প্রশ্নোত্তরে নারীদের ছালাত শিক্ষা
- শায়খ আব্দুল গাফফার মাদানী*
(৬ষ্ঠ কিস্তি)
[জানুয়ারী’২৬ সংখ্যার পর]
প্রশ্ন : যে দু‘আগুলোতে পুরুষলিঙ্গ (মুযাক্কার) শব্দ দ্বারা বর্ণিত হয়েছে, নারীদের ক্ষেত্রে সেগুলো কি স্ত্রীলিঙ্গ (মুয়ান্নাস) শব্দ দ্বারা পড়া যাবে?
উত্তর : ইবনু তাইমিয়া (রাহিমাহুল্লাহ) কে জিজ্ঞেস করা হয় একজন নারী হাদীছের মধ্যে এই দু‘আ শুনেছেন যে, اَللَّهُمَّ إِنِّيْ عَبْدُكَ، وَابْنُ عَبْدِكَ، نَاصِيَتِيْ بِيْدِكَ ‘হে আল্লাহ! আমি আপনার বান্দা, আপনার বান্দার পুত্র, আমার কপাল আপনার হাতে’। আর তিনি এই দু‘আ নিয়মিত পড়তে শুরু করলেন। তাঁকে কেউ বললেন, ‘তুমি তো নারী, তুমি বল, اَللَّهُمَّ إِنِّيْ أَمَتُكَ بِنْتُ عَبْدِكَ بِنْتُ أَمَتِكَ ‘হে আল্লাহ! আমি আপনার বান্দী, আপনার বান্দার কন্যা, আপনার বান্দীর কন্যা)। কিন্তু সেই নারী প্রথম দু‘আটিই পড়তে থাকলেন এবং সংশোধন করতে অস্বীকার করলেন। ইবনু তাইমিয়াহ (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন, বরং, তাঁর উচিত হবে বলা, اَللَّهُمَّ إِنِّيْ أَمَتُكَ، بِنْتُ عَبْدِكَ، ابْنِ أَمَتِكَ ‘হে আল্লাহ! আমি আপনার বান্দী, আপনার বান্দার কন্যা, আপনার বান্দীর পুত্র)। এটাই বেশি উপযুক্ত এবং উত্তম। যদিও কেউ বলে যে, عَبْدُكَ ابْنِ عَبْدُكَ ‘আপনার বান্দা, আপনার বান্দার পুত্র’। এটি আরবী ভাষায় কিছুটা গ্রহণযোগ্যতা পায়। যেমন- زوج ‘(স্বামী বা স্ত্রী) শব্দটি পুরুষ ও নারীর জন্য একইভাবে ব্যবহৃত হয়। এ প্রসঙ্গে মহান আল্লাহ বলেন, ہُوَ الَّذِیۡ خَلَقَکُمۡ مِّنۡ نَّفۡسٍ وَّاحِدَۃٍ وَّ جَعَلَ مِنۡہَا زَوۡجَہَا ‘তিনিই তোমাদেরকে এক ব্যক্তি থেকে সৃষ্টি করেছেন ও তার থেকে তার স্ত্রী সৃষ্টি করেছেন’ (সূরা আল-আ‘রাফ : ১৮৯)। আল্লাহই ভালো জানেন।[১]
ইমাম ইবনু হাজার আল-হাইতামি (রাহিমাহুল্লাহ) বলেছেন, ‘নারী যখন ‘সাইয়্যিদুল ইসতিগফার’ বা এর অনুরূপ দু‘আ পড়বে, তখন সে বলবে যে, وَأَنَا أَمَتُكَ بِنْتُ أَمَتِكَ، أَوْ بِنْتُ عَبْدِكَ ‘আমি আপনার বান্দী, আপনার বান্দীর কন্যা/আপনার বান্দার কন্যা’। আর যদি সে বলে وَأَنَا عَبْدُكَ, তাহলে তাও আরবী ভাষায় গ্রহণযোগ্য। কেননা তা ‘ব্যক্তি’ অর্থে ব্যাখ্যা করা যেতে পারে’।[২] শাইখ বিন বায (রাহিমাহুল্লাহ)-কে একই বিষয়ে জিজ্ঞেস করা হলে তিনি বলেন, এই ব্যাপারে উত্তম হবে যদি নারী বলেন যে, اَللَّهُمَّ إِنِّيْ أَمَتُكَ، وَابْنَةَ عَبْدُكَ، وَابْنَةَ أَمَتِكَ ‘হে আল্লাহ! আমি আপনার বান্দী, আপনার বান্দার কন্যা, আপনার বান্দীর কন্যা’। এভাবে বলা তার জন্য অধিক উপযোগী এবং যথাযথ। তবে যদি সে হাদীছে উল্লেখিত মূল শব্দ দিয়েই দু‘আ করে, তাও ক্ষতিকর নয়, ইনশাআল্লাহ। কারণ একজন নারীও তো আল্লাহর বান্দা, এবং عبد শব্দটি আল্লাহর দাস বা দাসী উভয়ের জন্য ব্যবহারযোগ্য।[৩]
প্রশ্ন : বিবাহিত নারী বাবার বাড়িতে বেড়াতে গিয়ে কি সালাত কছর করবে?
