আরাফার খুত্ববাহ
- খত্বীব : শায়খ ড. আলী বিন আব্দুর রহমান আল-হুযাইফী
- অনুবাদ : ড. হারুনুর রশীদ ত্রিশালী আল-মাদানী*
[গত ৮ যিলহজ্জ ১৪৪৭ হি. মোতাবেক ২৬ মে, ২০২৬ তারিখের ‘আরাফার খুত্ববা’-এর বঙ্গানুবাদ]
সমস্ত প্রশংসা আল্লাহর জন্য, যিনি সকল কিছুর মালিক, অতি পবিত্র ও শান্তিদাতা। তিনি মুসলমানদের ওপর তাঁর পবিত্র গৃহের হজ্জ ফরজ করেছেন এবং এটাকে ইসলাম ধর্মের একটি রুকন বানিয়েছেন। আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, আল্লাহ ছাড়া কোনো সত্য মাবুদ নেই, যিনি সর্বজ্ঞ, পরাক্রমশালী বাদশাহ। আমি আরও সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, আমাদের নবী ও নেতা মুহাম্মাদ (ﷺ) আল্লাহর বান্দা, তাঁর রাসূল ও সৃষ্টির সেরা মানব। সর্বোত্তম ছালাত ও পূর্ণাঙ্গ সালাম বর্ষিত হোক তাঁর ওপর, তাঁর পরিবার- পরিজন, সাহাবায়ে কেরাম এবং তাঁর অনুসারীদের ওপর।
অতঃপর, হে মানবসকল! আপনারা আল্লাহর তাক্বওয়া অবলম্বন করুন; কেননা এর মাধ্যমেই আখিরাতে বান্দার মুক্তি নিশ্চিত হয়। আল্লাহ তাআলা সূরা আল-হজ্জের শুরুতে বলেছেন,
یٰۤاَیُّہَا النَّاسُ اتَّقُوۡا رَبَّکُمۡ ۚ اِنَّ زَلۡزَلَۃَ السَّاعَۃِ شَیۡءٌ عَظِیۡمٌ ﴿۱﴾ یَوۡمَ تَرَوۡنَہَا تَذۡہَلُ کُلُّ مُرۡضِعَۃٍ عَمَّاۤ اَرۡضَعَتۡ وَ تَضَعُ کُلُّ ذَاتِ حَمۡلٍ حَمۡلَہَا وَ تَرَی النَّاسَ سُکٰرٰی وَ مَا ہُمۡ بِسُکٰرٰی وَ لٰکِنَّ عَذَابَ اللّٰہِ شَدِیۡدٌ
‘হে মানুষ! তোমরা তোমাদের রবকে ভয় করো; নিশ্চয়ই ক্বিয়ামতের কম্পন এক ভয়াবহ ব্যাপার। যেদিন তোমরা তা দেখবে, সেদিন প্রত্যেক স্তন্যদাত্রী নিজ দুগ্ধপোষ্য সন্তানকে ভুলে যাবে এবং প্রত্যেক গর্ভবতী তার গর্ভপাত করে ফেলবে। আর মানুষকে তুমি দেখবে মাতাল সদৃশ, অথচ তারা মাতাল নয়; বরং আল্লাহর আজাব অত্যন্ত কঠিন’ (সূরা আল-হাজ্জ : ১-২)। আর তাক্বওয়া অবলম্বনের অন্তর্ভুক্ত হলো: সৎকাজ সম্পাদন এবং পাপ ও মন্দ কাজ বর্জনের মাধ্যমে ক্বিয়ামত দিবসের জন্য প্রস্তুতি গ্রহণ করা। আল্লাহ তা‘আলা বলেছেন,
ذٰلِکَ بِاَنَّ اللّٰہَ ہُوَ الۡحَقُّ وَ اَنَّہٗ یُحۡیِ الۡمَوۡتٰی وَ اَنَّہٗ عَلٰی کُلِّ شَیۡءٍ قَدِیۡرٌ ۙ . وَّ اَنَّ السَّاعَۃَ اٰتِیَۃٌ لَّا رَیۡبَ فِیۡہَا ۙ وَ اَنَّ اللّٰہَ یَبۡعَثُ مَنۡ فِی الۡقُبُوۡرِ
‘তা এই জন্য যে, আল্লাহই সত্য এবং তিনিই মৃতকে জীবিত করেন ও তিনি সব কিছুর ওপর ক্ষমতাবান। আর এই জন্য যে, ক্বিয়ামত অবশ্যই আসবে, এতে কোনো সন্দেহ নেই এবং কবরে যারা আছে আল্লাহ তাদেরকে পুনরুত্থিত করবেন’ (সূরা আল-হাজ্জ : ৬-৭)।
আর আখিরাতের জন্য সবচেয়ে বড় প্রস্তুতি হলো তাওহীদ প্রতিষ্ঠা করা, একমাত্র আল্লাহর ইবাদত করা এবং আল্লাহ ছাড়া অন্য কারও নিকট দু‘আ করা বর্জন করা। মানুষ কীভাবে আল্লাহকে বাদ দিয়ে এমন কিছুর ইবাদত বা উপাসনা করতে পারে, যা তার কোনো ক্ষতিও করতে পারে না এবং কোনো উপকারও করতে পারে না?
