শনিবার, ০৭ মার্চ ২০২৬, ০২:০৯ অপরাহ্ন

প্রশ্নোত্তরে নারীদের ছালাত শিক্ষা 

-শায়খ আব্দুল গাফফার মাদানী* 


(২য় কিস্তি)  

প্রশ্ন : আয়েশা (রাযিয়াল্লাহু আনহা) বলেন,
لَوْ أَدْرَكَ رَسُوْلُ اللهِ ﷺ مَا أَحْدَثَ النِّسَاءُ لَمَنَعَهُنَّ كَمَا مُنِعَتْ نِسَاءُ بَنِيْ إِسْرَائِيْلَ‏
‘যদি আল্লাহর রাসূল (ﷺ) জানতেন যে, নারীরা কী অবস্থা সৃষ্টি করেছে, তাহলে বনী ইসরাঈলের নারীদের যেমন বারণ করা হয়েছিল, তেমনি এদেরও (মসজিদে আসা) নিষেধ করে দিতেন’ (ছহীহ বুখারী, হা/৮৬৯)। ছহীহ বুখারী ও ছহীহ মুসলিমে বর্ণিত উক্ত হাদীছটির সমাধান কিভাবে হবে?

উত্তর : এ বিষয়ে সব থেকে গুরুত্বপূর্ণ দিক-নির্দেশনা দিয়েছেন আবূ মুহাম্মাদ ইবনু হাজম (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন, যে হাদীছ আয়েশা (রাযিয়াল্লাহু আনহা) বর্ণনা করেছেন সেটি নিষেধ হওয়ার ক্ষেত্রে দলীল নয় কয়েকটি কারণে। যথা:
প্রথমতঃ রাসূলুল্লাহ (ﷺ) ঐ নারীদেরকে পাননি যারা কিছু সৃষ্টি করেছে এবং তাদেরকে নিষেধ করেননি। অতএব তাদেরকে যেহেতু নিষেধ করেননি সে ক্ষেত্রে তাদের নিষেধ করাটা বিদ‘আত এবং ত্রুটিপূর্ণ, এই কথাটি আল্লাহ তা‘আলার ঐ কথার মত

يٰنِسَآءَ النَّبِيِّ مَنْ يَّاْتِ مِنْكُنَّ بِفَاحِشَةٍ مُّبَيِّنَةٍ يُّضٰعَفْ لَهَا الْعَذَابُ ضِعْفَيْنِ

‘হে নবী-পত্নীগণ! তোমাদের মধ্যে কেউ কোন প্রকাশ্য অশ্লীল কাজ করলে তাকে দ্বিগুণ শাস্তি দেয়া হবে’ (সূরা আল-আহযাব: ৩০)।

বিধায় রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর স্ত্রীগণ প্রকাশ্যে অশ্লীল কাজ করেননি আর তাদের শাস্তি দ্বিগুণ করা হয়নি, আলহামদুলিল্লাহ। আর আল্লাহর ঐ কথার মত

وَ لَوْ اَنَّ اَهْلَ الْقُرٰۤى اٰمَنُوْا وَ اتَّقَوْا لَفَتَحْنَا عَلَيْهِمْ بَرَكٰتٍ مِّنَ السَّمَآءِ وَ الْاَرْضِ

‘আর যদি সে সব জনপদের অধিবাসীরা ঈমান আনত এবং তাক্বওয়া অবলম্বন করত তবে অবশ্যই আমরা তাদের জন্য আসমান ও যমীনের বরকতসমূহ উন্মুক্ত করে দিতাম’ (সূরা আল-আ‘রাফ: ৯৬)।

অতএব তারা ঈমান আনেনি আর তাদের জন্য বরকতের দরজা উন্মুক্ত করা হয়নি। আর সবচেয়ে নিম্নমানের দুর্বল দলীল হল এই কথা বলা যে, যদি এমন হত তাহলে এই রূপ হত বা এমন হতো ইত্যাদি।

