সোমবার, ০৩ অগাস্ট ২০২৬, ০৩:৩৬ পূর্বাহ্ন

 প্রশ্নোত্তরে ইদ্দত ও শোকপালনের বিধানাবলী 

-শায়খ আব্দুল গাফফার মাদানী*


 (২য় কিস্তি) 

প্রশ্ন : কোন নারী যদি যমজ সন্তান (দুই সন্তান) গর্ভে ধারণ করে, তাহলে তার ইদ্দত কিসের মাধ্যমে সমাপ্ত হবে?

উত্তর : যদি কোন নারী যমজ সন্তান বা একাধিক সন্তান গর্ভে ধারণ করে থাকে, তাহলে তার ইদ্দত সর্বশেষ সন্তান প্রসবের মাধ্যমে সমাপ্ত হবে। প্রথম সন্তান জন্ম নেয়ার সঙ্গে সঙ্গে ইদ্দত শেষ হবে না; বরং গর্ভে থাকা সব সন্তান জন্মগ্রহণ করার পরই ইদ্দত শেষ হবে। আল্লাহ তা‘আলা বলেন, وَ اُولَاتُ الۡاَحۡمَالِ  اَجَلُہُنَّ اَنۡ یَّضَعۡنَ حَمۡلَہُنَّ ‘গর্ভবতী নারীদের ইদ্দতের মেয়াদ হল তারা তাদের গর্ভের সন্তান প্রসব করবে’ (সূরা আত-ত্বালাক্ব : ৪)। এ আয়াতে حَمْلَهُنَّ (তাদের গর্ভ) শব্দ দ্বারা সম্পূর্ণ গর্ভের সন্তানকে বোঝানো হয়েছে। অতএব গর্ভে একাধিক সন্তান থাকলে সকল সন্তান প্রসব না হওয়া পর্যন্ত গর্ভ সম্পূর্ণরূপে মুক্ত হয়েছে বলা যাবে না। ইমাম ইবনু কুদামা (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন, وَإِنْ كَانَ فِي بَطْنِهَا اثْنَانِ أَوْ أَكْثَرُ، لَمْ تَنْقَضِ عِدَّتُهَا حَتَّى تَضَعَ الْجَمِيعَ ‘যদি তার গর্ভে দুই বা ততোধিক সন্তান থাকে, তবে সকল সন্তান প্রসব না করা পর্যন্ত তার ইদ্দত সমাপ্ত হবে না’।[১] ইমাম নববী (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন, لَوْ كَانَتْ حَامِلًا بِتَوْأَمٍ لَمْ تَنْقَضِ عِدَّتُهَا بِوَضْعِ الْأَوَّلِ، بَلْ بِوَضْعِ الثَّانِي ‘যদি কোন নারী যমজ সন্তানের গর্ভধারিণী হয়, তাহলে প্রথম সন্তান প্রসবের মাধ্যমে তার ইদ্দত শেষ হবে না; বরং দ্বিতীয় সন্তান প্রসবের মাধ্যমে শেষ হবে’।[২]

প্রশ্ন : গর্ভবতী নারীর গর্ভের কোন্ অবস্থার সন্তান বা ভ্রুণ বের হলে তার ইদ্দত শেষ হয়েছে বলে গণ্য হবে?

