মুসলিম নারীর সৌন্দর্য ও বিয়েতে পর্দাবিধি
- মূল : সাদাফ ফারুকী (করাচি, পাকিস্তান)
- অনুবাদ : মাহদী হাসান মানিক*
‘হিজাব’ শব্দটি প্রায়ই ভুলভাবে কেবল মুসলিম নারীর ওড়না বা স্কার্ফ বুঝাতে ব্যবহৃত হয়। অনেকের কাছে এটি যেন শুধু একটি কাপড়ের টুকরো, যার কাজ হলো মুসলিম নারীর চুল ঢেকে রাখে-এর বেশি কিছু নয়। অথচ আরবী শব্দ حجاب (হিজাব)-এর অর্থ হলো- আবরণ বা প্রাচীর। অর্থাৎ কোন কিছু আলাদা রাখার প্রতিবন্ধক বা পর্দা। তাই নন-মাহরাম পুরুষদের সামনে হিজাব পালন করা শুধু একজন প্রাপ্তবয়স্ক মুসলিম নারী বা কিশোরীর বাহ্যিক পোশাক বা চেহারার বিষয় নয় বরং এর মধ্যে অন্তর্ভুক্ত থাকে তার সম্পূর্ণ আচরণ, ভঙ্গি, কথা বলার ধরণ ও চলাফেরার শালীনতা। অর্থাৎ তার পুরো ব্যক্তিত্বের সংযম ও শালীন প্রকাশ। মহান আল্লাহ বলেন,
وَ قُلۡ لِّلۡمُؤۡمِنٰتِ یَغۡضُضۡنَ مِنۡ اَبۡصَارِہِنَّ وَیَحۡفَظۡنَ فُرُوۡجَہُنَّ وَلَا یُبۡدِیۡنَ زِیۡنَتَہُنَّ اِلَّا مَا ظَہَرَ مِنۡہَا وَ لۡیَضۡرِبۡنَ بِخُمُرِہِنَّ عَلٰی جُیُوۡبِہِنَّ
‘আর মুমিন নারীদেরকে বলুন, তারা যেন তাদের দৃষ্টি সংযত করে এবং তাদের লজ্জাস্থানের হেফাযত করে; আর তারা যেন তাদের সৌন্দর্য প্রদর্শন না করে; তবে যা সাধারণত প্রকাশ হয়ে থাকে। আর তাদের গ্রীবা ও বক্ষদেশ যেন মাথার কাপড় দ্বারা আবৃত করে’ (সূরা আন-নূর : ৩১)।
উপরের আয়াতে আল্লাহ তা‘আলা সব মুসলিম নারীকে সেই একই নির্দেশ দিয়েছেন, যা তিনি একই সূরার আগের আয়াতে (আয়াত-৩০) মুসলিম পুরুষদের নির্দেশ দিয়েছেন- দৃষ্টি সংযত রাখা এবং নিজেদের পবিত্রতা রক্ষা করা। তবে উক্ত সূরার ৩১ নম্বর আয়াতে, মুসলিম নারীদেরকে আরও দু’টি অতিরিক্ত নির্দেশনা দেয়া হয়েছে- ‘তারা যেন তাদের যীনাহ বা সৌন্দর্য প্রকাশ না করে, যা স্বাভাবিকভাবে প্রকাশ পায়, তা ছাড়া। তারা যেন তাদের মাথার কাপড় (‘খুমুর’; আরবী শব্দ ‘খিমার’-এর বহুবচন) নিজেরদের বক্ষদেশের উপর নামিয়ে দেয়- অর্থাৎ মাথা থেকে বুক পর্যন্ত ঢেকে রাখে’।
এর অর্থ হলো- মুসলিম নারীদের উচিত খুব সতর্ক থাকা, যেন তারা এমন কিছু প্রকাশ না করে, যা আরবী শব্দ زينة (যীনাহ)-এর অন্তর্ভুক্ত বা এর সংজ্ঞার মধ্যে পড়ে। অর্থাৎ যখন তারা এমন কোন প্রাপ্তবয়স্ক পুরুষের সামনে থাকে, যারা তাদের মাহরাম নয় বা এমন নারীদের সামনেও যারা নিজেদেরকে খ বা ই (খ – খবংনরধহ: এমন নারী যারা নারীদের প্রতি আকর্ষিত হয়; ই – ইরংবীঁধষৎ: এমন নারী যারা পুরুষ ও নারী উভয়ের প্রতি আকর্ষিত হয়) হিসাবে পরিচিত করে। তখনও তাদের উচিত নিজেদের ‘যীনাহ’ (সৌন্দর্য বা অলংকার) গোপন রাখা। একইভাবে, যদি কোন মুসলিম নারী এমন কোন স্থানে থাকেন, যেখানে তাদের দেখা যেতে পারে বা তাদের ছবি ধারণ করা সম্ভব; (সিসিটিভি ক্যামেরা বা যেকোন রেকর্ডিং বা সম্প্রচার মাধ্যম), তবুও তাদের উচিত ‘যীনাহ’ প্রকাশ না করা। কারণ সেখান থেকেও তাদের সৌন্দর্য অন্যদের চোখে পড়তে পারে; লাইভে নয়তো রেকর্ডিং-এ।
‘যীনাহ’ শব্দের অর্থ
আরবী ভাষায় زينة (যীনাহ) শব্দের অর্থ হলো- কোন কিছু বা কাউকে সজ্জিত, অলঙ্কৃত, সুশোভিত, সাজানো, শোভিত, অলংকরণ করা, সৌন্দর্যমণ্ডিত করা বা শোভা বৃদ্ধি করা। কুরআনে আল্লাহ তা‘আলা ‘যীনাহ’ শব্দটি আরও নানা প্রসঙ্গে ব্যবহার করেছেন, যাতে আমরা এই শব্দটির গভীর অর্থ ও তাৎপর্য ভালোভাবে বুঝতে পারি। যেমন আল্লাহ বলেন,اِنَّا جَعَلۡنَا مَا عَلَی الۡاَرۡضِ زِیۡنَۃً لَّہَا لِنَبۡلُوَہُمۡ اَیُّہُمۡ اَحۡسَنُ عَمَلًا ‘আমরা পৃথিবীর সবকিছু তার জন্য সুশোভিত করেছি, যেন তাদেরকে পরীক্ষা করি যে, তাদের মধ্যে কর্মে কে অধিক সুন্দর’ (সূরা আল-কাহ্ফ : ৭)। আল্লাহ তা‘আলা আরও বলেন, وَ لَقَدۡ جَعَلۡنَا فِی السَّمَآءِ بُرُوۡجًا وَّ زَیَّنّٰہَا لِلنّٰظِرِیۡنَ ‘আর অবশ্যই আমরা আকাশে গ্রহ নক্ষত্র সৃষ্টি করেছি এবং তাকে করেছি সুশোভিত, দর্শকদের জন্য’ (সূরা আল-হিজর : ১৬)।
