শনিবার, ০৭ মার্চ ২০২৬, ১২:২৩ অপরাহ্ন

ভারতীয় আধিপত্যবাদ : স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের জন্য হুমকি


স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব রাজনৈতিক কোন পরিভাষা নয়; বরং একটি জাতির অস্তিত্ব, আত্মমর্যাদা ও ভবিষ্যৎ নির্ধারণের মৌলিক ভিত্তি। মূলত স্বাধীনতা আল্লাহপ্রদত্ত এক মহান নে‘মত, যা অন্যায় আধিপত্য, যুল্ম ও শোষণ থেকে মুক্ত থাকার অধিকার নিশ্চিত করে। অথচ ভারতীয় আধিপত্যবাদ এ দেশের রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত, অর্থনৈতিক স্বাধীনতা এবং সাংস্কৃতিক স্বাতন্ত্রকে হুমকির সম্মুখীন করছে।

রাজনৈতিক ক্ষেত্রে আধিপত্যবাদ ‘ক্লাসিক্যাল হেজেমনি’ তত্ত্বের বিস্তৃতি ঘটিয়েছে। যেখানে একটি আঞ্চলিক শক্তি অন্য রাষ্ট্রগুলোর ওপর সিদ্ধান্তগত প্রভাব বিস্তার করে। ফলে দুর্বল রাষ্ট্রগুলো ধীরে ধীরে নিজেদের স্বার্থ নয়, বরং প্রভাবশালী রাষ্ট্রের প্রত্যাশা অনুযায়ী অবস্থান নিতে বাধ্য হয়, যা সার্বভৌমত্বের মৌলিক ধারণাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে। অর্থনৈতিক দিক থেকে আধিপত্যবাদ আরও সূক্ষ্ম ও দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব ফেলে। অসম বাণিজ্য কাঠামো, করিডোর, ট্রানজিট ও বাজারনির্ভরতা এবং অবকাঠামোগত চুক্তির মাধ্যমে একটি রাষ্ট্রকে অর্থনৈতিকভাবে নির্ভরশীল করে তুলে সমগ্র অর্থনীতির নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নেয়। অথচ যে জাতি তার অর্থনীতির নিয়ন্ত্রণ হারায়, সে জাতি একসময় নিজের সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতাও হারিয়ে ফেলে। নিরাপত্তা ও সামরিক বিশ্লেষণে দেখা যায়, আধিপত্যবাদী শক্তি প্রায়ই ‘আঞ্চলিক নিরাপত্তা’ বা ‘সন্ত্রাসবিরোধী সহযোগিতা’র নামে রাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা কাঠামোর ওপর প্রভাব বিস্তার করে। এতে একদিকে রাষ্ট্রের নিজস্ব নিরাপত্তা দুর্বল হয়, অন্যদিকে জনগণের ওপর নজরদারি ও নিয়ন্ত্রণের সুযোগ তৈরি হয়। সাংস্কৃতিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক আধিপত্যবাদ এই প্রক্রিয়ার সবচেয়ে গভীর এবং দীর্ঘমেয়াদি স্তর। ইতিহাস পুনর্লিখন, মিডিয়া প্রভাব, ভাষা ও

