শনিবার, ০৭ মার্চ ২০২৬, ১২:২৮ অপরাহ্ন

মুনাফিক্বী আচরণ : দ্বীনদারিতার মুখোশে কুফরী চর্চা


ইসলাম একটি স্বচ্ছ, নির্ভেজাল ও ঈমানভিত্তিক জীবনব্যবস্থা। এর মূল চালিকাশক্তি হলো সত্যবাদিতা, আন্তরিকতাপূর্ণ দৃঢ় ঈমান এবং দ্বীন ও দুনিয়ার ভারসাম্যপূর্ণ পরিচালনা। এই আদর্শিক ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়ে ইসলাম সমাজ গঠন করে, সংগঠন প্রতিষ্ঠা করে এবং রাষ্ট্র পরিচালনার একটি পূর্ণাঙ্গ কাঠামো দেয়। কিন্তু এই পবিত্র কাঠামোকে ধ্বংস করার জন্য ইতিহাসে এবং সমকালীন বাস্তবতায় যে সবচেয়ে বড় অন্তর্ঘাতী শক্তির উদ্ভব পরিলক্ষিত হয়, তা হলো- মুনাফিক্বী বা নিফাক্ব। এটি এমন এক চরিত্রগত ছদ্মবেশ, যার চেহারা ইসলামী হলেও, অন্তর থাকে কুফর ও ষড়যন্ত্রে নিমজ্জিত।

সমাজে এমন একটি চরিত্র বারবার ফিরে আসে, যে মুখে বলে এক কথা, মনে রাখে আরেক কথা, যার হাসির পেছনে থাকে শাণিত ছুরি। আর শুভেচ্ছা বা আন্তরিকতার আড়ালে থাকে স্বার্থের খেলা। এই দ্বিমুখী চরিত্রকে বলা হয় মুনাফিক্ব, আর সে সমাজে নিজেকে যে মুখে পরিচয় দেয়, সেটিই তার মুখোশ। মুনাফিক্বতা কোন নতুন রোগ নয়। এটি হাজার বছরের পুরোনো। ইতিহাসের পাতা উল্টালে দেখা যাবে, ইসলামের সবচেয়ে বড় ক্ষতিগুলো এসেছে এদের হাত ধরেই। তারা কোন এক অদৃশ্য দায়বদ্ধতায় সত্যের পাশে দাঁড়ায় না, আবার অন্যায়ের বিপক্ষেও নয়, তারা শুধু দাঁড়িয়ে থাকে নিজের সুবিধাজনক জায়গায়। একজন মুনাফিক্ব যেমন ধর্মীয় অঙ্গনে বিপজ্জনক, তেমনি পারিবারিক, সামাজিক, এমনকি রাজনৈতিক ক্ষেত্রেও মারাত্মক ক্ষতিকর। তারা জনসম্মুখে ধার্মিকতার চাদরে মুখ ঢেকে রাখে, অথচ অন্তরে থাকে অন্য কিছু। আজ তারা মুক্তচিন্তার নাম করে ভণ্ডামি করে, কাল তারা নীতির কথা বলে অসততার বাজার গরম করে। মুনাফিক্ব একেক সময় একেক রূপে আত্মপ্রকাশ করে। তারা কখনই নিজের প্রকৃত চেহারা দেখায় না। তারা ‘ভালো মানুষ’ সেজে থেকে নিজের স্বার্থের পথে কৌশলে এগিয়ে যায়, আর অন্যদের নৈতিকতাকে ব্যবহার করে নিজেকে বৈধতা দেয়। মূলত মুনাফিক্ব তার ‘আক্বীদা বা বিশ্বাস, ‘আমল ও কাজ গোপন করে। মুনাফিক্বরা গিরগিটির ন্যায়- সে বিভিন্ন পরিস্থিতিতে বিভিন্ন রূপ ধারণ করে ও স্বীয় স্বার্থে সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করে।

