উত্তর : তাওহীদপন্থীদের ঐকমত্যানুসারে, কুরআনুল কারীমের কোন একটি আয়াত অথবা অক্ষরকে অস্বীকার করলেও সে কাফির। সূরা ফাতিহা থেকে শুরু করে সূরা নাস পর্যন্ত পুরো কুরআনুল কারীম আল্লাহ তা‘আলার পক্ষ থেকে নাযিলকৃত। সুতরাং এর মধ্যে বিন্দুমাত্র দ্বিধাগ্রস্ত হলে বা কমবেশি করলে সে কাফির (আত-তামহীদ, ৪/২৭৮-২৭৯; শারহুন নববী, ৬/৮৮; কাশশাফুল ক্বিনা’, ১/৪৩৩; আল-মুহাল্লা, ১/৩২; আছ-ছারিমুল মাসলুল ‘আলা শাতিমির রাসূল, ৩/১১২১ পৃ.)। এদের শাস্তি সম্পর্কে আল্লাহ তা‘আলা বলেন, ‘যারা কুফরী করেছে এবং আমার আয়াতসমূহে মিথ্যারোপ করেছে, তারাই জাহান্নামবাসী’ (সূরা আল-মায়িদাহ : ১০, ৮৬)। আল্লাহ আরো বলেন, ‘নিশ্চয় যারা আল্লাহ্র আয়াতসমূহে কুফরী করে তাদের জন্য রয়েছে কঠোর শাস্তি’ (সূরা আলে ইমরান : ৪)।
অন্যত্র বলেন, ‘নিশ্চয় যারা আমার আয়াতসমূহকে অবিশ্বাস করে, তাদেরকে আমি অচিরেই আগুনে প্রবিষ্ট করব। যখনই তাদের চর্ম দগ্ধ হবে, তখনই ওর স্থলে নতুন চর্ম সৃষ্টি করব, যাতে তারা শাস্তি ভোগ করতে থাকে। নিশ্চয় আল্লাহ পরাক্রমশালী, প্রজ্ঞাময়’ (সূরা আন-নিসা : ৫৬, ১৪০)। (৫) আবূ হুরাইরা (রাযিয়াল্লাহু আনহু) বলেন, নবী (ﷺ) বলেন, ‘কুরআন সম্বন্ধে সন্দেহ পোষণ কুফরী’ (আবূ দাঊদ, হা/৪৬০৩)।
কুরআনের অবমাননা শরী‘আতের আলোকে দণ্ডনীয় অপরাধ হলেও এটি হদ্দযোগ্য (অর্থাৎ মৃত্যুদণ্ড বা শাস্তিযোগ্য) অপরাধ নয়। হদ্দ (حدّ) হচ্ছে সেই অপরাধ, যার শাস্তি আল্লাহ কর্তৃক দুনিয়াতেই নির্ধারিত ও অপরিবর্তনীয়। তবে সাধারণভাবে তা তা‘যীর (অর্থাৎ শাসক নির্দেশিত শাস্তি) যোগ্য অপরাধ হিসাবে বিবেচিত হবে।
হত্যাযোগ্য পাপ যেমন কোন বিবাহিত পুরুষ ব্যভিচার করলে তার শাস্তি রজম বা মৃত্যুদণ্ড (ছহীহ বুখারী, হা/৫২৭০-৫২৭১, ৬৮২৫; ছহীহ মুসলিম, হা/১৬৯১)। কোন অবিবাহিত পুরুষ ব্যভিচার করলে তার শাস্তি একশ’ বেত্রাঘাত এবং এক বছরের জন্য নির্বাসন (সূরা আন-নূর : ২; ছহীহ মুসলিম, হা/১৬৯০; আবূ দাঊদ, হা/৪৪১৫; তিরমিযী, হা/১৪৩৪)। যারা মুরতাদ বা ধর্মত্যাগী, যারা আল্লাহদ্রোহী বা ইসলাম বিদ্বেষী তাদের শাস্তি মৃত্যুদণ্ড (ছহীহ বুখারী, হা/৬৯২২-৬৯২৩)। অনুরূপভাবে রাসূল (ﷺ) সম্পর্কে কটূক্তিকারী ব্যক্তির শাস্তি মৃত্যুদণ্ড। যেমন-
