শী‘আ মতবাদের স্বরূপ ও তাদের বিভ্রান্তি
- মূল : শায়খ মুহাম্মাদ আব্দুস সাত্তার আত-তূনসাবী*
- অনুবাদ : ড. মো: আমিনুল ইসলাম**
(শেষ কিস্তি)
ভ্রান্ত আক্বীদা-৬ : তাক্বীয়া (التقية)-এর আক্বীদা ও তাদের মতে তার ফযীলতসমূহ।
শী‘আদের নিকট তাক্বীয়া (التقية)-এর অর্থ হল, নির্ভেজাল মিথ্যা, অথবা সুস্পষ্ট মুনাফেকি (কপটতা); যেমনিভাবে তাদের বর্ণনাসমূহ থেকে তা পরিষ্কার ও সুস্পষ্ট। তাক্বীয়া (التقية) ও তার ফযীলতের ব্যাপারে শী‘আদের গ্রন্থসমূহ থেকে তাদের আক্বীদা ও বিশ্বাস নিয়ে বর্ণিত বর্ণনাসমূহ থেকে অংশবিশেষ উপস্থাপন করা হল।
আল-কুলাইনী বর্ণনা করেন, ‘ইবনু ঊমাইর আল-আ‘জামী থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমাকে আবূ আব্দুল্লাহ বলেন, হে আবূ ওমর! নিশ্চয় দ্বীনের দশ ভাগের নয় ভাগ ‘তাক্বীয়া’ (التقية)-র মধ্যে, যার ‘তাক্বীয়া’ নেই, তার ধর্ম নেই। আর মদ ও মোজার উপর মাসাহ ব্যতীত সকল বস্তুর মধ্যে ‘তাক্বীয়া’ আছে’।[১] তিনি আরও বর্ণনা করেন, ‘আবূ জা‘ফর বলেন, ‘তাক্বীয়া’ আমার এবং আমার বাপ-দাদাদের ধর্ম। যার ‘তাক্বীয়া’ নেই, তার ঈমান নেই’।[২] অন্যত্র তিনি বর্ণনা করেন, ‘আবূ আব্দুল্লাহ থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, ‘তোমরা তোমাদের দ্বীনের ব্যাপারে ভয় কর এবং তাকে ‘তাক্বীয়া’ দ্বারা ঢেকে রাখ। কারণ যার ‘তাক্বীয়া’ নেই, তার ঈমান নেই’।[৩]
আল-কুলাইনী আরও বর্ণনা করেন, ‘আবূ আব্দুল্লাহ থেকে বর্ণিত, আল্লাহ তা‘আলার বাণী,﴿ وَلَا تَسۡتَوِي الۡحَسَنَةُ وَلَا السَّيِّئَةُ﴾ অর্থাৎ ‘ভাল ও মন্দ সমান হতে পারে না’-প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘ভাল (الۡحَسَنَةُ) হচ্ছে ‘তাক্বীয়া’ (التقية) বা গোপন করা এবং মন্দ (السَّيِّئَةُ) হচ্ছে প্রচার করা। আর আল্লাহ তা‘আলার বাণী, ﴿اِدۡفَعۡ بِالَّتِيْ هِيَ أَحۡسَنُ﴾ ‘মন্দ প্রতিহত কর উৎকৃষ্ট দ্বারা’- প্রসঙ্গে তিনি বলেন, উৎকৃষ্ট হল ‘তাক্বীয়া’ (التقية)।[৪]
আল-কুলাইনী বর্ণনা করেন, ‘আবূ জা‘ফর থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, প্রত্যেক প্রয়োজনের সময়েই ‘তাক্বীয়া’ রয়েছে; তার (প্রয়োজন) কখন হবে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিই তা সম্পর্কে অধিক অবগত, যখন তার উপর সে প্রয়োজন এসে পড়ে’।[৫] তিনি আরও বর্ণনা করেন, ‘আবূ আব্দুল্লাহ থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমার পিতা বলতেন, ‘তাক্বীয়া’র চেয়ে আমার চক্ষু অধিক শীতলকারী বস্তু আর কী হতে পারে! নিশ্চয় তাক্বীয়া’ হল মুমিনের জান্নাত’।[৬]
আল-কুলাইনী বর্ণনা করেন, ‘সুলায়মান খালিদ থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আবূ আব্দুল্লাহ বলেন, নিশ্চয় তোমরা দ্বীনের উপর প্রতিষ্ঠিত। যে ব্যক্তি তা গোপন করবে, তাকে আল্লাহ সম্মানিত করবেন এবং যে ব্যক্তি তা প্রচার করবে, তাকে আল্লাহ অপমানিত করবেন’।
পর্যালোচনা