দ্বিতীয়তঃ অবশ্যই আল্লাহ রাব্বুল আলামীন জানেন যে, নারীরা কী করবে বা কী ঘটাবে/সৃষ্টি করবে। অতএব যে ব্যক্তি নারীদের মসজিদে যাওয়াটা অবৈধতার অস্বীকার করবে সে কুফরি করল। কেন না যে আল্লাহ তা‘আলা তাঁর রাসূল (ﷺ)-এর কাছে এ বিষয়ে কোন ওহী করেননি যে তাদের নারীদের অপরাধের কারণে পুরুষেরা স্ত্রীদেরকে মসজিদে যেতে নিষেধ করবে। অতএব যেহেতু আল্লাহ তা‘আলা এ বিষয়ে কোন কিছুই বলেননি সেহেতু এই ধরনের মন্তব্য বা ধারণা করা চূড়ান্তই ভুল।

তৃতীয়তঃ আমরা জানি না যে, মহিলারা কী ঘটাবে যা রাসূল (ﷺ)-এর যুগে ঘটায়নি। আর তারা যেনার চাইতে আর বেশি কিছু ঘটাতে পারবে না। অথচ রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর যুগে যেনার কাজ সংঘটিত হয়েছে এবং সে বিষয়ে রজম করা হয়েছে বেত্রাঘাত করা হয়েছে এরপরেও তাদেরকে মসজিদে যেতে নিষেধ করা হয়নি। আর যেনার বিধান পুরুষদের ওপর যেমন হারাম ঠিক মহিলাদের ক্ষেত্রেও তেমনি হারাম এর মধ্যে কোন পার্থক্য নেই। তাহলে কী করে যেনার কারণে নারীদেরকে মসজিদ থেকে নিষেধ করা হচ্ছে? অথচ এই কারণেই পুরুষদেরকে তো মসজিদ থেকে নিষেধ করা হয় না। এই ধরনের কারণ উল্লেখ করাটা আল্লাহ এবং তাঁর রাসূল (ﷺ) পছন্দ করেন না।

চতুর্থতঃ নিঃসন্দেহে এই দুর্ঘটনা কতিপয় নারীর মাধ্যমে হয়ে থাকে, আর একজনের অপরাধের কারণে অধিকাংশকে কল্যাণ থেকে নিষেধ করা অসম্ভব। অন্যথা এ বিষয়ে স্পষ্ট আল্লাহ এবং তাঁর রাসূল (ﷺ)-এর কথার দলীল পেশ করা হলে সেটা মানা হবে এবং আনুগত্য করা হবে। আল্লাহ তা‘আলা বলেন,

وَ لَا تَكْسِبُ كُلُّ نَفْسٍ اِلَّا عَلَيْهَا١ۚ وَ لَا تَزِرُ وَازِرَةٌ وِّزْرَ اُخْرٰى

‘প্রত্যেকে নিজ নিজ কৃতকর্মের জন্য দায়ী এবং কেউ অন্য কারো ভার গ্রহণ করবে না’ (সূরা আল-আন‘আম: ১৬৪)।

পঞ্চমতঃ যদি তাদের কোন কিছু ঘটানোর কারণে মসজিদ থেকে নিষেধ করা হয়, তাহলে তাদেরকে বাজার থেকে  নিষেধ করা এবং প্রত্যেক রাস্তাঘাটে চলাফেরা করা থেকে নিষেধ করা অধিকতার উত্তম। অথচ তাদের অপরাধের কারণে তাদেরকে মসজিদ থেকে নিষেধ করা হচ্ছে অন্য কোন রাস্তায় চলা ফেরা করতে নিষেধ করা হচ্ছে না?! আর আবূ হানীফা (রাহিমাহুল্লাহ) তাদেরকে একাকী চলাফেরা করতে এবং সফর করতে বৈধতা দিয়েছেন তিনি সেটাকে মাকরূহ বলেননি!!