ذٰلِکَ ہُوَ الضَّلٰلُ الۡبَعِیۡدُ .یَدۡعُوۡا لَمَنۡ ضَرُّہٗۤ اَقۡرَبُ مِنۡ نَّفۡعِہٖ ؕ لَبِئۡسَ الۡمَوۡلٰی وَ لَبِئۡسَ الۡعَشِیۡرُ
‘এটা তো চরম পথভ্রষ্টতা। সে এমন সত্তাকে ডাকে, যার ক্ষতি তার উপকারের চেয়েও নিকটবর্তী; কত নিকৃষ্ট এই অভিভাবক এবং কত নিকৃষ্ট এই সহচর!’ (সূরা আল-হাজ্জ : ১২-১৩)। আল্লাহ তা‘আলা আরোও বলেছেন,
وَ مَنۡ یُّشۡرِکۡ بِاللّٰہِ فَکَاَنَّمَا خَرَّ مِنَ السَّمَآءِ فَتَخۡطَفُہُ الطَّیۡرُ اَوۡ تَہۡوِیۡ بِہِ الرِّیۡحُ فِیۡ مَکَانٍ سَحِیۡقٍ
‘আর যে কেউ আল্লাহর সাথে অংশিদার করে, সে যেন আকাশ থেকে আছড়ে পড়ল, অতঃপর পাখি তাকে ছোঁ মেরে নিয়ে গেল অথবা বাতাস তাকে উড়িয়ে নিয়ে কোনো দূরবর্তী স্থানে নিক্ষেপ করল’ (সূরা আল-হাজ্জ : ৩১)।
আর ঈমানদারদের স্লোগান বা পরিচয় হলো মহান আল্লাহর তাওহীদ (একত্ববাদ)। আল্লাহ তা‘আলা বলেছেন,
فَاِلٰـہُکُمۡ اِلٰہٌ وَّاحِدٌ فَلَہٗۤ اَسۡلِمُوۡا ؕ وَ بَشِّرِ الۡمُخۡبِتِیۡنَ . الَّذِیۡنَ اِذَا ذُکِرَ اللّٰہُ وَجِلَتۡ قُلُوۡبُہُمۡ وَالصّٰبِرِیۡنَ عَلٰی مَاۤ اَصَابَہُمۡ وَ الۡمُقِیۡمِی الصَّلٰوۃِ ۙ وَمِمَّا رَزَقۡنٰہُمۡ یُنۡفِقُوۡنَ
‘সুতরাং তোমাদের ইলাহ তো এক ইলাহ; অতএব তোমরা তাঁরই কাছে আত্মসমর্পণ করো। আর সুসংবাদ দাও বিনীতদের; যাদের অন্তর আল্লাহর স্মরণে প্রকম্পিত হয়, যারা তাদের বিপদে ধৈর্য ধারণ করে, যারা ছালাত কায়েম করে এবং আমি তাদেরকে যে রিযিক দিয়েছি, তা থেকে ব্যয় করে’ (সূরা আল-হাজ্জ : ৩৪-৩৫)।
আর এগুলোই হলো ইসলাম ধর্মের রুকনসমূহ: তাওহীদ তথা এই সাক্ষ্য দেওয়া যে, আল্লাহ ছাড়া কোনো সত্য মাবুদ নেই এবং মুহাম্মাদ আল্লাহর রাসূল, ছালাত কায়েম করা, যাকাত প্রদান করা, রামাযানের ছিয়াম পালন করা এবং আল্লাহর পবিত্র ঘরের হজ্জ করা। এর সাথে রয়েছে মহান আল্লাহকে ভয় করার উপদেশ; মহান আল্লাহ বলেন, وَ لِمَنۡ خَافَ مَقَامَ رَبِّہٖ جَنَّتٰنِ ‘আর যে ব্যক্তি তার রবের সামনে দাঁড়ানোকে ভয় করে, তার জন্য রয়েছে দু’টি উদ্যান (জান্নাত)’ (সূরা আর-রাহমান : ৪৬)। সেইসাথে আল্লাহর আনুগত্যের ওপর ও কষ্টদায়ক তাক্বদীরের (ভাগ্যের) ওপর ধৈর্য ধারণ করা; আল্লাহ তা‘আলা বলেছেন, اِنَّمَا یُوَفَّی الصّٰبِرُوۡنَ اَجۡرَہُمۡ بِغَیۡرِ حِسَابٍ ‘ধৈর্যশীলদের তো তাদের পুরস্কার পূর্ণমাত্রায় দেওয়া হবে কোনো হিসাব ছাড়াই’ (সূরা আয-যুমার : ১০)। এর পাশাপাশি আল্লাহর নে‘মতের জন্য তাঁর শুকরিয়া আদায় করা; তিনি বলেন, کَذٰلِکَ سَخَّرۡنٰہَا لَکُمۡ لَعَلَّکُمۡ تَشۡکُرُوۡنَ ‘এভাবেই আমি এগুলোকে (পশুদের) তোমাদের বশীভূত করে দিয়েছি, যাতে তোমরা কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করো’ (সূরা আল-হাজ্জ : ৩৬)।
