বিদ‘আতীদের ব্যাপারে সালাফীদের অবস্থান
-ওমর ফারুক বিন মুসলিমুদ্দীন*
আল-হামদুলিল্লাহি রব্বিল ‘আলামীন। ওয়াছ ছালাতু ওয়াস সালামু ‘আলা মান আরসালাহুল্লাহু বিল হাক্কি বাশীরাওঁ ওয়া নাযীরা। আম্মা বা‘দু!
নবী মুহাম্মাদ (ﷺ) দ্বীন ইসলামকে রেখে গেছেন স্বচ্ছ, শুভ্র অবস্থায়। যার রাতও দিনের মত আলোকিত। এই দ্বীনের মাঝে কোন অস্পষ্টতা ও অপরিপূর্ণতা রেখে যাননি যে, কারো এটার পরিপূর্ণতা দেয়ার দরকার আছে। এতে কোনকিছু সংযুক্ত করা, বৃদ্ধি করার প্রয়োজন নেই। তিনি দ্বীনের সকল বিধান পৌঁছে দিয়েছেন মানব জাতির কাছে। তাইতো তিনি বিদায় হজ্জের দিন বলেছিলেন, ‘আমি কি পরিপূর্ণ তাবলীগ করেছি।’ ছাহাবীগণ সমস্বরে জবাব দিয়েছিলেন, ‘অবশ্যই’।[১] রাসূল (ﷺ)-এর মৃত্যর পর আবূ বকর (রাযিয়াল্লাহু আনহু)-এর যুগে একশ্রেণির লোক যাকাতকে অস্বীকার করে বসল। দ্বীন ত্যাগের মত নিকৃষ্টপন্থা বেছে নিল। বিদ‘আতের মত জঘন্য কাজে লিপ্ত হতে লাগল। ওমর (রাযিয়াল্লাহু আনহু)-এর যুগে এরা তেমন মাথাচাড়া দিতে পারেনি। ওমর (রাযিয়াল্লাহু আনহু)-এর সামনে টিকে থাকে এমন সাহসী কেইবা ছিল! ওছমান (রাযিয়াল্লাহু আনহু)-এর যুগ হতে শুরু হল এসব বিভ্রান্তির মহরত। তারা দ্বীনের অপব্যাখ্যা দাঁড় করাতে লাগল। তখন হতে আজ অবধি এসমস্ত বিদ‘আতীদের ব্যাপারে আমাদের সালাফ-খালাফ ইমাম-আলিমগণের অবস্থান কেমন ছিল ও আমদের অবস্থান কেমন হবে সেটা নিয়ে সংক্ষিপ্ত আলোকপাত করব, ইনশাআল্লাহ।
বিদ‘আতীদের ব্যাপারে ছাহাবীগণের অবস্থান
ছাহাবীগণ বিদ‘আতীদের সাথে সম্পর্ক ছেদ করতেন। তাদেরকে ইসলামের শত্রু জানতেন। তাদের সাথে সমস্তপ্রকার লেনদেন বন্ধ করে দিতেন। তাদের সাথে নিজেরা তো ওঠাবসা করতেনই না বরং অন্যদেরকেও নিষেধ করতেন। যেমনটি আমরা তাদের বক্তব্য হতে পাই। তার কিছু প্রমাণ নিম্নে পেশ করা হল,
১- ইয়াইয়া ইবনু ইয়ামার (রাযিয়াল্লাহু আনহু) বলেন,
كَانَ أَوَّلَ مَنْ قَالَ فِى الْقَدَرِ بِالْبَصْرَةِ مَعْبَدٌ الْجُهَنِىُّ فَانْطَلَقْتُ أَنَا وَحُمَيْدُ بْنُ عَبْدِ الرَّحْمَنِ الْحِمْيَرِىُّ حَاجَّيْنِ أَوْ مُعْتَمِرَيْنِ فَقُلْنَا لَوْ لَقِينَا أَحَدًا مِنْ أَصْحَابِ رَسُوْلِ اللهِ ﷺ فَسَأَلْنَاهُ عَمَّا يَقُوْلُ هَؤُلَاءِ فِى الْقَدَرِ فَوُفِّقَ لَنَا عَبْدُ اللّه بْنُ عُمَرَ بْنِ الْخَطَّابِ دَاخِلًا الْمَسْجِدَ فَاكْتَنَفْتُهُ أَنَا وَصَاحِبِىْ أَحَدُنَا عَنْ يَمِيْنِهِ وَالْآخَرُ عَنْ شِمَالِهِ فَظَنَنْتُ أَنَّ صَاحِبِىْ سَيَكِلُ الْكَلَامَ إِلَىَّ فَقُلْتُ أَبَا عَبْدِ الرَّحْمَنِ إِنَّهُ قَدْ ظَهَرَ قِبَلَنَا نَاسٌ يَقْرَءُوْنَ الْقُرْآنَ وَيَتَقَفَّرُوْنَ الْعِلْمَ وَذَكَرَ مِنْ شَأْنِهِمْ وَأَنَّهُمْ يَزْعُمُوْنَ أَنْ لَا قَدَرَ وَأَنَّ الْأَمْرَ أُنُفٌ. قَالَ فَإِذَا لَقِيْتَ أُولَئِكَ فَأَخْبِرْهُمْ أَنِّىْ بَرِىءٌ مِنْهُمْ وَأَنَّهُمْ بُرَآءُ مِنِّىْ
