শনিবার, ০৭ মার্চ ২০২৬, ০১:০২ অপরাহ্ন

প্রবৃত্তি পূজার কুপ্রভাব ও আমাদের করণীয়


আধুনিক সভ্যতার রঙ্গিন মুখোশের আড়ালে মানবতা আজ গভীর সংকটের মুখোমুখি। এ সংকট কেবল বাহ্যিক নয়, বরং এটি একটি গভীর আত্মিক ও নৈতিক অবক্ষয়ের সংকট। প্রবৃত্তি পূজা এই অবক্ষয়ের মূল কারণগুলোর অন্যতম। এটিই আজ আবাল বৃদ্ধ বনিতা সহ অধকাংশ মানুষের জীবনের একমাত্র পথপ্রদর্শক হয়ে উঠেছে। ফলে সমাজে ন্যায়-অন্যায়, হালাল-হারাম, নীতি-নৈতিকতার সীমারেখা ক্রমশঃ বিলীন হয়ে যাচ্ছে।

প্রবৃত্তি পূজা হল- মানুষের মন যা চায়, নফস যা কামনা করে, সেটিকেই সর্বোচ্চ আদর্শ এবং জীবন পরিচালনার মাপকাঠি হিসাবে গ্রহণ করা। অর্থাৎ সে তার ইচ্ছার অধীনস্ত হয়, তার আত্মা যা চাই তাই করে এবং তা অর্জনের জন্য সকল প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখে। এমনকি যদি তা তার ধ্বংস এবং ক্ষতির কারণও হয় তবুও সে তা সম্পাদন করে থাকে। এভাবে সে তার ইচ্ছাকে তার মা‘বূদ বা উপাস্য হিসাবে গ্রহণ করে। যেমন আল্লাহ তা‘আলা বলেন, ‘তুমি কি তাকে দেখেছ, যে তার প্রবৃত্তিকে তার উপাস্য বানিয়ে নিয়েছে?’ (সূরা আল-জাছিয়া : ২৩)। এ আয়াতে মহান আল্লাহ স্পষ্ট করে দিয়েছেন, যে ব্যক্তি নিজের চাওয়াকে, নিজের ইচ্ছাকে, নিজের লালসাকে জীবনের মূল চালিকা শক্তি বানায়, সে মূলত নিজের নফসকেই উপাস্য বানিয়েছে। অর্থাৎ সে তাওহীদের সীমালঙ্ঘন করে শিরকের পথে অগ্রসর হয়েছেÑযদিও সেটা বাহ্যিকভাবে মূর্তিপূজা না-ও হতে পারে। এজন্য ইসলামী শরী‘আতের প্রমাণাদি দ্বিধাহীনভাবে প্রবৃত্তির অনুসরণ করতে নিষেধ করে। আল্লাহ তা‘আলা বলেন, ‘ন্যায়বিচার করতে তোমরা প্রবৃত্তির অনুসরণ কর না’ (সূরা আন-নিসা : ১৩৫)। অন্যত্র আল্লাহ তা‘আলা বলেন, ‘তোমরা সেসব জাতির খেয়াল-খুশীর অনুসরণ করো না, যারা আগেভাগেই পথভ্রষ্ট হয়ে গেছে এবং তারা অনেক লোককে পথহারা করে দিয়েছে আর তারা নিজেরাও সোজা পথ থেকে বিচ্যুত হয়ে গেছে’ (সূরা আল-মায়েদাহ : ৭৭)। কখনো মন্দের সাথে জড়িত মন বা ব্যক্তিসত্তার দিকে প্রবৃত্তিকে সম্বন্ধ করে তার নিন্দা করা হয়েছে (ইবনু মাজাহ, হা/৪২৬০); আবার কখনো অন্তরের সঙ্গে সম্পর্কিত প্রবৃত্তির নিন্দা জানানো হয়েছে (ছহীহ মুসলিম, হা/১৪৪; মিশকাত, হা/৫৩৮০)

