শনিবার, ০৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১১:৫৫ অপরাহ্ন

প্রশ্নোত্তরে মুসলিম নারীদের ইসলাম শিক্ষা

- আব্দুল গাফফার মাদানী*


(৫ম কিস্তি) 

জানাবাত বা অপবিত্র থেকে পবিত্রতা অর্জনের গোসল প্রসঙ্গে

প্রশ্ন: একজন মহিলা জানাবাত বা নাপাকি থেকে পবিত্রতা অর্জনের জন্য কিভাবে গোসল করবে?

উত্তর: অপবিত্র থেকে পবিত্রতা অর্জনের গোসলের বিবরণ নিম্নে উল্লেখ করা হলো: মহিলা সর্বপ্রথম হাতে পানি নিয়ে তা দিয়ে সুন্দরভাবে ওযূ করবে। আর ওযূর ক্ষেত্রে ডান দিক থেকে শুরু করবে। এ ব্যাপারে আয়েশা (রাযিয়াল্লাহু আনহা) বলেন, كَانَ النَّبِيُّ ﷺ يُعْجِبُهُ التَّيَمُّنُ فِيْ تَنَعُّلِهِ وَتَرَجُّلِهِ وَطُهُوْرِهِ وَفِيْ شَأْنِهِ كُلِّهِ‏ ‘নবী (ﷺ) জুতা পরা, চুল আঁচড়ানো এবং পবিত্রতা অর্জন করা তথা প্রত্যেক কাজই ডান দিক হতে আরম্ভ করতে পসন্দ করতেন’।[১] অতঃপর তিন অঞ্জলি পানি মাথায় ঢালে মাথাকে ভালোভাবে ঘোষবে যাতে করে চুলের প্রতিটি গোড়ায় পানি পৌঁছে যায়। তারপর শরীরের ডান পাশে অতঃপর বাম পাশে পানি ঢালবে। তবে মাথার খোপা খোলা আবশ্যক নয়। উপরেল্লেখিত বিষয়গুলো ওয়াজিব নয়, বরং তা মুস্তাহাব। এ ব্যাপারে ছহীহ বুখারীতে ঈমরান ইবনু হুসাইন (রাযিয়াল্লাহু আনহু) হতে ঘটনা বর্ণিত হয়েছে যে, তিনি বলেছেন,

‏‏‏‏‏‏أَنْ رَسُوْلَ اللهِ ﷺ رَأَى رَجُلًا مُعْتَزِلًا لَمْ يُصَلِّ مَعَ الْقَوْمِ، ‏‏‏‏‏‏فَقَالَ:‏‏‏‏ يَا فُلَانُ مَا مَنَعَكَ أَنْ تُصَلِّيَ مَعَ الْقَوْمِ ؟ فَقَالَ:‏‏‏‏ يَا رَسُوْلَ اللهِ، ‏‏‏‏‏‏أَصَابَتْنِيْ جَنَابَةٌ وَلَا مَاءَ، ‏‏‏‏‏‏قَالَ:‏‏‏‏ عَلَيْكَ بِالصَّعِيْدِ فَإِنَّهُ يَكْفِيْكَ 

‘রাসূলুল্লাহ (ﷺ) এক ব্যক্তিকে লোকেদের সঙ্গে ছালাত আদায় না করে আলাদা থাকতে দেখলেন। তিনি বললেন, হে অমুক! লোকেদের সঙ্গে ছালাত আদায় করতে কোন্ জিনিসটি তোমাকে বাধা দিল? সে ব্যক্তি বলল, হে আল্লাহর রাসূল (ﷺ)! আমি অপবিত্র অবস্থায় আছি অথচ পানি পাইনি। তিনি বললেন, তুমি মাটি ব্যবহার কর, তা-ই তোমার জন্য যথেষ্ট’।[২] যদি মহিলা তিন অঞ্জলি পানি নিয়ে মাথার ওপর ঢালে অতঃপর ডানে এবং বামে পুরো শরীরে পানি প্রবাহিত করে তাহলে তা যথেষ্ট হবে। আবার কোন মহিলা যদি সরাসরি ঝর্ণার নিচে গিয়ে গোসল করে তাহলে ঐ গোসল তার জন্য যথেষ্ট হবে।

