শী‘আ মতবাদের স্বরূপ ও তাদের বিভ্রান্তি
- মূল : শায়খ মুহাম্মাদ আব্দুস সাত্তার আত-তূনসাবী
- অনুবাদ : ড. মো: আমিনুল ইসলাম*
(২য় কিস্তি)
ভ্রান্ত আক্বীদা-৩: বর্তমানে বিদ্যমান কুরআন বিকৃত ও পরিবর্তিত।
শী‘আরা মুসলিমদের নিকট বর্তমানে বিদ্যমান কুরআনকে তিনটি কারণে বিশ্বাস স্থাপন করে না। যথা-
প্রথম কারণ : শী‘আদের আক্বীদা অনুযায়ী ছাহাবীগণ সকলেই মিথ্যাবাদী। তারা বিশ্বাস করে যে, ‘মিথ্যা বলা ইবাদত’। অনুরূপভাবে আহলে বাইত তথা নবী পরিবারের ইমামগণ মিথ্যাবাদী এবং ‘তাক্বীয়া’-র অনুসারী। সুতরাং যখন সকল ছাহাবী ও আহলে বাইত তথা নবী পরিবারের ইমামগণ মিথ্যাবাদী হয়ে যায়, তখন তারা কারা, যারা রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর কাছ থেকে এই কুরআন মাজীদ যথাযথভাবে পৌঁছাবে?
দ্বিতীয় কারণ : যেহেতু অনুযায়ী ছাহাবীগণ মিথ্যাবাদী ছিলেন। আর তারাই আল-কুরআনুল কারীম কপি করেছেন এবং বর্ণনা করেছেন। আর আহলে বাইত তথা নবী পরিবারের ইমামগণ তা বর্ণনা, সংকলন ও সত্যায়ন কোনটাই করেনি। সুতরাং কিভাবে রাফেযী ও শী‘আরা বিদ্যমান এই কুরআনের বিশুদ্ধতা ও পরিপূর্ণতার ব্যাপারে আস্থা পোষণ করবে?
তৃতীয় কারণ : শী‘আদের মত অনুযায়ী তাদের কিতাবসমূহে বর্ণিত বর্ণনাসমূহ, যার সংখ্যা দুই হাযার ছাড়িয়ে গেছে। আর প্রত্যেকটি বর্ণনাই স্পষ্ট করে বলে যে, আমাদের নিকট বিদ্যমান কুরআন বিকৃত, পরিবর্তিত এবং তার থেকে কম-বেশি করা হয়েছে।
আমরা শী‘আদের কিতাবসমূহ থেকে সামান্য কিছু বর্ণনা সূত্র সহ পেশ করব, যাতে প্রমাণ হবে যে, তারা আল-কুরআন বিকৃত হয়েছে বলে বিশ্বাস করে থাকে।
মুহাম্মাদ ইবনু ইয়াকূব আল-কুলাইনী তার ‘উছূলুল কাফী (أصول الكافي)’ নামক গ্রন্থে باب أنه لم يجمع القرآن كله إلا الأئمة و أنهم يعلمون علمه كله ‘ইমামগণই আল-কুরআনকে পরিপূর্ণ সংকলন করেন এবং তারাই তার পরিপূর্ণ জ্ঞান রাখে’ অনুচ্ছেদ শিরোনামের অধীনে বর্ণনা করেন,
১- ‘জাবের থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, ‘আমি আবূ জা‘ফরকে বলতে শুনেছি, মানুষের মধ্যে মিথ্যাবাদী ছাড়া কেউ দাবি করতে পারে না যে, আল্লাহ যেভাবে কুরআন নাযিল করেছেন, সে তা পরিপূর্ণভাবে সেভাবে সংকলন করেছে; বরং আলী ইবনু আবী তালিব ও তার পরবর্তী ইমামগণই আল্লাহ যেভাবে তা নাযিল করেছেন, ঠিক সেভাবে সংকলন ও সংরক্ষণ করেছেন’।
