শনিবার, ০৭ মার্চ ২০২৬, ০২:০৯ অপরাহ্ন

ইসলামিক প্যারেন্টিং 

-তিনা খান* 


(শেষ কিস্তি)  

অপরাধীর জন্য দু‘আ করা

রাসূল (ﷺ)-এর কাছে এক মদ্যপায়ীকে হাযির করা হলো। নবী (ﷺ) বললেন, ‘তাকে বেত্রাঘাত কর’। এতদ্‌শ্রবণে কিছু লোক বলে উঠল, ‘আল্লাহ তোমাকে অপমান করুন’। নবী (ﷺ) ইরশাদ করলেন, ‘তোমরা এভাবে বলে শয়তানকে সাহায্য কর না; বরং তার জন্য দু‘আ কর: হে আল্লাহ! তাকে ক্ষমা করে দিন। তার প্রতি রহম করুন’।[১] প্রিয় অভিভাবক! মদ্যপকে হদ প্রয়োগের সময়ও বদদু‘আ করা থেকে বিরত থাকতে হয়। তাহলে আমাদের সন্তানেরা এরচেয়ে বহু লঘু অপরাধে জড়িত হলে তাদের জন্য কি বদদু’আ করা যাবে?! তাই আমাদের কর্তব্য হবে অপরাধী অধীনস্থদের জন্য দু‘আ করা এবং বদদু‘আ করা থেকে বিরত থাকা।

শাস্তি প্রদানে শারঈ নীতিমালার প্রতি লক্ষ্য রাখুন!

শাইখুল ইসলাম ইমাম ইবনু তাইমিয়া (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন, ‘কারও এ অধিকার নেই যে, অপরাধ ব্যতীত সন্তানকে শাস্তি দেবে। কোন সীমালঙ্ঘন ছাড়াই তাকে মারপিট করবে। কোন হক নষ্ট ছাড়াই তার প্রতি শাসনের ছড়ি ওঠাবে। তবে সে অপরাধ করলে কেবল শরী‘আত কর্তৃক অনুমোদিত পন্থায় তাকে শাস্তি দিতে পারবে। কোন শিক্ষক, পিতামাতা ও মুরব্বির এ অধিকার নেই যে, যথেচ্ছা শাস্তি দেবে। এ ব্যাপারে কারও সহযোগিতারও সুযোগ নেই’।[২]

ভারসাম্য বজায় রাখুন!

সন্তান কিংবা ছাত্রের প্রতি সীমাতিরিক্ত কঠোরতা করলে অভিভাবক থেকে তারা বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। আবার বেশি উপদেশ দিতে গেলে তারা বিরক্ত হয়ে দূরে সরে যায়। অতএব এ ক্ষেত্রে ভারসাম্য বজায় রাখা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। অন্যথা লাগাম হাত থেকে ফসকে যাবে। তখন আফসোস করে কোন লাভ হবে না।

পদস্খলনের কথা বার বার বলা থেকে বিরত থাকুন!

‘তুমি যে কী করেছিলে আমি কিন্তু ভুলিনি’- এ জাতীয় কথা বলা থেকে বিরত থাকুন। পূর্বের পদস্খলন মনে করিয়ে দেয়া কাটা ঘায়ে নুনের ছিটা দেয়ার নামান্তর। এতে তাদের দিলের পুরানো জখম তাজা হয়ে ওঠে। যার ফলে অধীনস্থরা মুরুব্বিদের প্রতি ভক্তিশ্রদ্ধা হারিয়ে ফেলে।

