বৃহস্পতিবার, ১৬ Jul ২০২৬, ০২:৫৬ পূর্বাহ্ন

প্রশ্নোত্তরে ইদ্দত ও শোকপালনের বিধানাবলী

- শায়খ আব্দুল গাফফার মাদানী*


প্রশ্ন : ইসলামী শরী‘আয় ‘শোকপালন’ বলতে কী বুঝায়? 
 
উত্তর : ইসলামী শরী‘আয় ইহদাদ (الإحداد) বা শোকপালন বলতে বোঝায়- স্বামীর মৃত্যুর পর স্ত্রী নির্ধারিত ইদ্দতকালে শোকের বহিঃপ্রকাশস্বরূপ কিছু বৈধ সৌন্দর্যচর্চা ও সাজসজ্জা থেকে বিরত থাকা। এর মধ্যে সাধারণত অন্তর্ভুক্ত হল- (ক) সুগন্ধি ব্যবহার না করা। (খ) অলংকার (গহনা) পরিধান না করা। (গ) সৌন্দর্যবর্ধক প্রসাধনী ব্যবহার না করা। (ঘ) আকর্ষণীয় বা জাঁকজমকপূর্ণ পোশাক পরিধান না করা। (ঙ) যেসব বিষয় সহবাসের (যৌন মিলনের) প্রতি উদ্বুদ্ধকারী বা তার ভূমিকা পালন করে সে গুলো থেকে বিরত থাকা। হাদীছে বর্ণিত হয়েছে,

عَنْ أُمِّ سَلَمَةَ، زَوْجِ النَّبِيِّ ﷺ، عَنِ النَّبِيِّ ﷺ أَنَّهُ قَالَ: الْمُتَوَفَّى عَنْهَا زَوْجُهَا لَا تَلْبَسُ الْمُعَصْفَرَ مِنَ الثِّيَابِ، وَلَا الْمُمَشَّقَةَ، وَلَا الْحُلِيَّ، وَلَا تَخْتَضِبُ، وَلَا تَكْتَحِلُ

নবী (ﷺ)-এর স্ত্রী উম্মু সালামাহ (রাযিয়াল্লাহু আনহা) সূত্রে বর্ণিত। নবী (ﷺ) বলেছেন, কোন মহিলার স্বামী মারা গেলে সে রঙ্গিন পোশাক, কারুকার্য খচিত জামা ও অলংকার পরবে না, খিযাব ও সুরমা ব্যবহার করবে না।[১] স্বামীর মৃত্যুর ক্ষেত্রে স্ত্রীকে চার মাস দশ দিন (গর্ভবতী হলে সন্তান প্রসব পর্যন্ত) ইহদাদ বা শোক পালন করতে হয়।[২]

প্রশ্ন : কোন নারীর স্বামী মারা গেলে তার জন্য ইদ্দত পালন করার বিধান কি ওয়াজিব, না-কি মুস্তাহাব এবং তার সময়কাল কত দিন?

উত্তর : কোন নারীর স্বামী মারা গেলে তার জন্য ইদ্দত পালন করা শরী‘আতের দৃষ্টিতে ওয়াজিব (আবশ্যক)। প্রাপ্তবয়স্ক ও সুস্থ মস্তিষ্কের সকল মুসলিম নারীর জন্যই এটি বাধ্যতামূলক। আল্লাহ তা‘আলা বলেন, وَ الَّذِیۡنَ یُتَوَفَّوۡنَ مِنۡکُمۡ وَ یَذَرُوۡنَ اَزۡوَاجًا یَّتَرَبَّصۡنَ بِاَنۡفُسِہِنَّ اَرۡبَعَۃَ اَشۡہُرٍ وَّ عَشۡرًا. ‘তোমাদের মধ্যে যারা স্ত্রী রেখে মারা যায়, তাদের স্ত্রীগণ চার মাস দশ দিন অপেক্ষা করবে’ (সূরা আল-বাক্বারাহ: ২৩৪)। হাদীছে বর্ণিত হয়েছে,

