আদর্শ রাষ্ট্রনায়ক ও ন্যায়ভিত্তিক শাসনব্যবস্থা : কল্যাণরাষ্ট্রের মূলভিত্তি
কল্যাণরাষ্ট্র সর্বদা মানবিক ও ন্যায়ভিত্তিক কাঠামোর উপর প্রতিষ্ঠিত। এটি নির্ভর করে নাগরিকের নিরাপত্তা, মর্যাদা ও ন্যাসঙ্গত জীবনযাপনের উপর। এক্ষেত্রে আয়তন, সম্পদ, অবকাঠামো কিংবা শক্তিশালী সামরিক ব্যবস্থা সহায়ক ভূমিকা পালন করলেও মূখ্য বিষয় নয়। এখানে ক্ষমতা কোন ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর স্বৈরাচারের উপকরণ নয়। বরং জনগণের অধিকার সংরক্ষণ, নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ এবং সার্বিক কল্যাণ সাধনই মৌলিক কর্মসূচী। আর আমানতদারিতা, ন্যায়বিচার, যোগ্যতার যথাযথ মূল্যায়ন, জবাবদিহিতা, দুর্নীতিমুক্ত প্রশাসন এবং দুর্বল ও বঞ্চিত মানুষের অধিকার সংরক্ষণ এই কল্যাণের ভিত্তি। রাষ্ট্র তখনই সত্যিকার কল্যাণরাষ্ট্র হবে, যখন শাসক জনগণের ওপর অধিপতি না হয়ে তাদের অধিকার ও কল্যাণের দায়িত্বশীল অভিভাবক হন।
আল্লাহ তা‘আলা বলেন, ‘নিশ্চয় মহান আল্লাহ তোমাদের নির্দেশ দেন, তোমরা আমানত তার হক্বদারদের কাছে পৌঁছে দাও এবং যখন মানুষের মধ্যে বিচার করবে, তখন ন্যায়বিচার করবে’ (সূরা আন-নিসা : ৫৮)। রাসূলুল্লাহ (রাযিয়াল্লাহু আনহু) বলেছেন, ‘তোমাদের প্রত্যেকেই দায়িত্বশীল এবং প্রত্যেককে তার অধীনস্থদের সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হবে’ (ছহীহ বুখারী, হা/৮৯৩)। অতএব রাষ্ট্রের ক্ষমতা হবে আমানত এবং শাসনের ভিত্তি হবে ন্যায়। এছাড়া জবাবদিহির চেতনা রাষ্ট্রীয় ক্ষমতাকে স্বেচ্ছাচারিতা থেকে সেবায়, কর্তৃত্বকে দায়িত্বে এবং প্রশাসনকে জনকল্যাণের প্রতিষ্ঠানে রূপান্তরিত করে। ফলে আদর্শ রাষ্ট্রনায়কের ব্যক্তিগত সততা, নৈতিক দৃঢ়তা, প্রজ্ঞা ও ন্যায়পরায়ণতা কেবল তার ব্যক্তিগত গুণ নয়; এগুলো রাষ্ট্রের সামগ্রিক চরিত্র নির্মাণের একেকটা মৌলিক উপাদান।
রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক দিক থেকে বর্তমান বাংলাদেশ এক যুগ সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে। ২০২৪ সালের স্বৈরাচার পতনের মাধ্যমে ব্যাপক রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর ২০২৬ সালে নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতা তৈরি হয়েছে। জনগণের প্রত্যাশা ও প্রাপ্তির জায়গাও সম্প্রসারিত হয়েছে। তারা চায় নিরাপত্তা, সুশাসন, দুর্নীতিমুক্ত প্রশাসন, ন্যায়বিচার, অর্থনৈতিক স্বস্তি এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের প্রতি আস্থা। কিন্তু প্রত্যাশা অনুযায়ী প্রাপ্তি শূন্যের কোঠায়। কেননা এদেশে সাধারণ মানুষের জীবন ও রক্তের বিনিময়ে শুধু সরকার পরিবর্তন হয়, শাসনব্যবস্থায় কোন পরিবর্তন লক্ষ্য করা যায় না। কেবল তথাকথিত জনদরদি (?) রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দের পদ-পদবি বাড়ে, নতুন করে দেশের সম্পদ লুটেপুটে খাওয়ার লাইসেন্স খুঁজে পায়, দিনান্দিন চেহারা-সুরত, পোশাক-পরিচ্ছদ, যানবাহন পাল্টে যায়। মনে হয় আলাদিনের চেরাগ পেয়েছে, ফলে রাতারাতি আঙ্গুল ফুলে কলাগাছ হওয়ার অবস্থা। অথচ জনগণের ভাগ্যের কোন পরিবর্তন হয় না। প্রকৃতপক্ষে রাষ্ট্রের পরিবর্তন তখনই সম্ভব, যখন ক্ষমতা পরিবর্তিত হয়ে আমানত ও সেবায় রূপ নেয়। ব্যক্তিনির্ভরতার পরিবর্তে দেশ ও জনগণ, আনুগত্যের পরিবর্তে যোগ্যতা, প্রতিহিংসার পরিবর্তে ন্যায় এবং ক্ষমতার প্রদর্শনের পরিবর্তে কল্যাণরাষ্ট্র পরিচালনার মূলনীতি হয়ে ওঠে। যা কল্যাণরাষ্ট্রের আবশ্যিক পূর্বশর্ত।
আদর্শ রাষ্ট্রনায়ক সবসময় আত্মশুদ্ধি ও আত্মজবাবদিহির ব্যাপারে সতর্ক দৃষ্টি রাখবেন। তিনি যে নীতি জনগণের জন্য নির্ধারণ করবেন, তা নিজের জীবনেও ধারণ করবেন; সত্য প্রতিষ্ঠিত হলে নিজের ভুল স্বীকার করতে দ্বিধা করবেন না এবং নিজের প্রবৃত্তি, স্বার্থ ও ক্ষমতার মোহকে নিয়ন্ত্রণে রাখবেন। কারণ জনগণ শুধু শাসকের আইনের আনুগত্য করে না, তার আচরণও অনুসরণ করে। একইভাবে রাষ্ট্রের কর্মকর্তা নির্বাচনেও যোগ্যতা, সততা ও দক্ষতাকে রাজনৈতিক আনুগত্য, স্বজনপ্রীতি কিংবা ব্যক্তিগত ঘনিষ্ঠতার ওপর স্থান দিতে হবে। মন্ত্রী, বিচারক, প্রশাসক, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী কিংবা রাজস্বকর্মী প্রত্যেকেই রাষ্ট্রের মৌলিক অঙ্গ। আর একটি অযোগ্য বা দুর্নীতিগ্রস্ত অঙ্গ গোটা রাষ্ট্রীয় কাঠামোকেই দুর্বল করে দেয়। রাষ্ট্রনায়কের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব হল জনগণের বাস্তব অবস্থা সম্পর্কে অবহিত থাকা। তবে এর অর্থ এটা নয় যে, পুনরায় গুম-খুন, ভয় কিংবা গুপ্তচরবৃত্তির উত্থান ঘটানো; বরং তা হবে পূর্ণাঙ্গ জবাবদিহি, স্বাধীন নিরীক্ষা, নাগরিক অভিযোগের সুষ্ঠু প্রতিকার এবং প্রশাসনের মাঠপর্যায়ের বাস্তবতা বোঝার কার্যকর ব্যবস্থা। একই সঙ্গে শাসককে চোগলখোরি ও ভিত্তিহীন অভিযোগ থেকে সতর্ক থাকতে হবে। আল্লাহ তা‘আলা বলেন, তোমাদের নিকট আগত কোন বার্তা যাচাই-বাছাই করে গ্রহণ করবে (সূরা আল-হুজুরাত : ৬)। কারণ যাচাইহীন অভিযোগ সৎ মানুষকে দূরে সরিয়ে দেয় এবং তোষামোদকারী ও ষড়যন্ত্রকারীদের ক্ষমতার কাছাকাছি নিয়ে আসে।
