উপদেশ প্রদানের আদব ও শর্তসমূহ
- হোসাইন মঈন*
সাধারণত কোনো নির্দিষ্ট পরিস্থিতি বা কোনো বিষয়ে কোনো ব্যক্তি, পরিবার বা কোনো গোষ্ঠীর কী করা উচিত বা কী করণীয় অথবা কীভাবে আচরণ করা উচিত বা উচিত নয় সে সম্পর্কে নির্দিষ্টভাবে মতামত দেওয়া বা অনুরোধ করাই হচ্ছে উপদেশ। কাউকে কোনো বিষয়ে বিশেষ জ্ঞান বা শিক্ষা দেওয়া এবং সে অনুযায়ী চলা, কাজ করা বা আমল করার নির্দেশ দেওয়াও উপদেশের অন্তর্ভুক্ত। উপদেশ-এর সমার্থক শব্দগুলো হচ্ছে পরামর্শ, শিক্ষা, মন্ত্রণা, অনুশাসন, সুপারিশ ইত্যাদি। প্রতিদিনই আমরা কেউ না কেউ কাউকে না কাউকে কম-বেশি উপদেশ দিয়ে থাকি, অন্যের সমালোচনা করে থাকি। অন্য কোনো বিষয়ে আমাদের উদারতা থাক বা না থাক, অন্যের সমালোচনা করা বা উপদেশ প্রদানে আমাদের কোনো কার্পণ্য থাকে না। কিন্তু সমস্যা হলো, কোনো ব্যক্তি, পরিবার কিংবা গোষ্ঠীকে উপদেশ দেওয়ার ক্ষেত্রে সিংহভাগ সময়ই আমরা তার প্রতি আবেগ, দয়া, ভালোবাসা কিংবা সহানুভূতির মতো ব্যাপারগুলো পাশ কাটিয়ে যাই; তার অনুভূতিকে ছোট করে ফেলি, তাকে বোকা কিংবা সে নির্বোধ এটা বোঝানোর চেষ্টা করি, এমনকি কখনো কখনো নিজেকে তার চেয়ে জ্ঞানী-প্রজ্ঞাবান হিসেবে কায়েম করার পায়তারা করি। এর চেয়েও ভয়ংকর ব্যাপার হলো, যে লোক বা পরিবারটা ভুল করেছে বা ভুল পথে চলছে, কোনো রাখঢাক না রেখে সমালোচনা করা কিংবা উপদেশ দিতে গিয়ে আমরা তার মাথার উপর রূঢ়তার বোমা ছুঁড়ে এমনভাবে শুরু করি, যেন ফাঁসির রশিতে লটকানোর মতো শাস্তিযোগ্য কোনো ভয়ংকর অপরাধ সে বা তারা করে ফেলেছে। এদেশের খ্যাতিমান লেখক কাজী আনোয়ার হোসেন বলেছেন,
‘কেউ ভুল করছে বা ভুলভাবে চলছে দেখলে মুখ বুঝে না থেকে তাকে শুধরে দেওয়া আমাদের নৈতিক কর্তব্য। কিন্তু ‘তোমার ভালোর জন্যই বলছি’ এই জাতীয় কথা দ্বারা উপদেশ দেওয়া বা সমালোচনার নামে আমরা মানুষকে যা বলি, শতকরা পঁচানব্বই ভাগ ক্ষেত্রে সেটা মোটেও তার ভালোর জন্যে বলি না; বলি তার দোষ দেখিয়ে তাকে খাটো করে নিজেকে বড় প্রমাণ করে আত্মপ্রসাদ লাভ করার জন্যে; অন্যের ঘাড়ে চড়ে আমাদের আত্মপ্রেম বৃদ্ধি করার জন্য। মূলত কারও ছিদ্রান্বেষণ করে, টিটকারি মেরে, কাউকে দুঃখ দিয়ে, কাউকে ছোট করে কঠিন বা রূঢ় ভাষায় মিছরির ছুরি দিয়ে কুঁচি কুঁচি করে ফেলার নাম সমালোচনা বা উপদেশ নয়’।