(ক) রাসূল (ﷺ) স্বীয় যুগে তাঁর সম্পর্কে কটূক্তিকারী কা‘ব বিন আশরাফকে হত্যার নির্দেশ দিয়েছিলেন (ছহীহ বুখারী, হা/২৫১০, ৩০৩১, ৩০৩২, ৪০৩৭; ছহীহ মুসলিম, হা/১৮০১; আবূ দাঊদ, হা/২৭৬৮)।
(খ) ইহুদী নেতা আবু রাফি‘ রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-কে কষ্ট দিত বলে ‘আব্দুল্লাহ ইবনু ‘আতীক (রাযিয়াল্লাহু আনহু) রাতের বেলা তার ঘরে ঢুকে ঘুমন্ত অবস্থায় তাকে হত্যা করেন (ছহীহ বুখারী, হা/৩০২২, ৩০২৩, ৪০৩৮, ৪০৩৯, ৪০৪০)।
(গ) আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রাযিয়াল্লাহু আনহুমা) বলেন, ‘কোন এক অন্ধ ব্যক্তির একটি দাসী ছিল। সে নবী করীম (ﷺ)-এর শানে বেয়াদবীসূচক কথাবার্তা বলায় অন্ধ ব্যক্তিটি তাকে হত্যা করেন’ (আবূ দাঊদ, হা/৪৩৬১; নাসাঈ, হা/৪০৭০, সনদ ছহীহ)।
উপরিউক্ত হাদীছ সমূহ দ্বারা প্রতীয়মান হয় যে, নবী করীম (ﷺ)-এর নামে ব্যঙ্গাত্মক বা কটূক্তিমূলক কথা বললে তার শাস্তি হল মৃত্যুদণ্ড। উক্ত গুনাহে লিপ্ত ব্যক্তিদের ইসলামী শরী‘আহ অনুযায়ী মুসলিম শাসকের নির্দেশে হত্যা করা অপরিহার্য। কিন্তু ইসলামী শাসকের অনুমতি ব্যতীত কোন পাপের শাস্তি স্বরূপ কাউকে হত্যা করা নিষিদ্ধ। যেমন সঊদী আরবের স্থায়ী ফাতাওয়া কমিটি সহ অন্যান্য আলেম বলেন, ‘হদ্দ (মৃত্যুদণ্ড, সাজা, শাস্তি) প্রতিষ্ঠিত করার বিষয়টি মুসলিম ইমাম, সুলতান, শাসক অথবা তার স্থলাভিষিক্ত বা প্রতিনিধির উপর নির্ভরশীল। সমাজে নিরাপত্তা ও শান্তি বজায় রাখার জন্য মুসলিম শাসক ও তাঁর প্রতিনিধি ব্যতীত অন্য কারোর জন্য ‘হদ্দ’ ক্বায়িম করা অনুমোদিত নয়। কোন মুসলিম ব্যক্তি বা সমাজের জন্য হদ্দ ক্বায়িম করা জায়েয নয়। কারণ, এর ফলে যে, বিশৃঙ্খলা, গোলযোগ, অস্থিরতা, অরাজকতা, নৈরাজ্য ও অশান্তির পরিবেশ সৃষ্টি হবে তাকে নিয়ন্ত্রণ করার ক্ষমতা কোন ব্যক্তি বা সমাজের নেই (ফাতাওয়া আল-লাজনা আদ-দায়িমাহ, ২২/৫-১০; আল-মুগনী, ৯/৮; মাজমূঊ ফাতাওয়া ইবনে বায, ৯/৩০৩; লিক্বাউল-বাব আল-মাফতূহ্, লিক্বা নং-৩১)।
