শুক্রবার, ০৫ Jun ২০২৬, ০১:২৯ পূর্বাহ্ন

প্রশ্নোত্তরে নারীদের জানাযা শিক্ষা

- শায়খ আব্দুল গাফফার মাদানী*


(পূর্ব প্রকাশিতের পর)

প্রশ্ন : স্বামী-স্ত্রী পরস্পরে মৃত স্ত্রী বা স্বামীকে গোসল দিতে পারবে কি?
উত্তর : স্বামী তার মৃত স্ত্রীকে বা স্ত্রী তার মৃত স্বামীকে গোসল দিতে পারেন যদি তাদের ধৈর্য থাকে।[১] রাসূল (ﷺ) স্বীয় স্ত্রী আয়েশা (রাযিয়াল্লাহু আনহা)-কে বলেছিলেন, ‘যদি আমার পূর্বে তুমি মারা যাও, তাহলে আমি তোমাকে গোসল দেব, কাফন পরাব, জানাযা পড়াব ও দাফন করব’। হাদীছটি নিম্নরূপ:

عَنْ عَائِشَةَ قَالَتْ رَجَعَ رَسُوْلُ اللهِ ﷺ مِنْ الْبَقِيْعِ فَوَجَدَنِيْ وَأَنَا أَجِدُ صُدَاعًا فِيْ رَأْسِيْ وَأَنَا أَقُوْلُ وَا رَأْسَاهُ فَقَالَ بَلْ أَنَا يَا عَائِشَةُ وَا رَأْسَاهُ ثُمَّ قَالَ مَا ضَرَّكِ لَوْ مِتِّ قَبْلِيْ فَقُمْتُ عَلَيْكِ فَغَسَّلْتُكِ وَكَفَّنْتُكِ وَصَلَّيْتُ عَلَيْكِ وَدَفَنْتُكِ

আয়েশা (রাযিয়াল্লাহু আনহা) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বাকী থেকে ফিরে এসে আমাকে মাথা ব্যথায় যন্ত্রণাকাতর অবস্থায় পেলেন। তখন আমি বলছিলাম, হে আমার মাথা! তিনি বলেন, হে আয়েশা! আমিও মাথা ব্যথায় ভুগছি। হে আমার মাথা! অতঃপর তিনি বলেন, তুমি যদি আমার পূর্বে মারা যেতে, তাহলে তোমার কোন ক্ষতি হত না। কেননা আমি তোমাকে গোসল করাতাম, কাফন পরাতাম, তোমার জানাযার ছালাত পড়তাম এবং তোমাকে দাফন করতাম।[২]

وَكَانَتْ عَائِشَةُ تَقُوْلُ: لَوْ اسْتَقْبَلْتُ مِنْ أَمْرِي مَا اسْتَدْبَرْتُ، مَا غَسَلَهُ إِلَّا نِسَاؤُهُ

আয়েশা (রাযিয়াল্লাহু আনহা) বলেন, ‘আমি যদি আগে বুঝতে পারতাম যা পরে বুঝতে পেরেছি তাহলে তাঁর (রাসূলের) স্ত্রীরাই তাঁর গোসল দিত’।[৩] ইসলামের প্রথম খলীফা আবূবকর (রাযিয়াল্লাহু আনহু)-কে তাঁর স্ত্রী আসমা বিনতে উমাইস (রাযিয়াল্লাহু আনহা) এবং ফাতেমা (রাযিয়াল্লাহু আনহা)-কে তার স্বামী আলী (রাযিয়াল্লাহু আনহু) গোসল দিয়েছিলেন।[৪] উল্লেখ্য যে, স্বামী বা স্ত্রী মারা যাওয়ার পর তাদের সম্পর্ক ছিন্ন হয়ে যায়। তারা একে অপরকে দেখতে পারবে না, গোসল দিতে পারবে না ইত্যাদি কথাগুলো ভিত্তিহীন, মনগড়া মাত্র ও সমাজে প্রচলিত কুসংস্কার ব্যতীত কিছুই নয়।