পূর্বে শী‘আদের যেসব আক্বীদা ও বর্ণনাসমূহ আলোচিত হয়েছে, তার সবকটিই আল-কুরআনের বক্তব্যের পরিপন্থী। আল্লাহ তা‘আলা বলেন, یٰۤاَیُّہَا الرَّسُوۡلُ بَلِّغۡ مَاۤ اُنۡزِلَ اِلَیۡکَ مِنۡ رَّبِّکَ وَ اِنۡ لَّمۡ تَفۡعَلۡ فَمَا بَلَّغۡتَ رِسَالَتَہٗ ‘হে রাসূল! আপনার প্রতিপালকের নিকট থেকে আপনার প্রতি যা অবতীর্ণ হয়েছে, তা আপনি প্রচার করুন; যদি না করেন, তবে আপনি তাঁর বার্তা পৌঁছে দিলেন না’ (সূরা আল-মায়েদাহ : ৬৭)। তিনি আরও বলেন, ہُوَ الَّذِیۡۤ اَرۡسَلَ رَسُوۡلَہٗ بِالۡہُدٰی وَ دِیۡنِ الۡحَقِّ لِیُظۡہِرَہٗ عَلَی الدِّیۡنِ کُلِّہٖ ‘অপর সমস্ত দ্বীনের উপর জয়যুক্ত করার জন্য তিনিই পথনির্দেশ ও সত্য দীনসহ তাঁর রাসূল প্রেরণ করেছেন’ (সূরা আত-তওবাহ : ৩৩)। তিনি আরও বলেন, وَ اتۡلُ مَاۤ اُوۡحِیَ اِلَیۡکَ مِنۡ کِتَابِ رَبِّکَ ‘আপনি আপনার প্রতি প্রত্যাদিষ্ট আপনার প্রতিপালকের কিতাব থেকে পাঠ করে শুনান’ (সূরা আল-কাহ্ফ : ২৭)। অন্যত্র তিনি বলেন, فَاصۡدَعۡ بِمَا تُؤۡمَرُ وَ اَعۡرِضۡ عَنِ الۡمُشۡرِکِیۡنَ ‘অতএব আপনি যে বিষয়ে আদিষ্ট হয়েছেন, তা প্রকাশ্যে প্রচার করুন এবং মুশরিকদেকে উপেক্ষা করুন’ (সূরা আল-হিজর : ৯৪)। তিনি আরও বলেন, اَلۡیَوۡمَ یَئِسَ الَّذِیۡنَ کَفَرُوۡا مِنۡ دِیۡنِکُمۡ فَلَا تَخۡشَوۡہُمۡ وَ اخۡشَوۡنِ ‘আজ কাফিরগণ তোমাদের দ্বীনের বিরুদ্ধাচরণে হতাশ হয়েছে; সুতরাং তাদেরকে ভয় করো না, শুধু আমাকে ভয় কর’ (সূরা আল-মায়েদাহ : ৩)। তিনি আরও বলেন, یٰۤاَیُّہَا الَّذِیۡنَ اٰمَنُوا اتَّقُوا اللّٰہَ وَ کُوۡنُوۡا مَعَ الصّٰدِقِیۡنَ ‘হে মুমিনগণ! তোমরা আল্লাহকে ভয় কর এবং সত্যবাদীদের অন্তর্ভুক্ত হও’ (সূরা আত-তাওবাহ : ১১৯)। তিনি আরও বলেন,
اِنَّ الَّذِیۡنَ یَکۡتُمُوۡنَ مَاۤ اَنۡزَلۡنَا مِنَ الۡبَیِّنٰتِ وَ الۡہُدٰی مِنۡۢ بَعۡدِ مَا بَیَّنّٰہُ لِلنَّاسِ فِی الۡکِتٰبِ ۙ اُولٰٓئِکَ یَلۡعَنُہُمُ اللّٰہُ وَ یَلۡعَنُہُمُ اللّٰعِنُوۡنَ
‘নিশ্চয় আমি মানুষের জন্য যে সব স্পষ্ট নিদর্শন ও পথনির্দেশ অবতীর্ণ করেছি, কিতাবে তা স্পষ্টভাবে ব্যক্ত করার পরও যারা তা গোপন করে রাখে, আল্লাহ তাদেরকে ‘লা‘নত’ (অভিশাপ) দেন এবং অভিশাপদানকারীগণও তাদেরকে অভিশাপ দেয়’ (সূরা আল-বাক্বারাহ : ১৫৯)।
ইসলামে তাক্বীয়া (التقية)-এর বিধান
ইসলামে ‘তাক্বীয়া’ শূকরের গোশত ভক্ষণ করার চেয়েও বেশি কঠোরতার সাথে নিষিদ্ধ। কারণ কঠিন পরিস্থিতিতে নিরুপায় ব্যক্তির জন্য শূকরের গোশত ভক্ষণ করা বৈধ; আর তেমনিভাবে অনুরূপ কঠিন পরিস্থিতিতেই শুধু ‘তাক্বীয়া’ বৈধ হবে। কারণ কোন মানুষ যদি নিরুপায় অবস্থায়ও শূকরের গোশত ভক্ষণ করা থেকে মুক্ত থাকে এবং মারা যায়, তবে সে আল্লাহ্র নিকট গুনাহগার হবে। আর এটা ‘তাক্বীয়া’র বিপরীত। কারণ যখন কোন মানুষ নিরুপায় অবস্থায় ‘তাক্বীয়া’র আশ্রয় না নেয় এবং মারা যায়, তবে আল্লাহ্র নিকট তার জন্য উচ্চ মর্যাদা ও ছওয়াবের ব্যবস্থা থাকবে। সুতরাং শূকরের গোশত ভক্ষণ করার অবকাশটি যেন শরী‘আতের আবশ্যিক বিধানে রূপান্তরিত হয়, কিন্তু ‘তাক্বীয়া’র অবকাশটি শরী‘আতের আবশ্যিক বিধানে রূপান্তরিত হয় না। বরং যে ব্যক্তি আল্লাহ্র দ্বীনের জন্য ‘তাক্বীয়া’র আশ্রয় না নিয়েই মৃত্যুবরণ করবে, সে ব্যক্তি তার এই মৃত্যুর কারণে শীঘ্রই মহাপ্রতিদানের অধিকারী হবে। আর এই ক্ষেত্রে প্রত্যেক অবস্থায় তাক্বীয়ার চেয়ে দৃঢ় সিদ্ধান্তই উত্তম। আর এই উম্মতের দীর্ঘ পথপরিক্রমায় ইসলামের ইতিহাসে রয়েছে রাসূলুল্লাহ (ﷺ) কর্তৃক মুশরিকদের প্রদত্ত কষ্ট সহ্যকরণ, অনুরূপভাবে আবূ বকর ছিদ্দীক ও বেলাল (রাযিয়াল্লাহু আনহুমা) প্রমুখের কষ্ট সহ্যকরণ; আম্মার (রাযিয়াল্লাহু আনহু)-এর মাতা সুমাইয়া (রাযিয়াল্লাহু আনহা) ও খুবাইব (রাযিয়াল্লাহু আনহু) প্রমুখের শাহাদাত ইত্যাদি ধরনের বীরত্ব ও দৃঢ় সিদ্ধান্তের বহু বিরল ঘটনা ও কাহিনী এর উপর উত্তম দলীল যে, দৃঢ় সিদ্ধান্তই হল মূল বিষয়, অতি উত্তম ও সুন্দর।
