিয়োজিত করে।
তাতার জাতি তুর্কি জাতিগোষ্ঠির অন্তর্ভুক্ত একটি উপজাতি। যারা প্রধানত ইউরোপ ও এশিয়ায় বসবাস করে। প্রাথমিকভাবে তাতার নৃতাত্ত্বিক না। এটা খুব সম্ভবত তাতার কনফেডারেশনে উল্লেখ করা হয়েছিল, যেই কনফেডারেশনটি মঙ্গোলীয় সম্রাট চেঙ্গিজ খান বিভিন্ন উপজাতিকে একীভূত করার সময়ে মঙ্গোল সাম্রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত করেন। ঐতিহাসিকভাবে ‘তাতার’ শব্দটি উত্তর ও মধ্য এশিয়ার বিস্তীর্ণ ভূমি থেকে উদ্ভুত যেকোন ব্যক্তির জন্য প্রযোজ্য হতো, যা তখন ‘টারটারি’ শব্দে পরিচিত ছিল। তবে সাম্প্রতিককালে এই শব্দটি আরো সংকীর্ণভাবে সম্পর্কিত জাতিগত গোষ্ঠিগুলোর জন্য ব্যবহৃত হয়। যারা নিজেদের তাতার হিসাবে ব্যক্ত করে বা সাধারণ তাতারি ভাষা হিসাবে উল্লেখ করা হয়-এমন ভাষায় কথা বলে। তাতাররা ১২০০ সালে মঙ্গোলীয় মালভূমিতে বসবাসকারী পাঁচটি প্রধান উপজাতির মধ্যে অন্যতম ছিল। চেঙ্গিস খান ১২০৬ সালে মঙ্গোল সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠা করে তাতার জাতিভুক্ত লোকদের বশ করতে সক্ষম হয়। তার নেতৃত্বে তার পৌত্র বাতু খান (১২০৭-১২৫৫ খৃ.) তাতারদের আরো পশ্চিমে রুশ সমভূমির দিকে সরে যেতে বাধ্য করে। মঙ্গোল ও হাজারাদের মধ্যে এখনো তাতার অধ্যুষিত অনেক গোত্রের সন্ধান পাওয়া যায়। রুশ এবং ইউরোপীয়রা বর্তমানও মঙ্গোল ও তাদের শাসনভুক্ত তুর্কীয় জাতিগোষ্ঠী বুঝাতে তাতার শব্দটি ব্যবহার করে। এছাড়া পূর্বে তাতার বলতে ইউক্রেনীয়, তুর্কি ও বুলগার মুসলিমদের উত্তরসূরীদের বুঝাতে ব্যবহৃত হতো।
যাইহোক, বংশগতভাবেও শাহ ওয়ালীউল্লাহ (রাহিমাহুল্লাহ) ছিলেন সম্ভ্রান্ত ও উঁচু বংশের। শাহ ছাহেবের দাদা ছিলেন শায়খ ওয়াজিহুদ্দীন শহীদ। শাহাদাতের তামান্না সর্বদা নিজের মধ্যে লালন করে রেখেছিলেন এবং এর জন্য ইসলামের শত্রুদের সাথে যেকোন বিষয়ে মোকাবেলা করতে কোন সময় ভয় পেতেন না। শাহ আব্দুর রহীম (রাহিমাহুল্লাহ) পিতা ওয়াজিহুদ্দীন সম্পর্কে বলেছেন, আমার আব্বাজান এক রাতে তাহাজ্জুদ পড়ছিলেন। এক সিজদায় এতো দীর্ঘসময় কপাল মাটিতে লুটিয়ে রাখেন, মনে হত তার প্রাণবায়ু বেরিয়ে গেছে। এর কারণ আমি জিজ্ঞেস করেছিলাম। আব্বা বললেন, মনে হচ্ছে আমি হারিয়ে গিয়েছিলাম, তাতে শহীদের মর্যাদা ও প্রতিদানের অবস্থা