ইসলামিক প্যারেন্টিং
- তিনা খান*
(৪র্থ কিস্তি)
সপ্তম দিনে আক্বীক্বা দেয়া
শিশু সন্তানের মধ্যে তাওহীদের চেতনা প্রবিষ্ট করার লক্ষ্যে ভূমিষ্ঠ হবার সাথে সাথেই তার কানে তাওহীদের আওয়াজ আযান এবং সপ্তম দিনে আক্বীক্বা দেয়ার নিয়ম প্রবর্তিত হয়েছে। নবী করীম (ﷺ)-এর কথা ও কর্মপ্রণালীর প্রতি লক্ষ্য করুন, সালমান ইবনু আমের আয-যাবিয়্যু (রাযিয়াল্লাহু আনহু) বলেন,
سَمِعْتُ رَسُوْلَ اللهِ
ﷺ
يَقُوْلُ «مَعَ الْغُلَامِ عَقِيْقَةٌ، فَأَهْرِيْقُوْا عَنْهُ دَمًا وَأَمِيْطُوْا
عَنْهُ الْأَذَى».
‘আমি রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-কে বলতে শুনেছি, শিশুর জন্মের সাথে আক্বীক্বা সংযুক্ত। অতএব, তার পক্ষ থেকে তোমরা পশু যব্হ কর এবং তার দেহ থেকে ক্লেশ সরিয়ে দাও (অর্থাৎ তার মাথার চুল মুড়িয়ে দাও)’।[১] উম্মু কুরয (রাযিয়াল্লাহু আনহা) বলেন,
سَمِعْتُ النَّبِىَّ ﷺ
يَقُوْلُ «أَقِرُّوا الطَّيْرَ عَلَى مَكِنَاتِهَا». قَالَتْ وَسَمِعْتُهُ يَقُوْلُ
«عَنِ الْغُلَامِ شَاتَانِ وَعَنِ الْجَارِيَةِ شَاةٌ لَا يَضُرُّكُمْ
أَذُكْرَانًا كُنَّ أَمْ إِنَاثًا».
‘আমি নবী করীম (ﷺ)-কে বলতে শুনেছি, তোমরা পাখিকে তার বাসায় থাকতে দাও। উম্মে কুরুয (রাযিয়াল্লাহু আনহা) বলেন, আমি তাকে এ কথাও বলতে শুনেছি, পুত্র সন্তানের পক্ষ থেকে দু’টি ছাগল এবং কন্যা সন্তানের পক্ষ থেকে একটি ছাগল দিতে হয়, হতে পারে তা নর বা নারী’ ।[২]
আল্লাহর রাসূল (ﷺ) আগমনের পূর্বে আরবরা কোথাও যাবার পূর্বে বাড়ি থেকে বের হয়ে পাখির বাসার কাছে গিয়ে পাখিকে তাড়া করত। পাখীটি যদি ডান দিকে উড়ে যেত তা হলে তারা একে শুভ লক্ষণ মনে করত এবং বাম দিকে উড়ে গেলে তারা একে অশুভ লক্ষণ মনে করে উদ্দিষ্ট কাজে যাওয়া যে বিরত থাকত। উক্ত ঘোষণার মাধ্যমে আল্লাহর রাসূল (ﷺ) এ কুসংস্কারের মূলোৎপাটন করেন।
সামুরাহ (রাযিয়াল্লাহু আনহু) বলেছেন, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেন, كُلُّ غُلَامٍ مُرْتَهَنٌ بِعَقِيْقَتِهِ تُذْبَحُ عَنْهُ يَوْمَ السَّابِعِ وَيُحْلَقُ رَأْسُهُ وَيُسَمَّى ‘শিশু আক্বীক্বার সাথে আবদ্ধ থাকে, ভূমিষ্ঠের সপ্তম দিনে তার পক্ষ থেকে পর যব্হ করবে, শিশুর নামকরণ করবে এবং তার মাথা মুণ্ডন করবে’।[৩] আলী ইবনু আবী তালেব (রাযিয়াল্লাহু আনহু) বলেছেন,
عَقَّ رَسُوْلُ اللهِ ﷺ
عَنِ الْحَسَنِ بِشَاةٍ وَقَالَ «يَا فَاطِمَةُ احْلِقِىْ رَأْسَهُ وَتَصَدَّقِىْ بِزِنَةِ شَعْرِهِ فِضَّةً». قَالَ
فَوَزَنَتْهُ فَكَانَ وَزْنُهُ دِرْهَمًا أَوْ بَعْضَ دِرْهَمٍ.