ভ্রান্ত আক্বীদা-৭ : মুত‘আ বিয়ের আক্বীদা ও তাদের মতে তার ফযীলতসমূহ।
ফৎহুল্লাহ আল-কাশানী তার তাফসীরের মধ্যে উল্লেখ করেন, ‘রাসূলুল্লাহ (ﷺ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, যে ব্যক্তি একবার মুত‘আ বিয়ে করবে, তার মর্যাদা হবে হুসাইনের মর্যাদার সমান; আর যে ব্যক্তি দুইবার মুত‘আ বিয়ে করবে, তার মর্যাদা হবে হাসানের মর্যাদার সমান; আর যে ব্যক্তি তিনবার মুত‘আ বিয়ে করবে, তার মর্যাদা হবে আলী ইবনু আবী তালিবের মর্যাদার সমান এবং যে ব্যক্তি চারবার মুত‘আ বিয়ে করবে, তার মর্যাদা হবে আমার মর্যাদার সমান’।[৭] তিনি আরও উল্লেখ করেন, ‘নবী (ﷺ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, ‘যে ব্যক্তি মুত‘আ বিয়ে (সাময়িক বিবাহ) না করে দুনিয়া থেকে বের হয়েছে (মৃত্যুবরণ করেছে), সে ক্বিয়ামতের দিন নাক কাটা অবস্থায় হাজির হবে’।[৮]
আল-কাশানী তার তাফসীরের মধ্যে ফারসি ভাষায় বর্ণনা করেন, যার অনুবাদ হল, ‘রাসূলুল্লাহ (ﷺ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, জিবরীল আমার নিকট আমার প্রতিপালকের পক্ষ থেকে উপহার নিয়ে আগমন করল। আর ঐ উপহার ছিল মুমিন নারীদের ভোগ করা। আর এই উপহার আমার পূর্বে আল্লাহ তা‘আলা আর কোন নবীকে দান করেননি ...। তোমরা জেনে রাখ, পূর্ববতী সকল নবীর উপর আমার মর্যাদা ও শ্রেষ্ঠত্বের কারণে আল্লাহ তা‘আলা আমাকে মুত‘আ বিয়ের মাধ্যমে বিশেষিত করেছেন। সুতরাং যে ব্যক্তি তার জীবনে একবার মুত‘আ বিয়ে করবে, সে ব্যক্তি জান্নাতের অধিবাসীদের অন্তর্ভুক্ত হবে। ... আর যখন মুত‘আ বিবাহিত নারী ও পুরুষ কোন জায়গায় একত্রিত হবে, তখন তাদের উপর একজন ফেরেশতা নাযিল হবে এবং সে তারা বিচ্ছিন্ন হওয়া পর্যন্ত তাদেরকে পাহারা দেবে; তাদের উভয়ের মধ্যে যে কথাবার্তা হবে, সে কথাবার্তাগুলো হবে যিক্র ও তাসবীহ। আর তাদের একজন যখন অপরজনের হাত ধরবে, তখন তাদের উভয়ের আঙ্গুলসমূহ থেকে গুনাহসমূহ ফোঁটায় ফোঁটায় ঝরতে থাকবে; আর যখন তাদের একজন অপরজনকে চুম্বন করবে, তখন তাদের জন্য প্রত্যেক চুম্বনের বিনিময়ে হজ্জ ও ওমরাহর ছাওয়াব লিপিবদ্ধ করা হবে এবং তাদের সহবাসের সময় প্রত্যেক কামনা ও স্বাদের বিনিময়ে সুউচ্চ পর্বতসমূহ পরিমাণ পুণ্য লেখা হবে। আর যখন তারা গোসলে মশগুল থাকবে এবং পানি ফোঁটা ঝড়বে, তখন আল্লাহ তা‘আলা ঐ পানির প্রত্যেক ফোঁটা দ্বারা একজন করে ফেরেশতা সৃষ্টি করবেন, যে আল্লাহ্র তাসবীহ পাঠ করবে ও তার পবিত্রতা বর্ণনা করবে এবং তার তাসবীহ ও পবিত্রতা বর্ণনার ছওয়াব তাদের উভয়ের জন্য ক্বিয়ামত পর্যন্ত লিপিবদ্ধ হতে থাকবে। হে আলী! যে ব্যক্তি এই সুন্নাতটিকে (মুত‘আ বিয়েকে) হালকা ও দুর্বল মনে করবে এবং তাকে অপসন্দ করবে, সে ব্যক্তি আমার দলভুক্ত নয় এবং আমি তার দায়-দায়িত্ব থেকে মুক্ত ...।
জিবরীল (আলাইহিস সালাম) বলল, হে মুহাম্মাদ (ﷺ)! যে দিরহামটি মুমিন তার মুত‘আ বিয়েতে খরচ করবে, তা আল্লাহ্র নিকট মুত‘আ বিয়ের বাইরে এক হাযার দিরহাম ব্যয় করার চেয়ে উত্তম। হে মুহাম্মাদ! জান্নাতের মধ্যে ডাগর চক্ষু বিশিষ্ট একদল হুর রয়েছে, যাদেরকে আল্লাহ সৃষ্টি করেছেন মুত‘আ বিয়ের অনুসারীদের জন্য। হে মুহাম্মদ! যখন মুমিন পুরুষ মুমিন নারীকে মুত‘আ বিয়ের বন্ধনে আবদ্ধ করে, তখন সে তার যে জায়গায়ই দাঁড়াবে আল্লাহ তাকে ক্ষমা করে দেবেন এবং মুমিন নারীকেও ক্ষমা করে দেবেন ...।