কল্পনা করলে দেখা যায়, দিনের যেকোন সময়ে আকাশ কতটা মনোমুগ্ধকর লাগে- তার বিভিন্ন রঙের ঝলকানি, সেই সাথে সূর্য, চাঁদ, মেঘ আর রাতের ঝলমলে তারা, সব মিলিয়ে এক অপূর্ব দৃশ্য তৈরি করে। ঠিক তেমনই পৃথিবীর নানা প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের দৃশ্য যেমন সবুজ বনভূমি, হৃদ, পর্বত, তুষার, নদী আর সাগর অপরিসীম সৌন্দর্যে ভরপুর, যা দেখে আমাদের চক্ষু শীতল হয়ে যায়, মনে প্রশান্তি নেমে আসে। এই উদাহরণ থেকে আমরা কুরআনে আল্লাহর উল্লেখিত যীনাহ শব্দের প্রকৃত অর্থ সম্পর্কে একটি সুন্দর ধারণা পাই। অর্থাৎ রং, ঝলক, উজ্জ্বলতা, ছায়া, আলোর খেলা, বুনন আর সৃষ্টির বৈচিত্র্য- সবকিছু একত্রে মিলেই যে সৌন্দর্য ও শোভা সৃষ্টি করে, তাই হচ্ছে ‘যীনাহ’ বা এমন এক শোভা, যা মন কেড়ে নেয় এবং মানুষকে মুগ্ধ করে তুলে।
আর এটি মাথায় রাখলে, যে কেউ উপলদ্ধি করতে পারবে যে, ‘যীনাহ’ শব্দটি যখন নারীদের ক্ষেত্রে ব্যবহৃত হয়, তখন এটি বিশ্বব্যাপী সৌন্দর্য, ফ্যাশন বা লাইফস্টাইল শিল্প দ্বারা পণ্য বা পরিষেবা হিসেবে সরবরাহ করা সবকিছুকেই অন্তর্ভুক্ত করে। এই জমজমাট শিল্পটি নারীদের নিজেদেরকে সুন্দর করার আকাক্সক্ষার উপর ভিত্তি করে চলে। তাই এটি কখনোই বন্ধ হয় না বা এর ব্যবসা কমে যায় না। আর এটাও গোপন নয় যে, যুগ যুগ ধরে বিশ্বের যেকোন অঞ্চল বা সংস্কৃতিতে সৌন্দর্য ও ফ্যাশন শিল্প পুরুষদের চেয়ে নারীদেরই বেশি প্রাধান্য দিয়েছে বা দিচ্ছে। ঐতিহাসিকভাবে, রূপসজ্জা সবসময়ই পুরুষদের চেয়ে নারীদের জন্য বেশি উপযুক্ত বা বিশেষ অধিকার হিসেবে গণ্য হয়ে আসছে। এই কারণেই মুসলিম মহিলাদের জন্য কুরআনের নির্দেশ হলো- তাদের ‘যীনাহ’ বা সৌন্দর্য প্রকাশ না করা, শুধুমাত্র তার সেই অংশটুকু ছাড়া; যা স্বাভাবিকভাবেই প্রকাশ পায়।
নারীদের ক্ষেত্রে যীনাহ বলতে কী বোঝায়?
নারীদের পোশাকে রঙ, নকশা, বুনন, ছাপ, কাটিং এবং ঝকঝকে কারুকার্য- যেভাবে সাজানো যায়, তার কোনো শেষ নেই। এরপর রয়েছে গয়না, রত্নপাথর এবং মেকআপ। যেন এই সবকিছুই যথেষ্ট ছিল না, এর সাথে যোগ হয় জুতা এবং অন্যান্য অনুষঙ্গ (যেমন সানগ্লাস এবং হ্যান্ডব্যাগ), যা একজন নারীর বাহ্যিক সৌন্দর্যকে আরও বাড়িয়ে তোলার জন্য তৈরি করা হয়েছে অর্থাৎ যা তার ‘যীনাহ’ বা সাজসজ্জায় নতুন মাত্রা যোগ করে। তার চোখের পাপড়ি হোক কিংবা পায়ের আঙুলের ক্ষুদ্রতম নখ-সবকিছুর জন্যই এমন কিছু না কিছু আছে, যা ফ্যাশন ইন্ডাস্ট্রি একজন নারীকে তার সৌন্দর্য বৃদ্ধি বা ফুটিয়ে তোলার জন্য অফার করে থাকে।
আল্লাহ তা‘আলা মুসলিম মেয়েদের এবং নারীদের নির্দেশ দিয়েছেন যেন তারা এমন কিছু প্রকাশ না করে যা ‘যীনাহ’-এর আওতাভুক্ত হয়। অধিকাংশ মুসলিম স্কলারদের মতে, সূরা আন-নূরের ৩১ নম্বর আয়াতে ব্যবহৃত ‘যীনাহ’ শব্দটির আক্ষরিক অর্থ হলো ‘সাজসজ্জা’ বা ‘অলংকার’, যার মধ্যে নিচের দু’টি বিষয়ই অন্তর্ভুক্ত-
(ক) যা আল্লাহ নিজে অলঙ্কৃত করেছেন (অর্থাৎ নারীর প্রাকৃতিক বা শারীরিক সৌন্দর্য)।
(খ) যা দিয়ে তারা নিজেদের সজ্জিত করে (অর্থাৎ গয়না, আই শ্যাডো, আকর্ষণীয় পোশাক, মেহেদী ইত্যাদি)।
‘খুমুর’ (যা ‘খিমার’-এর বহুবচন) বলতে এমন একটি কাপড়কে বোঝায়, যা মাথা (কানসহ), চুল, ঘাড় এবং বুক ঢেকে রাখে।[১]
তাই এখান থেকে খুব পরিষ্কারভাবেই বোঝা যায় যে, ইসলামে মুসলিম মেয়ে এবং নারীদের জন্য কেবল মাথার চুল ঢেকে রাখার একটি স্কার্ফ বা হিজাবই বাধ্যতামূলক করা হয়নি। বরং ‘যীনাহ’-এর এই বিস্তৃত সংজ্ঞার আওতায় যা কিছু পড়ে- যেমন মেকআপ, অনুষঙ্গ, গয়না এবং কারুকার্যময় পোশাক- সবই ঢেকে রাখা উচিত। কেবল مَا ظَہَرَ مِنۡہَا অর্থাৎ ‘সাধারণত যা প্রকাশ থাকে’ সেটুকুই ব্যতিক্রম।