ন্যায়ভিত্তিক শাসন নির্ভর করে রাষ্ট্র তার বিরোধী ব্যক্তি ও দুর্বল নাগরিকের সঙ্গে কেমন আচরণ করে তার উপর। আল্লাহ তা‘আলা বলেন, ‘ন্যায়বিচার কর। এটাই তাক্বওয়ার অধিক নিকটবর্তী’ (সূরা আল-মায়িদা : ৮)। অতএব নিজের লোকের অপরাধ ক্ষমা করে বিরোধী পক্ষের অপরাধে কঠোর হওয়া যেমন অন্যায়, তেমনি আইনকে রাজনৈতিক স্বার্থে ব্যবহার করাও রাষ্ট্রীয় নৈতিকতার পরিপন্থী। বিচারব্যবস্থার স্বাধীনতা, প্রশাসনের নিরপেক্ষতা, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পেশাদারিত্ব, সংবাদ ও মতপ্রকাশের নিরাপদ পরিবেশ এবং অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত এসবই ন্যায়ভিত্তিক রাষ্ট্রের অপরিহার্য স্তম্ভ। একই সঙ্গে জনগণের সম্পদ, রাজস্ব, মুদ্রা, বাজার, ব্যবসা-বাণিজ্য ও যোগাযোগ ব্যবস্থার নিরাপত্তা নিশ্চিত করাও রাষ্ট্রনায়কের দায়িত্ব; কারণ অর্থনৈতিক ন্যায় ছাড়া রাজনৈতিক ন্যায়ও পূর্ণতা পায় না।
পরিশেষে বলতে চাই, শুধু রাজনৈতিক নেতৃত্বের পালাবদল নয়, প্রয়োজন ভারসাম্য শাসন-নৈতিকতা। যে নেতৃত্ব ক্ষমতাকে ব্যক্তিগত সম্পদ নয়, আমানত হিসাব দেখবে; রাষ্ট্রকে দলীয় স্বার্থের ঊর্ধ্বে রাখবে। যোগ্য মানুষকে যথাস্থানে দায়িত্ব দেবে। দুর্বল ও বিরোধী নাগরিকের অধিকারও সমানভাবে রক্ষা করবে এবং এমন প্রতিষ্ঠান নির্মাণ করবে, যা ব্যক্তি ও সরকারের পরিবর্তনের পরও ন্যায় ও সেবার ধারাবাহিকতা বজায় রাখবে। সর্বদা মনে রাখতে হবে যে, রাষ্ট্রের প্রকৃত শক্তি তার অস্ত্রাগারে নয়, নাগরিকের আস্থায়। তার প্রকৃত উন্নয়ন কেবল পরিসংখ্যানে নয়, মানুষের নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ জীবনে। অতএব সুরম্য প্রাসাদ, মেগা প্রকল্প বা রাজনৈতিক স্লোগান কোন আদর্শ রাষ্ট্রনায়কের কাজ নয়; বরং এমন একটি ন্যায়ভিত্তিক রাষ্ট্রব্যবস্থা কায়েম করে যাওয়া, যেখানে মানুষ রাষ্ট্রকে ভয় করে না, বরং রাষ্ট্রের ওপর আস্থা রাখে। ইসলামের দৃষ্টিতে রাষ্ট্র ব্যবস্থার এটিই মৌলিক আহ্বান। মহান আল্লাহ বাংলাদেশের সরকার প্রধানকে কল্যাণরাষ্ট্র প্রতিষ্ঠায় দ্বীনি আদর্শিক চেতনা ও ন্যায়ভিত্তিক শাসন ব্যবস্থার পুনর্জাগরণ ঘটানোর তাওফীক্ব দান করুন। আমীন!
رَبَّنَا تَقَبَّلۡ مِنَّا اِنَّکَ اَنۡتَ السَّیۡعُ الۡعَلِیۡمُ
প্রসঙ্গসমূহ »:
সম্পাদকীয়