আছ-ছাদিক থেকে বর্ণিত, মুত‘আ বিয়ে আমার এবং আমার বাপ-দাদার দ্বীনের অন্তর্ভুক্ত। সুতরাং যে ব্যক্তি তার উপর আমল করবে, সে আমাদের দ্বীনের উপর আমল করবে এবং যে ব্যক্তি তা অস্বীকার করবে, সে আমাদের দ্বীনকে অস্বীকার করবে; বরং সে আমাদের দ্বীন ব্যতীত অন্য দ্বীনের অনুসরণ করবে। মুত‘আ বিয়ের স্ত্রীর গর্ভের সন্তান স্থায়ী স্ত্রীর গর্ভের সন্তানের চেয়ে উত্তম। আর মুত‘আ বিয়ের বিধান অস্বীকারকারী কাফির, মুরতাদ’।[৯]
মুত‘আ বিয়ে অবৈধ ও নিষিদ্ধ হওয়ার ব্যাপারে ইজমা সংঘটিত হয়েছে। এ ব্যাপারে শী‘আদের একটা অংশ ব্যতীত আলেমদের মধ্যে কোন বিরোধ নেই। আর মুত‘আ বিয়ে নিষিদ্ধ (হারাম) হওয়ার উপর দলীল হল আল্লাহ তা‘আলার বাণী,
قَدۡ اَفۡلَحَ الۡمُؤۡمِنُوۡنَ ۙ .الَّذِیۡنَ ہُمۡ فِیۡ صَلَاتِہِمۡ خٰشِعُوۡنَ ۙ . وَ الَّذِیۡنَ ہُمۡ عَنِ اللَّغۡوِ مُعۡرِضُوۡنَ . وَ الَّذِیۡنَ ہُمۡ لِلزَّکٰوۃِ فٰعِلُوۡنَ . وَ الَّذِیۡنَ ہُمۡ لِفُرُوۡجِہِمۡ حٰفِظُوۡنَ ۙ . اِلَّا عَلٰۤی اَزۡوَاجِہِمۡ اَوۡ مَا مَلَکَتۡ اَیۡمَانُہُمۡ فَاِنَّہُمۡ غَیۡرُ مَلُوۡمِیۡنَ . فَمَنِ ابۡتَغٰی وَرَآءَ ذٰلِکَ فَاُولٰٓئِکَ ہُمُ الۡعٰدُوۡنَ
‘অবশ্যই সফলকাম হয়েছে মুমিনগণ, যারা বিনয়-নম্র নিজেদের ছালাতে, যারা ক্রিয়াকলাপ থেকে বিরত থাকে, যারা যাকাত দানে সক্রিয়, যারা নিজেদের যৌন অঙ্গকে সংযত রাখে নিজেদের স্ত্রী অথবা অধিকারভুক্ত দাসীগণ ব্যতীত, এতে তারা নিন্দনীয় হবে না, আর কেউ এদের ছাড়া অন্যকে কামনা করলে তার হবে সীমালংঘনকারী’ (সূরা আল-মুমিনূন : ১-৭)।
অনুরূপভাবে আল্লাহ তা‘আলার বাণী, فَاِنۡ خِفۡتُمۡ اَلَّا تَعۡدِلُوۡا فَوَاحِدَۃً اَوۡ مَا مَلَکَتۡ اَیۡمَانُکُمۡ ‘আর যদি আশঙ্কা কর যে, সুবিচার করতে পারবে না, তবে একজনকে অথবা তোমাদের অধিকারভুক্ত দাসীকে’ (সূরা আন-নিসা : ৩)।
সুতরাং যে ব্যক্তি অন্যায়ের আশঙ্কা করবে, সে যেন একজন স্ত্রী অথবা তার অধিকারভুক্ত দাসীকে যথেষ্ট মনে করে। সুতরাং কোথায় মুত‘আ বিয়ে? অতএব যদি তা হালাল হত, তবে তিনি (আল্লাহ) তা উল্লেখ করতেন।
অনুরূপভাবে আল্লাহ তা‘আলার বাণী, وَ لۡیَسۡتَعۡفِفِ الَّذِیۡنَ لَا یَجِدُوۡنَ نِکَاحًا حَتّٰی یُغۡنِیَہُمُ اللّٰہُ مِنۡ فَضۡلِہٖ ‘যাদের বিয়ের সামর্থ্য নেই, আল্লাহ তাদেরকে নিজ অনুগ্রহে অভাবমুক্ত না করা পর্যন্ত তারা যেন সংযম অবলম্বন করে’ (সূরা আন-নূর : ৩৩)।
আর মুত‘আ বিয়ে নিষিদ্ধ হওয়ার ব্যাপারে আরও দলীল হল রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর বাণী,
يَا أَيُّهَا النَّاسُ إِنِّىْ قَدْ كُنْتُ أَذِنْتُ لَكُمْ فِى الْاِسْتِمْتَاعِ مِنَ النِّسَاءِ وَإِنَّ اللهَ قَدْ حَرَّمَ ذَلِكَ إِلَى يَوْمِ الْقِيَامَةِ فَمَنْ كَانَ عِنْدَهُ مِنْهُنَّ شَىْءٌ فَلْيُخَلِّ سَبِيْلَهُ وَلَا تَأْخُذُوْا مِمَّا آتَيْتُمُوْهُنَّ شَيْئًا
‘হে লোকসকল! আমি তোমাদেরকে (সাময়িক বিয়ের মাধ্যমে) নারীদের ভোগ করার অনুমতি দিয়েছিলাম; আর আল্লাহ তা ক্বিয়ামতের দিন পর্যন্ত নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছেন। সুতরাং যার নিকট তাদের পক্ষ থেকে কোন বস্তু রয়েছে, সে যেন তার পথ উন্মুক্ত করে দেয়; আর তোমরা তাদেরকে যা প্রদান করেছ, তার মধ্য থেকে কিছুই গ্রহণ করো না’।[১০] অনুরূপভাবে ইমাম মুসলিম (রাহিমাহুল্লাহ) আরও বর্ণনা করেছেন,