জেনেছি। তাতে মহান আল্লাহর কাছে শাহাদাতের আকাঙ্ক্ষা মনে হয় কবুল হয়েছিল। ইসলাম ও মুসলিমদের শত্রু ডাকাতরা মানুষের জান-মালের ক্ষতিসাধনে ব্যস্ত থাকত। তিনি তাদের মোকাবেলা করতে গিয়েই শহীদ হন। ২০ জনের একটি ডাকাত দল শায়খ ওয়াজিহুদ্দীনকে টার্গেট করেই তার উপর আক্রমণ করে। ফলে একে একে বাইশটি আঘাত তাকে সহ্য করতে হয়। শেষ আঘাতে তার দেহ থেকে মাথা বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। তিনি উঠে দাঁড়ানোর চেষ্টা করেছেন এবং কাফিরদের তাড়াও করেছেন। এ সময় তার মুখ থেকে দীর্ঘ সময় তাকবীর চলতে থাকে। তাকবীর চলাবস্থায় এক স্থানে গিয়ে নিথর হয়ে পড়ে যান এবং প্রাণবায়ু উড়ে যায়।[১২]
অনুরূপভাবে শাহ ওয়ালীউল্লাহর নানাও ছিলেন একজন বিজ্ঞ আলেম শায়খ মুহাম্মদ ফুলতী (রাহিমাহুল্লাহ)। তার জীবনী নিয়ে শাহ ওয়ালীউল্লাহ (রাহিমাহুল্লাহ) নিজেই একটি জীবনবৃত্তান্ত লিখে যান। যার নাম দেন العطية الصمدية في أنفاس المحمدية।[১৩] নানার বংশের প্রাথমিক স্থান ছিল সাদুধর, যা বর্তমানে ভারতের উত্তর প্রদেশের বারাবাঙ্কি জেলায় অবস্থিত। শৈশব থেকেই তিনি ছিলেন নেককার ও সমসাময়িক বুযুর্গানেদীন। শাহ ওয়ালীউল্লাহর নানা শেখ মুহাম্মাদ ফুলতী প্রাথমিক শিক্ষা নেন শাহ সাহেবের চাচা শায়খ আবু রেজা মুহাম্মাদ ইবনে ওয়াজিহুদ্দীন এর নিকট। বদান্যতা, আত্মত্যাগ ও দুনিয়াবিমুখতায় ছিলেন তিনি উচ্চপর্যায়ে। শাহ ওয়ালীউল্লাহ (রাহিমাহুল্লাহ) তাঁর নানা ও পিতার মাঝের নিগূঢ় সম্পর্কের কথা একাধিক স্থানে লিখেছেন। নানা মুহাম্মাদ ফুলতি শাহ ওয়ালীউল্লাহর দাদা শ্বশূর। কারণ শায়খ মুহাম্মাদের পুত্র উবাইদুল্লাহ শাহ সাহেবের মামা এবং শ্বশূর। শায়েখ মুহাম্মাদ ফুলতী এর ইন্তেকাল হয় ৮ জমাদিউস সানী ১১২৫ হিজরী সালে।
তার চাচা শায়খ আবু রেযা মুহাম্মাদও ছিলেন বিজ্ঞ জ্ঞানী ব্যক্তি। যাকে ‘ইমামুত তরীকত ওয়াল হাকীকত’ এর মত উচ্চাঙ্গের উপাধিতে ভূষিত করা হত এ বিষয়ে স্পষ্ট ধারণা ও জ্ঞান থাকার কারণেই। শাহ ওয়ালীউল্লাহ (রাহিমাহুল্লাহ) নিজ চাচা সম্পর্কে লিখতে গিয়ে লিখেছেন, قوي العلم، فصيح اللسان، عظيم الورع، وسيع المعرفة ‘তথা বিজ্ঞ জ্ঞানী, প্রাঞ্জলভাষী, বাগ্মী, বিরাট সংযমী ও প্রখ্যাত ব্যক্তিত্ত্ব’। তিনি আরো বলেন, ‘আমার চাচা ছিলেন ওয়াহদাতুল ওজূদের