যে রশি কখনো ছিড়বার নয়
- ওবায়দুল্লাহ বিন মূসা*
এমন একটি রশির সন্ধান চাই, যা শক্ত করে আঁকড়ে ধরলে আমি পৌঁছে যাব অনন্তকালের সুখময় জান্নাতে। কি আপনারাও চান!
দুঃখিত! আমি কোন পীর বাবার আধ্যাত্মিক ও অলৌকিক রশির কথা বলছি না, বরং সেই রশির কথাই বলছি, যার কথা স্বয়ং আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা‘আলা বলেছেন। বক্ষ্যমান প্রবন্ধে আল্লাহ তা‘আলার সেই বাণীটির সাথেই আপনাদের পরিচয় করে দেওয়ার চেষ্টা করব। ইনশাআল্লাহ। এ রশি সম্পর্কে পবিত্র কালামুল্লা হতে আমরা দুটো আয়াত দেখতে পাই। ১ম টি সূরা আল-বাক্বারাহর ২৫৬ নং আয়াতে। মহান আল্লাহর বাণী-*
فَمَنۡ یَّکۡفُرۡ بِالطَّاغُوۡتِ وَ یُؤۡمِنۡۢ بِاللّٰہِ فَقَدِ اسۡتَمۡسَکَ بِالۡعُرۡوَۃِ الۡوُثۡقٰی ٭ لَا انۡفِصَامَ لَہَا ؕ وَ اللّٰہُ سَمِیۡعٌ عَلِیۡمٌ
‘অতএব, যে ব্যক্তি তাগূতকে অস্বীকার করে এবং আল্লাহর প্রতি ঈমান আনে, অবশ্যই সে মজবুত রশি আঁকড়ে ধরে, যা ছিন্ন হবার নয়। আর আল্লাহ সর্বশ্রোতা, সর্বজ্ঞ’ (সূরা আল-বাক্বারাহ : ২৫৬)। ২য় আরেকটি আয়াত, যা সূরা লুকমানে পাওয়া যায়, আলাহ তা‘আলা বলছেন-
وَ مَنۡ یُّسۡلِمۡ وَجۡہَہٗۤ اِلَی اللّٰہِ وَ ہُوَ مُحۡسِنٌ فَقَدِ اسۡتَمۡسَکَ بِالۡعُرۡوَۃِ الۡوُثۡقٰی ؕ وَ اِلَی اللّٰہِ عَاقِبَۃُ الۡاُمُوۡرِ
‘যদি কেহ সৎ কর্মপরায়ণ হয়ে আল্লাহর নিকট আত্মসমর্পন করে, তাহলে সেতো দৃঢ়ভাবে ধারণ করে এক মাযবূত রশি, যাবতীয় কার্যের পরিণাম আল্লাহর দিকে’ (সূরা লুকমান : ২২)। উপরিউক্ত আয়াতদ্বয়ে আল-উরওয়াতুল উছক্বা বা শক্ত রশি শব্দটি ব্যাবহৃত হয়েছে।
আল উরওয়াতুল উছক্বা কী?