প্রশ্ন: কোন পুরুষ মানুষ যদি এমন স্থানে মারা যায় যেখানে এক অপরিচিত নারী ছাড়া কেউ নেই। তাহলে সে নারী কি ঐ পুরুষের গোসল দিতে পারবে?
উত্তর : এ বিষয়ে ইসলামী স্কলারদের অভিমত রয়েছে। প্রথমতঃ যেহেতু শরী‘আতের দৃষ্টিতে গোসল দিতে অক্ষম সেহেতু তায়াম্মুম করিয়ে দিতে হবে।[৫] দ্বিতীয়তঃ হ্যাঁ, কোন পুরুষ মারা গেলে এবং কাছাকাছি কোন পুরুষ না থাকলে, একজন নারী মৃতদেহটিকে গোসল করাতে পারবে। তবে এক্ষেত্রে কিছু নিয়ম মানতে হবে। যেমন মৃতদেহের গোপনাঙ্গ হাতে একটি কাপড় জড়িয়ে ধুয়ে ফেলা এবং গোসলের সময় যতটা সম্ভব গোপনাঙ্গ ঢেকে রাখা।[৬]

প্রশ্ন: বাবা কি তার মেয়েকে গোসল দিতে পারবে?
উত্তর : যদি কোন মহিলা পাওয়া যায় তাহলে তার বাবার জন্য গোসল দেয়া জায়েয নেই। কেননা উম্মে আতিয়া (রাযিয়াল্লাহু আনহা) রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর জীবদ্দশায় তার মেয়েকে গোসল দিয়েছিলেন।[৭] পক্ষান্তরে যদি কোন মহিলা না পাওয়া যায় তখন তার বাবার জন্য গোসল দেয়াতে কোন বাধা নেই। কেননা এ বিষয়ে সালাফদের থেকে কিছু বর্ণনা পাওয়া যায় যে, তারা তাদের মেয়েকে গোসল দিয়েছেন যেমন আবূ কালাবা তার মেয়েকে গোসল দিয়েছেন।[৮] আল্লাহই অধিক জ্ঞাত।

প্রশ্ন: মৃত মহিলাকে গোসল দেয়ার পদ্ধতি কি?
উত্তর: মৃত নারীকে গোসল করানোর পদ্ধতি নিম্নরূপ: (ক) প্রথমে গোসলের স্থান নির্ধারণ করে সেটা পর্দাবৃত করবে। (খ) শরীরে থাকা কাপড় খুলে ফেলবে, তবে সতরের অঙ্গগুলো (নাভি থেকে হাঁটু পর্যন্ত) কোন কাপড় দ্বারা ঢেকে রাখবে। হাদীছে বলা হয়েছে, كَمَا نُجَرِّدُ مَوْتَانَا ‘যেমন আমরা আমাদের অন্যান্য মৃত ব্যক্তির কাপড় খুলে ফেলি’।[৯] (গ) সতরের অঙ্গগুলো (নাভি থেকে হাঁটু পর্যন্ত) কোন কাপড় দ্বারা ঢেকে রাখবে। আবূ সাঈদ আল-খুদরী (রাযিয়াল্লাহু আনহু) হতে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেন,

قَالَ‏ لَا يَنْظُرُ الرَّجُلُ إِلَى عَوْرَةِ الرَّجُلِ وَلَا الْمَرْأَةُ إِلَى عَوْرَةِ الْمَرْأَةِ

‘কোন পুরুষ অপর পুরুষের লজ্জাস্থানের দিকে তাকাবে না এবং কোন মহিলা অপর মহিলার লজ্জাস্থানের দিকে তাকাবে না।[১০] গোসলের দায়িত্বে থাকা নারীরাও সতরের অঙ্গগুলো খোলার সময় দৃষ্টি অবনত রাখবে। (ঘ) গোসল করানোর পূর্বে ওযূর অঙ্গগুলো ধৌত করবে। উম্মু আতিয়্যাহ (রাযিয়াল্লাহু আনহা) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আল্লাহর রাসূল (ﷺ) তাঁর কন্যার গোসলের ব্যাপারে ইরশাদ করেন, ابْدَأْنَ بِمَيَامِنِهَا وَمَوَاضِعِ الْوُضُوءِ مِنْهَا ‘তোমরা তাঁর ডান দিক হতে এবং ওযূর অঙ্গসমূহ হতে শুরু করবে’।[১১] (ঙ) বরই পাতা মিশ্রিত পানির ব্যবস্থা করবে। উম্মু আতিয়্যাহ আল-আনছারী (রাযিয়াল্লাহু আনহা) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন,