প্রবৃত্তি পূজার কুপ্রভাব অত্যন্ত সুদূরপ্রসারী। প্রবৃত্তির অনুসরণ মানুষকে ধীরে ধীরে অশ্লীলতা, ব্যভিচার, অসততা, মাদকাসক্তি, ভোগবিলাস ইত্যাদির দিকে ঠেলে দেয়। এটা একপ্রকার আত্মার রোগ যা সময়ের সাথে সাথে সমাজকে ভেতর থেকে ধ্বংস করে দেয়। আবার পরিবার ও সামাজিক বন্ধনের ভাঙ্গনের ক্ষেত্রেও প্রবৃত্তি পূজার বিশেষ ভূমিকা রয়েছে। কারণ, যখন মানুষ কেবল নিজের আরাম-আয়েশ, কামনা-বাসনার পেছনে ছুটে, তখন পারিবারিক দায়িত্ববোধ ও সামাজিক মূল্যবোধ গুরুত্বহীন হয়ে পড়ে। স্বামী-স্ত্রী, বাবা-মা-সন্তানদের মধ্যে দূরত্ব বাড়ে। পরিণামে বিচ্ছেদ, অবাধ যৌনতা, অবহেলা ও নির্যাতন নিত্যনৈমিত্তিক বিষয় হয়ে দাঁড়ায়। প্রবৃত্তির পেছনে ছুটে মানুষ যতই ভোগ-বিলাস অর্জন করুক না কেন, সে কখনোই প্রকৃত তৃপ্তি বা প্রশান্তি লাভ করতে পারে না। কারণ এই দুনিয়া তৃপ্তির জায়গা নয়, পরীক্ষা এবং আত্মার পরিশুদ্ধির জায়গা। দ্বীনের অপব্যাখ্যা ও ধর্মবিমুখতা ও প্রবৃত্তি পূজার অন্যতম কুপ্রভাব। নিজের প্রবৃত্তিকে জায়েয করতে গিয়ে মানুষ দ্বীনের বিধানকে নিজের মত করে ব্যাখ্যা করে। কেউ কেউ তো সরাসরি দ্বীনকে ‘আউটডেটেড’ বলে বাতিল করার ধৃষ্টতাও দেখায়। এর ফলে সত্যিকার ইসলাম হারিয়ে যায়, সমাজে ছড়িয়ে পড়ে বিভ্রান্তি।

বর্তমান বিশ্ব জৈবিক ও দৈহিক চাহিদা পূরণের ক্ষেত্রে মানুষ দু’ভাগে বিভক্ত হয়ে গেছে। এক শ্রেণী দৈহিক ও জৈবিক চাহিদাকে মূল প্রতিপাদ্য হিসাবে গ্রহণ করেছে। ফলে তারা অশ্লীলতায় লিপ্ত হচ্ছে, ত্যাগ করছে ছালাত ও অন্যান্য ইবাদত। এদের অধিকাংশই হচ্ছে পাশ্চাত্যের অনুসারী। দ্বিতীয় শ্রেণী দৈহিক ও জৈবিক চাহিদাকে সম্পূর্ণরূপে ত্যাগ করে বৈরাগ্যবাদকে গ্রহণ করেছে। ফলে এরা শরী‘আতের হালালকে হারাম করে নিয়েছে। এদের অধিকাংশই হচ্ছে প্রাচ্যের অনুসারী। এর বিপরীতে ইসলাম দৈহিক ও জৈবিক চাহিদার ক্ষেত্রে মধ্যমপন্থা গ্রহণ করেছে। ইসলামের এ মধ্যমপন্থার ব্যাখ্যায় ইবনুল ক্বাইয়িম (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন, ‘মানুষ কখনো প্রবৃত্তি থেকে আলাদা হতে পারবে না, যতদিন সে আছে ততদিন তার প্রবৃত্তিও আছে, এর থেকে মুক্ত হওয়া অসম্ভব। তাই ইসলাম তাকে প্রবৃত্তি থেকে আলাদা হতে বলেনি বরং তা নিয়ন্ত্রণ করার নির্দেশ দিয়েছে। ... যার মূল লক্ষ্য হচ্ছে মানব জাতিকে নৈতিক পদস্খলন, বেহায়াপনা ও অশ্লীলতা থেকে রক্ষা করা’ (ইবনুল জাওযী, যাম্মুল হাওয়া, পৃ. ৩৫)। যে ব্যক্তি প্রবৃত্তির অনুসরণ ও তার চাহিদা পূরণে মশগুল থাকে, সে কার্যত প্রবৃত্তির দাস ও গোলামে পরিণত হয় এবং প্রবৃত্তি তাকে সম্পূর্ণরূপে গ্রাস করে নেয়। ইমাম শাফেঈ (রাহিমাহুল্লাহ) বলেছেন, ‘যে তার প্রবৃত্তির অনুসরণ করবে, সে প্রকারন্তরে দুনিয়াদার লোকদের দাসে পরিণত হবে’ (সিয়ারু ‘আলামিন নুবালা, ১০/৯৭)। ফুযাইল ইবনু ইয়ায (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন, ‘প্রবৃত্তির তাবেদারী যার উপর বিজয়ী হয়, তাওফীক্ব বা সামর্থ্যরে সকল রাস্তা তার জন্য বন্ধ হয়ে যায়’ (রাওযাতুল মুহিব্বীন, পৃ. ৪৭৯)। নবী (ﷺ) বলেন, ‘একজন মুমিন তার পাপকে এতটাই ভয়াবহ মনে করে, যেন সে একটা পাহাড়ের নিচে বসে আছে, আর সে পাহাড়টা তার উপর ধ্বসে পড়ার ভয় করছে। কিন্তু পাপাচারী ব্যক্তি তার পাপকে তার নাকের উপর বসা মাছির তুল্য মনে করে (যাকে সে হাত দিয়ে জড়িয়ে ধরে)’ (ছহীহ বুখারী, হা/৬৩০৮)