ষষ্ঠতঃ আয়েশা (রাযিয়াল্লাহু আনহা) এই কারণে তাদের নিষেধের পক্ষে নন এবং তিনি এ কথা বলেননি যে, তারা কোন অন্যায় করলে তাদেরকে মসজিদ থেকে নিষেধ করবে। বরং তিনি এক কথায় বলে গেছেন যে, যদি রাসূলুল্লাহ (ﷺ) থাকতেন, তাহলে হয়তোবা তাদেরকে নিষেধ করতেন এবং আমরা বলব যদি রাসূলুল্লাহ (ﷺ) তাদেরকে নিষেধ করতেন আমরাও তাদেরকে নিষেধ করতাম। যেহেতু তিনি তাদেরকে নিষেধ করেননি আমরাও তাদেরকে নিষেধ করব না। অতএব যারা এটিকে নিষেধ মনে করেন তারা শুধু সুন্নাতের বিরোধ এবং আয়েশা (রাযিয়াল্লাহু আনহা)-এর বিরোধ করে থাকেন মাত্র। পক্ষান্তরে যারা তাদের এই ধারণার বশবর্তী অনুসরণ করে সেটা মিথ্যা যে, আয়েশা (রাযিয়াল্লাহু আনহা) নারীদের মসজিদে নিষেধ করেছেন অথচ তিনি একথা কোনদিনই বলেননি (নাউযূবিল্লাহ)।[১]
----

প্রশ্ন : নারীদের জন্য বাড়িতে ছালাত আদায় করা উত্তম, না-কি মসজিদে ছালাত আদায় করা উত্তম?

উত্তর : নারীদের জন্য মসজিদে গিয়ে জামা‘আতের সাথে ছালাত আদায় করা জায়েয। তবে তাদের বাড়িতে ছালাত আদায় করাই উত্তম। এ বিষয়ে বেশ কিছু হাদীছ ছহীহ সূত্রে বর্ণিত হয়েছে। যেমন,

عَنِ ابْنِ عُمَرَ، قَالَ قَالَ رَسُوْلُ اللهِ ﷺ‏ ‏لَا تَمْنَعُوْا نِسَاءَكُمُ الْمَسَاجِدَ وَبُيُوْتُهُنَّ خَيْرٌ لَهُنَّ‏

ইবনু উমার (রাযিয়াল্লাহু আনহুমা) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেন, তোমরা তোমাদের নারীদের মসজিদে যেতে নিষেধ করো না। তবে তাদের ঘরই তাদের জন্য উত্তম।[২]

عَنْ عَبْدِ اللهِ، عَنِ النَّبِيِّ ﷺ قَالَ ‏ ‏صَلَاةُ الْمَرْأَةِ فِيْ بَيْتِهَا أَفْضَلُ مِنْ صَلَاتِهَا فِيْ حُجْرَتِهَا وَصَلَاتُهَا فِيْ مَخْدَعِهَا أَفْضَلُ مِنْ صَلَاتِهَا فِيْ بَيْتِهَا‏

আব্দুল্লাহ ইবনু মাসঊদ (রাযিয়াল্লাহু আনহুমা) হতে বর্ণিত। নবী (ﷺ) বলেন, ‘মহিলাদের ঘরে ছালাত আদায় করা বৈঠকখানায় ছালাত আদায় করার চাইতে উত্তম এবং মহিলাদের সাধারণ থাকার ঘরে ছালাত আদায় করার চেয়ে গোপন প্রকোষ্ঠে ছালাত আদায় করা অধিক উত্তম’।[৩] ইমাম যাহাবী (রাহিমাহুল্লাহ) তার সাথে একমত পোষণ করেছেন,

وَصَلَاتُهَا فِيْ مَخْدَعِهَا أَفْضَلُ مِنْ صَلَاتِهَا فِيْ بَيْتِهَا

‘বাড়ীর প্রশস্ত আঙিনায় ছালাত আদায় করার চাইতে ঘরের ছোট প্রকোষ্টে ছালাত আদায় করা তাদের জন্য উত্তম। কেননা তাদের প্রতি এ নির্দেশের ভিত্তি হচ্ছে পর্দা। কাজেই যেখানে যত বেশী পর্দা রক্ষিত হবে সেখানে ছালাত আদায় করা তাদের জন্য উত্তম।