প্রবক্তা এবং এ বিষয়ে বিশেষজ্ঞ, ছূফীদের কাছে মালফুজাতের সঠিক ব্যাখ্যা তুলে ধরতেন। তাঁর জীবনে ঘটে যাওয়া অনেক ঘটনার পর তিনি আল্লাহর কাছে দু‘আ চাইলে মহান আল্লাহ তা কবুল করতেন। অতি পরহেযগার শেখ মুহাম্মাদ মিতাচারী পসন্দ করতেন, মানুষের সমসাময়িক কোন সমস্যা নিয়ে কুরআন-সুন্নাহ রিসার্চ করে সাধারণ মানুষকে পতিত বিপদ থেকে উদ্ধার করার চেষ্টা করতেন। তিনি সাধারণত জুমু‘আর খুতবা দিতেন না। কারণ খুতবার মত এ মহান পেশার ক্ষেত্রে তিনি নিজেকে অযোগ্য মনে করতেন। বৃষ্টিপ্রার্থনার ছালাত, মহামারী থেকে মুক্তি, জাতীয় সঙ্কটকালে দু‘আ করে তিনি সে দু‘আর ফল পেয়েছেন। তাইতো সেসময় (মুসতাজাবুদ দাওয়াহ) বা দু‘আ কবুল হওয়া ব্যক্তি হিসাবে পরিচিত পেয়েছিলেন। সুন্নাত পরিপালনে অতি যত্নশীল শায়খ আবু রেজা মুহাম্মাদ মাত্র পঞ্চাশ-ষাট বছরের মাঝামাঝি বয়সেই ১৭ মহররম ১১০১ হিজরী সালে আসর ছালাতের পর তিনি পরপারে যাত্রা করেন।[১৪]
পিতা শাহ আব্দুর রহীম সম্পর্কে শাহ ওয়ালীউল্লাহ (রাহিমাহুল্লাহ) তাঁর লিখিত গ্রন্থ ‘বাওয়ারিকুল বিলাইয়্যাহ’-তে পিতার অবস্থা, যোগ্যতা, পূর্ণতা ও কারামত সম্পর্কে দীর্ঘ আলোচনা করেছেন। একজন যোগ্য পুত্রের কলমে একজন যোগ্য পিতার জীবন-চরিত নিয়ে ঐতিহাসিক দৃষ্টিকোণ এবং দায়িত্বশীলতার সাথে পৃথক একটি গ্রন্থ রচনার খুব একটা দৃষ্টান্ত পাওয়া যায় না। এ গ্রন্থে বেশিরভাগ সেসব অবস্থা ও ঘটনা চয়ন করা হয়, যাতে তার ব্যক্তিত্ব ফুটে ওঠে, যেগুলোর দ্বারা তার শিক্ষাগত, ধর্মীয় ও আধ্যাত্মিক অবস্থার অনুমান করা যায়। উঁচু স্তরের বুযুর্গ শায়েখ রফিউদ্দীন (রাহিমাহুল্লাহ)-এর মেয়ের ঘরের নাতী ছিলেন শাহ আব্দুর রহীম। তাঁর জন্মসন সুস্পষ্টভাবে কোথাও পাওয়া যায় না। তবে যেহেতু তিনি ১১৩১ হিজরী সনে ইনতিকাল করেছেন এবং মৃত্যুকালে ৭৭ বছর বয়স হয়েছিল, তাই বুঝা যায় তার জন্মসন ১০৫৪ হিজরীই হবে।[১৫] শাহ ওয়ালীউল্লাহ বলেন, আব্বাজান অধিকাংশ বিষয়ে হানাফী মাযহাবের অনুসারী হলেও হাদীছ অনুসারে ফিকহকে মূল্যায়ন করতেন। যেমন ইমামের পিছনে সূরা ফাতিহা পাঠ, জানাযার ছালাতে সূরা ফাতিহা পাঠ ছিল অন্যতম।[১৬]
