শনিবার, ০৭ মার্চ ২০২৬, ০২:০৯ অপরাহ্ন

প্রশ্নোত্তরে নারীদের ছালাত শিক্ষা 

-শায়খ আব্দুল গাফফার মাদানী* 


প্রশ্ন: রাসূল (ﷺ)-এর যুগে নারীরা মসজিদে সালাত আদায় করত এ মর্মে কোন দলিল আছে কি?

উত্তর: হ্যাঁ, রাসূল (ﷺ)-এর যুগে নারীরা মসজিদে ছালাত আদায় করত এ মর্মে অনেক দলীল পাওয়া যায়। নিম্নে কিছু দলীল তুলে ধরা হল:

أَنَّ أَنَسَ بْنَ مَالِكٍ حَدَّثَهُ أَنَّ النَّبِيَّ ﷺ قَالَ ‏ ‏إِنِّيْ لأَدْخُلُ فِي الصَّلَاةِ وَأَنَا أُرِيْدُ إِطَالَتَهَا، فَأَسْمَعُ بُكَاءَ الصَّبِيِّ، فَأَتَجَوَّزُ فِيْ صَلَاتِيْ مِمَّا أَعْلَمُ مِنْ شِدَّةِ وَجْدِ أُمِّهِ مِنْ بُكَائِهِ‏

আনাস ইবনু মালিক (রাযিয়াল্লাহু আনহু) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেন, আমি দীর্ঘ করার ইচ্ছা নিয়ে ছালাত শুরু করি। কিন্তু পরে শিশুর কান্না শুনে আমার ছালাত সংক্ষেপ করে ফেলি। কেননা, শিশু কাঁদলে মায়ের মন যে অত্যন্ত বিচলিত হয়ে পড়ে তা আমি জানি।[১]

أَنَّ عَائِشَةَ، قَالَتْ أَعْتَمَ رَسُوْلُ اللهِ ﷺ بِالْعِشَاءِ حَتَّى نَادَاهُ عُمَرُ الصَّلَاةَ، نَامَ النِّسَاءُ وَالصِّبْيَانُ‏.‏ فَخَرَجَ فَقَالَ‏ مَا يَنْتَظِرُهَا أَحَدٌ مِنْ أَهْلِ الْأَرْضِ غَيْرُكُمْ.‏ قَالَ وَلَا يُصَلَّى يَوْمَئِذٍ إِلَّا بِالْمَدِيْنَةِ، وَكَانُوْا يُصَلُّوْنَ فِيْمَا بَيْنَ أَنْ يَغِيْبَ الشَّفَقُ إِلَى ثُلُثِ اللَّيْلِ الأَوَّلِ‏.‏

আয়িশা (রাযিয়াল্লাহু আনহা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, একদা রাসূলুল্লাহ (ﷺ) ইশার ছালাত আদায় করতে দেরী করলেন। উমর (রাযিয়াল্লাহু আনহু) তাঁকে বললেন, আছ-ছালাত। নারী ও শিশুরা ঘুমিয়ে পড়েছে। তারপর তিনি বেরিয়ে আসলেন এবং বললেন, তোমরা ব্যতীত পৃথিবীর আর কেউ এ ছালাতের জন্য অপেক্ষা করছে না। (রাবী বলেন) তখন মদীনা ব্যতীত অন্য কোথাও ছালাত আদায় করা হত না। (তিনি আরও বলেন যে) পশ্চিম আকাশের ‘শাফাক’ অন্তর্হিত হওয়ার পর থেকে রাতের প্রথম এক-তৃতীয়াংশের মধ্যে তাঁরা এশার ছালাত আদায় করতেন।[২]

أَنَّ عَائِشَةَ أَخْبَرَتْهُ قَالَتْ كُنَّ نِسَاءُ الْمُؤْمِنَاتِ يَشْهَدْنَ مَعَ رَسُوْلِ اللهِ ﷺ صَلَاةَ الْفَجْرِ مُتَلَفِّعَاتٍ بِمُرُوْطِهِنَّ، ثُمَّ يَنْقَلِبْنَ إِلَى بُيُوْتِهِنَّ حِيْنَ يَقْضِيْنَ الصَّلَاةَ، لَا يَعْرِفُهُنَّ أَحَدٌ مِنَ الْغَلَسِ‏.‏