عَنْ زَيْنَبَ بِنْتِ أَبِيْ سَلَمَةَ قَالَتْ لَمَّا جَاءَ نَعْيُ أَبِيْ سُفْيَانَ مِنْ الشَّأْمِ دَعَتْ أُمُّ حَبِيْبَةَ بِصُفْرَةٍ فِي الْيَوْمِ الثَّالِثِ فَمَسَحَتْ عَارِضَيْهَا وَذِرَاعَيْهَا وَقَالَتْ إِنِّيْ كُنْتُ عَنْ هَذَا لَغَنِيَّةً لَوْلَا أَنِّيْ سَمِعْتُ النَّبِيَّ ﷺ يَقُوْلُ لَا يَحِلُّ لِامْرَأَةٍ تُؤْمِنُ بِاللهِ وَالْيَوْمِ الآخِرِ أَنْ تُحِدَّ عَلَى مَيِّتٍ فَوْقَ ثَلَاثٍ إِلَّا عَلَى زَوْجٍ فَإِنَّهَا تُحِدُّ عَلَيْهِ أَرْبَعَةَ أَشْهُرٍ وَعَشْرًا

যায়নাব বিনতে আবী সালামাহ (রাযিয়াল্লাহু আনহা) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, যখন সিরিয়া হতে আবূ সুফিয়ান (রাযিয়াল্লাহু আনহু)-এর মৃত্যুর খবর পৌঁছল, তার তৃতীয় দিবসে উম্মু হাবীবাহ (রাযিয়াল্লাহু আনহা) হলুদ বর্ণের সুগন্ধি আনয়ন করলেন এবং তাঁর উভয় গণ্ড ও বাহুতে মথিত করলেন। অতঃপর বললেন, অবশ্য আমার এর কোন প্রয়োজন ছিল না, যদি আমি রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-কে এ কথা বলতে না শুনতাম, যে স্ত্রীলোক আল্লাহ এবং ক্বিয়ামতের দিবসের প্রতি ঈমান রাখে তার পক্ষে স্বামী ব্যতীত অন্য কোন মৃত ব্যক্তির জন্য তিন দিনের বেশি শোক পালন করা বৈধ নয়। অবশ্য স্বামীর জন্য সে চার মাস দশ দিন শোক পালন করবে।[৩] অন্য বর্ণনায় এসেছে,

قَالَتْ زَيْنَبُ وَسَمِعْتُ أُمِّيْ أُمَّ سَلَمَةَ، تَقُوْلُ جَاءَتِ امْرَأَةٌ إِلَى رَسُوْلِ اللهِ ﷺ فَقَالَتْ يَا رَسُوْلَ اللَّهِ إِنَّ ابْنَتِيْ تُوُفِّيَ عَنْهَا زَوْجُهَا وَقَدِ اشْتَكَتْ عَيْنَيْهَا أَفَنَكْحَلُهَا فَقَالَ رَسُوْلُ اللَّهِ ﷺ‏ لَا‏ مَرَّتَيْنِ أَوْ ثَلَاثَ مَرَّاتٍ كُلُّ ذَلِكَ يَقُوْلُ‏ لَا ، ثُمَّ قَالَ ‏ إِنَّمَا هِيَ أَرْبَعَةُ أَشْهُرٍ وَعَشْرً.

যাইনাব (রাযিয়াল্লাহু আনহা) বলেন, আমি আমার মা উম্মু সালামা (রাযিয়াল্লাহু আনহা)-কে বলতে শুনেছি, রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর নিকট এক মহিলা এসে বলল, হে আল্লাহর রাসূল (ﷺ)! আমার মেয়ের স্বামী মৃত্যুবরণ করেছে। ইদানীং তার দুই চোখে অসুখ দেখা দিয়েছে। আমরা তার চোখে সুরমা লাগাতে পারব কি? রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বললেন, না। মহিলাটি দুই কি তিনবার এই প্রশ্ন করল এবং প্রতি বারেই রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বললেন, না। তারপর তিনি বললেন, এটা তো মাত্র চার মাস দশ দিনের ব্যাপার’।[৪] উল্লেখ্য যে, কেউ কেউ বলে থাকেন ইদ্দত পালন করা ওয়াজিব নয়। এই পক্ষের যত দলীল পেশ করে থাকেন সবগুলই জাল ও যঈফ, যা নির্ভরযোগ্য নয়।

প্রশ্ন : নারীদের স্বামী ছাড়া অন্য কারোর জন্য ইদ্দত পালন করা কি ওয়াজিব?

