রবিবার, ০৭ Jun ২০২৬, ১২:৪৭ অপরাহ্ন

ইসলামী রাজনীতি : ইনছাফ ও জনকল্যাণের বাতিঘর 


ইসলামী রাজনীতি কোন সাময়িক বা পরিস্থিতিনির্ভর ধারণা নয়; বরং এটি কুরআন-সুন্নাহ, ছাহাবায়ে কেরাম, তাবেঈনে ও তাবে-তাবেঈনের বাস্তব প্রয়োগ ও চিন্তাচর্চার মধ্য দিয়ে বিকশিত একটি পূর্ণাঙ্গ জীবনব্যবস্থা। সালাফে ছালিহীন ইসলামী রাজনীতিকে ক্ষমতা অর্জনের কৌশল হিসাবে নয়; বরং তাওহীদ প্রতিষ্ঠা, ন্যায়বিচার বাস্তবায়ন এবং মানুষের অধিকার সংরক্ষণের একটি আমানত হিসাবে দেখেছেন। সমসাময়িক বাংলাদেশী সমাজ ও রাষ্ট্রব্যবস্থার প্রেক্ষাপটে এই সালাফী দৃষ্টিভঙ্গি নতুন করে বিশ্লেষণ করা অত্যন্ত যরূরী হয়ে উঠেছে।

সালাফে ছালিহীনের নিকট ইসলামী রাজনীতি বলতে বোঝায়- শরী‘আতের আলোকে তাওহীদ ও সুন্নাহ ভিত্তিক রাষ্ট্র পরিচালনা, জনকল্যাণ নিশ্চিতকরণ এবং যুল্ম প্রতিরোধ। ইবনু উকাইল (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন, ‘সিয়াসাহ (রাজনীতি) হল এমন কার্যপদ্ধতি, যার মাধ্যমে মানুষ কল্যাণের অধিক নিকটবর্তী হয় এবং অকল্যাণ থেকে অধিক দূরে থাকে- যদিও তা রাসূল (ﷺ) প্রণয়ন করেননি এবং সে বিষয়ে কোন অহিও নাযিল হয়নি। তবে তুমি যদি ‘শরী‘আতের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ’ বলতে বোঝাও- অর্থাৎ শরী‘আত যে বিষয়ে স্পষ্টভাবে বক্তব্য রেখেছে তার বিরোধী নয়- তাহলে তা সঠিক’ (ইবনুল ক্বাইয়িম, আত-তুরুকুল হুকমিয়্যাহ ফিস সিয়াসাহ আশ-শার-ঈয়্যাহ, পৃ. ১৬)। এই সংজ্ঞা থেকে স্পষ্ট যে, সালাফে ছালিহীনের দৃষ্টিতে রাজনীতি ছিল নৈতিকতা, দায়িত্ববোধ ও জবাবদিহিতার সমন্বিত রূপ। খুলাফায়ে রাশেদীন ইসলামী রাজনীতির বাস্তব ও প্রায়োগিক রূপ উপস্থাপন করেছেন। আবূ বকর (রাযিয়াল্লাহু আনহু) তাঁর ঐতিহাসিক ভাষণে বলেন, ‘আমি তোমাদের উপর শাসক নিযুক্ত হয়েছি, অথচ আমি তোমাদের মধ্যে শ্রেষ্ঠ নই’ (ইবনু কাছীর, আস-সীরাহ আন-নাবাবিয়্যাহ, ৪/৪৯৩)। এটি সালাফে ছালিহীনের রাজনৈতিক চিন্তায় শাসকের জবাবদিহিতা, বিনয়, আমানতদারিতা ও জনস্বার্থের অগ্রাধিকারের একটি মৌলিক দলীল হিসাবে স্বীকৃত। উমার ইবনুল খাত্তাব (রাযিয়াল্লাহু আনহু) এর শাসনামলে- আইনের শাসন, শাসকের জবাবদিহিতা, নাগরিক অধিকারের সুরক্ষা- এসব এতটাই সুদৃঢ় ছিল যে, সাধারণ মানুষও শাসকের বিরুদ্ধে প্রশ্ন তুলতে পারত। এজন্য ইমাম যাহাবী (রাহিমাহুল্লাহ) তাঁর রচনাসমূহে খলীফা উমার (রাযিয়াল্লাহু আনহু)-কে ‘ন্যায়পরায়ণ ইমাম’ হিসাবে আখ্যায়িত করেছেন এবং তাঁর শাসননীতিকে কুরআন ও সুন্নাহর কঠোর অনুসরণের উৎকৃষ্ট দৃষ্টান্ত হিসাবে উপস্থাপন করেছেন।

ইমাম আল-মাওয়ার্দী (রাহিমাহুল্লাহ) ন্যায়বিচার, যোগ্যতার ভিত্তিতে নিয়োগ এবং জনগণের নিরাপত্তাকে রাষ্ট্র পরিচালনার মৌলিক নীতিমালা হিসাবে নির্ধারণ করেছেন (আল-আহকামুস সুলতানিয়্যাহ)। ইমাম ইবনুল ক্বাইয়িম (রাহিমাহুল্লাহ) এর মতে, ন্যায়বিচার ও সত্য যেখানে প্রতিষ্ঠিত, সেখানেই আল্লাহর শরী‘আতের রূপরেখা ও উদ্দেশ্য বাস্তবায়িত হয় (ই‘লামুল মুওয়াক্কক্বিঈন ‘আন-রাব্বিল ‘আলামীন, ৪/২৮৪)। এটি সালাফী রাজনৈতিক দর্শনে অন্যতম কেন্দ্রীয় নীতি। তিনি আরো বলেন, ‘নিশ্চয় ন্যায়পরায়ণ রাজনীতি (সিয়াসাহ) সম্পূর্ণ শরী‘আতের বিরোধী নয়; বরং এটি শরী‘আতের একটি অংশ এবং শরী‘আতের একটি দরজা হিসাবে গণ্য’ (ঐ)।

