ইসলামে নারী নেতৃত্ব: একটি পর্যালোচনা
- শাইখ আব্দুল গাফফার মাদানী*
الحمد لله الذي جعل الخليفة في الأرض فعز من قائل: “إني جاعل في الأرض خليفة” وفضل الرجال على النساء وبقوله “الرجال قوامون على النساء”، والصلاة والسلام على رسوله الكريم أنه جعل الخليفة من بعده مبشرين ومنذرين، أما بعد
আল্লাহ তা‘আলা প্রত্যেক মাখলূককে ভিন্ন ভিন্ন সম্মান মর্যাদা দান করেছেন তার মধ্যে হতে সবচাইতে মানুষকে বেশি সম্মানিত করেছেন। কেউ যখন তার রবের সীমা অতিক্রম করবে তখনই তাকে অসম্মানের গ্লানি পোহাতে হবে। আল্লাহ তা‘আলা নারী জাতিকে বিভিন্নভাবে সম্মানিত করেছেন কিন্তু সে সম্মান পেতে হলে অবশ্যই আল্লাহর বিধান মান্য করতে হবে, অন্যথা সম্মান তো পাবেই না বরং বিভিন্নভাবে লাঞ্ছিত ও অপমানি হবে। আল্লাহ তা‘আলা নারীদেরকে অনেকভাবে সম্মানিত করেছেন মা হিসাবে, কন্যা হিসাবে, স্ত্রী হিসাবে, বোন হিসাবে, খালা হিসাবে, ফুফু হিসাবে, দাদী হিসাবে, নানি হিসাবে...,। পৃথিবীর সকল ধর্মের ঊর্ধ্বে ইসলাম নারীর মর্যাদা নিশ্চিত করেছে, যা অন্য কোন ধর্মে ১% নেই, (ফা-লিল্লাহিল হামদ)। অথচ ইহুদীবাদী পশ্চিমা দেশগুলো নারীদেরকে স্বাধীনতা ও সমান অধিকারের নামে উস্কে দিয়ে মাঠে নামানোর ষড়যন্ত্র চালিয়ে যাচ্ছে, আমরা কোন চিন্তা ছাড়াই তাদের কথা কানে নিয়ে মাঠে ও রাস্তায় নেমে পড়েছি। আসলেই তারা নারীদের অধিকারের জন্য বলেনি বরং কিভাবে নারীদেরকে অসম্মানিত, অপমানিত, লাঞ্ছিত এবং সহজে তারা মুসলিম নারীদের উপভোগ করতে পারবে সেই ষড়যন্ত্রের মূলমন্ত্র একে চলেছে।*
নারী নেতৃত্ব কি ইসলামে হারাম?
অমুসলিমদের খুব পসন্দের প্রসঙ্গ হল নারী নেতৃত্ব। ইসলামকে পশ্চাৎপদ, নারীবিদ্বেষী, অযৌক্তিক ও নানান অভিযোগে অভিযুক্ত করতে ইসলামের শত্রুদের একটা জনপ্রিয় ‘যুক্তি’ বলা যায় এটি। আর বর্তমানে অনেকেই এই নিয়ে সংশয়, হীনমন্যতায় ভুগে। মুসলিমরা হয়তো আল্লাহর কাছে নিজের ইচ্ছাকে আত্মসমর্পণ করে। তবে যখন প্রশ্নের সম্মুখীন হয় তখন সঠিক উত্তরের অভাবে তারাও বিভিন্ন সমস্যায় ভুগে। বর্তমানে লিবারেল সেক্যুলার আইডোলজির ফাঁদে পরে অনেকেই বুঝে উঠতে পারে না কিভাবে ইসলামে এমন আইন থাকতে পারে। অনেকে তো মুসলিম হবার পরেও ধরেই নেয় যে, ১৪শ বছর আগের ধর্ম, তখনকার সময়তো এই আধুনিক যুগ ছিল না, সেই অনুযায়ী এমন আইন থাকাই স্বাভাবিক। অর্থাৎ তারা ইসলামকে ‘পুরোনো’, বর্তমান সময়ে আংশিক অকার্যকর হিসাবে মেনে নেয় অথবা ইসলামের বাইরে গিয়ে চিন্তা করা শুরু করে এবং যারা মডারেট, তারা নব্য নব্য ব্যাখ্যা আনে। প্রশ্ন হল- আসলেই কি ইসলামে নারী নেতৃত্ব হারাম? নিশ্চিতভাবেই হ্যাঁ, কোন নারীর জন্য রাষ্ট্রপ্রধান হওয়া, খলীফা বা আমীর হওয়া ইসলামে হারাম। এ প্রসঙ্গে কুরআন, সুন্নাহ ও সালাফী ওলামায়ে কেরামের অসংখ্য বক্তব্য রয়েছে।