শাহ আব্দুর রহীম (রাহিমাহুল্লাহ) ছিলেন বিখ্যাত ‘ফতোয়ায়ে আলগমীরী’ সংকলনকারী আলেমদের অন্তর্ভুক্ত। এ দলের দিকনির্দেশক বা চেয়ারম্যান ছিলেন শায়েখ নিযামুদ্দীন বোরহানপুরী। সম্রাট আওরঙ্গজেব এ প্রকল্পে দুই লাখ রুপিয়া ব্যয় করেছেন। ‘আছ-ছাক্বাফাতুল ইসলামিয়া ফিল হিন্দ’-এর রচয়িতা গভীর তত্ত্বানুসন্ধান ও গবেষণার পর এসব সংকলকের নাম লিপিবদ্ধ করেছেন। তাদের সংখ্যা দাঁড়ায় একুশজনে। শাহ আব্দুর রহীম ছিলেন এ দলের অন্যতম সদস্য।[১৭] এ ফতোয়া লিখতে গিয়ে শাহ আব্দুর রহীম তার সাহসিকতার পরিচয়ও দিয়েছেন। চেয়ারম্যান মোল্লা নিযাম ও মোল্লা হামীদের লিখায় বিষয়বস্তু পরিবর্তন হলে তিনি বাদশার সামনে পেশকৃত পাণ্ডলিপিতে লিখে দেন- من لم يتفقه فى الدين قد خلط فيه هذا غلط وصوابه كذا ‘দ্বীন সম্পর্কে গভীর জ্ঞান না থাকার ফলে লেখক থেকে আলোচ্য বিষয়টি এলোমেলো হয়ে গেছে। সঠিক হচ্ছে এরূপ...’।[১৮] ‘আলকাওলুল জামীল’ গ্রন্থ থেকে জানা যায়, তাঁর সম্মানিত মাতার নাম ছিল ফখরুন নিসা। তিনিও ধর্মীয় বিষয়ে জ্ঞানী ছিলেন। শাহ ওয়ালীউল্লাহর জন্মের পূর্বে তিনি স্বপ্নে দেখেছিলেন সন্তানের নাম কুতুবুদ্দীন আহমাদ রাখার ব্যাপারে। প্রথমে নাম রাখা হয় ওয়ালীউল্লাহ। স্বপ্নের কথা খেয়াল হলে দ্বিতীয় বার পুনরায় তার নাম রাখা হয় কুতুবুদ্দীন আহমাদ।[১৯]
❖ শিক্ষা জীবন
মাত্র ৭ বছর বয়সে শাহ ওয়ালীউল্লাহ পবিত্র কুরআনের হাফেয হন। তিনি কুরআনের পাশাপাশি আরবী, ফারসী ভাষা ও সাহিত্য এবং উচ্চস্তরের দর্শন, ধর্মতত্ত্ব, অধিবিদ্যা, অতীন্দ্রিয়তা ও আইনশাস্ত্রের উপর পাঠ নেন। বলা যায় নবী ইবরাহীম (আলাইহিস সালাম)-এর মত ওয়ালীউল্লাহর নিঃসন্তান পিতা আল্লামা শাহ আব্দুর রহীম এর ৬০ বছর পার হওয়ার পরে দ্বিতীয় স্ত্রী ফখরুন নিসার গর্ভে শাহ ওয়ালীউল্লাহ, আহলুল্লাহ ও হাবীবুল্লাহ নামে পর পর তিনটি পুত্র সন্তান জন্ম লাভ করে। বাবার বড় সন্তান ওয়ালীউল্লাহ ১০ বছর বয়সে শরহে জামী শেষ করে পিতার নিকটে ফিক্বহ, উছূলে ফিক্বহ, তাফসীর বায়যাভী, আক্বাইদ, মানতিক, মিশকাত ও অন্যান্য কিতাবসমূহ পড়তে শুরু করেন। এ সময় তাঁর অন্যান্য উস্তাদগণের মধ্যে মুহাম্মাদ আফযাল শিয়ালকোটি, আফদুল্লাহ মাক্কী, তাজুদ্দীন মাক্কী প্রমুখের নাম উল্লেখযোগ্য।