যদি রাষ্ট্রের সরকার তার মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করতে বিলম্ব করে, তাহলে মুসলিম জনগণ ন্যায়সঙ্গতভাবে সরকারের উপর চাপ প্রয়োগ করতে পারে। আর যদি রাষ্ট্রপক্ষ তাদের শাস্তির বিষয়ে গড়িমসি করে, তাহলে ন্যায়ানুগভাবে সরকারকে একাজে বাধ্য করতে পারে। আর এ গুরু দায়িত্ব পালন করবেন সকল ধর্মপ্রাণ মুসলিম জনগণ। আর এটাই মূলত ঈমানের দাবী। কিন্তু কোনভাবেই আইন হাতে তুলে নেয়া যাবে না, সরকারী বা জাতীয় সম্পদ বিনষ্ট করা যাবে না। যেহেতু আমাদের দেশে ইসলামী শাসক নেই তাই ব্যক্তিগতভাবে বা সামাজিকভাবে হদ্দ (মৃত্যুদণ্ড, সাজা, শাস্তি) প্রতিষ্ঠিত করা সম্ভবপর নয়। এক্ষেত্রে গুনাহগার ব্যক্তি দুনিয়াবী তুচ্ছ শাস্তি থেকে পরিত্রাণ পেলেও কিন্তু পরকালের ভয়াবহ শাস্তি থেকে তাওবাহ ব্যতীত রক্ষা পাবে না। তাই পরকালের শাস্তি থেকে মুক্তি প্রাপ্তির জন্য আল্লাহ্ তা’আলার নিকট কঠোরভাবে তাওবাহ ও ক্ষমাপ্রার্থনা করতে হবে।
তবে এগুলো আদায়ের জন্য অবরোধ, হরতাল, মিছিল করা যাবে না। এতে সাধারণ মানুষের অনেক ক্ষতি হয়, কষ্ট হয়। যেমন শাইখ ছালিহ আল-ফাওযান (হাফিযাহুল্লাহ) বলেন, ‘আমাদের ধর্ম বিশৃঙ্খলার ধর্ম নয়। বরং আমাদের দ্বীন হল শৃঙ্খলা, ন্যায়-নীতি, শান্তি ও নিরাপত্তার দ্বীন। মিছিল, শোভাযাত্রা করা মুসলিমদের কাজ নয়। মুসলিমগণ কোনদিনই এ সম্পর্কে অবগত ছিল না। ইসলাম ধর্ম ভালোবাসা ও সম্প্রীতির ধর্ম। এতে বিশৃঙ্খলা, গোলযোগ ও ফিতনা-ফাসাদের কোন স্থান নেই। এ সকল ভ্রান্ত পদ্ধতি ছাড়া-ই শারঈ পন্থায় আবেদন করার মাধ্যমে অধিকার আদায় করা সম্ভব। মিছিল-লংমার্চ করার ফলে বিভিন্নস্থানে ফিতনা-ফাসাদ ছড়িয়ে পড়ে, শুরু হয় খুনা-খুনি ও জান-মালের ক্ষতি। সুতরাং এ কাজগুলো জায়েয নয়। জাযায়িরের বিদ্রোহ সম্পর্কে বলা হয় যে, ‘যখন আলেমগণ বললেন, আমরা লংমার্চ করব। তখন ত্রিশ লক্ষ লোক তাদের সাথে একমত হয়ে রাস্তায় বাহির হল। তারা বলল আল্লাহর হুকুমাত চাই। সাত লক্ষ মহিলাও বের হল যাদের দাবি ছিল ‘কুরআনী আইন দ্বারা শাসনকার্য পরিচালনা করতে হবে। আমরা হিজাবের প্রবর্তন চাই এবং নারী-পুরুষের অবাধ মেলমেশার প্রথা নিপাত যাক’ (শারহুত্ব ত্বাহাবী, ২/১৮৫ পৃ.)। কী অদ্ভুত ব্যাপার বলুন তো! এরা কুরআনী আইন অমান্য করে কুরআনী আইন চাচ্ছে, হিজাবের বিধানকে উপেক্ষা করে হিজাব প্রবর্তন করতে চাচ্ছে। অথচ আল্লাহ তা‘আলা বলেন, قُلۡ ہَاتُوۡا بُرۡہَانَکُمۡ اِنۡ کُنۡتُمۡ صٰدِقِیۡنَ ‘(হে নবী!) আপনি বলুন, তোমরা সত্যবাদী হলে প্রমাণ পেশ কর’ (সূরা আল-বাক্বারাহ : ১১১)।