আল উরওয়াতুল উছক্বা বা শক্ত রশি দ্বারা উদ্দেশ্য কি? তা নিয়ে তাফসীরকারকগণের মাঝে বিভিন্ন মতামত পাওয়া যায়। তবে সবগুলো মতের উৎস এক ও অভিন্ন।
রঈসুল মুফাস্সিরিন ইবনু আব্বাস (রাযিয়াল্লাহু আনহুমা) বলেন, আল উরওয়াতুল উছক্বা হলো : লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ (لا اله الا الله)। সাঈদ বিন জুবায়ের এবং যাহ্হাক্ব (রাহিমাহুমাল্লাহ)ও এমনটাই বলেছেন।
আনাস বিন মালেক (রাযিয়াল্লাহু আনহু) বলেন, তা হলো আল কুরআন। মুজাহিদ (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন, ঈমান। ইমাম সুদ্দী (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন, ইসলাম। সালেম বিন আবিল জা’দ (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন, সেটা হলো আল্লাহর জন্য ভালোবাসা ও তার জন্যই ঘৃণা করা।[১]
জগদ্বিখ্যাত মুফাসসির ইবনু কাছীর (রাহিমাহুল্লাহ) উক্ত সবগুলো মত একত্রিত করে বলেন, ‘এ সবগুলো কথাই সঠিক একটা আরেকটির বিপরীত নয়’।[২]
প্রথিতযশা আলেম সামাহাতুশ শায়েখ ইবনু উছায়মীন (রাহিমাহুল্লাহ)-কে একবার জিজ্ঞেস করা হয়েছিল, আল উরওয়াতুল উছক্বা কী? উত্তরে তিনি বলেছিলেন, ‘সেটা হলো আল-ইসলাম। আর এটাকে উরওয়াহ উছক্বা নামকরণের কারন হলো, তা জান্নাত পর্যন্ত পৌঁছে দেয়’।[৩]
পাঠকের সমীপে এখানে আরেকটি ঘটনা উল্লেখ না করলেই নয়, যা অনেক মুফাস্সিরগণ উরওয়াহ উছক্বার ব্যাখ্যায় উল্লেখ করেছেন তন্মেধ্যে ইবনু কাছীর (রাহিমাহুল্লাহ)ও। তা হলো, ক্বাইস বিন উবাদ (রাহিমাহুল্লাহ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি মদিনার মসজিদে বসে ছিলাম। তখন এমন এক ব্যক্তি মসজিদে প্রবেশ করলেন, যার চেহারায় বিনয় ও নম্রতার ছাপ ছিল। লোকজন বলতে লাগলেন, এই ব্যক্তি জান্নাতীগণের একজন। তিনি হালকাভাবে দু’ রাক‘আত ছালাত আদায় করে মাসজিদ হতে বেরিয়ে এলেন। আমি তাঁকে অনুসরণ করলাম এবং তাঁকে বললাম, আপনি যখন মসজিদে প্রবেশ করছিলেন, তখন লোকজন বলাবলি করছিল যে, ইনি জান্নাতবাসীগণের একজন। তিনি বললেন, আল্লাহর কসম! কারো জন্য এমন কথা বলা উচিত নয়, যা সে জানে না। আমি তোমাকে আসল কথা বলছি, কেন তা বলা হয়। আমি নবী ﷺ-এর যামানায় একটি স্বপ্ন দেখে তাঁর নিকট বর্ণনা করলাম। আমি দেখলাম যে, আমি যেন একটি বাগানে অবস্থান করছি; বাগানটি বেশ প্রশস্ত, সবুজ। বাগানের মধ্যে একটি লোহার স্তম্ভ, যার নিম্নভাগ মাটিতে এবং উপরিভাগ আকাশ স্পর্শ করেছে; স্তম্ভের উপরে একটি শক্ত কড়া সংযুক্ত রয়েছে। আমাকে বলা হল, উপরে উঠ। আমি বললাম, এটাতো আমার সামর্থ্যের বাইরে। তখন একজন খাদিম এসে পিছন দিক হতে আমার কাপড় সহ চেপে ধরে আমাকে