শনিবার, ০৭ মার্চ ২০২৬, ০১:০০ অপরাহ্ন

আধুনিক প্রযুক্তি এবং এগুলোর যথাযথ ব্যবহার 

- খত্বীব : শায়খ ইয়াসির বিন রশিদ আল-দুসারী 


অনুবাদ : আল-ইখলাছ ডেস্ক

 
[গত ৬ সফর ১৪৪৭ হি. মোতাবেক ১ আগস্ট, ২০২৫ তারিখের ‘মসজিদুল হারাম, মক্কা মুকাররামা’-এর জুমু‘আর খুত্ববার বঙ্গানুবাদ]

আল্লাহ তা‘আলার প্রশংসা এবং রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর উপর ছালাত ও সালামের পরে সম্মানিত খত্বীব বলেছেন, সমস্ত প্রশংসা আল্লাহর জন্য, যিনি কলমের মাধ্যমে শিক্ষা দিয়েছেন এবং মানুষকে সেইসব বিষয় শিখিয়েছেন যা সে জানত না। আমরা তাঁর অসংখ্য অনুগ্রহের জন্য তাঁর শুকরিয়া আদায় করি, যার হিসাব রাখা সম্ভব নয়। আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, আল্লাহ ছাড়া সত্য কোনো উপাস্য নেই, তিনি একক, তাঁর কোনো অংশীদার নেই। তিনি সব কিছুর জ্ঞান রাখেন এবং প্রত্যেক বিষয়ের জন্য নির্দিষ্ট পরিমাণ নির্ধারণ করেছেন। আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, মুহাম্মদ (ﷺ) আল্লাহর বান্দা ও রাসূল, তিনি হেদায়াতের পথ দেখিয়েছেন এবং উম্মতকে বিভ্রান্তির পথ থেকে সতর্ক করেছেন। মহান আল্লাহ তাঁর উপর, তাঁর পরিবার, সাহাবায়ে কেরাম এবং যারা ক্বিয়ামত পর্যন্ত নেকভাবে অনুসরণ করবে, তাদের উপর শান্তি বর্ষণ করুন।

হে মুসলমানগণ! আল্লাহকে ভয় করুন, সত্যিকার তাক্বওয়া অর্জন করুন, তাঁর নজরদারির অনুভব রাখুন প্রকাশ্যে ও গোপনে, এই দুনিয়ার চাকচিক্য যেন আপনাদের ধোঁকা না দেয়। মহান আল্লাহ বলেন,

فَاَمَّا مَنۡ طَغٰی  .وَ اٰثَرَ  الۡحَیٰوۃَ  الدُّنۡیَا  .فَاِنَّ الۡجَحِیۡمَ ہِیَ الۡمَاۡوٰی. وَ اَمَّا مَنۡ خَافَ مَقَامَ رَبِّہٖ وَ نَہَی النَّفۡسَ عَنِ  الۡہَوٰی  . فَاِنَّ  الۡجَنَّۃَ  ہِیَ الۡمَاۡوٰی

‘যে ব্যক্তি সীমালঙ্ঘন করে এবং দুনিয়ার জীবনকে প্রাধান্য দেয়, তার আবাস হবে জাহান্নাম। আর যে ব্যক্তি তার প্রতিপালকের সামনে দাঁড়ানোর ভয় করে এবং নিজের প্রবৃত্তিকে খারাপ কাজ থেকে বিরত রাখে, তার বাসস্থান হবে জান্নাত’ (সূরা আন-নাযি‘আত : ৩৭-৪১)।

হে মানুষ! আজকের যুগে আমরা এক বিস্ময়কর প্রযুক্তিগত অগ্রগতি দেখছি। স্মার্ট ডিভাইস, ডিজিটাল যোগাযোগ এবং বিভিন্ন অনলাইন প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে যোগাযোগ সহজ হয়েছে, দূরত্ব কমে গেছে, সময় বাঁচানো গেছে, বিভিন্ন সেবা দ্রুত ও উন্নত হয়েছে, জ্ঞান সবার কাছে পৌঁছানো সম্ভব হয়েছে।