উত্তর : একজন বিবাহিত নারীর নিজ বাড়ি, স্বামীর বাড়ি। তার বিয়ের পরে বাবার বাড়ি আর নিজ বাড়ি থাকে না। মহান আল্লাহ বলেন, لَا تُخۡرِجُوۡہُنَّ مِنۡۢ بُیُوۡتِہِنَّ ‘তোমরা তাদেরকে তাদের ঘরবাড়ি থেকে বহিষ্কার কর না’ (সূরা আত-ত্বালাক্ব : ১)। আবূ বকর (রাযিয়াল্লাহু আনহু) বলেন,
’... فَفَاضَتْ عَيْنَاهُ فَقَالَ أَقْسَمْتُ عَلَيْكِ يَا بُنَيَّةُ إِلَّا رَجَعْتِ إِلَى بَيْتِكِ. فَرَجَعْتُ وَلَقَدْ جَاءَ رَسُوْلُ اللهِ ﷺ بَيْتِيْ فَسَأَلَ عَنِّيْ خَادِمَتِيْ...‘
‘... এ কথা জেনে বাবার দু’চোখে পানি এলো। তিনি বললেন, কন্যা! তোমাকে আল্লাহ তা‘আলার নামে কসম করে বলছি, তুমি তোমার ঘরে ফিরে যাও। আমি ঘরে ফিরে এলাম। রাসূলুল্লাহ (ﷺ) আমার ঘরে এসে আমার কাজের মেয়েকে আমার বিষয়ে প্রশ্ন করলেন...’।[৪] উল্লেখিত আয়াত ও হাদীছ দ্বারা সুস্পষ্ট যে, স্বামীর বাড়িকে তার আপন বাড়ি বলে উল্লেখ করা হয়েছে, পক্ষান্তরে বাবার বাড়ি তার আপন বাড়ি বলা হয়নি। এই হাদীছটির প্রথমাংশে আয়েশা (রাযিয়াল্লাহু আনহা) নিজে বলেছেন যে, ‘আমি আমার বাসায় ফিরে আসলাম’। অথচ বাবার বাড়ির ক্ষেত্রে তিনি তার দিকে সম্বোধন করেননি, বরং বাবার বাড়িই বলেছেন। অতএব সে বাবার বাড়িতে বেড়াতে যায় এবং সে দূরত্ব কছর যোগ্য হয়, তাহলে সে অবশ্যই কছর (চার রাকা‘আত বিশিষ্ট ছালাত দুই রাকা‘আত করে পড়া) করে সালাত আদায় করবে। প্রসিদ্ধ ইফকের ঘটনায় উম্মুল মুমিনীন আয়েশা (রাযিয়াল্লাহু আনহা) বলেন, ‘আমি আমার পিতা-মাতার কাছে গিয়ে এই জঘন্য অপবাদ সম্পর্কে সঠিক খবর জানতে চাচ্ছিলাম। তাই আমি রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-কে বললাম, أَتَأْذَنُ لِيْ أَنْ آتِيَ أَبَوَىَّ ‘(হে আল্লাহর রাসূল (ﷺ)!) আপনি কি আমাকে আমার পিতা-মাতার কাছে যাওয়ার অনুমতি দিবেন’?