أَنَّ رَسُوْلَ اللهِ ﷺ نَهَى عَنِ الْمُتْعَةِ وَقَالَ أَلَا إِنَّهَا حَرَامٌ مِنْ يَوْمِكُمْ هَذَا إِلَى يَوْمِ الْقِيَامَةِ وَمَنْ كَانَ أَعْطَى شَيْئًا فَلَا يَأْخُذْهُ
‘রাসূলুল্লাহ (ﷺ) মুত‘আ বিয়ে থেকে নিষেধ করেছেন এবং বলেছেন, সাবধান! নিশ্চয় তা (মুত‘আ বিয়ে) তোমাদের এই দিন থেকে ক্বিয়ামতের দিন পর্যন্ত হারাম (নিষিদ্ধ)। আর যে ব্যক্তি কোন কিছু প্রদান করেছে, সে যেন তা গ্রহণ না করে’।[১১]
ভ্রান্ত আক্বীদা-৮ : গুপ্তাঙ্গ ধার করার (বেশ্যাবৃত্তি) বৈধতার আক্বীদা।
আবূ জা‘ফর মুহাম্মাদ ইবনু হাসান আত-তূসী ‘আল-ইসতিবছার’ (الاستبصار) নামক গ্রন্থে বর্ণনা করেন, ‘মুহাম্মাদ ইবনু মুসলিম থেকে বর্ণিত, তিনি আবূ জা‘ফর থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন, আমি তাকে জিজ্ঞেস করলাম, الرجل يحل لأخيه فرج جاريته؟ قال نعم لا بأس به له ما أحل له منها ‘কোন ব্যক্তি কি তার ভাইয়ের জন্য তার কন্যা বা দাসীর গুপ্তাঙ্গকে বৈধ করে দিতে পারে? তিনি জবাব দিলেন: হ্যাঁ, সে ব্যক্তি তার (কন্যা বা দাসীর) থেকে তার জন্য যা বৈধ করেছে, তাতে তার কোন সমস্যা নেই’।[১২] আবু জা‘ফর আত-তূসী আরও বর্ণনা করেন, ‘মুহাম্মাদ ইবনু মুযারিব থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আবূ আব্দুল্লাহ আমাকে বলল,
يا محمد! خذ هذه الجارية تخدمك وتصيب منها فإذا خرجت فارددها إلينا.
‘হে মুহাম্মাদ! তুমি এই দাসীটিকে গ্রহণ কর, সে তোমার সেবা করবে এবং তুমি তার থেকে (ফায়দা) অর্জন করবে। অতঃপর যখন বের হয়ে যাবে, তখন তাকে আমাদের নিকট ফেরত দিয়ে যাবে’।[১৩]
পর্যালোচনা
এটা যিনা-ব্যভিচারের আরেক প্রকার, যাকে শী‘আরা বৈধ করে দিয়েছে এবং তাকে মিথ্যা ও বানোয়াটি কায়দায় আহলে বাইতের ইমামগণের সাথে সম্পর্কযুক্ত করে দিয়েছে। এ ক্ষেত্রে তারা শুধু তাদের প্রবৃত্তির অনুসরণ করেছে। অথচ ইসলামী শরী‘আতে সকল প্রকারের যিনা-ব্যভিচার নিষিদ্ধ (হারাম), যেমনিভাবে তা সর্বজন বিদিত।
ভ্রান্ত আক্বীদা-৯ : নারীদের সাথে পিছনের পথে সংগম বৈধ হওয়া আক্বীদা।
আবূ জা‘ফর মুহাম্মাদ ইবনু হাসান আত-তূসী ‘আল-ইসতিবছার’ (الاستبصار) নামক গ্রন্থে বর্ণনা করেন, আব্দুল্লাহ ইবনু আবী ইয়া‘ফূর থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি আবূ আব্দুল্লাহকে জিজ্ঞেস করলাম, ‘ঐ পুরুষ ব্যক্তি সম্পর্কে, যে তার স্ত্রীর সাথে তার পিছনের পথে সংগমে মিলিত হয়। তখন তিনি বললেন, সে রাজি থাকলে কোন অসুবিধা নেই। আমি বললাম, তাহলে আল্লাহ তা‘আলার বাণী: (فَاۡتُوۡہُنَّ مِنۡ حَیۡثُ اَمَرَکُمُ اللّٰہُ ) তখন তাদের নিকট ঠিক সেভাবে গমন করবে, যেভাবে আল্লাহ তোমাদেরকে আদেশ দিয়েছেন)-এর বাস্তবতা কোথায়? তখন তিনি বললেন, এই আয়াতের বিধান সন্তান কামনার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। সুতরাং তোমরা সন্তান অনুসন্ধান কর, আল্লাহ যেভাবে তোমাদেরকে আদেশ দিয়েছেন। নিশ্চয় আল্লাহ তা‘আলা বলেন, نِسَآؤُکُمۡ حَرۡثٌ لَّکُمۡ ۪ فَاۡتُوۡا حَرۡثَکُمۡ اَنّٰی شِئۡتُمۡ ‘তোমাদের স্ত্রীগণ তোমাদের ক্ষেত্র। অতএব তোমরা তোমাদের ক্ষেত্রে যেভাবে ইচ্ছা গমন কর’ (সূরা আল-বাক্বারাহ : ২২৩)’। [১৪]
পর্যালোচনা