‘বাছরার অধিবাসী মা‘বাদ আল-জুহানী প্রথম ব্যক্তি যে তাক্বদীর অস্বীকার করে। আমি ও হুমায়দ ইবনু আব্দুর রহমান উভয়ে হজ্জ অথবা উমরার উদ্দেশ্যে রওয়ানা করলাম। আমরা বললাম, যদি আমরা এ সফরে রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর কোন ছাহাবীর সাক্ষাৎ পেয়ে যাই তাহলে ঐ সব লোক তাক্বদীর সম্বন্ধে যা কিছু বলে সে সম্পর্কে তাকে জিজ্ঞেস করব। সৌভাগ্যক্রমে আমরা আব্দুল্লাহ ইবনু উমার (রাযিয়াল্লাহু আনহুমা)-কে মসজিদে ঢুকার পথে পেয়ে গেলাম। আমি ও আমার সাথী তাকে এমনভাবে ঘিরে নিলাম যে, আমাদের একজন তার ডান এবং অপরজন তার বামে থাকলাম। আমি মনে করলাম আমার সাথী আমাকেই কথা বলার সুযোগ দেবে। আমি বললাম, হে আবূ আব্দুর রহমান! আমাদের এলাকায় এমন কতক লোকের আবির্ভাব ঘটেছে, তারা একদিকে কুরআন পাঠ করে অপরদিকে জ্ঞানের অন্বেষণও করে। ইয়াইয়া তাদের কিছু গুণাবলীর কথাও উল্লেখ করলেন। তাদের বক্তব্য হচ্ছে, তাক্বদীর বলতে কিছু নেই এবং প্রত্যেক কাজ অকস্মাৎ সংঘটিত হয়। ইবনু উমার (রাযিয়াল্লাহু আনহুমা) বললেন, যখন তুমি এদের সাথে সাক্ষাৎ করবে তখন তাদেরকে জানিয়ে দিবে, তাদের সাথে আমার কোন সম্পর্ক নেই, আর আমার সাথেও তাদের কোন সম্পর্ক নেই’।[২]
২- আবুল আসওয়াদ আদ-দুয়ালী (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন, ‘আমি বছরায় আসলাম। তখন সেখানে রাসূল (ﷺ)-এর ছাহাবী ইমরান ইবনু হুসাইন (রাযিয়াল্লাহু আনহু) থাকতেন। আমি কোন এক মজলিসে বসলাম। তারা তাক্বদীরের আলোচনা করল। (তাদের আলোচনা) আমার অন্তরকে তাক্বদীরের ব্যাপারে অসুস্থ করে ফেলল। তারপর আমি ইমরান ইবনু হুসাইন (রাযিয়াল্লাহু আনহু)-এর নিকটে আসলাম। বললাম, ওহে আবূ নাজীদ! আমি কোন এক মাজলিসে বসলাম। তারা তাক্বদীরের আলোচনা করল। তারা আমার অন্তরকে অসুস্থ করে ফেলল। আপনি আমাকে এ সম্পর্কে জানাবেন কি? তিনি বললেন, হ্যাঁ। জেনে রাখো, আল্লাহ তা‘আলা যখন আসমান ও যমীনবাসীকে শাস্তি দিতে চান, তখন তিনি তাদেরকে এমন শাস্তি দেন যেটা কোন যালেমকেও দেননি। আবার যখন তিনি তাদের প্রতি রহম করতে চান, তখন তাদেরকে ব্যাপক রহম করেন। তোমার কাছে যদি উহুদ পরিমাণও স্বর্ণ থাকে, আর সেটা তুমি দান করে দাও তবুও তোমার থেকে সেটা কবুল করা হবে না। যতক্ষণ না তুমি তাক্বদীরের ভালো এবং মন্দের পররতি পরিপূর্ণ ঈমান আনবে’।[৩]