তাই এখান থেকে পরিষ্কারভাবে বোঝা যায় যে, مَا ظَہَرَ مِنۡہَا -এর অন্তর্ভুক্ত বিষয়গুলো হলো :
>> একজন মুসলিম মেয়ে বা নারীর উচ্চতা, শারীরিক গঠন এবং অবয়ব। সে নিজেকে যত ভালোভাবেই ঢেকে রাখুক না কেন, এগুলো লুকিয়ে রাখা সম্ভব নয়।
>> তার মাথার স্কার্ফ বা খিমার এবং তার বাইরের পোশাক বা জিলবাব-এর কাপড়, বুনন, ধরণ এবং রঙ।
>> দৃষ্টিশক্তি ঠিক রাখার জন্য তাকে সচরাচর যে চশমা পরতে হয়।
>> খুব সাধারণ ও স্বাভাবিক মেকআপ (যা ‘জিরো’ বা ‘নিড’ মেকআপ হিসেবেও পরিচিত), যা কেবল ত্বকের দাগ বা খুত ঢাকার জন্য ব্যবহার করা হয়।
>> মোজা, জুতা এবং হ্যান্ডব্যাগ।
এগুলো ছাড়াও একজন মুসলিম নারীর সামগ্রিক হিজাবের জন্য এটি বাধ্যতামূলক যে, তিনি ঘরের বাইরে যাওয়ার সময় তীব্র সুগন্ধি ব্যবহার থেকে কঠোরভাবে বিরত থাকবেন। এছাড়া তিনি নিজের কণ্ঠস্বর, কথা, হাঁটার ধরণ, অঙ্গভঙ্গি বা শারীরিক ভাষা-এমন কোনোভাবেই নিজেকে উপস্থাপন করবেন না, যা স্বভাবগতভাবে প্ররোচনামূলক বা আকর্ষণীয়।
মনে রাখতে হবে,مَا ظَہَرَ مِنۡہَا -এর অধীনে উপরে উল্লিখিত ছাড়গুলোকে লোক দেখানোর জন্য উদ্দেশ্যমূলকভাবে ব্যবহার করা উচিত নয়। যেমন-ইচ্ছাকৃতভাবে চোখে গাঢ় কাজল বা কৃত্রিম পাপড়ি লাগানো, উজ্জ্বল রঙের নেইলপলিশ বা কৃত্রিম নখের ওপর আকর্ষণীয় ‘নেইল আর্ট’, বড় ও ঝকঝকে আংটি এবং শব্দ হয় এমন চুড়ি, চকচকে কালারিং জুতা, অথবা উজ্জ্বল রঙের কিংবা ভারী কারুকার্যময় খিমার বা জিলবাব পরা। মোটকথা একজন মুসলিম নারী তার ‘যীনাহ’ বা সৌন্দর্য ঢেকে রাখার জন্য যে বাইরের পোশাক পরিধান করেন, সেই পোশাকের কাপড় বা উপাদানটি যেন নিজেই ‘যীনাহ’-এর অন্তর্ভুক্ত না হয়ে যায়!
নারীর সহজাত সৌন্দর্য ও আকাঙ্ক্ষা
সুন্দরী হওয়া বা সুন্দর দেখানো প্রতিটি মেয়েরই সহজাত আকাক্সক্ষা। সে তার রূপের জন্য প্রশংসা পেতে চায় এবং শুনতে চায় সে কতটা চমৎকার, যদি সরাসরি রূপসী নাও হয়। নারী জাতির মধ্যে এই আকাক্সক্ষা থাকাটা অত্যন্ত স্বাভাবিক। এটি মূলত আল্লাহর পক্ষ থেকে একটি পরীক্ষাও বটে। সে কারণেই, যখন কোন মেয়ের জীবনে কনে হিসেবে সাজবার সময় আসে, তখন তার ব্যক্তিত্বের এক ইঞ্চি জায়গাও সাজসজ্জাহীন রাখা হয় না। ভারী গয়না, বিশেষ মেকআপ, চুলের কারুকার্যময় সাজ, হাত-পায়ে মেহেদী, নকশা করা দামি পোশাক, ফুলের মালা-সবকিছুই সেখানে থাকে। এমনকি একজন কনে তার পূর্ণ দীপ্তিতে যখন উজ্জ্বল হয়ে ওঠে, সেই মুহূর্তগুলো ধরে রাখার জন্য বিশেষ ব্যাকগ্রাউন্ড বা পটভূমি ব্যবহার করে খুঁটিনাটি পরিকল্পনার মাধ্যমে বড় ধরনের ফটোশুটের আয়োজন করা হয়।
দুঃখজনক হলে সত্যি যে, নিজেদের এই আনন্দ আর গর্বের মুহূর্তগুলোতেই অনেক মুসলিম মেয়ে এবং নারী কুরআনে বর্ণিত আল্লাহর স্পষ্ট নির্দেশগুলো অবজ্ঞা ও অমান্য করে। যেখানে আল্লাহ তা‘আলা স্পষ্টভাবে তাদেরকে তাদের ‘যীনাহ’ বা সৌন্দর্য, পরপুরুষের (গাইরে মাহরাম) সামনে প্রদর্শন করতে নিষেধ করেছেন। সেটি সরাসরি বা ডিজিটাল পর্দায় (ছবি বা ভিডিওতে) দেখা হোক, পরপুরুষের জন্য এমন কোনো মুসলিম নারী বা মেয়েকে দেখা বৈধ নয়, যিনি জাঁকজমকপূর্ণ সাজে সজ্জিত। এমনকি তাত্ত্বিকভাবে যদি কেবল তার মুখমণ্ডল এবং হাতই দেখা যায় তবুও। যদি তার মুখ ভারী মেকআপে ঢাকা থাকে, মাথায় পুঁতি ও সুতোর কারুকার্য করা ঝলমলে রেশমি স্কার্ফ থাকে এবং হাতে মেহেদীর নকশা, চকচকে আংটি ও উজ্জ্বল চুড়ি থাকে। তবে এই সম্পূর্ণ সাজসজ্জা ‘যীনাহ’-এর অন্তর্ভুক্ত হবে। অতএব তাকে অবশ্যই নিশ্চিত করতে হবে যে, এই সুসজ্জিত অবস্থায় তিনি যেন কোন পরপুরুষের সামনে না আসেন। এমনকি যদি তার শরীরের কেবল মুখমণ্ডল এবং হাতের চামড়াই দৃশ্যমান হয় তবুও।