[৫] উল্লেখিত হাদীছের ব্যাখ্যায় আল্লামা বদরুদ্দীন আইনী (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন, ﻭﻓﻴﻪ: ﺃﻥ اﻟﻤﺮﺃﺓ ﻻ ﺗﺬﻫﺐ ﻟﺒﻴﺖ أبويها ﺇﻻ ﺑﺈﺫﻥ ﺯﻭﺟﻬﺎ ‘আয়েশা (রাযিয়াল্লাহু আনহা)-এর এ কথা থেকে বুঝা গেল যে, স্ত্রী স্বামীর অনুমতি ছাড়া তার পিতামাতার বাড়িতেও যাবে না’।[৬]
আর উক্ত হাদীছের মধ্যে তার বাবার বাড়িকে তার বাড়ি বলে সম্বোধন করা হয়নি বরং বলা হয়েছে যে, তার পিতামাতার বাড়ি। মেয়ের মায়ের স্বামীর বাড়ি তার মায়ের আপন বাড়ি, তার আপন বাড়ি নয়। ইমাম আহমদ ইবনু হাম্বল (রাহিমাহুল্লাহ) এক বিবাহিতা মহিলার ব্যাপারে বলেন, যার মা অসুস্থ ছিল- ﻃﺎﻋﺔ ﺯﻭﺟﻬﺎ ﺃﻭﺟﺐ ﻋﻠﻴﻬﺎ ﻣﻦ ﺃﻣﻬﺎ ﺇﻻ ﺃﻥ ﻳﺄﺫﻥ ﻟﻬﺎ ‘মাকে দেখতে যাওয়ার চেয়ে স্বামীর আনুগত্য করা তার জন্য অধিক যরূরী। তবে স্বামী তাকে অনুমতি দিলে ভিন্ন কথা’।[৭] কেননা বিবাহের পূর্ব পর্যন্ত নারীরা পিতা-মাতার নিয়ন্ত্রণাধীনে থাকে। কিন্তু বিবাহের পর তারা স্বামীর নিয়ন্ত্রণে চলে যায়। সুতরাং সেসময় স্বামীর আদেশ-নিষেধ মান্য করাই তার জন্য যরূরী হবে। রাসূল (ﷺ) বলেন, لَوْ كُنْتُ آمِرًا أَحَدًا أَنْ يَسْجُدَ لِأَحَدٍ لَأَمَرْتُ النِّسَاءَ أَنْ يَسْجُدْنَ لِأَزْوَاجِهِنَّ ‘আমি যদি কাউকে কোন মানুষের জন্য সাজদা করার আদেশ দিতাম, তাহলে স্ত্রীকে তার স্বামীর জন্য সাজদা করতে বলতাম’।[৮] ইবনু তায়মিয়াহ (রাহিমাহুল্লাহ) আরো বলেন, ‘বিবাহিত নারীর স্বামীই আনুগত্যের ক্ষেত্রে পিতা-মাতার উপর অগ্রগণ্য। তার জন্য স্বামীর আনুগত্য করা ফরয’।[৯] অন্যত্র তিনি বলেন, ‘পিতা-মাতা বা অন্য কেউ আদেশ দিলেও স্ত্রী তার স্বামীর অনুমতি ব্যতীত বাইরে বের হতে পারবে না। এই ব্যাপারে চার ইমামের ঐকমত্য রয়েছে’।[১০]
প্রশ্ন : মহিলারা কি পুরুষদের সাথে চন্দ্র ও সূর্য গ্রহণের ছালাত আদায় করতে পারবে?