‘রাসূলুল্লাহ (ﷺ) হাসান (রাযিয়াল্লাহু আনহু)-এর পক্ষ থেকে একটি ছাগল দ্বারা আক্বীক্বা করলেন এবং বললেন, হে ফাতিমা! তার মাথা মুড়িয়ে দাও আর চুলের সমপরিমাণ ওজনে রৌপ্য দান কর। আলী (রাযিয়াল্লাহু আনহু) বলেন, আমরা তার মাথার চুল ওজন করলাম তা এক দিরহাম বা তার থেকে কিছু কম ছিল’।[৪]
অর্থমূলক সুন্দর নাম রাখা
সপ্তম দিনে সন্তানের সুন্দর অর্থমূলক একটি নাম রাখা সুন্নাহ। আবার এমন কোন নাম রাখা যাবে না, যা ইসলাম সমর্থন করে না। ছহীহ মুসলিমে উল্লেখিত হয়েছে যে, শাহানশাহ হলেন একমাত্র মহান আল্লাহ। এ কারণে এই নাম কোন মানুষের হতে পারে না। শিশুর নামকরণ করে সে নামের অর্থও উপযুক্ত বয়সে তাকে বুঝিয়ে দিতে হবে যে, সে যেন তার নামের বিপরীত কোন কর্মে জড়িত না হয় এবং এ নামের মর্যাদা রক্ষা করে জীবনকাল অতিবাহিত করে। হাদীছে একটি ঘটনা উল্লেখ করা হয়েছে। যেমন, ইবনুল মুসাইয়িব (রাহিমাহুল্লাহ) তাঁর পিতা থেকে বর্ণনা করেন,
أَنَّ أَبَاهُ جَاءَ إِلَى
النَّبِىِّ ﷺ
فَقَالَ «مَا اسْمُكَ». قَالَ حَزْنٌ. قَالَ «أَنْتَ سَهْلٌ». قَالَ لَا أُغَيِّرُ
اسْمًا سَمَّانِيهِ أَبِى . قَالَ ابْنُ الْمُسَيَّبِ فَمَا زَالَتِ الْحُزُونَةُ
فِينَا بَعْدُ .
‘নিশ্চয় একদা সাঈদ ইবনু মুসাইয়্যিব (রাহিমাহুল্লাহ)-এর দাদা নবী করীম (ﷺ)-এর কাছে এলেন। তিনি তাকে জিজ্ঞাসা করলেন, তোমার নাম কী? তিনি বললেন, আমার নাম ‘হাযন’। রাসূল (ﷺ) বললেন, না; বরং তোমার নাম ‘সাহল’। আমার দাদা বললেন, আমার পিতা আমার যে নামকরণ করেছেন তা আমি পরিবর্তন করব না। ইবনু মুসাইয়্যিব (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন, এরপর থেকে আমাদের পরিবারে কঠোরতার সূচনা হয়েছে’।[৫]
‘হাযন’ শব্দের অর্থ হচ্ছে কঠোরতা, দুশ্চিন্তা, দুঃখ-যন্ত্রণা ইত্যাদি । আর ‘সহল’ শব্দের অর্থ হচ্ছে কোমলতা, নরম, নমনীয়তা ইত্যাদি। এ জন্য আল্লাহর রাসূল (ﷺ) ঐ নাম পরিবর্তন করতে বলেছিলেন। কিন্তু সে ব্যক্তি রাসূল (ﷺ)-এর কথা অমান্য করার ফলে তার পরিবারে নানা ধরনের বিপর্যয় দেখা দিয়েছিল। সে সময় অনেকেরই নাম ছিল ‘আব্দুল ‘উযযা’ অর্থাৎ ‘উযযা দেবতার দাস’। আল্লাহর নবী (ﷺ) এ ধরনের বহু শিরকী নাম পরিবর্তন করে তাওহীদের চেতনা সংবলিত নামকরণ করেছেন। সুতরাং মুসলিম পরিবারে যে শিশু আগমন করবে, তার সুন্দর ও অর্থবহ নামকরণ করতে হবে এবং নাম শুনলে যেন অনুভব করা যায়, সে ব্যক্তি মহান আল্লাহর গোলাম।
পুত্র সন্তানের খাতনা করা
মাতৃগর্ভ থেকে সন্তান ভূমিষ্ঠ হবার পর সন্তান যদি সুস্থ থাকে, দুর্বল না হয়, তা হলে চিকিৎসকের মতামত গ্রহণপূর্বক পুত্র সন্তানের খাতনা ঐ আক্বীক্বার দিনেই করা উচিত। খাতনা করার পেছনে বৈজ্ঞানিক কারণ রয়েছে। খাতনার সাথে মানুষের বহু ধরনের রোগ থেকে মুক্ত থাকা, পবিত্রতা এবং সুস্বাস্থ্যের বিষয়টি জড়িত। আধুনিক বৈজ্ঞানিক যুগে যৌন বিজ্ঞানের দিকনির্দেশনা অনুসারে শুধু মুসলিমগণই