যেসব হাদীছ সমকামিতা বৈধতার ব্যাপারে বর্ণিত হয়েছে, সেগুলো ‘তাক্বীয়া’র নীতি অনুসরণ করে বর্ণিত হওয়ার সম্ভাবনা রাখে। কারণ মানুষ সাধারণভাবে এই বিষয়গুলো কামনা করে। ফলে ইমামগণ তাদের (জনগণের) কারণে এবং তাদেরকে সন্তুষ্ট করার জন্য ‘তাক্বীয়া’র পথ বেঁচে নিয়েছে। নিশ্চয় প্রত্যেক বস্তু এবং প্রত্যেক খবরের (হাদীছের) মধ্যে ‘তাক্বীয়া’র সম্ভাবনা রয়েছে।
আল-কুরআন ও সুন্নাহর আলোকে নারীদের পিছন পথ ব্যবহার হারাম
আল্লাহ তা‘আলা বলেন, نِسَآؤُکُمۡ حَرۡثٌ لَّکُمۡ فَاۡتُوۡا حَرۡثَکُمۡ اَنّٰی شِئۡتُمۡ ‘তোমাদের স্ত্রীগণ তোমাদের শস্যক্ষেত্র। অতএব তোমরা তোমাদের শস্যক্ষেত্রে যেভাবে ইচ্ছা গমন কর’ (সূরা আল-বাক্বারাহ : ২২৩)।
নিশ্চয় আল্লাহ তা‘আলা চাষের জায়গায় আসার অনুমতি দিয়েছেন; আর তা হল লজ্জাস্থান। আর তিনি পায়খানার জায়গায় গমনের অনুমতি দেননি; আর তা হল পিছনের রাস্তা। আল্লাহ তা‘আলা আরও বলেন, وَ یَسۡـَٔلُوۡنَکَ عَنِ الۡمَحِیۡضِ قُلۡ ہُوَ اَذًی فَاعۡتَزِلُوا النِّسَآءَ فِی الۡمَحِیۡضِ وَ لَا تَقۡرَبُوۡہُنَّ حَتّٰی یَطۡہُرۡنَ ‘লোকে আপনাকে রজঃস্রাব (হায়েয) সম্পর্কে জিজ্ঞেস করে।(হে নবী!) আপনি বলুন, ‘তা অশুচি’। সুতরাং তোমরা রজঃস্রাবকালে স্ত্রী-সংগম বর্জন করবে এবং পবিত্র না হওয়া পর্যন্ত স্ত্রী-সংগম করবে না’ (সূরা আল-বাক্বারাহ : ২২২)।
এই আয়াতের মধ্যে হাতেগণা কয়েকদিন অব্যাহত থাকা সত্ত্বেও হায়েয তথা রজঃস্রাবকালে নারীদের লজ্জাস্থানের নিকট গমন করতে আল্লাহ তা‘আলা আমাদেরকে নিষেধ করেছেন। সুতরাং সার্বক্ষণিক নাপাকি তথা ময়লা বিদ্যমান থাকা সত্ত্বেও কিভাবে নারীদের পায়ুপথে গমন করা বৈধ হতে পারে! আর এই আয়াতে আরও বর্ণনা করা হয়েছে যে, (মাসিক অবস্থায়) শুধু নারীদের সামনের লজ্জাস্থানের নিকট গমন করা নিষিদ্ধ, পায়ুপথে নিষিদ্ধ হওয়ার বিষয়টি উল্লেখ নেই। কারণ হায়েযের বিষয়টি শুধু সামনের লজ্জাস্থানের সাথে সংশ্লিষ্ট। আর পায়ুপথের বিধানের অবস্থা হবে হায়েযের পূর্বেকার অবস্থার বিধানের মত। সুতরাং হায়েযের পূর্বে সেখানে গমন করা যদি বৈধ হয়ে থাকে, তবে এখনও গমন করতে কোন বাধা নেই। অতঃপর বিষয়টি যদি অনুরূপই হত, তবে তখন আয়াতের ধরন হত, ‘فَاعْتَزِلُوا الْفُرُوْجَ فِي الْمَحِيْضِ’ (সুতরাং তোমরা মাসিক অবস্থায় তাদের লজ্জাস্থানে গমন করা থেকে দূরে থাক); ‘ فَاعۡتَزِلُوا النِّسَآءَ فِی الۡمَحِیۡضِ’ (সুতরাং তোমরা রজঃস্রাবকালে স্ত্রী-সংগম বর্জন করবে)- এমন কথা বলা হত না, যেমন আয়াতে বর্তমান আছে।
আবূ হুরায়রা (রাযিয়াল্লাহু আনহু) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেন,
مَنْ أَتَى كَاهِنًا فَصَدَّقَهُ بِمَا يَقُوْلُ أَوْ أَتَى امْرَأَتَهُ حَائِضًا أَوْ أَتَى امْرَأَتَهُ فِىْ دُبُرِهَا فَقَدْ بَرِئَ مِمَّا أَنْزَلَ اللهُ عَلَى مُحَمَّدٍ
‘যে ব্যক্তি জ্যোতিষীর নিকট আসে এবং সে যা বলে, তা বিশ্বাস করে; অথবা রজঃস্রাবকালীন সময়ে তার স্ত্রীর নিকট গমন করে; অথবা তার স্ত্রীর সাথে পায়ুপথে মিলিত হয়, সেই ব্যক্তি মুহাম্মাদ (ﷺ)-এর প্রতি যা অবতীর্ণ হয়েছে, তা থেকে মুক্ত’।[১৫] রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেন, مَلْعُوْنٌ مَنْ أَتَى امْرَأَتَهُ فِىْ دُبُرِهَا ‘যে ব্যক্তি তার স্ত্রীর সাথে পায়ুপথে মিলিত হয়, সেই ব্যক্তি অভিশপ্ত’।[১৬]
হে আল্লাহ! আপনি আমাদেরকে যাবতীয় অশ্লীল, অন্যায় এবং বাহ্যিক ও অভ্যন্তরীণ ফিতনা থেকে দূরে রাখুন-আমীন!!