উপরে বর্ণিত হাদীছগুলোর মূল কথা হলো ‘পুরুষের জন্য মহিলাদেরকে মসজিদে যাওয়ার অনুমতি দেয়া তখন ওয়াজিব অথবা মুস্তাহাব যখন তারা সুগন্ধি, গহনা ও সাজসজ্জা বর্জন করবে। পক্ষান্তরে তারা যখন এগুলো বর্জন না করবে তখন পুরুষের পক্ষে তাদের স্ত্রীদেরকে মসজিদে যাওয়ার অনুমতি দেয়া ওয়াজিব নয়।
----

প্রশ্ন : ইমাম ছাহেবের জন্য ছালাতে মহিলা মুক্তাদির প্রতি লক্ষ্য/খেয়াল করা কি শরী‘আতসম্মত?

উত্তর : হ্যাঁ, ইমাম ছাহেবের জন্য ছালাতে মহিলা মুক্তাদির প্রতি লক্ষ্য করা শরী‘আত সম্মত, যাতে করে তাদের বাচ্চাদের জন্য তাদের কষ্টের কারণ না হয়।

عَنْ عَبْدِ اللهِ بْنِ أَبِيْ قَتَادَةَ عَنْ أَبِيْهِ أَبِيْ قَتَادَةَ عَنِ النَّبِيِّ ﷺ قَالَ إِنِّيْ لَأَقُوْمُ فِي الصَّلَاةِ أُرِيْدُ أَنْ أُطَوِّلَ فِيْهَا فَأَسْمَعُ بُكَاءَ الصَّبِيِّ فَأَتَجَوَّزُ فِيْ صَلَاتِيْ كَرَاهِيَةَ أَنْ أَشُقَّ عَلَى أُمِّهِ تَابَعَهُ

আবূ ক্বাতাদা (রাযিয়াল্লাহু আনহু) হতে বর্ণিত, নবী (ﷺ) বলেন, আমি অনেক সময় দীর্ঘ করে ছালাত আদায়ের ইচ্ছা নিয়ে দাঁড়াই। পরে শিশুর কান্নাকাটি শুনে ছালাত সংক্ষেপ করি। কারণ শিশুর মাকে কষ্টে ফেলা আমি পসন্দ করি না।[৪] আয়িশা (রাযিয়াল্লাহু আনহা) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন,

عَنْ عَائِشَةَ، قَالَتْ أَعْتَمَ رَسُوْلُ اللهِ ﷺ بِالْعِشَاءِ حَتَّى نَادَاهُ عُمَرُ الصَّلَاةَ، نَامَ النِّسَاءُ وَالصِّبْيَانُ‏.‏

‘একদা রাসূলুল্লাহ (ﷺ) এশার ছালাত আদায় করতে দেরী করলেন। উমর (রাযিয়াল্লাহু আনহু) তাঁকে বললেন, আছ-ছালাত। নারী ও শিশুরা ঘুমিয়ে পড়েছে’।[৫]
----

প্রশ্ন : মহিলারা ইমামের সাথে ছালাত আদায়ের করলে ছালাত শেষে যিকিরের জন্য অবস্থান করা না-কি দ্রুত বাসায় চলে যাওয়া উত্তম?