উঠতে সাহায্য করলেন। আমি উঠতে লাগলাম এবং উপরে গিয়ে আংটাটি ধরলাম। তখন আমাকে বলা হল, শক্তভাবে আংটাটি ধর। তারপর কড়াটি আমার হাতের মুঠায় ধরা অবস্থায় আমি জেগে গেলাম। নবী ﷺ-এর নিকট স্বপ্নটি বললে, তিনি বললেন, এ বাগান হল ইসলাম, আর স্তম্ভটি হল ইসলামের খুঁটিসমূহ, কড়াটি হল উরুয়াতুল উছক্বা (শক্ত ও অটুট রজ্জু) এবং তুুমি আজীবন ইসলামের উপর কায়েম থাকবে। (রাবী বলেন) এই ব্যক্তি হলেন, ‘আব্দুল্লাহ ইবনু সালাম (রাযিয়াল্লাহু আনহু)।[৪]
প্রিয় পাঠক! এতক্ষণ হয়তো বুঝে নিয়েছেন, সেই শক্ত রশিটা কি? যার সম্পর্কে আমরা আলোচনা করছি, তা হলো ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ’ বা তাওহীদের রশি। সবগুলো মতের মাঝ থেকে ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ’ নিলেই বাকিগুলোও এর অন্তর্ভুক্ত হবে। তথাপি সঊদী আরবের প্রথিতযশা পন্ডিত শায়েখ আব্দুর রাজ্জাক বিন মুহসিন আল বদর (হাফিযাহুল্লাহ) এক দারসে উরওয়াতুন উছক্বা দ্বারা ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ’-কে উদ্দেশ্য করেছেন। কারন আয়াতেও এমন ইঙ্গিত পাওয়া যায়। বস্তুুত ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ’, ঈমান, ইসলাম একই।
এক্ষণে আমরা যদি সেই শক্ত, দৃঢ় রশি ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ’ আঁকড়ে ধরতে চাই, তাহলে এর অর্থ, শর্ত এবং আনুষাঙ্গিক সম্যক ধারণা থাকা যরূরী। রশিটা যেহেতু শক্ত, আঁকড়ে ধরতে হবে শক্তভাবে। তাই এর সম্পর্কে জ্ঞান অর্জনও শক্তভাবেই করা উচিত, যাতে কোনভাবেই ছিড়ে না যায়।
লা ইলাহা ইল্লাল্লাহর অর্থ
লোকসমাজে ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ’ সঠিক অর্থের থেকে ভ্রান্ত ও বাতিল অর্থই বেশি সমাদৃত। এজন্য আমরা আগে ভ্রান্ত গুলো জেনে নিই, এরপরে সঠিকটা তুলে ধরব ইনশাআল্লাহ।
ভ্রান্ত অর্থ : ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ’-এর ভ্রান্ত অর্থ করার ক্ষেত্রে চারটি গ্রুপ দেখা যায়।
১ম দল : সুফিবাদী তরিকার ভ্রষ্টরা। যারা অর্থ করে لا اله الا الله অর্থ لا معبود موجود الا الله ‘আল্লাহ ছাড়া কোনো উপাস্য বিদ্যমান নেই’। অর্থাৎ দুনিয়াতে যা কিছু আছে সবকিছুতেই তিনি বিদ্যমান। মুশরিকগণ গাছপালা, পাথর, সূর্য, ইত্যাদির ইবাদত করত। সুফিবাদীদের মতে এগুলো মূলত গাছপালা, পাথর, সূর্যের ইবাদত নয়; বরং এর মধ্যেই আল্লাহ মিশে আছে এবং আল্লাহরই ইবাদত, নাউজুবিল্লাহ। আর এই অর্থের মাধ্যমেই তারা ‘ওয়াহদাতুল উজূদ’ আক্বীদা সাব্যস্ত করে।