دَخَلَ عَلَيْنَا رَسُوْلُ اللهِ ﷺ حِيْنَ تُوُفِّيَتْ ابْنَتُهُ فَقَالَ اغْسِلْنَهَا ثَلَاثًا أَوْ خَمْسًا أَوْ أَكْثَرَ مِنْ ذَلِكَ إِنْ رَأَيْتُنَّ ذَلِكَ بِمَاءٍ وَسِدْرٍ وَاجْعَلْنَ فِي الآخِرَةِ كَافُوْرًا أَوْ شَيْئًا مِنْ كَافُوْرٍ

‘আল্লাহর রাসূল (ﷺ)-এর কন্যা যায়নাব (রাযিয়াল্লাহু আনহা) ইন্তিকাল করলে তিনি আমাদের নিকট এসে বললেন, তোমরা তাকে তিনবার বা পাঁচবার বা প্রয়োজন মনে করলে তার চেয়ে অধিকবার বরই পাতাসহ পানি দিয়ে গোসল দাও। শেষবারে কর্পুর বা (তিনি বলেছেন) কিছু কর্পুর ব্যবহার করবে’।[১২] (চ) তা দিয়ে শরীরের ডান পার্শ্ব ধৌত করবে।[১৩] এরপর বাম পার্শ্ব ধৌত করবে। এভাবে তিন বার ধৌত করবে। তবে প্রয়োজন হলে পাঁচ বার বা এরচেয়ে বেশি বার ধৌত করা যাবে। (ছ) এক্ষেত্রে সর্বশেষ বার ধৌত করার সময় কর্পূর (এক ধরনের সুগন্ধি) ব্যবহার করবে।[১৪] (জ) চুলের বেণী খুলে ধুয়ে মুছে আবার বেণী করে দিবে।

عَنْ أُمِّ عَطِيَّةَ أَنَّهُنَّ جَعَلْنَ رَأْسَ بِنْتِ رَسُوْلِ اللهِ ﷺ ثَلَاثَةَ قُرُوْنٍ نَقَضْنَهُ ثُمَّ غَسَلْنَهُ ثُمَّ جَعَلْنَهُ ثَلَاثَةَ قُرُوْنٍ.

উম্মু আতিয়্যাহ (রাযিয়াল্লাহু আনহা) হতে বর্ণিত, নবী (ﷺ)-এর কন্যার মাথার চুল তিনটি বেণী করেছেন। তাঁরা তা খুলেছেন, অতঃপর তা ধুয়ে তিনটি বেনী করেছেন।[১৫] (ঝ) গোসল শেষে মৃত নারীর চুলগুলো তিনভাগে ভাগ করে বেণি বানিয়ে পিঠের দিকে রেখে দিবে। হাদীছে বর্ণিত হয়েছে, فَضَفَرْنَا شَعَرَهَا ثَلَاثَةَ قُرُونٍ وَأَلْقَيْنَاهَا خَلْفَهَا ‘আমরা তাঁর মাথার চুলগুলো তিনটি বেনী করে পিছনের দিকে ছেড়ে দিলাম’।[১৬]

প্রশ্ন: মহিলাদের কয়টি কাপড়ে কাফন দিতে হবে?
উত্তর: মহিলা ও পুরুষের কাফনের কাপড়ে কোন পার্থক্য নেই। উভয়ের কাফন হচ্ছে সমপরিমাণ তিনটি কাপড়। আয়েশা (রাযিয়াল্লাহু আনহা) বলেন, রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-কে কাফন দেয়া হয়েছিল তিনটি ইয়ামনী সাদা সুতী কাপড়ে। যাতে জামা ও পাগড়ী ছিল না।[১৭] উল্লেখ্য, মহিলাদেরকে পাঁচটি কাপড় দিতে হবে বলে যে হাদীছ পেশ করা হয় তা যঈফ।[১৮] ওবায়দুল্লাহ মুবারকপুরী (রাহিমাহুল্লাহ) ইমাম শাওকানী (রাহিমাহুল্লাহ)-এর বক্তব্য উল্লেখ করে বলেন, কাফনের সংখ্যায় কোন নির্ভরযোগ্য হাদীছ নেই একমাত্র আয়েশা (রাযিয়াল্লাহু আনহা) বর্ণিত হাদীছ ব্যতীত। যা বুখারী ও মুসলিমে রয়েছে। কাজেই এর উপর আমল করাই উত্তম।[১৯] আরো উল্লেখ্য যে, পাঁচটি কাপড়ের বিষয়ে বিভিন্ন ফাতাওয়া গ্রন্থে উল্লেখ করা হয়েছে এবং সেটাকে অনেকেই জায়েয বলেছেন। যেমন: ইবনু কুদামা সহ আরো অন্যান্য। পাশাপাশি শাইখ বিন বায (রাহিমাহুল্লাহ) সহ ইবনু উছায়মীন (রাহিমাহুল্লাহ) এ বিষয়ে শিথিলতা অবলম্বন করেছেন।