আসলে বর্তমান সমাজে সমালোচনার নামে অহর্নিশ যে বিদ্রুপাত্মক ও আক্রমণাত্মক দোষ চর্চা হয়, তা বানোয়াট অপবাদ আরোপ ছাড়া কিছুই নয়। বুঝতে হবে যে, সমালোচনা বা উপদেশ এবং গীবতের মধ্যে বিস্তর পার্থক্য রয়েছে। সমালোচনা একটি গুরুত্বপূর্ণ ও সংবেদনশীল বিষয়। এটি শুধু একটি দৃষ্টিভঙ্গি নয়, বরং সমাজের নৈতিকতা ও মানসিক উন্নয়নেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। সমালোচনা যদি গঠনমূলক ও কল্যাণকামী না হয়, তবে তা সমাজে নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে এবং বিশৃঙ্খলার সৃষ্টি করবে। সমালোচনা হলো, কোনো ব্যক্তি বা বিষয়কে নির্মাণমূলকভাবে বিশ্লেষণ করা, যেখানে উদ্দেশ্য থাকে উন্নতি বা ভালো করার জন্য পরামর্শ দেওয়া, যাতে কোনো ব্যক্তি, পরিবার বা গোষ্ঠী সাহায্য পায় বা সঠিক পথে চলে। এতে সাধারণত তথ্যভিত্তিক ও যুক্তিযুক্ত আলোচনা করা হয় এবং সেটা হয় গঠনমূলকভাবে। ইসলামের দৃষ্টিতে সমালোচনার প্রধান উদ্দেশ্যই হবে ভুল সংশোধন, সত্য ও ন্যায় প্রতিষ্ঠা, কিন্তু তা ব্যক্তিগত আক্রমণ নয়।
ইসলামি দাঈগণ বলেন, ‘কাউকে তার ব্যক্তি জীবনের পরিশুদ্ধি ও আক্বীদা-বিশ্বাসের সংশোধন এবং ব্যবহারিক জীবনে ইসলামের অনুশীলনের জন্য সংশোধন করা কিংবা সঠিক পথ দেখানোর জন্য উপদেশ দেওয়াটা দোষের কিছু নয়, বরং উপদেশ দেওয়া কল্যাণের কাজ, ভালোবাসার বহিঃপ্রকাশ। উপদেশ হচ্ছে মুসলিম ভ্রাতৃত্বের গুরুত্বপূর্ণ একটি আলামত, এটি পূর্ণ ঈমান ও পরিপূর্ণ ইহসান শ্রেণির গুণ। কিন্তু মানুষের উপস্থিতিতে বা প্রকাশ্যে কাউকে উপদেশ প্রদান বা সমালোচনা করা অনুচিত কাজ; ইসলাম কোনোভাবেই এমন আচরণ সমর্থন করে না, এটা অশোভনীয়, গোনাহগার হওয়ার কারণ। তা যদি অতিথিদের সামনে স্বামী বা স্ত্রী বা ছেলে-মেয়েদের ভদ্রতা, বিনয় বা আচার-আচরণ সম্পর্কেও হয়, সে ক্ষেত্রেও। উপদেশ দিতে হবে গোপনে। লোকসম্মুখে যদি কাউকে নরম করেও কিছু সমালোচনা করা হয়, সেটা তার পক্ষে হজম করা খুবই শক্ত হবে। যত মঙ্গল কামনা নিয়েই বলা হোক না কেন, সে এটাকে ধরে নেবে অপরের সামনে তাকে অপমান বা ছোট করা হচ্ছে হিসেবে, তখন এটা তার কাছে বিরক্তিকর মনে হয়, মন খারাপের কারণ হয়ে ওঠে। নিজেকে প্রশ্ন করুন, অন্যের উপস্থিতিতে আপনার দোষ কেউ ধরলে আপনি পছন্দ করেন কিনা?