উত্তর : গর্ভবতী নারীর ইদ্দত তখনই সমাপ্ত হবে, যখন তার গর্ভ থেকে এমন কিছু বের হবে যা মানবসন্তানের সৃষ্টি (تخليق) শুরু হয়েছে বলে প্রমাণিত হয়। শুধু রক্তপিণ্ড (علقة) বা চিহ্নহীন মাংসপিণ্ড (مضغة) বের হলে ইদ্দত শেষ হবে না। তবে যদি ভ্রƒণের কোন অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ, যেমন হাত, পা, আঙুল, নখ ইত্যাদির চিহ্ন প্রকাশ পায়, তাহলে ইদ্দত সমাপ্ত হয়ে যাবে। আল্লাহ তা‘আলা বলেন, وَ اُولَاتُ الۡاَحۡمَالِ  اَجَلُہُنَّ اَنۡ یَّضَعۡنَ حَمۡلَہُنَّ ‘গর্ভবতী নারীদের ইদ্দতের মেয়াদ হল তারা তাদের গর্ভের সন্তান প্রসব করবে’ (সূরা আত-ত্বালাক্ব : ৪)। ইমাম ইবনু কুদামা (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন, وَإِنْ أَلْقَتْ مُضْغَةً فِيهَا تَخْطِيطُ آدَمِيٍّ انْقَضَتْ بِهَا الْعِدَّةُ ‘যদি নারী এমন একটি মাংসপিণ্ড প্রসব করে যাতে মানবসৃষ্টির চিহ্ন প্রকাশ পায়, তবে এর মাধ্যমে তার ইদ্দত সমাপ্ত হবে’।[৩] ইমাম নববী (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন, إن ألقت مضغة ظهر فيها شيء من خلق الآدمي انقضت بها العدة  ‘যদি এমন মাংসপিণ্ড বের হয় যাতে মানবসৃষ্টির কোন অংশ প্রকাশ পায়, তাহলে এর মাধ্যমে ইদ্দত শেষ হবে’।[৪] অর্থাৎ গর্ভপাত হলেও যদি ভ্রƒণের মানবীয় অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ বা তার স্পষ্ট চিহ্ন দেখা যায়, তাহলে ইদ্দত শেষ হবে। আর যদি শুধু রক্তপিণ্ড বা চিহ্নহীন মাংসপিণ্ড বের হয়, তাহলে ইদ্দত শেষ হবে না। সেক্ষেত্রে করণীয় হল-

  • যদি তিনি ত্বালাক্বপ্রাপ্তা হন, তাহলে ইদ্দত চলমান থাকবে এবং গর্ভের অবস্থা সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করবেন।
  • যদি পরে প্রমাণিত হয় যে, গর্ভ নষ্ট হয়ে গেছে এবং আর গর্ভ নেই, তাহলে অধিকাংশ ফক্বীহের মতে তিনি গর্ভবতী নারীর ইদ্দত থেকে বের হয়ে অগর্ভবতী নারীর প্রযোজ্য ইদ্দত পূর্ণ করবেন।
  • যদি তিনি স্বামীর মৃত্যুর কারণে ইদ্দতে থাকেন, তাহলে গর্ভ দ্বারা ইদ্দত শেষ প্রমাণিত না হলে মূল বিধান অনুযায়ী চার মাস দশ দিন ইদ্দত পালন করবেন।
প্রশ্ন : কোন ত্বালাক্বপ্রাপ্তা নারী বা এমন নারী যার স্বামী মারা গেছে, যদি সে গর্ভবতী কি না- এ বিষয়ে সন্দেহে পড়ে যায় অর্থাৎ তার গর্ভে সন্তান আছে কি নেই তা স্পষ্ট না হয়, তাহলে তার করণীয় কী?

উত্তর : কোন ত্বালাক্বপ্রাপ্তা নারী বা স্বামীহারা নারী যদি ইদ্দতের সময় সন্দেহে পড়ে যে, সে গর্ভবতী কি-না, তাহলে শুধু সন্দেহের ভিত্তিতে ইদ্দত শেষ হয়েছে বলে গণ্য হবে না। বরং গর্ভ আছে কি-না তা স্পষ্ট হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করবে। কারণ ইদ্দতের উদ্দেশ্যগুলোর একটি হল গর্ভের অবস্থা নিশ্চিত করা। আল্লাহ তা‘আলা বলেন, وَ اُولَاتُ الۡاَحۡمَالِ  اَجَلُہُنَّ اَنۡ یَّضَعۡنَ حَمۡلَہُنَّ ‘গর্ভবতী নারীদের ইদ্দতের মেয়াদ হল তারা তাদের গর্ভের সন্তান প্রসব করবে’ (সূরা আত-ত্বালাক্ব : ৪)। অতএব, গর্ভ আছে কি-না তা অনিশ্চিত থাকলে গর্ভবতী নারীর বিধান প্রয়োগ করা যাবে না, আবার গর্ভ নেই বলেও নিশ্চিত হওয়া যাবে না; তাই বিষয়টি স্পষ্ট হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে। ইমাম ইবনু কুদামাহ (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন, وَإِنِ ارْتَابَتِ الْمُعْتَدَّةُ بِالْحَمْلِ، لَزِمَهَا التَّرَبُّصُ حَتَّى يَزُولَ الرَّيْبُ  ‘ইদ্দত পালনকারিণী নারী যদি গর্ভ সম্পর্কে সন্দেহে পড়ে, তবে সন্দেহ দূর না হওয়া পর্যন্ত তার অপেক্ষা করা আবশ্যক’।[৫] ইমাম আল-কাসানী (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন, الأصل بقاء العدة عند الشك ‘সন্দেহের ক্ষেত্রে মূলনীতি হল ইদ্দত বহাল থাকা’।[৬] এখন করণীয় হল- ১. গর্ভধারণের সন্দেহ থাকলে তাড়াহুড়া করে পুনর্বিবাহ করবে না। ২. চিকিৎসক, আলামত বা সময় অতিবাহিত হওয়ার মাধ্যমে গর্ভ আছে কি-না তা নিশ্চিত করবে। ৩. গর্ভ না থাকার ব্যাপারে নিশ্চিত হলে স্বাভাবিক ইদ্দতের বিধান অনুসরণ করবে। ৪. গর্ভবতী হওয়া নিশ্চিত হলে সন্তান প্রসব পর্যন্ত ইদ্দত চলবে।