সুধী পাঠক! একটু লক্ষ্য করুন, আবুল আসওয়াদ একজন তাবেঈ। মোটামোটি বড় মাপের তাবেঈ। তিনি বিদ‘আতীদের একটা মজলিসে বসলেন। বিদ‘আতীরা তাক্বদীর নিয়ে এমন আলোচনা করল; যা তার ঈমানে সরাসরি আঘাত হানল। তার মাঝে প্রভাব পড়ল। তিনি তাক্বদীরের ব্যাপারে সংশয়ে পড়ে গেলেন। ছাহাবী ইমরান ইবনু হুসাইন (রাযিয়াল্লাহু আনহু)-এর কাছে ছুটে গিয়ে বিষয়টি পরিষ্কার হলেন। এই বিদ‘আতীরা ঘৃণিত যালেম সম্প্রদায়। বিদ‘আতীদের সবচেয়ে বড় সমস্যা হল, তাক্বদীর ও আসমা ওয়াছ ছিফাতের ব্যাপারে এরা অপব্যাখ্যা করে থাকে। যুক্তি ও প্রচলিত কুসংস্কার দিয়ে তারা তাক্বদীরে বিশ্বাস করে। নববী সুন্নায় কিভাবে আছে, রাসূল (ﷺ) কিভাবে বুঝেছেন সেদিকে লক্ষ্য করে না। বিদ‘আতীরা ইসলামের যতটা ক্ষতি সাধন করেছে এত ক্ষতি ইসলামের চরম শত্রুরাও করতে সক্ষম হয়নি।
৩- ছাহাবীগণ বিদ‘আতীদের প্রতি কতটা কঠোর ছিলেন তার অন্যতম আরেকটি দৃষ্টান্ত হচ্ছে, ওমর (রাযিয়াল্লাহু আনহু)-এর খিলাফতকালে সাবিগ বিন ঈসল নামক এক খারেজী বছরা হতে মদীনায় আগমন করল। সংবাদটি ওমর (রাযিয়াল্লাহু আনহু)-এর নিকটে পৌঁছে। তিনি তাকে বেদম প্রহার করেছিলেন। তাকে মদীনা হতে তাড়িয়ে দিয়েছিলেন। কারণ, তার সাথে লোকেরা চললে ভ্রান্ত হয়ে যাবে। তার ভ্রষ্টতা সকলকে পেয়ে বসতে পারে।[৪]
৪- ইবনু আব্বাস (রাযিয়াল্লাহু আনহুমা) বলেন, ‘দুনিয়ার যমীনে আমার নিকটে সবচেয়ে নিকৃষ্ট লোক তারা; ক্বাদরিয়্যাদের মধ্য হতে যারা আমার কাছে এসে তাক্বদীর নিয়ে ঝগড়ায় লিপ্ত হয়। তারা আসলে আল্লাহর কদর সম্পর্কে কিছু জানেই না’।[৫]
৫- ওয়ালিদ ইবনু মুসলিম (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন,
جاء طلق بن حبيب إلى جندب بن عبد الله، فسأله عن آية من القرآن فقال له: أحرج عليك إن كنت مسلمًا لما قمت عني، أو قال: أن تجالسني
‘ত্বালক ইবনু হাবীব জুনদুব ইবনু আব্দুল্লাহ এর নিকট এসে কুরআনের একটি আয়াত সম্পর্কে জিজ্ঞেস করল। তিনি তাকে বললেন, আমি তোমার জন্য বিব্রতবোধ করছি, যদি তুমি মুসলিম হতে তাহলে আমাকে বর্জন করতে না অথবা বললেন, তুমি আমার সাথে ওঠাবসা ছেড়ে দিতে না’।[৬]
৬- ইমাম বুখারী (রাহিমাহুল্লাহ) আবূ আইয়্যূব সাখতিয়ানী (রাহিমাহুল্লাহ)-এর উদ্ধৃতি দিয়ে বলেন,
وطلق بن حبيب من العُبَّاد، لكنه يعتقد بدعة الإرجاء وهي أنه لا يضر مع الإيمان معصية
‘ত্বালক ইবনু হাবীব ইবাদতগুজার বান্দা ছিল। কিন্তু সে ছিল বিদ‘আতী মুর্জিয়া। সে মুমিন ব্যক্তির পাপকাজ করাকে ক্ষতির কিছু মনে করত না’।[৭]