একই নিয়ম সেই সমস্ত মুসলিম নারী বা মেয়েদের জন্যও প্রযোজ্য, যারা এই ধরণের বিয়ের অনুষ্ঠান বা অন্যান্য পার্টিতে অংশগ্রহণ করেন। যদি এই নিশ্চয়তা না থাকে যে, উৎসবের সময় সেখানে কোন পরপুরুষ বা ক্যামেরা থাকবে না, তবে উপরে উল্লিখিত ইসলামের সংজ্ঞা অনুযায়ী তার ব্যক্তিত্বের এমন কোনো কিছুই উন্মোচন করা জায়েয নেই, যা ‘যীনাহ’-এর আওতায় পড়ে।
হিজাব ও সামাজিকতা : ভ্রান্ত ধারণা বনাম বাস্তবতা
বাইরে থেকে দেখলে, বাঁধনহীন সৌন্দর্যের অবাধ প্রদর্শনী পুরুষ ও নারী উভয়ের কাছেই অত্যন্ত জাঁকজমকপূর্ণ এবং আকর্ষণীয় মনে হয়। সম্মানিত ব্যক্তিদের উপস্থিতিতে প্রাণবন্ত, আলোকোজ্জ্বল এবং সুন্দরভাবে সাজানো নৈশভোজের আসরের মতো এমন কিছুই নেই, যা মানুষের মন ভালো করে দিতে পারে এবং জীবনের একঘেয়েমি দূর করতে পারে। সাধারণত মানুষ ধরে নেয় যে, নারী-পুরুষের সামাজিক মেলামেশা এবং নারীর হিজাব ও সাজসজ্জা নিয়ে ইসলামের বিধিনিষেধগুলো এতটাই কঠোর যে, মানুষের সামাজিক হওয়া এবং একসাথে ভালো খাবার উপভোগ করার স্বাভাবিক আকক্সক্ষার সাথে এর কোনো সমন্বয় করা সম্ভব নয়। বিশেষ করে নারীরা ভুলভাবে ধরে নেন যে, তারা যদি হিজাব পালন করেন, তবে তা তাদের জন্য এক ধরণের ‘পুরানো আমলের সেকেলে’ ব্যক্তিত্ব এবং সামাজিক বিচ্ছিন্নতা বয়ে আনবে।
সত্য হলো, প্রচলিত সামাজিক রীতিনীতিগুলোকে ইসলামের বিধান অনুযায়ী পরিবর্তন বা খাপ খাইয়ে নেওয়ার ক্ষেত্রে মুসলিমদের অনীহা এবং অক্ষমতাই নারীদের জন্য হিজাব পালন করাকে কঠিন করে তোলে। আল্লাহকে অমান্য না করেও পরিমিতি বোধ বজায় রেখে পার্টি বা সামাজিক অনুষ্ঠানে নারীদের নিজেদের সাজানো এবং অলঙ্কৃত করার সহজাত আকাক্সক্ষা পূরণ করার অনেক উপায় রয়েছে।
সবচেয়ে প্রথমে যে বিষয়টি মনে রাখতে হবে, তা হলো নিজের নিয়ত বা উদ্দেশ্যকে সংশোধন করা। একজন মুসলিম নারীর উচিত আল্লাহকে সন্তুষ্ট করার জন্য নিজেকে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন, পরিপাটি এবং রক্ষণাবেক্ষণ করা, কারণ তার এই দেহ আল্লাহর পক্ষ থেকে একটি আমানত। তাই আল্লাহর সৃষ্টির কেউ তাকে দেখুক বা না দেখুক, দৈনন্দিন জীবনে তার কখনোই অগোছালো, উপস্থাপনের অযোগ্য, শিথিল বা অপরিচ্ছন্ন থাকা উচিত নয়। বরং তার উচিত একটি মনোরম এবং পরিচ্ছন্ন শারীরিক অবয়ব বজায় রাখা; এমনকি যখন সে কেবল তার নিকটাত্মীয় বা পরিবারের সদস্যদের সামনে থাকে, তখনও যেন তাকে দেখতে এবং তার ঘ্রাণ ভালো লাগে।
দ্বিতীয়তঃ বাইরে যাওয়া এবং সামাজিক মেলামেশার ক্ষেত্রে আল্লাহর অবাধ্যতা এড়িয়ে চলা খুবই সহজ। ব্যক্তিগত কক্ষ বা এমন স্থান যেখানে ক্যামেরা এবং পরপুরুষ (গাইরে মাহরাম) নেই, সেখানে মুসলিম নারীরা অন্য নারী এবং অপ্রাপ্তবয়স্ক শিশুদের সামনে তাদের ‘খুমুর’ (মাথার স্কার্ফ) এবং ‘জীলবাব’ (বাইরের পোশাক) খুলে নিজেদের ‘যীনাহ’ বা সৌন্দর্য প্রকাশ করতে পারেন। তবে তা হতে হবে পরিমিতিবোধের মধ্যে এবং লোকদেখানো বা জাঁকজমক (অর্থাৎ সম্পদের অতিরিক্ত প্রদর্শন) এড়িয়ে, যা অহংকার ও ঔদ্ধত্যের জন্ম দেয়। এই ধরণের সামাজিক অনুষ্ঠানে আয়োজক এবং অতিথি-উভয়কেই আগে থেকে লজিস্টিক বা ব্যবস্থাপনার বিষয়ে একে অপরকে সহযোগিতা করা উচিত। যাতে অনুষ্ঠানস্থল এবং আমন্ত্রিতদের আচরণ ইসলামের পর্দার বিধান বা পৃথকীকরণ মেনে চলে। যা মূলত মুসলিম নারীদের গোপনীয়তা ও সম্মান বজায় রাখার জন্য এবং সুরক্ষিত রাখার জন্য তৈরি করা হয়েছে।
বিয়ের অনুষ্ঠানসহ বিভিন্ন সামাজিক অনুষ্ঠানে যেখানে হিজাব পালনকারী মুসলিম নারীরা উপস্থিত থাকবেন, সেখানে সফলভাবে পর্দা বা পৃথক ব্যবস্থাপনা বজায় রাখার বেশ কিছু উপায় রয়েছে।