উত্তর : না, স্বামী ছাড়া অন্য কারও মৃত্যুর কারণে কোন নারীর জন্য ইদ্দত পালন করা ওয়াজিব নয়। ইদ্দত কেবল স্বামীর মৃত্যুর পর বা ত্বালাক্বের ক্ষেত্রে পালন করা হয়। তবে শোকপালন (ইহদাদ)-এর ক্ষেত্রে শরী‘আতের বিধান হল, কোন নারীর জন্য স্বামী ব্যতীত অন্য কোন মৃত ব্যক্তির জন্য তিন দিনের বেশি শোক পালন করা জায়েয নয়। রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেন,

لَا يَحِلُّ لِامْرَأَةٍ تُؤْمِنُ بِاللهِ وَالْيَوْمِ الآخِرِ أَنْ تُحِدَّ عَلَى مَيِّتٍ فَوْقَ ثَلَاثٍ إِلَّا عَلَى زَوْجٍ

‘যে স্ত্রীলোক আল্লাহ এবং ক্বিয়ামতের দিবসের প্রতি ঈমান রাখে তার পক্ষে স্বামী ব্যতীত অন্য কোন মৃত ব্যক্তির জন্য তিন দিনের বেশি শোক পালন করা বৈধ নয়’।[৫] স্বামীর মৃত্যু হলে ইদ্দত ও শোক পালন (ইহদাদ) ওয়াজিব। পিতা, মাতা, সন্তান, ভাই, বোন বা অন্য আত্মীয়ের মৃত্যু হলে ইদ্দত নেই। তাদের জন্য সর্বোচ্চ তিন দিন শোক পালন করা জায়েয; এর বেশি নয়।

প্রশ্ন : অপ্রাপ্তবয়স্কা (মাসিক/মেন্স শুরু হয়নি এমন) নারীর স্বামী মারা গেলে বা বিবাহের পরে সহবাস হয়নি এমন নারীর উপর ইদ্দত পালন করা কি ওয়াজিব?

উত্তর : স্বামী মারা গেলে স্ত্রীকে ৪ মাস ১০ দিন ইদ্দত পালন করতে হবে (সূরা আল-বাক্বারাহ : ২৩৪)। অত্র আয়াতে আল্লাহ তা‘আলা সমগ্র স্ত্রী জাতিকে সম্বোধন করেছেন। প্রাপ্তবয়স্কা, অপ্রাপ্তবয়স্কা, যুবতী, বৃদ্ধা ও বন্ধ্যা সব ধরনের স্ত্রী এর অন্তর্ভুক্ত (ইবনু বায (রাহিমাহুল্লাহ)-এর অফিসিয়াল ওয়েবসাইট)। ইমাম ইবনু কুদামা, ইবনু আব্দিল বার্র, ইবনুল মুনযির (রাহিমাহুমুল্লাহ) বলেন, ‘আলিমগণ বলেছেন, এই আয়াত প্রমাণ করে যে, স্বামী মারা গেলে প্রত্যেক স্ত্রীকে ৪ মাস ১০ দিন ইদ্দত পালন করতে হবে। এখানে ছোট-বড়, প্রাপ্তবয়স্কা, অপ্রাপ্তবয়স্কা, বৃদ্ধা ও বন্ধ্যা সহ সব ধরনের স্ত্রীদের সম্বোধন করা হয়েছে, স্বামীর সাথে তার বাসররাত হোক কিংবা না হোক। এ আয়াত সাধারণভাবে সকল স্ত্রীদের উদ্দেশ্যে বলা হয়েছে।[৬] তবে শুধু গর্ভবতী স্ত্রী ব্যতীত। কেননা গর্ভবতী নারীদের ইদ্দতকাল সন্তান প্রসব পর্যন্ত (সূরা আত-ত্বালাক্ব : ৪)। এছাড়া বিবাহের পর বাসররাত না হয়ে থাকলেও স্বামীহারা নারী ঐ ইদ্দত পালন করবে। নাবালিকা কিশোরী অথবা অতিবৃদ্ধা হলেও ইদ্দত পালন করতে হবে।[৭]

প্রশ্ন : শোক পালনকারীণি নারী (মুহিদ্দাহ) কোন্ কোন্ বিষয়গুলো বর্জন করবে?