বাচ্চাদের গল্প শোনান/বড়দের জীবনী পড়তে দিন

বিখ্যাত সাহিত্যিক আলী তানতাবী (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন, ‘আমার বুঝে আসে না কেন শিক্ষক/প্রশিক্ষক প্রত্যেক শিশুর অন্তরে স্থির আকর্ষণকে কাজে লাগাতে পারে না? এমতাবস্থায় তাদের করণীয় হলো নিজেদের দরস ও উপদেশগুলো গল্পাকারে বাচ্চাদের সামনে উপস্থাপন করবে। তখন ছাত্রছাত্রী এবং ছেলেমেয়েদের এই প্রবণতা কাজে লাগবে। নাস্তিকতার বীজ বপনকারী গল্পকারদের ময়দানকে মিসমার করে দেবে। ফলে তারা ছড়াতে পারবে না চরিত্র-বিনাশী কোন উপন্যাস ও গল্প’।[৩]

সন্তানের চরিত্র উন্নত করতে হলে আদর্শ ব্যক্তিদের জীবনী পড়ার কোন বিকল্প নেই। এতে রয়েছে কল্যাণের বহু উপাদান। সালাফে ছালেহীনের জীবনীর বাঁকেবাঁকে রয়েছে শিক্ষণীয় নানা উপকরণ। কারণ, পৃথিবী গ্রহণ করেছে তাদের থেকে অজস্র মণিমুক্তা। আঁজলা ভরেছে কোটি কোটি হিরা-জহরত। তাদের আভায় ফুটেছে হাজারো মুকুল। আলোকিত হয়েছে এ বিশ্ব চরাচর। স্নাত হয়েছে চারিধার। ইমাম আবু হানীফা (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন, ‘আমার কাছে ফিকহের চেয়ে মনীষীদের জীবনী অধিক প্রিয়’।

লজ্জা-শরম শিক্ষা দেয়া

নবী করীম (ﷺ) লজ্জা-শরমকে ঈমানের অঙ্গ হিসাবে উল্লেখ করেছেন।[৪] নিঃসন্দেহে লজ্জা মানুষের চরিত্রের অন্যতম ভূষণ এবং মানুষকে লজ্জা বহুবিধ গর্হিত কর্ম থেকে বিরত রাখে। পিতা-মাতা বা অভিভাবকগণ পরিবারের ছোট সদস্যদের লজ্জা-শরমের ব্যাপারে শিক্ষা দেবেন এবং তাদের মন-মস্তিষ্কে এ কথা দৃঢ়ভাবে প্রোথিত করে দেবেন যে, ‘সব থেকে বেশি লজ্জা করতে হবে মহান আল্লাহকে। তাঁকে কেউ দেখতে পায় না, কিন্তু তিনি সকলকেই দেখছেন । এ কারণে তাঁকেই সব থেকে বেশি লজ্জা করতে হবে’। হাদীছে এসেছে,

عَنْ عَبْدِ اللهِ بْنِ مَسْعُوْدٍ قَالَ قَالَ رَسُوْلُ اللهِ ﷺ اسْتَحْيُوْا مِنَ اللهِ حَقَّ الْحَيَاءِ. قَالَ قُلْنَا يَا رَسُوْلَ اللهِ إِنَّا لَنَسْتَحْيِى وَالْحَمْدُ لِلهِ. قَالَ: لَيْسَ ذَاكَ وَلَكِنَّ الاِسْتِحْيَاءَ مِنَ اللهِ حَقَّ الْحَيَاءِ أَنْ تَحْفَظَ الرَّأْسَ وَمَا وَعَى وَتَحْفَظَ الْبَطْنَ وَمَا حَوَى وَتَتَذَكَّرَ الْمَوْتَ وَالْبِلَى وَمَنْ أَرَادَ الآخِرَةَ تَرَكَ زِينَةَ الدُّنْيَا فَمَنْ فَعَلَ ذَلِكَ فَقَدِ اسْتَحْيَا مِنَ اللهِ حَقَّ الْحَيَاءِ