সালাফে ছালেহীনের অবস্থান
আগে দেখি যে, এ প্রসঙ্গে আলেমদের অবস্থান কী? ইসলামের হাজার বছরের ইতিহাসে এখন পর্যন্ত কোন সালাফ ও পরবর্তী উলামায়ে কেরাম এ বিষয়ে দ্বিমতের কোন অবকাশ রাখেননি যে, নারীদের জন্য রাষ্ট্রপ্রধান বা শাসক হওয়া হারাম। রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার জন্য সর্বসম্মতিক্রমে পুরুষ হওয়া শর্ত। ইসলামের প্রথম যুগের ছাহাবী, তাবিঈ সবাই এ ব্যাপারে একমত পোষণ করেছেন। যার কারণে খুলাফায়ে রাশেদা হিসাবে কোন নারী ছাহাবী ছিলেন না। ছাহাবী-তাবেয়ীদেরই অনুসরণ করেছেন সব মাযহাবের ইমামগণ, ফুকাহায়ে কেরাম, উলামায়ে কেরাম, মুহাদ্দিছগণ ও মুফাসসিরগণ। সবাই ইজমা (ঐকমত্য পোষণ) করেছেন যে, নারীরা রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় আরোহণের যোগ্য নয়, কোন ইসলামী রাষ্ট্রের প্রধান নেতা (খলীফা) হিসাবে তাদেরকে নিয়োগ দেয়া জায়েয নেই। মহান আল্লাহ বলেন,
اَلرِّجَالُ قَوّٰمُوۡنَ عَلَی النِّسَآءِ بِمَا فَضَّلَ اللّٰہُ بَعۡضَہُمۡ عَلٰی بَعۡضٍ
‘পুরুষরা নারীদের কর্তা, কারণ আল্লাহ তাদের এককে অপরের উপর শ্রেষ্ঠত্ব দিয়েছেন’ (সূরা আন-নিসা : ৩৪)। রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেন,
عَنْ أَبِيْ بَكْرَةَ قَالَ لَقَدْ نَفَعَنِي اللهُ بِكَلِمَةٍ سَمِعْتُهَا مِنْ رَسُوْلِ اللهِ ম أَيَّامَ الْجَمَلِ بَعْدَ مَا كِدْتُ أَنْ أَلْحَقَ بِأَصْحَابِ الْجَمَلِ فَأُقَاتِلَ مَعَهُمْ قَالَ لَمَّا بَلَغَ رَسُوْلَ اللهِ ম أَنَّ أَهْلَ فَارِسَ قَدْ مَلَّكُوْا عَلَيْهِمْ بِنْتَ كِسْرَى قَالَ لَنْ يُفْلِحَ قَوْمٌ وَلَّوْا أَمْرَهُمْ امْرَأَةً
আবূ বাকরাহ (রাযিয়াল্লাহু আনহু) বলেন, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) থেকে শ্রুত একটি বাণীর দ্বারা আল্লাহ জঙ্গে জামালের (উষ্ট্রের যুদ্ধ) দিন আমার মহা উপকার করেছেন, যে সময় আমি ছাহাবায়ে কিরামের সঙ্গে মিলিত হয়ে জামাল যুদ্ধে শরীক হতে প্রায় প্রস্তুত হয়েছিলাম। আবূ বাকরাহ (রাযিয়াল্লাহু আনহু) বলেন, সে বাণীটি হল, যখন নবী (ﷺ)-এর কাছে এ খবর পৌঁছল যে, পারস্যবাসী কিসরা কন্যাকে তাদের বাদশাহ মনোনীত করেছেন, তখন তিনি বললেন, সে জাতি কক্ষনো সফল হবে না স্ত্রীলোক যাদের প্রশাসক হয়’।[১]