আয়িশা (রাযিয়াল্লাহু আনহা) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, মুসলিম মহিলাগণ সর্বাঙ্গ চাদরে ঢেকে রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর সঙ্গে ফজরের জামা‘আতে হাযির হতেন। তারপর ছালাত আদায় করে তারা যার যার ঘরে ফিরে যেতেন। আবছা আঁধারে কেউ তাঁদের চিনতে পারত না’।[৩]

মসজিদে পুরুষদের সাথে ছালাত আদায়ের জন্য নারীদের ঘর থেকে বের হওয়া বৈধ, তবে তাদের ছালাত তাদের ঘরেই উত্তম। ইমাম মুসলিম (রাহিমাহুল্লাহ) তাঁর ‘ছহীহ’ গ্রন্থে বর্ণনা করেন, রাসূল (ﷺ) বলেছেন, لَا تَمْنَعُوْا إِمَاءَ اللهِ مَسَاجِدَ اللهِ ‘তোমরা আল্লাহর বান্দিদেরকে আল্লাহর মসজিদ থেকে নিষেধ করো না’।[৪] অপর হাদীছে তিনি বলেন,

عَنِ ابْنِ عُمَرَ، قَالَ قَالَ رَسُوْلُ اللهِ ﷺ ‏لَا تَمْنَعُوْا نِسَاءَكُمُ الْمَسَاجِدَ وَبُيُوْتُهُنَّ خَيْرٌ لَهُنَّ

ইবনু উমার (রাযিয়াল্লাহু আনহুমা) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেন, ‘তোমরা তোমাদের নারীদের মসজিদে যেতে নিষেধ করো না। তবে তাদের ঘরই তাদের জন্য উত্তম’।[৫] উল্লেখ্য, পর্দার জন্য নারীদের ঘরে অবস্থান ও তাতে ছালাত আদায় করাই তাদের জন্য উত্তম।

প্রশ্ন: ইমাম ছাহেব সাধারণত ক্বিরায়াত লম্বা করে থাকেন কিন্তু বাচ্চার কান্নার আওয়াজ শুনে ছালাত সংক্ষিপ্ত করে ফেলেন। এটা করা কি ঠিক হয়েছে?

উত্তর: হ্যাঁ, তার এমনটা করা ঠিক আছে; যা ছহীহ হাদীছ দ্বারা প্রমাণিত।

عَنْ أَبِيْ قَتَادَةَ قَالَ قَالَ رَسُوْلُ اللهِ ﷺ ্রإِنِّيْ لَأَدْخُلُ فِي الصَّلَاةِ وَأَنَا أُرِيْدُ إِطَالَتَهَا فَأَسْمَعُ بُكَاءَ الصَّبِيِّ فَأَتَجَوَّزُ فِيْ صَلَاتِيْ مِمَّا أَعْلَمُ مِنْ شِدَّةِ وَجْدِ أُمِّهِ مِنْ بُكَائِهِ

আবূ ক্বাতাদা (রাযিয়াল্লাহু আনহু) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) ইরশাদ করেছেন, আমি ছালাত আরম্ভ করলে তা লম্বা করার ইচ্ছা করি। কিন্তু যখনই (পেছন থেকে) শিশুদের কান্নার শব্দ শুনি, তখন আমার ছালাতকে আমি সংক্ষেপ করি। কারণ তার কান্নায় তার মায়ের মনের উদ্বিগ্নতা বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কায়।[৬] অতএব প্রত্যেক ইমামের জন্য অবশ্যই করণীয় হল- মুক্তাদির অবস্থা দেখে ছালাত লম্বা বা সংক্ষিপ্ত করা উচিত। কেননা তাদের মধ্যে শিশু, নারী, বয়ঃবৃদ্ধ ও অসুস্থ ব্যক্তি থাকে।

প্রশ্ন: কোন স্ত্রী যদি তার স্বামীর নিকট মসজিদে যাওয়ার জন্য অনুমতি চাই, তার স্বামী কি তাকে বাধা দিতে পারবে?