৭- ইবনু আব্বাস (রাযিয়াল্লাহু আনহুমা) আবূ ছালিহ যাকওয়ান আস-সাম্মানকে বিদ‘আতীদের থেকে সতর্ক করে বলেন, لا تجالس أهل الأهواء؛ فإن مجالستهم ممرضة للقلوب ‘তুমি কখনো বিদ‘আতীদের সাথে ওঠাবসা, চলাফেরা করো না। কারণ, তাদের সাথে চলাফেরা করলে তারা অন্তরকে অসুস্থ ফেলবে’।[৮]
তাবেঈ ও তাদের পরবর্তী যুগের আলেমদের অবস্থান
বিদ‘আতীদের সাথে চলাফেরা করলে তার ভ্রান্ত আকীদা, মতামতের প্রভাব ব্যক্তির উপর পড়ে। ফলে ব্যক্তিও তার মত বিদ‘আতের পথে পা রাখে। দ্বীন দুনিয়া দুটোই হারায়। যেমন,
১- বিশিষ্ট তাবেঈ আবূ কিলাবা আব্দুল্লাহ ইবনু যায়েদ আল-জুরমী (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন,
لَا تُجَالِسُوْا أَصْحَابَ الْأَهْوَاءِ، فَإِنِّيْ لَا آمَنُ أَنْ يَغْمِسُوْكُمْ فِيْ ضَلَالَتِهِمْ، أَوْ يَلْبِسُوْا عَلَيْكُمْ بَعْضَ مَا تَعْرِفُوْنَ
‘তোমরা বিদ‘আতীদের সাথে চলাফেরা করো না। তাদের সাথে ঝগড়া-বিবাধে লিপ্ত হয়ো না। কারণ, তাদের পথভ্রষ্টতা তোমাদেরকে ঘিরে ফেলার আশংকা থেকে অথবা তোমরা যা সঠিকভাবে জানো সেটাতে তারা সংশয় তৈরি করে দেয়া হতে আমি আশংকামুক্ত নই’।[৯]
২- আমর ইবনু কায়েস (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন, ‘আগেকার সময় বলা হত, তোমরা বিদ‘আতীদের সাথে চলাফেরা কর না। এতে তোমাদের অন্তর বক্র হয়ে যাবে’।[১০]
৩- হাছান বাছরী (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন, ‘তুমি কোন বিদ‘আতীর সাথে উঠাবসা করো না। তার সাথে বসলে সে তোমার অন্তরকে অসুস্থ বানিয়ে দেবে’।[১১]
৪- হাছান বাছরী (রাহিমাহুল্লাহ) ও মুহাম্মদ ইবনু সীরীন (রাহিমাহুল্লাহ) বলতেন, لَا تُجَالِسُوْا أَصْحَابَ الْأَهْوَاءِ، وَلَا تُجَادِلُوْهُمْ، وَلَا تَسْمَعُوْا مِنْهُمْ ‘তোমরা বিদ‘আতীদের সাথে চলাফেরা করো না। তাদের সাথে ঝগড়ায় লিপ্ত হয়ো না। তাদের থেকে (বক্তব্য) শ্রবণ করো না’।[১২]
৫- ইমাম আওযায়ী (রাহিমাহুল্লাহ)-কে একবার বলা হল, এক ব্যক্তি বলে যে, সে আহলুস সুন্নাহ ও আহলুল বিদ‘আহ উভয় শ্রেণির সাথেই চলাফেরা করে, তার ব্যাপারে আপনার মতামত কী? তিনি বললেন, এ তো এমন ব্যক্তি, যে কিনা হক্ব ও বাতিলের সমন্বয় করতে চায়। হক্ব ও বাতিলকে সমান মনে করে।[১৩]
৬- শাইখ রবী বিন হাদী আল-মাদখালী (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন, ‘ইমাম আওযায়ী (রাহিমাহুল্লাহ) ঠিকই বলেছেন। আমি তো বলব, এ লোক প্রকৃতপক্ষে হক আর বাতিলই চিনে না। কোন্টা ঈমান আর কোন্টা কুফর সেটাই বুঝে না। এরকম টাইপের লোকদের বআপারটা সূরা বাকারার ১৪ নং আয়াতের ভাষ্যের সাথে মিলে যায়। আল্লাহ তা‘আলা বলেন, ‘যখন তারা মুমিনদের সাথে মিলিত হয় তখন তারা বলে আমরা ঈমান এনেছি আর যখন তাদের শয়তানদের সাথে মিলিত হয়, তখন বলে নিশ্চয় আমরা তোমাদের সাথে আছি’।[১৪]