২- কুলাইনী তার ‘উছূলুল কাফী (أصول الكافي)’ নামক গ্রন্থের ২৬৪ পৃষ্ঠায় তিনি আরও বর্ণনা করেন, ‘আবূ আব্দুল্লাহ থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, জিবরীল (আলাইহিস সালাম) মুহাম্মাদ (ﷺ)-এর উপর এই আয়াত নাযিল করেন, يَا أَيُّهَا الَّذِيْنَ أُوْتُوا الْكِتَابَ آمَنُوْا بِمَا نَزَّلْنَا فِيْ عَلِي نُوْرًا مُبِيْنًا ‘হে যাদেরকে কিতাব দেয়া হয়েছে! আমরা আলীর ব্যাপারে যে সুস্পষ্ট নূর বা আলো অবতীর্ণ করেছি, তার প্রতি বিশ্বাস স্থাপন কর’।
৩- তাদের কেউ কেউ বলে, ওছমান কুরআনের কপিগুলো পুড়িয়ে দিয়েছে এবং আলী ও তার পরিবার-পরিজনের মর্যাদা বর্ণনায় যেসব সূরা ছিল, সে তা ধ্বংস কর দিয়েছে; তন্মধ্যে এই সূরাটিও ছিল,
بسم الله الرحمن الرحيم يا أيها الذين آمنوا آمنوا بالنورين أنزلناهما يتلوان عليكم آياتي و يحذرانكم عذاب يوم عظيم نوران بعضهما من بعض و أنا السميع العليم
‘আল্লাহর নামে শুরু করছি, যিনি রহমান ও রহীম; হে ঈমানদারগণ! তোমরা দুই নূরের প্রতি বিশ্বাস স্থাপন কর, যা আমরা নাযিল করেছি; তারা তোমাদের নিকট আমার আয়াতসমূহ তিলাওয়াত করবে এবং মহান দিবসের শাস্তির ভয় প্রদর্শন করবে; উভয় নূর পরস্পর পরস্পরের অংশ; আর আমি শ্রবণকারী, জ্ঞানী’।[১]
৪- আর মোল্লা হাসান উল্লেখ করেন, ‘আবূ জা‘ফর থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, ‘যদি আল্লাহর কিতাবের মধ্যে কম-বেশি করা না হত, তবে কোন বিবেকবানের কাছেই আমাদের হক (অধিকার) গোপন থাকত না’।[২]
৫- নূরী আত-তাবারসী ‘ফাছলুল খিত্বাব’ (فصل الخطاب)-এর মধ্যে বলেন, ‘আমীরুল মুমিনীনের একটি বিশেষ কুরআন ছিল, যা তিনি রাসূলুল্লাহ (ﷺ) ইন্তিকালের পর নিজেই সংকলন করেন এবং তা জনসমক্ষে পেশ করেন। কিন্তু তারা তা উপেক্ষা করে। অতঃপর তিনি তা তাদের দৃষ্টি থেকে গোপন করে রাখেন। আর তা ছিল তার সন্তান তথা বংশধরের নিকট সংরক্ষিত।[৩]
৬- হুসাইন আন-নূরী আত-তাবারসী ‘ফাছলুল খিত্বাব’ (فصل الخطاب) নামক গ্রন্থের মধ্যে আরো বলেন, ‘অনেক প্রবীণ রাফেযীর নিকট থেকে বর্ণিত আছে যে, আমাদের নিকট যে কুরআন বিদ্যমান আছে, তা ঐ কুরআন নয়, যা আল্লাহ তা‘আলা মুহাম্মাদ (ﷺ)-এর উপর নাযিল করেছেন; বরং তা রদবদল করা হয়েছে এবং তাতে কম-বেশি করা হয়েছে’।[৪]