উত্তর: মসজিদে যাওয়াতে যদি শারঈ কোন প্রতিবন্ধকতা না থাকে তাহলে তার স্বামী তাকে মসজিদে যাওয়া থেকে বাধা দেয়াটা সমীচীন হবে না।

عَنْ سَالِمٍ، عَنْ أَبِيْهِ، عَنِ النَّبِيِّ ﷺ‏ إِذَا اسْتَأْذَنَتِ امْرَأَةُ أَحَدِكُمْ إِلَى الْمَسْجِدِ فَلَا يَمْنَعْهَا

সালিমের পিতা (ইবনু উমর (রাযিয়াল্লাহু আনহুমা)) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেন, যদি তোমাদের কারো স্ত্রী মসজিদে যাওয়ার অনুমতি চায়, তাহলে তাকে নিষেধ করো না।[৭]

عَنْ ابْنِ عُمَرَ عَنِ النَّبِيِّ ﷺ قَالَ ائْذَنُوا لِلنِّسَاءِ بِاللَّيْلِ إِلَى الْمَسَاجِدِ

ইবনু উমার (রাযিয়াল্লাহু আনহুমা) সূত্রে রাসূলুল্লাহ (ﷺ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, তোমরা মহিলাদেরকে রাতে (ছালাতের জন্য) মসজিদে যাওয়ার অনুমতি দিবে।[৮]

أَنَّ عَبْدَ اللهِ بْنَ عُمَرَ، قَالَ سَمِعْتُ رَسُوْلَ اللهِ ﷺ يَقُوْلُ‏ لَا تَمْنَعُوْا نِسَاءَكُمُ الْمَسَاجِدَ إِذَا اسْتَأْذَنَّكُمْ إِلَيْهَا، قَالَ فَقَالَ بِلَالُ بْنُ عَبْدِ اللهِ وَاللهِ لَنَمْنَعُهُنَّ‏.‏ قَالَ فَأَقْبَلَ عَلَيْهِ عَبْدُ اللهِ فَسَبَّهُ سَبًّا سَيِّئًا مَا سَمِعْتُهُ سَبَّهُ مِثْلَهُ قَطُّ وَقَالَ أُخْبِرُكَ عَنْ رَسُوْلِ اللهِ ﷺ وَتَقُوْلُ وَاللهِ لَنَمْنَعُهُنَّ‏.‏

আব্দুল্লাহ ইবনু উমার (রাযিয়াল্লাহু আনহুমা) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-কে বলতে শুনেছি যে, তোমাদের স্ত্রী লোকগণ মসজিদে যেতে চাইলে তাদেরকে মসজিদে যেতে বাধা দিবে না। বিলাল ইবনু আবদুল্লাহ বললেন, আল্লাহর শপথ! আমরা অবশ্যই তাদেরকে বাধা দিব। তখন আব্দুল্লাহ ইবন উমর (রাযিয়াল্লাহু আনহুমা) এমন রুঢ় ভাষায় তাঁকে তিরস্কার করলেন যে, ইতিপূর্বে আমি কখনো তাঁকে এভাবে তিরস্কার করতে শুনিনি। তিনি আরো বললেন, আমি তোমাকে রাসূল (ﷺ) এর হাদীছ শোনাচ্ছি আর তুমি বলছ, আল্লাহর কসম! আমরা অবশ্যই তাদেরকে নিষেধ করব! [৯]