৭- আল্লামা শাতিবী (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন, ‘একমাত্র নাজাতপ্রাপ্ত দল হল আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামা‘আত। আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামা‘আত বিদ‘আতীদের সাথে বৈরি আচরণ করতে, তাদেরকে তাড়িয়ে দিতে এবং কেউ হত্যাযোগ্য কোন কাজ লিপ্ত হলে তাকে হত্যা করা বা অন্য কোন শাস্তি দেয়ার ব্যাপারে আদিষ্ট। আলিমগণ তাদের সাথে চলাফেরা ও ওঠাবসা করতে নিষেধ করেছেন’। তিনি আরো বলেন, ‘সুন্নাহ ও ইজমা দ্বারা প্রমাণিত যে, প্রবৃত্তিপূজারী পাপী থেকে বিদ‘আতী বেশি মারাত্মক’।[১৫]
৮- শায়খ বাকর ইবনু আবু যায়েদ (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন, ‘উম্মাহর কারো জন্য একমাত্র আমাদের নবী ও রাসূল মুহাম্মাদ (ﷺ) ছাড়া অন্য কোন ব্যক্তিকে দাঁড় করিয়ে তার দিকে আহ্বান করা, তার ভিত্তিতে ভালোবাসা ও শত্রুতা পোষণ করা বৈধ নয়। যদি কেউ রাসূল মুহাম্মাদ (ﷺ) ছাড়া অন্য কোন ব্যক্তিকে একাজে দাঁড় করায় সে বিদ‘আতী ও বিভ্রান্ত বলে পরিগণিত হবে’।[১৬]
৯- ইমাম আহমাদ ইবনু হাম্বল (রাহিমাহুল্লাহ)-কে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল,
الرجل يصوم ويصلي ويعتكف أحب إليك، أو يتكلم في أهل البدع؟ فقال: “إذا قام وصلى واعتكف، فإنما هو لنفسه، وإذا تكلم في أهل البدع فإنما هو للمسلمين وهذا أفضل
‘যে ব্যক্তি নফল ছিয়াম পালন করে, নফল ছালাত আদায় করে, ই‘তিকাফ করে সে আপনার নিকট বেশি প্রিয়, না-কি যে ব্যক্তি বিদ‘আতীদের মুখোশ উম্মোচন করে সে বেশি প্রিয়? তিনি প্রতুত্তরে বললে, ‘যে ব্যক্তি যখন ছিয়াম, ছালাত পালন করে তা শুধু তার নিজের কল্যাণেই করে থাকে, পক্ষান্তরে যখন বিদ‘আতীদের মুখোশ উম্মোচনের কথা বলে তা সকল মুসলিমের কল্যাণ হয়ে থাকে। আর এটাই উত্তম’।[১৭] শুধু তাই নয়, ইমাম আহমাদ ইবনু হাম্বল (রাহিমাহুল্লাহ)-কে হুসাইন কারাবিসী সম্পর্কে জিজ্ঞেশ করা হয়েছিল। তিনি জবাবে বলেছিলেন, সে তো কাট্টা বিদ‘আতী।[১৮]
১০- শায়খুল ইসলাম ইবনু তাইমিয়া (রাহিমাহুল্লাহ) বিদ‘আতীদের অনিষ্টতার ব্যাপারে বলেন, যদি কেউ তাদের মুকাবিলা না করত তাহলে দ্বীন ধ্বংস হয়ে যেত। যুদ্ধক্ষেত্রে শত্রুদলের আক্রমণ থেকেও মারাত্মক তাদের আক্রমণ। কেননা তারা বিজয়ী হলে শুধু আনুগত্যই করে নিতে পারে; মন-মানসিকতা এবং দ্বীন ধ্বংস করতে পারে না। পক্ষান্তরে বিদ‘আতীরা প্রথমেই মন-মানসিকতা নষ্ট করে দেয়।[১৯]