২য় দল : যারা ‘ইলাহ’-এর স্থলে রুবুবিয়াতের অর্থ করে যেমন: لا رب الا الله ‘আল্লাহ ছাড়া কোন রব নাই’,لا خالق الا الله ‘আল্লাহ ছাড়া কোন সৃষ্টিকারী নেই’। لا قادر الا الله ‘আল্লাহ ছাড়া কোন ক্ষমতাবান নেই’। আবার আশ‘আরী মাতুরীদীদের একটি দল অনুবাদ করে থাকে, ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহর অর্থ مستغني عما سواه و مفتقراليه ما عداه ‘তিনি সবকিছু থেকে অমুখাপেক্ষী, আর তিনি ছাড়া বাকি সবকিছুই তাঁর মুখাপেক্ষী’। অর্থগত দিক থেকে এগুলো ভুল নয়, তবে لا اله الا الله-এর সাথে এই অর্থগুলো সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। কারন এগুলো রুবুবিয়াতের অর্থ আর ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ’ বাক্যতে ইলাহ শব্দটি উলুহিয়াত দাবি করে। রুবুবিয়াতের শব্দ দিয়ে উলুহিয়াত অর্থ করা নিতান্তই বোকামি বৈ কিছুই নয়।
৩য় দল : মু‘তাজিলা সম্প্রদায় তাওহীদ স্বীকার করে। তবে তাদের তাওহীদ আর আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামা‘আতের তাওহীদের পার্থক্য আছে। তাদের তাওহীদ-এর অর্থ হলো আল্লাহর সকল আসমাউল হুসনা ও ছিফাত বা আল্লাহর সুন্দর সুন্দর নাম এবং গুণাগুণ অস্বীকার করা। আর এই নীতিটাই ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহর অর্থ হিসেবে গণ্য করে। যা তাদের উসূলুল খমসা বা পাঁচটি মূলনীতির একটি।
৪র্থ দল : বর্তমান সময়ের কিছু ক্ষমতালোভী, উগ্রপন্থী সম্প্রদায় ভ্রান্ত একটি অর্থ করে থাকে তা হলো, لا اله الا الله অর্থ হলো لا حاكم الا الله ‘আল্লাহ ছাড়া কোন হাকেম নেই’। ইখওয়ানুল মুসলিমিন, সুরুরী এবং বাংলাদেশেরও কিছু নামধারী ইসলামি দলের পক্ষ থেকে প্রচারিত এই ভ্রান্ত অর্থটি বেশ প্রচলিত। যা থেকে বেঁচে থাকা অতীব যরূরী।
সঠিক অর্থ : এতক্ষণ আমরা বিভিন্ন ভ্রান্ত দল থেকে নব উদঘাটিত ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ’-এর ভ্রান্ত আক্বীদাগুলো জানলাম। এবারে সঠিক অর্থটি জেনে নেওয়া যাক। সঠিক অর্থ হলো لا اله الا الله অর্থাৎ لا معبود بحق الا الله ‘আল্লাহ ছাড়া সত্য কোনো মা‘বুদ নেই’। সালাফে ছলেহীন থেকে এই অর্থটিই বিশুদ্ধভাবে প্রমানিত। যেমন : ইমাম ইয বিন আব্দুস সালাম (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন, ‘কালিমাতুত তাওহীদ ওয়াজিব ও হারামের তাকলীফের উপর দালালত করে। কারণ এর অর্থ হলো, আল্লাহ ছাড়া কোনো সত্য মাবুদ নেই। আর ইবাদত হলো চরম বিনয় ও পূর্ণ আনুগত্যের সাথে আনুগত্য করা’।[৫]
মুজাদ্দিদ ইমাম মুহাম্মাদ বিন আব্দুল ওয়াহহাব (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন, معناه لا معبود بحق الا الله وحده ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহর অর্থ হলো, আল্লাহ ছাড়া সত্যিকারের কোন মাবুদ নাই, তিনি একক’।[৬] অতএব উম্মতের হক্বপন্থী ওলামায়ে কেরাম যেই অর্থ করেছেন, সেটাকেই আমরা গ্রহন করব। এটাই নিরাপদ ও সহজ।
