মুসলিমদের সাহায্য করা ও তার পদ্ধতি
- শায়খ মতিউর রহমান মাদানী (হাফিযাহুল্লাহ)
আল্লাহ রব্বুল আলামীনের প্রশংসা এবং প্রিয় নবী মুহাম্মাদ (ﷺ)-এর উপর ছালাত ও সালামের পর...
একজন মুসলিম হিসাবে সারা বিশ্বের মুসলিম ভাই-বোনদেরকে সাহায্য করতে হবে। কিভাবে সাহায্য করতে হবে? এক্ষেত্রে অধিকাংশ মুসলিম বিব্রত, বিভ্রান্ত অথবা হতভম্ব যে, কী করব বা কিভাবে সাহায্য করতে পারি?
মুসলিম ভাইয়ের সাহায্য করার ফযীলত, গুরুত্ব ও আবশ্যকতা
একজন মুসলিম আরেকজন মুসলিমদের ভাই, অলী বা বন্ধু। সুতরাং মুসলিম ভাই বা মুসলিম বন্ধু যাকে অন্তর থেকে ভালোবাসা হয় তাকে যথাসম্ভব সার্বিক সহযোগিতা করা আবশ্যক, চাই যেকোন ধরনের সাহায্য হোক না কেন। একজন মুসলিমের সাহায্য করা আরেকজন মুসলিমের উপর ফরয। মহান আল্লাহ বলেন, اِنَّمَا الْمُؤْمِنُوْنَ اِخْوَةٌ ‘নিশ্চয় মুমিন-মুসলিমগণ পরস্পরের ভাই’ (সূরা আল-হুজুরাত: ১০)।
ঈমানী ভ্রাতৃত্ব, ইসলামী ভ্রাতৃত্ব, দ্বীনী ভ্রাতৃত্ব এমন একটি ভ্রাতৃত্ব- যতক্ষণ পর্যন্ত ঈমান আছে, দ্বীন আছে, ইসলাম আছে, তাওহীদ আছে- ততক্ষণ সেটি বহাল আছে। রক্তের সম্পর্ক ছুটে যেতে পারে এবং রক্তের সম্পর্ক হচ্ছে সীমিত সম্পর্ক। পৃথিবীতে হাতেগোনা কিছু মানুষের সাথে রক্তের সম্পর্ক রয়েছে। কিন্তু ঈমানী সম্পর্ক, ইসলামী সম্পর্ক, ইসলামী ভ্রাতৃত্ব সেটি সারা বিশ্বের যেকোন জায়গার মুসলিম ভাইবোনদের সাথে রয়েছে। আল্লাহ রব্বুল আলামীন আমাদেরকে এই ভ্রাতৃত্ববোধের তাওফীক দান করুন।
প্রিয় নবী (ﷺ)-এর প্রসিদ্ধ হাদীছ, আনাস (রাযিয়াল্লাহু আনহু) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেন,
«انْصُرْ
أَخَاكَ ظَالِمًا أَوْ مَظْلُوْمًا». قَالُوْا يَا رَسُوْلَ اللهِ هَذَا
نَنْصُرُهُ مَظْلُوْمًا، فَكَيْفَ نَنْصُرُهُ ظَالِمًا قَالَ «تَأْخُذُ فَوْقَ
يَدَيْهِ»
‘তুমি তোমার মুসলিম ভাইয়ের সাহায্য কর, মাযলূম হলেও বা যালিম হলেও। ছাহাবীগণ জিজ্ঞেস করলেন, যালিমকে কিভাবে সাহায্য করতে হবে? নবী (ﷺ) বললেন, তুমি তার হাত ধরে তাকে বিরত রাখবে’।[১]
জাহেলী যুগে কাফেরদের ধারণা ছিল তোমার জাত ভাই, তোমার বংশের ভাই, তোমার গোত্রের লোক যেটাই করুক না কেন। চোর হলে, খুনী হলে এবং অন্যায়কারী হলেও সাহায্য কর। এমনকি ভালো হলেও সাহায্য কর, মন্দ হলেও সাহায্য কর। ইসলাম এটা সমর্থন করে না। কিন্তু সেই প্রবাদটিকে নবী (ﷺ) ইসলামীকরণ করলেন অর্থাৎ ইসলামী রঙে রঞ্জিত করলেন বা ইসলামী ব্যাখ্যা দিলেন। সেটি হচ্ছে, ্রتَأْخُذُ فَوْقَ يَدَيْهِগ্ধ ‘যালিমের হাতকে ধরে ফেলবে অথবা হাতকে ভেঙ্গে দিবে, হাতকে তার অন্যায় করা থেকে বিরত রাখবে’। অন্য রেওয়াতে রয়েছে, تَكُفُّهُ عَنِ الظُّلْمِ ‘যুল্ম করতে দিবে না, অত্যাচার করতে দিবে না। যেভাবে হোক না কেন প্রতিহত করবে। মাযলূমের পাশে দাঁড়াবে। যদি যুল্ম করতে আসে, তাহলে তাকে প্রতিহত করবে। তার হাতকে সামনে বাড়তে দিবে না। ্রفَذَاكَ نَصْرُكَ إِيَّاهُগ্ধ অর্থাৎ এটি হচ্ছে তোমার যালিম ভাইকে সাহায্য করা। যালেমকে যুলুম করতে দিলে না, অন্যায়কারীকে অন্যায় করতে দিলে না। এটিই তোমার সাহায্য করা।
আল্লাহ রব্বুল আলামী কুরআনুল কারীমে এটা স্পষ্ট করেছেন যে, একজন মুসলিম যদি আরেকজন মুসলিমের সাহায্য করে তাহলে এটি তার ঈমানের সততার প্রমাণ। ঈমানের দাবীদার হিসাবে সে যে মুসলিম, এটাতে তার সততার প্রমাণ আছে। তার এ দাবী সত্য। আর যদি সে মুসলিমের সাহায্য না করে, মুসলিমকে অসহায় ছেড়ে দেয়, এর বিপরীত কাফেরকে সাহায্য করে, তাহলে এটি তার ঈমানের দাবীতে মিথ্যুক প্রমাণ বহন করে। মহান আল্লাহ ইরশাদ করেন,
وَ الْمُؤْمِنُوْنَ وَ الْمُؤْمِنٰتُ بَعْضُهُمْ اَوْلِيَآءُ بَعْضٍ