ইসলামী রাজনীতিতে ক্ষমতা ও নৈতিকতার কাছে একটি নিবিড় সম্পর্ক বিদ্যমান। কেননা সালাফে ছালিহীন ক্ষমতাকে কখনো লক্ষ্য হিসাবে দেখেননি; বরং এটি ছিল একটি আমানত। ইসলামের দিক নির্দেশনা অনুযায়ী নেতৃত্ব একটি আমানত। এই দৃষ্টিভঙ্গি অনুযায়ী- ক্ষমতা ব্যক্তিগত স্বার্থে ব্যবহার করা হারাম, জনগণের অধিকার হরণ যুল্ম, অন্যায় নীরবে মেনে নেয়া বিশ্বাসঘাতকতা।

বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে সালাফী রাজনৈতিক চিন্তার প্রাসঙ্গিকতা গুরুত্বের দাবি রাখে। কারণ বাংলাদেশ একটি মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশ হলেও রাষ্ট্র পরিচালনায়- নৈতিক সংকট, দুর্নীতি, রাজনৈতিক সহিংসতা, জবাবদিহিতার অভাব স্পষ্টভাবে বিদ্যমান। আর সালাফে ছালিহীনের দৃষ্টিভঙ্গি অনুযায়ী, ইসলামী রাজনীতি মানে- ইসলামকে স্লোগান বানানো নয়, ক্ষমতার জন্য দ্বীন ব্যবহার করা নয় বরং ন্যায়, ইনছাফ ও আমানতদারিতা প্রতিষ্ঠা করাই ইসলামী রাজনীতি। স্মর্তব্য যে, ইসলামী রাজনীতি তখনই শরী‘আতসম্মত হবে, যখন তা আল্লাহর বিধান বাস্তবায়নে সহায়ক হবে। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে শরী‘আতের এই নীতিগুলো প্রয়োগ করলে- রাজনৈতিক সংস্কৃতি শুদ্ধ হবে, নেতৃত্বের মান উন্নত হবে, জনগণের আস্থা পুনরুদ্ধার হবে।  বাস্তবতা হলো- ইসলামী রাজনীতির ভুল ব্যাখ্যা, দলীয় স্বার্থে ধর্মের অপব্যবহার এবং সালাফী চিন্তার সাথে চরমপন্থার ভুল সংযোগ ইত্যাদি কারণে ইসলামী রাজনীতির গ্রহণযোগ্যতা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। সালাফে সালিহীনের প্রকৃত দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরা ছাড়া এই সংকট নিরসন সম্ভব নয়। অতএব সালাফে সালিহীনের দৃষ্টিতে ইসলামী রাজনীতি একটি নৈতিক, মানবিক ও জবাবদিহিতামূলক রাষ্ট্রব্যবস্থা। এটি ক্ষমতার রাজনীতি নয়; বরং দায়িত্বের রাজনীতি। বাংলাদেশের মত মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশে এই দর্শন রাজনৈতিক সংস্কার, ন্যায়বিচার ও সামাজিক স্থিতিশীলতার জন্য একটি শক্তিশালী তাত্ত্বিক ভিত্তি প্রদান করতে পারে। তবে এর জন্য প্রয়োজন সঠিক জ্ঞান, আন্তরিকতা এবং সালাফী আদর্শের বাস্তব ও ভারসাম্যপূর্ণ প্রয়োগ।

পরিশেষে বলতে চাই, অধিকাংশ মুসলিম অধ্যুষিত বাংলাদেশে ইসলামী রাজনীতির চর্চা ও বাস্তবায়ন অবশ্যম্ভাবী। শুধু প্রয়োজন দক্ষ, অভিজ্ঞ ও যোগ্য এমন পলিটিশিয়ান, যারা হবেন সালাফী মানহাজের আলোকে ইসলামী রাজনীতি বিষয়ে পরিপূর্ণ জ্ঞানী ও প্রচলিত রাজনীতির হাল-চাল সম্পর্কে ওয়াকিফহাল। রাজনৈতিক সূক্ষèতা ও কূটনৈতিক প্রজ্ঞায় যারা হবেন অদ্বিতীয়, আর স্বচ্ছতা, সততা, ন্যায়পরায়ণতা, জনকল্যাণ নিশ্চিতকরণে যারা হবেন সিদ্ধহস্ত। ইসলামী শরী‘আতের বিধানাবলী কার্যকরীভাবে বাস্তবায়নে হবেন প্রতিজ্ঞাবদ্ধ। আল্লাহ তা‘আলা আমাদেরকে ইসলামী রাজনীতির পরিচয় ও প্রভাব সম্পর্কে জেনে এ বিষয়ে জাগ্রত সচেতন হওয়ার তাওফীক্ব দান করুন-আমীন!!


رَبَّنَا تَقَبَّلۡ مِنَّا اِنَّکَ اَنۡتَ السَّیۡعُ الۡعَلِیۡمُ






প্রসঙ্গসমূহ »: সম্পাদকীয়

সর্বশেষ প্রবন্ধ

ফেসবুক পেজ