ভ্রান্ত আক্বীদা-১০ : হুসাইনের শাহাদাতের স্মরণে শোকের মাতম, বক্ষ বিদীর্ণকরণ ও গালে আঘাত করার মধ্যে ছাওয়াব প্রত্যাশা।
আর এটাও ইসলামী আক্বীদা ও বিশ্বাসের (বিপদ ও মুছিবতে ধৈর্য ধারণ) পরিপন্থী। শী‘আরা শোক, মাতম ও বিলাপের জন্য মাহফিল ও মাজলিস তথা সভা ও সমাবেশের আক্বীদায় বিশ্বাস করে এবং তারা প্রতি বছর মহররম মাসের প্রথম দশকে আল্লাহ্র নৈকট্য হাসিলের বিশ্বাস নিয়ে হুসাইন (রাযিয়াল্লাহু আনহু)-এর শাহাদাতের স্মরণে বিভিন্ন মাঠে ও ময়দানে এবং মহাসড়কে বড় বড় শোক মিছিলের আয়োজন করে। অতঃপর তারা তাদের হাত দ্বারা তাদের গালে, বক্ষে ও পিঠে আঘাত করে এবং কাঁদতে কাঁদতে বক্ষ বিদীর্ণ করে। আর বিশেষ করে প্রত্যেক মহররম মাসের দশম তারিখে তারা ইয়া হোসাইন! ... ইয়া হোসাইন! শ্লোগানে শ্লোগানে চীৎকার করে। কারণ বন্ধুত্বের আবেগ ভর্তি তাদের চীৎকার পৌঁছে যায় পরিপূর্ণতার চরম শিখরে। আরা তারা ঐ দিন কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে সারিবদ্ধভাবে কাঠ বা অনুরূপ বস্তু দ্বারা নির্মিত হোসাইনের কফিন বহন করে (র্যালিতে) বের হয় এবং সকল প্রকার সৌন্দর্য ও অলঙ্কার দ্বারা সুসজ্জিত ঘোড়া পরিচালিত করে। আর এর দ্বারা তারা কারবালার ময়দানে হোসাইনের ঘোড়া ও তার দলবলের সেই দিনের অবস্থার অভিনয় করে। আর তাদের সাথে এই হৈচৈ ও গোলযোগ অংশগ্রহণের জন্য তারা বড় ধরনের মজুরি দিয়ে শ্রমিক ভাড়া করে। তারা রসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর ছাহাবীদের গালি দেয় এবং তাদের থেকে নিজেদেরকে মুক্ত মনে করে। আর তাদের এই প্রথম স্তরের জাহেলী কর্মকাণ্ডগুলো আহলে সুন্নাত ওয়াল জামা‘আতের সাথে বিবাদ ও বিতর্কের দিকে নিয়ে যায়। বিশেষ করে যখন তারা রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর ছাহাবীদের গালি দেয়, নিন্দা করে এবং আবূ বকর, ওমর ও ওছমানের মত খলীফাদের থেকে নিজেদেরকে মুক্ত মনে করে। অতঃপর তাদের কারণেই সৎব্যক্তিদের মধ্যে রক্তপাতের ঘটনা সংঘটিত হয়েছে বলে মনে করত।
আর শী‘আ হোসাইনের মাতম তথা শোক প্রকাশে এইভাবে বহু অর্থ-সম্পদ খরচ করে। কারণ তারা বিশ্বাস করে যে, এটা তাদের দ্বীনের মূল কর্মকাণ্ড ও মহান প্রতীক তথা নিদর্শনের অন্তর্ভুক্ত। শী‘আ তাদের সন্তানদেরকে এই মাতমের সময় কাঁদতে অভ্যস্ত করে তোলে। সুতরাং যখন তারা বড় হয়, তখন তারা যখন ইচ্ছা কাঁদতে অভ্যস্ত হয়ে যায়। অতএব তাদের কাঁদাটা হল একটা ঐচ্ছিক বিষয়; আর তাদের শোক-দুঃখ হল কৃত্তিম শোক-দুঃখ।
পর্যালোচনা
অথচ পবিত্র শরী‘আত দৃঢ়ভাবে শোকের মাতম (কান্নাকাটি), বক্ষ বিদীর্ণকরণ ও গালে আঘাত করাকে নিষেধ করেছে এবং আল-কুরআন আদম সন্তানদেরকে ধৈর্যধারণ করার ও আল্লাহ্র সিদ্ধান্তের প্রতি সন্তুষ্ট থাকার উপদেশ দিয়েছে। যেমন আল্লাহ তা‘আলা বলেন:
یٰۤاَیُّہَا الَّذِیۡنَ اٰمَنُوا اسۡتَعِیۡنُوۡا بِالصَّبۡرِ وَ الصَّلٰوۃِ اِنَّ اللّٰہَ مَعَ الصّٰبِرِیۡنَ
‘হে মুমিনগণ! ধৈর্য ও ছালাতের মাধ্যমে তোমরা সাহায্য প্রার্থনা কর। নিশ্চয় আল্লাহ ধৈর্যশীলদের সাথে আছেন’ (সূরা আল-বাক্বারাহ : ১৫৩)। আল্লাহ তা‘আলা আরও বলেন,
وَ بَشِّرِ الصّٰبِرِیۡنَ . الَّذِیۡنَ اِذَاۤ اَصَابَتۡہُمۡ مُّصِیۡبَۃٌ قَالُوۡۤا اِنَّا لِلّٰہِ وَ اِنَّاۤ اِلَیۡہِ رٰجِعُوۡنَ