নয়, অমুসলিমদের মধ্যে যারা সচেতন তারাও খাতনা করতে বাধ্য হচ্ছে। ইবরাহীম (আলাইহিস সালাম)-কে আল-কুরআনে আল্লাহ তা‘আলা ‘মুসলিম উম্মাহর পিতা’ বলে ঘোষণা করেছেন। তার সম্পর্কে এক হাদীছে উল্লেখ করা হয়েছে যে, আবূ হুরায়রা (রাযিয়াল্লাহু আনহু) হতে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেন, اخْتَتَنَ إِبْرَاهِيْمُ بَعْدَ ثَمَانِيْنَ سَنَةً، وَاخْتَتَنَ بِالْقَدُوْمِ ‘ইবরাহীম (আলাইহিস সালাম) আশি বছরোর্ধ্ব বয়সে খাতনা করেন এবং তিনি ‘কাদুম’ নামক স্থানে খাতনা করেন’।[৬]
ইবনু শিহাব (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন, كَانَ الرَّجُلُ إِذَا أَسْلَمَ أُمِرَ بِالِاخْتِتَانِ وَإِنْ كَانَ كَبِيْرًا ‘কোন ব্যক্তি ইসলাম গ্রহণ করলে সে প্রাপ্ত বয়স্ক হলেও তাকে খাতনা করার নির্দেশ দেয়া হত’।[৭] আবূ হুরায়রা (রাযিয়াল্লাহু আনহু) হতে বর্ণিত, নবী করীম (ﷺ) বলেছেন, اَلْفِطْرَةُ خَمْسٌ الْخِتَانُ، وَالاِسْتِحْدَادُ، وَقَصُّ الشَّارِبِ، وَتَقْلِيْمُ الأَظْفَارِ، وَنَتْفُ الآبَاطِ ‘পাঁচটি বিষয় হচ্ছে স্বভাব সম্মত বিষয় (যা ছিল সকল নবী-রাসূলের অভ্যাস, তাহল:) খাতনা করা, গোঁফ কর্তন করা, নখ কাটা, নাভীর নিম্ন দেশের পশম কামানো এবং বগলের চুল উঠিয়ে ফেলা’।[৮]
ইসলামী ফিতরাত নিয়ে সকল শিশুর জন্ম
আবু হুরায়রা (রাযিয়াল্লাহু আনহু) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূল (ﷺ) বলেছেন, مَا مِنْ مَوْلُوْدٍ إِلَّا يُوْلَدُ عَلَىْ الْفِطْرَةِ فَأَبَوَاهُ يُهَوِّدَانِهِ وَيُنَصِّرَانِهِ وَيُمَجِّسَانِهِ ‘প্রত্যেক আদম সন্তান ফিৎরাতের উপরে জন্মগ্রহণ করে থাকে। অতঃপর তার পিতা-মাতা তাকে ইহুদী, নাছারা বা অগ্নি উপাসক বানায়’। যেমন চতুষ্পদ জন্তু পূর্ণাঙ্গ বাচ্চা প্রসব করে। তোমরা তাতে কোন বিকলাঙ্গ উপলব্ধি কর কি?[৯]
সকল সৃষ্টজীবের ক্ষেত্রে আল্লাহর এটাই নিয়ম। গৃহপালিত প্রাণীকে আমরাই রাগান্বিত করি, কিন্তু সে জন্ম নিয়েছে প্রকৃত স্বভাব ও অবয়ব নিয়েই। চরিত্রগত প্রাণীরা স্বভাব-প্রকৃতি অনুযায়ীই বেড়ে ওঠে এবং জীবনধারণ করে, কিন্তু মানুষ বদলে যায়। কেননা পিতা-মাতা, সমাজ, পরিবেশ মানুষের স্বভাবকে বদলে দেয়। পৃথিবীর সকল দেশের, সব জাতির শিশুরা একই থাকলেও পরিবেশের কারণে বিরাট ভিন্নতা দেখা দেয়। স্বভাব, রুচি, অভ্যাস সবই পিতা-মাতা থেকেই ধারণ করে। ফলে মানুষের মধ্যে পরিবর্তন দেখা দেয়। হাদীছে এসেছে,
إِنَّ رَبِّيْ أَمَرَنِيْ أَنْ أُعَلِّمَكُمْ مَا جَهِلْتُمْ
مِمَّا عَلَّمَنِيْ يَوْمِيْ هَذَا كُلُّ مَالٍ نَحَلْتُهُ عَبْدًا حَلَالٌ وَإِنِّيْ
خَلَقْتُ عِبَادِيْ حُنَفَاءَ كُلَّهُمْ وَإنَّهُ أَتَتْهُمُ الشَّيَاطِيْنُ فَاجْتَالَتْهُمْ
عَنْ دِيْنِهِمْ وَحَرَّمَتْ عَلَيْهِمْ مَا أَحْلَلْتُ لَهُمْ وَأَمَرَتْهُمْ أَنْ
يُشْرِكُوْا بِيْ مَا لَمْ أُنْزِلْ بِهِ سُلْطَانًا.