প্রশ্ন : কোন নারীর স্বামী বিদেশে বা অন্য স্থানে অবস্থানকালে মারা গেলে, তার মৃত্যুর খবর পরে পৌঁছালে স্ত্রী ইদ্দত কখন থেকে শুরু করবে- মৃত্যুর দিন থেকে, না-কি খবর পাওয়ার দিন থেকে?

উত্তর : কোন নারীর স্বামী যদি বিদেশে বা অন্য স্থানে মারা যায় এবং স্ত্রী পরে এ সংবাদ জানতে পারে, তাহলে জুমহূর ফক্বীহ (হানাফী, মালিকী, শাফেঈ ও হাম্বালী)-এর মতে তার ইদ্দত স্বামীর মৃত্যুর দিন থেকেই গণনা হবে, খবর পাওয়ার দিন থেকে নয়। আল্লাহ তা‘আলা বলেন,  وَ الَّذِیۡنَ یُتَوَفَّوۡنَ مِنۡکُمۡ وَ یَذَرُوۡنَ اَزۡوَاجًا یَّتَرَبَّصۡنَ بِاَنۡفُسِہِنَّ اَرۡبَعَۃَ اَشۡہُرٍ وَّ عَشۡرًا ‘তোমাদের মধ্যে যারা মৃত্যুবরণ করে এবং স্ত্রী রেখে যায়, তাদের স্ত্রীরা নিজেদেরকে চার মাস দশ দিন অপেক্ষায় রাখবে’ (সূরা আল-বাক্বারাহ : ২৩৪)। ইমাম কাসানী (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন, وابتداء العدة من وقت الموت لا من وقت العلم بالموت  ‘ইদ্দতের সূচনা মৃত্যুর সময় থেকে হবে, মৃত্যুর সংবাদ জানার সময় থেকে নয়’।[৭] ইমাম নববী (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন, عدة الوفاة تبتدئ من حين الوفاة بلا خلاف عندنا، سواء علمت في الحال أو بعد مدة ‘আমাদের মাযহাবে মৃত্যুর ইদ্দত মৃত্যুর মুহূর্ত থেকেই শুরু হয়- নারী সঙ্গে সঙ্গে জানুক বা অনেক পরে জানুক’।[৮] ইমাম ইবনু কুদামাহ (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন,

