বৃহস্পতিবার, ২৩ এপ্রিল ২০২৬, ০৬:২৭ পূর্বাহ্ন

ইসলামিক প্যারেন্টিং

তিনা খান* 


(২য় কিস্তি) 


শিক্ষনীয় সংলাপ

বাবা : ইনশাআল্লাহ আমি তোমার সাথে ওয়াদা করছি।
ছেলে : ইনশাআল্লাহ বাদ দিয়ে ওয়াদা করো।
বাবা : কেন?
ছেলে : ওয়াদা পূরণ করতে না পারলে তুমি অভ্যাস-মাফিক বলবে, ‘আমি তো ইনশাআল্লাহ বলেছিলাম!’

সংলাপ থেকে বুঝা যায় যে, তারা পিতা-মাতার কথা ও কাজ খুব বেশি ফলো করে। সুতরাং পিতা-মাতা যদি তাদের সন্তানদের মাঝে নিজেদের নেতিবাচক অভ্যাসগুলো ঢুকিয়ে দিতে পারে, তাহলে তারা বড় হয়ে এ কাজগুলো করতে থাকবে। আসুন! আমরা এ মর্মে সংকল্প করি যে, সন্তানদের ইতিবাচক নৈতিকতা শিক্ষা দেব। গড়ে তুলব ইসলামী শিষ্টাচারে।

সম্পদের প্রতি তাদের দীক্ষা

ছোটবেলাতেই সন্তানকে সম্পদের প্রতি স্বচ্ছ ধারণা দিতে হবে। তাকে জানাতে হবে সম্পদ কী? কী তার মূল্য? তার প্রয়োজনীয়তা মানব জীবনে কতটুকু? সন্তানের শৈশবকালে সম্পদের ব্যাপারে যে বিষয়গুলো বোঝানো উচিত, সেগুলো হল-

  • সম্পদ জীবনের উপলক্ষ্যমাত্র, জীবনের অভীষ্ট লক্ষ্য নয়।
  • সম্পদ উপার্জন করতে প্রচুর মেহনত করতে হয়।
  • দুনিয়াতে অনেক কিছু রয়েছে, যা কেবল সম্পদ দিয়েই লাভ করা যায় না। যেমন: সম্মান, ভ্রাতৃত্ব, অকৃত্রিম ভালোবাসা, আমানতদারী, জ্ঞান-বিজ্ঞান ও সুকুমারবৃত্তি।
  • অন্যকে অগ্রাধিকার এবং সাধ্যমতো তাদের জন্য খরচ করা নিজের চাহিদা পূরণের তুলনায় অনেক বেশি তৃপ্তিদায়ক। তাই অর্থ উপার্জনের উদ্দেশ্য শুধু সম্পদ কুক্ষিগত রাখা নয়; বরং, পরোপকার, অন্যের পাশে দাঁড়ানো, বিপদে সাহায্য-সহযোগিতা করা ইত্যাদি।
  • সার্বক্ষণিক এ প্রশ্ন অন্তরে জাগরূক রাখা যে, আমি কীভাবে অর্থ উপার্জন করছি? কোন্ খাতে খরচ করছি?
  • যেকোন বস্তু দেখলেই ক্রয় করতে উৎসাহী না হওয়া। নফসের কাছে আত্মসমর্পণ থেকে  নিজেকে সংযত রাখতে শেখা।

সন্তানের খরচ

সন্তানের ব্যয়ভার কতটুকু হবে? হাত-খরচ কেমন হবে? এ ক্ষেত্রে অনেক কিছু শেখার রয়েছে। জানতে হয় অনেক নিয়মনীতি। সন্তানের খরচকে কেন্দ্র করে যেগুলো শেখানো প্রয়োজন, তাহল-