‘আমি তোমাদেরকে ঐ কথাটি জানিয়ে দেই, যা তোমারা জান না। আল্লাহ তা‘আলা আজ আমাকে যে বিষয়ে অবগত করেছেন, তাহল, আমি আমার বান্দাকে যে সমস্ত মাল দান করেছি, তা হালাল এবং আমি আমার বান্দাদেরকে ন্যায় ও সত্যের উপরে সৃষ্টি করেছি। অতঃপর তাদের নিকট শয়তান এসে তাদেরকে দ্বীন হতে ফিরিয়ে দেয়; আর আমি তাদের জন্য যা হালাল করেছিলাম শয়তান তা তাদের জন্য হারাম করে দেয় এবং শয়তান তাদেরকে এই নির্দেশ করে যে, তারা যেন আমার সাথে ঐ জিনিসকে শরীক করে, যার স্বপক্ষে আমি কোন দলীল বা প্রমাণ নাযিল করিনি’।[১০]
অর্থাৎ মানুষ কখনো নিজের প্রকৃত স্বভাব অনুযায়ী চলে না কিংবা চলতে পারে না এখানে শয়তান মানুষের মন, মত ও চাহিদা অনুযায়ী ভিন্ন একটি পথের সন্ধান দেয়। মানুষ তখন নিজ ইচ্ছাতেই এই পথকে চলার জন্য বাছাই করে। পথে মানুষকে আনার জন্য জবরদস্তি করে না। মানুষ এক্ষেত্রে স্বাধীন ইচ্ছার অধিকারী। তবে সে সহজেই অন্যের দ্বারা প্রভাবিত হয় এবং স্বেচ্ছায় তার স্বভাব-ধর্মের পথ-পরিক্রমা বদলে নেয়। মানুষের এ ধরনের স্বভাবের কথা পবিত্র কুরআনে এভাবে বলা হয়েছে, وَ ہَدَیۡنٰہُ النَّجۡدَیۡنِ ‘আর আমরা ভালো ও মন্দ উভয় পথ তার জন্য সুস্পষ্ট করে রেখে দিয়েছি’ (সূরা আল-বালাদ: ১০)। ফলে মানবশিশুকে যে সত্য-মিথ্যা, সঠিক-বেঠিকের জ্ঞান দেয়া হয়েছিল, তা সে যথাযথভাবে কাজে লাগায়নি। এজন্য মানুষ নিজের কাজের জন্য নিজে দায়ী; কোন বাহানা চলবে না।
(ইনশাআল্লাহ চলবে)
* মাদারটেক, ঢাকা।
তথ্যসূত্র :
[১]. ছহীহ বুখারী, হা৫৪৭২।
[২]. আবূ দাঊদ, হা/২৮৩৫; ইবনু মাজাহ, হা/১৫১৬, সনদ ছহীহ।
[৩]. ইবনু মাজাহ, হা/৩১৬৫; মুসনাদে আহমাদ, হা/২০১৫১, সনদ ছহীহ।
[৪]. তিরমিযী, হা/১৫১৯; মিশকাত, হা/৪১৫৪, সনদ হাসান।
[৫]. ছহীহ বুখারী, হা/৬১৯০।
[৬]. ছহীহ বুখারী, হা/৬২৯৮; ছহীহ মুসলিম, হা/২৩৭০।
[৭]. আল-আদাবুল মুফরাদ, হা/১২৫২, সনদ ছহীহ।
[৮]. ছহীহ বুখারী, হা/৫৮৯১।
[৯]. ছহীহ বুখারী, হা/৪৭৭৫৮; ছহীহ মুসলিম, হা/২৬৫৮।
[১০]. ছহীহ মুসলিম, হা/২৮৬৫; মিশকাত, হা/৫৩৭১।