উত্তর : হ্যাঁ, মহিলারাও পুরুষদের সাথে চন্দ্র ও সূর্য গ্রহণের ছালাত আদায় করতে পারবে। এ বিষয়ে ইমাম বুখারী (রাহিমাহুল্লাহ) স্বতন্ত্রভাবে অধ্যায় বেঁধেছেন- بَابُ صَلَاةِ النِّسَاءِ مَعَ الرِّجَالِ فِي الْكُسُوْفِ ‘সূর্যগ্রহণের সময় পুরুষদের সঙ্গে মহিলাদের ছালাত’। এ প্রসঙ্গে হাদীছে বর্ণিত হয়েছে,
عَنْ أَسْمَاءَ بِنْتِ أَبِيْ بَكْرٍ رَضِىَ اللهُ عَنْهُمَا أَنَّهَا قَالَتْ أَتَيْتُ عَائِشَةَ زَوْجَ النَّبِيِّ ﷺ حِيْنَ خَسَفَتْ الشَّمْسُ فَإِذَا النَّاسُ قِيَامٌ يُصَلُّوْنَ وَإِذَا هِيَ قَائِمَةٌ تُصَلِّي فَقُلْتُ مَا لِلنَّاسِ فَأَشَارَتْ بِيَدِهَا إِلَى السَّمَاءِ وَقَالَتْ سُبْحَانَ اللهِ فَقُلْتُ آيَةٌ فَأَشَارَتْ أَيْ نَعَمْ قَالَتْ فَقُمْتُ حَتَّى تَجَلَّانِي الْغَشْيُ فَجَعَلْتُ أَصُبُّ فَوْقَ رَأْسِي الْمَاءَ
আসমা বিনতে আবূ বকর (রাযিয়াল্লাহু আনহুমা) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, সূর্যগ্রহণের সময় আমি নবী (ﷺ)-এর সহধর্মিনী আয়েশা (রাযিয়াল্লাহু আনহা)-এর নিকট গেলাম। তখন লোকজন দাঁড়িয়ে ছালাত আদায় করছিল। তখন আয়েশা (রাযিয়াল্লাহু আনহা)ও ছালাতে দাঁড়িয়েছিলেন। আমি জিজ্ঞেস করলাম, লোকদের কী হয়েছে? তখন তিনি হাত দিয়ে আসমানের দিকে ইশারা করলেন এবং ‘সুবহানাল্লাহ’ বললেন। আমি বললাম, এ কি কোন নিদর্শন? তখন তিনি ইঙ্গিতে বললেন, হ্যাঁ। আসমা (রাযিয়াল্লাহু আনহা) বলেন, আমিও দাঁড়িয়ে গেলাম। এমনকি (দীর্ঘ সময় দাঁড়িয়ে থাকার কারণে) আমি প্রায় বেহুঁশ হয়ে পড়লাম এবং মাথায় পানি ঢালতে লাগলাম।[১১]
عَنْ أَسْمَاءَ بِنْتِ أَبِيْ بَكْرٍ، قَالَتْ كَسَفَتِ الشَّمْسُ عَلَى عَهْدِ النَّبِيِّ ﷺ فَفَزِعَ فَأَخْطَأَ بِدِرْعٍ حَتَّى أُدْرِكَ بِرِدَائِهِ بَعْدَ ذَلِكَ قَالَتْ فَقَضَيْتُ حَاجَتِيْ ثُمَّ جِئْتُ وَدَخَلْتُ الْمَسْجِدَ فَرَأَيْتُ رَسُوْلَ اللهِ ﷺ قَائِمًا فَقُمْتُ مَعَهُ فَأَطَالَ الْقِيَامَ حَتَّى رَأَيْتُنِيْ أُرِيْدُ أَنْ أَجْلِسَ ثُمَّ أَلْتَفِتُ إِلَى الْمَرْأَةِ الضَّعِيْفَةِ فَأَقُوْلُ هَذِهِ أَضْعَفُ مِنِّيْ . فَأَقُوْمُ فَرَكَعَ فَأَطَالَ الرُّكُوْعَ ثُمَّ رَفَعَ رَأْسَهُ فَأَطَالَ الْقِيَامَ حَتَّى لَوْ أَنَّ رَجُلًا جَاءَ خُيِّلَ إِلَيْهِ أَنَّهُ لَمْ يَرْكَعْ .