আমরা কাউকে শুধরে দেব অবশ্যই, তবে আত্মপ্রসাদ লাভের খাতিরে কারও দোষ খুঁজতে যাব না। এমনভাবে করবো, যাতে তার সত্যিই উপকার হয়, উপদেশ প্রদানের উদ্দেশ্যই হলো মানুষকে ভাল কিছু করতে সাহায্য করা, পছন্দনীয় কাজে উদ্বুদ্ধ করা, আর অপছন্দনীয় বিষয় থেকে বিরত রাখা, তাকে গড়ে তোলা। মিষ্টি কথা, প্রশংসা বা সমর্থন মানুষে মানুষে হৃদ্যতার সম্পর্ক গড়ে তোলে; উপদেশ এসব দিয়ে শুরু করতে হয়, নইলে যাকে উপদেশ দেওয়া হচ্ছে, সে আত্মরক্ষার বর্ম পরে নেবে প্রথমেই, উপদেশ দাতার কোনো কথা বুঝতে চাইবে না। ব্যক্তিকে সমালোচনা না করে তার কাজ বা ব্যবহারের সমালোচনা করতে হয়। একটু বুদ্ধি খরচ করে তাকে উপদেশ গ্রহণ করার মুডে নিয়ে আসতে হয়। উপদেশ দেওয়ার উদ্দেশ্য যেন কাউকে দোষারোপ বা ভর্ৎসনা না করা হয়। মনে রাখতে হবে, মানুষ কঠিন ও রূঢ় স্বভাবের মানুষদের ভয়ই করে শুধু, কেউ তাদেরকে মন থেকে পছন্দ করে না, তাদের সঙ্গ বা নৈকট্য এড়িয়ে চলে। ইবনে রজব (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন, ‘সালাফে ছলেহীন যখন কাউকে উপদেশ দিতে চাইতেন, তখন তারা তাকে গোপনে সদুপদেশ দিতেন। এমনকি তাদের কেউ কেউ বলেছেন, যে ব্যক্তি তার মুসলিম ভাইকে একান্তে উপদেশ দিয়েছে সেটাই নাসীহা, আর যে ব্যক্তি মানুষের সামনে সদুপদেশ দিয়েছে, সে তাকে ভর্ৎসনা করেছে। তবে, প্রকাশ্যে উপদেশ দেওয়ার মধ্যে যদি কোনো অগ্রগণ্য কল্যাণ বা কল্যাণের দিক প্রবল থাকে, তাহলে প্রকাশ্যে উপদেশ দেওয়া যেতে পারে। কিন্তু সেটা কোন ক্ষেত্রে? যে ব্যক্তি মানুষের মাঝে বিদ’আত ও পাপকর্মের প্রসার ঘটায়, এ ধরনের লোককে প্রকাশ্যে উপদেশ দেওয়া শরী‘আত সম্মত। ফুযাইল (রাহিমাহুল্লাহ) বলেছেন, ‘ঈমানদার লোক দোষ গোপন রাখে ও উপদেশ দেয়। আর পাপী লোক দোষ খুঁজে বেড়ায়, বেইজ্জত করে ও ভর্ৎসনা করে’।[১]
ইবনে হাযম (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন, ‘যদি তুমি উপদেশ দিতে চাও তাহলে গোপনে দাও, ইঙ্গিতে দাও, সরাসরি ও প্রকাশ্যে নয়। যদি সে ইঙ্গিত না বুঝে, তাহলে সরাসরি উপদেশ দেওয়া ছাড়া উপায় নেই। যদি তুমি এ দিকগুলো এড়িয়ে যাও তাহলে তুমি যালিম, তুমি হিতৈষী নও’।
উপদেশ প্রদানের আদব, শর্ত ও শিষ্টাচার হচ্ছে সবসময় নম্রতা, ভদ্রতা, বিনয় ও কোমলতা বজায় রাখা এবং প্রতিনিয়ত আমাদের এই অভ্যাসের অনুশীলন করা উচিত। এর কোনো বিকল্প বা অন্যথা যে নেই, তা রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর উদ্দেশ্যে মহান আল্লাহ তা‘আলা বর্ণিত ওহীতেই প্রতিয়মান হয়। আল্লাহ তা‘আলা বলেন, وَ لَوۡ کُنۡتَ فَظًّا غَلِیۡظَ الۡقَلۡبِ لَانۡفَضُّوۡا مِنۡ حَوۡلِکَ ‘(হে নবি!) আপনি যদি রূঢ় প্রকৃতির ও কঠোর হৃদয়ের হতেন, তবে তারা আপনার আশপাশ থেকে সরে বিক্ষিপ্ত হয়ে যেত’ (সূরা আলে ইমরান : ৩/১৫৯)। মহান আল্লাহ বলেন,