৭- মোল্লা হাসান বর্ণনা করেন, ‘আবূ জা‘ফর থেকে বর্ণিত, আল-কুরআন থেকে অনেক আয়াত বাদ দেয়া হয়েছে; আর কতগুলো শব্দ বৃদ্ধি করা হয়েছে’।[৫] মোল্লা হাসান আরও বলেন, ‘আহলে বাইত তথা নবী পরিবারের সূত্রে বর্ণিত এসব কাহিনী ও অন্য বর্ণনাসমূহ থেকে বুঝা যায় যে, আমাদের মধ্যে প্রচলিত কুরআন মুহাম্মাদ (ﷺ)-এর উপর অবতীর্ণ কুরআনের মত পরিপূর্ণ নয়; বরং তার মাঝে আল্লাহ যা নাযিল করেছেন, তার পরিপন্থী আয়াত যেমন রয়েছে; আবার তেমনি পরিবর্তিত ও বিকৃত আয়াতও রয়েছে। আর তার থেকে অনেক কিছু বিলুপ্ত করা হয়েছে; তন্মধ্যে অনেক জায়গায় আলী’র নাম বিলুপ্ত করা হয়েছে; আবার একাধিক বার ‘آل محمد’ (মুহাম্মাদের বংশধর) শব্দটি বিলুপ্ত করা হয়েছে; আরও বিলুপ্ত করা হয়েছে মুনাফিকদের নামসমূহ এবং ইত্যাদি ইত্যাদি। আর এটা আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের পসন্দসই ক্রমধারা অনুযায়ী সাজানোও নয়’।[৬]
৮- কুলাইনী বর্ণনা করেন, ‘আবু আব্দুল্লাহ থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, ‘নিশ্চয় জিবরীল (আলাইহিস সালাম) যে কুরআন মুহাম্মাদ (ﷺ)-এর নিকট নিয়ে এসেছে, তাতে আয়াত সংখ্যা সতের হাযার’।[৭] অথচ আমাদের সামনে বিদ্যমান কুরআনে আছে (মতান্তরে) ছয় হাযার ছয়শত ছেষট্টি[৮] আয়াত। সুতরাং মনে হচ্ছে যেন তার থেকে প্রায় দুই তৃতীয়াংশ আয়াত বিলুপ্ত করা হয়েছে এবং শুধু এক তৃতীয়াংশ আয়াত বাকি আছে।
পর্যালোচনা
পবিত্র কিতাবকে কেন্দ্র করে তাদের আক্বীদাসমূহ স্পষ্ট ভ্রান্ত। কারণ এ কিতাবের সামনে ও পেছনে কোনভাবেই বাতিল আগমন করতে পারে না। কারণ এটি প্রজ্ঞাময় প্রশংসিত আল্লাহর নাযিলকৃত কিতাব। এই সম্মানিত কিতাবের ব্যাপারে আল্লাহ তা‘আলা বলেন,
المّ ذٰلِکَ الۡکِتٰبُ لَا رَیۡبَ فِیۡہِ ہُدًی لِّلۡمُتَّقِیۡنَ
‘আলিফ-লাম-মীম, এটা সেই কিতাব; এতে কোন সন্দেহ নেই, মুত্তাক্বীদের জন্য তা পথ প্রদর্শক’ (সূরা আল-বাক্বারাহ : ১-২)। তিনি আরও বলেন, اِنَّا نَحۡنُ نَزَّلۡنَا الذِّکۡرَ وَ اِنَّا لَہٗ لَحٰفِظُوۡنَ ‘নিশ্চয় আমরাই কুরআন অবতীর্ণ করেছি এবং অবশ্যই আমরাই তার সংরক্ষক’ (সূরা আল-হিজর : ৯)। তিনি আরও বলেন,
لَا تُحَرِّکۡ بِہٖ لِسَانَکَ لِتَعۡجَلَ بِہٖ .اِنَّ
عَلَیۡنَا جَمۡعَہٗ وَ قُرۡاٰنَہٗ . فَاِذَا
قَرَاۡنٰہُ فَاتَّبِعۡ قُرۡاٰنَہٗ . ثُمَّ اِنَّ عَلَیۡنَا بَیَانَہٗ.
