নববী দু‘আ : এক অনন্য সৌভাগ্যের পরশ
- মশিউর রহমান বিন মোঃ মনসূর আলী*
আপনার সরল হৃদয় আর চিন্তাশীল মনকে একবার ভাবনায় আনুন তো, নবীকুলের শিরোমণি, রহমাতুল্লিল আলামীন, জগতের শ্রেষ্ঠ মানব মুহাম্মাদ (ﷺ) তাঁর যমযমে ধোয়া পবিত্র অন্তর থেকে যদি আপনার জন্য দু‘আ করে বসেন! তিনি যদি তাঁর একমাত্র রব আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা‘আলার দরবারে আপনার মাগফিরাত চান, আপনার জ্ঞান বৃদ্ধি কামনা করেন। তাহলে এর চেয়ে বড় প্রাপ্তি জীবনে আর কিছু কি হতে পারে? যদি তিনি আপনার জন্য বলেন, ‘হে আল্লাহ! তুমি এ মানুষটিকে ভালোবাসো’। তাহলে পৃথিবীতে আপনার চেয়ে সৌভাগ্যবান আর কেউ থাকতে পারে? *
ছাহাবায়ে কেরামের মধ্যে অনেকে ছিলেন, যারা নবী মুহাম্মাদ (ﷺ)-এর যবান থেকে এমন দু‘আ পেয়ে ধন্য হয়েছেন। নববী দু‘আর বরকতে তাঁদের জীবন হয়েছে অপরূপ, চমৎকার এবং বিস্ময়করভাবে সুন্দর। যারা দু‘আ পেয়েছেন, তাঁরা বাস্তব জীবনে সেই দু‘আর প্রতিফলন স্পষ্টভাবে দেখেছেন। আর সেটিই ছিল রাসূল মুহাম্মাদ (ﷺ)-এর মু‘জিযার উজ্জ্বল সাক্ষ্য।
আজকের আলোচনায় আমরা এমন কয়েকজন ছাহাবীর কথা জানব, যারা নববী দু‘আপ্রাপ্ত হয়ে ধন্য হয়েছেন। প্রথমেই জানব সেইসব ছাহাবীদের কথা, যাদের নবী মুহাম্মাদ (ﷺ) দুনিয়াতে চলমান অবস্থাতেই জান্নাতের পাখি বলে আখ্যায়িত করেছেন।
عَنْ عَبْدِ الرَّحْمَنِ بْنِ عَوْفٍ، قَالَ قَالَ رَسُولُ اللهِ رَضِىَ اللهُ عَنْهُ أَبُو بَكْرٍ فِي الْجَنَّةِ وَعُمَرُ فِي الْجَنَّةِ وَعُثْمَانُ فِي الْجَنَّةِ وَعَلِيٌّ فِي الْجَنَّةِ وَطَلْحَةُ فِي الْجَنَّةِ وَالزُّبَيْرُ فِي الْجَنَّةِ وَعَبْدُ الرَّحْمَنِ بْنُ عَوْفٍ فِي الْجَنَّةِ وَسَعْدٌ فِي الْجَنَّةِ وَسَعِيدٌ فِي الْجَنَّةِ وَأَبُو عُبَيْدَةَ بْنُ الْجَرَّاحِ فِي الْجَنَّةِ
আব্দুর রহমান ইবনু আউফ (রাযিয়াল্লাহু আনহু) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেন, আবূ বকর জান্নাতে, উমর জান্নাতে, উছমান জান্নাতে, আলী জান্নাতে, তালহা জান্নাতে, যুবাইর জান্নাতে, আব্দুর রহমান ইবনু আউফ জান্নাতে, সা‘দ জান্নাতে, সাঈদ জান্নাতে, আবূ উবাইদাহ ইবনুল জাররাহ জান্নাতে।[১]
রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বহু ছাহাবীকে জান্নাতের সুসংবাদ দিয়েছেন। তবে তাতে তাঁরা ইবাদতে আলস্য করেননি কিংবা শুধু সে সংবাদে ভরসা করে বসে থাকেননি। তাঁদের মধ্যে বিশেষভাবে পরিচিত আছেন দশজন ছাহাবী, যাদের জীবদ্দশাতেই জান্নাতের সুসংবাদ দেওয়া হয়েছিল। এই হাদীছে রাসূলুল্লাহ (ﷺ) তাঁদের নাম একত্রে উল্লেখ করেছেন। এখানে উল্লেখিত ছাহাবীগণ হলেন,
১. আবু বকর সিদ্দীক (রাযিয়াল্লাহু আনহু)
আব্দুল্লাহ ইবনু উছমান আত-তাইমী আল-কুরাইশী। প্রথম খলীফা, নবী মুহাম্মাদ (ﷺ)-এর ঘনিষ্ঠ সাথী ও হিজরতের সঙ্গী। তিনি সব ছাহাবীদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি ঈমানদার, অগ্রগণ্য এবং নবীর নিকট প্রিয়তম। রাসূলুল্লাহ (ﷺ) তাঁকে ‘ছিদ্দীক’ উপাধি দেন তাঁর অধিক সত্যায়নের কারণে।[২]
২. উমর ইবনুল খাত্তাব (রাযিয়াল্লাহু আনহু)
আল-আদাভী আল-কুরাশী, যিনি ‘ফারুক’ উপাধি পেয়েছিলেন। দ্বিতীয় খলীফা, ছাহাবীদের মধ্যে বড়দের একজন। ন্যায়বিচারে খ্যাত, তাঁর যুগে ইসলামী ফুতুহাত (জয়যাত্রা) ব্যাপক প্রসার লাভ করে। তিনি প্রথম রাষ্ট্রীয় প্রশাসনিক কাঠামো গড়ে তোলেন।
৩. উছমান ইবনু আফফান (রাযিয়াল্লাহু আনহু)
আল-আমবী আল-কুরাশী। তৃতীয় খলীফা, ইসলামের প্রারম্ভেই ইসলাম গ্রহণ করেন। ‘যুন নুরাইন’ (দুই নূরের অধিকারী) উপাধি পান, কারণ তিনি রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর দুই কন্যা রুকাইয়া ও উম্মে কুলসুমকে বিয়ে করেছিলেন। তাঁর খিলাফতের সময় কুরআন সংগ্রহ ও মসজিদে হারাম এবং মসজিদে নববীর সম্প্রসারণ সম্পন্ন হয়। তিনিই প্রথম সমুদ্র নৌবাহিনী গঠন করেন।
৪. আলী ইবনু আবি তালিব (রাযিয়াল্লাহু আনহু)
নবীর চাচাতো ভাই ও জামাতা। চতুর্থ খলীফা, শিশু বয়সে প্রথম ইসলাম গ্রহণকারী। উহুদের যুদ্ধ ছাড়া তিনি সব যুদ্ধে অংশ নেন। নবীর জামাতা হিসেবে ফাতিমা (রাযিয়াল্লাহু আনহা)-কে বিয়ে করেন। তিনি ছিলেন জ্ঞানে ও সাহসে অগ্রগণ্য।
৫. যুবাইর ইবনুল আওয়াম (রাযিয়াল্লাহু আনহু)
নবীর খালাতো ভাই, ইসলামের প্রথমদিকের মুসলিম। তাঁকে ‘হাওয়ারি রাসূল’ বলা হয়। তিনি প্রথম ব্যক্তি, যিনি ইসলামের জন্য তরবারি তোলেন। সব যুদ্ধেই অংশ নেন। জামালের যুদ্ধে শহীদ হন।
৬. তালহা ইবনু উবাইদুল্লাহ (রাযিয়াল্লাহু আনহু)
তিনি বনি তাইম থেকে, আবূ বকর (রাযিয়াল্লাহু আনহু)-এর গোত্রীয় আত্মীয়। ইসলামের প্রথম দিকেই ইসলাম গ্রহণ করেন। সব যুদ্ধে অংশ নেন, জামালের যুদ্ধে শহীদ হন।
৭. আব্দুর রহমান ইবনু আউফ (রাযিয়াল্লাহু আনহু)