কোন মহিলা যদি ওযূ সংরক্ষণ করতে চায়, তাহলে গোসলের পর হাত দ্বারা লজ্জাস্থান স্পর্শ করা থেকে বিরত থাকবে। (যেহেতু পূর্বে আলোচনা করা হয়েছে যে, হাত দ্বারা লজ্জাস্থান স্পর্শ করলে ওযূ নষ্ট হয়ে যায়)। এ বিষয়গুলোর দলীল গোসলের বর্ণনাতে আলোচিত হয়েছে। অন্যত্র আয়েশা (রাযিয়াল্লাহু আনহা) বলেন,

كُنَّا إِذَا أَصَابَتْ إِحْدَانَا جَنَابَةٌ، أَخَذَتْ بِيَدَيْهَا ثَلَاثًا فَوْقَ رَأْسِهَا، ثُمَّ تَأْخُذُ بِيَدِهَا عَلَى شِقِّهَا الْأَيْمَنِ، وَبِيَدِهَا الْأُخْرَى عَلَى شِقِّهَا الْأَيْسَرِ‏

‘আমাদের কারও জানাবাতের গোসলের প্রয়োজন হলে সে দু’হাতে পানি নিয়ে তিনবার মাথায় ঢালত। পরে হাতে পানি নিয়ে ডান পাশে তিনবার এবং আবার অপর হাতে পানি নিয়ে বাম পাশে তিনবার ঢালত’।[৩] আয়েশা (রাযিয়াল্লাহু আনহা) আরো বলেন,

كَانَتْ إِحْدَانَا إِذَا أَصَابَتْهَا جَنَابَةٌ أَخَذَتْ ثَلَاثَ حَفَنَاتٍ هَكَذَا- تَعْنِيْ بِكَفَّيْهَا جَمِيْعًا- فَتَصُبُّ عَلَى رَأْسِهَا وَأَخَذَتْ بِيَدٍ وَاحِدَةٍ فَصَبَّتْهَا عَلَى هَذَا الشِّقِّ وَالأُخْرَى عَلَى الشِّقِّ الآخَرِ ‏.‏

‘আমাদের কেউ অপবিত্র হলে সে তিন কোষ পানি নিয়ে এইরূপে অর্থাৎ দুই হাতের কোশ দ্বারা মাথার উপর পানি ঢালতেন। অতঃপর তিনি হাত দ্বারা পানির পাত্র থেকে পানি নিয়ে শরীরের একাংশে একবার এবং অপরাংশে একবার পানি ঢালতেন’।[৪]

আবার ছহীহ মুসলিমে এভাবে বর্ণিত হয়েছে যে, আসমা বিনতে শাকাল (রাযিয়াল্লাহু আনহা) রাসূল (ﷺ)-কে জানাবাতের গোসল সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করলে তিনি বলেন,

تَأْخُذُ مَاءً فَتَطَهَّرُ فَتُحْسِن الطُّهُوْرَ -أَوْ تُبْلِغُ الطُّهُوْرَ - ثُمَّ تَصُبُّ عَلَى رَأْسِهَا فَتَدْلُكُهُ حَتَّى تَبْلُغَ شُئُوْنَ رَأْسِهَا ثُمَّ تُفِيضُ عَلَيْهَا الْمَاءَ‏.‏ فَقَالَتْ عَائِشَةُ نِعْمَ النِّسَاءُ نِسَاءُ الْأَنْصَارِ لَمْ يَكُنْ يَمْنَعُهُنَّ الْحَيَاءُ أَنْ يَتَفَقَّهْنَ فِي الدِّيْنِ‏.‏

‘পানি দ্বারা সুন্দরভাবে পবিত্র হবে। তারপর মাথায় পানি ঢেলে দিয়ে ভাল করে রগড়ে ফেলবে যাতে চুলের গোড়ায় পানি পৌঁছে যায়। তারপর সর্বাঙ্গে পানি বইয়ে দিবে। আয়েশা (রাযিয়াল্লাহু আনহা) বললেন, আনছারদের মহিলারা কত ভাল! লজ্জা তাদেরকে দ্বীনের জ্ঞান থেকে ফিরিয়ে রাখে না’।[৫]

মাথার খোপা খোলা যরূরী নয়। যেহেতু এ ব্যাপারে ছহীহ মুসলিমে উম্মে সালামা (রাযিয়াল্লাহু আনহা) থেকে স্পষ্ট বর্ণনা এসেছে। তিনি বলেন, আমি বললাম, হে আল্লাহর রাসূল (ﷺ)!