উত্তর : মহিলারা যখন ইমামের সাথে মসজিদে ছালাত আদায় করবে তখন তাদের জন্য উত্তম হলো ছালাম ফেরানোর সাথে সাথে বাড়িতে ফিরে আসা মসজিদে অপেক্ষা না করা, এজন্য যে যাতে করে রাস্তায় পুরুষদের সাথে সংমিশ্রণ না ঘটে।

عَنْ عَائِشَةَ، رَضِىَ اللهُ عَنْهُ أَنَّ رَسُوْلَ اللهِ ﷺ كَانَ يُصَلِّي الصُّبْحَ بِغَلَسٍ فَيَنْصَرِفْنَ نِسَاءُ الْمُؤْمِنِينَ، لَا يُعْرَفْنَ مِنَ الْغَلَسِ، أَوْ لَا يَعْرِفُ بَعْضُهُنَّ بَعْضًا‏.‏

আয়িশা (রাযিয়াল্লাহু আনহা) থেকে বর্ণিত, রাসূল (ﷺ) অন্ধকার থাকতেই ফজরের ছালাত আদায় করতেন। এরপর মুমিনদের স্ত্রীগণ চলে যেতেন, অন্ধকারের জন্য তাদের চেনা যেত না অথবা বলেছেন, অন্ধকারের জন্য তাঁরা একে অপরকে চিনতেন না।[৬]

عَنْ عَائِشَةَ، قَالَتْ إِنْ كَانَ رَسُوْلُ اللهِ ﷺ لَيُصَلِّي الصُّبْحَ فَيَنْصَرِفُ النِّسَاءُ مُتَلَفِّعَاتٍ بِمُرُوْطِهِنَّ مَا يُعْرَفْنَ مِنَ الْغَلَسِ ‏.‏

আয়িশা (রাযিয়াল্লাহু আনহা) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) এমন সময় ফজরের ছালাত আদায় করতেন যে, মহিলারা গায়ে চাদর জড়িয়ে চলে যেতেন, কিন্তু অন্ধকার হেতু তাদেরকে চেনা যেতো না।[৭]

أَنَّ أُمَّ سَلَمَةَ زَوْجَ النَّبِيِّ ﷺ أَخْبَرَتْهَا أَنَّ النِّسَاءَ فِيْ عَهْدِ رَسُوْلِ اللهِ كُنَّ إِذَا سَلَّمْنَ مِنَ الْمَكْتُوْبَةِ قُمْنَ وَثَبَتَ رَسُوْلُ اللهِ ﷺ وَمَنْ صَلَّى مِنْ الرِّجَالِ مَا شَاءَ اللهُ فَإِذَا قَامَ رَسُوْلُ اللهِ ﷺ قَامَ الرِّجَالُ

নবী (ﷺ)-এর স্ত্রী সালামাহ (রাযিয়াল্লাহু আনহা) তাঁকে জানিয়েছেন, নারীরা আল্লাহর রাসূল (ﷺ)-এর সময় ফরয ছালাতের সালাম ফিরানোর সাথে সাথে উঠে যেতেন এবং আল্লাহর রাসূল (ﷺ)ও তাঁর সঙ্গে ছালাত আদায়কারী পুরুষগণ, আল্লাহ যতক্ষণ ইচ্ছা করেন অবস্থান করতেন। অতঃপর আল্লাহর রাসূল (ﷺ) উঠলে পুরুষরাও উঠে যেতেন।[৮]

عَنْ هِنْدٍ بِنْتِ الْحَارِثِ، أَنَّ أُمَّ سَلَمَةَ رَضِىَ اللهُ عَنْهُ قَالَتْ كَانَ رَسُوْلُ اللهِ ﷺ إِذَا سَلَّمَ قَامَ النِّسَاءُ حِيْنَ يَقْضِي تَسْلِيْمَهُ، وَمَكَثَ يَسِيْرًا قَبْلَ أَنْ يَقُوْمَ‏.‏ قَالَ ابْنُ شِهَابٍ فَأُرَى ـ وَاللهُ أَعْلَمُ ـ أَنَّ مُكْثَهُ لِكَىْ يَنْفُذَ النِّسَاءُ قَبْلَ أَنْ يُدْرِكَهُنَّ مَنِ انْصَرَفَ مِنَ الْقَوْمِ‏.‏