  • তাকে বাজেট গ্রহণে মিতব্যয়িতা এবং খরচের দায়ভার নিজেকেই গ্রহণ করার প্রশিক্ষণ দেয়া।
  • খরচে অভ্যস্ত করা। যেমন: কোন বন্ধুর হাত-খরচের ব্যবস্থা নেই, তার জন্য কিছু খরচ করা।
  • খরচের টাকা থেকে কিছু জমা করে প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র কেনার অভ্যাস গড়ে তোলা।
উল্লেখ্য, যে বিষয়টি বেশি গুরুত্বের দাবি রাখে তাহল- সন্তানের খরচে ভারসাম্য রক্ষা করা। এত বেশি পরিমাণ দেয়া থেকে বিরত থাকা, যা তাকে লাইনচ্যুত করে দেয়। পক্ষান্তরে পরিমাণে এত কম না দেয়া, যা তার মধ্যে বঞ্চিত হওয়ার অনুভূতি সৃষ্টি করে।

সন্তানের সহপাঠী ছেলে বন্ধুদের সাথে আচরণ

ছেলে-মেয়েদের থাকে অনেক বন্ধু-বান্ধব। প্রত্যেক পিতা-মাতাকে তাদের সাথে কোমল আচরণ করতে হবে। তাদের প্রতি দেখাতে হবে স্নেহ-ভালোবাসা। তারা বাড়িতে আসলে করতে হবে আদর-যত্ন। দিতে হবে মেহমানের মর্যাদা। এতে ছেলে-মেয়েরা মাতা-পিতার প্রতি হবে আগ্রহী। নিজেদের ব্যাপারে হবে আস্থাশীল। অন্ধকার জগতের দিকে অগ্রসর হবে না তাদের যাত্রা। বন্ধু নির্বাচনে হবে না তারা বেপরোয়া।

কাজের পূর্বেই আদব শিক্ষা দেয়া

কোন কাজ করার পূর্বেই সন্তানকে উক্ত কাজের আদব শিক্ষা দিতে হয়। অনেক সময় কাজের ফাঁকে ফাঁকে আদব শিক্ষা দেয়া যায়। তবে আদব শিক্ষা দেয়ার সময় খেয়াল রাখতে হবে, সে যেন বিরক্ত বা ক্লান্ত হয়ে না পড়ে। এ জন্য ধীরে ধীরে, থেমে থেমে আদব শিক্ষা দিতে হবে। এভাবে একপর্যায়ে এগুলো তার আয়ত্তে এসে যাবে। পরিণত হবে তার অভ্যাসে। আর তারবিয়াতের উদ্দেশ্য হলো আমল ও স্বভাবে পরিণত হওয়া। নিছক জানিয়ে দেয়া উদ্দেশ্য নয়। উমার ইবনু আবী সালামা (রাযিয়াল্লাহু আনহু) বলেন,

كُنْتُ غُلَامًا فِىْ حَجْرِ رَسُوْلِ اللهِ وَكَانَتْ يَدِى تَطِيْشُ فِى الصَّحْفَةِ فَقَالَ لِىْ رَسُوْلُ اللهِ «يَا غُلَامُ سَمِّ اللهَ، وَكُلْ بِيَمِيْنِكَ وَكُلْ مِمَّا يَلِيْكَ». فَمَا زَالَتْ تِلْكَ طِعْمَتِىْ بَعْدُ.

‘আমি শৈশবকালে নবী করীম (ﷺ)-এর কোলে ছিলাম। প্লেটে রাখা খাবার ইচ্ছামত যেখান সেখান থেকে উঠিয়ে আহার করছিলাম। আমাকে লক্ষ্য করে রাসূল (ﷺ) বললেন, ‘হে ছেলে! আল্লাহর নামে খাও, ডান হাতে খাও এবং নিজের সামনে থেকে খাও'। পরবর্তী সময়ে এ আদবগুলো আমার অভ্যাসে পরিণত হয়ে গিয়েছিল’।[১]

সুযোগের সদ্ব্যবহার করা

সন্তানের জীবনকে সফল করতে তাকে শিক্ষা দিতে হবে হাতের নাগালে আসা সুযোগ কীভাবে কাজে লাগাতে হয়?  ‘আমর ইবনু সালামা (রাযিয়াল্লাহু আনহুমা) বলেন,