সালাফগণের মধ্যে, ইবনু হাযম তার ‘মারাতিব আল-ইজমা’ গ্রন্থে বর্ণনা করেছেন যে, এই বিষয়ে পণ্ডিতদের ঐকমত্য ছিল। অধ্যায়ে তিনি বলেছেন, ‘ক্বিবলার লোকদের, সকল দলের মধ্যে [অর্থাৎ সমস্ত মুসলিম সম্প্রদায়ের] মধ্যে এমন একটিও দলও নেই যারা মহিলাদের নেতৃত্বের অনুমতি দেয়’। ইমাম কুরতুবী (রাহিমাহুল্লাহ) অনুরূপ কিছু বর্ণনা করেছেন এবং আল্লামা আল-শানক্বীতী (রাহিমাহুল্লাহ) বলেছেন, ‘এ বিষয়ে আলেমদের মধ্যে কোন মতপার্থক্য নেই।[২] এই বিষয়ে কোন দ্বিমতের সুযোগ নেই যে, নারীদের রাষ্ট্রপ্রধান হওয়া ইসলামে হারাম। মূলত পরিবারের কর্তা থেকে শুরু করে রাষ্ট্রের কর্তা হবে পুরুষ, এই নিয়ে উপনিবেশিক যুগের আগে ইসলামের ইতিহাসে কোন আলেমই কখনো সন্দেহ করেননি।
এখন সাধারণত মডার্নিস্ট রিফর্মিস্ট লিবারেল সেক্যুলাররা বলতে পারে! এটা সম্পূর্ণ অসমতা, নারীবিদ্বেষ, অন্যায়, এটা নারীদের ঘরের মধ্যে দাবিয়ে রাখা, ওপ্রেশন! নারী পুরুষ সম্পূর্ণ সমান, হ্যাঁ কিছু অ্যানাটোমিকাল পার্থক্য থাকলেও দিন শেষে নারী পুরুষের তেমন কোন পার্থক্য নেই। বরং যার যোগ্যতা বেশি, সেই তার ফলাফল পাবে। নারী পুরুষ একই ভাবে চিন্তা করে, নেতৃত্ব দেবার যোগ্যতা উভয়ই রাখে। আর এখন নারীরা কোন দিক থেকেই পিছিয়ে নেই, তাই ইসলামের এই আইন একদমই অযৌক্তিক। পশ্চাৎপদ! ইসলাম তো সেই ১৪শ বছর আগের মধ্যযুগের ধর্ম, সেটার ছাপ তো বিধানে থাকবেই, আগের ইতিহাস অনুযায়ী এটা ঠিক আছে, তবে এখন সময় বদলেছে। এখন আর নারীদের এত প্রতিবন্ধকতার উপর নির্ভর করতে হয় না। এখন আর কায়িক শ্রম ও পেশির দরকার হয় না বেশি। এখন মানুষ তার মেধা দিয়েই দুনিয়া জয় করতে পারে। আর এখন জন্মনিয়ন্ত্রণ আসার ফলে মহিলাদের অর্ধেক জীবন সন্তান জন্মদানে চলে যায় না। এখন নারীরা চাইলেই জন্ম নিয়ন্ত্রণ করতে পারে এবং কর্মক্ষেত্রে অধিক সময় দিতে পারে। হ্যাঁ; মানলাম ইসলামে এটা হারাম, তবে এখন আর নেতৃত্বের বিষয়টা আগের মত নেই। পরিস্থিতি বদলেছে। তাই পরিস্থিতি আর অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে বিধান পরিবর্তন আমরা করতেই পারি।
যৌক্তিকতার সন্ধানে
আমরা প্রথমে দেখি যে সমঅধিকারের এই দাবি কতুটুকু যৌক্তিক? দেখার বিষয় হল সমতা মানে কী বুঝানো হয়। মূলত সমতার ধারণা হল- একটা খালি কলসির মত। বাজে বেশি, তবে ভিতরে যতক্ষণ না ধরে বাইরের পানি ভরা হচ্ছে, সেটা পূর্ণতা লাভ করে না। সমতার ধারণা আসলে কন্টেক্সট এর উপর নির্ভরশীল হয়, যদি সেটা যৌক্তিকতা বজায় রাখতে চায়।
অতীতের আয়নায়