শাহ ওয়ালীউল্লাহ মুহাদ্দিছ দেহলভী (রাহিমাহুল্লাহ) তাঁর লিখিত গ্রন্থ ‘আল-জুযউল লাতীফ’ এ তার পঠিত পাঠ্যসূচির একটি বর্ণনা দিয়েছেন। তাতে বুঝা যায় তিনি ফিকহ্, উছূলে ফিকহ, মানতিক, আত্মশুদ্ধি, হকীকত, খাওয়াসসে আসমা, আল-ফাওয়ায়িদুল মিয়াহ এবং আয়াত সম্পর্কিত বিভিন্ন বিষয়বস্তুর উপরে প্রচুর বই পড়া-শোনা করেছেন। তাছাড়াও চিকিৎসাশাস্ত্রে, দর্শনশাস্ত্রে, মা‘আনীশাস্ত্রে এবং গণিতশাস্ত্রেও তিনি বিভিন্ন বই পড়েছেন। শাহ ওয়ালীউল্লাহর প্রকৃত উসতায হলেন পিতা শাহ আব্দুর রহীম। পিতাই এসব পাঠ্যসূচি সন্তানের জন্য তৈরি করে দিতেন সময়/যুগের চাহিদা মোতাবেক। ইজতেহাদী জ্ঞানের অধিকারী পিতা আব্দুর রহীম সন্তানের জন্য যা উপকারী ও ফলদায়ক হয়, সেসকল বিষয়বস্তুই নির্ধারণ করে দিতেন। তারই পরিপ্রেক্ষিতে মুলতান থেকে দিল্লীতে আগত শায়খ আব্দুল্লাহ ও শায়েখ আযীযুল্লাহ‘র সুবাদে ইলমে কালাম, বালাগাত ও মা‘কুলাতের বিভিন্ন কিতাব পড়ারও সুযোগ হয়। এক্ষেত্রে ইরানের বিদগ্ধ গবেষক মীর সদরুদ্দীন শিরাজী, গিয়াসুদ্দীন মানসূর ও মির্জা জানের রচনাবলী উল্লেখযোগ্য।[২০] ১৫ বছর বয়সে তিনি সম্মানিত পিতার কাছে মিশকাতের সবক নেন, যার কিছু অংশ ছাড়া পুরোটাই শেষ করে দেন। পিতার কাছেই ছহীহ বুখারীর ‘কিতাবুত তাহারাত’ পর্যন্ত পড়েন, ‘শামায়েলে তিরমিযী’ পরিপূর্ণ, ‘তাফসীরে মাদারিক’ ও বায়যাভীর কিছু অংশ পড়েছেন। এ বিষয়ে তিনি বলেন, ‘আল্লাহর বিরাট এক নে‘মত হলো, আব্বাজানের কুরআনের সবকে কয়েকবার শরীক হয়েছি। যাতে কুরআনের মর্মের অপর এক দরজা খুলে গিয়েছে’।
শাহ ওয়ালীউল্লাহর বর্ণিত পাঠ্যসূচিতে আরবী সাহিত্যের কোনো কিতাব দৃষ্টিগোচর হয় না। অথচ শাহ ছাহেবের আরবী রচনাবলি বিশেষত হুজ্জাতুল্লাহিল বালিগাহ সাক্ষ্য দেয় যে, তার আরবী ভাষা এবং আরবীতে লেখনী ও রচনার শুধু প্রতিভূ ক্ষমতাই ছিল না, বরং হুজ্জাতুল্লাহিল বালিগাহ সম্পর্কে যতদূর জানা যায়, তিনি এক্ষেত্রে এমন এক ধারা ও রচনাশৈলীর উদ্ভাবক, যা শিক্ষামূলক প্রতিপাদ্য ও উদ্দেশ্য বর্ণনার জন্য অতীব ভারসাম্যপূর্ণ পদ্ধতি, যেখানে আল্লামা ইবনে খালদূনের পরে তার সমতুল্য ও সমপর্যায়ের দ্বিতীয় কাউকে দেখা যায় না। এতে বোঝা যায়, শাহ ওয়ালীউল্লাহ নিজেই আরবী সাহিত্য ও গদ্য-পদ্যের সেসব প্রাচীন উচ্চাঙ্গের কিতাব অধ্যয়ন করেছেন, যা ছিল বাগ্মিতা ও মধুরতার নমুনা, অনারব আরবী শব্দ থেকে অনেকটাই সংরক্ষিত।[২১]
জ্ঞানার্জনের জন্য আরব গমন