‘মুমিন পুরুষ এবং মুমিন নারী একে অপরের বন্ধু’। অর্থাৎ একে অপরের পৃষ্ঠপোষক। একে অপরের অলী বা দোস্ত’ (সূরা আত-তাওবাহ: ৭১)। একজন মুসলিম আরেক মুসলিমের, ভাই হোক বা বোন হোক পরস্পর তাদের মিত্রতা রয়েছে, দোস্তী রয়েছে, বন্ধুত্ব রয়েছে। সুতরাং يَاْمُرُوْنَ بِالْمَعْرُوْفِ ‘একজন মুসলিম আরেকজন মুসলিমকে ভাল কাজের উপদেশ দিবে ও وَ يَنْهَوْنَ عَنِ الْمُنْكَرِ ‘অন্যায় কাজে বাধা দিবে’। আর وَ يُقِيْمُوْنَ الصَّلٰوةَ ‘ছালাত কায়েম করবে’ এবং وَ يُؤْتُوْنَ الزَّكٰوةَ যাকাত দিবে। আর وَ يُطِيْعُوْنَ اللّٰهَ وَ رَسُوْلَهٗ ‘আল্লাহকে ও তাঁর রাসূল (ﷺ)-এর আনুগত্য করবে’।
সুধী পাঠক! আল্লাহ তা‘আলার বাণী হল- ছালাত পড়বে। ইসলামী শরী‘আত অনুযায়ী কেউ ছালাত আদায় না করলে সে মুসলিম থাকতে পারে না। ছালাতে হাজির হয় না, আর কোথায় মুসলিমদের যুল্ম হচ্ছে তা নিয়ে মাথাব্যথ্যা। অথচ এ অবস্থায় মারা গেলে নিজে জাহান্নামে যাবে। নিজের খবর নেই যে, আমি কোথায় যাব! আমার উপর আল্লাহ গযব নাযিল হচ্ছে এই খবর নেই! এই শ্রেণীর মুসলিম, এই ডাউন কোয়ালিটির ফালতু মুসলিম দিয়ে ইসলামের কী সাহায্য হতে পারে? আর মুসলিম জাতির কী সাহায্য হতে পারে? অন্যদিকে যদি যাকাত ঠিকভাবে আদায় করা হয়, তবে মুসলিমদের কোন রকমের আর্থিক সমস্যা থাকবে না ইনশাআল্লাহ।
আল্লাহর বাণী: وَ يُطِيْعُوْنَ اللّٰهَ وَ رَسُوْلَهٗ ‘আল্লাহকে ও তাঁর রাসূল (ﷺ)-এর আনুগত্য করবে’। অর্থাৎ আল্লাহকে মানার জায়গায় পীর, ওলী, মাযার ভক্ত হয়ে পড়েছে। মাজারে সিজদা করে, মাযারে চাদর চড়িয়ে দুনিয়ার গরয পুরা করতে চায়। যার ছেলে হয় না, মাযারে গিয়ে ছেলে চায়। রোগ ভাল হয় না, রোগের আরোগ্য চায়। মনস কামনা পুরণ চায়, গাইরুল্লাহকে মনে করে আল্লাহ তাদেরকে অসাধারণ ক্ষমতা দিয়ে দিয়েছেন। এরা মুসলিম নয়। এসব মুসলিম সমাজের আগাছা স্বরূপ। যেমন চাষের জমিতে ঘাস থাকে। যত ঘাস বাড়বে ততবেশি আসল ফসল নষ্ট হয়ে যাবে, বেকার হয়ে যাবে, বরবাদ হয়ে যাবে, ফসল ভাল হবে না। ঠিক তেমনি আল্লাহকে মানবে, আল্লাহর সাথে কাউকে শরীক করবে না। আল্লাহর ইবাদত প্রতিষ্ঠা করবে, তাওহীদ বা একত্ব প্রতিষ্ঠা করবে। আর রাসূল (ﷺ)-এর আনুগত্য করবে। রাসূল (ﷺ)-এর তরীকার সামনে এসব নকশাবন্দী, চিশতী, চরমোনাই, শারসীনা, জৌনপুরী এসব তরীকা রাখবে না। এগুলো ইসলাম নয়। সুতরাং রাসূল (ﷺ) এর আনুগত্য করবে বা রাসূল (ﷺ)-এর তরীকা মানবে। আয়াতের পরের অংশে বলা হয়েছে, اُولٰٓىِٕكَ سَيَرْحَمُهُمُ اللّٰهُ অর্থাৎ এই কোয়ালিটির মুসলিম যদি হয়, একে অপরের বন্ধু এবং যেই বৈশিষ্ট্যগুলো, যেমন ভালো কাজের উপদেশ দেয়া আর অন্যায় কাজ হতে বাধা দেয়া, পাঁচ ওয়াক্ত ছালাত কায়েম করা, যাকাত দেয়া, আল্লাহ ও তদীয় রাসূল (ﷺ)-কে অনুসরণ করা, সুন্নাহ প্রতিষ্ঠা করা, তাওহীদ প্রতিষ্ঠা করা, শিরক-বিদ‘আত থেকে মুক্ত থাকা- তাহলে এই কোয়ালিটির মুসলিমদের উপর আল্লাহ রহম করবেন। দুনিয়ায় রহম করবেন, আখিরাতেও রহম করবেন। দুনিয়ার রহমত হচ্ছে আল্লাহর সাহায্য এবং বিজয়, যার আশা করছেন আর যেটা সবসময়ই চাইছেন। সকল মুসলিমই চাইছেন যেন আমরা কাফেরদের উপর বিজয়ী থাকি। কিন্তু শুধু চাইলে হবে না, সেই পথের পথিক হতে হবে। اُولٰٓىِٕكَ سَيَرْحَمُهُمُ اللّٰهُ ওদের উপরই আল্লাহর রহমত হবে দুনিয়া এবং আখিরাতে। আখিরাতে রহমত হবে, জান্নাত পাবে, আল্লাহ আযাব থেকে মুক্তি পাবে, জাহান্নাম থেকে রক্ষা পাবে (সূরা আত-তওবাহ: ৭১)।
প্রিয় নবী (ﷺ) আরো বলেছেন, ছহীহ বুখারী ও মুসলিমের হাদীছ রয়েছে, নু‘মান ইবনু বাশীর (রাযিয়াল্লাহু আনহু) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেন, ্রمَثَلُ الْمُؤْمِنِينَ فِى تَوَادِّهِمْগ্ধ ‘মুমিনদের দৃষ্টান্ত হচ্ছে, তাদের পরস্পরের ভালোবাসার ক্ষেত্রে, وَتَرَاحُمِهِمْ ‘মায়া-মততার ক্ষেত্রে’, وَتَعَاطُفِهِمْ ‘পরস্পরের সহানুভুতির ক্ষেত্রে, একজন আরেকজনের সহানুভুতির ক্ষেত্রে’। কেমন হবে? مَثَلُ الْجَسَدِ ‘একটি দেহের মত হবে’। যেকোন মুসলিম হোক না কেন? একটি দেহের বিভিন্ন অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ। যদি আপনি হোন মুসলিম দেহের একটি পা, তাহলে জানতে হবে যে ফিলিস্তীনের বা গাযার মুসলিম ভাইবোনেরা তারা আরেকটি পা বা আরেকটি