إِنِّي امْرَأَةٌ أَشُدُّ ضَفْرَ رَأْسِيْ فَأَنْقُضُهُ لِغُسْلِ الْجَنَابَةِ ؟ قَالَ: لَا. إِنَّمَا يَكْفِيْكِ أَنْ تَحْثِيْ عَلَى رَأْسِكِ ثَلَاثَ حَثَيَاتٍ ثُمَّ تُفِيضِيْنَ عَلَيْكِ الْمَاءَ فَتَطْهُرِيْنَ 

‘আমার চুল অত্যন্ত ঘন, আমি কি জানাবাতের গোসলের জন্য মাথার খোপা খুলবো? তিনি বলেন না বরং তোমার জন্য যথেষ্ট হলো যে, মাথায় তিন অঞ্জলি পানি ঢালাবে এরপর পুরো শরীরে পানি ঢেলে পবিত্রতা অর্জন করবে’।[৬]

‘জানাবাত থেকে পবিত্রতা অর্জনকারী মাথার খোপা খুলবে’ আব্দুল্লাহ ইবনু আমর (রাযিয়াল্লাহু আনহুমা)-এর একথাকে আয়েশা (রাযিয়াল্লাহু আনহা) অস্বীকার করেছেন। ছহীহ মুসলিমে বর্ণিত হয়েছে, আয়েশা (রাযিয়াল্লাহু আনহা) কাছে একটি সংবাদ পৌঁছলো যে, আব্দুল্লাহ ইবনু আমর মহিলাদেরকে জানাবার থেকে পবিত্রতা অর্জন করার জন্য গোসল করার সময় মাথার খোপা খোলার নির্দেশ দেন। তখন আয়েশা (রাযিয়াল্লাহু আনহা) ইবনে আম্মুর কে লক্ষ্য করে বলেন, কী আশ্চর্য! এই ব্যক্তি মহিলাদেরকে গোসলের সময় বেনি খোলার নির্দেশ দেয়...?! তিনি কি মহিলাদেরকে মাথা মুণ্ডন করা নির্দেশ দিতে পারেন না!!! অবশ্যই আমি এবং রাসূল (ﷺ) একই পাত্র থেকে গোসল করেছি অথচ আমি আমার মাথায় মাত্র তিন অঞ্জলি পানি ঢেলেছি। (আল্লাহ তায়ালাই সর্বাধিক জ্ঞাত)

হায়েয থেকে পবিত্র হওয়ার লক্ষ্যে গোসল প্রসঙ্গে

প্রশ্ন: একজন মহিলা হায়েয থেকে পবিত্র হওয়ার জন্য কিভাবে গোসল করবে?

উত্তর: আয়েশা (রাযিয়াল্লাহু আনহা) বলেন, আসমা (রাযিয়াল্লাহু আনহা) নবী (ﷺ)-কে ঋতুস্রাবরত মহিলার গোসল প্রসঙ্গে জিজ্ঞাসা করলে নবী (ﷺ) বলেন,

تَأْخُذُ إِحْدَاكُنَّ مَاءَهَا وَسِدْرَتَهَا فَتَطَهَّرُ فَتُحْسِنُ الطُّهُوْرَ ثُمَّ تَصُبُّ عَلَى رَأْسِهَا فَتَدْلُكُهُ دَلْكًا شَدِيْدًا حَتَّى تَبْلُغَ شُئُوْنَ رَأْسِهَا ثُمَّ تَصُبُّ عَلَيْهَا الْمَاءَ‏.‏ ثُمَّ تَأْخُذُ فِرْصَةً مُمَسَّكَةً فَتَطَهَّرُ بِهَا‏.‏ فَقَالَتْ أَسْمَاءُ وَكَيْفَ تَطَهَّرُ بِهَا فَقَالَ ‏"‏سُبْحَانَ اللهِ تَطَهَّرِيْنَ بِهَا.‏ فَقَالَتْ عَائِشَةُ كَأَنَّهَا تُخْفِي ذَلِكَ تَتَبَّعِيْنَ أَثَرَ الدَّمِ ‏.‏فَقَالَتْ عَائِشَةُ نِعْمَ النِّسَاءُ نِسَاءُ الْأَنْصَارِ لَمْ يَكُنْ يَمْنَعُهُنَّ الْحَيَاءُ أَنْ يَتَفَقَّهْنَ فِي الدِّيْنِ.