মাত্র ত্রিশ বছর বয়সে শাহ ওয়ালীউল্লাহ দেহলভী হজ্জ সফরে হারামাইনের দিকে রওনা দেন। সেসময়কার রজনৈতিক অবস্থা, পথঘাটের নিরাপত্তা পরিস্থিতি, কিছু বিদেশী শক্তির আগ্রাসন, স্থল ও সমুদ্রপথের নানা বিপদাশঙ্কা ও ডাকাতির ভয় থাকার পরও এই সফর তার উচ্চ সাহস, ইলম পিপাসা এবং হারামাইনের সাথে তার ঐকান্তিক ইচ্ছারই জ্বলন্ত প্রমাণ। হজ্জ ছাড়া জ্ঞানের প্রতিও কুতুবুদ্দীন আহমাদের নেশা ছিল অনেক বেশী। তাই তো শিক্ষক এবং মাদরাসার প্রধান হওয়া সত্ত্বেও এগুলো ছেড়ে দিয়ে তিনি জ্ঞানার্জনের জন্য হেজাজে গমন করেন। কর্মজীবন হলেও তিনি নিজেকে শিক্ষার্থী ভেবে জীবনের এক পর্যায়ে হাদীছ শাস্ত্রে অধিক জ্ঞান অর্জনের গুরুত্ব উপলব্ধি করেন। সে লক্ষ্যে ১১৪৩ হিজরী মোতাবেক ১৭২৪ সালে তিনি প্রথমে হজ্জ পালনের জন্য মক্কায় গমন করেন। তিনি সুরাট থেকে জিদ্দা পৌঁছান ৪৫ দিনে। ১৫ জিলকদে মক্কা মুকাররামায় প্রবেশ করেন। সেখানে গিয়েই ওলামায়ে কেরাম ও তালিবে ইলমদের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে মসজিদে হারামে মুছাল্লায়ে হানাফীর পাশে দরস শুরু করেন।[২২] এরপর হেজাজে ২ বছর অবস্থান করে আবূ তাহের ইবন ইবরাহীম আল-কুর্দি আল-মাদানীর (মৃত ১১৪৫ হি.) মত পণ্ডিতদের কাছে হাদীছ, ফিক্বহ শিক্ষা লাভ করেন। বুখারীর উস্তাদ হিসাবে খ্যাতিমান ও অভিজ্ঞ আবূ তাহের আল-কুর্দির কাছে তিনি ছহীহ বুখারীর দারস নেন। একই সময়ে তিনি মুসলিম বিশ্বের আরো বিভিন্ন প্রান্তের লোকের সংস্পর্শে আসেন এবং বিভিন্ন মুসলিম দেশের অবস্থা সম্পর্কে সম্যক জ্ঞান লাভ করেন। অর্জিত এ সকল অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে তিনি ‘ফুয়ূদ আল-হারামাইন’ নামক বিখ্যাত গ্রন্থ রচনা করেন। ১৭৩২ খৃষ্টাব্দে তিনি পুনরায় দিল্লীতে ফিরে আসেন এবং মৃত্যুর আগ পর্যন্ত জীবেনর বাকি সময় এখানেই তাঁর লিখালিখি ও কর্ম তৎপরতা অব্যাহত রাখেন।
আরবদেশে শিক্ষার্জনের সাথে সাথে হজ্জ পালন এবং সেখান থেকে পুরো মুসলিম বিশ্বকে আয়নার মত দেখতে চেয়েছিলেন শাহ ওয়ালীউল্লাহ (রাহিমাহুল্লাহ)। কারণ প্রতিবছর মুসলিমবিশ্বের উঁচুমানের শিক্ষিত ব্যক্তিবর্গ, হারামাইনের ইমাম ও খত্বীব, ওলামায়ে কেরাম অনেকেই এখানে তাশরীফ আনতেন। বিশেষ করে মদিনা মুনাওয়ারা ইলমে হাদীছের প্রাণকেন্দ্ররূপে গড়ে উঠেছিল। যেখানে পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্ত