বিদ‘আতীদের ভালো কাজ, অবদানের কথা উল্লেখ করা যাবে না। বিদ‘আতীদের ভুলত্রুটি সমালোচনার সময় তাদের অবদানের কথা উল্লেখ না করার ক্ষেত্রে শায়খুল ইসলাম ইবনু তাইমিয়া (রাহিমাহুল্লাহ)-এর বইগুলো স্পষ্ট প্রমাণ। তার কিতাবগুলো বিদ‘আতীদের সমালোচনা ও যুক্তি খণ্ডনে ভরপুর। তিনি আহলে কালাম, জাহমিয়াহ, মু‘তাযিলা এবং আশ‘আরীদের সমালোচনা-পর্যালোচনা ও মতামত খণ্ডন করেছেন। কিন্তু আমরা কোথাও পাইনি যে, তিনি তাদের কোন অবদানের কথা উল্লেখ করেছেন। তিনি নির্দিষ্টভাবে কিছু ব্যক্তির মতামত খণ্ডন করেছেন। কিন্তু তাদের প্রশংসা করেননি। নিঃসন্দেহে তাদেরও অনেক অবদান রয়েছে কিন্তু সমালোচনার ক্ষেত্রে অবদানের কথা উল্লেখ করা নিষ্প্রয়োজন।
১১- রাফী ইবনে আশরাস (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন, ‘পাপাচারী বিদ‘আতীদের একটি বিরাট শাস্তি হল তাদের অবদানের কথা উল্লেখ করা হবে না’।[২০]
সুপ্রিয় পাঠক! আল্লাহ তা‘আলা বলেন,
وَ اِذَا رَاَيْتَ الَّذِيْنَ يَخُوْضُوْنَ فِيْۤ اٰيٰتِنَا فَاَعْرِضْ عَنْهُمْ حَتّٰى يَخُوْضُوْا فِيْ حَدِيْثٍ غَيْرِهٖ١ؕ وَ اِمَّا يُنْسِيَنَّكَ الشَّيْطٰنُ فَلَا تَقْعُدْ بَعْدَ الذِّكْرٰى مَعَ الْقَوْمِ الظّٰلِمِيْنَ
‘আর আপনি যখন তাদেরকে দেখেন, যারা আমাদের আয়াতসমূহ সম্বদ্ধে উপহাসমূলক আলোচনায় মগ্ন হয়, তখন আপনি তাদের থেকে মুখ ফিরিয়ে নিবেন, যে পর্যন্ত না তারা অন্য প্রসঙ্গ শুরু করবে। আর শয়তান যদি আপনাকে ভুলিয়ে দেয় তবে স্মরণ হওয়ার পর যালিম সম্প্রদায়ের সাথে বসবেন না’ (সূরা আল-আন‘আম: ৬৮)।
১২- ইমাম শাওকানী (রাহিমাহুল্লাহ) এই আয়াতের তাফসীর করতে গিয়ে বলেন, বিদ‘আতীদের সংস্পর্শে যারা থাকে তাদের জন্য এই আয়াতে একটা বিরাট গুরুত্বপূর্ণ নছীহত রয়েছে, বিদ‘আতীরা আল্লাহ তা‘আলার কালামের বিকৃত ব্যাখ্যা করে, আল্লাহর কিতাব ও রাসূল (ﷺ)-এর সুন্নাহ নিয়ে মজাক করে, তাদের ভ্রান্ত, বিকৃত ও নষ্ট মতের দিকে মানুষদের আহ্বান জানায়। ব্যক্তি যদি এদেরকে অপসন্দ না করে, বর্জন না করে তাহলে তারা বিদ‘আতীদের মতের দিকেই ধাবিত হয়ে যাবে’।[২১]
১৩- শায়খ ড. মুহাম্মাদ তাকীউদ্দীন হিলালী ‘আস-সিরাজুল মুনীর ফী তানবিহী জামা‘আতিত তাবলীগ ‘আলা আখদ্বায়িহিম’ নামক গ্রন্থে লিখেছেন যে, ‘বিদ‘আতী তাবলীগ পন্থীদের দোষ হিসাবে এটাই যথেষ্ট যে, তারা তাওহীদের প্রতি আহ্বান করে না। বরং তারা তাওহীদের প্রতি আহ্বান করা ও আহ্বায়ককে ঘৃণা করে।