‘তোমাদের কেউ পানি এবং বরই এর পাতা নিয়ে সুন্দরভাবে পবিত্রতা অর্জন করবে। তারপর মাথায় পানি ঢেলে দিয়ে ভালভাবে নাড়াচড়া করবে যাতে পানি সমস্ত চুলের গোড়া পর্যন্ত পৌঁছে যায়। তারপর তার উপর পানি ঢেলে দিবে। তারপর সুগন্ধযুক্ত কাপড় নিয়ে তার দ্বারা পবিত্রতা অর্জন করবে। আসমা বলল, তা দিয়ে সে কিভাবে পবিত্রতা অর্জন করবে? তিনি বললেন, সুবহানাল্লাহ! তা দিয়ে পবিত্রতা অর্জন করবে। অতঃপর আয়েশা (রাযিয়াল্লাহু আনহা) তাকে যেন চুপি চুপি বলে দিলেন, রক্ত বের হবার জায়গায় তা বুলিয়ে দিবে। আয়েশা (রাযিয়াল্লাহু আনহা) বললেন, আনছারদের মহিলারা কত ভাল লজ্জা তাদেরকে দ্বীন এর জ্ঞান থেকে ফিরিয়ে রাখে না’।[৭]

ছহীহুল বুখারীতেও কাছাকাছি অনুরূপ হাদীছ বর্ণিত হয়েছে। সুতরাং উল্লেখিত হাদীছগুলোর উপর ভিত্তি করে ঋতুস্রাবরত মহিলার গোসলের সারসংক্ষেপ বিবরণ নিম্নে উল্লেখ করা হলো: মহিলা সর্বপ্রথম পানি এবং (গুড়াকৃত)বরই পাতা উপস্থিত করে তা পানিতে মিশাবে অথবা বরই পাতার স্থলাভিষিক্ত সাবান বা এই জাতীয় অন্য কিছু ব্যবহার করবে। এরপর সুন্দরভাবে ওযূ করবে, অতঃপর মাথায় পানি ঢেলে তা ভালোভাবে ঘষবে যাতে করে চুলের প্রতিটি গোড়ায় পানি পৌঁছে যায়। এক্ষেত্রে চুলের বেণী খোলা আবশ্যক নয়, তবে বেণী খোলা চুলের প্রতিটি ঘোড়ায় পানি পৌঁছাতে সাহায্য করে। এরপর শরীরের ডান পাশে অতঃপর বাম পাশে এবং পুরো শরীরে পানি ঢালবে। এরপর কাপড়ের একটি টুকরা বা জাতীয় অন্য কিছু রক্ত প্রবাহিত হওয়ার স্থানে বেধে দিবে।

পরিশেষে, যদিও আবশ্যক নয় তারপরেও রক্ত প্রবাহিত হওয়ার স্থানে অবশ্যই সুগন্ধি ব্যবহার করবে। সুগন্ধি ব্যবহারের গুরুত্ব এবং তা মুস্তাহাব হওয়ার ব্যাপারে ছহীহুল বুখারীতে উম্মে আতিয়া (রাযিয়াল্লাহু আনহা) থেকে স্পষ্ট বর্ণনা এসেছে যে,

وَقَدْ رُخِّصَ لَنَا عِنْدَ الطُّهْرِ إِذَا اغْتَسَلَتْ إِحْدَانَا مِنْ مَحِيْضِهَا فِيْ نُبْذَةٍ مِنْ كُسْتِ أَظْفَارٍ

‘আমাদের কেউ যখন হায়িয শেষে গোসল করে পবিত্র হয়, তখন (দুর্গন্ধ দূর করার জন্য) আযফার নামক স্থানের সুগন্ধি ব্যবহার করার আমাদেরকে অনুমতি দেয়া হয়েছে’।[৮]