থেকে ইলম পীপাসুরা সমবেত হত। সেখানে বসে বিভিন্নমুখী ইলমের সহযোগিতায় খুব সহজেই পুরো মুসলিমবিশ্বের অবস্থা পর্যবেক্ষণ করা যেত। সেখানকার বিভিন্ন ব্যক্তিত্ব, মনীষী, সংস্কারমূলক আন্দোলন, দাওয়াতী কার্যক্রম এবং বিচ্ছিন্নতা সৃষ্টিকারী অপতৎপরতা ও ষড়যন্ত্র সম্পর্কে সম্যক ধারণা পাওয়া যেত। শাহ ওয়ালীউল্লাহ দেহলভীর মত দরদী মানুষ, যাকে আল্লাহর অসীম কুদরত ও দ্বীন পুনর্জীবিত করার মহান কাজের জন্য তৈরি করেছিলেন, নিশ্চয় এ মহান সফরে তিনি উপকৃত ও প্রভাবিত হয়েছিলেন। ১১৪৩ ও ১১৪৪ হিজরীতে পরপর দু’বার হজ্জ করে ১১৪৫ হিজরীর প্রথম দিকে ভারত রওয়ানা হন এবং ১০ রজব ১১৪৫ হিজরী শুক্রবার সুস্থ ও নিরাপদে নিজের আবাসস্থল দিল্লীতে প্রত্যাবর্তন করেন।[২৩] অবশ্য তিনি انسان العين في مشايخ الحرمين ‘ইনসানুল ‘আইন ফী মাশায়িখিল হারামাইন’ নামে একটি পুস্তকও রচনা করেন। সেখানে বিশেষ করে তার খাছ শায়েখ ও প্রিয় উসতাদ শায়েখ আবূ তাহের মুহাম্মাদ ইবনে ইবরাহীম আল-কুর্দী আল-মাদানীর বিস্তারিত পরিচিত তুলে ধরেছেন।[২৪]
(ইনশাআল্লাহ চলবে)
* প্রিন্সিপ্যাল, দারুল হুদা ইসলামী কমপ্লেক্স, বাঘা, রাজশাহী।
তথ্যসূত্র :
[১]. ফুলত- ভারতের একটি স্থানের নাম, যার বর্তমান নাম মুযাফফরনগর।
[২]. সৌভাগ্যবশত শাহ ওয়ালীউল্লাহর কলম দ্বারা সংক্ষিপ্তভাবে আপন জীবনের গুরুত্বের অবস্থাদি, তা‘লীম ও তা‘লীমী নিসাব পিতার তা‘লীম-তারবিয়ার বিশেষ ধরন-পদ্ধতি, বায়‘আত ও ইজাযত, হিজায সফর এবং সেখানকার মাশায়েখ থেকে ইসতিফাদা, তাদের পরিচিত ও আলোচনা এবং জীবনের গুরুত্বপূর্ণ ঘটনাবলি সংরক্ষিত হয়ে গেছে। সেসব তথ্য-উপাত্তের দু’টি বিরাট উৎস الجزء اللطيف في ترجمة العبد الضعيف ও انسان العين في مشائخ الحرمين। শাহ ওয়ালীউল্লাহর জীবনের সংক্ষিপ্ত অবস্থাদি এই কিতাব الجزء اللطيف থেকে উদ্ধৃত হয়েছে। কোনো কোনো স্থানে القول الجلي থেকে সাহায্য নেওয়া হয়েছে।
[৩]. সিদ্দীক ইবন হাসান আল-কানূজী, আবজাদুল ‘উলূম, ৩য় খণ্ড (দামিস্ক : ওয়াযারাতুছ ছাকাফাহ ওয়াল ইরশাদ আল-ক্বওমী, দারুল কুতুব আল-‘ইলমিয়্যাহ, ১৩৯৮ হি./১৯৭৮ খৃ.), পৃ. ২৪৩।
[৪]. শাহ সাহেবের বর্ণনা দ্বারা বুঝা যায় রুহিতক সেসময়কার নতুন ইসলামী রাজত্বের গুরুত্বপূর্ণ একটি শহর এবং পশ্চিমা দেশ থেকে দিল্লী আগমনকারী ইসলামী সেনাবাহিনী, মুজাহিদ, ইসলামের দায়ীগণ, মাশায়েখ ও ওলামায়েকেরামের দিল্লীর পথে গুরুত্বপূর্ণ একটি মনযিল ও বিশ্রামস্থল ছিল।
