উত্তর : মানুষের হক্ব বা বান্দার সাথে সংশ্লিষ্ট গুনাহ ইসলামে অত্যন্ত ভয়াবহ বিষয়। আল্লাহ তা‘আলা তাঁর নিজের হক্ব ইচ্ছা করলে ক্ষমা করে দিতে পারেন; কিন্তু বান্দার হক বান্দা ক্ষমা না করলে ক্বিয়ামতের দিন পর্যন্ত এর হিসাব চলতে থাকবে। গীবত, হত্যা, সম্পদ আত্মসাৎ, অপবাদ, প্রতারণা, যুল্ম ইত্যাদি সবই বান্দার হক্বের অন্তর্ভুক্ত। তাই এসব গুনাহ থেকে তাওবা করার মাধ্যমে পূর্ণ হয় না; বরং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির হক্ব আদায় করতে হয় বা তার কাছে ক্ষমা নিতে হয়। আল্লাহ তা‘আলা বলেন,
اِنَّ اللّٰہَ یَاۡمُرُ بِالۡعَدۡلِ وَ الۡاِحۡسَانِ وَ اِیۡتَآیِٔ ذِی الۡقُرۡبٰی وَ یَنۡہٰی عَنِ الۡفَحۡشَآءِ وَ الۡمُنۡکَرِ وَ الۡبَغۡیِ ۚ یَعِظُکُمۡ لَعَلَّکُمۡ تَذَکَّرُوۡنَ
‘নিশ্চয় আল্লাহ ন্যায়বিচার, সদাচার ও আত্মীয়কে দান করার নির্দেশ দেন এবং অশ্লীলতা, অন্যায় ও সীমালঙ্ঘন থেকে নিষেধ করেন’ (সূরা আল-নাহল : ৯০)। তিনি আরও বলেন,
وَ الَّذِیۡنَ یُؤۡذُوۡنَ الۡمُؤۡمِنِیۡنَ وَ الۡمُؤۡمِنٰتِ بِغَیۡرِ مَا اکۡتَسَبُوۡا فَقَدِ احۡتَمَلُوۡا بُہۡتَانًا وَّ اِثۡمًا مُّبِیۡنًا
‘যারা মুমিন পুরুষ ও মুমিন নারীদের অন্যায়ভাবে কষ্ট দেয়, তারা অপবাদ ও প্রকাশ্য গুনাহ বহন করে’ (সূরা আল-আহযাব : ৫৮)। রাসূল (ﷺ) বলেছেন, ‘তোমরা কি জানো নিঃস্ব কে? ছাহাবীগণ বললেন, আমাদের মধ্যে নিঃস্ব হল- যার টাকা-পয়সা নেই। তিনি বললেন, আমার উম্মতের প্রকৃত নিঃস্ব সে ব্যক্তি, যে ক্বিয়ামতের দিন ছালাত, ছিয়াম ও যাকাত নিয়ে আসবে; কিন্তু সে কাউকে গালি দিয়েছে, কাউকে অপবাদ দিয়েছে, কারও সম্পদ ভক্ষণ করেছে, কারও রক্তপাত করেছে, কাউকে প্রহার করেছে। তখন তার নেক আমল থেকে এদেরকে দেয়া হবে। যদি নেক আমল শেষ হয়ে যায় অথচ হক বাকি থাকে, তবে তাদের গুনাহ তার উপর চাপিয়ে দেয়া হবে; এরপর তাকে জাহান্নামে নিক্ষেপ করা হবে’ (ছহীহ মুসলিম, হা/২৫৮১)। এ কারণে কোন ব্যক্তি যদি গীবত বা বান্দার হক্ব সম্পর্কিত গুনাহ করে, তাহলে তার জন্য কয়েকটি বিষয় যরূরী।
প্রথমতঃ আন্তরিক তওবা করতে হবে। তওবার মূল শর্ত হল- গুনাহ ছেড়ে দেয়া, কৃতকর্মের জন্য গভীর অনুতপ্ত হওয়া এবং ভবিষ্যতে আর না করার দৃঢ় সংকল্প করা। আল্লাহ তা‘আলা বলেন, وَ تُوۡبُوۡۤا اِلَی اللّٰہِ جَمِیۡعًا اَیُّہَ الۡمُؤۡمِنُوۡنَ لَعَلَّکُمۡ تُفۡلِحُوۡنَ ‘হে মুমিনগণ! তোমরা সবাই আল্লাহর নিকট তওবা কর, যাতে তোমরা সফল হতে পার’ (সূরা আন-নূর : ৩১)। দ্বিতীয়তঃ যার গীবত বা অন্যকোনো অধিকার ক্ষুণ্ন করা হয়েছে, সম্ভব হলে তার কাছে ক্ষমা চাওয়া উত্তম। কারণ এটি মানুষের হক্ব। রাসূল (ﷺ) বলেছেন, مَنْ كَانَتْ لَهُ مَظْلَمَةٌ لأَخِيْهِ مِنْ عِرْضِهِ أَوْ شَيْءٍ فَلْيَتَحَلَّلْهُ مِنْهُ الْيَوْمَ ‘যার কাছে তার ভাইয়ের সম্মান বা অন্য কোন বিষয়ে যুল্ম থাকে, সে যেন আজই তার থেকে ক্ষমা নিয়ে নেয়’ (ছহীহ বুখারী, হা/২৪৪৯)।
তবে অনেক সময় সরাসরি গিয়ে ক্ষমা চাইলে আরো বড় ফিতনা, ঝগড়া বা সম্পর্ক নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা থাকে। এ অবস্থায় তার জন্য বেশি বেশি দু‘আ করা, তার প্রশংসা করা এবং তার জন্য ইস্তিগফার করা যথেষ্ট হবে আশা করা যায়। আর সম্পদ সংক্রান্ত কিছু হলে ফেরত দেয়া। সম্ভব না হলে দান করে দেয়া। ইমাম নববী (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন, ‘যদি গীবতের কথা সেই ব্যক্তির কাছে পৌঁছে যায়, তাহলে তার কাছে ক্ষমা চাওয়া উচিত। আর যদি না পৌঁছে থাকে, তাহলে তার জন্য দু‘আ ও ইস্তিগফার করবে’ (আল-আযকার, পৃ. ৩৬৮)। সঊদী আরবের স্থায়ী ফতোয়া বোর্ড বলেন, ‘যদি গীবতের বিষয়টি ঐ ব্যক্তির কাছে পৌঁছেনি এবং জানালে ফিতনার আশঙ্কা থাকে, তাহলে তার জন্য দু‘আ করবে, তার ভালো গুণাবলি উল্লেখ করবে এবং যেখানে তার গীবত করেছে সেখানে তার প্রশংসা করবে’ (ফাতাওয়া আল-লাজনাহ আদ-দায়িমা, ২৬/১০ পৃ.)।
আর যদি সেই ব্যক্তিকে খুঁজে পাওয়া না যায়, মারা যায়, যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায় বা কোথায় আছে জানা না যায়, তাহলে তার জন্য বেশি বেশি দু‘আ করা, ছাদাক্বাহ করা, ইস্তিগফার করা এবং আল্লাহর কাছে তার হক মাফ চাওয়া উচিত। আশা করা যায় আল্লাহ তা‘আলা ক্বিয়ামতের দিন বান্দাদের মাঝে সমাধান করে দেবেন।
প্রশ্নকারী : মুহাম্মদ রাহুল, ঢাকা।