প্রথম দিকেই ইসলাম গ্রহণকারী, বদরসহ সব যুদ্ধে অংশ নেন। তিনি ছাহাবীদের মধ্যে সবচেয়ে বড় দানশীলদের একজন। জীবনে বহুবার বিপুল সম্পদ দান করেছেন। নবীর স্ত্রীদের সাথেও নিয়মিত সদয় আচরণ করতেন।
৮. আবূ উবাইদাহ ইবনুল জাররাহ (রাযিয়াল্লাহু আনহু)
নবীর ছাহাবী, প্রথমদিকেই ইসলাম গ্রহণ করেন। নবী মুহাম্মাদ (ﷺ) তাঁকে ‘আমীনুল উম্মাহ’ (এই উম্মাহর আমানতদার) উপাধি দিয়েছিলেন। উহুদের যুদ্ধে স্থির ছিলেন। শাম অঞ্চলে আমওয়াস প্লেগে ইন্তিকাল করেন।
৯. সা‘দ ইবনু আবি ওয়াক্কাস (রাযিয়াল্লাহু আনহু)
নবীর খালা আমিনার বংশ থেকে। প্রথম তীর নিক্ষেপকারী। নবী মুহাম্মাদ (ﷺ) উহুদের যুদ্ধে তাঁকে দু‘আ দিয়েছিলেন এই বলে যে, اللهم سدد رميته وأجب دعوته ‘হে আল্লাহ! তাঁর নিক্ষেপকে সঠিক করো এবং তাঁর দু‘আ কবুল করো’। তাঁর দু‘আ কবুল হতো। তিনি ক্বাদিসিয়ার যুদ্ধের সেনাপতি ছিলেন এবং মাদাইন বিজয় করেন।
১০. সাঈদ ইবনু যায়েদ (রাযিয়াল্লাহু আনহু)
প্রথম দিককার মুসলিমদের একজন। উমর ইবনুল খাত্তাব (রাযিয়াল্লাহু আনহু)-এর চাচাতো ভাই এবং তাঁর বোন ফাতিমা বিনতে খাত্তাবের স্বামী, যিনি উমরের ইসলাম গ্রহণের মাধ্যম হন। তিনি বদরের যুদ্ধে অংশ না নিলেও নবী মুহাম্মাদ (ﷺ) তাঁর জন্য অংশগ্রহণকারীদের সমান সওয়াবের দু‘আ করেন। ইয়ারমুক যুদ্ধে ও দিমাশকের বিজয়ে অংশ নেন। ৫১ হিজরিতে মৃত্যুবরণ করেন।
নবী (ﷺ) ব্যক্তিগতভাবে যাদের জন্য দু‘আ করেছেন
১১. আবূ বকর (রাযিয়াল্লাহু আনহু)
রাসূলুল্লাহ (ﷺ) আবূ বকর সিদ্দীক (রাযিয়াল্লাহু আনহু)-কে সঙ্গে নিয়ে গারে সাওর-এর দিকে রওনা হলেন। এ গার মক্কা মুকাররমার দক্ষিণ-পশ্চিম দিকে প্রায় তিন মাইল দূরে অবস্থিত। যখন তাঁরা গারে পৌঁছালেন, তখন আবূ বকর (রাযিয়াল্লাহু আনহু) নবীজি (ﷺ)-কে বললেন, আপনি কিছুক্ষণ স্থির থাকুন, হে আল্লাহর রাসূল! আমি আপনার জন্য গারটি আগে পরীক্ষা করে দেখি। আবার ঐদিকে যখন মুশরিকরা জানতে পারল যে, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) ও আবূ বকর (রাযিয়াল্লাহু আনহু) বের হয়ে গেছেন, তখন তারা সর্বত্র তাঁদের খোঁজ করতে লাগল এবং ঘোষণা দিল যে, যে তাঁদের ধরে আনবে তাকে একশত উট পুরস্কার দেওয়া হবে। তারা গারের দরজার পাশ দিয়েও গেল, কিন্তু ভিতরে প্রবেশ করল না।
এদিকে আবূ বকর সিদ্দীক (রাযিয়াল্লাহু আনহু) শত্রুদের দেখে উদ্বিগ্ন হয়ে নবীজি (ﷺ)-এর জন্য ভয় অনুভব করছিলেন। কিন্তু নবীজি (ﷺ) তাঁকে সান্ত্বনা দিয়ে বললেন, لا تحزن إن الله معنا ‘ভয় পেয়ো না, নিশ্চয়ই আল্লাহ আমাদের সঙ্গে আছেন’।