আর সৃষ্টিজগতে আল্লাহর কিছু জাগতিক নীতি রয়েছে, যার ওপর বান্দার ঈমান আনা এবং তা থেকে শিক্ষা ও উপকার গ্রহণ করা উচিত। আল্লাহ তা‘আলা বলেছেন, اِنَّ اللّٰہَ یُدٰفِعُ عَنِ الَّذِیۡنَ اٰمَنُوۡا ؕ اِنَّ اللّٰہَ لَا یُحِبُّ کُلَّ خَوَّانٍ کَفُوۡرٍ ‘নিশ্চয়ই আল্লাহ মুমিনদের পক্ষ থেকে প্রতিরোধ করেন। আল্লাহ কোনো বিশ্বাসঘাতক, অকৃতজ্ঞকে পছন্দ করেন না’ (সূরা আল-হাজ্জ : ৩৮)। এবং আল্লাহ সুবহানাহু আরও বলেছেন, وَ لَیَنۡصُرَنَّ اللّٰہُ مَنۡ یَّنۡصُرُہٗ ؕ اِنَّ اللّٰہَ لَقَوِیٌّ عَزِیۡزٌ ‘আর অবশ্যই আল্লাহ তাকে সাহায্য করেন, যে তাকে সাহায্য করে। নিশ্চয়ই আল্লাহ পরম শক্তিমান, পরাক্রমশালী’ (সূরা আল-হাজ্জ : ৪০)। আর এই নীতির অন্তর্ভুক্ত হলো মহান আল্লাহর এই বাণী :
فَکَاَیِّنۡ مِّنۡ قَرۡیَۃٍ اَہۡلَکۡنٰہَا وَ ہِیَ ظَالِمَۃٌ فَہِیَ خَاوِیَۃٌ عَلٰی عُرُوۡشِہَا وَ بِئۡرٍ مُّعَطَّلَۃٍ وَّ قَصۡرٍ مَّشِیۡدٍ
‘কত জনপদ আমরা ধ্বংস করেছি, যখন তারা জালেম ছিল; ফলে সেগুলো ছাদসহ ভেঙে পড়ে আছে এবং কত পরিত্যক্ত কূপ ও সুউচ্চ প্রাসাদ (জনশূন্য হয়ে পড়ে আছে)’ (সূরা আল-হাজ্জ : ৪৫)। এবং তিনি আরও বলেছেন, وَ کَاَیِّنۡ مِّنۡ قَرۡیَۃٍ اَمۡلَیۡتُ لَہَا وَ ہِیَ ظَالِمَۃٌ ثُمَّ اَخَذۡتُہَا ۚ وَ اِلَیَّ الۡمَصِیۡرُ ‘আর কত জনপদকে আমি অবকাশ দিয়েছি, যখন তারা জালেম ছিল, অতঃপর আমি তাদেরকে পাকড়াও করেছি; আর আমারই কাছে তো ফিরে আসতে হবে’ (সূরা আল-হাজ্জ : ৪৮)।
আর মহান আল্লাহ তাঁর খলীল (বন্ধু) ইবরাহীম (আলাইহিস সালাম)-কে হজ্জের জন্য ঘোষণা দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছিলেন। এ মর্মে আল্লাহ তা‘আলা বলেছেন,
وَ اَذِّنۡ فِی النَّاسِ بِالۡحَجِّ یَاۡتُوۡکَ رِجَالًا وَّ عَلٰی کُلِّ ضَامِرٍ یَّاۡتِیۡنَ مِنۡ کُلِّ فَجٍّ عَمِیۡقٍ . لِّیَشۡہَدُوۡا مَنَافِعَ لَہُمۡ وَ یَذۡکُرُوا اسۡمَ اللّٰہِ فِیۡۤ اَیَّامٍ مَّعۡلُوۡمٰتٍ عَلٰی مَا رَزَقَہُمۡ مِّنۡۢ بَہِیۡمَۃِ الۡاَنۡعَامِ