সামাজিক অনুষ্ঠানে নারী-পুরুষের পৃথক ব্যবস্থা নিশ্চিত করা
ইসলাম মুসলিমদের একে অপরের সাথে সুসম্পর্ক বজায় রাখতে উৎসাহিত করে। সে কারণেই মুসলিমদের অনেক সাধারণ কাজের সাথে মহান আল্লাহর পক্ষ থেকে পুরস্কার বা নেকি জড়িয়ে আছে, যার মধ্যে সামাজিক বন্ধন তৈরি এবং তা মজবুত করার কাজগুলোও অন্তর্ভুক্ত। এর মধ্যে রয়েছে পরিচিত এবং অপরিচিত-উভয়কেই সালাম দেওয়া, নিজের পরিবারকে এবং অন্যদের খাওয়ানো এবং ভোজের অনুষ্ঠানে মেহমানদের দাওয়াত দেওয়া ও অন্যের দাওয়াতে সাড়া দেয়া।
বিশেষ করে একটি মুসলিম বিয়েতে ‘ওয়ালিমা’ ভোজের আয়োজন করা এবং আমন্ত্রিত হলে তাতে অংশগ্রহণ করা বাধ্যতামূলক (ওয়াজিব)। তা সত্ত্বেও, এটি নিশ্চিত করাও বাধ্যতামূলক যে, মুসলিমরা যেসব সামাজিক সমাবেশের আয়োজন করবে বা যেখানে অংশগ্রহণ করবে, তা যেন সব ধরণের গুনাহ থেকে মুক্ত থাকে। যে বিষয়টি বড় ধরণের ‘ফিতনা’-এর দিকে নিয়ে যেতে পারে (এবং প্রায়ই নিয়ে যায়), তা হলো নৈশভোজ বা পার্টির মতো সামাজিক ও উৎসবের অনুষ্ঠানগুলোতে নারী-পুরুষের অবাধ মেলামেশা।
এই ধরণের উৎসবের সময়, হিজাব পালনকারী মুসলিম নারীদের এমন সুযোগ এবং স্থান দেওয়া উচিত, যাতে তারা তাদের বাইরের পোশাক, যেমন-খিমার এবং জিলবাব খুলে রাখতে পারেন। এর ফলে তারা স্বাচ্ছন্দ্যে সেজেগুজে সামাজিক সমাবেশটি উপভোগ করতে পারবেন, এই নিশ্চিন্ত মনে যে সেখানে কোনো পরপুরুষ (গাইরে মাহরাম) বা ক্যামেরা নেই, যা তাদের গোপনীয়তা ও হিজাবকে ক্ষুণ্ন করতে পারে।
অনুষ্ঠানস্থলের মাঝখানে কেবল একটি পাতলা পর্দা বা স্বচ্ছ কোনো বাধা টেনে দেওয়াই যথেষ্ট নয়, যার ভেতর দিয়ে পুরুষরা সহজেই নারীদের দেখতে পায় এবং নারীরাও পুরুষদের দেখতে পায়। আয়োজক এবং অতিথি-উভয়কেই আগেভাগেই বাস্তবসম্মত এবং কার্যকর লজিস্টিক পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে, যাতে উপস্থিত সকলের (বিশেষ করে নারীদের) গোপনীয়তা ও শালীনতা বজায় থাকে এবং সুরক্ষিত হয়। এটিকে একটি পবিত্র ‘আমানত’ হিসেবে বিবেচনা করা উচিত; যা আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য পূরণ করা আবশ্যক।
নারীদের জন্য পৃথকীকরণের শারঈ প্রমাণ
পবিত্র কুরআনে সূরা আল-আহযাব-এর নিম্নের আয়াত উল্লেখ করা হয়েছে, যা প্রমাণ করে যে, মুমিনদের মাতা অর্থাৎ নবী করীম (ﷺ)-এর পত্নীগণের জন্য- পরোক্ষভাবে সকল মুসলিম নারীর জন্য- পর্দার আড়াল থেকে কোনো পরপুরুষের প্রয়োজনীয় প্রশ্নের উত্তর দেওয়া বা অনুরোধ রক্ষা করা কতটা পবিত্রতর পদ্ধতি।
وَ اِذَا سَاَلۡتُمُوۡہُنَّ مَتَاعًا فَسۡـَٔلُوۡہُنَّ مِنۡ وَّرَآءِ حِجَابٍ ؕ ذٰلِکُمۡ اَطۡہَرُ لِقُلُوۡبِکُمۡ وَ قُلُوۡبِہِنَّ
‘আর তোমরা যখন তাঁদের (নবী-পত্নীদের) কাছে কোনো কিছু চাইবে, তখন পর্দার আড়াল থেকে চাইবে। এটি তোমাদের এবং তাঁদের অন্তরের জন্য অধিকতর পবিত্রতার কারণ’ (সূরা আল-আহযাব : ৫৩)।
তদুপরি, রাসুলুল্লাহ (ﷺ)-এর জীবনী বা হাদীছ থেকে জানা যায় যে, তাঁর জীবদ্দশায় মদীনার মসজিদে নববীতে নারীদের ছালাতের কাতার পুরুষদের কাতারের বেশ খানিকটা পেছনে থাকত। নারী-পুরুষের মধ্যে এই পৃথকীকরণ নিশ্চিত করা হয়েছিল, যাতে নারীদের পূর্ণ গোপনীয়তা ও পর্দা বজায় থাকে।[২] মসজিদে ছালাত শেষ হওয়ার পর, নারীদের প্রথমে মসজিদ ত্যাগ করার নির্দেশ দেওয়া হত এবং বাড়ি ফেরার পথে তাদের রাস্তার এক পাশ দিয়ে দেয়াল ঘেঁষে চলার পরামর্শ দেওয়া হত, যাতে রাস্তায় পুরুষদের সাথে কোনো সংমিশ্রণ না ঘটে। সে সময় যেসব মুসলিম নারীরা রাসুলুল্লাহ (ﷺ)-এর মসজিদে ছালাতে অংশ নিতেন, তারা মাথা থেকে পা পর্যন্ত ইসলামী হিজাবে আবৃত থাকতেন বলে জানা যায়।[৩]