اُدۡعُ اِلٰی سَبِیۡلِ رَبِّکَ بِالۡحِکۡمَۃِ وَ الۡمَوۡعِظَۃِ الۡحَسَنَۃِ وَ جَادِلۡہُمۡ بِالَّتِیۡ ہِیَ اَحۡسَنُ
‘আপনি আপনার রবের দিকে আহ্বান করুন হিকমত বা প্রজ্ঞা দ্বারা, সুন্দর সদুপদেশ দ্বারা এবং তাদের সঙ্গে উৎকৃষ্টতর পদ্ধতিতে আলোচনা-বিতর্ক করুন’ (সূরা আন-নাহল, ১৬/১২৫)। মহান আল্লাহ বলেন, فَقُوۡلَا لَہٗ قَوۡلًا لَّیِّنًا لَّعَلَّہٗ یَتَذَکَّرُ اَوۡ یَخۡشٰی ‘তোমরা উভয়ে নম্র ভাষায় কথা বলো। হয়তো সে শিক্ষা গ্রহণ করবে অথবা ভয় পাবে’ (সূরা ত্বহা, ২০/৪৪)।
হাদীছে বর্ণিত আছে, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেন, وَمَا تَوَاضَعَ أَحَدٌ لِلهِ إِلاَّ رَفَعَهُ اللهُ ‘কেউ আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে নম্রতা অবলম্বন করলে বা বিনীত হলে আল্লাহ তার মর্যাদা বাড়িয়ে দেন’।[২] হাদীছের ভাষানুযায়ী কোনো মুসলিম ততক্ষণ পর্যন্ত পূর্ণ ঈমানদার বা মুমিন হতে পারবে না, যতক্ষণ পর্যন্ত না সে নিজের জন্য যা ভালোবাসে, তার মুসলিম ভাইয়ের জন্যেও তা ভালোবাসে এবং যতক্ষণ পর্যন্ত না সে নিজের জন্য যা অপছন্দ করে তার মুসলিম ভাইয়ের জন্যেও তা অপছন্দ করে।[৩]
আর এটাই হচ্ছে উপদেশ দেওয়ার প্রেরণা। আল্লাহ তা‘আলা বলেন, وَّ ذَکِّرۡ فَاِنَّ الذِّکۡرٰی تَنۡفَعُ الۡمُؤۡمِنِیۡنَ ‘আপনি তাদের উপদেশ দিতে থাকুন, কেননা উপদেশ মুমিনের উপকারে আসবে’ (সূরা আয-যারিয়াত, ৫১/৫৫)। মহান আল্লাহ বলেন, وَ تَعَاوَنُوۡا عَلَی الۡبِرِّ وَ التَّقۡوٰی ‘হে ঈমানদারগণ! তোমরা পূণ্যশীলতা ও তাক্বওয়ার কাজে একে অপরকে সাহায্য কর’ (সূরা আল-মায়েদা, ৫/২)। মহান আল্লাহ আরো বলেন, وَ اۡمُرۡ بِالۡمَعۡرُوۡفِ وَ انۡہَ عَنِ الۡمُنۡکَرِ وَ اصۡبِرۡ عَلٰی مَاۤ اَصَابَکَ ‘সৎকাজের নির্দেশ দাও এবং অসৎ কাজে নিষেধ করো, আর তোমার ওপর যা আপতিত হয় তাতে ধৈর্য ধারণ কর’ (সূরা লোকমান, ৩১/১৭)। হাদীছে এসেছে, ‘যখন কোনো বান্দা নিজে ভালো কাজ করার পাশাপাশি অন্যের প্রতি সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেন, তখন আল্লাহ তা‘আলাও ওই ব্যক্তির প্রতি সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেন’।[৪]