শিক্ষানীতিতে প্রভাব বিস্তারের মাধ্যমে একটি বিশেষ ম্যান্ডেড প্রতিষ্ঠা করা হয়, যা ধীরে ধীরে জাতির আত্মপরিচয়কে দুর্বল করে দেয়। এই পরিচয় ক্ষয়প্রাপ্ত হলে জাতি মানসিকভাবে পরাধীন হয়ে পড়ে, যা রাজনৈতিক প্রতিরোধের সক্ষমতাকেও ভেঙে দেয়। অন্যদিকে আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে আধিপত্যবাদ প্রায়ই বৈধতার মুখোশ পরে আসে। আন্তর্জাতিক আইন, আঞ্চলিক জোট বা উন্নয়ন সহযোগিতার ভাষা ব্যবহার করে একতরফা স্বার্থকে স্বাভাবিক ও গ্রহণযোগ্য হিসাবে উপস্থাপন করা হয়।
আধিপত্যবাদ মানে শুধু সামরিক আগ্রাসন নয়। এটি একটি দীর্ঘমেয়াদি কাঠামো, যেখানে প্রভাবশালী রাষ্ট্র তার কূটনৈতিক, অর্থনৈতিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক ক্ষমতা ব্যবহার করে প্রতিবেশী রাষ্ট্রের নীতি নির্ধারণে অন্যায় প্রভাব বিস্তার করে। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে এই ছায়া কখনো সীমান্ত ও নিরাপত্তা বয়ানে, কখনো বাণিজ্য ও অবকাঠামোগত নির্ভরতায়, আবার কখনো রাজনৈতিক বৈধতার প্রশ্নে স্পষ্ট হয়ে ওঠে। স্বাধীনতা উত্তর বাংলাদেশে ভাতরীয় আধিপত্যবাদের বিষ দেশের সকল স্তরÑ রাজনীতি, অর্থনীতি, নিরাপত্তা ও সামরিক, সাংস্কৃতিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক এবং আন্তর্জাতিক সম্পর্ক স্থাপনের ক্ষেত্রেÑ সংক্রামিত করেছে। মাথা উঁচু করে কখনো স্বাধীনভাবে অগ্রসর হতে দেয়নি। বরং বিভিন্ন সময়ে ফ্যাসিস্ট সরকার প্রতিষ্ঠা করে দেশকে অন্যায়ভাবে শোষন ও লুণ্ঠন করেছে। অন্যদিকে জুলাই অভ্যুত্থান-পরবর্তী সময়ে স্বাধীন সিদ্ধান্ত, ন্যায়ভিত্তিক রাজনীতি ও বিদেশি প্রভাবমুক্ত রাষ্ট্রনীতিÑ বাস্তবায়নের যে দারুন সুযোগ এসেছিলÑ এই পথটিও ভারতীয় আধিপত্যবাদ ধ্বংসের পথে নিমজ্জিত করেছে, বারবার বাঁধার প্রাচীর হয়ে দাঁড়িয়েছে; যা সচেতন ব্যক্তি মাত্রই বোধগম্য।

স্মর্তব্য, বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় ইতিহাসে জুলাই অভ্যুত্থান একটি গভীর রাজনৈতিক ও নৈতিক বাঁকবদলের প্রতীক। এটি কেবল শাসনব্যবস্থার পরিবর্তন নয়, বরং সার্বভৌমত্ব, ন্যায়বিচার ও জাতীয় মর্যাদার প্রশ্নে নতুন করে আত্মজিজ্ঞাসার সূচনা। এই প্রেক্ষাপটে আবরার ফাহাদ, আবূ সাঈদ, মুগ্ধ ও শরীফ ওসমান হাদীর হত্যাকাণ্ডগুলো কেবল বিচ্ছিন্ন অপরাধ হিসাবে দেখলে হবে না। কেননা এসব ঘটনা রাষ্ট্রের ভেতরে মতপ্রকাশের নিরাপত্তা, ভিন্নমতের প্রতি সহনশীলতা এবং জাতীয় স্বার্থের প্রশ্নে স্বাধীন অবস্থানের সীমাবদ্ধতাকে উন্মোচিত করেছে। বিশেষ করে আবরার ফাহাদ ও ওসমান হাদীর হত্যাকাণ্ড দেশের মানুষকে স্পষ্টভাবে দেখিয়েছেÑ বিদেশী আধিপত্যবিরোধী চিন্তা ও সমালোচনা কীভাবে ভয় ও দমননীতির মুখে পড়ে। এই ঘটনাগুলো একটি বড় প্রশ্ন সামনে আনে, তাহলোÑ একটি স্বাধীন রাষ্ট্রে নাগরিকের চিন্তা ও কণ্ঠ যদি নিরাপদ না থাকে, তবে সার্বভৌমত্ব কি কেবল কাগুজে ধারণায় সীমাবদ্ধ!?