উপকারিতা

বিজ্ঞ একদল আলেম বলেন, সুগন্ধি ব্যবহারের উদ্দেশ্য হলো রক্ত প্রবাহিত হওয়ার স্থান তথা লজ্জাস্থানকে সুগন্ধিযুক্ত করা এবং দুর্গন্ধকে প্রতিহত করা, যাতে করে একজন স্বামী তার স্ত্রীর থেকে পরিপূর্ণভাবে স্বাদ উপভোগ করতে পারে। (আল্লাহ তা‘আলাই সর্বাধিক  জ্ঞাত)।

প্রশ্ন: একজন স্ত্রী তার স্বামীর সাথে সহবাস করে অতঃপর সে ঋতুস্রব হয়েছে, সে কি জানাবাত থেকে পবিত্র হওয়ার জন্য দ্রুত গোসল করবে, না-কি দেরি করে হায়েয এবং জানাবাতের গোসল একসাথে করবে?

উত্তর: এ ব্যাপারে আল্লাহর রাসূল (ﷺ) থেকে স্পষ্ট হাদীছ আছে বলে জানা যায় না। এ ব্যাপারে আলেমদের দু’টি মত লক্ষ্য করা যায়। যথা: একদল আলিমের মত হল- প্রথমে জানাবাতের গোসল করবে অতঃপর পুনরায় হায়েয থেকে পবিত্র হওয়ার জন্য গোসল করবে। আর এই মত পোষণ করেছেন ‘আত্বা ইবনে আবি রবাহ, ইমাম হাসান আল বাছরী ইবরাহীম আন-নাখঈ, আল-হাকাম, হাম্মাদ এবং অন্যরা। আলেমদের অপর একটি বিজ্ঞ দলের মতে, তার মধ্যে ক্বাতাদা (রাহিমাহুল্লাহ) (তার দুই মতের একটি হলো): ঐ মহিলা প্রথমে তার লজ্জাস্থান পরিষ্কার করবে, আর এটাই তার জন্য যথেষ্ট হবে। (অর্থাৎ শুধু লজ্জাস্থান পরিষ্কার করে রাখবে এরপর হায়েয এবং জানাবাতের গোসল একসাথে করবে)।

‘জামিঊ আহকামিন নিসা’ গ্রন্থাকার বলেন, ‘আমার কাছে যে মতটি স্পষ্ট মনে হয় (এর প্রকৃত জ্ঞান আল্লাহ তা‘আলার কাছেই) তা হল, যার উপর গোসল অপরিহার্য হবে তার কর্তব্য হলো (এ কথার স্পষ্ট কোন দলীল নেই) যদি ছালাতের জন্য হয়, তাহলে দ্রুত গোসল করবে, আর যদি ছালাত না থাকে, তাহলে দেরিতে গোসল করা তার জন্য বৈধতা রয়েছে। যেমন,

كَيْفَ كَانَ يَصْنَعُ فِى الْجَنَابَةِ أَكَانَ يَغْتَسِلُ قَبْلَ أَنْ يَنَامَ أَمْ يَنَامُ قَبْلَ أَنْ يَغْتَسِلَ قَالَتْ كُلُّ ذَلِكَ قَدْ كَانَ يَفْعَلُ رُبَّمَا اغْتَسَلَ فَنَامَ وَرُبَّمَا تَوَضَّأَ فَنَامَ. قُلْتُ الْحَمْدُ لِلهِ الَّذِىْ جَعَلَ فِى الأَمْرِ سَعَةً

‘একবার আয়েশা (রাযিয়াল্লাহু আনহা)-কে জিজ্ঞাসা করা হলো, আল্লাহর রাসূল (ﷺ) কি জুনুবী থাকা অবস্থায় গোসলের পূর্বে ঘুমাতেন? আয়েশা (রাযিয়াল্লাহু আনহা) বলেন, তিনি কখনো এমনটা করতেন, আবার কখনো এমনটা করতেন না। অতঃপর আয়েশা (রাযিয়াল্লাহু আনহা)-কে লক্ষ্য করে প্রশ্নকারী বলেন, ঐ আল্লাহর সকল প্রশংসা যিনি এ বিষয়ে প্রশস্ততা রেখেছেন’।[৯] সুতরাং এখান থেকে বুঝা যায় যে, জুনুবী ব্যক্তির দেরিতে গোসল করার বৈধতা রয়েছে। অতএব, হায়েযের এবং জানাবাতের গোসল একত্র করার বৈধতা রয়েছে। (আল্লাহ তা‘আলাই সর্বাধিক জ্ঞাত)