المشهور في المذهب، أنه متى مات زوجها أو طلقها، فعدتها من يوم موته وطلاقه

‘মাযহাবের প্রসিদ্ধ মত হল, যখনই কোন নারীর স্বামী মারা যায় অথবা তাকে ত্বালাক্ব দেয়, তখন তার ইদ্দত স্বামীর মৃত্যু বা ত্বালাক্ব সংঘটিত হওয়ার দিন থেকেই শুরু হবে’। এরপর তিনি বলেন, ‘আবূ বকর বলেন, আমার জানা মতে, ইমাম আহমাদ (আবু আব্দিল্লাহ)-এর পক্ষ থেকে এ বিষয়ে কোন মতভেদ নেই যে, ইদ্দত মৃত্যুর মুহূর্ত বা ত্বালাক্ব সংঘটিত হওয়ার সময় থেকেই আবশ্যক হয়। তবে ইসহাক ইবনু ইবরাহীম একটি ভিন্ন বর্ণনা উল্লেখ করেছেন’। এরপর তিনি আরো বলেন, ‘এ মতই গ্রহণ করেছেন ছাহাবীগণের মধ্যে আব্দুল্লাহ ইবনু উমর, আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস ও আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রাযিয়াল্লাহু আনহুম)। এছাড়াও তাবেয়ী ও পরবর্তী আলিমদের মধ্যে মাসরূক, ‘আত্বা, জাবির ইবনু যায়েদ, ইবনু সীরীন, মুজাহিদ, সাঈদ ইবন জুবাইর, ইকরিমাহ, তাউস, সুলাইমান ইবন ইয়াসার, আবু কিলাবাহ, আবুল আলিয়াহ, নাখঈ, নাফি‘, ইমাম মালিক, ইমাম সাওরী, ইমাম শাফেয়ী, ইসহাক, আবু উবাইদ, আবু সাওর এবং আহলুর রায় তথা হানাফী ফক্বীহগণ’।[৯] অর্থাৎ যদি স্বামীর মৃত্যুর পর চার মাস দশ দিনের বেশি সময় অতিবাহিত হওয়ার পর স্ত্রী সংবাদ পায়, তাহলে তার ইদ্দত ইতোমধ্যেই শেষ হয়ে গেছে; নতুন করে ইদ্দত পালন করতে হবে না। আর যদি চার মাস দশ দিন পূর্ণ হওয়ার আগে সংবাদ পায়, তাহলে অবশিষ্ট সময় পূর্ণ করবে।[১০]

প্রশ্ন : স্বামী দূরে/অনুপস্থিত থাকা অবস্থায় ত্বালাক্ব দিয়েছে, কিন্তু স্ত্রী পরে সে খবর জানতে পেরেছে। সেক্ষেত্রে স্ত্রীর ইদ্দত কি ত্বালাক্বের দিন থেকে গণনা হবে, না-কি ত্বালাক্বের সংবাদ পাওয়ার দিন থেকে?

উত্তর : কোন নারীর স্বামী অনুপস্থিত অবস্থায় তাকে ত্বালাক্ব দিলে এবং স্ত্রী কিছুদিন পরে সে সংবাদ পায়, তাহলে জুমহূর ফক্বীহর মতে, ইদ্দত ত্বালাক্ব সংঘটিত হওয়ার দিন থেকেই গণনা হবে, সংবাদ পাওয়ার দিন থেকে নয়। আল্লাহ তা‘আলা বলেন, یٰۤاَیُّہَا  النَّبِیُّ  اِذَا طَلَّقۡتُمُ النِّسَآءَ فَطَلِّقُوۡہُنَّ  لِعِدَّتِہِنَّ وَ اَحۡصُوا  الۡعِدَّۃَ ‘হে নবী! যখন তোমরা নারীদের ত্বালাক্ব দেবে, তখন তাদের ইদ্দতের জন্য ত্বালাক্ব দাও এবং ইদ্দত গণনা কর’ (সূরা আত-ত্বালাক্ব : ১)। ইমাম ইবনু কুদামা (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন, المشهور في المذهب، أنه متى مات زوجها أو طلقها، فعدتها من يوم موته وطلاقه ‘মাযহাবের প্রসিদ্ধ মত হল, যখনই কোন নারীর স্বামী মারা যায় অথবা তাকে ত্বালাক্ব দেয়, তখন তার ইদ্দত স্বামীর মৃত্যু বা ত্বালাক্ব সংঘটিত হওয়ার দিন থেকেই শুরু হবে’। তিনি আরও বলেন, ‘আবু বকর বলেন: আমার জানা মতে, ইমাম আহমদ (আবু আব্দিল্লাহ)-এর পক্ষ থেকে এ বিষয়ে কোন মতভেদ নেই যে, ইদ্দত মৃত্যুর মুহূর্ত বা ত্বালাক্ব সংঘটিত হওয়ার সময় থেকেই আবশ্যক হয়। তবে ইসহাক ইবন ইবরাহীম একটি ভিন্ন বর্ণনা উল্লেখ করেছেন’।
এরপর তিনি বলেন, ‘এ মতই গ্রহণ করেছেন ছাহাবীগণের মধ্যে আব্দুল্লাহ ইবনু উমর, আব্দুল্লাহ ইবনু আব্বাস ও আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রাযিয়াল্লাহু আনহুম)। এছাড়াও তাবেয়ী ও পরবর্তী আলিমদের মধ্যে মাসরূক, ‘আত্বা, জাবির ইবনু যায়েদ, ইবনু সীরীন, মুজাহিদ, সাঈদ ইবনু জুবাইর, ইকরিমাহ, তাউস, সুলাইমান ইবনু ইয়াসার, আবু কিলাবাহ, আবুল আলিয়াহ, নাখঈ, নাফি‘, ইমাম মালিক, ইমাম সাওরী, ইমাম শাফেয়ী, ইসহাক, আবু উবাইদ, আবু সাওর এবং আহলুর রায়  তথা হানাফী ফক্বীহগণ’।[১১] ইমাম কাসানী (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন, وابتداء العدة من وقت الطلاق لا من وقت العلم به ‘ইদ্দতের সূচনা ত্বালাক্ব সংঘটিত হওয়ার সময় থেকে হবে, ত্বালাক্বের সংবাদ জানার সময় থেকে নয়’।[১২] স্বামী দূরে থেকে ত্বালাক্ব দিলে এবং স্ত্রী পরে সে সংবাদ পেলেও ইদ্দত ত্বালাক্বের দিন থেকেই শুরু হবে। যদি সংবাদ পাওয়ার আগেই ইদ্দতের সময় পূর্ণ হয়ে যায়, তাহলে নতুন করে ইদ্দত পালন করতে হবে না।