‘তাড়াতাড়ি অহী আয়ত্ব করার জন্য আপনি আপনার জিহ্বা তার সাথে সঞ্চালন করবেন না। এটা সংরক্ষণ ও পাঠ করাবার দায়িত্ব আমারই। সুতরাং যখন আমরা তা পাঠ করি, তখন আপনি সেই পাঠের অনুসরণ করুন; অতঃপর এর বিশদ ব্যাখ্যার দায়িত্ব আমারই’ (সূরা আল-ক্বিয়ামাহ : ১৬-১৯)। অন্যত্র তিনি বলেন, وَ اِنۡ کُنۡتُمۡ فِیۡ رَیۡبٍ مِّمَّا نَزَّلۡنَا عَلٰی عَبۡدِنَا فَاۡتُوۡا بِسُوۡرَۃٍ مِّنۡ مِّثۡلِہٖ ‘আমরা আমার বান্দার প্রতি যা অবতীর্ণ করেছি, তাতে তোমাদের কোন সন্দেহ থাকলে তোমরা তার অনুরূপ কোন সূরা নিয়ে আস’ (সূরা আল-বাক্বারাহ : ২৩)। তিনি আরও বলেন,
قُلۡ لَّئِنِ اجۡتَمَعَتِ الۡاِنۡسُ وَ الۡجِنُّ عَلٰۤی اَنۡ یَّاۡتُوۡا بِمِثۡلِ ہٰذَا الۡقُرۡاٰنِ لَا یَاۡتُوۡنَ بِمِثۡلِہٖ وَ لَوۡ کَانَ بَعۡضُہُمۡ لِبَعۡضٍ ظَہِیۡرًا
‘(হে নবী!) আপনি বলুন, যদি এই কুরআনের অনুরূপ কুরআন নিয়ে আসার জন্য মানুষ ও জিন সমবেত হয় এবং যদিও তারা পরস্পরকে সাহায্য করে, তবুও তারা এর অনুরূপ আনয়ন করতে পারবে না’ (সূরা বানী ইসরাঈল : ৮৮)।
মুসলিমগণ সামগ্রিকভাবে ঐকমত্য পোষণ করেছেন যে, নিশ্চয় পূর্ব থেকে পশ্চিম পর্যন্ত এবং তন্মধ্যবর্তী স্থানে অবস্থানরত মুসলিমদের সামনে বিদ্যমান আল-কুরআনের কপিগুলোর প্রথম থেকে শুরু করে সূরা ফালাক্ব ও নাসের শেষ পর্যন্ত আল্লাহ তা‘আলার বাণী এবং তার অহী, যা তিনি তাঁর নবী মুহাম্মাদ (ﷺ)-এর উপর নাযিল করেছেন। সুতরাং তার একটি হরফ (অক্ষর) যে অস্বীকার করবে, সে কাফির।
ভ্রান্ত আক্বীদা-৪: মুমিন জননী নবী করীম (ﷺ)-এর স্ত্রীদেরকে অপমান করা।
মুহাম্মাদ বাকের আল-মজলিসী ‘হাক্কুল ইয়াক্বীন’ (حق اليقين) নামক গ্রন্থে ফারসী ভাষায় বলেন,
وعقيدتنا (الشيعة (في التبرؤ : أننا نتبرأ من الأصنام الأربعة: أبي بكر وعمر وعثمان ومعاوية، والنساء الربع: عائشة وحفصة وهند وأم الحكم، ومن جميع أتباعهم وأشياعهم، وأنهم شر خلق الله على وجه الأرض، وأنه لا يتم الإيمان بالله ورسوله والأئمة إلا بعد التبرؤ من أعدائهم
‘দায়মুক্তির ব্যাপারে আমাদের (শী‘আদের) আক্বীদা ও বিশ্বাস হল, আমরা আবূ বকর, ওমর, ওছমান ও মু‘আবিয়ার মত চার মূর্তি থেকে মুক্ত। আমরা আরও মুক্ত আয়েশা, হাফছা, হিন্দা ও উম্মুল হেকামের মত চার নারী এবং তাদের অনুসারী ও তাদের বিভিন্ন দল-গোষ্ঠী থেকে। তারা হল পৃথিবীর বুকে আল্লাহর নিকৃষ্ট সৃষ্টি। আর তাদের শত্রুদের থেকে মুক্ত হওয়ার পরেই শুধু আল্লাহ, তাঁর রাসূল ও ইমামদের প্রতি ঈমান পরিপূর্ণতা লাভ করবে’।[৯] ইমাম মুহাম্মাদ বাকের বলেন,