আব্দুল্লাহ ইবনু মাসঊদ (রাযিয়াল্লাহু আনহুমা) বলেন, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) এরশাদ করেন, তোমরা আল্লাহকে লজ্জা কর সত্যিকারের লজ্জা। আমরা বললাম, হে আল্লাহর রাসূল (ﷺ)! আমরা অবশ্যই আল্লাহকে লজ্জা করি- আলহামদুলিল্লাহ। তিনি বললেন, কথা সেটা নয়। বরং আল্লাহকে যথার্থভাবে লজ্জা করার অর্থ এই যে, (১) তুমি তোমার মাথা ও যেগুলোকে সে জমা করে, তার হেফাযত কর। (২) তুমি তোমার পেট ও যেগুলোকে সে জমা করে, তার হেফাযত কর। (৩) আর তোমার বারবার স্মরণ করা উচিত মৃত্যুকে ও তার পরে পচে-গলে যাওয়াকে। (৪) আর যে ব্যক্তি আখেরাত কামনা করে, সে যেন পার্থিব বিলাসিতা পরিহার করে। যে ব্যক্তি উপরিউক্ত কাজগুলো করে, সে ব্যক্তি সত্যিকার অর্থে আল্লাহকে লজ্জা করে’।[৫]

অতএব সন্তান-সন্ততিদেরকে যদি মহান আল্লাহকে লজ্জা করতে শেখানো হয়, তাহলে তাদের দ্বারা গর্হিত কর্ম সংঘটিত হবার সম্ভাবনা থাকবে না। লজ্জাশীলতা মানুষের জন্য কেবল কল্যাণই বয়ে আনে। হাদীসে উল্লেখ করা হয়েছে, ইমরান ইবনু হুসাইন (রাযিয়াল্লাহু আনহু) হতে বর্ণিত, নবী করীম (ﷺ) বলেছেন, اَلْحَيَاءُ لَا يَأْتِى إِلَّا بِخَيْرٍ ‘লজ্জাশীলতা কেবল কল্যাণই বয়ে আন’।[৬]

নৈতিক চরিত্র অটুট রাখার জন্য লজ্জা এক দূর্গ বিশেষ । যে মানুষের লজ্জা-শরম রয়েছে, তার চরিত্রের দূর্গ চিরদিন দুর্ভেদ্যই থাকবে । কারো পক্ষেই সম্ভব হবে না তা ভেদ করে চরিত্রে কলুষ ঢুকিয়ে দেয়া। লজ্জা মানুষকে সকল প্রকার গর্হিত ও মানবতা-বিরোধী কাজ পরিহার করতে এবং তা থেকে পরিপূর্ণভাবে বিরত থাকতে উদ্বুদ্ধ করে। মানুষের কাজে-কর্মে, চলায়-বলায়, জীবনের সব স্তরে ও সকল ব্যাপারেই লজ্জা হচ্ছে এক অতি প্রয়োজনীয় গুণ। এ গুণই মানুষে ও পশুতে পার্থক্যের ভিত্তি। এ গুণ না থাকলে মানুষে ও পশুতে কোন পার্থক্য থাকে না । কার্যত মানুষ পশুর স্তরে নেমে যায়। পশুর অনুরূপ নির্লজ্জ হয়ে কাজ করতে শুরু করে। হাদীসে এ লজ্জাহীনতার মারাত্মক পরিণতি সম্পর্কে বলা হয়েছে, আবূ মাসঊদ (রাযিয়াল্লাহু আনহু) হতে বর্ণিত, নবী করীম (ﷺ) বলেছেন,

إِنَّ مِمَّا أَدْرَكَ النَّاسُ مِنْ كَلاَمِ النُّبُوَّةِ ، إِذَا لَمْ تَسْتَحِى فَافْعَلْ مَا شِئْتَ