এই বিষয়ে কেউই দ্বিমত করবে না যে, অতীতের প্রায় সকল সভ্যতা ছিল পুরুষতান্ত্রিক এবং পুরুষ শাসক দ্বারা দেশ বা রাষ্ট্র শাসিত হত। যদিও কিছু নারী শাসকের উদাহরণ পাওয়া যায়, তবে সেটা সংখ্যায় খুবই নগন্য। এমনকি যত মাতৃতান্ত্রিক সমাজ দেখা যায়, তাদের আসলে কোন সভ্যতা বলা যায় না, বরং তারা শুধু সমাজ হিসাবেই থাকা, যদিও তারা দেখা যায় কোন দেশের বা সমাজের একদম কোণার অংশে বসবাস করে, বিশেষ করে বাংলাদেশের একদম কোণায় পাহাড়ি অঞ্চলে এর প্রমাণ দেখা যায়। তাদেরকে কোনভাবে সভ্যতা বলা যায় না, বরং পৃথিবীর ইতিহাসের ৯৯% সমাজ ছিল পুরুষতান্ত্রিক এবং সকল প্রভাবশালী সভ্যতা ছিল পুরুষতান্ত্রিক। তাদের শুরু থেকে সভ্যতার উন্নতির এক নির্দিষ্ট পর্যায় পর্যন্ত সেটা পুরুষদের হাত ধরেই গিয়েছে। প্রাচীন গ্রিসে মানুষদের মধ্যেও এমন ধারণা দেখা যায় যে, নারী ও পুরুষের মধ্যে ভিন্ন ভিন্ন স্বভাব রয়েছে। তাদের পুরুষ ঈশ্বরেরা যুক্তির দেবতা, আলোর দেবতা, আইন বা হুকুমের দেবতা ইত্যাদি। আর নারী ঈশ্বর হল মমতা বা অনুভুতির দেবতা, মহানন্দ এর দেবতা, উর্বরতার দেবতা, সন্তানদের দেবতা ইত্যাদি এবং অনুরূপ প্রাচীন চাইনিজ সংস্কৃতিতেও পাওয়া যায়। তাদের স্বভাব এবং কাজ ভিন্ন। তবে যে যার কাজ প্রকৃতি অনুযায়ী কাজ করে একটা ভারসাম্যপূর্ণ সমাজ তৈরি করত।
রাণী বিলকিস ও সুলাইমান (আলাইহিস সালাম)
বর্তমানে অনেক হিজাবী ফেমিনিস্ট, মডারেট, রিফরমিস্টরা নারী নেতৃত্ব ইসলামে জায়েয দেখানোর জন্য সকল হাদীছ অস্বীকার করে ও রানী বিলকিসের ঘটনা দেখায়। তবে মজার বিষয় হল- এই ঘটনা উল্টো তাদের বিপরীতে প্রমাণ দেয় যে, কেন নারী নেতৃত্ব গ্রহণযোগ্য না- মহান আল্লাহ বলেন, ‘কিছুক্ষণ পরেই হুদহুদ এসে পড়ল এবং বলল, আপনি যা জ্ঞানে পরিবেষ্টন করতে পারেননি আমি তা পরিবেষ্টন করেছি এবং সাবা হতে সুনিশ্চিত সংবাদ নিয়ে এসেছ। আমি তো এক নারীকে দেখলাম তাদের উপর রাজত্ব করছে। তাকে দেয়া হয়েছে সকল কিছু হতেই এবং তার আছে এক বিরাট সিংহাসন। আমি তাকে ও তার সম্প্রদায়কে দেখলাম তারা আল্লাহর পরিবর্তে সূর্যকে সিজদা করছে। আর শয়তান তাদের কার্যাবলী তাদের কাছে সুশোভিত করে দিয়েছে এবং তাদেরকে সৎপথ থেকে বাধাগ্রস্থ করেছে, ফলে তারা হেদায়াত পাচ্ছে না। নিবৃত্ত করেছে এ জন্য যে, তারা যেন সিজদা না করে আল্লাহকে, যিনি আসমানসমূহ ও যমীনের লুক্কায়িত বস্তুকে বের করেন। আর যিনি জানেন, যা তোমরা গোপন কর এবং যা তোমরা ব্যক্ত কর। আল্লাহ, তিনি ছাড়া সত্য কোন ইলাহ নেই, তিনি মহা আরশের রব। সুলাইমান বললেন, আমরা দেখব তুমি কি সত্য বলেছ, না-কি তুমি মিথ্যুকদের অন্তর্ভুক্ত? তুমি যাও আমার এ পত্র নিয়ে এবং এটা তাদের কাছে নিক্ষেপ কর, তারপর তাদের কাছ থেকে সরে থেকো এবং লক্ষ্য করো তাদের প্রতিক্রিয়া কী? সেই নারী বলল, হে পরিষদবর্গ! আমাকে এক সম্মানিত পত্র দেয়া হয়েছে।