সুধী পাঠক! একটু গভীর ভাবে চিন্তা করে দেখুন তো এখানে রাসূল (ﷺ)-এর কথাটুকু যিনি উদ্ধৃত করেছেন, অর্থাৎ আব্দুল্লাহ ইবনু উমর (রাযিয়াল্লাহু আনহুমা)-এর প্রতিক্রিয়া থেকে সুস্পষ্টভাবে বুঝা যায়, নারীদেরকে মসজিদে যেতে বাধা দেয়া রাসূল (ﷺ)-এর আদেশের পরিপন্থী। কিন্তু তাঁর ছেলে বেলাল সম্ভাব্য ‘অপকর্মের’ (দাগাল বা ফেতনা) দোহাই দিয়ে এই আদেশ এড়িয়ে যেতে চেয়েছিলেন। এটিই পরবর্তীতে ‘সা‘দ আল-জারাঈ’ (মন্দের দিকে ধাবিত করে, এমন পথ রুদ্ধ করে দেয়া) হিসাবে পরিচিতি লাভ করেছে এবং তা প্রয়োগ করা হয়েছে। কোন সম্ভাব্য মন্দ কাজ ঠেকাতে বৈধ কাজ নিষিদ্ধ করার এই যুক্তিকে বলা হয় পরিণতিমূলক যুক্তি। এ সংক্রান্ত বিভিন্ন মাযহাবের মতামতগুলো গভীরভাবে অধ্যয়ন করে আমি বুঝতে পেরেছি যেসব স্কলার নারীদেরকে মসজিদে যেতে নিষেধ বা নিরুৎসাহিত করেন, তারা আসলে আব্দুল্লাহ ইবনু উমর (রাযিয়াল্লাহু আনহুমা)-এর বর্ণিত হাদীছ ও তাঁর প্রতিক্রিয়াকে আমলে নেন না। তাঁরা বরং তাঁদের দৃষ্টিভঙ্গির সমর্থনে নিম্নোক্ত হাদীছ দুটো উল্লেখ করে থাকেন। আয়েশা (রাযিয়াল্লাহু আনহা) বলেন, নারীরা যেসব আপত্তিজনক কর্মকাণ্ড শুরু করেছে, রাসূল (ﷺ) যদি এসব দেখতেন তাহলে নিশ্চয় তাদের মসজিদে যাওয়া বন্ধ করে দিতেন, যেমনিভাবে বনী ইসরাইলের নারীদেরকে তাদের উপাসনালয়ে যেতে নিষেধ করে দেয়া হয়েছিলো।[১০]

ছাহাবী উম্মে হুমাইদ (রাযিয়াল্লাহু আনহা) বর্ণনা করেছেন, রাসূল (ﷺ) তাঁকে বলেছেন, ‘তোমার জন্য জামা‘আতে ছালাত পড়ার চেয়ে তোমার ঘরে ছালাত পড়াই উত্তম।[১১] তাঁর ভাতিজা বলেছেন, তারপর উম্মে হুমাইদ (রাযিয়াল্লাহু আনহা) আদেশ করেছিলেন, তাঁর ঘরের একদম ভেতর দিকে, সবচেয়ে অন্ধকারাচ্ছন্ন একটি জায়গায় যেন তাঁর জন্য ছালাতের স্থান প্রস্তুত করে দেয়া হয়। মৃত্যুর আগ পর্যন্ত সেখানেই তিনি ছালাত আদায় করতেন।[১২]

আয়েশা (রাযিয়াল্লাহু আনহা)-এর মতামতের ব্যাপারে কথা হলো, এই বক্তব্য যে একটি বিশেষ প্রেক্ষাপটকে কেন্দ্র করে দেয়া হয়েছিলো, তা স্পষ্ট। খুব সম্ভবত নারীদের কেউ কেউ মসজিদে অন্যায় কিছু করেছিলো বলে তিনি এমনটা বলেছিলেন। কিন্তু এর দ্বারা তিনি নারীদের মসজিদে যাওয়ার সাধারণ নিয়মের পরিবর্তন বা বাতিল চাননি। যদিও পরবর্তীতে কোন কোন ফক্বীহ একে নারীদের মসজিদে যাওয়ার নিষেধাজ্ঞার পক্ষের মতামত বলে বিবেচনা করেছেন। অথচ তৎকালীন মদীনার কোন ফক্বীহই কিন্তু বলেননি যে, উনার এই বক্তব্য নারীদের মসজিদে যাওয়ার সাধারণ বৈধতা বাতিলের ইঙ্গিত। আয়েশা (রাযিয়াল্লাহু আনহা)-এর মৃত্যু পরবর্তীকালে মদীনার অধিবাসী ইমাম মালেক (রাহিমাহুল্লাহ)-এর কাছে জানতে চাওয়া হয়েছিল, নারীদেরকে মসজিদে যেতে বাধা দেয়া যাবে কিনা? তিনি জবাব দিয়েছিলেন, ‘কখনোই নারীদেরকে মসজিদে যেতে বাধা দেয়া উচিত হবে না’।[১৩] তবে এ ব্যাপারে নিরুৎসাহিত করা উচিত। আর যে পথ দিনশেষে হালাল কাজের দিকে নিয়ে যায়, তা উন্মুক্ত রাখা উচিত এবং সে পথে চলার ব্যাপারে লোকদেরকে উৎসাহ দেয়া উচিত।[১৪] এছাড়া ইবনু ফারহুনের বিভিন্ন ফাতাওয়ায় ‘ফাতহ আল-জারাঈ’ পদ্ধতি প্রয়োগের বিষয়টিও প্রাসঙ্গিক হিসাবে উল্লেখ করা যায়।[১৫]