‘তুমি শুভ সংবাদ দাও ধৈর্যশীলগণকে, যারা তাদের উপর বিপদ আপতিত হলে বলে, ‘আমরা তো আল্লাহ্রই এবং নিশ্চিতভাবে আমরা তাঁর দিকেই প্রত্যাবর্তনকারী’ (সূরা আল-বাক্বারাহ : ১৫৫-১৫৬)। আল্লাহ তা‘আলা আরও বলেন, وَ تَوَاصَوۡا بِالۡحَقِّ وَ تَوَاصَوۡا بِالصَّبۡرِ ‘এবং তারা পরস্পরকে সত্যের উপদেশ দেয় ও পরস্পরকে ধৈর্যের উপদেশ দেয়’ (সূরা আল-‘আছর : ৩)। আল্লাহ তা‘আলা আরও বলেন, تَوَاصَوۡا بِالصَّبۡرِ وَ تَوَاصَوۡا بِالۡمَرۡحَمَۃِ ‘এবং যারা পরস্পরকে উপদেশ দেয় ধৈর্যধারণের ও দয়া-দাক্ষিণ্যের’ (সূরা আল-বালাদ : ১৭)। অন্যত্র বলেন,
وَ الصّٰبِرِیۡنَ فِی الۡبَاۡسَآءِ وَ الضَّرَّآءِ وَ حِیۡنَ الۡبَاۡسِ ؕ اُولٰٓئِکَ الَّذِیۡنَ صَدَقُوۡا ؕ وَ اُولٰٓئِکَ ہُمُ الۡمُتَّقُوۡنَ
‘অর্থ-সংকটে, দুঃখ-ক্লেশে ও সংগ্রাম-সংকটে ধৈর্যধারণ করলে। এরাই তারা যারা সত্যপরায়ণ এবং এরাই মুত্তাকী’ (সূরা আল-বাক্বারাহ : ১৭৭)।
উপসংহার
মহান আল্লাহ তা‘আলার নিকট প্রার্থনা করছি, তিনি যেন তাঁর অনুগ্রহ ও ইহসান দ্বারা শী‘আদের মিথ্যা বর্ণনাসমূহ, আক্বীদা-বিশ্বাস এবং তাদের পথভ্রষ্ট থেকে মুসলিম সম্প্রদায়কে হেফাযত করেন। কারণ তা সৎকর্মসমূহ নষ্ট করবে, মুমিন ব্যক্তিকে ঈমান শূন্য করবে এবং তাকে ইসলাম থেকে খারিজ করে দেবে। তাঁর নিকট আরও প্রার্থনা করি, তিনি যেন আমাদেরকে সরল-সঠিক পথ প্রদর্শন করেন এবং আমাদেরকে সুস্পষ্ট সত্য বিধানের উপর প্রতিষ্ঠিত রাখেন; আর তিনি যেন আমাদেরকে মুক্তিপ্রাপ্ত সাহায্যপ্রাপ্ত সুস্পষ্ট হকের উপর প্রতিষ্ঠিত দল আহলে সুন্নাত ওয়াল জামা‘আতের আক্বীদা-বিশ্বাসের উপর সুদৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠিত রাখেন। তাঁর নিকট আরও প্রার্থনা করি, তিনি যেন আমাদেরকে এমন কথা, কাজ, নিয়ত ও হেদায়াত অর্জনের তাওফীক্ব দান করেন, যা তিনি ভালবাসেন এবং পসন্দ করেন। আর তিনি সকল বস্তুর উপর ক্ষমতাবান।
[পরিমার্জিত ও সংক্ষেপায়িত]
* ভাইস প্রিন্সিপ্যাল, গাজিমোড়া আলিয়া মাদরাসা, লাকসাম, কুমিল্লা ।
তথ্যসূত্র :
[১]. উছূলুল কাফী, পৃ. ৪৮২।
[২]. প্রাগুক্ত, পৃ. ৪৮৪।
[৩]. প্রাগুক্ত, পৃ. ৪৮৩।
[৪]. প্রাগুক্ত, পৃ. ৪৮২।
[৫]. প্রাগুক্ত, পৃ. ৪৮৪।
[৬]. প্রাগুক্ত, পৃ. ৪৮৫।
[৭]. মোল্লা ফাৎহুল্লাহ আল-কাশানী, তাফসীরু মানহাজিছ ছাদেক্বীন, পৃ. ৩৫৬।
[৮]. প্রাগুক্ত।
[৯]. তাফসীরু মানহাজিছ ছাদেক্বীন, পৃ. ৩৫৬।
[১০]. ছহীহ মুসলিম, হা/১৪০৬; ইবনু মাজাহ, হা/১৯৬২।
[১১]. ছহীহ মুসলিম, হা/১৪০৬; ছহীহ ইবনু হিব্বান, হা/৪১৫০।
[১২]. আবূ জা‘ফর মুহাম্মাদ ইবনু হাসান আত-তূসী, আল-ইসতিবছার, ৩য় খণ্ড, পৃ. ১৩৬; মুহাম্মাদ ছাক্বর, আশ-শী‘আতু হুমুল ‘আদুউঊ ফাহযারহুম, পৃ. ২৯; আশ-শী‘আতু ওয়াল মুতা‘আ, পৃ. ১০৭; আক্বীদাতুশ শী‘আতি ওয়া তারিখিহিম আসওয়াদি, পৃ. ১০।
[১৩]. আল-ইসতিবছার, ৩য় খণ্ড, পৃ. ১৩৬; ফুরূঊল কাফী, ২য় খণ্ড, পৃ. ২০০; আশ-শী‘আতু হুমুল ‘আদুউঊ ফাহযারহুম, পৃ. ২৯; আশ-শী‘আতু ওয়াল মুতা‘আ, পৃ. ১০৭; আক্বীদাতুশ শী‘আতি ওয়া তারিখিহিম আসওয়াদি, পৃ. ১৫৫।
[১৪]. আল-ইসতিবছার, ৩য় খণ্ড, পৃ. ২৪৩।
[১৫]. আবূ দাঊদ, হা/৩৯০৪; তিরমিযী, হা/১৩৫; ইবনু মাজাহ, হা/৬৩৯; মিশকাত, হা/৫৫১, সনদ ছহীহ।
[১৬]. আবূ দাঊদ, হা/২১৬২; মুসনাদে আহমাদ, হা/৯৭৩১; মিশকাত, হা/৩১৯৩, সনদ ছহীহ।
প্রসঙ্গসমূহ »:
ভ্রান্ত মতবাদ