উত্তর : শোক পালনকারীণি নারীর বর্জনীয় বিষয়গুলো হল: (ক) সুগন্ধি ব্যবহার না করা। (খ) অলংকার (গহনা) পরিধান না করা। (গ) সৌন্দর্যবর্ধক প্রসাধনী ব্যবহার না করা। (ঘ) আকর্ষণীয় বা জাঁকজমকপূর্ণ পোশাক পরিধান না করা। (ঙ) যেসব বিষয় সহবাসের (যৌন মিলনের) প্রতি উদ্বুদ্ধকারী বা তার ভূমিকা পালন করে সেগুলো থেকে বিরত থাকা।[৮] (চ) অপ্রয়োজনীয়ভাবে ঘরের বাইরে রাত্রিযাপন না করা।[৯] (ছ) সুরমা/কাজল ব্যবহার না করা। হাদীছে বর্ণিত হয়েছে,

عَنْ أُمِّ سَلَمَةَ، زَوْجِ النَّبِيِّ ﷺ، عَنِ النَّبِيِّ ﷺ أَنَّهُ قَالَ: الْمُتَوَفَّى عَنْهَا زَوْجُهَا لَا تَلْبَسُ الْمُعَصْفَرَ مِنَ الثِّيَابِ، وَلَا الْمُمَشَّقَةَ، وَلَا الْحُلِيَّ، وَلَا تَخْتَضِبُ، وَلَا تَكْتَحِلُ

নবী (ﷺ)-এর স্ত্রী উম্মু সালামাহ (রাযিয়াল্লাহু আনহা) সূত্রে বর্ণিত। নবী (ﷺ) বলেছেন, কোন মহিলার স্বামী মারা গেলে সে রঙ্গিন পোশাক, কারুকার্য খচিত জামা ও অলংকার পরবে না, খিযাব ও সুরমা ব্যবহার করবে না।[১০]

প্রশ্ন : শোক পালনরত নারী (মুহাদ্দাহ) কি তার নখ কাটতে, বগলের লোম উঠাতে বা সাবান দিয়ে গোসল করতে পারবে?

উত্তর : হ্যাঁ, শোকপালনরত নারী (المُحِدَّة/الحادّة) নখ কাটতে, বগলের লোম উঠাতে, নাভির নিচের লোম পরিষ্কার করতে এবং সাবান দিয়ে গোসল করতে পারবে। এগুলো শোকপালনের নিষিদ্ধ বিষয়ের অন্তর্ভুক্ত নয়; বরং ফিতরাত ও পরিচ্ছন্নতার কাজ। হাদীছে বর্ণিত হয়েছে,

عَنْ أَبِيْ هُرَيْرَةَ رَضِىَ اللهُ عَنْهُ سَمِعْتُ النَّبِيَّ ﷺ يَقُوْلُ ‏الْفِطْرَةُ خَمْسٌ الْخِتَانُ، وَالاِسْتِحْدَادُ، وَقَصُّ الشَّارِبِ، وَتَقْلِيْمُ الْأَظْفَارِ، وَنَتْفُ الآبَاطِ‏‏.‏

আবূ হুরাইরা (রাযিয়াল্লাহু আনহু) বলেন, আমি নবী (ﷺ)-কে বলতে শুনেছি যে, ফিতরাত পাঁচটি। যথা: খাতনা করা, (নাভির নিচে) ক্ষুর ব্যবহার করা, গোঁফ ছোট করা, নখ কাটা ও বগলের পশম উপড়ে ফেলা।[১১] উল্লিখিত হাদীছে স্বতন্ত্র কোন বিধান বলা হয়নি। অতএব শোকপালনরত অবস্থায় নখ, লোম পরিষ্কার করাতে কোন বাধা নেই।[১২] ইমাম ইবনুল কাইয়িম (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন, ‘বিধবা নারীকে নখ কাঁটা, বগলের পশম উপড়ে ফেলা, যে চুল ফেলে দেয়া মুস্তাহাব তা ফেলে দেয়া, বরই পাতা দিয়ে গোসল করা ও চুল আঁচড়ানো থেকে বারণ করা যাবে না।[১৩] উল্লেখ্য যে, বর্তমানে অনেক মুসলিম সমাজে পরিলক্ষিত হয় যে, হিন্দু সমাজের ন্যায় বিভিন্ন ধরনের পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা থেকে দূরে থাকে ইদ্দত পালন করার নামে, যা ইসলামী শরী‘আহ সমর্থিত নয়। বরং প্রাচীন যুগ থেকে চলে আসা রসম-রেওয়াজ মাত্র।

প্রশ্ন : বিধবা নারী কী কী কাজ করতে পারবে এবং কী কী খেতে পারবে?