এমতাবস্থায় আমাদের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব হলো-আত্মাকে প্রবৃত্তির দাসত্ব থেকে মুক্ত করে আল্লাহর দাসত্বে প্রবেশ করানো। এর জন্য চাই অন্তর পরিশুদ্ধ করা, খাঁটি তাওহীদের চর্চা করা এবং কুরআন-সুন্নাহর আলোকে জীবন গড়ে তোলা। ইসলামে ছালাত, ছিয়াম, যিকির ইত্যাদি ইবাদতসমূহ নিয়মিত সম্পাদনের মাধ্যমে নফসকে নিয়ন্ত্রণ করা। এছাড়া ভবিষ্যৎ প্রজন্ম যেন প্রবৃত্তির গোলাম না হয়ে যায়, সে জন্য ছোটবেলা থেকেই তাদের ইসলামী আদর্শে গড়ে তোলা। আর মিডিয়া, বিনোদন, সোশ্যাল মিডিয়া ইত্যাদির মাধ্যমে সমাজে যে প্রবৃত্তি পূজা উৎসাহিত হচ্ছে, তার বিরুদ্ধে সাংস্কৃতিক বিপ্লব গড়ে তোলা। সুতরাং আমরা যদি প্রবৃত্তিকে নিয়ন্ত্রণ না করি, তাহলে প্রবৃত্তিই আমাদের নিয়ন্ত্রণ করে ফেলবে। ওমর ইবনু আব্দুল আযীয (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন, ‘কুপ্রবৃত্তির বিরুদ্ধে জিহাদই সর্বোত্তম জিহাদ’ (আল-আদাবুশ শারঈয়্যাহ, ৩/২৫১)। সুফিয়ান ছাওরী (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন, ‘কুপ্রবৃত্তির অনুসরণ থেকে যে যত বেশি বিরত থাকতে সক্ষম, সে তত বড় বীর পুরুষ। আর তুচ্ছ সব জিনিস থেকেই বড় বড় ধ্বংসাত্মক জিনিস জন্ম দেয়’ (ঐ)। সাহল ইবনু আব্দুল্লাহ (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন, ‘তোমার কুপ্রবৃত্তি তোমার রোগ। তুমি যদি তার বিরোধিতা কর তাহলে সেটাই হবে তোমার ঔষধ’ (তাফসীরে কুরতুবী, ১৬/১৪৪)

অতএব প্রবৃত্তির পূজা পরিহার করে, খাঁটি ঈমান, তাক্বওয়া ও ইসলামী আদর্শকে অনুসরণ করাই আমাদের মুক্তির একমাত্র পথ। অন্যথা শুধু ব্যক্তি নয়, বরং গোটা জাতি ধ্বংস্তূপে পরিণত হবে। আল্লাহ আমাদের সকলকে নফসের গোলামী থেকে মুক্ত করে, তাঁর একনিষ্ঠ দাসত্বে প্রবেশের তাওফীক্ব দান করুন- আমীন!!

رَبَّنَا تَقَبَّلۡ مِنَّا اِنَّکَ اَنۡتَ السَّیۡعُ الۡعَلِیۡمُ





প্রসঙ্গসমূহ »: সম্পাদকীয়
মানহাজের বিরোধিতা ও তার পরিণাম - সম্পাদকীয়
প্রচলিত কুসংস্কার : মুসলিমদের জন্য মরণব্যাধি ক্যান্সার - সম্পাদকীয়
জননিরাপত্তা নিশ্চিত করুন! - সম্পাদকীয়
জাতীয় ঐক্য: ভিত্তি হোক ইসলাম - সম্পাদকীয়
দ্রব্যমূল্যের উর্দ্ধগতি ও মূল রহস্য - ড. মুযাফফর বিন মুহসিন
ইলিয়াসী তাবলীগ নিষিদ্ধের নেপথ্যে - সম্পাদকীয়
নিরাপদ সমাজ প্রতিষ্ঠায় আলেম সমাজের ভূমিকা - ড. মুযাফফর বিন মুহসিন
ইসলামী বিচারব্যবস্থা : ইনছাফ ও ন্যায় প্রতিষ্ঠার চূড়ান্ত মানদণ্ড - সম্পাদকীয়
শিক্ষা জাতির মেরুদণ্ড, না-কি পঙ্গুত্ব? - সম্পাদকীয়
খুন ও ধর্ষণ : নৈরাজ্যের চরম সীমা অতিক্রম - সম্পাদকীয়
মধ্যপ্রাচ্যে আমেরিকার পরাজয় : - সম্পাদকীয়
মানুষের চরম সংকট! - সম্পাদকীয়

সর্বশেষ প্রবন্ধ

ফেসবুক পেজ