মুনাফিক্বরা সত্যকে ব্যবহার করে মিথ্যার ভিত গড়ে এবং ধর্মকে ব্যবহার করে কুফর বাস্তবায়ন করে। তারা মন্দ কাজের আদেশ করে, ভালো কাজে নিষেধ করে, অপরাধমূলক কাজ করে, ছালাতে উদাসীন থাকে এবং লোক দেখানোর জন্য ইবাদতসমূহ সম্পাদন করে। মিথ্যা বলা, আমানতের খেয়ানত করা, অঙ্গিকার ভঙ্গ করা এবং অশ্লীল কথা বলা তাদের মজ্জাগত স্বভাব। তারা আল্লাহ ও তাঁর রাসূল (ﷺ) থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয়, দ্বীনের বিষয়ে ঠাট্টা-বিদ্রƒপ করে, কাফিরদের সাথে বন্ধুত্ব করে, ত্বাগূতের ফায়সালা কামনা করে, মুমিনদের মধ্যে ফাসাদ সৃষ্টি করে, মুসলিমদের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা ও প্রতারণা করে, তারা যমীনে ফাসাদ সৃষ্টি করে, সমাজে বিভ্রান্তি ছড়ায়- অথচ নিজেরা নিরপেক্ষতার মুখোশ পরে থাকে। তারা ইসলামের কথা বলে কিন্তু সে অনুযায়ী আমল করে না, ইসলামকে ব্যবহার করে কিন্তু তা বাস্তবায়ন করে না। তাদের কথা তাদের কাজের সাথে মেলে না; তাদের অন্তর ও বহির্জগত এক নয়; তারা একরকমভাবে প্রবেশ করে, অন্যরকমভাবে প্রস্থান করে; লোকসমক্ষে যা দেখায়, একান্তে তা ভিন্ন। তারা আল্লাহর তাওহীদের এবং নবীর রিসালাতের পরিপূর্ণ স্বীকৃতি দেয় না, নবীর সুন্নাতের প্রতি ঘৃণা-বিদ্বেষ পোষণ করে। তারা প্রকাশ্যে অনুগত এবং বিশ্বাসী কিন্তু গোপনে অস্বীকারকারী। তারা ভিতরে ইসলামের বিরোধিতা করে, ইসলামকে অপসন্দ করে, অন্তরে কুফরী লালন করে এবং কাফিরদের ভালোবাসে। তারা নিজেদের সম্মান, ক্ষমতা ও জান-মাল রক্ষা করার জন্য অথবা নিজেদের অসৎ উদ্দেশ্য হাসিল করার জন্য মুখে ইসলামের কথা বলে, ইসলামের লেবাস ধারণ করে এবং উদ্দেশ্য হাছিলের পরে তা পরিত্যাগ করে। প্রকৃতপক্ষে তাদের অন্তরে কুফরী দ্বারা পরিপূর্ণ।

রাষ্ট্রীয় পরিসরে মুনাফিক্বির রূপ হয় আরও বিপজ্জনক। ইসলামের ইতিহাসে, বিশেষ করে খেলাফত পতনের সময়কালীন ঘটনাগুলোতে বারবার দেখা যায়, আত্মঘাতী চুক্তি, অভ্যন্তরীণ বিশ্বাসঘাতকতা এবং অমুসলিমদের সঙ্গে গোপন যোগাযোগ- সবকিছুর পেছনে মুনাফিক্বদেরই ভূমিকা ছিল। ১৩৫৪ সালে স্পেনে ইসলামী শাসন পতনের আগে মুসলিম নেতাদের মধ্যে যে বিভক্তি ও বিশ্বাসঘাতকতা দেখা যায়, তা ছিল নিফাকের এক উন্মোচন। একইভাবে বাগদাদে মঙ্গোল আক্রমণের সময় মুসলিম উজিরদের মধ্যে বিশ্বাসঘাতকতা ও আল্লাহর রাসূল (ﷺ)-এর শিক্ষা থেকে বিচ্যুতি রাষ্ট্রের পতনের অন্যতম কারণ ছিল। আজকের মুসলিম রাষ্ট্রগুলোতেও এর ধারা চলমান- নামে মুসলিম, বাহ্যিকভাবে ইসলামী পরিচয়ের ধরন, কিন্তু শাসননীতি, অর্থনীতি, শিক্ষা এবং আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে তারা ইসলামের বিপরীতমুখী অবস্থান নেয়। মুনাফিক্বরা সমাজে দীর্ঘস্থায়ী হয় তখনই, যখন সত্যিকারের ঈমানদাররা চুপ থাকে, দুর্বল হয়ে পড়ে বা নিজেদের মধ্যে বিভক্ত হয়ে পড়ে। মুনাফিক্বদের মোকাবেলা কেবল ফাতাওয়া দিয়ে সম্ভব নয়, বরং একটি অন্তর্দৃষ্টি, দূরদর্শিতা এবং আপোষহীন নেতৃত্বের প্রয়োজন। যাকে হতে হবে হুজাইফা (রাযিয়াল্লাহু আনহু)-র মত দূরদর্শী, আর কর্মীদের হতে হবে ছাহাবীদের মত পরিশুদ্ধ- যারা সত্য ও মিথ্যার পার্থক্য বুঝে এবং মুখোশধারী মুনাফিক্বদের চিহ্নিত করে।