‘আর মানুষের নিকট হজ্জের ঘোষণা দাও; তারা তোমার কাছে আসবে পায়ে হেঁটে এবং সর্বপ্রকার কৃশকায় উটের পিঠে চড়ে, তারা আসবে দূর-দূরান্তের পথ অতিক্রম করে। যাতে তারা তাদের কল্যাণের স্থানগুলোতে উপস্থিত হতে পারে এবং তিনি তাদেরকে চতুষ্পদ জন্তু হতে যা রিযক হিসেবে দিয়েছেন, তার উপর নির্দিষ্ট দিনগুলোতে আল্লাহর নাম উচ্চারণ করতে পারে’ (সূরা আল-হাজ্জ : ২৭-২৮)। হ্যাঁ, যাতে তারা তাদের কল্যাণের স্থানসমূহে উপস্থিত হতে পারে এবং আল্লাহর নাম স্মরণ করতে পারে।
হাজীগণ দূর-দূরান্তের প্রত্যন্ত পথ অতিক্রম করে এখানে এসেছেন হজ্জ পালন করতে; একমাত্র মহান আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন ও তাঁর সওয়াবের আশায়। তারা এই প্রাচীন গৃহ এবং পবিত্র স্থানসমূহের প্রতি সম্মান প্রদর্শন করছেন। আল্লাহ তা‘আলা বলেন,
وَ الۡمَسۡجِدِ الۡحَرَامِ الَّذِیۡ جَعَلۡنٰہُ لِلنَّاسِ سَوَآءَۨ الۡعَاکِفُ فِیۡہِ وَ الۡبَادِ ؕ وَ مَنۡ یُّرِدۡ فِیۡہِ بِاِلۡحَادٍۭ بِظُلۡمٍ نُّذِقۡہُ مِنۡ عَذَابٍ اَلِیۡمٍ
‘আর মসজিদুল হারাম, যাকে আমি মানবজাতির জন্য উন্মুক্ত করেছি- সেখানে স্থানীয় অধিবাসী ও বহিরাগতদের অধিকার সমান। আর যে সেখানে অন্যায়ভাবে ইলহাদ তথা দ্বীনবিরোধী পাপ কাজের ইচ্ছে করে, তাকে আমি আস্বাদন করাব যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি’ (সূরা আল-হাজ্জ : ২৫)।
তারা এই পবিত্র স্থানগুলোতে সমবেত হয়েছেন তাওহীদের আহ্বানে সাড়া দিয়ে- একমাত্র আল্লাহর ইবাদত করার এবং আল্লাহর সাথে শিরক বর্জন করার প্রত্যয় নিয়ে। আল্লাহ বলেন, وَ اِذۡ بَوَّاۡنَا لِاِبۡرٰہِیۡمَ مَکَانَ الۡبَیۡتِ اَنۡ لَّا تُشۡرِکۡ بِیۡ شَیۡئًا وَّ طَہِّرۡ بَیۡتِیَ لِلطَّآئِفِیۡنَ وَ الۡقَآئِمِیۡنَ وَ الرُّکَّعِ السُّجُوۡدِ ‘আর স্মরণ করো, যখন আমি ইবরাহীমকে সেই গৃহের স্থান নির্ধারণ করে দিয়েছিলাম এবং বলেছিলাম যে, আমার সাথে কোনো কিছুকে শরিক করো না এবং আমার গৃহকে পবিত্র রাখো তওয়াফকারীদের জন্য, (ছালাতে) দাঁড়ানো ব্যক্তিদের জন্য এবং রুকু‘ ও সেজদাকারীদের জন্য’ (সূরা আল-হাজ্জ : ২৬)।
সুতরাং বায়তুল্লাহকে এমন সব কিছু থেকে পবিত্র রাখতে হবে, যা তার উচ্চ মর্যাদার সাথে সংগতিপূর্ণ নয়। তাই হজ্জের মধ্যে কোনো পাপাচার ও ঝগড়া-বিবাদ থাকবে না; কোনো রাজনৈতিক স্লোগান ও দলীয় বা গোষ্ঠীগত আহ্বান থাকবে না। বরং এখানে থাকবে কেবলই আল্লাহর সামনে বিনয়তা, আল্লাহর বিধানসমূহের প্রতি আনুগত্য এবং তাঁর নবী (ﷺ)-এর সুন্নাতের অনুসরণ; বাহ্যিক ও অভ্যন্তরীণ পবিত্রতা, অঙ্গীকার