১২. উমার ইবনুল খাত্ত্বাব (রাযিয়াল্লাহু আনহু)
ইসলাম গ্রহণের পূর্বে উমার ইসলামের ঘোর শত্রু ছিলেন। এমনকি তিনি রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-কে হত্যা করার জন্য উন্মুক্ত তলোয়ার নিয়ে বের হয়েছিলেন। আবূ জাহলের মতো ক্ষমতাধর ছিলেন তিনি। বোন ও ভগ্নিপতির ইসলাম কবুলের কথা শুনে তিনি ছুটে গিয়ে তাঁদের আঘাতও করেছিলেন বটে। কিন্তু শেষ রক্ষা হয়নি ইসলামের গণ্ডি হতে। সবশেষে ইসলামের ছায়াতলে আশ্রয় নিতে হয়েছিল উমর (রাযিয়াল্লাহু আনহু)-কে। এটিও ছিল কেবল রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর দু‘আর ফসল।[৩]
কিন্তু পরবর্তীতে তিনি রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর কাছে এসে মুসলিম হয়ে জীবনকে আলোর সাজে সজ্জিত করেন। তাঁর এই ইসলাম গ্রহণ ও ইসলামের একজন কিংবদন্তি ব্যক্তি হওয়ার পিছনে ছিল রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর দু’আ। তিনি দু’আতে বলেছিলেন,اللَّهُمَّ أَعِزَّ الإِسْلَامَ بِأَحَبِّ هَذَيْنِ الرَّجُلَيْنِ إِلَيْكَ بِأَبِي جَهْلِ أَوْ بِعُمَرَ بْنِ الخَطَّابِ ‘হে আল্লাহ! আবূ জাহল আর উমারের মধ্যে যে তোমার কাছে প্রিয়, তাঁর দ্বারা তুমি ইসলামকে শক্তিশালী করো’।[৪]
আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা‘আলা তাঁর দ্বীনের জন্য উমার-কে বেছে নিয়েছিলেন। উমার ইসলামের জন্য হয়ে উঠেছিলেন শক্ত মজবুত প্রাচীরের মতো। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা‘আলা তাঁর যবানে ও অন্তরে হক্ক প্রতিষ্ঠিত করে দিয়েছিলেন। ইবনে মাসঊদ (রাযিয়াল্লাহু আনহুমা) তাঁর ব্যাপারে বলেন, ‘উমার-এর ইসলাম গ্রহণ ছিল বিজয়, হিজরত ছিল সহায়তা আর খেলাফত ছিল রহমত’।[৫]
(ইনশাআল্লাহ আগামী সংখ্যায় সমাপ্য)
* প্রাক্তন শিক্ষার্থী, দারুল হুদা ইসলামী কমপ্লেক্স, রাজশাহী।
তথ্যসূত্র :
[১]. আবূ দাঊদ, হা/৪৬৪৯, সনদ ছহীহ।
[২] মুসতাদরাক হাকিম, হা/৪৪০৭, সনদ ছহীহ।
[৩]. আর-রাহীকুল মাখতুম (সমকালীন প্রকাশনী), পৃ. ১৫৮; তারিখু উমার ইবনুল খাত্ত্বাব, পৃ. ৭, ১০, ১১।
[৪]. আর-রাহীকুল মাখতুম (সমকালীন প্রকাশনী), পৃ. ১৫৮; তারিখু উমার ইবনুল খাত্ত্বাব, পৃ. ৭, ১০, ১১।
[৫]. ইবনু আসাকির, তারীখু দেমাশক, পৃ. ৪২।