যে সকল দাঈ ও নামধারী আলিমরা নারীদের মিছিল-লংমার্চ করার অনুমোদন দিয়েছে, তাদের নাম আমাদের নিকট সংরক্ষিত রয়েছে, আমরা তাদেরকে সতর্ক করছি এবং তাদের থেকে সাধারণ মানুষদেরকেও সতর্ক করছি। তারা তো শুধু ফিতনা ও বিশৃঙ্খলারই দাঈ। একজন দাঈ জুমু‘আর খুত্ববায় বলেছেন, যাঁর হাতে আমার প্রাণ তাঁর শপথ করে বলছি, জাযায়িরে এক দিনে হিযাব পরিহিতা সাত লক্ষ মুসলিম মহিলা রাস্তায় বের হয়েছিল। তাদের দাবি ছিল যেন আল্লাহর শরী‘আত অনুযায়ী বিচার ব্যবস্থা প্রবর্তন করা হয় (মাদারিকুন নাযার, পৃ. ৪৭৬)। নিঃসন্দেহে তার এই কথাগুলো বিশৃঙ্খলার প্রতি সমর্থন ও সাহায্যই বুঝায়। নতুবা কোথায় তার পক্ষ থেকে এসবের বিরোধিতা। আমি তাদেরকে বলতে চাই, কীভাবে এত লক্ষ লক্ষ মানুষের পরিসংখ্যান করা হল? আল্লাহর পথ বাদ দিয়ে এভাবে বাড়াবাড়ি, কঠোরতার মাধ্যমে কোথায় যাচ্ছ? তোমারা মহিলাদেরকে বের হওয়ার অনুমতি দাও কীভাবে? কীভাবে মুসলিমদের মাঝে ফিতনা ও বিশৃঙ্খলার অনুমোদন প্রদান কর? তোমরা কি আল্লাহ্ তা‘আলার এই কথা পড়নি? আল্লাহ তা’আলা বলেন,
وَ قَرۡنَ فِیۡ بُیُوۡتِکُنَّ وَ لَا تَبَرَّجۡنَ تَبَرُّجَ الۡجَاہِلِیَّۃِ الۡاُوۡلٰی
‘তোমরা (মহিলারা) ঘরে অবস্থান করবে এবং জাহিলিয়্যাতের (যুগের) মত বের হয়ো না’ (সূরা আল-আহযাব : ৩৩)। শাইখ মুহাম্মাদ ইবনু ছালিহ আল-উছাইমীন (রাহিমাহুল্লাহ)-এর ‘জারীদাতুল মুসলিমীন’ নামক ম্যাগাজিনের ৫৪০ সংখ্যা, প্রকাশ ১১ই মুহাররাম হিজরী ১৪১৬ সাল। তিনি বলেন, ‘জাযায়িরে বিশৃঙ্খলা-বিদ্রোহের ঘটনায় অনেক সংখ্যক মুসলিম নিহত হয়েছে এবং বহু সংখ্যক মুসলিম ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। আমাদের দায়িত্ব হল, সাধ্যমত উপদেশ প্রদান করা। আপনারা এখন এটাও খুব ভালো করে জানেন যে, এ সকল বিশৃঙ্খলা-বিদ্রোহের সাথে ইসলামী শরী‘আত এবং সংশোধন বা কল্যাণের কোন দূরতম সম্পর্কও নেই। এসকল বিদ্রোহ-বিশৃঙ্খলাতে আমরা মোটেও কোন সাহায্য-সহযোগিতা করব না। এ পথ ছাড়াও সংশোধনের অনেক পথ রয়েছে। তবে হ্যাঁ, এ সকল বিশৃঙ্খলার নেপথ্যে অনেক বিদেশী শক্তি (মুসলিমদের শত্রুরা) কলকাঠি নাড়ছে’ (মানহাজ, আল-আজবিবাতুল মুফীদাহ্, প্রশ্ন নং ৯৮)।
প্রশ্নকারী : মোস্তফা মনোয়ার, রংপুর।