লা ইলাহা ইল্লাল্লাহর শর্ত
কুরআন এবং হাদীছ থেকে সুচিন্তিত গবেষণার মাধ্যমে আমাদের পূর্ববর্তী ওলামাগণ কিছু শর্ত নির্ধারণ করেছেন। এগুলো ছাড়া ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ’ গ্রহনযোগ্য নয়। শর্তগুলোকে কেউ ‘শুরুতু লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ’ আবার কেউ ‘ওয়াজিবাতু লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ’ বলে নামকরণ করেছেন। তবে শুরুতু লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ (شروط لا اله الا الله) হওয়াই অধিক যুক্তিসঙ্গত। কারন শর্ত হলো ইবাদতের পূর্বে থাকে আর ওয়াজিবগুলো ইবাদতের ভিতরে থাকে। আর নিম্নোক্ত শর্তগুলো ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ’ বলার পূর্বেই পূরন করতে হয়। এমনটাই বলেছেন আন্তর্জাতিক দাঈ উস্তাজ ড. উসামা বিন আতায়া আল উতায়বি। শর্তগুলোর সংখ্যা সাতটি, যা নিম্নরুপ-
১. আল-ইলম তথা কালেমার অর্থ জানা। অর্থাৎ কালেমার ভেতর কী অস্বীকার ও কী সাব্যস্ত করা হয়েছে, তা জানা যরূরী, যা তার অর্থ সম্পর্কে অজ্ঞতার বিপরীত।
২. আল-ইয়াকীন তথা মনে-প্রাণে বিশ্বাস করা। কালেমার ভেতর যা সাব্যস্ত করা হয়েছে তা মনে-প্রাণে বিশ্বাস করা যরূরী, যা কালেমা সম্পর্কে সংশয় ও সন্দেহ পোষণ করার বিপরীত।
৩. আল-ইখলাছ তথা একনিষ্ঠতা প্রদর্শন করা। কালেমার প্রতি পূর্ণ ইখলাছ প্রদর্শন করা যরূরী, যা তার অর্থ ও দাবি বাস্তবায়ন করার সময় শিরক ও রিয়াকে প্রশ্রয় দেওয়ার বিপরীত।
৪. আস-ছিদ্ক্ব তথা সত্য জানা। কালেমাকে মনে-প্রাণে সত্য জানা যরূরী, যা তার প্রতি মিথ্যারোপ করার বিপরীত।
৫. আল-মাহাব্বাহ তথা ভালোবাসা। কালেমায় সাব্যস্ত সত্তাকে (আল্লাহকে) মহব্বত করা যরূরী, যা তার প্রতি কোনো প্রকার বিদ্বেষ ও অসন্তুষ্টি প্রকাশ করার বিপরীত।
৬. আল-ইনক্বিয়াদ তথা আনুগত্য প্রদর্শন করা। কালেমার অর্থ ও দাবির প্রতি আনুগত্য প্রদর্শন করা যরূরী, যা তার অর্থ ও দাবিকে ত্যাগ করার বিপরীত।
৭. আল-ক্ববুল তথা গ্রহণ করা। কালেমার অর্থ ও দাবি মনে-প্রাণে গ্রহণ করা যরূরী, যা তার অর্থ ও দাবির বাস্তবায়নকে প্রতিরোধ করার বিপরীত।
শ্রদ্ধেয় পাঠকমণ্ডলী! লা ইলাহা ইল্লাল্লাহর স্বীকৃতির মাধ্যমেই আল্লাহর এককত্ব তাওহিদকে স্বীকৃতি প্রদান করা হয়। আর তাওহিদ হলো -
إفراد الله سبحانه وتعالى بما يختص به من الربوبية، والألوهية، والأسماء والصفات