ও চুক্তিসমূহের পূর্ণ বাস্তবায়ন এবং অধিকারসমূহের প্রতি যথাযথ সম্মান প্রদর্শন। আল্লাহ তা‘আলা বলেছেন, ذٰلِکَ ٭ وَ مَنۡ یُّعَظِّمۡ حُرُمٰتِ اللّٰہِ فَہُوَ خَیۡرٌ لَّہٗ عِنۡدَ رَبِّہٖ ‘এটাই বিধান এবং কেউ আল্লাহর পবিত্র বিধানসমূহকে সম্মান করলে তার রবের নিকট তার জন্য তা উত্তম’ (সূরা আল-হাজ্জ : ৩০)। এবং তিনি আরও বলেছেন, ذٰلِکَ ٭ وَ مَنۡ یُّعَظِّمۡ شَعَآئِرَ اللّٰہِ فَاِنَّہَا مِنۡ تَقۡوَی الۡقُلُوۡبِ ‘আর কেউ আল্লাহর নিদর্শনসমূহকে সম্মান করলে তা তো তার অন্তরের তাক্বওয়ারই বহিঃপ্রকাশ’ (সূরা আল-হাজ্জ : ৩২)।
আর হজ্জের মধ্যে মুসলিমদের পারস্পরিক পরিচিতি, সম্প্রীতি, সহযোগিতা ও সহমর্মিতার এক অনুপম রূপ প্রকাশ পায়; ভাষার ভিন্নতা, বর্ণের বৈচিত্র্য এবং দেশের দূরত্ব থাকা সত্ত্বেও। তারা একে অপরের প্রতি ভালোবাসাপূর্ণ ভ্রাতৃত্বের বন্ধনে আবদ্ধ হয়ে হজ্জের সমস্ত বিধান পালন করে। এ জন্য তারা তাদের কল্যাণের স্থানগুলোতে উপস্থিত হয় এবং তাদের কোরবানির পশুর গোশত থেকে অভাবগ্রস্ত ও দরিদ্রদের আহার করায়। আর তখন তাদের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হয়- কর্মে ইহসান করা এবং কথায় সত্যবাদী হওয়া। আল্লাহ তা‘আলা বলেছেন, ‘আর তোমরা পরিহার করো মিথ্যা কথা’।
আর আরাফাতের এই ময়দানেই আল্লাহ তা‘আলা আপনাদের (হাজীদের) নিয়ে তাঁর ফেরেশতাদের সাথে গৌরব করেন। আর এটি সেই মহান স্থান, যেখানে আল্লাহ তা‘আলা এই আয়াতটি অবতীর্ণ করেছিলেন,اَلۡیَوۡمَ اَکۡمَلۡتُ لَکُمۡ دِیۡنَکُمۡ وَ اَتۡمَمۡتُ عَلَیۡکُمۡ نِعۡمَتِیۡ وَ رَضِیۡتُ لَکُمُ الۡاِسۡلَامَ دِیۡنًا ‘আজ আমি তোমাদের জন্য তোমাদের দ্বীনকে পূর্ণাঙ্গ করলাম, তোমাদের প্রতি আমার নে‘মত সম্পূর্ণ করলাম এবং ইসলামকে তোমাদের জন্য দ্বীন হিসেবে মনোনীত করলাম’ (সূরা আল-মায়িদাহ : ৩)।
সুতরাং আপনারা হেদায়েতের নবী (ﷺ)-এর অনুসরণ ও অনুকরণ করুন। তিনি আরাফাতের ময়দানে যোহর ও আছরের ছালাত একত্রে কছর করে আদায় করেছিলেন। এরপর তিনি সেখানেই অবস্থান করে আল্লাহর যিকিরে মগ্ন ছিলেন; সূর্যাস্ত পর্যন্ত। অতঃপর তিনি মুযদালিফার দিকে রওনা হন, যেমনটি আল্লাহ তা‘আলা বলেছেন,
فَاِذَاۤ اَفَضۡتُمۡ مِّنۡ عَرَفٰتٍ فَاذۡکُرُوا اللّٰہَ عِنۡدَ الۡمَشۡعَرِ الۡحَرَامِ ۪ وَ اذۡکُرُوۡہُ کَمَا ہَدٰىکُمۡ ۚ وَ اِنۡ کُنۡتُمۡ مِّنۡ قَبۡلِہٖ لَمِنَ الضَّآلِّیۡنَ