জানাবাতের গোসল হায়েযের গোসল পর্যন্ত দেরিতে করা এ কথাটি হায়েযরত অবস্থায় জানাবাতের গোসল মুস্তাহাব হওয়ার বিষয়টিকে অস্বীকার করে না। আর এই মাসআলাটি ইবনে কুদামা (রাহিমাহুল্লাহ) তাঁর ‘আল-মুগনী’ গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন, ‘যখন কোন ঋতুবতী মহিলা অপবিত্র অবস্থায় থাকবে। এমতাবস্থায় ঐ মহিলা হায়েয বন্ধ হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করাতে কোন অসুবিধা নেই’। ইসহাক্ব (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন, যে এ ব্যাপারে ইমাম আহমাদ (রাহিমাহুল্লাহ) দলীল পেশ করেছেন। আর তা এই কারণে যে, দ্রুত গোসল করাটা শরী‘আতের বিধি-বিধানের কোন উপকারে আসবে না। যদি ঋতুবতী থাকা অবস্থায় গোসল করে তাহলে তার গোসল বিশুদ্ধ হবে এবং তার থেকে জানাবাতের হুকুম দূর হয়ে যাবে। এ ব্যাপারে ইমাম আহমাদ (রাহিমাহুল্লাহ) দলীল পেশ করে বলেন, তার থেকে জানাবাতের বিধান দূর হয়ে যাবে কিন্তু রক্ত বন্ধ না হওয়া পর্যন্ত তার থেকে হায়েযের বিধান রহিত হবে না’।[১০]

রেহেমে প্লাস্টিক সার্জারি বিধান

প্রশ্ন: মা শিশুর দুগ্ধ পান (দুই বছর) পূর্ণ করার লক্ষ্যে দুগ্ধ পানকালে গর্ভ ধারন প্রতিবন্ধক (প্লাস্টিক সার্জারি, ঔষধ, ইনজেকশন ইত্যাদি) এমন কোন মাধ্যম গ্রহণ করার বিধান কী?

উত্তর: কুরআন ও ছহীহ হাদীছের আলোকে জায়েয। আল্লাহ তা‘আলা বলেন, وَ الۡوَالِدٰتُ یُرۡضِعۡنَ اَوۡلَادَہُنَّ حَوۡلَیۡنِ کَامِلَیۡنِ لِمَنۡ اَرَادَ  اَنۡ یُّتِمَّ الرَّضَاعَۃَ ‘আর জননীগণ তাদের সন্তানদেরকে পূর্ণ দু’বছর স্তন্য পান করাবে এটা সে ব্যক্তির জন্য, যে স্তন্যপান কাল পূর্ণ করতে চায়’ (সূরা আল-বাক্বারাহ: ২৩৩)। উবাদা ইবনুস ছামিত (রাযিয়াল্লাহু আনহু) বলেন, أَنَّ رَسُوْلَ اللهِ ﷺ قَضَى أَنْ لَا ضَرَرَ وَلَا ضِرَارَ ‘রাসূলুল্লাহ (ﷺ) নির্দেশ দিয়েছেন যে, ক্ষতি করাও যাবে না, ক্ষতি সহাও যাবে না’।[১১]