‘আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা‘আলাকে একমাত্র তাঁর জন্যই নির্দিষ্ট করে নেওয়া- রুবুবিয়্যাহ, উলুহিয়্যাহ এবং নাম ও গুণাবলীর ক্ষেত্রে’। এই তিনপ্রকারের প্রত্যেকটি তাওহীদকে আবার তিনটি নীতির মাধ্যমে অনুসরন করতে হবে- তাওহীদুল উলুহিয়্যাহকে তিনটি নীতির মাধ্যমে অনুসরণ করতে হয়। যেমন :
> ১. অন্তরের মাধ্যমে ইবাদত। যেমন: ভয়, আশা, ভালোবাসা, ভরষা, ধৈর্য ইত্যাদি সকল আন্তরিক ইবাদাত।
> ২. মুখের মাধ্যমে ইবাদত। যেমন : কুরআন তেলাওয়াত, যিকর আযকার, সত্য কথা, সত্যের দাওয়াত ইত্যাদি।
> ৩. শরীরের অঙ্গপ্রতঙ্গের মাধ্যমে। যেমন : ছালাত, যাকাত, ছিয়াম, হজ্জ ইত্যাদি।
তাওহীদুর রুবুবিয়্যাহও তিনটি নীতির মাধ্যমে বিশ্বাস করতে হয়। যথা :
> ১. আল্লাহকে সকল কিছুর সৃষ্টিকর্তা (خالق) হিসেবে মানা
> ২. সকল কিছুর মালিক (مالك) হিসেবে মানা।
> ৩. সকল কিছুর পরিচালনাকারী (مدبر) হিসেবে মানা।
তাওহীদুল আসমা ওয়াছ ছিফাত তিনটি নীতির অনুসরণের মাধ্যমেই বাস্তবায়িত হয়। যথাক্রমে -
> ১. কুরআন এবং ছহীহ হাদীছে আল্লাহর যেসকল নাম ও গুণ বর্নিত হয়েছে, সেগুলো কোনভাবে অস্বীকার, (তা’তীল) অর্থ পরিবর্তন ও অপব্যাখ্যা (তাহরীফ) ছাড়াই হুবহুর বিশ্বাস করা।
> ২. সেগুলো কোন সৃষ্টির সাথে সাদৃশ্য (তামছীল) দেওয়া ছাড়াই বিশ্বাস করা।
> ৩. সেগুলোর কোন ধরন (কাইফিয়্যাত) বর্ননা না করা।
সুধী পাঠক! এতক্ষণ ছিলাম জান্নাত পর্যন্ত পৌঁছে দেয় এমন শক্ত ও সুদৃঢ় রশির সন্ধানে। পরিচিত হয়েছি সেই শক্ত রশি সম্পর্কিত এলাহী বাণী আর সুন্নাতে নববীর সাথে। সাথে রশির আঁকড়ে ধরাটা যেন টেকসই হয়, তজ্জন্য লা ইলাহা ইল্লাল্লাহর সঠিক ও ভ্রান্ত অর্থ, শর্তসমূহ এবং তাওহিদের পরিচয় ও প্রকার সংক্ষেপে জেনেছি। এইগুলো অনুধাবন ও আমলে বাস্তবায়নের মাধ্যমেই আমরা পৌঁছাতে পারব কাঙ্খিত স্থান জান্নাত আর মুক্তি পাবো কষ্ট-ক্লেশ ও অশান্তির স্থান জাহান্নাম থেকে।
পরিশেষে মহান আল্লাহর কাছে মানবিক দুর্বলতা পেশ করে লিখার ভুলত্রুটি থেকে মার্জনা ও কবুলিয়াত প্রার্থনা করছি। পাশাপাশি আল্লাহ তা‘আলা আমাদেরকে যেন মৃত্যু অবধি সেই শক্ত রশিটি আঁকড়ে ধরে থেকে তার দ্বীনের উপরই ইস্তিক্বামাত রাখেন- সেই তাওফীক্ব কামনা করছি-আমীন!!
* শিক্ষার্থী, দারুল হুদা ইসলামি কমপ্লেক্স, বাঘা, রাজশাহী।
তথ্যসূত্র :
[১]. তাফসীরে ইবনু আবি হাতেম, ২য় খণ্ড, পৃ. ৪৯৬।
[২]. তাফসীরুল কুরআনিল আযীম, ১ম খণ্ড, পৃ. ৬৮৪।
[৩]. ফাতাওয়া নুরুন আলাদ দারব, ছালাত অধ্যায়; পৃ. ১২১৮।
[৪]. ছহীহ বুখারী, হা/৩৮১৩; ছহীহ মুসলিম, হা/২৪৮৪।
[৫]. আল-ইমাম ফী বায়ানি আদিল্লাতিল আহকাম, পৃ. ১৬৮।
[৬]. ছালাছাতুল উছূল, পৃ. ১৪।