এটা সুলায়মান (আলাইহিস সালাম)-এর নিকট হতে এবং এটা এই দয়াময়, পরম দয়ালু আল্লাহর নামে। অহমিকা বশে আমাকে অমান্য কর না এবং আনুগত্য স্বীকার করে আমার নিকট উপস্থিত হও। তিনি (বিলকিস) বললেন, হে পরিষদবর্গ! আমার এ সমস্যায় তোমরা পরামর্শ দাও; আমি যা সিদ্ধান্ত করি তা তো তোমাদের উপস্থিতিতেই করি। তারা বলল, আমরা তো শক্তিশালী ও কঠোর যোদ্ধা; তবে সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা আপনারই, কী আদেশ করবেন তা আপনি ভেবে দেখুন। তিনি বললেন, রাজা-বাদশাহরা যখন কোন জনপদে প্রবেশ করেন তখন ওকে বিপর্যস্ত করে দেন এবং তথাকার মর্যাদাবান ব্যক্তিদেরকে অপদস্থ করেন; এরাও এইরূপই করবে। আমি তাদের নিকট উপঢৌকন পাঠাচ্ছি; দেখি, দূতেরা কী উত্তর নিয়ে ফিরে আসে। অতঃপর যখন দূত সুলায়মান (আলাইহিস সালাম)-এর নিকট আসল তখন সুলায়মান (আলাইহিস সালাম) বললেন, তোমরা কি আমাকে ধন-সম্পদ দিয়ে সাহায্য করছ? আল্লাহ আমাকে যা দিয়েছেন তা তোমাদেরকে যা দিয়েছেন তা হতে উৎকৃষ্ট; বরং তোমরা তোমাদের উপঢৌকন নিয়ে সন্তুষ্ট থাক। তাদরে নিকট ফিরে যাও, আমি অবশ্যই তাদের বিরুদ্ধে এক সৈন্যবাহিনী নিয়ে আসব যার মুকাবিলা করার শক্তি তাদের নেই। আমি অবশ্যই তাদেরকে তা হতে বহিষ্কার করব লাঞ্ছিতভাবে এবং তারা হবে অবনমিত।
সুলায়মান (আলাইহিস সালাম) আরো বললেন, হে আমার পরিষদবর্গ! তারা আত্মসমর্পণ করে আমার নিকট আসার পূর্বে তোমাদের মধ্যে কে তার সিংহাসন আমার নিকট নিয়ে আসবে? এক শক্তিশালী জ্বিন বলল, আপনি আপনার স্থান হতে উঠবার পূর্বে আমি ওটা আপনার নিকট এনে দিব এবং এই ব্যাপারে আমি অবশ্যই ক্ষমতাবান, বিশ্বস্ত। কিতাবের জ্ঞান যার ছিল, সে বলল, আপনি চক্ষুুর পলক ফেলবার পূর্বেই আমি ওটা আপনাকে এনে দিব। সুলাইমান (আলাইহিস সালাম) যখন ওটা সামনে রক্ষিত অবস্থায় দেখলেন তখন বললেন, এটা আমার প্রতিপালকের অনুগ্রহ, যাতে তিনি আমাকে পরীক্ষা করতে পারেন, আমি কৃতজ্ঞ না অকৃতজ্ঞ; যে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে, সে তা করে নিজের কল্যাণের জন্য এবং যে অকৃতজ্ঞ হয়, সে জেনে রাখুক যে, আমার প্রতিপালক অভাবমুক্ত মহানুভব।
সুলায়মান বললেন, তার সিংহাসনের আকৃতি বদলিয়ে দাও; দেখি সে সঠিক দিশা পাচ্ছে, না সে বিভ্রান্তদের অন্তর্ভুক্ত হয়? ঐ নারী যখন আসলেন, তখন তাকে জিজ্ঞেস করা হ’ল তোমার সিংহাসনটি কি এই রূপই? তিনি বললেন, এটা তো যেন ওটাই, আমাদেরকে ইতিপূর্বে প্রকৃত জ্ঞান দান করা হয়েছে এবং আমরা আত্মসমর্পনও করেছি। আল্লাহর পরিবর্তে সে যার পূজা করত তাই তাকে সত্য পথে চলা থেকে বাধা দিয়ে রেখেছিল, সে নারী ছিল কাফির সম্প্রদায়ের অন্তর্ভুক্ত। তাকে বলা হল, ‘প্রাসাদটিতে প্রবেশ কর’। অতঃপর যখন সে সেটা দেখল তখন সে সেটাকে এক গভীর জলাশয় মনে করল এবং সে তার পায়ের গোছা দু’টো অনাবৃত করল। সুলাইমান বললেন, এটা তো স্বচ্ছ স্ফটিক মণ্ডিত প্রাসাদ। সেই নারী বলল, ‘হে আমার রব! আমি তো নিজের প্রতি যুলুম করেছিলাম, আর আমি সুলাইমানের সাথে সৃষ্টিকুলের রব আল্লাহর কাছে আত্মসমর্পণ করছি’ (সূরা আন নামল : ২২-৪৪)।