এ সম্পর্কে শায়খ আব্দুল হালীম আবু শুক্কাহর মন্তব্যটি তুলে ধরা যেতে পারে। মসজিদে নারীদের যাতায়াত সংক্রান্ত আয়েশা (রাযিয়াল্লাহু আনহা)-এর মন্তব্য ব্যাখ্যা করতে গিয়ে তিনি ‘সা‘দ আল-জারাঈ’র পরিবর্তে ‘ফাতহ আল-জারাঈ’ পদ্ধতি অনুসরণ করেছেন। তিনি লিখেছেন, ‘বিনোদন ও ক্রীড়াজগতে বর্তমানে নারীদেরকে নিয়ে যেসব নতুন নতুন ফেতনার প্রচলন হয়েছে; নারীদের চিন্তাভাবনা ও মনমানসিকতার পরিবর্তনে বিভিন্ন মিডিয়া যে পরিমাণ নেতিবাচক ভূমিকা রাখছে; সর্বোপরি, বর্তমানে নারীদেরকে কেবল একটি স্থানে (মসজিদে) যাওয়ার সুযোগ থেকে বঞ্চিত করায় যে ধরনের পরিস্থিতির উদ্ভব ঘটেছে, সেইসব বাস্তবতা কি আয়েশা (রাযিয়াল্লাহু আনহা) দেখার সুযোগ পেয়েছেন? তিনি যদি এসব দেখার সুযোগ পেতেন, তাহলেও কী এ ধরনের মতামত ব্যক্ত করতেন? উত্তর হলো: না। বরং এসব দেখে আয়েশা (রাযিয়াল্লাহু আনহা) হয়তো বলতেন, বর্তমানে যা কিছু চলছে, রাসূল (ﷺ) যদি এসব দেখতেন, তাহলে তিনি নারীদের জন্য মসজিদে যাওয়া বাধ্যতামূলক করে দিতেন। নারীদের মসজিদে যাওয়াকে তিনি যতটা উদ্দীপনার সাথে নিরুৎসাহিত করেছিলেন, ঠিক ততটা উদ্দীপনার সাথেই বরং তাদেরকে এখন মসজিদে যেতে উৎসাহ দিতেন। চলমান স্রোতে গা ভাসিয়ে না দিয়ে নারীরা যাতে সদাচারণে অভ্যস্ত হতে পারে, সে জন্য তিনি বরং নারীদেরকে মসজিদে যাওয়ার আহ্বান জানাতেন।[১৬]

প্রশ্ন: কোন্ কোন্ কারণে একজন অভিভাবক তার ফ্যামিলি কে মসজিদে যেতে নিষেধ করতে পারবে?

উত্তর: উল্লেখযোগ্য কারণগুলোর মধ্যে থেকে অন্যতম হলো- (ক) স্বামী স্ত্রীর উপরে পথিমধ্যে অন্যায়ের সম্মুখীন হওয়া। (খ) স্বামী তার স্ত্রীর প্রতি যৌন মিলনের প্রয়োজন থাকা (তবে ফরয বিধান নষ্ট করে নয়)। (গ) সে জানে যে তার স্ত্রী মাধ্যমে ফাসাদ এবং অন্যায় সংঘটিত হওয়া সম্ভব। (ঘ) সে শুধু এমনিতেই অনর্থক বের হয়। আর সে তার স্বামীর বাড়ির দায়িত্বে অবহেলাকারিণী (তাই সে স্বামীর বাড়ির দায়িত্ব বিনষ্ট করে ফেলবে)।

প্রশ্ন: নারীরা মসজিদে ছালাতের জন্য যাওয়ার শর্ত কী?