মসজিদ হলো পৃথিবীর সবচেয়ে পবিত্র স্থান, যেখানে মুসলিমরা একাগ্রচিত্তে আল্লাহর ইবাদত করে। যদি রাসুলুল্লাহ (ﷺ)-এর জীবদ্দশায় খোদ তাঁর নিজের মসজিদেই নারী-পুরুষের পৃথকীকরণের এই বিধান কার্যকর করা হয়ে থাকে, তবে বর্তমান যুগের সামাজিক অনুষ্ঠানগুলো সম্পর্কে কী বলা যেতে পারে? যে অনুষ্ঠানগুলোর মূল উদ্দেশ্যই হলো সামাজিক মেলামেশা, আত্মীয়তার বন্ধন রক্ষা, একে অপরকে জানা, মেহমানদারী করা, অন্যের দাওয়াত ও উপকারের প্রতিদান দেয়া এবং সবাই মিলে একসাথে খাওয়া-দাওয়া ও আনন্দ করা।
এটি সত্য যে, অবাধ ও অপ্রয়োজনীয় সামাজিক মেলামেশা অনেক অন্যায় ও মন্দের জন্ম দেয়। তবুও পরিমিতিবোধের মধ্যে থেকে ইসলাম সামাজিকতাকে কেবল অনুমতিই দেয়নি, বরং উৎসাহিতও করেছে-বিশেষ করে যখন এর পেছনে সৎ উদ্দেশ্য থাকে। কারণ, এটি মুসলিম উম্মাহকে ঐক্যবদ্ধ, ঘনিষ্ঠ এবং একটি শক্তিশালী সম্প্রদায় হিসেবে টিকিয়ে রাখে।
একটি ভোজসভা বা ওয়ালিমা অনুষ্ঠানের আয়োজকরা সকল অতিথির শালীনতা এবং গোপনীয়তা বজায় রাখার জন্য বেশ কিছু উপায়ে নারী-পুরুষের পৃথক পর্দার ব্যবস্থা গ্রহণ করতে পারেন। এটি বিশেষ করে সেইসব নারী অতিথিদের জন্য প্রযোজ্য, যারা কঠোরভাবে হিজাব পালন করেন। যারা তাদের মাথার স্কার্ফ (খিমার) বা বাইরের পোশাক (জিলবাব) ততক্ষণ পর্যন্ত খুলবেন না, যতক্ষণ পর্যন্ত একজন পরপুরুষও (গাইরে মাহরাম) তাদের দেখে ফেলার সম্ভাবনা থাকে, অথবা ক্যামেরা বা সিসিটিভির মাধ্যমে তাদের দেখার সামান্যতম সুযোগ থাকে।
দুই তলা বিশিষ্ট ব্যবস্থা
নারী-পুরুষের পৃথকীকরণের একটি কার্যকর উপায় হলো একটি ভবনের দু’টি তলা ব্যবহার করা; নিচতলা পুরুষদের জন্য এবং ওপরের তলা নারীদের জন্য। অপ্রাপ্ত বয়স্ক বাচ্চাদের উভয় তলায় যাতায়াতের অনুমতি দেওয়া যেতে পারে; এর ফলে পুরুষ ও নারী অতিথিদের মধ্যে যারা একে অপরের মাহরাম, তাদের মধ্যে প্রয়োজনীয় যোগাযোগ রক্ষা করা সহজ হবে। তবে এমন পরিস্থিতিতেও যেসব অতিথি সেক্যুলার বা ধর্মনিরপেক্ষ মানসিকতার অথবা অমুসলিম, তারা আয়োজকদের নির্ধারিত এই সীমানা মেনে নিতে আপত্তি জানাতে পারে। তারা অবাধ্যভাবে এমন তলায় প্রবেশ করতে পারে, যেখানে তাদের প্রবেশ করার কথা নয়, যা আয়োজক এবং অন্যান্য পর্দানশীন অতিথিদের জন্য অস্বস্তিকর পরিস্থিতির সৃষ্টি করতে পারে।
এছাড়াও প্রায়ই লক্ষ্য করা যায় যে- যেসব পৃথক অনুষ্ঠানে পুরুষ ও নারীদের নির্ধারিত বিভাগগুলো খুব কাছাকাছি থাকে, সেখানে যেসব অতিথি আল্লাহ তা‘আলার অবাধ মেলামেশা সংক্রান্ত বিধিনিষেধকে ভয় করে না বা সম্মান করে না, তারা ইচ্ছাকৃতভাবে নিজেদের নির্ধারিত স্থান ছেড়ে বাইরে চলে আসে। তারা ছাদ, লবি বা এমনকি পার্কিং লটের মতো সাধারণ জায়গায় গিয়ে বিপরীত লিঙ্গের অন্যান্য অতিথিদের সাথে (যারাও একইভাবে নিজেদের বিভাগ ছেড়ে বাইরে এসেছেন) আনন্দঘন খোশগল্প এবং নিরর্থক কথাবার্তায় (এমনকি প্রকাশ্য ফ্লার্টিং-আল্লাহ আমাদের রক্ষা করুন) মেতে ওঠে। অনেক সময় তারা ধূমপান করা বা ফোনে কথা বলার অজুহাত দিয়ে বাইরে যান। আশ্চর্যের বিষয় হলো- পুরুষ ও নারীদের ব্যক্তিগত বিভাগের বাইরে তৃতীয় একটি জায়গায় ছোটখাটো একটি ‘মিশ্র অনুষ্ঠান’ পুরোদমে শুরু হয়ে যায়। এটি ততক্ষণ পর্যন্ত চলতে থাকে, যতক্ষণ না আয়োজকদের চরম অস্বস্তিতে ফেলে।
এমন পরিস্থিতিতে যখন অনুষ্ঠানের আয়োজকরা আগে থেকেই বুঝতে পারেন যে, তাদের কিছু সেক্যুলার বা উদারমনা অতিথি এই নিয়মের প্রতি অশ্রদ্ধা দেখাবেন এবং আল্লাহ তা‘আলার বিধান ও আয়োজকদের পৃথকীকরণের প্রচেষ্টাকে স্পষ্টভাবে লঙ্ঘন করবেন, তখন নিচে দেওয়া বিকল্প ব্যবস্থাগুলো গ্রহণ করা শ্রেয়।