উত্তর : শাইখুল ইসলাম ইবনু তাইমিয়্যাহ (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন, ‘বিধবা নারীর জন্য সব কিছু খাওয়া বৈধ, যা আল্লাহ তার জন্য হালাল করেছেন। যেমন, ফল ও গোশত ইত্যাদি। অনুরূপ বৈধ সকল পানীয় পান করা... অতঃপর তিনি বলেন, বৈধ কোন কাজে ব্যস্ত থাকা তার জন্য হারাম নয়। যেমন, নকশা, সেলাই ও কাপড় বুনা ইত্যাদি, যা নারীদের স্বভাবসুলভ কাজ। অনুরূপ ইদ্দতের বাইরে সেসব কাজ করা তার জন্য বৈধ ইদ্দতের ভেতরও তা বৈধ। যেমন, প্রয়োজনে পুরুষদের সাথে কথা বলা, তবে পর্দার আড়াল থেকে অবশ্যই। আমি যা উল্লেখ করলাম তা নবী (ﷺ)-এর সুন্নত, যা ছাহাবীগণের নারীগণ সম্পাদন করতেন তাদের স্বামীদের মৃত্যুর পর’।[১৪] সাধারণ মানুষ যা বলে, চাঁদ থেকে বিধবা নারী চেহারা ঢেকে রাখবে, ঘরের ছাদে উঠবে না, পুরুষের সাথে কথা বলবে না, মাহরামদের থেকেও চেহারা ঢেকে রাখবে ইত্যাদি ইত্যাদি, এগুলোর কোন ভিত্তি নেই।

প্রশ্ন : শোক পালনরত নারী (মুহাদ্দাহ) কি তেল ব্যবহার করতে পারবে?

উত্তর : শোকপালনরত নারী (المُحِدَّة / الإحداد) তেল ব্যবহার করতে পারবে কি না- এটা তেলের ধরন ও উদ্দেশ্যের উপর নির্ভর করে। শরীর বা চুলের জন্য সাধারণ, সুগন্ধিহীন তেল ব্যবহার করা জায়েজ- যদি তা সৌন্দর্য প্রকাশ বা সাজসজ্জার উদ্দেশ্যে না হয়, বরং চুল/ত্বক রক্ষা বা চিকিৎসার জন্য হয়। কারণ নিষেধাজ্ঞা মূলত সুগন্ধি ব্যবহার করা, সাজসজ্জা ও সৌন্দর্য প্রদর্শন করা। যে তেলে সুগন্ধি (perfume/fragrance) আছে, তা ব্যবহার করা হারাম- কারণ রাসূলুল্লাহ (ﷺ) শোকপালনকারী নারীর জন্য সুগন্ধি নিষেধ করেছেন,

عن أُمُّ عَطِيَّةَ نَهٰى النَّبِيُّ ﷺ وَلَا تَمَسَّ طِيْبًا إِلَّا أَدْنٰى طُهْرِهَا إِذَا طَهُرَتْ نُبْذَةً مِنْ قُسْطٍ وَأَظْفَارٍ قَالَ أَبُوْ عَبْد اللهِ الْقُسْطُ وَالْكُسْتُ مِثْلُ الْكَافُوْرِ وَالْقَافُوْرِ

উম্মু আতিয়্যাহ (রাযিয়াল্লাহু আনহা) হতে বর্ণিত। নবী (ﷺ) নিষেধ করেছেন শোক পালনকারিণী যেন সুগন্ধি না মাখে। তবে হায়িয থেকে পবিত্র হলে (দুর্গন্ধ দূর করার জন্য) কাফূরের ‘কুস্ত’ ও ‘আযফার’ সুগন্ধি ব্যবহার করতে পারে।[১৫]

প্রশ্ন : স্বামী মৃত্যুবরণ করেছে এমন নারীর (বিধবা) কি নির্দিষ্ট কোন স্থানে ইদ্দত পালন করা বাধ্যতামূলক?