كُنَّا بِحَاضِرٍ يَمُرُّ بِنَا النَّاسُ إِذَا أَتَوُا النَّبِىَّ فَكَانُوا إِذَا رَجَعُوْا مَرُّوْا بِنَا فَأَخْبَرُوْنَا أَنَّ رَسُوْلَ اللهِ قَالَ كَذَا وَكَذَا وَكُنْتُ غُلَامًا حَافِظًا فَحَفِظْتُ مِنْ ذَلِكَ قُرْآنًا كَثِيْرًا فَانْطَلَقَ أَبِىْ وَافِدًا إِلَى رَسُوْلِ اللهِ فِىْ نَفَرٍ مِنْ قَوْمِهِ فَعَلَّمَهُمُ الصَّلَاةَ فَقَالَ «يَؤُمُّكُمْ أَقْرَؤُكُمْ». وَكُنْتُ أَقْرَأَهُمْ لِمَا كُنْتُ أَحْفَظُ فَقَدَّمُوْنِىْ فَكُنْتُ أَؤُمُّهُمْ وَعَلَىَّ بُرْدَةٌ لِىْ صَغِيْرَةٌ صَفْرَاءُ فَكُنْتُ إِذَا سَجَدْتُ تَكَشَّفَتْ عَنِّى فَقَالَتِ امْرَأَةٌ مِنَ النِّسَاءِ وَارُوا عَنَّا عَوْرَةَ قَارِئِكُمْ. فَاشْتَرَوْا لِىْ قَمِيْصًا عُمَانِيًّا فَمَا فَرِحْتُ بِشَىْءٍ بَعْدَ الإِسْلَامِ فَرَحِى بِهِ فَكُنْتُ أَؤُمُّهُمْ وَأَنَا ابْنُ سَبْعِ سِنِيْنَ أَوْ ثَمَانِ سِنِيْنَ.


‘আমরা এমন জায়গায় সমবেত ছিলাম যে, লোকেরা আমাদের পাশ দিয়ে নবী (ﷺ)-এর নিকট যাতায়াত করত এবং প্রত্যাবর্তনের সময় তারা আমাদের পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় বর্ণনা করত, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) এরূপ এরূপ বলেছেন। তখন আমি বালক ছিলাম, যা শুনতাম তাই মুখস্থ করে ফেলতাম। শুনে শুনে আমি কুরআনের কিছু অংশও মুখস্থ করে ফেলি। একবার আমার পিতা কিছু সংখ্যক লোকসহ রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর নিকট গেলেন। তিনি তাদেরকে ছালাতের নিয়ম-কানুন শিক্ষা দিলেন। তিনি আরো বললেন, তোমাদের মধ্যকার কুরআন সম্পর্কে সবচেয়ে অভিজ্ঞ ব্যক্তি ইমামতি করবে। আর আমিই ছিলাম কুরআন সম্পর্কে সর্বাধিক অভিজ্ঞ এবং সকলের চেয়ে আমারই কুরআন বেশী মুখস্থ ছিল। সেহেতু তারা আমাকে ইমাম নিযুক্ত করল। আমি তাদের ইমমতি করতাম। এ সময় আমার গায়ে ছোট একটি গেরুয়া রংয়ের চাদর ছিল। আমি যখন সাজদায় যেতাম তখন আমার লজ্জাস্থান অনাবৃত হয়ে যেত। এক মহিলা বলল, তোমাদের ক্বারীর লজ্জাস্থান ঢাকার ব্যবস্থা কর। তারা আমার জন্য একটি ওমানী চাদর খরিদ করল। এতে আমি এতই আনন্দিত হই যে, ইসলাম গ্রহণের পর আর কিছুতে আমি এতটা আনন্দিত হইনি। আমার বয়স যখন মাত্র সাত কি আট বছর তখন থেকেই আমি তাদের ইমামতি করতাম’।[২]