বস্তুত, অন্যকে সদুপদেশ দেওয়াও সহযোগিতার প্রকারান্তর। আবূ আমর ইবনুস সালাহ বলেন, ‘নসীহা বা উপদেশ হচ্ছে এমন একটি ব্যাপক অর্থবোধক শব্দ, যা উপদেশদাতার পক্ষ থেকে উপদেশ গ্রহীতার যাবতীয় উপায়ে সব ধরনের হিত কামনা ও হিত সাধনকে বুঝায়’। হাদীছে এসেছে, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেন, ‘দ্বীন হলো সদুপদেশ বা কল্যাণ কামনা। তা আল্লাহর জন্য, তাঁর কিতাবের জন্য, তাঁর রাসুলের জন্য, মুসলমানের নেতার ও সর্বসাধারণ মুসলিমের জন’।[৫]
আজগুবি, অহেতুক কথাবার্তা, শুনতে রাসালো কোনো উদ্ভট কথা দ্বারা কাউকে উপদেশ দেওয়া যাবে না। নিজের দিকে আকৃষ্ট করার জন্য লৌকিকতার আশ্রয় নেয়া, কৃত্রিম হাসি-কান্না বা ভাষাশৈলীর ব্যবহার করা কোনোভাবেই কাম্য নয়।
উপদেশদাতার দায়িত্ব হবে উপযুক্ত সময় নির্বাচন করে উপদেশ গ্রহীতার দোষ-ত্রুটিসমূহ লুকিয়ে রেখে সম্মানে আঘাত না করে সুন্দর ভাষা নির্বাচন করে তার সঙ্গে নরম ভাষা ব্যবহার করা। কেননা সবাইকে সমানভাবে সম্মান করা ইসলামের অন্যতম নির্দেশনা। হোক সে সাদা বা কালো, ধনী বা দরিদ্র, সবল বা দুর্বল। উপদেশ দেওয়ার আগে যাচাই-বাছাই করে নিশ্চিত হতে হবে, উপদেশ শ্রবণকারীর মাঝে যে দোষ নাই, তার উপর সে দোষ আরোপ করা হচ্ছে কিনা; প্রয়োজনে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির সঙ্গে আলোচনা করে বিষয়টি পরিষ্কার করে নিতে হবে। ধর্ম বিশারদগণ বলেন,
‘উপদেশ দিতে হবে ইখলাছের সঙ্গে। কারণ, ইখলাছবিহীন কোনো আমল আল্লাহর কাছে গ্রহণযোগ্য নয়। অর্থাৎ যাকে উপদেশ দেওয়া হবে, তা একমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য, নিজের অন্তরে হিংসা-বিদ্বেষ রেখে দুনিয়ার কোনো পার্থিব স্বার্থ হাসিলের জন্য নয়। ব্যক্তির প্রতি কোনো ক্ষোভ, ঘৃণা ও কু-ধারণা রেখে রূঢ় কণ্ঠে এবং মনে আঘাত করে কাউকে উপদেশ দেওয়া যাবে না। উপদেশ প্রদানে পবিত্র কুরআনের বাণী শোনানো উচিত, নবী-রাসুল ও আগের মুসলিম মনীষীদের ঘটনা বর্ণনা করা উচিত। উপদেশ প্রদানের ক্ষেত্রে মূল কর্তব্য হবে মুখলিছ বা আন্তরিক হওয়া, এর মাধ্যমে আল্লাহর সন্তুষ্টি প্রত্যাশা করা। উপদেশ কোনো মুসলিম ভাইয়ের উপর বড়ত্ব ও শ্রেষ্ঠত্ব জাহির করার জন্য হবে না। উপদেশ হতে হবে নির্ভেজাল ও খেয়ানতমুক্ত। উপদেশ দেওয়ার উদ্দেশ্য দোষারোপ বা ভর্ৎসনা করা নয়। কর্কশ ও কঠিন ভাষায় নয়, উপদেশ দিতে হবে ভ্রাতৃত্ব ও ভালোবাসার চেতনা নিয়ে’।