‘নবুয়তের প্রথম থেকে যে কথা মানুষের কাছে পৌঁছেছিল তা হলো, যদি তোমার লজ্জা না থাকে তা হলে যা ইচ্ছা তাই কর’।[৭] আবূ হুরায়রা (রাযিয়াল্লাহু আনহু) হতে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেন, الْحَيَاءُ مِنَ الإِيمَانِ وَالإِيمَانُ فِى الْجَنَّةِ وَالْبَذَاءُ مِنَ الْجَفَاءِ وَالْجَفَاءُ فِى النَّارِ ‘লজ্জা-শরম একান্তই ঈমানের ব্যাপার, আর ঈমান জান্নাতে প্রবেশের চাবিকাঠি। পক্ষান্তরে, লজ্জাহীনতা হচ্ছে যুল্ম, আর যুল্মের কারণেই একজনকে জাহান্নামে যেতে হয়’।[৮] আব্দুল্লাহ ইবনে উমার (রাযিয়াল্লাহু আনহুমা) হতে বর্ণিত,

مَرَّ النَّبِىُّ عَلَى رَجُلٍ وَهْوَ يُعَاتَبُ فِى الْحَيَاءِ يَقُوْلُ إِنَّكَ لَتَسْتَحْيِى. حَتَّى كَأَنَّهُ يَقُوْلُ قَدْ أَضَرَّ بِكَ. فَقَالَ رَسُوْلُ اللهِ «دَعْهُ فَإِنَّ الْحَيَاءَ مِنَ الإِيْمَانِ».


‘নবী করীম (ﷺ) একজন লোকের পাশ দিয়ে যাচ্ছিলেন, লোকটি লজ্জা সম্পর্কে তার (ছোট) ভাইকে তিরস্কার করে বলছিল, তুমি খুবই লাজুক, এতে তোমার অনেক ক্ষতি হবে। তখন রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বললেন, তাকে ছেড়ে দাও। কেননা লজ্জা ঈমানের অংশ’।[৯] আব্দুুল্লাহ ইবনে উমার (রাযিয়াল্লাহু আনহুমা) বলেন, إِنَّ الْحَيَاءَ وَالْإِيمَانَ قُرِنَا جَمِيعًا فَإِذَا رُفِعَ أَحَدُهُمَا رُفِعَ الْآخَرُ ‘লজ্জাশীলতা ও ঈমান একই প্রকৃতির, এদের একটি তুলে নেয়া হলে অন্যটি এমনিতেই দূরীভূত হয়ে যায়’।[১০]

আল্লাহভীরু জীবনসাঙ্গি নির্বাচন

সন্তানকে সৎভাবে গড়ে তুলতে আল্লাহভীরু জীবনসঙ্গীর ভূমিকা অপরিসীম। নেককার মা ছাড়া নেককার সন্তান আশা করা সম্ভব না, যদিও কেউ কেউ বড় বড় ডিগ্রি অর্জনকারী হয়। তাই পাত্রী নির্বাচনের ক্ষেত্রে গুরুত্বের সাথে সিদ্ধান্ত নিতে হবে। বিয়ে করতে হবে- এ সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত হবার পর পাত্র বা পাত্রী নির্বাচনের ক্ষেত্রে আল্লাহভীরু পুরুষদেরকে যে নির্দেশনা দান করা হয়েছে তা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। নবী করীম (ﷺ) দিকনির্দেশনা দিয়েছেন, تُنْكَحُ الْمَرْأَةُ لأَرْبَعٍ لِمَالِهَا وَلِحَسَبِهَا وَجَمَالِهَا وَلِدِينِهَا ، فَاظْفَرْ بِذَاتِ الدِّينِ تَرِبَتْ يَدَاكَ ‘চারটি বিষয়ের প্রতি লক্ষ্য রেখে মেয়েদেরকে বিয়ে করা হয়। যথা: তার সম্পদ, তার বংশমর্যাদা, তার সৌন্দর্য ও তার দ্বীনদারী। সুতরাং তুমি দ্বীনদারীকেই প্রাধান্য দেবে নতুবা তুমি ক্ষতিগ্রস্ত হবে’।[১১]