এখানে বিলকিস যখন সুলাইমান (আলাইহিস সালাম)-এর বার্তা পায়, তখন বিলকিস সবার প্রথমে কী করে? সবার প্রথমে নিজে কিছু না করে তার পরিষদের কাছে পরামর্শ চায় এবং পরিষদের লোকেরা কী বলল? দেখুন তারা প্রথমের আক্রমণাত্মক কথা বলে, তারা বলে যে, ‘আমরা শক্তির অধিকারী ও কঠোর যোদ্ধা’। এখানেই কিন্তু নারী পুরুষের মাঝের মানসিকতার যেই পার্থক্য সেটা সুস্পষ্ট। কিন্তু বিলকিস ডিফেন্সিফ সিধান্তই নেয়। বিলকিস বলে, ‘রাজারা যখন কোন জনপদে ঢুকে তখন বিপর্যয় ডেকে আনে এবং তথাকার সম্মানিত ব্যক্তিদেরকে অপমানিত করে ছাড়ে আর এরাও তাই করবে। আমি তাদের নিকট উপঢৌকন পাঠাচ্ছি’। অর্থাৎ বিলকিস এখানে সমস্যায় না জড়িয়ে সমঝতার জন্য আগায়। আমরা উপরে এতক্ষণ নারীর যেইসব বৈশিষ্ট্য নিয়ে আলোচনা করলাম, সেগুলোর প্রতিফলন সরাসরি বিলকিসের মধ্যে পাওয়া যাচ্ছে। সে সুলাইমান এর কাছে উপঢৌকন পাঠায়। তবে সেটার বদলে সুলাইমান (আলাইহিস সালাম) তা প্রত্যাখ্যান করে।
দেখুন সুলাইমান (আলাইহিস সালাম) এর জ্ঞান, তিনি জানেন যে, তিনি একজন নারীর সাথে ডিল করছে, তিনি কী করলেন? তিনি এক জীনের মাধমে বিলকিসের সিংহাসন নিয়ে আসে, তার নিজের ক্ষমতা প্রদর্শন করে। তিনি দেখালেন তিনি কত উচ্চ মর্যাদার, কত ক্ষমতা ও পরাক্রমশালী, কত সম্পদশালী এবং বিলকিস যখন পানির মত দেখতে স্বচ্ছ কাঁচের উপর হাঁটে, সুলাইমান (আলাইহিস সালাম) এর এত ক্ষমতা দেখে সাথে সাথেই সুলাইমান (আলাইহিস সালাম) এর আনুগত্য স্বীকার করে নেয়, আত্মসমর্পণ করে। শুধু তাইই না, বিলকিস সবার আগের ভুলের আঙ্গুল নিজের দিকেই তাক করে, সে নিজের ভুলদের কথা স্বীকার করে। তবে এখানে বিলকিসের বদলে যদি একজন পুরুষ থাকত সে কী করত? সে হয়তো অপমানবোধ করতো, আগ্রাসী সিদ্ধান্তের দিকে এগিয়ে যেত, বিকল্প না পেলে হয়তো অন্য সিদ্ধান্তে যেত, হিংসা কাজ করত, ইত্যাদি। আপনিই বলুন, আপনি কি এমন একজন নেতা চাইবেন যে, আগে সাহসিকতা না দেখিয়েই সমঝোতার জন্য আগাবে?, যে শত্রুর ক্ষমতা দেখে নিজেকে আত্মসমর্পণ করে দিবে? বরং এমন নারী নেতৃত্ব কাফেরদের জন্য উপকারী। এটা শত্রুর জন্য একটা বেশি সুবিধা যে তার প্রতিপক্ষে একজন নারী রয়েছে, যার এমন প্রবণতা কাজ করে। বরং কুরআনের এই ঘটনা আসলে নারী নেতৃত্বের বিপক্ষেই প্রমাণ দেয়। এবং নারী নেতৃত্ব যে শত্রুর জন্য উপকারী তার এক ঝলক আমরা এখনি দেখব।
একটু তাকিয়ে দেখুন!