প্রশ্ন: বিবাহিত নারী মারা গেলে কাফন-দাফনের খরচ কে বহন করবে?
উত্তর: ইসলামী শরী‘আত অনুযায়ী, বিবাহিত নারী মারা গেলে তার কাফন-দাফনের খরচের দায়িত্ব মূলত তার স্বামীর। স্ত্রী যদি নিজের কোন সম্পদ রেখেও যান, তবুও তার দাফন-কাফনের খরচ স্বামীর ওপরই বর্তায়। স্বামী জীবিত থাকলে বা স্ত্রীর ভরণপোষণের দায়িত্বে থাকলে, এই খরচ স্বামীকেই বহন করতে হবে। আর যদি স্বামী না থাকে বা স্বামী অত্যন্ত অভাবী হয়, তবে স্ত্রীর নিজের সম্পদ (যদি থাকে) থেকে এই খরচ করা হবে। যদি স্ত্রীর নিজের সম্পদ না থাকে এবং স্বামীও খরচ বহনে অক্ষম হয়, তবে যাদের ওপর তার ভরণপোষণের দায়িত্ব ছিল (যেমন: বাবা, ভাই বা সন্তান), তারা এই খরচ বহন করবেন।

প্রশ্ন: নারীদেরকে রেশমের কাপড় দিয়ে কাফন করা যাবে কি?
উত্তর: হ্যাঁ, নারীদের কাফনে রেশমি কাপড় ব্যবহার করা জায়েয বা বৈধ। কারণ জীবিতাবস্থায় নারীদের জন্য রেশমি কাপড় বা রেশম পরিধান করা বৈধ। তবে এ বিষয়ে কিছু যরূরী বিষয় খেয়াল রাখা প্রয়োজন:

(ক) আবশ্যক নয়: কাফনের জন্য রেশমি কাপড়ের ব্যবহার আবশ্যক বা সুন্নাত নয়। সাধারণ সুতি সাদা কাপড়ে কাফন দেয়া সর্বোত্তম ও সুন্নাত।

(খ) অপচয় নিষেধ: যদি রেশমি কাপড় মূল্যবান হয় এবং তা প্রয়োজনের অতিরিক্ত হয়, তবে তা ব্যবহার না করাই ভালো। ইসলামে মৃত্যুর পর অহেতুক অপচয় নিষেধ। মহান আল্লাহ বলেন, وَ الَّذِیۡنَ  اِذَاۤ  اَنۡفَقُوۡا لَمۡ  یُسۡرِفُوۡا وَ لَمۡ یَقۡتُرُوۡا وَ کَانَ  بَیۡنَ  ذٰلِکَ  قَوَامًا ‘এবং যখন তারা ব্যয় করে তখন অপব্যয় করে না, কৃপনতাও করে না, আর তাদের পন্থা হয় এতদুভয়ের মধ্যবর্তী’ (সূরা আল-ফুরক্বান : ৬৭)। অর্থাৎ আল্লাহর প্রিয় বান্দারা অপব্যয় করে না এবং কৃপণতাও করে না; বরং উভয়ের মধ্যবর্তী সমতা বজায় রাখে। আয়াতে أسْرَافٌ এবং এর বিপরীতে إقْتَارٌ শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে। أسْرَافٌ এর অর্থ সীমা অতিক্রম করা। শরী‘আতের পরিভাষায় ইবনু আব্বাস, মুজাহিদ, ক্বাতাদাহ, ইবনু জুবায়েরের মতে আল্লাহ‌র অবাধ্যতার কাজে ব্যয় করা أسْرَافٌ তথা অপব্যয়; যদিও তা এক পয়সাও হয়। কেউ কেউ বলেন, বৈধ এবং অনুমোদিত কাজে প্রয়োজনাতিরিক্ত ব্যয় করাও অপব্যয়ের অন্তর্ভুক্ত। কেননা, تَبْذِيْرٌ তথা অনর্থক ব্যয় কুরআনের আয়াত দ্বারা হারাম ও গোনাহ। আল্লাহ বলেন,
 اِنَّ الۡمُبَذِّرِیۡنَ کَانُوۡۤا اِخۡوَانَ الشَّیٰطِیۡنِ ‘অপচয়কারীরা শয়তানদের ভাই’ (সূরা বানী ইসরাঈল : ২৭)। আল্লাহর প্রিয় বান্দাদের গুণ এই যে, তারা ব্যয় করার ক্ষেত্রে অপব্যয় ও ত্রুটির মাঝখানে সততা ও মিতব্যয়ীতার পথ অনুসরণ করে।