বিদ‘আতীদের মানহাজ ঠিক নেই! যার মানহাজ ঠিক নেই তার আকিদাও ঠিক নেই। বিদ‘আতীরা নিজেদের কর্মকে কখনোই খারাপ মনে করে না। যদি তাকে ধরিয়ে দেয়াও হয়। ডাকাত কখনো ডাকাতিকে ভালো মনে করে না। চোর কখনো চুরি পেশাকে সাধু পেশা মনে করে না। সব সূদখোরই জানে যে, সূদ খাওয়া হারাম। শয়তান নিজেও জানে যে সে তার কুকীর্তির কারণে জাহান্নামে যাবে। আল্লাহর শাস্তির সম্মুখীন হবে। কিন্তু বিদ‘আতীর অন্তরটা এমনই বক্র, তার অন্তরে শয়তান এমনভাবেই পেরেক মেরে দেয় যে, বিদ‘আতকে সে কখনোই বিদ‘আত মনে করে না। এর মাধ্যমে সে ছাওয়াব চায় আল্লাহ তা‘আলার কাছে। নাউযুবিল্লাহি মিন যালিক। তাই এদের ভাগ্যে তওবাও জুটে না। বিদ‘আতীরা তওবা করতে পারে না। ইমাম সুফিয়ান ছাওরী (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন, ‘অবাধ্যতা বা পাপাচার থেকে শয়তানের নিকট বেশি প্রিয় বিদ‘আত। কেননা পাপকাজ থেকে তাওবাহ করা হয়ে থাকে পক্ষান্তরে বিদ‘আত থেকে তাওবাহ করা হয় না’।[২২] রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেন, ‘আল্লাহ তা‘আলা তাওবাহকে বিদ‘আতীদের থেকে দূরে রাখেন’।[২৩]
পরিশেষে রাসূল (ﷺ)-এর কয়েকটি হাদীছ পেশ করছি। রাসূল (ﷺ) বলেছেন, الْمَرْءُ مَعَ مَنْ أَحَبَّ ‘ব্যক্তি যাকে ভালোবাসে তার সাথেই থাকবে’।[২৪] আয়িশা (রাযিয়াল্লাহু আনহা) বলেন, আমি নবী (ﷺ)-কে বলতে শুনেছি, اَلأَرْوَاحُ جُنُوْدٌ مُجَنَّدَةٌ، فَمَا تَعَارَفَ مِنْهَا ائْتَلَفَ، وَمَا تَنَاكَرَ مِنْهَا اخْتَلَفَ ‘সমস্ত রূহ সেনাবাহিনীর মত একত্রিত ছিল। সেখানে তাদের যে সমস্ত রূহের পরস্পর পরিচয় ছিল, এখানেও তাদের মধ্যে পরস্পর পরিচিতি থাকবে। আর সেখানে যাদের মধ্যে পরস্পর পরিচয় হয়নি, এখানেও তাদের মধ্যে পরস্পর মতভেদ ও মতবিরোধ থাকবে’।[২৫] আবূ মূসা (রাযিয়াল্লাহু আনহু) বলেন, নবী (ﷺ) বলেছেন,
مَثَلُ الْجَلِيْسِ الصَّالِحِ وَالسَّوْءِ كَحَامِلِ الْمِسْكِ وَنَافِخِ الْكِيْرِ، فَحَامِلُ الْمِسْكِ إِمَّا أَنْ يُحْذِيَكَ، وَإِمَّا أَنْ تَبْتَاعَ مِنْهُ، وَإِمَّا أَنْ تَجِدَ مِنْهُ رِيْحًا طَيِّبَةً، وَنَافِخُ الْكِيْرِ إِمَّا أَنْ يُحْرِقَ ثِيَابَكَ، وَإِمَّا أَنْ تَجِدَ رِيْحًا خَبِيْثَةً
সৎসঙ্গী ও অসৎ সঙ্গীর দৃষ্টান্ত হল, আতরওয়ালা ও কামারের হাপরের ন্যায়। আতরওয়ালা হয়তো তোমাকে কিছু দিবে কিংবা তার নিকট হতে তুমি কিছু খরিদ করবে। কমপক্ষে তার নিকট হতে তুমি সুবাস পাবে। আর কামারের হাপর হয়তো তোমার কাপড় পুড়িয়ে দেবে কিংবা তুমি তার নিকট হতে পাবে দুর্গন্ধ’।[২৬]
সুধী পাঠক! উক্ত নাতিদীর্ঘ আলোচনা হতে সুস্পষ্টরূপে প্রতিভাত হয় যে, আমরা যারা নিজেদেরকে আহলুল হাদীছ বা সালাফী দাবী করি এবং সে অনুযায়ী আমল করার চেষ্টা করি- তাদের নিম্নোক্ত কাজগুলো করা অত্যন্ত যরূরী। যেমন,