‘তারপর যখন তোমরা আরাফাত থেকে ফিরে আসবে, তখন মাশআরুল হারামের (মুযদালিফা) কাছে আল্লাহর যিকির করো। আর তাকে স্মরণ করো যেভাবে তিনি তোমাদের হেদায়েত দিয়েছেন, যদিও এর আগে তোমরা পথভ্রষ্টদের অন্তর্ভুক্ত ছিলে’ (সূরা আল-বাক্বারাহ : ১৯৮)। এরপর ঈদের দিন সকালে তিনি মিনার দিকে রওনা হন। আল্লাহ বলেন,ثُمَّ اَفِیۡضُوۡا مِنۡ حَیۡثُ اَفَاضَ النَّاسُ وَ اسۡتَغۡفِرُوا اللّٰہَ ؕ اِنَّ اللّٰہَ غَفُوۡرٌ رَّحِیۡمٌ ‘তারপর তোমরা ফিরে যাও যেখান থেকে মানুষ ফিরে যায় এবং আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করো; নিশ্চয়ই আল্লাহ পরম ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু’ (সূরা আল-বাক্বারাহ : ১৯৯)। সেখানে তিনি জামরাতুল আকাবায় পাথর নিক্ষেপ করেন, তার কোরবানির পশু যবাই করেন এবং মাথা মুণ্ডন করেন- তবে চুল ছোট করারও অনুমতি দিয়েছেন। অতঃপর তিনি বায়তুল্লাহতে তাওয়াফে ইফাদাহ করেন। আল্লাহ তা‘আলা বলেছেন, ثُمَّ لۡیَقۡضُوۡا تَفَثَہُمۡ وَ لۡیُوۡفُوۡا نُذُوۡرَہُمۡ وَ لۡیَطَّوَّفُوۡا بِالۡبَیۡتِ الۡعَتِیۡقِ ‘তারপর তারা যেন তাদের অপরিচ্ছন্নতা দূর করে, তাদের মানতসমূহ পূর্ণ করে এবং প্রাচীন গৃহের তাওয়াফ করে’ (সূরা আল-হাজ্জ : ২৯)।
এর পাশাপাশি (হজ্জের পুরো সময়টায়) প্রশান্তি, নম্রতা ও কোমলতা বজায় রাখার ব্যাপারে যত্নবান হতে হবে; ধাক্কাধাক্কি ও হুড়োহুড়ি থেকে দূরে থাকতে হবে এবং শৃঙ্খলা রক্ষাকারী ও আয়োজক কর্তৃপক্ষের নির্দেশনাবলী মেনে চলতে হবে। গ্রুপ ভিত্তিতে চলাচলের নিয়ম ও যাতায়াতের নির্ধারিত পথ কঠোরভাবে অনুসরণ করতে হবে; যাতে সামগ্রিক কল্যাণ অর্জিত হয়, ক্ষতি ও বিশৃঙ্খলা এড়ানো যায়, জীবন রক্ষা পায় এবং হজ্জের আনুষ্ঠানিকতা পালন সবার জন্য সহজ ও সাবলীল হয়।
আর মিনাতে অবস্থানকালে বেশি বেশি আল্লাহর যিকির করা মুস্তাহাব। আল্লাহ তা‘আলা বলেছেন,فَاِذَا قَضَیۡتُمۡ مَّنَاسِکَکُمۡ فَاذۡکُرُوا اللّٰہَ کَذِکۡرِکُمۡ اٰبَآءَکُمۡ اَوۡ اَشَدَّ ذِکۡرًا ‘অতঃপর যখন তোমরা তোমাদের হজ্জের কার্যাদি সম্পন্ন করবে, তখন আল্লাহকে স্মরণ করো- যেভাবে তোমরা তোমাদের পিতৃপুরুষদের স্মরণ করতে অথবা তার চেয়েও তীব্রভাবে স্মরণ করো’ (সূরা আল-বাক্বারাহ : ২০০)। এবং আইয়ামে তাশরীকের দিনগুলোতে (যিলহজ্জের ১১, ১২ ও ১৩ তারিখ) হাজীগণ তিনটি জামরাতেই পাথর নিক্ষেপ করবেন; প্রতিদিন প্রতিটি জামরায় সাতটি করে পাথর মারবেন। (মিনায়) তেরো তারিখ পর্যন্ত অবস্থান করা সবচেয়ে উত্তম, তবে বারো তারিখে (পাথর নিক্ষেপ শেষ করে) তাড়াতাড়ি চলে যাওয়াও জায়েয। এ মর্মে আল্লাহ তা‘আলা বলেছেন,