উত্তর : যে গৃহ থেকে স্বামী মরার খবর পাবে, সেই গৃহ তার জন্য নিরাপদ ও সুবিধাজনক হলে সেখানে ৪ মাস ১০ দিন অথবা গর্ভকাল ইদ্দত পালন করবে। মহানবী (ﷺ) ফুরাইআহকে বলেছিলেন,‘তুমি সেই গৃহে অবস্থান কর, যে গৃহে তোমার কাছে তোমার স্বামীর মৃত্যু সংবাদ এসেছে’।

عَنْ الْفُرَيْعَةَ بِنْتَ مَالِكٍ قَالَتْ خَرَجَ زَوْجِي فِيْ طَلَبِ أَعْلَاجٍ لَهُ فَأَدْرَكَهُمْ بِطَرَفِ الْقَدُوْمِ فَقَتَلُوْهُ فَجَاءَ نَعْيُ زَوْجِيْ وَأَنَا فِيْ دَارٍ مِنْ دُوْرِ الْأَنْصَارِ شَاسِعَةٍ عَنْ دَارِ أَهْلِي فَأَتَيْتُ النَّبِيَّ ﷺ فَقُلْتُ يَا رَسُوْلَ اللهِ جَاءَ نَعْيُ زَوْجِيْ وَأَنَا فِيْ دَارٍ شَاسِعَةٍ عَنْ دَارِ أَهْلِيْ وَدَارِ إِخْوَتِيْ وَلَمْ يَدَعْ مَالًا يُنْفِقُ عَلَيَّ وَلَا مَالًا وَرِثْتُهُ وَلَا دَارًا يَمْلِكُهَا فَإِنْ رَأَيْتَ أَنْ تَأْذَنَ لِيْ فَأَلْحَقَ بِدَارِ أَهْلِيْ وَدَارِ إِخْوَتِيْ فَإِنَّهُ أَحَبُّ إِلَيَّ وَأَجْمَعُ لِيْ فِيْ بَعْضِ أَمْرِيْ قَالَ فَافْعَلِيْ إِنْ شِئْتِ قَالَتْ فَخَرَجْتُ قَرِيْرَةً عَيْنِيْ لِمَا قَضَى اللهُ لِيْ عَلَى لِسَانِ رَسُوْلِ اللهِ ﷺ حَتَّى إِذَا كُنْتُ فِي الْمَسْجِدِ أَوْ فِيْ بَعْضِ الْحُجْرَةِ دَعَانِيْ فَقَالَ كَيْفَ زَعَمْتِ قَالَتْ فَقَصَصْتُ عَلَيْهِ فَقَالَ امْكُثِيْ فِيْ بَيْتِكِ الَّذِيْ جَاءَ فِيْهِ نَعْيُ زَوْجِكِ حَتَّى يَبْلُغَ الْكِتَابُ أَجَلَهُ قَالَتْ فَاعْتَدَدْتُ فِيْهِ أَرْبَعَةَ أَشْهُرٍ وَعَشْرًا

ফুরাইআ বিনতে মালিক (রাযিয়াল্লাহু আনহা) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমার স্বামী তার (পলাতক) গোলামের খোঁজে রওয়ানা হয়ে কাদূম নামক স্থানে তাদের ধরে ফেলেন। তারা আমার স্বামীকে হত্যা করে। যখন আমার স্বামীর মৃত্যুসংবাদ আসে, তখন আমি আমার পরিবার-পরিজন থেকে অনেক দূরে আনছারদের বসতিতে অবস্থান করছিলাম। আমি নবী (ﷺ) এর নিকট এসে বললাম, হে আল্লাহর রসূল (ﷺ)! যখন আমার স্বামীর মৃত্যুর সংবাদ এলো তখন আমি আমার পরিজন ও ভাইদের বাড়ি থেকে দূরে বসবাস করছিলাম। তিনি আমার ভরণপোষণের জন্য কোন মাল রেখে যাননি এবং তার এমন কোন মালও নেই, আমি যার ওয়ারিছ হতে পারি, এমনকি তার মালিকানাভুক্ত কোন ঘরও নেই। আপনি আমাকে অনুমতি দিলে আমি আমার পরিবার ও ভাইদের বাড়িতে গিয়ে উঠতে পারি। আর এটা আমার জন্য অধিক প্রিয় এবং বিভিন্ন দিক দিয়ে সুবিধাজনকও। রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেন, তুমি চাইলে তা করতে পারো। মহিলাটি বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর মুখে আমার জন্য আল্লাহর এই ফায়ছালা শুনে খুশি মনে ফিরে যেতে লাগলাম। আমি মসজিদে অথবা তাঁর কোন এক হুজরার নিকটে পৌঁছতেই, তিনি আমাকে ডেকে বলেন, তুমি জান কী বলেছিলে? মহিলাটি বলল, আমি পুনরায় তাকে আমার বিবরণ শুনালাম। তিনি বলেন, তুমি ঐ ঘরেই অবস্থান কর, যেখানে তোমার স্বামীর মৃত্যু সংবাদ পেয়েছ, যতক্ষণ না তোমার ইদ্দাত পূর্ণ হয়। ফুরাইআ (রাযিয়াল্লাহু আনহা) বলেন, এরপর আমি সেখানেই চার মাস দশ দিন ইদ্দত পালন করলাম।[১৬]