উপদেশ হতে হবে জ্ঞাননির্ভর, ব্যাখ্যামূলক ও যুক্তিভিত্তিক। শায়খ আস-সা’দী (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন. ‘হিকমত হচ্ছে জ্ঞানের মাধ্যমে দাওয়াত দেওয়া; অজ্ঞতার ভিত্তিতে নয় এবং অধিক গুরুত্বপূর্ণটি আগে শুরু করা, এরপর পরেরটি এবং মানুষের স্মৃতিশক্তি ও বোধশক্তির যেটা কাছাকাছি সেটা দিয়ে শুরু করা। যেটা মানুষ পুরোপুরি গ্রহণ করবে, সেটা দিয়ে শুরু করা’। আর একটা কথা, যখন আপনি নিজেই কোনো বিষয় নিয়ে হতাশ কিংবা রেগে আছেন, সে অবস্থায় কাউকে উপদেশ না দেওয়াই ভালো। আবার একজন ব্যক্তি, সে হয়তো তখন এমনিতেই একটা খারাপ সময়ের মধ্যে দিয়ে যাচ্ছে, আর আপনি এর মধ্যে উপদেশ দেওয়ার মতো আরেকটি নতুন ব্যাপার নিয়ে এলেন, এমনটাও যেন না হয়। কেননা ওই সময়ে আপনার উপদেশ তার মনটাকে আরও ছোট করে দিতে পারে অথবা এমনও হতে পারে আপনার উপদেশ মেনে চলার জন্য সে প্রস্তুত নয়। উপদেশ প্রদানে অপ্রয়োজনীয় কথা পরিত্যাগ করা শ্রেয় এবং যে বিষয়ে উপদেশ দিচ্ছেন, তা আগে নিজের মধ্যে অনুশীলন থাকা যরূরী।
আমরা অনেকেই আছি অন্যকে অনেক বিষয়ে উপদেশ দেই ঠিকই, কিন্তু নিজে তা আমল করি না বা সে বিষয়ে বেমালুম। প্রকৃতপক্ষে নিজে আমল না করে অপরকে উপদেশ দেওয়া জায়েজ হলেও তা নিন্দনীয়। ইয়াহুদি-খ্রিষ্টানদের ছলনা হলো তারা মানুষকে ভালো ভালো কথা শুনিয়ে আস্থা অর্জন করবে, কিন্তু তারা কখনো ভালো কাজ করবে না। বলা হয়ে থাকে, নিজে আমল না করে অপরকে ভালো কাজের উপদেশ দেওয়া ইয়াহুদি আলেম ও মুনাফিকদের বৈশিষ্ট্য। এ ধরনের ব্যক্তিদের দাওয়াত ফলদায়ক নয়। আর এ শ্রেণির মানুষের জন্য জাহান্নামের কঠিন শাস্তি রয়েছে। যারা এমনটা করে, তাদেরকে আল্লাহ তা‘আলা ভর্ৎসনা করেছেন। আল্লাহ তা‘আলা বলেন, اَتَاۡمُرُوۡنَ النَّاسَ بِالۡبِرِّ وَ تَنۡسَوۡنَ اَنۡفُسَکُمۡ وَ اَنۡتُمۡ تَتۡلُوۡنَ الۡکِتٰبَ ؕ اَفَلَا تَعۡقِلُوۡنَ ‘তোমরা কি মানুষকে সৎকাজের নির্দেশ দাও, আর নিজেদের কথা ভুলে যাও! অথচ তোমরা কিতাব অধ্যয়ন করো। তবে কি তোমরা বোঝ না?’ (সূরা আল-বাক্বারাহ, ২/৪৪)। মহান আল্লাহ বলেন,
یٰۤاَیُّہَا الَّذِیۡنَ اٰمَنُوۡا لِمَ تَقُوۡلُوۡنَ مَا لَا تَفۡعَلُوۡنَ . کَبُرَ مَقۡتًا عِنۡدَ اللّٰہِ اَنۡ تَقُوۡلُوۡا مَا لَا تَفۡعَلُوۡنَ
‘তোমরা কেন এমন কথা বলো, যা তোমরা নিজেরাই মেনে চল না? তোমরা যা করো না, তোমাদের তা বলা আল্লাহর কাছে অতিশয় অসন্তোষজনক’ (সূরা আস-সফ, ২-৩)। রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেন, ‘কিছুসংখ্যক জান্নাতবাসী অন্য কিছুসংখ্যক জাহান্নামবাসীকে অগ্নিদ্বগ্ধ হতে দেখে জিজ্ঞেস করবে, তোমরা কীভাবে জাহান্নামী হলে, অথচ আমরা তো সেসব কাজের জন্য জান্নাতে প্রবেশ করেছি, যা তোমাদের কাছ থেকে শিখেছিলাম? জাহান্নামবাসীরা বলবে, আমরা মুখে অবশ্য বলতাম, কিন্তু নিজে তা কাজে পরিণত করতাম না’।[৬]