আমরা যদি উপনিবেশবাদের দিকে তাকাই, তাহলে দেখব যে উপনিবেশবাদীরা নারী ক্ষমতায়ন এর খুবই পক্ষে ছিল। তারা নারীদেরকে নেতৃত্বে আনতে চাইত, নারীদেকে সামনের কাতারে আনতে চাইত, তারা সিদ্ধান্ত নেবার বিষয়গুলো নারীদের সাথে পরামর্শ করতে চাইতা অনেক সময়। কেন? খুবই সহজ। এর কারণে তারা যত না সহজে পুরুষদের প্রভাবিত করতে পারবে তার থেকে বেশি নারীদের প্রভাবিত করতে পারবে। তারা নির্দিষ্ট ভাবে মুসলিম বিশ্বে নারীদের ক্ষমতায়ন চায়, ইসলামকে পুনর্জাগরণ করতে চায়, তাদের আধিপত্য এবং প্রভাব বিস্তারের সুবিধার্থে। এটা কি যথেষ্ট লক্ষণীয় বিষয় না? আমাদের শত্রুরা আমাদের নারীদের ঘর থেকে বের করতে চাচ্ছে তাদের সুবিধার্থে, তবে আমাদের আলেমগণ নারীদের ঘরে থাকতে বললে তারা ‘কাঠমোল্লা’ হয়ে যায়।
আমেরিকানরা চায় যে, মুসলিম বিশ্বে রাজনৈতিক নেতা হিসাবে নারীরা থাকুক; যাতে করে তাদের মাধ্যমে তাদের আদর্শ এবং আধিপত্য বিস্তার করতে পারে। আমেরিকা অনেক আগেই তাদের প্রকল্প গ্রহণ করেছে কিভাবে মডারেট মুসলিম নেটওয়ার্ক তৈরি করা যায় এবং এই বাস্তবায়ন এ তারা বেশ সফল। সেই মডারেট মুসলিম তৈরি করা যারা আমেরিকার জন্য উপকারী, যারা মেনে নিবে আমেরিকার লিবারেল সেক্যুলার আদর্শ। যারা গণতন্ত্র মেনে নিবে, নারীক্ষমতায়ন মেনে নিবে, যারা বাহিরে হবে বাদামি, তবে ভিতরে হবে সাদা, অর্থাৎ তারা বাদামি চামড়ার হলেও, ভিতরে সাদা চামড়ার মানুষদের মত হতে চাইবে। মানে আধুনিক (কথিত) হতে চাইবে।
আমরা বলছি না যে, নারীদের এই বৈশিষ্ট্যগুলো তাদের দুর্বলতা, মোটেও না। তাদের যে দায়িত্ব আল্লাহ দিয়েছেন, সেখানে তাদের জন্য এটা তাদের শক্তি। তবে কেউ যদি পদার্থবিজ্ঞান পরীক্ষায় গীতাঞ্জলী পড়ে যায়, সেটা তো হবে না। যেখানে যা প্রয়োজন, সেখানে সেই অনুযায়ী কাজ করতে হবে। আল্লাহ নারীদের যে সহজাত বৈশিষ্ট্য দিয়ে সৃষ্টি করেছেন, সেই অনুযায়ী তাদের দায়িত্ব দিয়েছেন। পুরুষদের যে সহজাত, সেই অনুযায়ী দায়িত্ব দিয়েছেন এবং তাদের নিজেদের ক্ষেত্রে তাদের বৈশিষ্ট্য তাদের জন্য শক্তি। বরং ইসলাম নারী ও পুরুষকে সুষমভাবে, তাদের সহজাত বৈশিষ্ট্য অনুযায়ী দায়িত্ব বণ্টন করে এবং কার কী দায়িত্ব তা বলে দেয় এবং সেটা তার, তার পরিবার, তার সমাজ ও উম্মতের জন্য উপকারী। সেটা তার ভালো লাগুক বা না লাগুক। যৌক্তিক লাগুক বা না লাগুক এবং আমরা পরিষ্কারভাবে দেখতে পারছি আল্লাহর এই আইনের পেছনে যেই গভীর জ্ঞান, তা কতো বাস্তবসম্মত!