সুতরাং সে যদি সেই সময় স্ত্রীর মায়ের বাড়িতে থাকে এবং শ্বশূরবাড়ি অপেক্ষা সেই বাড়ি সুবিধাজনক ও নিরাপদ হয়, তাহলে সেখানেই ইদ্দত পালন করতে হবে। মেয়েরা বাড়িতে থাকলেও তাই। নচেৎ স্বামী গৃহে ফিরে যেতে হবে। পক্ষান্তরে স্বামী গৃহে থাকা অবস্থায় স্বামী মারা গেলে এবং সেখানে তাকে দেখাশোনা করার মত কোন মাহরাম পুরুষ বা তেমন কেউ না থাকলে, সেখানে বসবাস করা তার অসুবিধাজনক বা ক্ষতিকর হলে মায়ের বাড়িতে গিয়ে ইদ্দত পালন করতে পারে।

প্রশ্ন : গর্ভবতী বিধবা নারী কখন পুনরায় বিবাহের জন্য বৈধ হবে এবং তার ইদ্দত কখন শেষ হবে?

উত্তর : গর্ভবতী বিধবার ইদ্দত শেষ হবে শিশু জন্ম নেয়ার সাথে সাথে- চাই সেটা স্বামীর মৃত্যুর পর একদিনেই হোক বা নয় মাস পরে হোক। আর সন্তান জন্ম দেয়ার সাথে সাথেই সে পুনরায় বিবাহ করতে পারে, কারণ তখন তার ইদ্দত শেষ হয়ে যায়। এই কারণে গর্ভের শেষের দিকে স্বামী মারা গেলে স্ত্রীর ইদ্দত মাত্র কয়েক ঘণ্টাও হতে পারে। আল্লাহ তা‘আলা বলেন, وَ اُولَاتُ الۡاَحۡمَالِ  اَجَلُہُنَّ اَنۡ یَّضَعۡنَ حَمۡلَہُنَّ ‘আর গর্ভবতী নারীদের ইদ্দতকাল সন্তান প্রসব পর্যন্ত’ (সূরা আত-ত্বালাক্ব : ৪)। হাদীছে বর্ণিত হয়েছে,

عَنِ الْمِسْوَرِ بْنِ مَخْرَمَةَ أَنَّ سُبَيْعَةَ الأَسْلَمِيَّةَ نُفِسَتْ بَعْدَ وَفَاةِ زَوْجِهَا بِلَيَالٍ فَجَاءَتْ النَّبِيَّ ﷺ فَاسْتَأْذَنَتْه أَنْ تَنْكِحَ فَأَذِنَ لَهَا فَنَكَحَتْ

মিসওয়ার ইবনু মাখরামাহ (হাফিযাহুল্লাহ) হতে বর্ণিত যে, সুবামফ‘আহ আসলামিয়্যাহ তার স্বামীর মৃত্যুর কয়েকদিন পর সন্তান প্রসব করে। এরপর সে নবী (ﷺ)-এর কাছে এসে বিয়ে করার অনুমতি প্রার্থনা করে, তিনি তাকে অনুমতি দেন। তখন সে বিয়ে করে।[১৭] এ হাদীছই স্পষ্ট দলীল যে, গর্ভবতী বিধবা নারীর ইদ্দত সন্তান প্রসবের মাধ্যমে শেষ হয়ে যায়, চার মাস দশ দিন পূর্ণ হওয়ার অপেক্ষা করতে হয় না।

(ইনশাআল্লাহ চলবে)