হাত। শরীরের অন্য কোন অংশ। إِذَا اشْتَكَى مِنْهُ عُضْوٌ ‘একটি অংশ যদি রোগাক্রান্ত হয়, একটি অংশে যদি বেদনা-ব্যাথা থাকে, ফোঁড়া থাকে, ক্যানসার থাকে। একটু হাত কেটেছে সেই হাতের ব্যথায়, একটা দাঁতে শুধু ব্যথ্যা আছে, তার যন্ত্রণায় জ¦র চলে এসেছে। আর কাঁপছেন আপনি, গোটা শরীর কাঁপছে, সারা রাত অনিদ্রা, কোন ঘুম হয়নি, আর গোটা শরীর ব্যথায় ব্যথিত। গোটা শরীরে জ¦র চলে এসেছে। এই রকম হতে হবে, গোটা শরীর যেন আক্রান্ত। تَدَاعَى لَهُ سَائِرُ الْجَسَدِ بِالسَّهَرِ وَالْحُمَّى গোটা শরীর সঙ্গ দিবে। যখন শরীরের একটি কোন অংশ অসুস্থ হয়ে পড়ে, কষ্ট পায়, তখন অঙ্গ-প্রত্যঙ্গগুলো সেই অঙ্গটুকুর সঙ্গ দেয়; অনিদ্রায়, ঘুম আসে না তো গোটা শরীরে ঘুম আসে না। আর যদি জ¦র আসে তবে গোটা শরীরে জ¦র আসে। এই নয় যে, দাঁতে ব্যথা তাই শুধু দাঁতে জ¦র আছে আর বাকি অংশে জ¦র নেই, এমনটা নয়। এইরকম মুসলিম হতে হবে।[২]
আবূ মূসা (রাযিয়াল্লাহু আনহু) হতে বর্ণিত, নবী (ﷺ) বলেছেন, الْمُؤْمِنُ لِلْمُؤْمِنِ كَالْبُنْيَانِ ‘মুমিন মুমিনের সাথে একটি দালানের বিভিন্ন অংশের মত। يَشُدُّ بَعْضُهُ بَعْضًا একটি ইট আরেকটি ইটকে শক্তিশালী করে, সাপোর্ট করে। ঠিক ঐরকম হতে হবে। মুসলিমদের পারস্পরিক কেমন সুসম্পর্ক হওয়া উচিত এটা বুঝাতে গিয়ে وَشَبَّكَ بَيْنَ أَصَابِعِهِ নবী (ﷺ) এক হাতের আঙ্গুলের মাঝে অন্য হাতের আঙ্গুল ঢোকালেন।[৩]
একদা নবী (ﷺ) দেখলেন যে, দুরাবস্থায় পরিপূর্ণ কতিপয় লোক দুপুর বেলায় এসে হাজির হয়েছে, যোহরের একটু আগে। এমন অবস্থায় রয়েছে যে, তাদের পায়ে কারো সেন্ডেল, জুতা, চটি কিছুই নেই। বিবস্ত্র, ছেড়া-ফাঁটা, কোন রকমে লজ্জাস্থান ঢেকেছে। জীর্ণ-শীর্ণ অবস্থা। আবার এমন ক্ষুধার্ত যে, শরীর শুকিয়ে আছে ও চেহারা মলিন হয়ে আছে। অবস্থা খুবই খারাপ। তাদের সিংহভাগ মুযার বংশের লোক ছিল। বর্তমানের যারা রিয়াদ বা আল-কাসিমের এসব এলাকায় বসবাস করত। রাসূলুল্লাহ (ﷺ) এসব নতুন নতুন মুসলিম আর জীর্ণ-শীণ, অসহায়, ক্ষুধার্ত লোকদেরকে দেখে তাঁর চেহারা পরিবর্তন হয়ে মলিন হয়ে গেল। হায়! কী করে আমি এদের সাহায্য করব? কিভাবে সাহায্য করতে পারি? পেরেশান হয়ে গেলেন। মানুষ যখন পেরেশান হয়, তখন এক জায়গায় স্থির হয়ে বসতে পারে না, ছটপট করে। একবার এখানে, একবার ওখানে। সর্বদা অশান্তিতে সময় অতিবাহিত করে।
নবী (ﷺ) এর এমন অশান্তি হয়েছে যে, একবার বাড়িতে ঢুকে দেখলেন যে, বাড়িতে কিছু আছে কি না? তাদেরকে দেয়ার মত, তাদের সামনে পরিবশন করার মত, বাড়িতে কিছু নেই। আবার বেরিয়ে আসছেন মসজিদে নববীতে দেখি কোন মুসলিম ভাইদের পাচ্ছি কিনা যারা এতে সহযোগিতার হাত বাড়াতে পারে? এভাবে ছোটাছুটি করছেন? কিন্তু তখনও যোহরের সময় হয়নি, মসজিদ শূন্য হয়ে আছে। বেলাল (রাযিয়াল্লাহু আনহু)-কে বললেন, তাড়াতাড়ি আযান দাও। একেবারে আউয়াল ওয়াক্তে আযান দাও। তারপরে তাড়াতাড়ি ইকামত দাও, লোকজন চলে এসেছে। সবাইকে নিয়ে ছালাত আদায় করলেন। তারপরে ভাষণ দিলেন। নবী (ﷺ) প্রত্যেক খুতবায় যে আয়াতগুলো পাঠ করতেন সেগুলো পাঠ করার পর সূরা হাশরের এই আয়াতটি পাঠ করলেন। আল্লাহ তা‘আলা বলেন,
يٰۤاَيُّهَا الَّذِيْنَ اٰمَنُوا اتَّقُوا اللّٰهَ وَ لْتَنْظُرْ نَفْسٌ مَّا قَدَّمَتْ لِغَدٍ١ۚ وَ اتَّقُوا اللّٰهَ١ؕ اِنَّ اللّٰهَ خَبِيْرٌۢ بِمَا تَعْمَلُوْنَ
‘হে মুমিনগণ! আল্লাহকে ভয় কর, প্রত্যেকেই ভেবে দেখুক যে, আগামী কালের জন্য সে কী অগ্রিম পাঠিয়েছে। আর আল্লাহকে ভয় কর; তোমরা যা কর আল্লাহ সে সম্পর্কে অবহিত’ (সূরা আল-হাশর: ১৮)। অর্থাৎ হে ঈমানদারগণ! তোমরা আল্লাহকে ভয় কর। প্রত্যেক ব্যক্তি নিজ নিজ অবস্থান নিয়ে চিন্তা করে দেখ যে, আগামীকালকে কবরে চলে যাবে, পরকালে পাড়ি দিবে, যেখানে জান্নাত না হয় জাহান্নাম, সেখানের জন্য কতটা নেকী পাঠাতে পেরেছ? কতটুকু নেকী করতে পেরেছ? বা কতটুকু নেক আমল পাঠাতে পেরেছ? আল্লাহকে ভয় কর।