সুধী পাঠক! রাসূল (ﷺ)-এর এ নির্দেশ কেবল মুমিন পুরুষদের ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য নয়- মুমিন নারীদের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। একজন মুমিন মেয়ে বিয়ের বন্ধনে আবদ্ধ হবার পূর্বে তার জীবনসাথীর সার্বিক অবস্থা এবং পুরুষটি মহান আল্লাহর বিধান অনুসরণে কতটা একনিষ্ঠ তা ভিন্ন কারো মাধ্যমে অবশ্যই জেনে নেবে। কেননা, এটি তার মৌলিক অধিকার। এছাড়া বিয়ে বন্ধনে আবদ্ধ হবার ক্ষেত্রে আরেকটি মৌলিক দিক-নির্দেশনা হল- ‘কুফু’, যার অর্থ হচ্ছে সমতা ও সাদৃশ্য। অর্থাৎ বিয়ের পাত্র-পাত্রীর সমান সমান হওয়া, একজনের সাথে আরেকজনের সামঞ্জস্যতা। উভয়ের মধ্যে যদি সমতা-সাদৃশ্য ও সামঞ্জস্যতা না থাকে, তা হলে পারিবারিক জীবনে অশাস্তি দেখা দেবে এবং পরিশেষে তা ভাঙনের দিকে গড়াবে। এ কথা অবশ্যই সত্য যে, মুসলিমগণ পরস্পরে বিয়ের বন্ধনে আবদ্ধ হতে পারে এবং এতে কেউ বাধার সৃষ্টি করতে পারে না। কিন্তু সেটি কোন্ মুসলিম? বর্তমানে অধিকাংশ মুসলিম নিজেদেরকে যে অর্থে ‘মুসলিম’ হিসাবে দাবি করে সেই মুসলিম অবশ্যই নয়।

‘মুসলিমগণ পরস্পর ভাই ভাই’- ইসলামের এ বিধানটি সেই মুসলিমদের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য, যে মুসলিমগণ প্রকৃত অর্থেই মহান আল্লাহর বিধানের প্রতি আত্মসমর্পণকারী এবং ইসলামের বিধান অনুসরণে একনিষ্ঠ। নিজেকে মুসলিম হিসাবে দাবি করছে, কিন্তু বাস্তব জীবনে আল্লাহর বিধান পরিত্যাগ করে ভিন্ন কোন বিধান অনুসরণ করছে, ইচ্ছাকৃতভাবে কুরআন-সুন্নাহর বিধান লঙ্ঘন করছে এবং ক্ষেত্রবিশেষে আল্লাহর বিধানের বিরোধিতাও করছে। এ প্রকৃতির কোন পুরুষের সাথে যেমন একজন মুমিন নারী বিয়ে বন্ধনে আবদ্ধ হতে পারে না, তেমনি এ স্বভাব-প্রকৃতির কোন নারীর সাথেও কোন মুমিন পুরুষ বিয়ে করতে পারে না। স্পষ্টতই আল্লাহর বিধান অমান্যকারী কোন নারী-পুরুষের সাথে এমন নারী-পুরুষের বিয়ে দেয়া যেতে পারে না, যে নারী-পুরুষ একনিষ্ঠভাবে মহান আল্লাহর বিধান অনুসরণ করে। মহান আল্লাহর নির্দেশ হচ্ছে,

اَلزَّانِيْ لَا يَنْكِحُ اِلَّا زَانِيَةً اَوْ مُشْرِكَةً١ٞ وَّ الزَّانِيَةُ لَا يَنْكِحُهَاۤ اِلَّا زَانٍ اَوْ مُشْرِكٌ١ۚ وَ حُرِّمَ ذٰلِكَ عَلَى الْمُؤْمِنِيْنَ.


