আর্তমানবতার সেবায় বাংলাদেশ জমঈয়তে আহলে হাদীস
বাংলাদেশ নদীমাতৃক দেশ। এই ভূখণ্ডে মানুষের জীবন যেমন নদীর সঙ্গে নিবিড়ভাবে জড়িত, তেমনি বন্যাও এ দেশের এক নির্মম বাস্তবতা। প্রায় প্রতি বছরই দেশের কোনো না কোনো অঞ্চল বন্যার কবলে পড়ে। সাম্প্রতিক সময়ে চট্টগ্রাম, কক্সবাজারসহ পূর্বাঞ্চলের বিস্তীর্ণ এলাকায় যে ভয়াবহ বন্যা আঘাত হেনেছে, তা শুধু ঘরবাড়িই ভাসিয়ে নেয়নি; হাজারো পরিবারের স্বপ্ন, জীবিকা ও নিরাপত্তাবোধও বিপর্যস্ত করেছে। বহু মানুষ এখনো আশ্রয়কেন্দ্রে কিংবা ভাঙাচোরা ঘরে অনিশ্চয়তার মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন। বিশুদ্ধ পানির সংকট, খাদ্যের অভাব, শিশুদের অপুষ্টি, পানিবাহিত রোগের ঝুঁকি এবং জীবিকা হারানোর কষ্ট- সব মিলিয়ে গভীর এক মানবিক সংকট।
এমন সংকটে মানুষের পাশে দাঁড়ানো কেবল রাষ্ট্রের দায়িত্ব নয়; এটি সমাজের প্রতিটি সচেতন নাগরিক, প্রতিটি সামাজিক প্রতিষ্ঠান এবং প্রতিটি ধর্মীয় সংগঠনেরও নৈতিক ও ঈমানি দায়িত্ব। ইসলামের শিক্ষা আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয়, সৃষ্টির সেবা স্রষ্টার সন্তুষ্টি অর্জনের অন্যতম শ্রেষ্ঠ মাধ্যম। রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেন, “মানুষের মধ্যে সেই ব্যক্তিই সর্বোত্তম, যে মানুষের জন্য সবচেয়ে বেশি উপকারী।” এই মহান আদর্শই মুসলিম সমাজকে যুগে যুগে মানবকল্যাণের পথে পরিচালিত করেছে।
বাংলাদেশ জমঈয়তে আহলে হাদীস প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকেই দাওয়াহ-তাবলীগ, তানযীম, তাহরীক এবং তালীম-তারবিয়াহর পাশাপাশি খিদমতে খালক- অর্থাৎ- আর্তমানবতার সেবাকে সংগঠনের অন্যতম মৌলিক কর্মসূচি হিসেবে গ্রহণ করেছে। দুর্যোগ, দারিদ্র্য, শীত, মহামারি কিংবা অন্য যেকোনো মানবিক সংকটে সংগঠনের নেতাকর্মীরা মানুষের পাশে দাঁড়ানোর চেষ্টা করেছেন। কারণ ইসলামের দৃষ্টিতে একজন ক্ষুধার্ত মানুষকে আহার দেওয়া, একজন অসহায়কে আশ্রয় দেওয়া কিংবা একজন বিপন্ন মানুষের চোখের অশ্রু মুছে দেওয়াও এক মহান ইবাদত।
সাম্প্রতিক বন্যার খবর পাওয়ার অব্যবহিত পরে বাংলাদেশ জমঈয়তে আহলে হাদীসের মাননীয় সভাপতি অধ্যাপক ড. আব্দুল্লাহ ফারুক এবং সেক্রেটারি জেনারেল অধ্যাপক মুহাম্মদ আসাদুল ইসলাম তাঁদের পূর্বনির্ধারিত কর্মসূচি স্থগিত করে দুর্গত এলাকায় ছুটে যান। তাঁরা ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের দুর্দশা সরেজমিনে পর্যবেক্ষণ করেন, স্থানীয় নেতৃবৃন্দ ও স্বেচ্ছাসেবকদের সঙ্গে সমন্বয় করে জরুরি ত্রাণ ও পরবর্তী পুনর্বাসন কার্যক্রমকে গতিশীল করার উদ্যোগ গ্রহণ করেন। নেতৃত্বের এই উপস্থিতি শুধু প্রশাসনিক দায়িত্ব পালন নয়; এটি বিপন্ন মানুষের প্রতি সহমর্মিতা, দায়িত্ববোধ এবং ইসলামী ভ্রাতৃত্বের এক বাস্তব প্রতিফলন।