আসমা বিনতে আবূ বকর (রাযিয়াল্লাহু আনহুমা) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর যুগে সূর্যগ্রহণ হয়েছিল। তিনি তা দেখে শংকিত হয়ে পড়েছিলেন। তাড়াতাড়ি বেরিয়ে পড়তে তিনি ভুলক্রমে লৌহবর্ম নিয়ে নিলেন। অবশেষে চাদর দিয়ে তাঁর ভুল শোধরানো হল। আসমা (রাযিয়াল্লাহু আনহা) বলেন, আমি তাড়াতাড়ি আমার প্রয়োজনাদি পূরণ করে নিলাম। এরপর এসে মসজিদে প্রবেশ করে দেখতে পেলাম, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) ছালাতে দাঁড়িয়ে রয়েছেন। আমিও দাঁড়িয়ে ছালাতে শামিল হলাম। এরপর আমি (সেখানে) দুর্বল মহিলা দেখতে পেয়ে মনে মনে বললাম, এসব মহিলা তো আমার চেয়েও দুর্বল, কাজেই আমি দাঁড়িয়ে থাকলাম। এরপর তিনি রুকূ‘ করলেন এবং দীর্ঘ সময় রুকূ‘ করলেন। এরপর তিনি মাথা উঠিয়ে দীর্ঘক্ষণ দাঁড়িয়ে রইলেন। (অবস্থা এমন দাঁড়াল যে) কেউ যদি বাহির হতে আসে তবে তার কাছে মনে হবে যে, তিনি রুকূ‘ই করেননি।[১২]
عَنْ أَبِيْ مُوْسَى، قَالَ خَسَفَتِ الشَّمْسُ، فَقَامَ النَّبِيُّ ﷺ فَزِعًا، يَخْشَى أَنْ تَكُوْنَ السَّاعَةُ، فَأَتَى الْمَسْجِدَ، فَصَلَّى بِأَطْوَلِ قِيَامٍ وَرُكُوْعٍ وَسُجُوْدٍ رَأَيْتُهُ قَطُّ يَفْعَلُهُ وَقَالَ "هَذِهِ الآيَاتُ الَّتِيْ يُرْسِلُ اللهُ لَا تَكُوْنُ لِمَوْتِ أَحَدٍ وَلَا لِحَيَاتِهِ، وَلَكِنْ يُخَوِّفُ اللهُ بِهِ عِبَادَهُ، فَإِذَا رَأَيْتُمْ شَيْئًا مِنْ ذَلِكَ فَافْزَعُوْا إِلَى ذِكْرِهِ وَدُعَائِهِ وَاسْتِغْفَارِهِ".
আবূ মূসা (রাযিয়াল্লাহু আনহু) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, একবার সূর্যগ্রহণ হল, তখন নবী (ﷺ) ভীত অবস্থায় উঠলেন এবং ক্বিয়ামত সংঘটিত হবার ভয় করছিলেন। অতঃপর তিনি মসজিদে আসেন এবং এর পূর্বে আমি তাঁকে যেমন করতে দেখেছি, তার চেয়ে দীর্ঘ সময় ধরে কিয়াম, রুকূ‘ ও সাজদা সহকারে ছালাত আদায় করলেন। আর তিনি বললেন, এগুলো হল নিদর্শন যা আল্লাহ পাঠিয়ে থাকেন, তা কারো মৃত্যু বা জন্মের কারণে হয় না। বরং আল্লাহ তা‘আলা এর মাধ্যমে তাঁর বান্দাদের সতর্ক করেন। কাজেই যখন তোমরা এর কিছু দেখতে পাবে, তখন ভীত অবস্থায় আল্লাহর যিকর, দু‘আ এবং ইস্তিগফারের দিকে ধাবিত হবে।[১৩]
উপরিউক্ত হাদীছের আদেশ মুমিন নর-নারী সকলের জন্য প্রযোজ্য। অতএব উক্ত ‘আম হাদীছের নির্দেশ অনুযায়ী মহিলাগণ বাড়িতে জামা‘আতের সাথে বা একাকী উক্ত ছালাত পড়বেন। জামা‘আতের সাথে পড়লে তারা খুৎবা দিবেন না। তবে উক্ত বিষয়ে তাদের মধ্যে থেকে একজন আলোচনা করবেন।[১৪]
প্রশ্ন : মুছল্লীর সামনে দিয়ে নারী অতিক্রম করলে ছালাত নষ্ট হয়ে যায় কি?