সুধী পাঠক! এটা ছিল নাগালের সুযোগ কাজে লাগানোর নগদ পুরস্কার! তাই আমাদের সন্তানদের যথাসম্ভব আশপাশের সুযোগগুলো কাজে লাগানোর ব্যাপারে সজাগ করতে হবে। তাহলে তারা সমবয়স্কদের মধ্যে অন্য রকম মর্যাদার অধিকারী হতে পারবে।

খাবারে মধ্যপন্থা অবলম্বন করা

ইবনুল ক্বাইয়্যিম (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন, ‘বাচ্চাদের বদ অভ্যাসগুলোর অন্যতম হলো, তারা পেট ভরে খাবার খায়। অতি ভোজনে অভ্যস্ত হয়ে পড়ে। পানাহার বেশি করলেই মাতা-পিতা খুশিতে আটখানা হয়ে পড়ে! আসলে এমন ব্যবস্থাপনা তাদের জন্য খুবই ক্ষতিকর। তাদের জন্য সর্বোত্তম ব্যবস্থা হলো, এ পরিমাণ খাদ্য তার সামনে রাখা, যা ভোজন করার পর তৃপ্ত হতে একটু বাকি থাকে। এতে তাদের হজমশক্তি মজবুত হবে। তাদের দেহরস ভারসাম্যপূর্ণ হবে। শরীরে বর্জ্যপদার্থ হ্রাস পাবে। দেহ থাকবে সুস্থ-সবল। রোগ হবে মাত্রাতিরিক্ত কম। ঠাণ্ডার প্রকোপ থেকে বেঁচে থাকতে সহায়ক হবে। থাকবে না হৃদরোগ কিংবা পেট ব্যথা।[৩]

(ইনশাআল্লাহ চলবে)


* মাদারটেক, ঢাকা।

তথ্যসূত্র :
[১]. ছহীহ বুখারী, হা/৫৩৭৬; ছহীহ মুসলিম, হা/২০২২; ইবনু মাজাহ, হা/৩২৬৭; মুসনাদে আহমাদ, হা/১৬৩৭৫।
[২]. আবূ দাঊদ, হা/৫৮৫ ‘ইমামতির অধিক যোগ্য কে?’ অনুচ্ছেদ-৬১, ‘ছালাত’ অধ্যায়-২।
[৩]. তুহফাতুল মাউলূদ, পৃ. ১৬৬।




প্রসঙ্গসমূহ »: পরিবার নারীমঞ্চ
ইসলামিক প্যারেন্টিং (৮ম কিস্তি) - তিনা খান
স্ত্রীর প্রতি স্বামীর দায়িত্ব ও কর্তব্য (২য় কিস্তি) - তামান্না তাসনীম
ইসলামিক প্যারেন্টিং (৩য় কিস্তি) - তিনা খান
ইসলামিক প্যারেন্টিং (২য় কিস্তি) - তিনা খান
আল-কুরআনে নারী কেন্দ্রিক আলোচনা ও শিক্ষনীয় বিষয়সমূহ - ওবাইদুল্লাহ আল-আমীন
শারঈ পর্দা : একটি পর্যালোচনা (৯ম কিস্তি) - ওবাইদুল্লাহ আল-আমীন
শারঈ পর্দা : একটি পর্যালোচনা (৫ম কিস্তি) - ওবাইদুল্লাহ আল-আমীন
ইসলামিক প্যারেন্টিং (৭ম কিস্তি) - তিনা খান
প্রশ্নোত্তরে নারীদের ছালাত শিক্ষা (৩য় কিস্তি) - আব্দুল গাফফার মাদানী
ইসলামে ব্যবসা-বাণিজ্যের রূপরেখা - গুলশান আখতার
শারঈ পর্দা : একটি পর্যালোচনা (শেষ কিস্তি) - ওবাইদুল্লাহ আল-আমীন
প্রশ্নোত্তরে মুসলিম নারীদের ইসলাম শিক্ষা (৪র্থ কিস্তি) - আব্দুল গাফফার মাদানী

ফেসবুক পেজ