ইবনু হারেসাহ (রাযিয়াল্লাহু আনহু) বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-কে বলতে শুনেছি, ক্বিয়ামতের দিন এক ব্যক্তিকে আনা হবে; অতঃপর তাকে জাহান্নামে নিক্ষেপ করা হবে। সেখানে তার নাড়ি-ভুঁড়ি বের হয়ে যাবে এবং সে তার চারপাশে এমনভাবে ঘুরতে থাকবে, যেমন গাধা তার চাকির চারপাশে ঘুরতে থাকে। তখন অন্য জাহান্নামীরা তার সামনে একত্রিত হয়ে বলবে, ওহে অমুক! তোমার এ অবস্থা কেন? তুমি না আমাদেরকে সৎ কাজের আদেশ আর অসৎ কাজে বাধা দিতে? তখন সে বলবে, আমি তোমাদেরকে আদেশ দিতাম কিন্তু নিজে তা করতাম না এবং অসৎ কাজে বাধা দিলেও নিজেই তা করতাম।[৭]
মুসনাদে আহমাদের অপর বর্ণনায় এসেছে, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেন, ‘মিরাজের রাতে আমি এমন এক শ্রেণির মানুষের নিকট দিয়ে গমন করলাম, যাদের জিহ্বাকে জাহান্নামের কাঁচি দিয়ে কাটা হচ্ছে। আমি জিবরীল (আলাইহিস সালাম)-কে জিজ্ঞেস করলাম, ‘ওরা কারা?’ তিনি বললেন, ‘এরা হলো আপনার উম্মতের দুনিয়াদার বক্তা, তারা যে সব ভালো কাজের আদেশ করতো, তা নিজেরা কখনো করতো না।[৮]
অথচ উপদেশ প্রদান করার বহুবিধ শর্তাবলির মধ্যে প্রধানতম শর্ত হলো নিজের মধ্যেও ওই আমল পালন বা গুণাবলিগুলো চলমান বা বলবৎ থাকা; অর্থাৎ অন্যকে উপদেশ দেওয়ার সাথে সাথে নিজেও আমলের চেষ্টা করবে, অর্থাৎ নিজেকেও সংশোধন করা আবশ্যক এবং তা যরূরীও বটে। কারণ, অনেক সময় অন্যকে বলার দ্বারা নিজেরও আমলের তাওফীক্ব হয়। তাছাড়া এটা হচ্ছে রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর আদর্শ ও সুন্নাত।
অন্যকে উপদেশ দিতে গিয়ে স্বগর্বে নিজের অপরাধসমূহ জনসম্মুখে প্রকাশ করে থাকে অনেকে। উদাহরণস্বরূপ আমি আগে বেনামাজি ছিলাম, অনেক অপকর্মও করে বেড়াতাম, এহেন কোনো কাজ নেই যা আমি করিনি। এখন সবকিছু ছেড়ে দিয়েছি, এখন আমি পাঁচ ওয়াক্ত ছালাত পড়ি, আল্লাহ বিল্লাহ করি...। আমি যদি পারি, তুমিও পারবে। আমি যদি ভদ্র হতে পারি, তুমি কেন পারবে না? আমি তো আগে তোমার থেকেও বেশি অভদ্র ছিলাম... ইত্যাদি। তারা মনে করে যে, এতে করে তারা মুখলিছ বা খাঁটি মানুষ হিসেবে গণ্য হবে। এটিও একটি ভুল ধারণা। মূলত নিজের পাপের কথা বলে বেড়ানো মুমিনদের মাঝে অশ্লীলতা ছড়িয়ে দেওয়ার অন্তর্ভুক্ত; এটা কোনো মুমিনের বৈশিষ্ট্য হতে পারে না। সব সময় সব কথা সব জায়গায় বলে