(ক) পৃথক অনুষ্ঠানস্থল : সামাজিক অনুষ্ঠান বা পার্টির ক্ষেত্রে পুরুষ এবং নারীদের বিভাগগুলোকে একে অপরের থেকে অল্প ড্রাইভিং দূরত্বে রাখা লিঙ্গ পৃথকীকরণ বজায় রাখার আরেকটি ব্যবহারিক ও সফল পদ্ধতি। যদিও প্রাথমিকভাবে এটি একটি ব্যয়বহুল বিকল্প মনে হতে পারে, তবে প্রতিটি বিভাগের জন্য ছোট পার্টি রুম এবং ছোট আকারের ক্যাটারার ব্যবহার করে অনুষ্ঠানের মোট খরচ কমিয়ে আনা সম্ভব। এছাড়াও, আয়োজকরা ভোজ বা অনুষ্ঠানের সময় দিনের শুরুর দিকে বা বিকেলে নিয়ে আসতে পারেন; যখন উভয় ভেন্যু বা অনুষ্ঠানস্থলের ভাড়া কম থাকে এবং রাতের অনুষ্ঠানের জন্য প্রয়োজনীয় দামী আলোকসজ্জার খরচটিও পুরোপুরি এড়িয়ে যাওয়া যায়।
(খ) মারকিউ টানেল (তাবুর সুড়ঙ্গ পথ) : আজকাল সামাজিক অনুষ্ঠান এবং ভোজসভার জন্য তাবু বা মারকিউ ব্যবহার করার ফলে অনুষ্ঠানের পুরো সময় জুড়ে সফলভাবে নারী-পুরুষের পৃথকীকরণের বেশ কিছু বিকল্প পথ উন্মুক্ত হয়েছে। যেহেতু তাবু নমনীয় উপকরণ দিয়ে তৈরি করা যায়, তাই প্রথাগত চিন্তার বাইরে গিয়ে ইভেন্ট প্ল্যানার বা বিয়ের আয়োজকদের সাথে আগে থেকেই সমন্বয় করা সম্ভব। এর মাধ্যমে নারীদের জন্য সম্পূর্ণ আলাদা ও ব্যক্তিগত একটি তাবু তৈরি করা যায়, যেখানে প্রবেশের পথ হিসেবে তাবুর কাপড় দিয়েই তৈরি বেশ কিছু আঁকাবাঁকা ঢাকা টানেল বা সুড়ঙ্গ পথ ব্যবহার করা যেতে পারে। একটি আন্ডারপাস বা ভূগর্ভস্থ পথ যেভাবে কাজ করে তা কল্পনা করুন। ঠিক তেমনই ব্যক্তিগত ও সুরক্ষিত এই প্রবেশপথ বা টানেলটি মাটির নিচে না করে মাটির ওপরেই স্থাপন করা হবে। এটি নিশ্চিত করবে যে নারীদের ব্যক্তিগত বিভাগে কোনো অননুমোদিত প্রবেশ ঘটবে না। তাঁবুর তৈরি এই হাঁটার পথ বা টানেলগুলো যদি অন্তত একবার, দুবার বা তার বেশি সমকোণে ঘোরানো বা বাঁকানো হয়, তবে নারীদের মূল অনুষ্ঠানস্থল এবং এর প্রবেশপথটি বাইরের যেকোনো উঁকিঝুঁকি দেওয়া উৎসুক দৃষ্টি থেকে সম্পূর্ণরূপে আড়ালে থাকবে।
(গ) কনের জন্য পর্দাঘেরা গাজিবো (বিশেষ কক্ষ) : বিয়ের প্রতিটি অনুষ্ঠানে কনের ব্যক্তিগত গোপনীয়তা রক্ষা করার জন্য-বিশেষ করে যদি তিনি পূর্ণাঙ্গ হিজাব পালন করেন (কিন্তু তার বর্ধিত পরিবারের অনেক সদস্যই হয়তো তা করেন না)-তবে অনুষ্ঠানস্থলে শুধুমাত্র কনে এবং তার বরের বসার জন্য একটি ব্যক্তিগত, পর্দাঘেরা এবং ঢাকা ‘গাজিবো’ (এক ধরণের ছোট সুসজ্জিত কক্ষ) স্থাপন করা অত্যন্ত যরূরী। ফুলে ফুলে সজ্জিত এই ছোট, ব্যক্তিগত এবং নির্জন কক্ষটি মূল বড় প্যান্ডেল বা মারকিউ-র ভেতরেই স্থাপন করা যেতে পারে। এটি নিশ্চিত করবে যে, কনের পূর্বানুমতি এবং সম্মতি ছাড়া কেউ হঠাত করে তার সামনে চলে আসবে না অথবা নিজের ফোনে তার ছবি তোলার চেষ্টা করবে না।
এখানে এটি উল্লেখ করাও প্রাসঙ্গিক যে, ঢেকে রাখা মারকিউ (তাঁবু) এবং গাজিবো ওপর দিয়ে উড়ে যাওয়া ড্রোন ক্যামেরার নজরদারি থেকেও গোপনীয়তা নিশ্চিত করতে পারে। ড্রোন হলো আধুনিক যুগের এমন এক উদ্ভাবন, যা দুর্ভাগ্যবশত অত্যন্ত অসতর্ক এবং দায়িত্বজ্ঞানহীনভাবে ব্যবহৃত হচ্ছে-তা ইচ্ছা করেই হোক বা ভুলবশত-যা অন্যের ব্যক্তিগত গোপনীয়তাকে ক্ষুণ্ন করে।
(ঘ) হাতের নাগালে ওড়না রাখা : সবশেষে উপায় হচ্ছে, কনেসহ হিজাব পালনকারী সকল মুসলিম নারী ও মেয়ের উচিত উৎসব বা সামাজিক অনুষ্ঠানের পুরোটা সময় নিজেদের হাতের নাগালে একটি পাতলা কিন্তু বড় স্কার্ফ বা ওড়না রাখা। এটি এই কারণে যরূরী যে, যদি হঠাৎ কোনো পরপুরুষ (গাইরে মাহরাম) বিনা নোটিশে সামনে চলে আসে, অথবা যদি কোনো জেদি মুরুব্বি মহিলা ‘খালা’ বা ‘চাচি’ ছবি তোলার জন্য পীড়াপীড়ি করেন এবং ‘না’ বলা সত্ত্বেও শুনতে রাজি না হন-তবে সেই পরিস্থিতিতে নিজেকে দ্রুত ঢেকে নেওয়ার জন্য এই স্কার্ফটি শেষ কিন্তু প্রয়োজনীয় উপায় হিসেবে ব্যবহার করা যেতে পারে।