প্রশ্ন : কোন নারীকে তার স্বামী রজয়ী (প্রত্যাবর্তনযোগ্য) ত্বালাক্ব দিয়েছে। সে ইদ্দত পালন শুরু করেছে। ইদ্দত চলাকালীন অবস্থায় স্বামী মারা গেল। সে কি ত্বালাক্বের ইদ্দত পূর্ণ করবে, না-কি মৃত্যুর কারণে নতুন ইদ্দত (চার মাস দশ দিন) পালন করবে?

উত্তর : যদি কোন নারীকে তার স্বামী ত্বালাক্ব-এ রজঈ (প্রত্যাবর্তনযোগ্য ত্বালাক্ব) দেয় এবং সে ইদ্দত পালনরত অবস্থায় স্বামী মারা যায়, তাহলে ত্বালাক্বের ইদ্দত বাতিল হয়ে যাবে এবং তাকে স্বামীর মৃত্যুর ইদ্দত (চার মাস দশ দিন) নতুন করে পালন করতে হবে। কারণ রজঈ ত্বালাক্বের ইদ্দত চলাকালে স্ত্রী এখনও শরী‘আতের দৃষ্টিতে স্ত্রীর মর্যাদায় থাকে এবং স্বামীর মৃত্যুর মাধ্যমে সে বিধবা হয়ে যায়। আল্লাহ তা‘আলা বলেন,  وَ الَّذِیۡنَ یُتَوَفَّوۡنَ مِنۡکُمۡ وَ یَذَرُوۡنَ اَزۡوَاجًا یَّتَرَبَّصۡنَ بِاَنۡفُسِہِنَّ اَرۡبَعَۃَ اَشۡہُرٍ وَّ عَشۡرًا ‘তোমাদের মধ্যে যারা মৃত্যুবরণ করে এবং স্ত্রী রেখে যায়, তাদের স্ত্রীরা নিজেদেরকে চার মাস দশ দিন অপেক্ষায় রাখবে’ (সূরা আল-বাক্বারাহ : ২৩৪)। রজঈ ত্বালাক্বপ্রাপ্তা স্ত্রী ইদ্দতের মধ্যে স্বামীর স্ত্রী হিসাবেই গণ্য হয়; তাই স্বামীর মৃত্যু হলে এই আয়াতের বিধান তার ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য হবে। ইমাম ইবনু কুদামাহ (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন, وَإِنْ مَاتَ الْمُطَلِّقُ الرَّجْعِيُّ فِي عِدَّتِهَا، انْتَقَلَتْ إِلَى عِدَّةِ الْوَفَاةِ بِغَيْرِ خِلَافٍ نَعْلَمُهُ ‘যদি রজঈ ত্বালাক্বদাতা স্বামী স্ত্রীর ইদ্দতের মধ্যে মারা যায়, তবে স্ত্রী মৃত্যুর ইদ্দতে (চার মাস দশ দিন) স্থানান্তরিত হবে। এ বিষয়ে আমাদের জানা মতে কোন মতভেদ নেই’।[১৩] ইমাম আন-নাওয়াবী (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন, إذا مات الزوج في عدة الرجعية وجب عليها عدة الوفاة بلا خلاف ‘রজঈ ত্বালাক্বপ্রাপ্তা স্ত্রীর ইদ্দত চলাকালে স্বামী মারা গেলে তার উপর মৃত্যুর ইদ্দত পালন করা ওয়াজিব। এ বিষয়ে কোন মতভেদ নেই’।[১৪] অতএব রজঈ ত্বালাক্বপ্রাপ্তা নারী ইদ্দতের মধ্যে স্বামী মারা গেলে ত্বালাক্বের ইদ্দত বাতিল হয়ে যায়; তাকে মৃত্যুর দিন থেকে চার মাস দশ দিনের নতুন ইদ্দত পালন করতে হবে।