তারপরে বললেন যে, যার কাছে যা আছে, কেউ পারলে একটি দীনার দাও, কেউ পারলে একটি রৌপ্য মুদ্রা দাও, কেউ কাপড় দাও, যদি কেউ পারো যে গম আছে, এক ছা‘ আধা ছা‘ যা আছে, খেজুর পারলে খেজুর দাও। একটা খেজুরের অর্ধেক বা একটু অংশ আছে, অতটুকুই দাও। একজন আনছারী ব্যক্তি একটা থলে ভর্তি করে টাকা পয়সা, রৌপ্য মুদ্রা বা স্বর্ণমুদ্রা যা কিছু তার কাছে নিয়ে আসছেন। সেই থলেটি এত ভারী যে হাতে বহন করে নিয়ে আসতে পারছেন না। রাসূলুল্লাহ (ﷺ) উৎসাহিত করায় ছাহাবায়ে কেরাম সবাই ছুটলেন বাড়িতে, আর যার বাড়িতে যা যা আছে নিয়ে এসে রাসূলুল্লাহ (ﷺ) এর সামনে উপস্থাপন করতে চেষ্টা করলেন। কেউ খাবার, কেউ কাপড়, কেউ আর কিছু। বেশ কিছু দান-খয়রাত চলে এসেছে। রাসূলুল্লাহ (ﷺ) এর চেহারা একটু আগে একেবারে মলিন হয়ে গিয়েছিল, লাল হয়ে গিয়েছিল, পেরেশান হয়ে গিয়েছিল। কিন্তু যখন দেখলেন যে, আলহামদুলিল্লাহ দান-ছাদাকা মুসলিম ভাইদের সহযোগিতায় যথেষ্ট সংগ্রহ হয়ে গেছে। এই ক্ষণিকের মধ্যে চাঁদা কালেকশন হওয়ার আগে চেহারা কেমন ছিল, দুশ্চিন্তায়, পেরেশানিতে, অশান্তিতে। আর যখন মুসলিম ভাইদের জন্য সহযোগিতা চলে এসেছে তাঁর চেহারার দিকে দেখছি বর্ণনাকারী আব্দুল্লাহ বলছেন যে, তাঁর চেহারা এত উজ্জ্বল হয়েছে যে, যেন তাঁর চেহারা একটি স্বর্ণের টুকরার মত ঝকঝক করছে। রাসূলুল্লাহ (ﷺ) সেই সময় বললেন, দেখ! যে ব্যক্তি তার ইসলামী জীবনে কোন ভাল কাজের প্রচলন ঘটাবে, অর্থাৎ আগে আগে কোনো কাজ করবে। যার মূল ইসলামে স্বীকৃত, প্রমাণিত। এই হাদীছটাকে বিদ‘আতীরা মনে করে বিদ‘আতে হাসানা বা সুন্নাতে হাসানা। নবী (ﷺ) কি বিদ‘আতে হাসানা বলেছেন? বিদ‘আতীদের খণ্ডনের জন্য হাদীছটি লক্ষ্য করুন। কিন্তু বিদ‘আতীরা বলছে বিদ‘আত দুই প্রকার। বিদ‘আতে হাসানা ও বিদ‘আতে সায়ইয়া। অথচ নবী (ﷺ) কিন্তু এটা বলেননি, যে বিদ‘আত দুই প্রকার। বিদ‘আতের কোনো ভাগ নেই। বিদ‘আত বিদ‘আত-ই। বিদ‘আত ইসলামে নেই, নবী (ﷺ) এর তরীকা নয়। কারণ নবী (ﷺ) এর খুতবা-ই হচ্ছে সমস্ত বিদ‘আত-ই গোমরাহী, জাহান্নামের রাস্তায় নিয়ে যাওয়া বা জান্নাতের রাস্তা হারিয়ে দেয়া। একথা বুঝলেই তো হলো, তাহলে সহজ-সরল মানুষদেরকে বিদ‘আতী মোল্লারা ধোঁকা দিতে পারবে না যে, মীলাদ করলে বিদ‘আতে হাসানা, সম্মিলিত দরুদ পড়লে বিদ‘আতে হাসানা, সম্মিলিত মুনাজাত করলে বিদ‘আতে হাসানা আর যেটা আমরা করি না অন্যরা করে সেটা বিদ‘আতে সায়ইয়া। এমনটা নয়, সবগুলোই হচ্ছে গোমরাহীতা বা পথভ্রষ্টতা।
নবী (ﷺ) বলেছেন, ‘যে যদি ইসলামী জীবনে ভাল তরীকা চালু করে। কোন্ তরীকা? যেটা ইসলামে স্বীকৃত। ইসলামে দান-খয়রাত করার কথা আছে, ইসলামে মুসলিম ভাইয়ের সহযোগিতা করার কথা আছে। কিন্তু কেউ আপনাদের এগিয়ে আসছে না। প্রথম একজন পাঁচশ’ টাকা বের করে দিলেন। তা দেখে আরেকজন তার চেয়ে বেশি দিতে পারে। এই প্রথম যে ব্যক্তি পাঁচশ টাকা দিল, তার দেখাদেখি পরে যারা দিল, তাদের চেয়ে প্রথমজন বেশি নেকী পাবেন। যে আগে আগে দান-খয়রাত করবে বা নেকীর কাজে অংশ নিবে, নেকীর কাজ আগে করবে। আপনার গ্রামে কেউ বিদ‘আতের বিরুদ্ধে বলেনি। আপনি গ্রামে গিয়েও প্রথম বিদ‘আত বা শিরকের বিরুদ্ধে বললেন। আর তারপর সেখান থেকে বিদ‘আত ও শিরককে উৎখাত করলেন। অনেক কিন্তু সাপোর্টার আছে, কিন্তু সাহস করেনি। এরপরে যত লোক সুন্নাত কায়েম করবে, দান-খয়রাত করবে, নেক আমল করবে, তার একভাগ থেকে সমান সমান নেকী আপনি পেতে থাকবেন আল্লাহর ভাণ্ডার থেকে, তাদের ভাণ্ডার থেকে নয়। এই হচ্ছে হাদীছের অর্থ। নবী (ﷺ) এই দানের ফযীলত বর্ণনা করলেন। আর কেউ যদি গুনাহের রাস্তা চালু করে তাহলে সে গুনাহের বোঝা উঠাবে।[৪]
মুসলিমদের সাহায্য করা
মুসলিমদের সাহায্য করা এমন একটি বিষয় যে, আপনি সাহায্য করবেন অর্থাৎ যেমন কর্ম, তেমন ফল পাবেন। এই কথাটি বাংলা কথা হলেও কুরআন-হাদীছ দ্বারা স্বীকৃত। আপনি যদি মুসলিম, অসহায়, মাযলুম ভাইবোনদের সাহায্য করেন, আল্লাহ আপনার দুর্দিনে, দুনিয়াতে বা আখিরাতে যখন প্রয়োজন তখন সাহায্য করবেন। আপনি মুসলিম ভাইদের সাহায্য করেছেন, আল্লাহ আপনাকে সাহায্য করবেন দুনিয়ায়, হাশরের মাঠে, কবরে, জান্নাতে যেতে, পুলছিরাতে সব জায়গায়। আপনার ছেলেমেয়েকে আল্লাহ সাহায্য করবেন, কারণ আপনি অন্যের ছেলেমেয়েদের সাহায্য করেছেন।