‘ব্যভিচারী ব্যভিচারিণী অথবা মুশরিক নারীকে ব্যতীত বিয়ে কর না এবং ব্যভিচারিণী তাকে ব্যভিচারী অথবা মুশরিক ব্যতীত কেউ বিয়ে করে না, মুমিনদের জন্য এটা হারাম করা হয়েছে’ (সূরা আন-নূর: ৩)। আবার যে সকল নারী-পুরুষ ইসলামের বিধান অনুসরণে একনিষ্ঠ, আর যে সকল নারী-পুরুষ আল্লাহর বিধান অনুসরণে আন্তরিক নয়, পার্থিব স্বার্থে এবং নিজের কামনা-বাসনা চরিতার্থ করার জন্য কুরআন-হাদীছের নির্দেশ অমান্য করে, এ ফাসিক প্রকৃতির নারী-পুরুষের সাথে মুমিন নারী-পুরুষের বিয়ে দেয়া উচিত নয়। কেননা, এদের মধ্যেও সমতা নেই। কুরআন বলছে, اَفَمَنْ كَانَ مُؤْمِنًا كَمَنْ كَانَ فَاسِقًا١ؔؕ لَا يَسْتَوٗنَؐ ‘ঈমানদার ব্যক্তি কি অবাধ্যের অনুরূপ? তারা সমান নয়’ (সূরা আস-সাজদা: ১৮)।

জীবনের ক্ষুদ্র একটি অংশে ইসলামের অনুসারী এবং বৃহত্তর অংশে ভিন্ন মতবাদের অনুসারী, মুমিন নারী-পুরুষ এমন কারো সাথে অবশ্যই বিয়ের বন্ধনে আবদ্ধ হবে না, মুমিন কেবল মুমিনের সাথেই বিয়ের বন্ধনে আবদ্ধ হবে। সমতার দিক থেকে এটিই হচ্ছে মুখ্য। অন্যান্য দিকের মধ্যে রয়েছে শিক্ষা, বংশীয় আভিজাত্য, দানশীলতা, দৈনন্দিন স্বভাব-প্রকৃতি, আচরণ-ব্যবহারে নমনীয়তা, মিষ্টভাষী, উন্নত রুচি ও সৌজন্যতাবোধ, শিষ্টাচার, আত্মীয়স্বজনের অধিকার প্রদানে উদারতা, বয়স্কদের প্রতি সম্মান প্রদর্শন, ছোটদের প্রতি স্নেহ-মমতা পোষণ এবং সামাজিকতা রক্ষার মনোভাব ইত্যাদি বিষয়সমূহ এসব দিকে উভয়ের মধ্যে কমবেশি সামঞ্জশ্য-সাদৃশ্যতা না থাকলে পারিবারিক জীবনে অশান্তি দেখা দেয়। এসব দিক দেখে জীবনসাথী নির্বাচন করলে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম আল্লাহভীরু ও শিষ্টাচারসম্পন্ন হবে বলে আশা করা যায়।

সুতরাং জীবনসাথী হিসাবে যাকে নির্বাচন করা হচ্ছে, সে বিখ্যাত কোন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে শিক্ষা গ্রহণ করেছে এ দিকটিকে প্রাধান্য না দিয়ে সে কোন্ পরিবারের স্নেহ-মমতায় বড় হয়েছে, সেদিকটি প্রাধান্য দেয়া প্রয়োজন। পাশাপাশি দ্বীনকেও প্রাধান্য দেয়া আবশ্যক।

উপসংহার

পরিশেষ বলতে চাই, ‘ইসলামিক প্যারেন্টিং’ শীর্ষক আলোচ্য প্রবন্ধটির মধ্যে সন্তান প্রতিপালনের ক্ষেত্রে খুঁটিনাটি সকল বিষয়কে অন্তর্ভুক্ত করার প্রচেষ্টা করা হয়েছে। যদিও উত্তম প্যারেন্টিংয়ের ক্ষেত্রে আরো অসংখ্য ব্যবস্থাপত্র রয়েছে। তবে এ প্রবন্ধে উল্লিখিত বিষয়গুলো সর্বাগ্রে মূল্যায়ন করলে আশা করা যায় যে, একদিকে উক্ত ব্যবস্থাপত্র দ্বীনদার, সুসন্তান ও সুনাগরিক হিসাবে গড়ে তুলতে সহায়তা করবে, অন্যদিকে পিতা-মাতা অভিভাবক হিসাবে তাদের দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে উপযুক্ত ব্যবস্থাপত্র পেয়ে অত্যন্ত কঠিন এ যাত্রাপথে কিছুটা কষ্ট লাঘব হবে ইনশাআল্লাহ। আল্লাহ তা‘আলা প্রত্যেক পিতা-মাতাকে তাদের সন্তান-সন্ততি লালন-পালনের ক্ষেত্রে ইসলামিক রীতি-নীতি ও আদর্শের দিকটা প্রাধান্য দেয়ার তাওফীক্ব দান করুন। আমীন!