যদি প্রত্যেক বৎসর সন্তান দিয়ে দুর্বল ও রোগা হয়ে যায় বা ঘন-ঘন সন্তান দানের ফলে কোন স্ত্রীরোগ তাকে পীড়িত করে তোলে, তাহলে ট্যাবলেট আদি ব্যবহার করে দুই সন্তানের মাঝের সময়কে কিছু লম্বা করা বৈধ। এর বৈধতা রাসূল (ﷺ)-এর যুগে কিছু ছাহাবীর আয্ল (সঙ্গমে বীর্যস্খলনের সময় যোনীপথের বাইরে বীর্যপাত করা) থেকে প্রমাণিত হয়।[১২] তবে দারিদ্র্যের ভয়ে সন্তান কম নেয়ার লক্ষ্যে জন্মনিয়ন্ত্রণ করা হারাম (সূরা বনী ইসরাঈল: ৩১)। এছাড়া বাচ্চার দুধ খাওয়া পর্যন্ত কিংবা স্ত্রীর কোন শারীরিক কারণে যেকোন অস্থায়ী পদ্ধতি গ্রহণ করা যায়।[১৩] সন্তান না নেয়ার উদ্দেশ্যে অস্ত্রোপচার বা স্থায়ী যে কোন পদ্ধতি অবলম্বন করা কাবীরাহ গোনাহ, যা তওবা ব্যতিরেকে মাফ হবে না (সূরা আয-যুমার: ৫৩)।

(ইনশাআল্লাহ চলবে)


*  শিক্ষক, দারুল হুদা ইসলামী কমপ্লেক্স, বাঘা, রাজশাহী।

তথ্যসূত্র :
[১]. ছহীহ বুখারী, হা/৪২৬, ৫৩৮০, ৫৮৫৪, ৫৯২৬; ছহীহ মুসলিম, হা/১১৮৭।
[২]. ছহীহ বুখারী, হা/৩৪৪; ছহীহ মুসলিম, হা/৬৮২; ইরওয়াউল গালীল, হা/১৫৬।
[৩]. ছহীহ বুখারী, হা/২৬৯।
[৪]. আবূ দাঊদ, হা/২৫৩।
[৫]. ছহীহ মুসলিম, হা/৩৩২।
[৬]. ছহীহ মুসলিম, হা/৩৩০; মিশকাত, হা/৪৩৮।
[৭]. ছহীহ মুসলিম, হা/৩৩২।
[৮]. ছহীহ মুসলিম, হা/৩৩২।
[৯]. ছহীহ মুসলিম, হা/৩০৭।
[১০]. মুছত্বফা আল-‘আদাভী, জামিঊ আহকামিন নিসা, ৫ম খণ্ড, পৃ. ৩৯।
[১১]. ইবনু মাজাহ, হা/২/২৩৪১; মুসনাদে আহমাদ, হা/২৮৬২।
[১২]. আয-যিওয়াজ, পৃ. ৩১-৩৩; রিসালাতুন ফী দিমাইত ত্বাবীইয়্যাতি লিন্নিসা, পৃ. ৪৪।
[১৩]. ছহীহ মুসলিম, হা/১৪৩৮; মিশকাত, হা/৩১৮৭।




প্রশ্নোত্তরে ইদ্দত ও শোকপালনের বিধানাবলী (২য় কিস্তি) - আব্দুল গাফফার মাদানী
প্রশ্নোত্তরে নারীদের ছালাত শিক্ষা (৩য় কিস্তি) - আব্দুল গাফফার মাদানী
স্ত্রীর প্রতি স্বামীর দায়িত্ব ও কর্তব্য (২য় কিস্তি) - তামান্না তাসনীম
প্রশ্নোত্তরে নারীদের ছালাত শিক্ষা (৬ষ্ঠ কিস্তি) - আব্দুল গাফফার মাদানী
ইসলামিক প্যারেন্টিং (৪র্থ কিস্তি) - তিনা খান
প্রশ্নোত্তরে নারীদের ছালাত শিক্ষা (৫ম কিস্তি) - আব্দুল গাফফার মাদানী
প্রশ্নোত্তরে নারীদের জানাযা শিক্ষা - আব্দুল গাফফার মাদানী
শারঈ পর্দা : একটি পর্যালোচনা (৩য় কিস্তি) - ওবাইদুল্লাহ আল-আমীন
প্রশ্নোত্তরে ইদ্দত ও শোকপালনের বিধানাবলী - আব্দুল গাফফার মাদানী
ইসলামে ব্যবসা-বাণিজ্যের রূপরেখা - গুলশান আখতার
প্রশ্নোত্তরে নারীদের ছালাত শিক্ষা - আব্দুল গাফফার মাদানী
প্রশ্নোত্তরে ইদ্দত ও শোকপালনের বিধানাবলী - আব্দুল গাফফার মাদানী

ফেসবুক পেজ