[৫]. তারীখে দাওয়াত ও আযীমাত, তদেব, ৩/১৯-২১ পৃ.।
[৬]. আল-কুরআন, সূরা ইউসূফ ১১১।
[৭]. আল-কুরআন, সূরা আ‘রাফ ১৭৬।
[৮]. আবুল হাসান আলী ইবন আবিল কারাম মুহাম্মাদ ইবন মুহাম্মাদ ইবন আব্দিল কারীম শায়বানী ইবনুল আছীর, আল-কামিল ফিত তারিখ, (বৈরুত: দারুল কুতুব আল-ইলমিইয়্যাহ, ১৪২৪ হি./২০০৩ খৃ.), খণ্ড ১০, পৃ. ৩৩৩।
[৯]. তদেব, খণ্ড ১০, পৃ. ৩৩৫।
[১০]. তদেব, খণ্ড ১০, পৃ. ৩৪৮।
[১১]. ইবন কাইউম আল-জাওযী, ইলামুল মুয়াক্কিয়িন, ৩/১৫ পৃ.; সফিউর রহমান মুবারকপুরী, আর-রাহীকুল মাখতূম (রিয়াদ: দারুস সালাম, ১৯৯৪ খৃ.), ১/৩৪ পৃ.।
[১২]. সংগ্রামী সাধকদের ইতিহাস, ৫ম খণ্ড, পৃ ৭০-৭৩।
[১৩]. শায়খ আব্দুল আযীয ইবন শাহ ওয়ালীউল্লাহ, মাজমু‘আ রাসায়েল (জর্ডান: দারুন নুরুল মুবীন লিদ দিরাসাতি ওয়ান নাশর, ১৪৩৪ হি./২০১৩ খৃ.), পৃ. ১২৭।
[১৪]. শাহ ওয়ালীউল্লাহ মুহাদ্দিছ দেহলভী, আনফাসুল আরিফীন (দিল্লী : প্রকাশনা সংস্থা বিহীন, ১৩১৫ হি./১৮৯৭ খৃ.), পৃ. ৮৬-৮৯।
[১৫]. তদেব, পৃ. ৮৫।
[১৬]. মাজমু‘আ রাসায়েল, পৃ. ১/৩৬।
[১৭]. সাইয়েদ আব্দুল হাই হাসানী রহ., আসসাকাফাতুল ইসলামিয়া ফিল হিন্দ (কায়রো : মুওয়াসসাতু হানদাবী লিত তা‘লীম ওয়াছ ছাকাফা, ১৪৩৩ হি./২০১২ খৃ.), পৃ. ১১১।
[১৮]. শাহ ওয়ালীউল্লাহ মুহাদ্দিছ দেহলভী, আনফাসুল আরিফীন (দিল্লী : প্রকাশনা সংস্থা বিহীন, ১৩১৫ হি./১৮৯৭ খৃ.), পৃ. ২৪।
[১৯]. শাহ ওয়ালীউল্লাহ দেহলভী, আলকাওলুল জামীল ফী বায়ানি সাওয়াইস সাবীল (বৈরুত: দারুল জাওদিইয়্যা, ১৪৩১ হিজরী/২০১০ খৃ.), পৃ. ২৭।
[২০]. শাহ ওয়ালীউল্লাহ দেহলভী, আল-জুযউল লতীফ, পৃ. ৩।
[২১]. সাইয়েদ আবুল হাসান আলী নদভী, সংগ্রামী সাধকদের ইতিহাস, অনু: শাহ আব্দুল হালীম হুসাইনী (ঢাকা : মাকতাবাতুল হেরা, ১৪৪১ হিজরী/২০২০ খৃ.), পঞ্চম খণ্ড, পৃ. ৮৭-৮৯।
[২২]. আল-কাওলুল জামীল, পূর্বোক্ত পৃ. ২৫।
[২৩]. আল-জুজউল লতীফ, পূর্বোক্ত পৃ. ৫।
[২৪]. মুহাম্মাদ মুহসিন ইবন ইয়াহইয়া আল-বিকরি আত-তাইমী আত-তিরহুতী, আল-ইয়ানিউ’ আল-জানিইয়ি মিন আসানীদিশ শাইখ আব্দুল গানি (আম্মান : আরওয়াকাহ লিদ দিরাসাতি ওয়ান নাশর, ১৪৩৭ হি./২০১৬ খৃ.),। পৃ. ১৩৩।