এই মর্মে প্রিয় নবী (ﷺ) এর ছহীহ হাদীছ রয়েছে ছহীহ বুখারীতে,
وَمَنْ فَرَّجَ عَنْ مُسْلِمٍ كُرْبَةً فَرَّجَ اللهُ عَنْهُ كُرْبَةً مِنْ كُرُبَاتِ يَوْمِ الْقِيَامَةِ
‘আপনি যদি কোনো মুসলিমের কষ্ট, দুঃখ, বালা-মুছীবত দূর করেন, আল্লাহ আপনার ক্বিয়ামতের মাঠে, হাশরের মাঠে বালা-মুছীবত দূর করে দিবেন’।[৫] রাসূলুল্লাহ (ﷺ) আরো বলেছেন, وَاللهُ فِىْ عَوْنِ الْعَبْدِ مَا كَانَ الْعَبْدُ فِىْ عَوْنِ أَخِيْهِ ‘যদি কোন মুসলিম অসহায় ভাইয়ের সাহায্য করেন, তাহলে আল্লাহ আপনার সাহায্য করতে থাকবেন’।[৬] অর্থাৎ যতক্ষণ মানুষের সাহায্যের মনমানসিকতা থাকবে, ততক্ষণ আল্লাহ সাহায্য করতে থাকবেন। বান্দার সাহায্য আল্লাহ ততদিন পর্যন্ত করবেন, যতদিন আপনি আপনার মুসলিম ভাইয়ের সাহায্য করতে থাকবেন।
মুসলিম ভাইবোনদের সাহায্য করা, মসজিদে এমনকি মসজিদে হারাম বা মসজিদে নববীতে ই‘তিকাফ করার চেয়েও বেশি ফযীলতপূর্ণ। যেমন কর্মহীনকে কর্মের সন্ধান দিলেন, কারও খাবারের ব্যবস্থা নেই, তাকে খাবারের ব্যবস্থা করে দিলেন, কারও কোন সমস্যা রয়েছে, সমস্যা দূরে করে দিলেন। মুসলিম ভাইবোনদের পাশে দাঁড়ালেন, যেকোন ক্ষেত্রে হোক না কেন। আপনার কাছে হোক কিংবা দূরে হোক যেভাবে পারছেন। এই মর্মে নবী (ﷺ) এর হাদীছ,
وَلِأَنْ أَمْشِيَ مَعَ أَخٍ لِيْ فِيْ حَاجَةٍ أَحَبُّ إِلَيَّ مِنْ أَنْ أَعْتَكِفَ فِيْ هَذَا الْمَسْجِدِ، يَعْنِيْ مَسْجِدَ الْمَدِيْنَةِ، شَهْرًا
‘আমি যদি কোন মুসলিম ভাইয়ের সাথে তার প্রয়োজন মেটানোর জন্য হেঁটে যাই, তাহলে এটা আমার কাছে মসজিদে নববীতে একমাস ই‘তিক্বাফের চাইতে বেশি প্রিয়’।।[৭] অর্থাৎ কিছুক্ষণের জন্য পায়ে হেঁটে গিয়ে একজন মুসলিম ভাইয়ের সাহায্য করে আসা। অনেকে বাইরের শহর থেকে এসে রাস্তা হারিয়ে দেয়। যদি জিজ্ঞাসা করে যে, অমুক জায়গায় যাব রাস্তা তো হারিয়ে ফেলেছি। তখন সাধারণত বলা হয়, এটা দিয়ে যান, নয়তো ওটা দিয়ে যান, ওদিকে দিয়ে চলে যান। এটা আসলে তেমন কোন সাহায্য হলো না। আপনি এই ক্ষেত্রে যদি ৫-১০ মিনিট সময় ব্যয় করে তাকে সোজা রাস্তা বা সঠিক জায়গায় পৌঁছে দেন, তবে সেটা হবে সত্যিকারের সাহায্য। এটাই হচ্ছে আসলে মুসলিম ভাইয়ের সহযোগিতায় হেঁটে যাওয়া। একমাস মসজিদে নববীতে কেউ ই‘তিক্বাফ করছে, আর আপনি মাত্র দশ মিনিটে একটি রাস্তা দেখিয়ে দিলেন অথবা কোন বিল্ডিং বা জায়গায় দেখানোর জন্য হেঁটে গেলেন।
সুধী পাঠক! মুসলিম ভাইবোনদের সাহায্যের অনেক ফযীলত রয়েছে। আব্দুল্লাহ ইবনু উমার (রাযিয়াল্লাহু আনহুমা) থেকে বর্ণিত- হাদীছটি ইমাম ইবনে আদ-দুনইয়া এবং ইমাম তাবারানী (রাহিমাহুল্লাহ) বর্ণনা করেছেন, হাদীছটি হাসান। হাদীছটি হলো-
أَنَّ
رَجُلًا جَاءَ إِلَى النَّبِيِّ ﷺ
فَقَالَ: يَا رَسُوْلَ اللهِ أَيُّ النَّاسِ أَحَبُّ إِلَى اللهِ؟ وَأَيُّ
الْأَعْمَالِ أَحَبُّ إِلَى اللهِ؟ فَقَالَ رَسُوْلُ اللهِ ﷺ:
«أَحَبُّ النَّاسِ إِلَى اللهِ تَعَالَى أَنْفَعُهُمْ لِلنَّاسِ، وَأَحَبُّ
الْأَعْمَالِ إِلَى اللهِ تَعَالَى سُرُوْرٌ تُدْخِلُهُ عَلَى مُسْلِمٍ، أَوْ
تَكَشِفُ عَنْهُ كُرْبَةً، أَوْ تَقْضِي عَنْهُ دَيْنًا، أَوْ تَطْرُدُ عَنْهُ
جُوعًا، وَلَأَنْ أَمْشِيَ مَعَ أَخِيْ فِيْ حَاجَةٍ أَحَبُّ إِلَيَّ مِنْ أَنْ
أَعْتَكِفَ فِيْ هَذَا الْمَسْجِدِ - يَعْنِيْ مَسْجِدَ الْمَدِيْنَةِ شَهْرًا -
وَمَنَ كَفَّ غَضَبَهُ سَتَرَ اللهُ عَوْرَتَهُ، وَمَنْ كَظَمَ غَيْظَهُ، وَلَوْ
شَاءَ أَنْ يُمْضِيَهُ أَمْضَاهُ مَلَأَ اللهُ قَلْبَهُ رَجَاءً يَوْمَ
الْقِيَامَةِ، وَمَنْ مَشَى مَعَ أَخِيْهِ فِيْ حَاجَةٍ حَتَّى يَتَهَيَّأَ لَهُ
أَثْبَتَ اللهُ قَدَمَهُ يَوْمَ تَزُوْلُ الْأَقْدَامِ».