উত্তর: নারীদের মসজিদে আসার জন্য কিছু শর্ত আছে।  যেমন:
(ক) সম্পূর্ণ আবৃত ও পূর্ণ শরীর ঢেকে বের হবে। আল্লাহ তা‘আলা বলেন, وَ لَا تَبَرَّجْنَ تَبَرُّجَ الْجَاهِلِيَّةِ الْاُوْلٰى ‘প্রাচীন জাহেলী যুগের প্রদর্শনীর মত নিজেদেরকে প্রদর্শন করে বেড়াবে না’ (সূরা আল-আহযাব: ৩৩)।
(খ) সেজেগুজে সুগন্ধি/খুশবু লাগিয়ে বের না হওয়া। যয়নাব (রাযিয়াল্লাহু আনহা) বলেন, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেন, إِذَا شَهِدَتْ إِحْدَاكُنَّ الْعِشَاءَ فَلَا تَمَسَّ طِيبًا ‘তোমাদের কোন মহিলা ইশার জামা‘আতে আসতে ইচ্ছা করলে সে যেন সুগন্ধি স্পর্শ না করে’ (ছহীহ মুসলিম, হা/৪৪৩; নাসাঈ, হা/৫২৫৯)।
(গ) বাজনাদার অলংকার, চুড়ি, নূপুর ইত্যাদি পরে আসতে পারবে না। আল্লাহ তা‘আলা বলেন, وَ لَا يَضْرِبْنَ بِاَرْجُلِهِنَّ لِيُعْلَمَ مَا يُخْفِيْنَ مِنْ زِيْنَتِهِنَّ ‘কারো কাছে তাদের সৌন্দর্য প্রকাশ না করে, তারা যেন তাদের গোপন সৌন্দর্য প্রকাশের উদ্দেশ্যে সজোরে পদচারণা না করে’ (সূরা আন-নূর: ৩১)।
(ঘ) এমন কোন পোশাক পরা যাবে না, যা মানুষের দৃষ্টি আকর্ষণ করে এবং অঙ্গভঙ্গি করে চলতে পারবে না। মহান আল্লাহ বলেন, وَ اللّٰهُ لَا يُحِبُّ الْفَسَادَ ‘আর আল্লাহ ফাসাদ ভালোবাসেন না’ (সূরা আল-বাক্বারাহ: ২০৫)।
(ঙ) পুরুষদের ভিড় এড়িয়ে পাশ কাটিয়ে চলবে: আবূ উসাই আল-আনছারী তার পিতা থেকে হাদিস বর্ণনা করেন, তিনি রাসূল (ﷺ)-কে বলতে শুনেছেন, তিনি মসজিদের বাহিরে দেখতে পান যে, নারীরা রাস্তায় পুরুষের সাথে মিশে গেছেন। তখন আল্লাহর রাসূল (ﷺ) নারীদের বলেন, তোমরা অপেক্ষা কর, কারণ, তোমাদের জন্য রাস্তার মাঝে হাটা উচিত নয়, তোমাদের জন্য হল রাস্তার পাশ। এ কথা শোনে নারী দেয়াল ঘেসে হাঁটা শুরু করে তখন দেখা গেল তাদের অনেকের কাপড় দেয়ালের সাথে মিশে যেতে।[১৭]
(চ) অপ্রয়োজনে কোন বেগানা পুরুষের সঙ্গে কথা বলবে না। সর্বোপরি তাদের এই বের হওয়া ফেতনার কারণ হবে না।

(ইনশাআল্লাহ চলবে)