সম্মতি ও গোপনীয়তা : একটি গুরুতর আইনি বিষয়
যখন গোপনীয়তা এবং সম্মতির বিষয় আসে, তখন আধুনিক বিশ্ব এক দ্রুত ও গতিশীল পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। ব্যক্তিগত স্থান এবং মিডিয়া সংক্রান্ত সীমানার ক্ষেত্রে ‘সম্মতি’ এখন বিশ্বের অনেক অঞ্চলেই একটি গুরুতর আইনি ইস্যুতে পরিণত হয়েছে। একে হালকাভাবে নিলে বা অবজ্ঞা করলে ভবিষ্যতে মারাত্মক আইনি পরিণতির সম্মুখীন হতে পারে।
মুসলিম নারীদের গোপনীয়তা, ব্যক্তিগত স্থান এবং শালীনতা বজায় রাখা ও সুরক্ষার ক্ষেত্রে ‘সম্মতি’ বা অনুমতি গ্রহণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। এমনকি ডিজিটাল ফটোগ্রাফি এবং ভিডিও নির্মাণের ক্ষেত্রেও, অনলাইনে কোনো মিডিয়া শেয়ার করার সময় তাতে যদি অন্য কোনো ব্যক্তির চেনা যায় এমন ছবি থাকে, তবে তার অনুমতি নেওয়া এখন একটি আইনি বাধ্যবাধকতা। সামাজিক অনুষ্ঠান এবং ডিজিটাল ফটোগ্রাফির ক্ষেত্রে সামনে এগিয়ে যাওয়ার সময় এই বিষয়টি অবশ্যই আমাদের মনে রাখতে হবে।
মুসলিমদের উচিত গোপনীয়তার বিষয়টিকে অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে গ্রহণ করা, যেন পবিত্র কুরআন এবং হাদীছে বর্ণিত আল্লাহর দেওয়া বিধান ও সীমানাগুলো যথাযথভাবে পালন করা যায়। বর্তমান সময়ে অনেক প্রথম সারির তারকা এবং প্রভাবশালী ব্যক্তিরা- যেমন রাজনৈতিকভাবে শক্তিশালী নেতারা- যখন কোনো সামাজিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করেন, তখন তারা অতিথিদের স্বাচ্ছন্দ্য, নিরাপত্তা এবং গোপনীয়তা নিশ্চিত করতে আগেভাগেই ব্যাপক ও সুনিপুণ ব্যবস্থা গ্রহণ করেন। এমনকি অনেক ক্ষেত্রে অতিথিদের বলা হয় প্রবেশপথেই বিশেষ নিরাপত্তা দলের কাছে তাদের ফোন জমা দিয়ে আসতে। অনুষ্ঠানের ভেতরে ভিডিও বা ছবি তোলা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ হতে পারে। এছাড়া প্রহরীদের ব্যবহার, সিকিউরিটি পাস-কোড এবং অন্যান্য উপায়ে নির্দিষ্ট সীমানার বাইরে যাওয়া কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করা হতে পারে।
উপসংহার
ডিজিটাল উন্নতির এই যুগেও, যখন ব্যক্তিগত গোপনীয়তা ও নিরাপত্তার জন্য সীমারেখা টানার প্রশ্ন আসে, তখন অনেক অমুসলিমরাও তাদের প্রতিষ্ঠানে অতিথিদের প্রবেশের সময় নিয়মকানুন বেঁধে দিতে কুণ্ঠাবোধ করেন না। সেটি কোনো জাঁকজমকপূর্ণ পার্টি সেন্টার হোক, কোনো বিশেষ ক্লাব বা অবকাশ যাপন কেন্দ্র হোক, কিংবা কোনো অফিস বা কর্মস্থলই হোক না কেন। যদি সারা বিশ্বের মানুষ তাদের প্রিয়জনদের স্বায়ত্তশাসন এবং গোপনীয়তা রক্ষার জন্য কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করতে পারে, তবে আমরা মুসলিম হিসেবে কেন আমাদের মা, বোন, স্ত্রী এবং কন্যাদের জন্য একই কাজ করতে পারব না?
কেন আমরা সেই সীমারেখা টানার ক্ষেত্রে শিথিলতা প্রদর্শন করব, যা আমাদের মাহরাম নারী আত্মীয় এবং অন্যান্য মুসলিম বোনদের এমন এক সামাজিক পরিবেশ উপহার দেবে, যেখানে তারা সেজেগুজে মনভরে আনন্দ করতে পারবেন? এমন এক পরিবেশ- যেখানে তারা বিন্দুমাত্র দুশ্চিন্তা বা উদ্বেগ ছাড়াই তাদের হিজাব ও জিলবাব খুলে অন্য নারী ও শিশুদের সাথে স্বাচ্ছন্দ্যে মেলামেশা করতে পারবেন। কথায় আছে, ‘ইচ্ছা থাকলে উপায় হয়’- আর যেখানে দৃঢ় সংকল্প থাকে, সেখানে পথ সব সময়ই উন্মুক্ত থাকে।
* প্রভাষক, কাজিহাল দহশতিয়া ফাজিল মাদরাসা, ফুলবাড়ি, দিনাজপুর।
তথ্যসূত্র :
[১]. সূত্র: হিজাব : সংজ্ঞা ও শর্তাবলি- ইসলামওয়েব।
[২]. ছহীহ বুখারী, হা/৮৫০; ছহীহ মুসলিম, হা/৪৪০; আবূ দাঊদ, হা/৪৬২, সনদ ছহীহ।
[৩]. ছহীহ বুখারী, হা/৫৭৮, ৮৭২।