প্রশ্ন: মহিলারা কি জানাযার ছালাত পড়তে পারবে?
উত্তর: মহিলারা পৃথকভাবে পর্দা বজায় রেখে জানাযার ছালাতে অংশগ্রহণ করতে পারবে এবং নিজেরা নিজেদের ইমামতিও করতে পারবে। নবী করীম (ﷺ)-এর স্ত্রীগণ ছাহাবী সা‘দ ইবনু আবূ ওয়াক্কাছ (রাযিয়াল্লাহু আনহু)-এর জানাযার ছালাত আদায় করেছিলেন।[২০] মহিলারা স্বামী বা যেকোন মহিলার গোসল করানোর ক্ষেত্রে অংশগ্রহণ করতে পারে।[২১] তবে তারা দাফন কার্যে অংশগ্রহণ করবে না। উম্মু আতিয়্যাহ (রাযিয়াল্লাহু আনহা) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, نُهِينَا عَنْ اتِّبَاعِ الْجَنَائِزِ وَلَمْ يُعْزَمْ عَلَيْنَا ‘জানাযার পশ্চাদানুগমণ করতে আমাদের নিষেধ করা হয়েছে, তবে আমাদের উপর কড়াকড়ি আরোপ করা হয়নি’।[২২] জানাযার পশ্চাদানুগমণ করা নারীদের জন্য মাকরূহ (অপসন্দনীয়)।

প্রশ্ন: মহিলারা কি মৃত ব্যক্তির খাট বহন করতে পারবে?
উত্তর: নারীদের জানাযার অনুসরণ করাটা যেমন ঠিক নয় তেমনি খাটিয়া বহন করাও ঠিক নয়। এরপরও একটি হাদীছ বর্ণিত হয়েছে, যেখানে বলা হয়েছেÑ শুধু পুরুষরাই বহন করবে নারীরা নয়। আবূ সা‘ঈদ খুদরী (রাযিয়াল্লাহু আনহু) হতে বর্ণিত, আল্লাহর রাসূল (ﷺ) বলেছেন, إِذَا وُضِعَتْ الْجِنَازَةُ وَاحْتَمَلَهَا الرِّجَالُ عَلَى أَعْنَاقِهِمْ ‘যখন জানাযা খাটে রাখা হয় এবং পুরুষরা তা কাঁধে বহন করে নেয়’।[২৩] পুরুষ থাকাকালীন মহিলাদের খাটিয়া বহন করা জায়েয হবে না, যদি কোন পুরুষ না থাকে সেটা ভিন্ন বিষয়।

প্রশ্ন: গর্ভের সন্তান জীবিত অবস্থায় মায়ের মৃত্যু হলে দাফন করতে হবে কীভাবে?
উত্তর: তাকে দাফন করার নিয়ম হল- আগে দেখতে হবে সন্তান জীবিত আছে কি না? যদি জীবিত থাকে তবে দ্রুত অপারেশন করে বের করতে হবেÑ যদি বাচ্চাটি ছয় মাসের হয় অথবা অভিজ্ঞ সম্পন্ন ডাক্তারের পরামর্শক্রমে যদি বাচ্চা বের করার পরে সে বেঁচে থাকার সম্ভাবনা থাকে, অন্যথা নয়। অতঃপর মৃতের গোসল ও কাফন-দাফন সম্পন্ন করতে হবে। আর গর্ভের সন্তান মৃত হলে গর্ভসহই মৃতকে দাফন করে দিতে হবে।[২৪]