- আহলে ইলম হতে মানহাজ-আক্বীদা সম্পর্কে জ্ঞান অর্জন করা।
- সখ্যতা হবে কুরআন-সুন্নাহের সাথে।
- বিদ‘আতীদের বই পড়া থেকে বিরত থাকা।
- বিদ‘আতীদের বক্তব্য শ্রবণ না করা।
- বিদ‘আতীদের থেকে সর্বদা দূরে অবস্থান করা।
- যথাসম্ভব তাদের সাথে আত্মীয়তা করা হতে বিরত থাকা।
- আমাদের ওপর তাদের বিদ‘আতের প্রভাব পড়বে এমন সব কাজ হতে বিরত থাকা।
- সালাফগণ যেভাবে নিজেরা তাদের দ্বীনি অনিষ্টতা হতে বেঁচে থেকেছেন এবং অন্যদের বারণ করেছেন, আমরাও সে কাজেই করব।
পরিশেষে বলব, আমাদের চলাফেরা যদি হয় বিদ‘আতীদের সাথে, তাদের সাথে যদি হয় আমাদের সখ্যতা তবে জেনে রাখা ভালো হবে, ঈমানের পথে অবিচল থাকা, ছিরাতে মুস্তাক্বীমে অবিচল থাকা আমাদের পক্ষে কখনোই সম্ভব নয়। আল্লাহ তা‘আলা আমাদের সঠিক বুঝ দান করুন। সঠিকটা জেনে মানার তাওফীক দান করুন। ওমা আলাইনা ইল্লাল বালাগ।
* অধ্যয়নরত, ইমাম মুহাম্মাদ বিন সউদ ইসলামী ইউনিভার্সিটি, রিয়াদ, সৌদিআরব; সাবেক মুদাররিস, দারুল হুদা ইসলামী কমপ্লেক্স, বাঘা, রাজশাহী।
তথ্যসূত্র :
[১]. আত-তাবাকাতুল কুবরা, ৬ষ্ঠ খণ্ড, পৃ. ১৯৯।
[২]. ছহীহ মুসলিম, হা/৮।
[৩]. আবূ বকর আল-আজুর্রী, আশ-শরী‘আহ, পৃ. ১৮৮, সনদ হাসান।
[৪]. ইমাম লালাকায়ী, ই‘তিকাদু আহলিস সুন্নাহ, পৃ. ১১৩৬।
[৫]. আবূ বকর আল-আজুর্রী, আশ-শারী‘আহ, পৃ. ২১৩।
[৬]. ইবনু জারীর ত্বাবারী, তাফসীরে ত্বাবারী, ১ম খণ্ড, পৃ. ৮০, সনদ ছহীহ।
[৭]. আত-তারীখুল কাবীর, ৪র্থ খণ্ড, পৃ. ৩৫৯।
[৮]. আবূ বকর আল-আজুর্রী, আশ-শারী‘আহ, পৃ. ৬৫।
[৯]. দারেমী, হা/৩৯১, সনদ হাসান।
[১০]. আল-ইবানাহ ‘আন শারী‘আতিল ফিরক্বাতিন নাজিয়াহ, পৃ. ৩৭১।
[১১]. আল-ই‘তিছাম, ১ম খণ্ড, পৃ. ১৭২।
[১২]. আল-ইবানাহ ‘আন-শারী‘আতিল ফিরক্বাতিন নাজিয়াহ, পৃ. ৪০০।
[১৩]. আল-ইবানাহ ‘আন-শারী‘আতিল ফিরক্বাতিন নাজিয়াহ, পৃ. ৪৩৫।
[১৪]. তাহযীরু আহলিস সুন্নাহ আস-সালাফীয়্যিন মিন মুজালাসাতি ও মুখালাতাতি আহলিল আহওয়া আল-মুবতাদিঈন, পৃ. ৭।
[১৫]. মাজমূঊল ফাতওয়া, ২০শ খণ্ড, পৃ. ১০৩।
[১৬]. হুকমুল ইনতিমা ইলাল ফিরাকি ওয়াল আহযারি ওয়াল জামা‘আতিল ইসলামিয়্যাহ, পৃ. ৯৬-৯৭।
[১৭]. মাজমূউল ফাতওয়া, ২৮শ খণ্ড, পৃ. ২৩১।
[১৮]. তারীখে বাগদাদ, ৮ম খণ্ড, পৃ. ৬৫।
[১৯]. মাজমূঊল ফাতওয়া, ২৮শ খণ্ড, পৃ. ২৩২।
[২০]. শারহু ইলালিত তিরমিযী, ৬০০/৫০।
[২১]. ইমাম শাওকানী, ফাৎহুল ক্বদীর, ২য় খণ্ড, পৃ. ১২৮।
[২২]. মুসনাদু ইবনি জা‘দি, হা/১৮৮৫; মাজমূঊ ফাতওয়া, ১১শ খণ্ড, পৃ. ৮৭২।
[২৩]. সিলসিলা ছহীহাহ, হা/১৬২০।
[২৪]. ছহীহ বুখারী, হা/৬১৬৮।
[২৫]. ছহীহ বুখারী, হা/৩৩৩৬।
[২৬]. ছহীহ বুখারী, হা/৫৫৩৪।