উম্মু সালামাহ (রাযিয়াল্লাহু আনহা) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আল্লাহর রাসূল (ﷺ) যখন সালাম ফিরাতেন, তখন সালাম শেষ হলেই মহিলাগণ দাঁড়িয়ে পড়তেন। তিনি দাঁড়ানোর পূর্বে কিছুক্ষণ বসে অপেক্ষা করতেন। ইবনু শিহাব (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন, আল্লাহই ভাল জানেন, আমার মনে হয়, তাঁর এ অপেক্ষা এ কারণে যাতে মুছল্লীগণ হতে যে সব পুরুষ ফিরে যান তাদের পূর্বেই মহিলারা নিজ অবস্থানে পৌঁছে যেতে পারেন।[৯]
----

প্রশ্ন : মহিলারা কি মসজিদে ঘুমাতে পারবে বা নফল ছালাত আদায় করতে পারবে?

উত্তর : যদি ফিতনা মুক্ত হয় তাহলে মহিলারা মসজিদে নফল ছালাত আদায় করতে পারবে এবং ঘুমাতে পারবে। হাদীছে এসেছে,

قَالَ دَخَلَ النَّبِيُّ ﷺ فَإِذَا حَبْلٌ مَمْدُوْدٌ بَيْنَ السَّارِيَتَيْنِ فَقَالَ مَا هَذَا الْحَبْلُ.‏ قَالُوْا هَذَا حَبْلٌ لِزَيْنَبَ فَإِذَا فَتَرَتْ تَعَلَّقَتْ‏.‏ فَقَالَ النَّبِيُّ ﷺ‏ لَا، حُلُّوْهُ، لِيُصَلِّ أَحَدُكُمْ نَشَاطَهُ، فَإِذَا فَتَرَ فَلْيَقْعُدْ.‏

আনাস ইবনু মালিক (রাযিয়াল্লাহু আনহু) হতে বর্ণিত, নবী (ﷺ) (মসজিদে) প্রবেশ করে দেখতে পেলেন যে, দু’টি স্তম্ভের মাঝে একটি রশি টাঙানো রয়েছে। তিনি জিজ্ঞাসা করলেন, এ রশিটি কি কাজের জন্য? লোকেরা বলল, এটি যায়নাবের রশি, তিনি (ইবাদত করতে করতে) অবসন্ন হয়ে পড়লে এটির সাথে নিজেকে বেঁধে দেন। রাসূল (ﷺ) ইরশাদ করলেন, না, ওটা খুলে ফেল। তোমাদের যে কোন ব্যাক্তির প্রফুল্লতা ও সজীবতা থাকা পর্যন্ত ইবাদত করা উচিত। যখন সে ক্লান্ত হয়ে পড়ে তখন যেন সে বসে পড়ে।[১০]

عَنْ عَائِشَةَ زَوْجِ النَّبِيِّ ﷺ أَنَّ النَّبِيَّ كَانَ يَعْتَكِفُ الْعَشْرَ الْأَوَاخِرَ مِنْ رَمَضَانَ حَتَّى تَوَفَّاهُ اللهُ ثُمَّ اعْتَكَفَ أَزْوَاجُهُ مِنْ بَعْدِهِ

আয়িশা (রাযিয়াল্লাহু আনহা) হতে বর্ণিত, নবী (ﷺ) রামাযানের শেষ দশক ই‘তিকাফ করতেন। তাঁর ওফাত পর্যন্ত এই নিয়মই ছিল। এরপর তাঁর সহধর্মিণীগণও (সে দিনগুলোতে) ই‘তিকাফ করতেন।[১১]

عَنْ عَائِشَةَ قَالَتْ كَانَ رَسُوْلُ اللهِ ﷺ يَعْتَكِفُ فِيْ كُلِّ رَمَضَانٍ وَإِذَا صَلَّى الْغَدَاةَ دَخَلَ مَكَانَهُ الَّذِي اعْتَكَفَ فِيْهِ قَالَ فَاسْتَأْذَنَتْهُ عَائِشَةُ أَنْ تَعْتَكِفَ فَأَذِنَ لَهَا فَضَرَبَتْ فِيْهِ قُبَّةً فَسَمِعَتْ بِهَا حَفْصَةُ فَضَرَبَتْ قُبَّةً وَسَمِعَتْ زَيْنَبُ بِهَا فَضَرَبَتْ قُبَّةً أُخْرَى