বেড়াতে হয় না; নিজের গুনাহের কথা তো একদমই নয়। কেননা মহান আল্লাহ গুনাহ প্রকাশ করাকে অপছন্দ করেন। গুনাহ করার পর কোনো ব্যক্তি যদি তা প্রকাশ করে, তাহলে সেটা আর সগীরা গুনাহ থাকে না, তা কাবীরা গুনাহে রূপান্তরিত হয়ে যায়, সে গুনাহের জন্য রয়েছে ভয়াবহ শাস্তি। রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেন, ‘আমার সব উম্মতকে মাফ করা হবে, তবে প্রকাশকারী এর ব্যতিক্রম। আর নিশ্চয়ই এটা বড়ই অন্যায় যে, কোনো ব্যক্তি রাতের বেলা অপরাধ করলো, যা আল্লাহ গোপন রেখেছেন। কিন্তু সে সকালে বলে বেড়াতে লাগলো, হে অমুক, আমি আজ রাতে এই এই কাজ করেছি। অথচ সে এমন অবস্থায় রাত কাটালো যে, আল্লাহ তার কর্ম লুকিয়ে রেখেছিলেন, আর সে ভোরে উঠে তার ওপর আল্লাহর দেওয়া আবরণ খুলে ফেলল।[৯]
উপদেশ দাতার মতো উপদেশ গ্রহণকারীর জন্যও অবশ্য পালনীয় কিছু আদব বা শর্ত রয়েছে। তন্মধ্যে অন্যতম হচ্ছে আপনাভ্যন্তরের অহম ঝেড়ে ফেলা, যথাসম্ভব নম্র থাকার চেষ্টা করা। সর্বোপরি মনে রাখা যরূরী যে, উপদেশ মানেই আক্রমণ নয়। উপদেশদাতা যা বলছে বা বলতে চায়, তা সঠিকভাবে মনোযোগ দিয়ে শোনা এবং সে অনুযায়ী নিজেকে আরও ভালোভাবে গড়ে তোলার জন্য প্রত্যয়ী হওয়া উচিত। উপদেশ গ্রহণের ব্যাপারে মনখোলা থাকা উচিত এইজন্য যে, যিনি আপনাকে উপদেশ দিচ্ছেন, হয়তো তিনি এমন কোনো বিষয়ে কথা বলতে পারেন, যে বিষয়ে আপনি আগে কখনোই ভাবেননি, হয়তো সেটা আপনার মনের মধ্যে নতুন কোনো ভাবনারও জন্ম দিতে পারে। যে আপনার ভালোর জন্য চেষ্টা বা সাহায্য করে, তাকে মূল্যায়ন করতে হবে। মনে রাখা যরূরী, আপনার ভুলের ব্যাপারে প্রতিনিয়ত যে সতর্ক করে, সেই প্রকৃত বা আসল বন্ধু; আর যে আপনাকে অনবরত ভুলের মধ্যে ডুবে থাকতে দেখলেও এড়িয়ে যায়, সে বন্ধু নয়। সব উপদেশ আপনাকে মেনে চলতে হবে এমন কোনো বাধ্যবাধকতা নেই। কারও উপদেশ গ্রহণ না করলেও উপদেশদাতাকে ধন্যবাদ বলা এবং তার সাথে সৌহার্দ্যপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখা উচিত। মহান আল্লাহ তা‘আলা আমাদেরকে সঠিক বুঝ দান করুন-আমীন!!
* সাংবাদিক, সাহিত্যিক ও ইসলামী লেখক, টাঙ্গাইল।
তথ্যসূত্র :
[১]. জামিউল উলূম ওয়াল হাকাম, ১ম খণ্ড, পৃ. ২৩৬।
[২]. ছহীহ মুসলিম, ২৫৮৮।
[৩]. ছহীহ বুখারী, ১৩।
[৪]. ছহীহ মুসলিম, ২৬৯৯।
[৫]. ছহীহ মুসলিম, ২০৫।
[৬]. ছহীহ বুখারী, ৩২৬৭।
[৭]. ছহীহ বুখারি, হা/৭০৯৮; ছহীহ মুসলিম, হা/২৯৮৯।
[৮]. মুসনাদে আহমাদ, হা/১২২২১।
[৯]. ছহীহ বুখারি, হা/৬০৬৯।
প্রসঙ্গসমূহ »:
নীতি-নৈতিকতা