إذا ظهر الإمام المهدي فإنه سيحيي عائشة ويقيم عليها الحد انتقاماً لفاطمة
‘যখন ইমাম মাহদী আত্মপ্রকাশ করবে, তখন তিনি অতিসত্বর আয়েশাকে জীবিত করবেন এবং ফাতেমার প্রতিশোধ হিসাবে তার উপর শাস্তির বিধান (হদ) কায়েম করবেন’।[১০]
আহমাদ ইবনু আবী তালিব আত-তাবারসী ‘আল-ইহতিজাজ’ নামক গ্রন্থের ২য় খণ্ডের ২৪০ পৃষ্ঠায় উল্লেখ করেন, ‘আলী উম্মুল মুমনীন আয়েশাকে উদ্দেশ্য করে বলেন, আল্লাহর শপথ! তিনি আমাকে তাকে ত্বালাক্ব দেয়ার সিদ্ধান্ত দিয়ে গেছেন ...। রাসূলুল্লাহ (ﷺ) আলীকে উদ্দেশ্য করে বলেছেন, ‘হে আলী! আমার স্ত্রীদের বিষয়টি আমার অবর্তমানে তোমার হাতে দিয়ে গেলাম’। অর্থাৎ রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর পরে আলী (রাযিয়াল্লাহু আনহু)-এর অধিকার ছিল যে, তিনি ইচ্ছা করলে তাঁর (রাসূলের) পবিত্র স্ত্রীদের যে কাউকে ত্বালাক্ব দিতে পারতেন।
পর্যালোচনা
শী‘আরা বিশেষ করে উম্মুল মুমেনীন আয়েশা ছিদ্দীকা (রাযিয়াল্লাহু আনহা) এবং রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর অপরাপর স্ত্রীগণের মর্যাদা ক্ষুণ্ন করার জন্য এই মিথ্যা ও বানোয়াট বর্ণনার উদ্ভাবন করেছে। অথচ আল্লাহ তা‘আলা আল-কুরআনুল কারীমের মধ্যে নবী (ﷺ)-এর স্ত্রীগণের গুণাগুণ বর্ণনা করেছেন। তিনি তাঁর নবীকে উদ্দেশ্য করে তাঁর এসব স্ত্রীদের শানে বলেন,
لَا یَحِلُّ لَکَ النِّسَآءُ مِنۡۢ بَعۡدُ وَ لَاۤ اَنۡ تَبَدَّلَ بِہِنَّ مِنۡ اَزۡوَاجٍ وَّ لَوۡ اَعۡجَبَکَ حُسۡنُہُنَّ اِلَّا مَا مَلَکَتۡ یَمِیۡنُکَ ؕ وَ کَانَ اللّٰہُ عَلٰی کُلِّ شَیۡءٍ رَّقِیۡبًا
‘এরপর আপনার জন্য কোন নারী বৈধ নয় এবং আপনার স্ত্রীদের পরিবর্তে অন্য স্ত্রী গ্রহণও বৈধ নয়, যদিও তাদের সৌন্দর্য আপনাকে মুগ্ধ করে; তবে আপনার অধিকারভুক্ত দাসীদের ব্যাপারে এই বিধান প্রযোজ্য নয়। আল্লাহ সমস্ত কিছুর উপর তীক্ষ্ম দৃষ্টি রাখেন’ (সূরা আল-আহযাব : ৫২)। তিনি আরও বলেন, اَلنَّبِیُّ اَوۡلٰی بِالۡمُؤۡمِنِیۡنَ مِنۡ اَنۡفُسِہِمۡ وَ اَزۡوَاجُہٗۤ اُمَّہٰتُہُمۡ ‘নবী মুমিনদের নিকট তাদের নিজেদের অপেক্ষা ঘনিষ্ঠতর এবং তার স্ত্রীগণ তাদের