وَ اذۡکُرُوا اللّٰہَ فِیۡۤ اَیَّامٍ مَّعۡدُوۡدٰتٍ ؕ فَمَنۡ تَعَجَّلَ فِیۡ یَوۡمَیۡنِ فَلَاۤ اِثۡمَ عَلَیۡہِ ۚ وَ مَنۡ تَاَخَّرَ فَلَاۤ اِثۡمَ عَلَیۡہِ ۙ لِمَنِ اتَّقٰی ؕ وَ اتَّقُوا اللّٰہَ وَ اعۡلَمُوۡۤا اَنَّکُمۡ اِلَیۡہِ تُحۡشَرُوۡنَ
‘আর তোমরা আল্লাহকে স্মরণ করো নির্দিষ্ট দিনগুলোতে। অতঃপর যে ব্যক্তি তাড়াহুড়ো করে দুই দিনে চলে যাবে, তার কোনো পাপ নেই; আর যে ব্যক্তি বিলম্ব করবে, তারও কোনো পাপ নেই- তার জন্য যে তাক্বওয়া অবলম্বন করেছে। আর তোমরা আল্লাহকে ভয় করো এবং জেনে রাখো, তোমাদের সবাইকে তাঁর কাছেই একত্রিত করা হবে’ (সূরা আল-বাক্বারাহ : ২০৩)। আর স্বদেশে রওনা হওয়ার পূর্বে বিদায়ী তাওয়াফ করতে হবে।
মূলত আল্লাহ তা‘আলা নিজেই আপনাদেরকে মনোনীত করেছেন এবং দ্বীনের ব্যাপারে আপনাদের ওপর কোনো সংকীর্ণতা বা কঠিন নিয়ম চাপিয়ে দেননি; এটি আপনাদের পিতা ইবরাহীমের মিল্লাত (আদর্শ)। তিনি পূর্বেই আপনাদের নাম রেখেছেন ‘মুসলিম’ এবং এই কিতাবেও, যাতে রাসূল আপনাদের জন্য সাক্ষী হন এবং আপনারা সাক্ষী হন মানবজাতির জন্য। সুতরাং আপনারা ছালাত কায়েম করুন, যাকাত প্রদান করুন এবং আল্লাহকে অবলম্বন করুন; তিনিই আপনাদের অভিভাবক। কতই না উত্তম অভিভাবক এবং কতই না চমৎকার সাহায্যকারী তিনি’!
আর আল্লাহকে অবলম্বন করার অন্যতম উপায় হলো: ব্যক্তি তার রবের নিকট বেশি বেশি দু‘আ ও প্রার্থনা করবে; বিশেষ করে হজ্জের পবিত্র স্থানগুলোতে, কারণ এগুলো দু‘আ কবুল হওয়ার মোক্ষম সময় ও স্থান। হাদীছে এসেছে, (সর্বোত্তম দু‘আ হলো আরাফাহ দিবসের দু‘আ। আর আরাফাহ দিবসে আমি এবং আমার পূর্ববর্তী নবীগণ যা বলেছি তার মধ্যে সর্বোত্তম হলো, لاَ إِلَهَ إِلاَّ اللهُ وَحْدَهُ لاَ شَرِيكَ لَهُ، لَهُ الْمُلْكُ وَلَهُ الحَمْدُ وَهُوَ عَلَى كُلِّ شَيْءٍ قَدِيرٌ ‘আল্লাহ ছাড়া কোন হক্ব মা‘বূদ নেই। তিনি এক ও অদ্বিতীয়, তাঁর কোন শরীক নেই। যাবতীয় সাম্রাজ্য তাঁরই এবং তাঁর জন্যই যাবতীয় প্রশংসা। তিনি সবকিছুর উপর ক্ষমতাবান’।[১] তাছাড়া আল্লাহ তা‘আলা বলেছেন,
وَ قَالَ رَبُّکُمُ ادۡعُوۡنِیۡۤ اَسۡتَجِبۡ لَکُمۡ ؕ اِنَّ الَّذِیۡنَ یَسۡتَکۡبِرُوۡنَ عَنۡ عِبَادَتِیۡ سَیَدۡخُلُوۡنَ جَہَنَّمَ دٰخِرِیۡنَ