মুনাফিক্ব পৃথিবীতে ক্ষতিগ্রস্তদের অন্তর্ভুক্ত হবে এবং আখেরাতে শাস্তিযোগ্য অপরাধী হবে। কেননা, তারা দুনিয়ার অস্থায়ী স্বার্থের জন্য ইসলামকে ব্যবহার করে। ঈমানের পরিবর্তে নিকৃষ্ট কুফরকে ক্রয় করে। আল-কুরআনে এই মুখোশধারী কপটদের ব্যাপারে বলা হয়েছে যে, তারা সরল-সঠিক পথ ও কল্যাণ থেকে বঞ্চিত (বাক্বারাহ ১৬, ১৮), তাদের কোন অভিভাবক ও সাহায্যকারী থাকবে না (তাওবা ৭৪), তাদের নূর ছিনিয়ে নেয়া হবে (বাক্বারাহ ১৭; হাদীদ ১৩), দুনিয়া ও আখেরাতে তাদের আমলসমূহ নষ্ট করে দেয়া হবে এবং তারা শাস্তিপ্রাপ্ত হবে (তাওবা ৬৬, ৬৯), তাদের জন্য দুনিয়াতে রয়েছে লাঞ্ছনা এবং আখেরাতে দহন যন্ত্রণা (হজ্জ ৯)। তাদেরকে দুনিয়া এবং কবরে শাস্তি দেয়া হবে এবং ফিরিয়ে দেয়া হবে মহাশাস্তির দিকে (তাওবা ১০১)। ক্বিয়ামতের দিন তাদেরকে অপমান আচ্ছন্ন করবে এবং তাদের পিঠ তক্তার মত শক্ত হয়ে যাবে (কলম : ৪২-৪৩)। তাদের জন্য রয়েছে জাহান্নাম- যার যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি তাদেরকে চিরস্থায়ীভাবে পরিবেষ্টন করে রাখবে, যা হবে মহালাঞ্ছনা (তাওবা ৬৮, ৪৯, ৬৩) এবং তাদের চিরস্থায়ী ঠিকানা হবে জাহান্নামের তলদেশ (নিসা : ১৪৫)।

মহান আল্লাহ আমাদেরকে ভেতরের ও বাইরের সব ধরনের নিফাক্ব ও নিফাক্বী আচরণ থেকে হেফাযত করুন, সমাজ, সংগঠন ও রাষ্ট্রকে শুদ্ধ নীতিতে পরিচালনার তাওফীক দান করুন। আমাদের অন্তর হোক দৃঢ় ঈমানের ঘাঁটি, কর্ম হোক ইখলাছে পরিপূর্ণ, আর সমাজ হোক নির্ভেজাল, খাঁটি ও আলোকিত। আল্লাহ তা‘আলা আমাদের সহায় হোন-আমীন!

رَبَّنَا تَقَبَّلۡ مِنَّا اِنَّکَ اَنۡتَ السَّیۡعُ الۡعَلِیۡمُ





প্রসঙ্গসমূহ »: সম্পাদকীয়
হাদীছ অস্বীকারের পরিণাম - সম্পাদকীয়
আলেমের মর্যাদা - সম্পাদকীয়
উত্তম চরিত্রের দুর্ভিক্ষ ও পরিত্রাণের উপায় - ফাতাওয়া বোর্ড, মাসিক আল-ইখলাছ
ইসলামী দলগুলোর লেজুড়বৃত্তি ও ফলাফল - ড. মুযাফফর বিন মুহসিন
ভারতীয় আধিপত্যবাদ : স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের জন্য হুমকি - সম্পাদকীয়
উত্তপ্ত রাজনীতি ও রামাযানের আহ্বান - সম্পাদকীয়
ইসলামী শিক্ষা : উন্নত জাতি গঠনের সর্বশ্রেষ্ঠ মাধ্যম - সম্পাদকীয়
মধ্যপ্রাচ্যে আমেরিকার পরাজয় : - সম্পাদকীয়
প্রতারণার পরিণাম - সম্পাদকীয়
ইসকন: মুসলিম নিধনে হিন্দুত্ববাদী ইহুদী আগ্রাসন - সম্পাদকীয়
জ্ঞান-বিজ্ঞানে দক্ষতা অর্জন : ইসলাম, স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের রক্ষাকবচ - সম্পাদকীয়
নাস্তিকতার অভিশাপ - সম্পাদকীয়

সর্বশেষ প্রবন্ধ

ফেসবুক পেজ