মাতা’ (সূরা আল-আহযাব : ৬)। তিনি আরও বলেন, یٰنِسَآءَ النَّبِیِّ لَسۡتُنَّ کَاَحَدٍ مِّنَ النِّسَآءِ ‘হে নবী-পত্নিগণ! তোমরা অন্য নারীদের মত নও’ (সূরা আল-আহযাব : ৩২)। তাঁদের (উম্মুহাতুল মুমিনীন) ব্যাপারে আয়াত নাযিল হয়েছে যে, اِنَّمَا یُرِیۡدُ اللّٰہُ لِیُذۡہِبَ عَنۡکُمُ الرِّجۡسَ اَہۡلَ الۡبَیۡتِ وَ یُطَہِّرَکُمۡ تَطۡہِیۡرًا ‘হে নবী-পরিবার! আল্লাহ তো শুধু চান তোমাদের থেকে অপবিত্রতা দূর করতে এবং তোমাদেরকে সম্পূর্ণরূপে পবিত্র করতে’ (সূরা আল-আহযাব : ৩৩)।
বিশেষ করে আয়েশা ছিদ্দীকা (ﷺ)-এর পবিত্রতা ও পরিপূর্ণতার ব্যাপারে আল্লাহ তা‘আলা সূরা নূরের আয়াতসমূহ নাযিল করেছেন। আর তা সুস্পষ্ট করে বলে দিয়েছে যে, যে ব্যক্তি তাঁর ব্যাপারে মিথ্যা অপবাদ দেয় এবং তাঁর ব্যাপারে মিথ্যা অপবাদ দেয়ার জন্য মিথ্যা ও বানোয়াট বর্ণনাসমূহের উদ্ভাবন করে, সে ব্যক্তি মুনাফিক গোষ্ঠীর অন্তর্ভুক্ত। আল্লাহ তা‘আলা সূরার শেষ অংশে বলেন, یَعِظُکُمُ اللّٰہُ اَنۡ تَعُوۡدُوۡا لِمِثۡلِہٖۤ اَبَدًا اِنۡ کُنۡتُمۡ مُّؤۡمِنِیۡنَ ‘আল্লাহ তোমাদেরকে উপদেশ দিচ্ছেন, তোমরা যদি মুমিন হও, তবে কখনও অনুরূপ আচরণের পূনরাবৃত্তি করো না’ (সূরা আন-নূর : ১৭)।
ভ্রান্ত আক্বীদা-৫ : খুলাফায়ে রাশেদীন, মুহাজিরীন ও আনছার (রাযিয়াল্লাহু আনহুম)-কে অপমান করা।
আল-কুলাইনী ‘ফুরূঊল কাফী (فروع الكافي)’ নামক গ্রন্থে উল্লেখ করেন, ‘আবূ জা‘ফর থেকে বর্ণিত, নবী (ﷺ)-এর ইন্তিকালের পর তিনজন ব্যতীত বাকি সকল মানুষ ধর্মত্যাগীদের অন্তর্ভুক্ত হয়ে গেছে। তখন আমি জিজ্ঞেস করলাম, সে তিন ব্যক্তি কে? জবাবে তিনি বললেন, মিক্বদাদ ইবনুল আসওয়াদ, আবূ যার আল-গিফারী এবং সালমান ফারসী’।[১১]
মুহাম্মাদ বাকের আল-মাজলিসী আরো বলেন, أن أبابكر وعمر هما فرعون وهامان ‘নিশ্চয় আবূ বকর এবং ওমর উভয় হলেন ফেরাউন ও হামান’।[১২] ‘তাক্বরীবুল মা‘আরিফ (تقريب المعارف)’ নামক গ্রন্থে উল্লেখ করা হয়েছে যে, ‘আলী ইবনু হুসাইনকে উদ্দেশ্য করে তার মাওলা (মুক্ত দাস) বলল, আপনার উপর আমার খেদমতের হক রয়েছে। সুতরাং আপনি আমাকে আবূ বকর ও ওমর সম্পর্কে সংবাদ দিন? তখন আলী ইবনু হুসাইন বলল, তারা উভয়ে কাফির ছিল। আর যে ব্যক্তি তাদেরকে ভালবাসবে, সেও কাফির’।[১৩]