* শিক্ষক, আল-জামি‘আহ আস-সালাফিয়্যাহ, ডাঙ্গীপাড়া, রাজশাহী।

তথ্যসূত্র :
[১]. আবূ দাঊদ, হা/২৩০৪; নাসাঈ, হা/৩৫৩৫; মুসনাদে আহমাদ, হা/২৬৬২৩, সনদ ছহীহ।
[২]. ছহীহ বুখারী, হা/১২৮০; ছহীহ মুসলিম, হা/১৪৮৬; তিরমিযী, হা/১১৯৭।
[৩]. ছহীহ বুখারী, হা/১২৮০; ছহীহ মুসলিম, হা/১৪৮৬।
[৪]. তিরমিযী, হা/১১৯৭।
[৫]. ছহীহ বুখারী, হা/১২৮০; ছহীহ মুসলিম, হা/১৪৮৬।
[৬]. আল-মুগনী, ৮/১১৫; আল-ইসতিযকার, ৬/১৭৮।
[৭]. মাজাল্লাতুল বুহূছিল ইসলামিয়্যাহ, ১৬/ ১১৪, ১২০, ১৩২।
[৮]. শারহু ছহীহ মুসলিম লিন নববী, ৬/১১৭।
[৯]. আবূ দাঊদ, হা/২৩০০; তিরমিযী, হা/১২০৪; ইবনু মাজাহ, হা/২০৩১; আল-মুগনী, ৮/১৫০।
[১০]. আবূ দাঊদ, হা/২৩০৪; নাসাঈ, হা/৩৫৩৫; মুসনাদে আহমাদ, হা/২৬৬২৩, সনদ ছহীহ।
[১১]. ছহীহ বুখারী, হা/৫৮৯১; ছহীহ মুসলিম, হা/২৫৭।
[১২]. আল-মুগনী, দারুল ফিকর, ৮/১৬৫-১৮৫।
[১৩]. আল-হাদইউন নববী, ৫/৫০৭।
[১৪]. মাজমূঊল ফাতওয়া, ২৪/২৭ ও ২৮।
[১৫]. ছহীহ বুখারী, হা/৫৩৪৩।
[১৬]. আবূ দাঊদ, হা/২৩০০; তিরমিযী, হা/১২০৪; নাসায়ী, হা/৩৫২৮; ইবনু মাজাহ, হা/২০৩১; মুসনাদে আহমাদ, হা/২৬৫৪৭, ২৬৮১৭; মুয়াত্তা মালেক, হা/১২৫৪; দারেমী, হা/২২৮৭; ইরওয়াহ, হা/২১৩১, সনদ ছহীহ।
[১৭]. ছহীহ বুখারী, হা/৫৩২০; ছহীহ মুসলিম, হা/১৪৮৪।




প্রসঙ্গসমূহ »: নারী সমাজ নারীমঞ্চ
আল-কুরআনে নারী কেন্দ্রিক আলোচনা ও শিক্ষনীয় বিষয়সমূহ - ওবাইদুল্লাহ আল-আমীন
ইসলামে ব্যবসা-বাণিজ্যের রূপরেখা - গুলশান আখতার
স্ত্রীর প্রতি স্বামীর দায়িত্ব ও কর্তব্য (২য় কিস্তি) - তামান্না তাসনীম
প্রশ্নোত্তরে নারীদের জানাযা শিক্ষা - আব্দুল গাফফার মাদানী
শারঈ পর্দা : একটি পর্যালোচনা (৯ম কিস্তি) - ওবাইদুল্লাহ আল-আমীন
প্রশ্নোত্তরে নারীদের ছালাত শিক্ষা (৩য় কিস্তি) - আব্দুল গাফফার মাদানী
স্ত্রীর প্রতি স্বামীর দায়িত্ব ও কর্তব্য - তামান্না তাসনীম
স্ত্রীর প্রতি স্বামীর দায়িত্ব ও কর্তব্য (শেষ কিস্তি) - তামান্না তাসনীম
শারঈ পর্দা : একটি পর্যালোচনা (৬ষ্ঠ কিস্তি) - ওবাইদুল্লাহ আল-আমীন
সুন্নাহ প্রতিষ্ঠায় নারী সমাজের ভূমিকা - আল-ইখলাছ ডেস্ক
শারঈ পর্দা : একটি পর্যালোচনা (৩য় কিস্তি) - ওবাইদুল্লাহ আল-আমীন
ইসলামিক প্যারেন্টিং (৭ম কিস্তি) - তিনা খান

সর্বশেষ প্রবন্ধ

ফেসবুক পেজ