‘জনৈক ব্যক্তি নবী (ﷺ)-এর নিকট এসে জিজ্ঞেস করল, ‘হে আল্লাহর রাসূল (ﷺ)! মানুষের মধ্যে কে আল্লাহর কাছে সবচেয়ে প্রিয়? এবং কোন্ কাজ আল্লাহর কাছে সবচেয়ে প্রিয়’? নবী (ﷺ) উত্তর দিলেন, ‘আল্লাহর কাছে সবচেয়ে প্রিয় মানুষ হলো সেই ব্যক্তি, যে মানুষের জন্য সবচেয়ে বেশি উপকারী। আর আল্লাহর কাছে সবচেয়ে প্রিয় কাজ হলো- তুমি কোনো মুসলিম ভাইয়ের মনে আনন্দ দাও, অথবা তার কোন দুঃখ-কষ্ট দূর কর, অথবা তার ঋণ পরিশোধ করে দাও, অথবা তার ক্ষুধা নিবারণ করো। আমি যদি আমার মুসলিম ভাইয়ের কোন প্রয়োজনে তার সঙ্গে চলি, তা আমার কাছে এই মসজিদে (অর্থাৎ মদীনার মসজিদে) এক মাস ই‘তিকাফ করার চেয়ে অধিক প্রিয়। যে ব্যক্তি নিজের ক্রোধ সংযত করে, আল্লাহ তার গোপন দোষসমূহ ঢেকে দেন। আর যে ব্যক্তি নিজের রাগ দমন করে রাখে, অথচ সে চাইলে তা প্রকাশ করতে পারত, আল্লাহ কিয়ামতের দিনে তার অন্তর আশায় পূর্ণ করে দেবেন। আর যে ব্যক্তি তার মুসলিম ভাইয়ের কোন প্রয়োজনে তার সঙ্গে চলে যতক্ষণ না তার কাজ সম্পন্ন হয়, আল্লাহ তা‘আলা ক্বিয়ামতের সেই দিনে তার পা দৃঢ় রাখবেন, যেদিন বহু পা পিছলে যাবে’।[৮]
অর্থাৎ একজন ব্যক্তি রাসূলুল্লাহ (ﷺ) এর কাছে আসল। অতঃপর জিজ্ঞেস করল যে, আল্লাহর কাছে সবচেয়ে প্রিয় মানুষ কে? আল্লাহ সবচেয়ে বেশি কাকে ভালোবাসেন? (আপনারা হয়তো বলবেন, যে তাহাজ্জুদ গুজার তাকে আল্লাহ ভালোবাসেন। হয়তো বলবেন, চাশতের নফল সালাত আদায়কারীকে আল্লাহ ভালোবাসেন) মূলত আল্লাহর কাছে সবচেয়ে প্রিয় মানুষ ঐ ব্যক্তি, যে যত বেশি মানুষের উপকার করে। যে যতবেশি পরোপকারী। এই পথে, এক্ষেত্রে প্রতিযোগিতা করতে হবে যে, আমি সব চাইতে বেশি পরোপকারী মানুষ হবো। আল্লাহ সন্তুষ্টির জন্য দুনিয়ার স্বার্থে নয়। দুনিয়ার গরজে যার সাথে স্বার্থ জড়িত তাকে সবাই সহযোগিতা করে, মুসলিম করে বা অমুসলিমও করে, সৎ লোক করে বা অসৎ লোক করে। কিন্তু যেখানে নিঃস্বার্থভাবে আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য, জান্নাতের জন্য, আল্লাহ আমাকে ভালোবাসবেন, আল্লাহ ভালোবাসা অর্জনের জন্য যেই ব্যক্তি যতবেশি পরোপকারী। সার্বিক দিক থেকে উপকারী, আর্থিক হতে পারে, মানসিক হতে পারে, শারীরিক হতে পারে, পরামর্শ দিয়ে হতে পারে, সময় দিয়ে হতে পারে, শ্রম দিয়ে হতে পারে, যেকোন ভাবে উপকার হতে পারে।
আর সবচেয়ে উপকার হচ্ছে, এক পথভ্রষ্টকে যে জাহান্নামের রাস্তায় চলছিল, তাকে জান্নাতের রাস্তায় লাগিয়ে দেয়া। ইলম দেয়া, সঠিক জ্ঞান দেয়া। ইলম দিয়ে তাকে বা তার অজ্ঞতাকে দূর করে দেয়া। বেনামাযী, বিদ‘আতী, শিরককারী বা মাজারপূজারী জান্নাতের রাস্তা হারিয়ে ফেলেছে কিংবা জাহান্নামের রাস্তায় চলে গেছে। তাকে জাহান্নামের রাস্তা থেকে সরিয়ে এনে, তাকে জান্নাতের রাস্তা দেখিয়ে দিবে। এটাই তাওহীদের রাস্তা, এটাই জান্নাতের রাস্তা। ছালাত আদায়কারী হওয়া, মসজিদমুখী হওয়া, হারাম জীবন পরিত্যাগ করা এটিই দুনিয়া ও আখিরাতে শান্তির মাধ্যম।
এইভাবে নবী (ﷺ)-কে জিজ্ঞেস করা হল, আল্লাহর কাছে সবচাইতে প্রিয় আমল কোনটি? তিনি বললেন, কোন মুসলিমকে একটু খুশি করা। কোন মুসলিমের মুখে একটি হাসি ফুটিয়ে দেয়া। যে কান্না করছে, যে দুঃখে আছে, যে কষ্টে আছে, যে যালিমের যুলম বরদাস্ত করতে পারছে না। তার পাশে দাঁড়িয়ে, তাকে যুলম থেকে উদ্ধার করা। বালা-মুসীবত দূর করতে সাহায্য করা। কেউ ঋণে জর্জরিত হলে ঋণমুক্ত করা অথবা ক্ষুধার্ত থাকলে ক্ষুধা দূর করে দেয়া।
এর বিপরীত কেউ পারবে সহযোগিতা করতে তারপরেও যদি মুসলিম ভাইবোনদেরকে অসহায় ছেড়ে দেয়, ওকে মারছে আমাকে মারেনি, ওর সাথে ঝামেলা তাতে আমার কী? আমি আরামে মসজিদে বসে তাসবীহ জপি। চরিত্র যদি শুধু এই হয়, কেউ যদি অসহায় ছেড়ে দেয়; তাহলে তার শাস্তি সম্পর্কে হাদীছে বর্ণিত হয়েছে,
اَلْمُسْلِمُ أَخُو الْمُسْلِمِ لَا يَظْلِمُهُ وَلَايَخْذُلُهُ وَلَا يَحْقِرُهُ