কাশি আরও বর্ণনা করেন, ‘কুমাইত বলল, হে আমার নেতা! আমি আপনাকে একটি মাসআলা জিজ্ঞেস করব। অতঃপর তিনি বললেন, জিজ্ঞেস কর। তখন সে বলল, আমি আপনাকে দুই ব্যক্তি সম্পর্কে জিজ্ঞেস করছি; তখন তিনি বললেন, হে কুমাইত ইবন যায়েদ! ইসলামের মধ্যে যত রক্তপাত, অবৈধভাবে সম্পদ অর্জন এবং অবৈধভাবে যৌনকাম চরিতার্থ করার দায়ভার রয়েছে তা তাদের (দুই ব্যক্তির) ঘাড়ে বর্তাবে ঐ দিন পর্যন্ত, যেদিন আমাদের ইমাম (মাহদী) দাঁড়াবে। আর আমরা বনু হাশিমের জনসমষ্টি আমাদের বড় ও ছোটদেরকে নির্দেশ দিচ্ছি তাদেরকে গালি দিতে এবং তাদের থেকে মুক্তি ঘোষণা করতে’।[১৪]
মাকবুল আহমাদ তার ‘তরজমাতু লি মা‘আনিল কুরআন’ (ترجمة لمعاني القرآن)-এর মধ্যে উর্দূ ভাষায় বলেন, যার অনুবাদ হল, الفحشاء (অশ্লীলতা) দ্বারা উদ্দেশ্য হল- প্রথম নেতা আবূ বকর; المنكر (মন্দ) দ্বারা উদ্দেশ্য হল দ্বিতীয় শায়খ ওমর এবং البغي (বিদ্রোহ) দ্বারা উদ্দেশ্য হল তৃতীয় পর্দা ওছমান’। মাকবুল আহমাদ উর্দূ ভাষায় আরও বলেন, ‘الكفر (অস্বীকার) দ্বারা উদ্দেশ্য হল প্রথম নেতা আবূ বকর, الفسوق (পাপাচার) দ্বারা উদ্দেশ্য হল দ্বিতীয় শায়খ ওমর এবং العصيان (অমান্য করা) দ্বারা উদ্দেশ্য হল তৃতীয় পর্দা ওছমান’।[১৫]
পর্যালোচনা
হে মানব মণ্ডলী! তোমরা এই নোংরা বর্ণনাসমূহের ব্যাপারের চিন্তা-ভাবনা কর, যেগুলো শী‘আ সম্প্রদায়ের পূর্ববর্তী ও পরবর্তীগণ কর্তৃক আল-কুরআনুল কারীমের অর্থসমূহ বিকৃতিকরণের সংবাদ দিচ্ছে। আরও সংবাদ দিচ্ছে তাদের পক্ষ থেকে আল-কুরআনের মনগড়া তাফসীর প্রসঙ্গে, যে ব্যাপারে আল্লাহ কোন কিছু নাযিল করেননি। আরও জানিয়ে দিচ্ছে রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর বড় বড় ছাহাবীদের উপর তাদের দেয়া মিথ্যা অপবাদ সম্পর্কে, যাদেরকে রাসূলুল্লাহ (ﷺ) স্বয়ং সঠিক পন্থায় তা‘লীম (শিক্ষা) ও তারবিয়াত (প্রশিক্ষণ) দিয়েছেন এবং তাদেরকে পরিশুদ্ধ করেছেন। আর আল-কুরআন তাদেরকে আল্লাহর পক্ষ থেকে জান্নাত, ক্ষমা ও সন্তুষ্টির সনদ দিয়েছে। আল্লাহ তাদের প্রতি সন্তুষ্ট; আর তারাও তাঁর প্রতি সন্তুষ্ট। আল্লাহ তা‘আলা তাদের ব্যাপারে বলেন, وَ اَعَدَّ لَہُمۡ جَنّٰتٍ تَجۡرِیۡ تَحۡتَہَا الۡاَنۡہٰرُ خٰلِدِیۡنَ فِیۡہَاۤ اَبَدًا ‘এবং তিনি তাদের জন্য জান্নাত প্রস্তুত করেছেন, যার নিম্নদেশে নদী প্রবাহিত, যেথায় তারা চিরস্থায়ী হবে’ (সূরা আত-তওবাহ : ১০০)।