উত্তর : বিনা সুতরায় ছালাত পড়লে এবং সামনে দিয়ে সাবালিকা মেয়ে, গাধা বা মিশমিশে কালো কুকুর অতিক্রম করলে ছালাত বাতিল হয়ে যায়। হাদীছে এসেছে,
عَنْ أَبِيْ ذَرٍّ قَالَ قَالَ رَسُوْلُ اللهِ ﷺ إِذَا قَامَ أَحَدُكُمْ يُصَلِّي فَإِنَّهُ يَسْتُرُهُ إِذَا كَانَ بَيْنَ يَدَيْهِ مِثْلُ آخِرَةِ الرَّحْلِ فَإِذَا لَمْ يَكُنْ بَيْنَ يَدَيْهِ مِثْلُ آخِرَةِ الرَّحْلِ فَإِنَّهُ يَقْطَعُ صَلَاتَهُ الْحِمَارُ وَالْمَرْأَةُ وَالْكَلْبُ الْأَسْوَدُ. قُلْتُ يَا أَبَا ذَرٍّ مَا بَالُ الْكَلْبِ الْأَسْوَدِ مِنَ الْكَلْبِ الْأَحْمَرِ مِنَ الْكَلْبِ الْأَصْفَرِ قَالَ يَا ابْنَ أَخِيْ سَأَلْتُ رَسُوْلَ اللهِ ﷺ كَمَا سَأَلْتَنِيْ فَقَالَ الْكَلْبُ الْأَسْوَدُ شَيْطَانٌ
আবূ যার (রাযিয়াল্লাহু আনহু) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেন, তোমাদের কেউ যখন ছালাতে দাঁড়ায়, সে যেন হাওদার খুঁটির ন্যায় একটি কাঠি তার সামনে দাঁড় করিয়ে দেয়। যদি সে তার সামনে হাওদার পিছনের খুঁটির ন্যায় একটি কাঠি দাঁড় (সুতরাহ) না থাকে, আর এমতাবস্থায় তার সামনে দিয়ে গাধা, মহিলা এবং কালো কুকুর চলাচল করলে তার ছালাত নষ্ট হয়ে যাবে। আমি বললাম, হে আবূ যার (রাযিয়াল্লাহু আনহু)! কালো কুকুরের কী অপরাধ, অথচ লাল ও হলুদ বর্ণের কুকুরও তা রয়েছে? তিনি বললেন, হে ভাতিজা! তুমি আমাকে যে প্রশ্ন করেছ, আমিও রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-কে এ রকম প্রশ্ন করেছিলাম। তিনি উত্তরে বলেছেন, কালো কুকুর হলো একটি শয়তান।[১৫]
নাবালিকা মেয়ে অতিক্রম করলে ছালাত নষ্ট হয় না। হাদীছে এসেছে,
عَنْ أَبِي الصَّهْبَاءِ، قَالَ تَذَاكَرْنَا مَا يَقْطَعُ الصَّلَاةَ عِنْدَ ابْنِ عَبَّاسٍ فَقَالَ جِئْتُ أَنَا وَغُلَامٌ مِنْ بَنِيْ عَبْدِ الْمُطَّلِبِ عَلَى حِمَارٍ وَرَسُوْلُ اللهِ ﷺ يُصَلِّيْ فَنَزَلَ وَنَزَلْتُ وَتَرَكْنَا الْحِمَارَ أَمَامَ الصَّفِّ فَمَا بَالَاهُ وَجَاءَتْ جَارِيَتَانِ مِنْ بَنِيْ عَبْدِ الْمُطَّلِبِ فَدَخَلَتَا بَيْنَ الصَّفِّ فَمَا بَالَى ذَلِكَ
আবুছ ছাহ্বা (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন, আমরা ইবনু আব্বাস (রাযিয়াল্লাহু আনহুমা)-এর নিকট ছালাত নষ্ট হওয়ার কারণ সম্পর্কে আলোচনা করলাম। ইবনু আব্বাস (রাযিয়াল্লাহু আনহুমা) বললেন, একদা আমি এবং বনু আব্দুল মুত্তালিবের এক বালক গাধার পিঠে আরোহণ করে রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর নিকট আসলাম। তখন তিনি ছালাত আদায় করছিলেন। সে ও আমি গাধার পিঠ থেকে নামলাম এবং আমরা গাধাটিকে কাতারের সামনে ছেড়েদিলাম। রাসূলুল্লাহ (ﷺ) একে আপত্তিকর মনে করলেন না। এ সময় বনু আব্দুল মুত্তালিবের দু’টি বালিকা এসে কাতারের মধ্যে প্রবেশ করল। এতেও তিনি কোন ভ্রুক্ষেপ করলেন না।[১৬]