কখনোই সফলকাম হতে পারবে না
আবূ বাকরাহ (রাযিয়াল্লাহু আনহু) বলেন, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেন, لَنْ يُفْلِحَ قَوْمٌ وَلَّوْا أَمْرَهُمْ امْرَأَةٍ ‘সে জাতি কক্ষনো সফলকাম হবে না, যারা তাদের শাসনভার কোন স্ত্রীলোকের হাতে অর্পণ করে’।[৩] প্রশ্ন হলা- এখানে সফলতা বলতে কী বুঝানো হচ্ছে? কিসের মানদণ্ডে সফলতা? নিশ্চয় রাসূল (ﷺ) এখানে পুঁজিবাদী স্ট্যান্ডার্ড এর বস্তুবাদী স্ট্যান্ডার্ড এর সফলতার কথা বলেননি। নিশ্চয় তাঁর কাছে পদ্মা সেতু কোন সফলতা না। তাহলে সফলতা কী? সফলতার সংজ্ঞায় কুরআন সুন্নাহ একদম স্পষ্ট,
ذٰلِکَ الۡکِتٰبُ لَا رَیۡبَ ۚۖۛ فِیۡہِ ۚۛ ہُدًی لِّلۡمُتَّقِیۡنَ- الَّذِیۡنَ یُؤۡمِنُوۡنَ بِالۡغَیۡبِ وَ یُقِیۡمُوۡنَ الصَّلٰوۃَ وَ مِمَّا رَزَقۡنٰہُمۡ یُنۡفِقُوۡنَ-وَ الَّذِیۡنَ یُؤۡمِنُوۡنَ بِمَاۤ اُنۡزِلَ اِلَیۡکَ وَ مَاۤ اُنۡزِلَ مِنۡ قَبۡلِکَ ۚ وَ بِالۡاٰخِرَۃِ ہُمۡ یُوۡقِنُوۡنَ-اُولٰٓئِکَ عَلٰی ہُدًی مِّنۡ رَّبِّہِمۡ ٭ وَ اُولٰٓئِکَ ہُمُ الۡمُفۡلِحُوۡنَ
‘এটা সেই কিতাব; যাতে কোন সন্দেহ নেই, মুত্তাকীদের জন্য হেদায়াত। যারা গায়েবের প্রতি ঈমান আনে, ছালাত কায়েম করে আর যারা ঈমান আনে তাতে, যা আপনার উপর নাযিল করা হয়েছে এবং যা আপনার পূর্বে নাযিল করা হয়েছে, আর যারা আখেরাতে নিশ্চিত বিশ্বাসী এবং তাদেরকে আমরা যা দান করেছি তা থেকে ব্যয় করে। তারাই তাদের রব-এর নির্দেশিত হেদায়াতের উপর রয়েছে এবং তারাই সফলকাম’ (সূরা আল বাক্বারাহ : ২-৫)। অর্থাৎ ইসলামী স্ট্যান্ডার্ড এ সফলতা হচ্ছে হেদায়াত লাভ এবং ঈমান ও আমলে উন্নতি সাধনের মাধ্যমে চিরস্থায়ী আযাব থেকে বেঁচে যাওয়া। আমরা একটা সফল শাসকের সাথে তুলনা করতে গেলে উমার বিন খাত্তাব (রাযিয়াল্লাহু আনহু) অথবা উমার ইবনু আব্দুল আযীয (রাহিমাহুল্লাহ) এর সাথে তুলনা করতে পারি। তাদের সময় ছিল তওহীদের জ্বলন্ত আগুন এর যুগ। সেটাই ছিল সেরা সময় যখন মানুষ সৃষ্টির দাসত্ব থেকে মুক্ত হয়ে আল্লাহর দাসত্বে নিয়োজিত হয় এবং আল্লাহর বিধান দিয়ে শাসিত হয়। মানুষ আল্লাহর বিধানের যত কাছাকাছি, তাক্বওয়া, ইনসাফ, ইহসান, আদল এর যত কাছাকাছি সে ততই সফল।
পরিশেষে আল্লাহ তা‘আলা আমাদের সবাইকে কুরআন ও ছহীহ সুন্নার সঠিক বুঝ দান করুন, সাথে সাথে রাসূলুল্লাহ (ﷺ) এবং সালাফে ছালেহীনের মানহাজ অনুযায়ী জীবন গড়ার তাওফীক দান করুন এবং ইহুদীদের ফাঁদ থেকে হেফাযত করুন- আল্লাহুম্মা আমীন!
وصلى الله على نبينا محمد وعلى آله وصحبه أجمعين
* শিক্ষক, আল-জামি‘আহ আস-সালাফিয়্যাহ, ডাঙ্গীপাড়া, রাজশাহী।
তথ্যসূত্র :
[১]. ছহীহ বুখারী, হা/৪৪২৫; মুসনাদে আহমাদ, হা/২০৪০২; ইবনু হিব্বান, হা/৪৫১৬।
[২]. মারাতিবুল ইজমা লি ইবনে হাযাম, পৃ. ১২৬।
[৩]. ছহীহ বুখারী, হা/৪৪২৫; মুসনাদে আহমাদ, হা/২০৪০২; ইবনু হিব্বান, হা/৪৫১৬।