প্রশ্ন: একই কবরে নারী-পুরুষ উভয়কে দাফন করা কি জায়েয?
উত্তর: এতে কোন সমস্যা নেই, প্রয়োজনে দেয়া যেতে পারে, যখন যুদ্ধ বা মহামারি ইত্যাদি কারণে অনেক লাশ একত্র জমা হয়।[২৫]

প্রশ্ন: নারীদের কালো পোশাক পরে শোক পালনের বিধান কী?
উত্তর: ইসলামে শোক পালনের জন্য নারীদের বিশেষভাবে কালো পোশাক পরা বাধ্যতামূলক বা সুন্নতÑ এমন কোন দলীল নেই। বরং শোক পালনের জন্য নির্দিষ্ট রঙকে আবশ্যক বানানো বিদ‘আত ও জাহেলি রীতির অন্তর্ভুক্ত হতে পারে, যদি এটাকে ধর্মীয় বিধান মনে করা হয়। কারোর জন্য শোক পালনে কালো কাপড় পড়া শরী‘আতসম্মত নয়। স্বামী মারা গেলে স্ত্রীর জন্যও তা বিধেয় নয়। আত্মীয় মারা গেলে মহিলারা তিনদিন পর্যন্ত শোক পালন করতে পারে।[২৬] আর স্বামী মারা গেলে ৪ মাস ১০ দিন শোক পালন করা ওয়াজিব। অবশ্য গর্ভবতীর ইদ্দত প্রসবকাল পর্যন্ত।

প্রশ্ন : মহিলারা কবর যিয়ারত করতে পারবে কি?
উত্তর: মহিলারা শর্ত সাপেক্ষে কবর যিয়ারত করতে পারে। শর্ত হল- তারা সেখানে গিয়ে বিলাপ করতে পারবে না। যদি বিলাপ করার আশঙ্কা থাকে, তাহলে এমন নারী কবর যিয়ারত করা থেকে বিরত থাকবে। বাড়ি থেকেই কবরবাসীর জন্য দু‘আ করবে। আনাস ইবনু মালেক (রাযিয়াল্লাহু আনহু) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, নবী করীম (ﷺ) কবরের পাশে বিলাপ করে ক্রন্দরত কোন এক মহিলার পাশ দিয়ে অতিক্রম করছিলেন। তা দেখে তিনি তাকে বললেন, আল্লাহকে ভয় করো, ধৈর্যধারণ কর।[২৭] ইবনু বুরায়দা তার পিতা থেকে বর্ণনা করেন। তার পিতা বলেন, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেন, ‘আমি তোমাদের কবর যিয়ারত করতে নিষেধ করেছিলাম তোমরা এখন কবর যিয়ারত করতে পার। কেননা তা পরকালের কথা স্মরণ করিয়ে দেয়’।[২৮] এছাড়া রাসূলুল্লাহ (ﷺ) আয়েশা (রাযিয়াল্লাহু আনহা)-কে কবর যিয়ারতের দু‘আ শিখিয়ে দিয়েছেন।[২৯]