* মাদারটেক, ঢাকা।

তথ্যসূত্র :
[১]. আবূ দাঊদ, হা/৪৪৭৭, সনদ ছহীহ।
[২]. মাজমূঊল ফাতাওয়া, ২৮শ খণ্ড, পৃ. ১৪।
[৩]. হিকায়াতুম মিনাত তারীখ।
[৪]. ছহীহ বুখারী, হা/৯; ছহীহ মুসলিম, হা/৩৫; আবূ দাঊদ, হা/৪৬৭৬।
[৫]. মুসনাদে আহমাদ, হা/৩৬৭১; তিরমিযী, হা/২৪৫৮, মিশকাত, হা/১৬০৮, সনদ হাসান ‘জানায়েয’ অধ্যায় ‘মৃত্যু কামনা’ অনুচ্ছেদ।
[৬]. ছহীহ বুুখারী, হা/৬১১৭; ছহীহ মুসলিম, হা/৩৭।
[৭]. ছহীহ বুখারী, হা/৩৪৮৩, ৬১২০।
[৮]. তিরমিযী, হা/২০০৯; ইবনু মাজাহ, হা/৪৩২৪, সনদ ছহীহ।
[৯]. ছহীহ বুখারী, হা/৬১১৮।
[১০]. আল-আদাবুল মুফরাদ, হা/১৩১৩।
[১১]. ছহীহ বুখারী, হা/৫০৯০; ছহীহ মুসলিম, হা/১৪৬৬।




প্রসঙ্গসমূহ »: পরিবার নারীমঞ্চ
প্রশ্নোত্তরে মুসলিম নারীদের ইসলাম শিক্ষা (৩য় কিস্তি) - আব্দুল গাফফার মাদানী
ইসলামে ব্যবসা-বাণিজ্যের রূপরেখা - গুলশান আখতার
শারঈ পর্দা : একটি পর্যালোচনা (৬ষ্ঠ কিস্তি) - ওবাইদুল্লাহ আল-আমীন
শারঈ পর্দা : একটি পর্যালোচনা (৯ম কিস্তি) - ওবাইদুল্লাহ আল-আমীন
স্ত্রীর প্রতি স্বামীর দায়িত্ব ও কর্তব্য (২য় কিস্তি) - তামান্না তাসনীম
ইসলামিক প্যারেন্টিং (শেষ কিস্তি) - তিনা খান
আল-কুরআনে নারী কেন্দ্রিক আলোচনা ও শিক্ষনীয় বিষয়সমূহ - ওবাইদুল্লাহ আল-আমীন
সুন্নাহ প্রতিষ্ঠায় নারী সমাজের ভূমিকা - আল-ইখলাছ ডেস্ক
প্রশ্নোত্তরে নারীদের ছালাত শিক্ষা (৩য় কিস্তি) - আব্দুল গাফফার মাদানী
প্রশ্নোত্তরে মুসলিম নারীদের ইসলাম শিক্ষা (৪র্থ কিস্তি) - আব্দুল গাফফার মাদানী
স্ত্রীর প্রতি স্বামীর দায়িত্ব ও কর্তব্য (শেষ কিস্তি) - তামান্না তাসনীম
ইসলামিক প্যারেন্টিং (৩য় কিস্তি) - তিনা খান

সর্বশেষ প্রবন্ধ

ফেসবুক পেজ