তিনি আরও বলেন, اُولٰٓئِکَ ہُمُ الۡمُؤۡمِنُوۡنَ حَقًّا لَہُمۡ دَرَجٰتٌ عِنۡدَ رَبِّہِمۡ ‘তারাই প্রকৃত মুমিন। তাদের প্রতিপালকের নিকট তাদেরই জন্য রয়েছে মর্যাদা...’ (সূরা আল-আনফাল : ৪)। আর তাদের সম্পর্কে তিনি আরও বলেন, وَ اَلۡزَمَہُمۡ کَلِمَۃَ التَّقۡوٰی وَ کَانُوۡۤا اَحَقَّ بِہَا وَ اَہۡلَہَا ‘আর তাদেরকে তাক্বওয়ার বাক্যে সুদৃঢ় করলেন এবং তারাই ছিল এর অধিকতর যোগ্য ও উপযুক্ত’ (সূরা আল-ফাত্হ : ২৬)। তাদের সম্পর্কে আল্লাহ তা‘আলা আরও বলেন, وَ لٰکِنَّ اللّٰہَ حَبَّبَ اِلَیۡکُمُ الۡاِیۡمَانَ وَ زَیَّنَہٗ فِیۡ قُلُوۡبِکُمۡ وَ کَرَّہَ اِلَیۡکُمُ الۡکُفۡرَ وَ الۡفُسُوۡقَ وَ الۡعِصۡیَانَ ‘কিন্তু আল্লাহ তোমাদের নিকট ঈমানকে প্রিয় করেছেন এবং তাকে তোমাদের হৃদয়গ্রাহী করেছেন। আর কুফ্রী, পাপাচার ও অবাধ্যতাকে করেছেন তোমাদের নিকট অপ্রিয়’ (সূরা আল-হুজুরাত : ৭)। এগুলো ছাড়া আরও বহু আয়াতে তাদের মর্যাদা বর্ণিত হয়েছে।
(ইনশাআল্লাহ চলবে)
* ভাইস প্রিন্সিপ্যাল, গাজিমোড়া আলিয়া মাদরাসা, লাকসাম, কুমিল্লা।
তথ্যসূত্র :
[১]. ফাছলুল খিত্বাব (ইরানী সংস্করণ), পৃ. ১৮০।
[২]. মোল্লা হাসান, তাফসীরুস সাফী, পৃ. ১১।
[৩]. ফাছলুল খিত্বাব, পৃ. ৯৭।
[৪]. ফাছলুল খিত্বাব (ইরানী সংস্করণ), পৃ. ৩২।
[৫]. মোল্লা হাসান, তাফসীরুস সাফী, পৃ. ১১।
[৬]. প্রাগুক্ত, পৃ. ১৩।
[৭]. উছূলুল কাফী (ভারতীয় সংস্করণ), পৃ. ৬৭১।
[৮]. এখানে বর্ণিত তথ্য সঠিক নয়।
[৯]. হাক্কুল ইয়াক্বীন, পৃ. ৫১৯; ইবরাহীম ইবনু আমের আর-রুহায়লী, আল-ইনতিছারু লিছছুহবি ওয়াল আ-লি মানিফতারায়াতিস সামাবিয যাল (২য় সংস্করণ, তাবি), পৃ. ৪৭; আক্বীদাতুশ শী‘আতু ওয়া তারীখিহিমল আসওয়াদ, পৃ. ৭।
[১০]. হাক্কুল ইয়াক্বীন, পৃ. ৩৭৮; মুহাম্মাদ বাকের আল-মাজলিসী, হায়াতুল কুলূব, ২য় খণ্ড, পৃ.৮৫৪; ইবরাহীম ইবনু আমের আর-রুহায়লী, আল-ইনতিছারু লিছছুহবি ওয়াল আ-লি মানিফতারায়াতিস সামাবিয যাল (২য় সংস্করণ, তাবি), পৃ. ৪৭; আক্বীদাতুশ শী‘আতু ওয়া তারীখিহিমল আসওয়াদ, পৃ. ৭।
[১১]. ফুরূঊল কাফী, পৃ. ১১৫ ‘রওযা’ অধ্যায়।
[১২]. হাক্কুন ইয়াক্বীন,, পৃ. ৩৬৭।
[১৩]. প্রাগুক্ত, পৃ. ৫২২।
[১৪]. মা‘আরিফাতুল আখবারিল রিজাল, পৃ. ১৩৫ (রিজালু কাশী)।
[১৫]. তারজমাতু মাকবূল, পৃ. ৫৫১, ১০২৭; তাফসীরুল কুমী, পৃ. ২১৮, ৩২২।
প্রসঙ্গসমূহ »:
ভ্রান্ত মতবাদ