(ইনশাআল্লাহ চলবে)


*শিক্ষক, আল-জামি‘আহ আস-সালাফিয়্যাহ, ডাঙ্গীপাড়া, রাজশাহী।

তথ্যসূত্র :
[১]. আল-মুগনী, ১১/২৩১ পৃ.।
[২]. আল-মাজমূ‘ শারহুল মুহাযযাব, ১৯/২৯১ পৃ.।
[৩]. আল-মুগনী, ১১/২৩১ পৃ.।
[৪]. আল-মাজমূ‘ শারহুল মুহাযযাব, ১৯/২৮৯ পৃ.।
[৫]. আল-মুগনী, ১১/২৩১ পৃ.।
[৬]. বাদায়েউছ ছানায়ে, ৩/২০৫ পৃ.।
[৭]. বাদায়েউছ ছানায়ে, ৩/১৯৭ পৃ.।
[৮]. আল-মাজমূ‘ শারহুল মুহাযযাব, ১৮/১৯৭ পৃ.।
[৯]. আল-মুগনী, ১১/৩০৭ পৃ.।
[১০]. ফাতওয়া নূরুন ‘আলাদ দারব লি ইবনু উছায়মীন, ২/১৯ পৃ.।
[১১]. আল-মুগনী, ১১/৩০৭ পৃ.।
[১২]. বাদায়েউছ ছানায়ে, ৩/২০৩ পৃ.।
[১৩]. আল-মুগনী, ১১/২৪৯ পৃ.।
[১৪]. আল-মাজমূ‘ শারহুল মুহাযযাব, ১৮/১৮৫ পৃ.।




প্রসঙ্গসমূহ »: নারী সমাজ নারীমঞ্চ
শারঈ পর্দা : একটি পর্যালোচনা (৬ষ্ঠ কিস্তি) - ওবাইদুল্লাহ আল-আমীন
ইসলামে ব্যবসা-বাণিজ্যের রূপরেখা - গুলশান আখতার
ইসলামে ব্যবসা-বাণিজ্যের রূপরেখা - গুলশান আখতার
আল-কুরআনে নারী কেন্দ্রিক আলোচনা ও শিক্ষনীয় বিষয়সমূহ - ওবাইদুল্লাহ আল-আমীন
শারঈ পর্দা : একটি পর্যালোচনা - ওবাইদুল্লাহ আল-আমীন
প্রশ্নোত্তরে ইদ্দত ও শোকপালনের বিধানাবলী (২য় কিস্তি) - আব্দুল গাফফার মাদানী
ইসলামে নারী নেতৃত্ব: একটি পর্যালোচনা - আব্দুল গাফফার মাদানী
প্রশ্নোত্তরে নারীদের ছালাত শিক্ষা (৫ম কিস্তি) - আব্দুল গাফফার মাদানী
ইসলামিক প্যারেন্টিং (৮ম কিস্তি) - তিনা খান
সুন্নাহ প্রতিষ্ঠায় নারী সমাজের ভূমিকা - আল-ইখলাছ ডেস্ক
স্ত্রীর প্রতি স্বামীর দায়িত্ব ও কর্তব্য (২য় কিস্তি) - তামান্না তাসনীম
শারঈ পর্দা : একটি পর্যালোচনা (৭ম কিস্তি) - ওবাইদুল্লাহ আল-আমীন

সর্বশেষ প্রবন্ধ

ফেসবুক পেজ