তবে অভিজ্ঞতা বলে, বন্যার পানি নেমে গেলেই দুর্ভোগের অবসান হয় না; বরং তখনই শুরু হয় আরো কঠিন সংগ্রাম। ভেঙে যাওয়া ঘর পুনর্নির্মাণ, কৃষকের নষ্ট হয়ে যাওয়া ফসলের ক্ষতি পুষিয়ে নেওয়া, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীর পুঁজি ফিরিয়ে দেওয়া, শিক্ষার্থীদের শিক্ষাজীবন সচল রাখা, বিশুদ্ধ পানির ব্যবস্থা করা এবং রোগব্যাধির বিস্তার রোধ- এসবই দীর্ঘমেয়াদি পুনর্বাসনের অংশ। তাই কেবল তাৎক্ষণিক ত্রাণ নয়, টেকসই পুনর্বাসনই হওয়া উচিত আমাদের সম্মিলিত লক্ষ্য।
এই বাস্তবতা উপলব্ধি করেই বাংলাদেশ জমঈয়তে আহলে হাদীস জরুরি ত্রাণের পাশাপাশি বন্যা-পরবর্তী পুনর্বাসন কার্যক্রম পরিচালনার উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। কিন্তু একটি জাতীয় মানবিক উদ্যোগ কেবল একটি সংগঠনের পক্ষে বাস্তবায়ন করা সম্ভব নয়। এর জন্য প্রয়োজন সমাজের সর্বস্তরের মানুষের অংশগ্রহণ। ব্যবসায়ী, শিল্পপতি, চিকিৎসক, শিক্ষক, প্রবাসী, তরুণ সমাজ, সমাজসেবী এবং সকল দানশীল ব্যক্তিকে মানবতার এই আহ্বানে সাড়া দেওয়ার সময় এখনই।
আজ হয়তো দুর্গত মানুষগুলো আমাদের আত্মীয় নয়, প্রতিবেশী নয়; কিন্তু তারা আমাদেরই দেশের মানুষ, আমাদেরই ভাই-বোন। তাদের শিশুর কান্না, মায়ের অসহায় দৃষ্টি, বৃদ্ধের দীর্ঘশ্বাস এবং গৃহহারা মানুষের অনিশ্চয়তা আমাদের বিবেককে নাড়া দেওয়ার জন্য যথেষ্ট। মানবিক বিপর্যয়ের এই মুহূর্তে নির্লিপ্ত থাকা কোনো সভ্য সমাজের পরিচয় হতে পারে না।
আসুন, আমরা সবাই নিজ নিজ সামর্থ্য অনুযায়ী এগিয়ে আসি। কেউ অর্থ দিয়ে, কেউ খাদ্য দিয়ে, কেউ ওষুধ দিয়ে, কেউ শ্রম দিয়ে, কেউ আবার সময় দিয়ে বন্যাকবলিত মানুষের পাশে দাঁড়াই। মনে রাখতে হবে, একটি পরিবারের পুনর্বাসনে আমাদের সামান্য সহযোগিতাও হতে পারে তাদের নতুন জীবনের সূচনা।
বাংলাদেশ জমঈয়তে আহলে হাদীস সেই বিশ্বাস থেকেই দেশবাসীর প্রতি আন্তরিক আহ্বান জানায়! আসুন, আমরা সবাই মিলে বন্যাকবলিত মানুষের হাত ধরি। ত্রাণের সীমা অতিক্রম করে পুনর্বাসনের দীর্ঘ পথেও তাদের পাশে থাকি। কারণ সৃষ্টির সেবাতেই নিহিত রয়েছে স্রষ্টার সন্তুষ্টি।
প্রসঙ্গসমূহ »:
সম্পাদকীয়