* সিনিয়র মুহাদ্দিছ, দারুল হুদা ইসলামী কমপ্লেক্স, বাঘা, রাজশাহী।

তথ্যসূত্র :
[১]. ছহীহ বুখারী, হা/৬৭৪, ৭০৭।
[২]. ছহীহ বুখারী, হা/৩৭৫।
[৩]. ছহীহ বুখারী, হা/৫৫১।
[৪]. ছহীহ বুখারী, হা/৮৫৮; ছহীহ মুসলিম, হা/৪৪২; তিরমিযী, হা/৫৭০; নাসাঈ, হা/৭০৬; আবূ দাঊদ, হা/৫৬৮।
[৫]. আবূ দাঊদ, হা/৫৬৭; মুসনাদে আহমাদ, হা/৫৪৬৮।
[৬]. ছহীহ বুখারী, হা/৭১০।
[৭]. ছহীহ বুখারী, হা/৫২৩৮।
[৮]. ছহীহ বুখারী, হা/৮৯৯; ছহীহ মুসলিম, হা/৮৬৫।
[৯]. ছহীহ মুসলিম, হা/৪৪২।
[১০]. ছহীহ বুখারী, ১ম খণ্ড, পৃ. ১৭৩ পৃ., ‘ছালাত’ অধ্যায়; ছহীহ মুসলিম, ১ম খণ্ড, পৃ. ৩২৮ পৃ., ‘ছালাত’ অধ্যায়।
[১১]. বায়হাকী, হা/৪৯৪৪।
[১২]. মুসনাদে আহমাদ, হা/২৬৫৫০।
[১৩]. আল-মুদাওয়ানাতুল কুবরা, ১ম খণ্ড, পৃ. ১০৬।
[১৪]. আল-কারাফী, আদ-দাখীরাহ, ১ম খণ্ড, পৃ. ১৫৩, আল-কারাফী, আল-ফারুক মা‘আ হাওয়ামিশিহ, ২য় খণ্ড, পৃ. ৬০।
[১৫]. ইবনু ফারহুন, তাবসিরাতুল হুকুম, ২য় খণ্ড, পৃ. ২৭০।
[১৬]. তাহরীরুল মারআতি ফী আসরির রিসালাহ/রাসূল (ﷺ)-এর যুগে নারী স্বাধীনতা, ১ম খণ্ড, পৃ. ৩৬।
[১৭]. আবূ দাঊদ, হা/৫২৭২।




প্রসঙ্গসমূহ »: বিধি-বিধান নারীমঞ্চ
প্রশ্নোত্তরে নারীদের ছালাত শিক্ষা - আব্দুল গাফফার মাদানী
সুন্নাহ প্রতিষ্ঠায় নারী সমাজের ভূমিকা - আল-ইখলাছ ডেস্ক
শারঈ পর্দা : একটি পর্যালোচনা (৫ম কিস্তি) - ওবাইদুল্লাহ আল-আমীন
প্রশ্নোত্তরে মুসলিম নারীদের ইসলাম শিক্ষা (৪র্থ কিস্তি) - আব্দুল গাফফার মাদানী
প্রশ্নোত্তরে নারীদের ছালাত শিক্ষা (৩য় কিস্তি) - আব্দুল গাফফার মাদানী
ইসলামিক প্যারেন্টিং (শেষ কিস্তি) - তিনা খান
স্ত্রীর প্রতি স্বামীর দায়িত্ব ও কর্তব্য (২য় কিস্তি) - তামান্না তাসনীম
প্রশ্নোত্তরে নারীদের ছালাত শিক্ষা (২য় কিস্তি) - আব্দুল গাফফার মাদানী
শারঈ পর্দা : একটি পর্যালোচনা - ওবাইদুল্লাহ আল-আমীন
স্ত্রীর প্রতি স্বামীর দায়িত্ব ও কর্তব্য (শেষ কিস্তি) - তামান্না তাসনীম
স্ত্রীর প্রতি স্বামীর দায়িত্ব ও কর্তব্য - তামান্না তাসনীম
ইসলামে ব্যবসা-বাণিজ্যের রূপরেখা - গুলশান আখতার

সর্বশেষ প্রবন্ধ

ফেসবুক পেজ