জুলাই অভ্যুত্থানের পর রাষ্ট্রের আত্মনির্ভর ও মর্যাদাসম্পন্ন অবস্থান নেয়ার একটা ব্যাপক সুযোগ ছিল। কিন্তু আফসোসের বিষয় হল- ভারতীয় আধিপত্যবাদের প্রতি অতিনির্ভরতা ও নীরব সমঝোতা সেই সুযোগকে সংকুচিত, বলা যায় ধ্বংস করছে। ভারতীয় আধিপত্যবাদ এখানে সরাসরি নির্দেশনার মাধ্যমে নয়, বরং ‘স্থিতিশীলতা’, ‘বন্ধুত্ব’ ও ‘কৌশলগত অংশীদারত্ব’ ইত্যাদি ভাষা ব্যবহার করে প্রভাব বিস্তার করছে। এর ফলে দেশের পররাষ্ট্রনীতি ও নিরাপত্তার ক্ষেত্রে জনগণের স্বার্থের চেয়ে আঞ্চলিক শক্তির প্রত্যাশা অগ্রাধিকার পাচ্ছেÑ যা একটি স্বাধীন রাষ্ট্রের জন্য দীর্ঘমেয়াদে ক্ষতিকর। উল্লেখ্য, ভারতীয় আধিপত্যবাদকে হুমকি হিসাবে দেখার অর্থ প্রতিবেশিতা অস্বীকার করা নয়। বরং এর অর্থ হলÑ সমতা ও পারস্পরিক সম্মানের ভিত্তিতে সম্পর্ক পুনর্গঠন করা। সুতরাং স্বাধীন বাংলাদেশকে এমন নীতি গ্রহণ করতে হবে, যেখানে জাতীয় স্বার্থ, নাগরিকের নিরাপত্তা ও ন্যায়বিচার কোনভাবেই ভারতীয় বা আঞ্চলিক কোন শক্তির ছায়ায় ঢাকা না পড়ে। প্রত্যেককে জুলাই অভ্যুত্থানের মূল স্পিরিট ধারণ করতে হবেÑ যা কেবল সরকার পরিবর্তন নয়, বরং  দ্বীনের ভিত্তিতে রাষ্ট্রের স্বকীয়তা, স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের অখণ্ডতা রক্ষা এবং নাগরিকের নিরাপত্তা, ন্যায় ও ইনসাফভিত্তিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করা।

পরিশেষে বলা যায়, ভারতীয় আধিপত্যবাদ একটি বহুমাত্রিক সমস্যা, যা রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক নিরাপত্তা এবং সাংস্কৃতিক স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বকে চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন করেছে। ইসলামের দৃষ্টিতে এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করা কোন ঐচ্ছিক বিষয় নয় বরং এটি ন্যায়, মর্যাদা ও আমানত রক্ষার এক গুরুত্বপূর্ণ ঈমানী দায়িত্ব। এক্ষেত্রে রাজনৈতিক সচেতনতা, অর্থনৈতিক আত্মনির্ভরতা, প্রজ্ঞা, ঐক্য এবং আদর্শিক স্বচ্ছতা আধিপত্যবাদ মোকাবিলার মৌলিক উপাদান হিসাবে গ্রহণ করতে হবে। কেননা এগুলোর মাধ্যমেই একটি জাতি তার স্বাধীন ও সার্বভৌমত্ব রক্ষা করতে পারে, অন্যায় আধিপত্যের বিরুদ্ধে দৃঢ়ভাবে দাঁড়াতে পারে এবং প্রতিরোধের আগুন প্রজ্জ্বলিত করতে পারে। আল্লাহ তা‘আলা আমাদের দেশকে ভারতীয় আধিপত্যবাদ থেকে মুক্ত করুন-আমীন!!

 




প্রসঙ্গসমূহ »: সম্পাদকীয়
সালাফী মানহাজ : পরিচিতি ও অনুসরণের আবশ্যকতা - সম্পাদকীয়
রামাযান: তাক্বওয়া ও ক্ষমা লাভের সুবর্ণ সুযোগ - সম্পাদকীয়
নারী পোশাকের স্বাধীনতা ও প্রগতিবাদীদের ভ্রান্তি বিলাস - সম্পাদকীয়
শৃঙ্খলাপূর্ণ উন্নত সমাজ কাঠামো কাম্য - সম্পাদকীয়
অবরুদ্ধ কাশ্মীর : বিশ্ব মোড়লরা নীরব - সম্পাদকীয়
ইসলাম ও মানবাধিকার - সম্পাদকীয়
­­অসহায় মানুষের সহযোগিতায় এগিয়ে আসুন! - সম্পাদকীয়
শী‘আদের ধ্বংসযজ্ঞ ও আমাদের করণীয় - সম্পাদকীয়
কুরআন মাজীদের হক্ব আদায় করুন! - সম্পাদকীয়
শী‘আ প্রীতি ও সঊদী বিদ্বেষ - সম্পাদকীয়
ইসলামী শিক্ষা : উন্নত জাতি গঠনের সর্বশ্রেষ্ঠ মাধ্যম - সম্পাদকীয়
খুন ও ধর্ষণ : নৈরাজ্যের চরম সীমা অতিক্রম - সম্পাদকীয়

সর্বশেষ প্রবন্ধ

ফেসবুক পেজ