উত্তর : ইসলামী শরী‘আতে পিতা-মাতার সম্পদের মালিকানা তাঁদের জীবদ্দশায় তাঁদের হাতেই থাকে। সন্তান ছেলে হোক বা মেয়ে, পিতা-মাতা জীবিত থাকা অবস্থায় স্বয়ংক্রিয়ভাবে মীরাছের অধিকারী হবে না। কুরআনে যে উত্তরাধিকার বণ্টনের বিধান এসেছে, তা কার্যকর হয় মৃত্যুর পর। আল্লাহ তা‘আলা বলেন, یُوۡصِیۡکُمُ اللّٰہُ فِیۡۤ اَوۡلَادِکُمۡ ٭ لِلذَّکَرِ مِثۡلُ حَظِّ الۡاُنۡثَیَیۡنِ ‘আল্লাহ তোমাদের সন্তানদের সম্পর্কে নির্দেশ দিচ্ছেন-একজন পুত্রের অংশ দুইজন কন্যার অংশের সমান’ (সূরা আন-নিসা : ১১)। এই আয়াতে এবং পরবর্তী আয়াতগুলোতে উত্তরাধিকার বণ্টনের বিধান বর্ণিত হয়েছে, যা মৃত ব্যক্তির সম্পদ বণ্টনের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। অর্থাৎ পিতা-মাতা জীবিত থাকলে মেয়ে তার নির্ধারিত মীরাছ ‘দাবি’ করে নিতে পারবে না; কারণ তখনো সে মীরাছের মালিক হয়নি। পিতা-মাতা চাইলে জীবদ্দশায় সন্তানদেরকে হাদিয়া বা উপহার দিতে পারেন, আবার নাও দিতে পারেন। তবে যদি কাউকে দেন, তাহলে ন্যায়বিচার বজায় রাখা যরূরী।
হাদীছে এসেছে, নু‘মান ইবনু বাশীর (রাযিয়াল্লাহু আনহু) বলেন, তাঁর পিতা তাঁকে একটি দান দিতে চাইলেন। তখন রাসূলুল্লাহ (ﷺ) জিজ্ঞেস করলেন, ‘তুমি কি তোমার সব সন্তানকে এ রকম দান দিয়েছ? তিনি বললেন, না। তখন নবী (ﷺ) বললেন, ‘আল্লাহকে ভয় কর এবং সন্তানদের মধ্যে সুবিচার কর’ (ছহীহ বুখারী, হা/২৫৮৭; ছহীহ মুসলিম, হা/১৬২৩)। জীবদ্দশায় সম্পদের মালিক ব্যক্তি নিজ সম্পদের পূর্ণ অধিকারী। তাঁর মৃত্যুর আগে কেউ মীরাছ দাবি করতে পারে না। কিন্তু যদি তিনি সন্তানদের কাউকে বঞ্চিত করার উদ্দেশ্যে অন্যায়ভাবে সব সম্পদ একদিকে দিয়ে দেন, তাহলে তা যুল্মের অন্তর্ভুক্ত হতে পারে (মাজমূঊ ফাতাওয়া ইবন বায, খণ্ড ২০)। উত্তরাধিকার কেবল মৃত্যুর পর সাব্যস্ত হয়। জীবিত অবস্থায় সন্তানদের কারো ‘আমার মীরাছের অংশ এখনই চাই’ বলা শরী‘আতের দৃষ্টিতে সঠিক নয়। তবে পিতা-মাতা যদি কোন সন্তানকে অন্যায়ভাবে বঞ্চিত করতে চান, বা কারো প্রতি যুল্ম করেন, তাহলে তা গুনাহ হবে’ (আশ-শারহুল মুমতি‘, (মীরাছ) খণ্ড ১১)।
অতএব, কোনো মেয়ে বিয়ের ৮/১০ বছর পর হলেও পিতা-মাতা জীবিত থাকতে শরী‘আত অনুযায়ী ‘মীরাছ’ হিসাবে অংশ দাবি করতে পারবে না। কারণ মীরাছ তখনো ওয়াজিব হয়নি। তবে সে ভদ্রভাবে প্রয়োজনের কথা বলতে পারে, সাহায্য চাইতে পারে, বা পিতা-মাতার কাছে ন্যায্য আচরণ আশা করতে পারে। কিন্তু যদি পিতা-মাতা মৃত্যুর আগে কৌশলে শুধু ছেলেদের নামে সব সম্পত্তি লিখে দেন, আর মেয়েদেরকে বঞ্চিত করার উদ্দেশ্য থাকে, তাহলে এটি হারাম, যুল্ম ও বড় গুনাহ। কারণ আল্লাহ তা‘আলা কুরআনে নির্ধারিত হক্ব নষ্ট করা কঠোরভাবে নিষেধ করেছেন। রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি কোন উত্তরাধিকারীর অধিকার নষ্ট করে, আল্লাহ ক্বিয়ামতের দিন জান্নাতে তার অধিকার নষ্ট করবেন’ (ইবনু মাজাহ, হা/২৭০৩)। তাই পিতা-মাতার উচিত, মৃত্যুর পর শরী‘আত অনুযায়ী মেয়েদের নির্ধারিত অংশ অবশ্যই দিতে অছিয়ত করা এবং জীবদ্দশায়ও সন্তানদের সাথে ইনছাফপূর্ণ আচরণ করা। মেয়েদের হক্ব মেরে খাওয়া, সমাজের রেওয়াজের কারণে বঞ্চিত করা, বা ‘মেয়ে তো বিয়ে হয়ে গেছে’ বলে সম্পদ না দেয়া ইসলামে বৈধ নয়। আল্লাহ তা‘আলা বলেন,
لِلرِّجَالِ نَصِیۡبٌ مِّمَّا تَرَکَ الۡوَالِدٰنِ وَ الۡاَقۡرَبُوۡنَ ۪ وَ لِلنِّسَآءِ نَصِیۡبٌ مِّمَّا تَرَکَ الۡوَالِدٰنِ وَ الۡاَقۡرَبُوۡنَ مِمَّا قَلَّ مِنۡہُ اَوۡ کَثُرَ ؕ نَصِیۡبًا مَّفۡرُوۡضًا
‘পুরুষদের জন্য রয়েছে পিতা-মাতা ও নিকটাত্মীয়দের রেখে যাওয়া সম্পদের অংশ, আর নারীদের জন্যও রয়েছে পিতা-মাতা ও নিকটাত্মীয়দের রেখে যাওয়া সম্পদের অংশÑ তা অল্প হোক বা বেশি; এটি নির্ধারিত অংশ’ (সূরা আন-নিসা : ৭)। সুতরাং পিতা-মাতা জীবিত থাকলে মেয়ের মীরাছের অংশ কার্যকর হয় না; তাই সে জোরপূর্বক তা নিতে পারবে না। তবে মৃত্যুর পর তার নির্ধারিত অংশ না দিলে বা ইচ্ছাকৃতভাবে তাকে বঞ্চিত করলে তা স্পষ্ট গুনাহ, যুল্ম এবং আল্লাহর নির্ধারিত বিধানের বিরোধিতা হবে।
প্রশ্নকারী : মীজানুর রহমান ভূঁইয়া, মোমেনশাহী সেনানিবাস।