‘আর তোমাদের রব বলেছেন, তোমরা আমাকে ডাকো, আমি তোমাদের ডাকে সাড়া দেব। নিশ্চয়ই যারা অহংকারবশত আমার ইবাদত (দু‘আ) থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয়, তারা অচিরেই লাঞ্ছিত হয়ে জাহান্নামে প্রবেশ করবে’ (সূরা গাফির : ৬০)। তিনি আরও বলেছেন,
وَ مِنۡہُمۡ مَّنۡ یَّقُوۡلُ رَبَّنَاۤ اٰتِنَا فِی الدُّنۡیَا حَسَنَۃً وَّ فِی الۡاٰخِرَۃِ حَسَنَۃً وَّ قِنَا عَذَابَ النَّارِ . اُولٰٓئِکَ لَہُمۡ نَصِیۡبٌ مِّمَّا کَسَبُوۡا ؕ وَ اللّٰہُ سَرِیۡعُ الۡحِسَابِ
‘তাদের মধ্যে কেউ কেউ বলে- হে আমাদের রব! আমাদের দুনিয়াতেও কল্যাণ দান করুন এবং আখিরাতেও কল্যাণ দান করুন এবং আমাদেরকে আগুনের আজাব থেকে রক্ষা করুন। এদের জন্যই রয়েছে তাদের উপার্জনের অংশ; আর আল্লাহ হিসাব গ্রহণে অত্যন্ত তৎপর’ (সূরা আল-বাক্বারাহ : ২০১-২০২)।
হে আল্লাহ! আপনি হাজীদের দু‘আ ও হজ্জের যাবতীয় আমল কবুল করে নিন, তাদের সকল বিষয়কে সহজ করে দিন, তাদের গুনাহসমূহ ক্ষমা করুন এবং তাদের ছহীহ-সালামতে, পুণ্যময় ও সফলকাম অবস্থায় নিজ নিজ দেশে ফিরিয়ে দিন।
হে আল্লাহ! আপনি মুসলিমদের অবস্থা সংশোধন করে দিন এবং সত্যের ওপর তাদের ঐক্যবদ্ধ করুন। হে আল্লাহ! আপনি মুসলিমদের অবস্থা সংশোধন করে দিন এবং সত্যের ওপর তাদের ঐক্যবদ্ধ করুন। হে আল্লাহ! আপনি মুসলিমদের অবস্থা সংশোধন করে দিন এবং সত্যের ওপর তাদের ঐক্যবদ্ধ করুন। আপনিই তাদের সমস্ত বিষয়ের দায়িত্বভার গ্রহণ করুন এবং তাদের দ্বীন ও দুনিয়ার সার্বিক অবস্থার সংশোধন করে দিন, হে সৃষ্টিজগতের প্রতিপালক!
হে আল্লাহ! আপনি খাদেমুল হারামাইন শারিফাইন বাদশাহ সালমান বিন আব্দুল আজিজ এবং তার নায়েব প্রিন্স মুহাম্মাদ বিন সালমানকে উত্তম কাজের তাওফীক্ব দান করুন। দুনিয়া ও আখিরাতে তাদেরকে সর্বোত্তম প্রতিদান দিন; কারণ তারা আপনার বান্দাদের প্রতি ইহসান করেছেন, হাজীদের জন্য হজ্জ পালন সহজ করেছেন এবং দুই পবিত্র মসজিদ ও সেখানে আগমনকারীদের সেবায় অত্যন্ত উদারহস্তে ব্যয় করেছেন। হে আল্লাহ! আপনি তাদের মাধ্যমে আপনার দ্বীনকে বিজয়ী করুন, হে আল্লাহ! আপনি তাদের মাধ্যমে আপনার দ্বীনকে বিজয়ী করুন।
আল্লাহ তাআলা আমাদের নেতা ও নবী মুহাম্মাদ (ﷺ)-এর ওপর এবং তাঁর পরিবার ও ছাহাবীদের ওপর অজস্র ছালাত ও সালাম বর্ষণ করুন।
* বাংলা আলোচক ও জুমু‘আর খুৎবার লাইভ অনুবাদক, মসজিদে নববী।
তথ্যসূত্র :
[১]. তিরমিযী, হা/৩৫৮৫; সনদ ছহীহ, সিলসিলা ছহীহাহ, হা/১৫০৩।