‘মুসলিমগণ পরস্পর ভাই। সুতরাং সে তাকে যুলম করবে না, অসহায় অবস্থায় ফেলে রাখে না এবং তাকে তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করে না’।[৯] এ হাদীছে বর্ণিত وَلَايَخْذُلُهُ ‘কোন মুসলিমকে অসহায় ছেড়ে দিবে না’ অর্থাৎ কেউ যদি কোন মুসলিম ভাইকে অসহায় অবস্থায় ছেড়ে দেয়, তারপর নিজের পেট নিয়ে ব্যস্ত, নিজের কাজ নিয়ে ব্যস্ত- যেখানে তাকে লাঞ্ছিত অপমানিত করা হচ্ছে, কষ্ট দেয়া হচ্ছে, তার মান-ইজ্জতকে নষ্ট করা হচ্ছে। আপনি পারতেন সাহায্য করতে কিন্তু সাহায্য করলেন না, আপনাকে আল্লাহ অসহায় ছেড়ে দেন এমন জায়গায়, যেখানে আপনি চারিদিকে তাকাবেন আমার জন্য সাহায্য যদি নেমে আসত! আমাকে যদি কেউ রক্ষা করত! এমন বিপদ দুনিয়াতে পড়েছেন অথবা হাশরের মাঠে পড়েছেন। পারলৌকিক জীবনে পড়েছেন যে, একটি বা দু’টি বা দশটি নেকির জন্য জাহান্নামে চলে যাচ্ছেন, সেই সময় আশেপাশে তাকাচ্ছেন- কেউ যদি আমার পাশে এসে দাঁড়াত! আর দশটি নেকী আমাকে দিয়ে দিত! আর আমার জন্য কেউ যদি একটু সুপারিশ করত! সেই সময় আল্লাহ স্বয়ং সাহায্য করবেন, কারণ দুনিয়াতে আপনি অন্য মুসলিম ভাইদেরকে অসহায় ছেড়ে দেননি, তাদের পাশে দাঁড়িয়েছিলেন। আল্লাহ রব্বুল আলামীন যেন আমাদেরকে তাওফীক দান করেন।
আমাদের করণীয়
প্রথমতঃ আবেগপ্রবণ না হয়ে শারঈ নীতিমালার নিকট আত্মসমর্পণ করতে হবে। শরী‘আতের মানহাজ, শরী‘আতের নীতিমালা সবসময় জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে অনুসরণ করে চলতে হবে। শরী‘আতের মৌলিক নীতিমালা হচ্ছে- শাসকের কথা শোনা এবং আনুগত্য করা। যে যেই দেশে বাস করছেন অথবা আপনি যে দেশের নাগরিক সেই দেশের আইনের বাহিরে আপনি বেরিয়ে যাবেন, এতে করে কোনদিন দেশের জন্য শান্তি নিয়ে আসতে পারবেন না। আর যেসব মুসলিম ভাইদের জন্য আপনি চেঁচামেচি করছেন, তাদেরও কোন উপকার করতে পারবেন না। আপনি যেখানে প্রবাসে আছেন এখনকার আইন-কানুন মেনে চলা হচ্ছে, শাসকের কথা শোনা এবং আনুগত্য করা। আমাদের উপরে এটি ফরয। আগ বাড়িয়ে কাজ করা, আইন লঙ্ঘন করা, যার অনুমতি নেই তা করা, এমন কিছু পদক্ষেপ নেয়া যা ইসলাম কখনো সমর্থন করে না। এটি ইসলামে হারাম। কারণ এতে দুনিয়ার ক্ষতি, আপনারও ক্ষতি, অন্যেরও ক্ষতি। আর ভাঙবেন বেশি, গড়তে কিছুই পারবেন না, ভালো কিছু করে দিতে পারবেন না। আশা করেছিলেন ভালো, কিন্তু কোনোদিন এই আশা পূরণ হবে না। এজন্য যারা এই রকম পরিস্থিতিতে- যখন মুসলিমদের উপর যুলম অত্যাচার হচ্ছে, পশ্চিমা কাফেরদের দেয়া তরীকা অবলম্বন করছে, মিছিল করা, বিক্ষোভ করা, ঘেরাও করা, ভাংচুর করা, গাড়ি জ¦ালিয়ে দেয়া, টায়ার জ¦ালানো, রাস্তা অবরোধ করা- এসব যারা করছে, তারা ইয়াহুদী-খ্রিস্টানার-ই গোলামী করছে। তারা শরী‘আতের নীতিমালা মানে না। এর মাধ্যমে কখনো কোন জায়গায় গঠনমূলক কাজ হয়েছে, শান্তি প্রতিষ্ঠা হয়েছে, মুসলিমদের সমস্যার সমাধান হয়েছে- তা দেখাতে পারবেন না। সুতরাং এই পথ বর্জনীয়।
শাসকের আনুগত্য করবেন। আইন লঙ্ঘন করবেন না। আর বর্জনীয় হচ্ছে যে, এসব পশ্চিমাদের গোলামী করে এই বিক্ষোভ, মিছিল, আন্দোলন এসব দিয়ে কোনদিন কাজ হবে না। এম্বাসি ঘেরাও করে, সরকারী ও রাষ্ট্রীয় ভবন ঘেরাও করে, ভাঙচুর করে যাতে করে আমাদের সরকার ওখানে কাজ করে, এইভাবে কোনদিন হয় না। কারণ সরকার কতটা পারছে, তারা আপনার চাইতে বেশি বুঝে এবং তারা তাদের দূরদর্শিতায় যা কিছু দেখছে, আমরা দেখতে পাই না। আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্রের অংশ হিসাবে বিশ্বশক্তি কী টার্গেট করতে চায়? সেটা তারা পাহাড়ের আড়ালে বা টিলার আড়ালে লুকায়িত দেখতে পাচ্ছে। কিন্তু আমাদের এই চোখে দেখতে পাই না। সুতরাং তারা ভালো বুঝছে যে, কোন্টা করলে ভালো হবে আর কোন্টা করলে আরো সর্বনাশ হবে। আমাদর সর্বনাশ হবে, তাদেরও সর্বনাশ হবে। কোনো উপকার করতে পারব না।
দ্বিতীয়তঃ এমন একটি কাজ রয়েছে, যা করতে কখনো বাধার সম্মুখীন হতে হয় না আর আগামীতেও হতে হবেও না। কোন শক্তি বাধা দিতে পারবে না আর দেয়ও না। সেটি হচ্ছে, দু‘আ করা। হোক তা নিজের জন্য বা মুসলিম ভাইবোনদের জন্য। কয়জন লোক আছেন তাহাজ্জুদে পড়ে পড়ে, সিজদায় পড়ে পড়ে দু‘আ করেছেন? কয়জন লোক আছেন জুমুআর মসজিদে দু‘আ করেছেন যেদিন দু‘আ কবুল হয়? কয়জন আছেন মুসলিম ভাইদের জন্য বিশেষ করে ফিলিস্তীনী ভাইদের জন্য দু‘আ করেছেন। ইয়াহুদীরা ধ্বংস হোক বলে দু‘আ করেছেন কয়জন আছেন? কয়জন আছেন ফরয নামায বা সুন্নাত ছালাতের সিজদায় দু‘আ করেছেন? দরুদ পড়ার পরে দু‘আ করেছেন? সালাম ফিরানোর আগে দু‘আ করেছেন? হাত তুলে দু‘আ করেছেন? আল্লাহর সামনে কান্নাকাটি করেছেন? আপনার ছেলেমেয়েদের উপর যদি যুলম অত্যাচার হত, তাদের যদি মারা হত, যেভাবে কান্না করে দু‘আ করতেন, সেই ভাবে বা সেই কোয়ালিটির দু‘আ- কয়জন করেছেন? এমন লোক কয়জন আছেন? এক্কেবারে নাই। একজনও করেননি।