আয়িশা (রাযিয়াল্লাহু আনহা) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আল্লাহর রাসূল (ﷺ) প্রতি রামাযানে ই‘তিকাফ করতেন। ফজরের ছালাত শেষে ই‘তিকাফের নির্দিষ্ট স্থানে প্রবেশ করতেন। আয়িশা (রাযিয়াল্লাহু আনহা) তাঁর কাছে ই‘তিকাফ করার অনুমতি চাইলে তিনি অনুমতি দিলেন। আয়িশা (রাযিয়াল্লাহু আনহা) মসজিদে (নিজের জন্য) একটি তাঁবু করে নিলেন। হাফছা (রাযিয়াল্লাহু আনহা) তা শুনে (নিজের জন্য) একটি তাঁবু তৈরি করে নিলেন এবং যায়নাব (রাযিয়াল্লাহু আনহা)-ও তা শুনে (নিজের জন্য) আর একটি তাঁবু তৈরি করে নিলেন।[১২]
----

প্রশ : মহিলারা কি মসজিদ ঝাড়ু দিতে/পরিষ্কার করতে পারবে?

উত্তর : হ্যাঁ, মহিলারা মসজিদ পরিষ্কার করতে পারবে এবং ঝাড়ু দিতে পারবে।

কেননা রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর যুগে এক মহিলা মসজিদে নববী ঝাড়ু দিতেন এবং পরিষ্কার করতেন মর্মে হাদীছ বর্ণিত হয়েছে।

عَنْ أَبِيْ هُرَيْرَةَ أَنَّ امْرَأَةً، سَوْدَاءَ كَانَتْ تَقُمُّ الْمَسْجِدَ أَوْ شَابًّا فَفَقَدَهَا رَسُوْلُ اللهِ ﷺ فَسَأَلَ عَنْهَا أَوْ عَنْهُ فَقَالُوْا مَاتَ.‏ قَالَ أَفَلَا كُنْتُمْ آذَنْتُمُوْنِيْ ‏قَالَ فَكَأَنَّهُمْ صَغَّرُوْا أَمْرَهَا- أَوْ أَمْرَهُ- فَقَالَ

আবূ হুরায়রা (রাযিয়াল্লাহু আনহু) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, একজন কালো অথবা একজন যুবক মসজিদ ঝাড়ু দিত। রাসুলুল্লাহ (সা.) তাকে কয়েক দিন না পেয়ে তার সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করলেন। লোকেরা তাকে জানালেন, সে মারা গিয়াছে। রাসুলুল্লাহ (ﷺ) বললেন, তোমরা আমাকে জানাওনি কেন? রাবী বলেন, তারা যেন তাঁর ব্যাপারটি তুচ্ছ মনে করেছিলেন।[১৩]

عَنْ أَبِيْ رَافِعٍ عَنْ أَبِيْ هُرَيْرَةَ أَنَّ امْرَأَةً سَوْدَاءَ كَانَتْ تَقُمُّ الْمَسْجِدَ فَفَقَدَهَا رَسُوْلُ اللهِ ﷺ فَسَأَلَ عَنْهَا بَعْدَ أَيَّامٍ فَقِيْلَ لَهُ إِنَّهَا مَاتَتْ قَالَ فَهَلَّا آذَنْتُمُوْنِيْ فَأَتَى قَبْرَهَا فَصَلَّى عَلَيْهَا

আবূ হুরাইরা (রাযিয়াল্লাহু আনহু) থেকে বর্ণিত। এক কৃষ্ণকায় নারী মসজিদে নববীতে ঝাড়ু দিত। রাসূলুল্লাহ (ﷺ) তাকে দেখতে না পেয়ে কয়েক দিন পর তিনি তার সম্পর্কে জিজ্ঞেস করেন। তাঁকে জানানো হলো যে, সে মারা গেছে। তিনি বলেন, তোমরা কেন আমাকে অবহিত করোনি? অতঃপর তিনি তার কবরের পাশে আসেন এবং তার জানাযার ছালাত পড়েন।[১৪]