সুতরাং নিজের স্ত্রী বা কোন মহিলা ছালাত আদায়কারীর সামনে নিজেকে কাপড় দ্বারা আবৃত করে অন্ধকারে ঘুমিয়ে থাকলে ছালাতের কোন ক্ষতি হয় না। আয়েশা (রাযিয়াল্লাহু আনহা) হতে বর্ণিত, لَقَدْ رَأَيْتُنِيْ مُضْطَجِعَةً عَلَى السَّرِيْرِ فَيَجِيءُ النَّبِيُّ فَيَتَوَسَّطُ السَّرِيْرَ فَيُصَلِّي ‘আল্লাহর রসূল (ﷺ) রাত্রে তাহাজ্জুদ পড়তেন, আর আয়েশা (রাযিয়াল্লাহু আনহা) তাঁর সামনে জানাযার লাশের মত শুয়ে ঘুমাতেন’।[১৭] এছাড়া তিনি কখনো কখনো চাদরের ভিতর থেকে পায়ের দিকে চুপে চুপে নিজের প্রয়োজনে বের হয়ে যেতেন। এতেও তাঁর ছালাতের কোন ক্ষতি হত না। আয়েশা (রাযিয়াল্লাহু আনহা) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন,
كُنْتُ أَنَامُ بَيْنَ يَدَيْ رَسُوْلِ اللهِ وَرِجْلَايَ فِيْ قِبْلَتِهِ فَإِذَا سَجَدَ غَمَزَنِيْ فَقَبَضْتُ رِجْلَيَّ فَإِذَا قَامَ بَسَطْتُهُمَا قَالَتْ وَالْبُيُوْتُ يَوْمَئِذٍ لَيْسَ فِيْهَا مَصَابِيْحُ
‘আমি আল্লাহর রাসূল (ﷺ)-এর সামনে শুয়ে থাকতাম আর আমার পা দু’টো থাকত তাঁর ক্বিবলার দিকে। তিনি যখন সিজদা করতেন তখন আমাকে টোকা দিতেন, আর আমি আমার পা সরিয়ে নিতাম। তিনি দাঁড়িয়ে গেলে পুনরায় পা দু’টো প্রসারিত করে দিতাম। আয়েশা (রাযিয়াল্লাহু আনহা) বলেন, তখন ঘরে কোন বাতি ছিল না’।[১৮] প্রকাশ থাকে যে, কোন মহিলা-ছালাত আদায়কারীর সামনে বেয়ে (বিনা সুতরায়) কোন (সাবালিকা) মেয়ে পার হলেও ছালাত নষ্ট হয় না।[১৯]
প্রশ্ন : পুরুষদের ডান ও বাম পার্শে নারীদের চলাফেরা করলে ছালাত নষ্ট হয়ে যাবে কি?
উত্তর : পুরুষদের ডান ও বাম পার্শে নারীদের চলাফেরা করলে ছালাত নষ্ট হবে না। এ বিষয়ে ছহীহ আছার বর্ণিত হয়েছে। যেমন- আবূ সাঈদ খুদরী (রাযিয়াল্লাহু আনহু) বলেন, أنه كان يصلي والمرأة تمر به يمينًا وشمالًا، فلا يرى بذلك بأسًا ‘ছালাতরত অবস্থায় তার ডানে বামে মহিলা অতিক্রম করত, তাতে কোন সমস্যা মনে করতেন না’।[২০]
প্রশ্ন : মহিলার সামনে দিয়ে মহিলা অতিক্রম করলে ছালাত নষ্ট হবে কি?
উত্তর : না, মহিলার সামনে দিয়ে মহিলা অতিক্রম করলে ছালাত নষ্ট হবে না। কেননা নষ্ট হওয়ার ব্যাপারে কোন দলীল বর্ণিত হয়নি এবং কোন বিদ্বানও কিছু বলেনি।[২১] তবে, ছালাতে মনোযোগ বা খুশূ‘-খুযূ‘ নষ্ট হতে পারে, তাই সামনে দিয়ে কাউকে (নারী, পুরুষ বা শিশু) যেতে না দেয়াই উত্তম এবং এর জন্য সামনে একটি সুতরা (যেমন: দেয়াল, লাঠি, বা অন্য কোন বস্তু) রাখা উচিত।
প্রশ্ন : পুরুষের পার্শে নারী অবস্থান করলে পুরুষের ছালাত নষ্ট হয়ে যাবে কি?
উত্তর : পুরুষের পার্শে নারী অবস্থান করলে পুরুষের ছালাত নষ্ট হবে না।
عَنْ عَائِشَةَ، قَالَتْ كَانَ النَّبِيُّ ﷺ يُصَلِّي مِنَ اللَّيْلِ وَأَنَا إِلَى جَنْبِهِ وَأَنَا حَائِضٌ وَعَلَىَّ مِرْطٌ وَعَلَيْهِ بَعْضُهُ إِلَى جَنْبِهِ .