* শিক্ষক, আল-জামি‘আহ আস-সালাফিয়্যাহ, ডাঙ্গীপাড়া, রাজশাহী।

তথ্যসূত্র :
[১]. নববী, আল-মাজমূ‘ ৫/১১৪ ও ১২২; বিন বায, মাজমূ‘ ফাতাওয়া ১৩/১০৯।
[২]. মুসনাদে আহমাদ, হা/২৫৯৫০; ইবনু মাজাহ, হা/১৪৬৫; মিশকাত, হা/৫৯৭১।
[৩]. আবূ দাঊদ, হা/৩১৪১; আলবানী, আহকামুল জানায়েয, ১/৪৯ পৃ.।
[৪]. বায়াহাক্বী, ৩/৩৯৭;দারাকুৎনী, হা/১৮৩৩, সনদ হাসান।
[৫]. আল-মুগনী ২/২০২ পৃ.।
[৬]. আহকামু জামিঊন নিসা, ৫/১২২ পৃ.।
[৭]. ছহীহ বুখারী, হা/১২৫৩; ছহীহ মুসলিম, হা/৯৩৯।
[৮]. আহকামু জামিঊন নিসা, ৫/১২২ পৃ.।
[৯]. আবূ দাঊদ, হা/৩১২৭।
[১০]. ছহীহ মুসলিম, হা/৩৩৮।
[১১]. ছহীহ বুখারী, হা/১২৫৫।
[১২]. ছহীহ বুখারী, হা/১২৫৩।
[১৩]. ছহীহ বুখারী, হা/১২৫৫।
[১৪]. ছহীহ বুখারী, হা/১২৫৩।
[১৫]. ছহীহ বুখারী, হা/১২৬০।
[১৬]. ছহীহ বুখারী, হা/১২৬৩।
[১৭]. ছহীহ বুখারী, হা/১২৭২; ছহীহ মুসলিম, হা/৯৪১; মিশকাত, হা/১৬৩৫।
[১৮]. যঈফ আবূ দাঊদ, হা/৬৯১।
[১৯]. মির‘আতুল মাফাতীহ, ৫/২৪৩-২৪৬ পৃ. ‘জানাযা’ অধ্যায়।
[২০]. ছহীহ মুসলিম, হা/৯৭৩; মিশকাত, হা/১৬৫৬; ফিক্বহুস সুন্নাহ, ১ম খণ্ড, পৃ. ৫২৮।
[২১]. ইবনু মাজাহ, হা/১৪৬৪-৬৫।
[২২]. ছহীহ বুখারী, হা/১২৭৮; ছহীহ মুসলিম, হা/৯৩৮।
[২৩]. ছহীহ বুখারী, হা /১৩১৪।
[২৪]. জামি‘ আহকামুন নিসা, ৫/১৩২ পৃ.।
[২৫]. জামি‘ আহকামুন নিসা, ৫/১৩৪ পৃ.; ইসলাম সাওয়াল ওয়া জাওয়াব, ফৎওয়া নং-৯৬৬৬৭।
[২৬]. ছহীহ বুখারী, হা/১২৮০; ছহীহ মুসলিম, হা/১৪৮৬।
[২৭]. ছহীহ বুখারী, হা/১২৫২।
[২৮]. মুসনাদে আহমাদ, হা/২৩০৫৫।
[২৯]. ছহীহ মুসলিম, হা/৯৭৪; মিশকাত, হা/১৭৬৭।




প্রসঙ্গসমূহ »: জানাযা নারীমঞ্চ
শারঈ পর্দা : একটি পর্যালোচনা (৫ম কিস্তি) - ওবাইদুল্লাহ আল-আমীন
স্ত্রীর প্রতি স্বামীর দায়িত্ব ও কর্তব্য (শেষ কিস্তি) - তামান্না তাসনীম
শারঈ পর্দা : একটি পর্যালোচনা (৯ম কিস্তি) - ওবাইদুল্লাহ আল-আমীন
স্ত্রীর প্রতি স্বামীর দায়িত্ব ও কর্তব্য - তামান্না তাসনীম
প্রশ্নোত্তরে নারীদের ছালাত শিক্ষা (৫ম কিস্তি) - আব্দুল গাফফার মাদানী
আল-কুরআনে নারী কেন্দ্রিক আলোচনা ও শিক্ষনীয় বিষয়সমূহ - ওবাইদুল্লাহ আল-আমীন
প্রশ্নোত্তরে নারীদের ছালাত শিক্ষা - আব্দুল গাফফার মাদানী
প্রশ্নোত্তরে মুসলিম নারীদের ইসলাম শিক্ষা (৪র্থ কিস্তি) - আব্দুল গাফফার মাদানী
প্রশ্নোত্তরে নারীদের জানাযা শিক্ষা - আব্দুল গাফফার মাদানী
ইসলামে ব্যবসা-বাণিজ্যের রূপরেখা - গুলশান আখতার
প্রশ্নোত্তরে মুসলিম নারীদের ইসলাম শিক্ষা (৩য় কিস্তি) - আব্দুল গাফফার মাদানী
প্রশ্নোত্তরে নারীদের ছালাত শিক্ষা (২য় কিস্তি) - আব্দুল গাফফার মাদানী

সর্বশেষ প্রবন্ধ

ফেসবুক পেজ