(ইনশাআল্লাহ চলবে)


*  সিনিয়র মুহাদ্দিছ, দারুল হুদা ইসলামী কমপ্লেক্স, বাঘা, রাজশাহী।

তথ্যসূত্র :
[১]. জামে‘ আহকামুন নিসা, ৫ম খণ্ড, পৃ. ৮৬-৮৭।
[২]. আবূ দাঊদ, হা/৫৬৭; মুসনাদে আহমাদ, হা/৫৪৬৮।
[৩]. আবূ দাঊদ, হা/৫৭০; বায়হাক্বী, ৯৩/১৩১; ইবনু খুযাইমাহ, হা/১৬৮৮, ১৬৯০; হাকিম, ১/২০৯, ইমাম হাকিম বলেন, হাদীছটি বুখারী ও মুসলিমের শর্তে ছহীহ।
[৪]. ছহীহ বুখারী, হা/৭০৭।
[৫]. ছহীহ বুখারী, হা/৩৭৫।
[৬]. ছহীহ বুখারী, হা/৮৩০।
[৭]. ছহীহ বুখারী, হা/১৩৩৪।
[৮]. ছহীহ বুখারী, হা/৮৬৬।
[৯]. ছহীহ বুখারী, হা/৮৩৭, ৮৪৯, ৮৫০, ৮৬৬, ৮৭০, ৮৭৪।
[১০]. ছহীহ বুখারী, হা/১১৫০-১১৫১।
[১১]. ছহীহ বুখারী, হা/২০২৬; ছহীহ মুসলিম, হা/১১৭২; মুসনাদে আহমাদ, হা/২৬০১১।
[১২]. ছহীহ বুখারী, হা/২০৪১।
[১৩]. ছহীহ বুখারী, হা/২০৮৬।
[১৪]. ছহীহ বুখারী, হা/৪৫৮, ৪৬০, ১৩৩৭; ছহীহ মুসলিম, হা/৯৫৬।




প্রসঙ্গসমূহ »: ছালাত নারীমঞ্চ
শারঈ পর্দা : একটি পর্যালোচনা (৬ষ্ঠ কিস্তি) - ওবাইদুল্লাহ আল-আমীন
ইসলামিক প্যারেন্টিং (৮ম কিস্তি) - তিনা খান
প্রশ্নোত্তরে মুসলিম নারীদের ইসলাম শিক্ষা (৪র্থ কিস্তি) - আব্দুল গাফফার মাদানী
শারঈ পর্দা : একটি পর্যালোচনা (শেষ কিস্তি) - ওবাইদুল্লাহ আল-আমীন
প্রশ্নোত্তরে নারীদের ছালাত শিক্ষা - আব্দুল গাফফার মাদানী
ইসলামে ব্যবসা-বাণিজ্যের রূপরেখা - গুলশান আখতার
স্ত্রীর প্রতি স্বামীর দায়িত্ব ও কর্তব্য - তামান্না তাসনীম
স্ত্রীর প্রতি স্বামীর দায়িত্ব ও কর্তব্য (শেষ কিস্তি) - তামান্না তাসনীম
স্ত্রীর প্রতি স্বামীর দায়িত্ব ও কর্তব্য (২য় কিস্তি) - তামান্না তাসনীম
প্রশ্নোত্তরে নারীদের ছালাত শিক্ষা (২য় কিস্তি) - আব্দুল গাফফার মাদানী
শারঈ পর্দা : একটি পর্যালোচনা (৭ম কিস্তি) - ওবাইদুল্লাহ আল-আমীন
ইসলামে ব্যবসা-বাণিজ্যের রূপরেখা - গুলশান আখতার

সর্বশেষ প্রবন্ধ

ফেসবুক পেজ