অথচ মুমিনের সবচেয়ে শক্তিশালী অস্ত্র বা হাতিয়ার হচ্ছে দু‘আ। যে দু‘আ জবান বন্ধ করে দিলেও আস্তে আস্তে, জিহ্বা নড়িয়ে ভিতরে ভিতরে বলতে পারবেন, উপরেও বুঝতে পারবে না। জিহ্বা যদি না নড়াতে পারেন, তবুও মনে মনে বা ক্বলবেও দু‘আ করতে পারবেন। অন্তর থেকে দু‘আ করতে পারবেন। কারণ আল্লাহ কিন্তু অন্তরের খবরও জানছেন যে, আমার ঐ বান্দা দু‘আ করছে। ফিলিস্তীনী ভাইদের জন্য, ইয়াহুদীদের ধ্বংসের জন্য, কেন দু‘আ করছেন সেটাও জানেন। দু‘আর ক্ষেত্রে কখনো অবহেলা করবেন না। নিজের জন্য দু‘আ করবেন, মুসলিম ভাইবোনদের জন্য দু‘আ করবেন। বিশেষ করে ফিলিস্তীনীর মাযলূম মুসলিম ভাইবোনদের জন্য, শিশুদের জন্য, বৃদ্ধদের জন্য, যারা সত্যিকারের জিহাদের পথে আছে তাদের জন্য দু‘আ করবেন।
তৃতীয়তঃ আল্লাহ রব্বুল আলামীন অর্থ সম্পদ দিয়েছেন, কম দেন বা বেশি দেন সবাইকে দিয়েছেন। যদি বৈধ পথে আপনি পাঠাতে পারেন, অবশ্যই পাঠাবেন। যাকে তাকে দিয়ে দিবেন না। অবৈধ পথে পাঠাতে যাবেন না। কারণ অবৈধ পথে পাঠালে ইসলামের খাতিরে, মুসলিমের খাতিরে ব্যয় না হয়ে তাদের বিরুদ্ধে ব্যয় হতে পারে। আর সঊদী আরবে কিং সালমান রিলিফ সেন্টার রয়েছে। এটি হচ্ছে বিশস্ত মাধ্যম। সেখানে যারা রাজনীতি করে ধর্ম নিয়ে, অথবা মুসলিম জাতির রক্ত নিয়ে রাজনীতি তাদের কাছে পৌঁছবে না। সরাসরি যারা মাযলূম, যারা হক্বদার তাদের কাছে পৌঁছানো হবে এই রিলিফ। এই জায়গায় আপনি দান করতে পারেন, এই রাস্তা খোলা আছে। আর একটি কথা সতর্ক সাবধান, মুসলিম জাতির বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রের ক্ষেত্রে কিছু লোক মুজাহিদীন সেজে তারা নেতৃত্ব দিচ্ছে। কিন্তু তারা ফাইভ স্টার হোটেলে বসবাস করে। তারা কাফেরদের খরচে বিশাল বিশাল বিশাল বাংলোয় বা প্যালেসে বসবাস করে। তাদের ছেলেমেয়েরা ঐসব কাফেরদের দেশেই ভোগ বিলাসের জীবন কাটাচ্ছে। আর তারা কাফেরদের সাথে মিশে হোক, মিলে হোক বা তাদের মূর্খতার কারণে হোক এই ফিলিস্তীনী ভাইবোনদেরকে বা মুসলিম অসহায় ভাইবোনদেরকে যুলমের স্বীকার করেছে, যালেমের সামনে, নেকড়ে হায়নার সামনে ছেড়ে দিয়েছে। তাদের ষড়যন্ত্র থেকে, তাদের অনিষ্ট হতে সতর্ক সাবধান হতে হবে ও তাদেরকে চিনতে হবে। মুসলিম ভাইদের ব্যথা এবং তাদের সাথে সমবেদনা, তাদের সাহায্য করা অবশ্যই ফরয। কিন্তু যারা চক্রান্তকারী, তারা মুসলিমদের নিয়ে, মুসলিমদের সমস্যা নিয়ে রাজনীতি করছে, তাদেরকে চিহ্নিত করা আর তাদেরকে মুখোশ উন্মোচন করা অপরিহার্য। তারা লাঞ্ছিত হোক এবং তাদের জন্য বদদু‘আ করা যে, কেউ যদি আমাদেরকে নিয়ে ছিনিমিনি খেলে অথবা আমাদের নিয়ে কেউ রাজনীতি করে বা রাজনৈতিক স্বার্থ হাসিল করতে চায়, আল্লাহ যেন তাদের মুখোশ উন্মোচন করে দেন, তাদেরকে অপদস্ত করেন, তাদেরকে চিহ্নিত করে মুসলিম জাতিকে চেনার তাওফীক দান করেন।
আল্লাহ রব্বুল আলামীন যেন ইয়াহুদীদের ধ্বংস করেন, তাদের পৃষ্ঠপোষকদের ধ্বংস করেন এবং মুসলিম জাতির হেফাজত করেন, ফিলিস্তীনী ভাইবোনদের হেফাজত করেন। এক শ্রেণির লোক যারা মুসলিম সেজে কাফেরদের সাথে মিলে ষড়যন্ত্র করছে, মুসলিমদেরকে অসহায় অবস্থায় ছেড়ে দিয়েছে আর তাদেরকে নেকড়ের সামনে ফাঁসিয়ে দিয়েছে, আল্লাহ যেন তাদের অনিষ্টতা দূর করেন এবং তাদের অনিষ্ট দিয়েই যেন তাদেরকে লাঞ্ছিত ও অপমানিত করেন। আমীন ইয়া রব্বাল আলামীন।
وصلي الله وسلم نبينا محمد وأل أله وصحبه أجمعين
তথ্যসূত্র :
[১]. ছহীহ বুখারী, হা/২৪৪৪; তিরমিযী, হা/২২৫৫; মিশকাত, হা/৪৯৫৭।
[২]. ছহীহ মুসলিম, হা/২৫৮৬।
[৩]. ছহীহ বুখারী, হা/২৪৪৬।
[৪]. ছহীহ মুসলিম, হা/১০১৭।
[৫]. ছহীহ বুখারী, হা/২৪৪২; ছহীহ মুসলিম, হা/২৫৮০।
[৬]. ছহীহ মুসলিম, হা/২৬৯৯।
[৭]. ত্বাবারাণী, আল-মু‘জামুল কাবীর, হা/৬০২৬; সনদ হাসান, সিলসিলা ছহীহাহ, হা/৯০৬।
[৮]. ত্বাবারাণী, আল-মু‘জামুল কাবীর, হা/১৩৬৪৬; সনদ হাসান, সিলসিলা ছহীহাহ, হা/৯০৬।
[৯]. ছহীহ মুসলিম, হা/২৫৮০।