আয়েশা (রাযিয়াল্লাহু আনহা) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী (ﷺ) রাত্রিকালে ছালাত আদায় করতেন, আর আমি ঋতূমতী অবস্থায় তার পাশে থাকতাম। আমি একটি চাঁদর গায়ে দিতাম, তার কিছু অংশ তাঁর গায়েও থাকত।[২২] উক্ত হাদীছ দ্বারা স্পষ্টভাবে বুঝা যায় যে, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) ছালাত আদায় করতেন সে সময় মা আয়েশা (রাযিয়াল্লাহু আনহা) পার্শে থাকতেন এতে ছালাতের কোন ক্ষতি বা ব্যাঘাত ঘটলে রাসূল (ﷺ) নিজে করতেন না এবং নিষেধও করতেন।
(ইনশাআল্লাহ চলবে)
* শিক্ষক, আল-জামি‘আহ আস-সালাফিয়্যাহ, ডাঙ্গীপাড়া, রাজশাহী।
তথ্যসূত্র :
[১]. মাজমূঊল ফাতাওয়া লিইবনি তাইমিয়াহ, ২য় খণ্ড, পৃ. ১৭৭।
[২]. ফাতাওয়া আল-কুবরা, ৫ম খণ্ড, পৃ. ৩৪২।
[৩]. মাজমূঊ ফাতাওয়া লিইবনি বায, ৬ষ্ঠ খণ্ড, পৃ. ৭৬।
[৪]. ছহীহ বুখারী, হা/৪৭৫৭; ছহীহ মুসলিম, হা/২৭৭০; তিরমিযী, হা/৩১৮০।
[৫]. ছহীহ বুখারী, হা/৩৮৩৫।
[৬]. উমদাতুল ক্বারী, ১৩শ খণ্ড, পৃ. ২৩৫।
[৭]. শরহু মুনতাহাল ইরাদাত, ৩য় খণ্ড, পৃ. ৪৭।
[৮]. আবূ দাঊদ, হা/২১৪০; মিশকাত, হা/৩২৫৫, সনদ ছহীহ।
[৯]. মাজমূঊল ফাতাওয়া লিইবনি তাইমিয়্যাহ, ৩২শ খণ্ড, পৃ. ২৬১।
[১০]. মাজমূঊল ফাতাওয়া লিইবনি তাইমিয়্যাহ, ৩২শ খণ্ড, পৃ. ২৬১।
[১১]. ছহীহ বুখারী, হা/১০৫৩; ছহীহ ইবনু হিব্বান, হা/৩১০৪।
[১২]. ছহীহ মুসলিম, হা/১৯৮০।
[১৩]. ছহীহ বুখারী, হা/১০৫৯; ছহীহ মুসলিম, হা/৯১২।
[১৪]. নববী, আল-মাজমূ‘ শারহুল মুহাযযাব, ৫ম খণ্ড, পৃ. ৫৯; উছায়মীন, মাজমূঊ ফাতাওয়া ওয়া রাসাইল, ১৬শ খণ্ড, পৃ. ৩১০।
[১৫]. ছহীহ মুসলিম, হা/৫১০; তিরমিযী, হা/৩৩৮; আবূ দাঊদ, হা/৭০২।
[১৬]. আবূ দাঊদ, হা/৭১৬, ৭১৭; নাসাঈ, হা/৭২৭।
[১৭]. ছহীহ বুখারী, হা/৫০৮; ছহীহ মুসলিম, হা/৫১২
[১৮]. ছহীহ বুখারী, হা/৫১৩; ছহীহ মুসলিম, হা/৫১২।
[১৯]. মুছান্নাফ আব্দুর রাযযাক, হা/২৩৫৬; মুহাল্লা, ৪র্থ খণ্ড, পৃ. ১২, ২০।
[২০]. জামি‘ আহকামূন নিসা, ৫ম খণ্ড, পৃ. ১১২।
[২১]. জামি‘ আহকামূন নিসা, ৫ম খণ্ড, পৃ. ১১২।
[২২]. ছহীহ মুসলিম, হা/৫১৪।