আমাদের সৌভাগ্য যে সঊদী আরব (বা এই খুতবার প্রেক্ষাপটে ‘আমাদের দেশ’) এই ক্ষেত্রে নেতৃত্ব দিচ্ছে উন্নত প্রযুক্তির সঠিক ব্যবহার করে সমাজ ও মানুষের কল্যাণে অবদান রাখছে। এবং সব কিছুই ইসলামের মূলনীতি ও ঐতিহ্যের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে।

কিন্তু হে আল্লাহর বান্দাগণ, যদি এই প্রযুক্তি ভুলভাবে ব্যবহৃত হয়, তাহলে এটি কল্যাণকর নয়, বরং অভিশাপ হয়ে দাঁড়ায়। আজ অনেকেই সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের প্রতি রোগগ্রস্ত আসক্তিতে ভুগছে, নারী-পুরুষ, তরুণ-তরুণী নির্বিশেষে। মানুষ এখন মোবাইলের পর্দায় ডুবে থাকে, মানুষের মাঝেও সে কেবল শারীরিকভাবে উপস্থিত, কিন্তু মানসিকভাবে বিচ্ছিন্ন। এটি এক আত্মবিনাশী অবস্থা যেমন : দিকহীন নৌকা, যার নেই কোনো দিশা বা চঞ্চল বাতাসে ভাসমান, দিন পার হচ্ছে, জীবন কেটে যাচ্ছে, অথচ কোনো লাভ নেই। রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেন,نِعْمَتَانِ مَغْبُوْنٌ فِيْهِمَا كَثِيْرٌ مِّنَ النَّاسِ الصِّحَّةُ وَالْفَرَاغُ ‘দু’টি নে‘মতের সদ্বব্যবহারের ব্যাপারে অধিকাংশ মানুষ ধোঁকার মধ্যে রয়েছে। তাহল, সুস্থতা ও অবসর।[১] ইবনুল কাইয়্যিম (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন,

إضاعة الوقت أشدُّ من الموت؛ لأنَّ إضاعة الوقت تقطعك عن الله والدار الآخرة، والموتُ يقطعك عن الدنيا وأهلها

‘সময় নষ্ট করা মৃত্যুর থেকেও ভয়ানক। কারণ মৃত্যু তোমাকে কেবল পরিবার ও দুনিয়া থেকে বিচ্ছিন্ন করে, কিন্তু সময় নষ্ট করা তোমাকে আল্লাহ ও আখিরাত থেকে বিচ্ছিন্ন করে’।[২]

হে মুসলমানগণ! মানুষের মন যদি আনুগত্য (ইবাদত ও ভালো কাজ) দিয়ে পূর্ণ না করা হয়, তবে তা গোনাহে (পাপ কাজে) লিপ্ত হয়ে পড়ে, বিশেষ করে এই ডিজিটাল যোগাযোগের যুগে, যেখানে প্রতিদিনের ছবি, শিরোনাম এবং ব্যক্তিগত প্রোফাইল সাজানোর প্রতি আকর্ষণ বেড়েই চলেছে। আপনি দেখবেন, মানুষ এক ধরণের অন্তহীন কল্পনার বন্দী হয়ে গেছে এবং এমন সব আক্সক্ষার মাঝে আটকে পড়েছে যার কোনো শেষ নেই। এর থেকেও খারাপ হলো, যে ব্যক্তি অন্যের জীবন নিয়ে মগ্ন থাকে, তার নিজের দিনগুলো নষ্ট করে দেয়, অন্যদের জীবন পর্যবেক্ষণ করতে করতে নিজের জীবনকে ভুলে যায়। অথচ শারী‘আত (ইসলামী বিধান) এমন অসার ব্যস্ততা ও বিষাক্ত আচরণ থেকে কঠোরভাবে সতর্ক করেছে, যা একজন মানুষের দ্বীনকে নষ্ট করে দেয় এবং তার মূল্যবান জীবনটিকে অপচয় করে। আবূ হুরায়রা (রাযিয়াল্লাহু আনহু) বলেন, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেন, مِنْ حُسْنِ إِسْلَامِ الْمَرْءِ تَرْكُهُ مَا لَا يَعْنِيْهِ ‘কোন ব্যক্তির জন্য ইসলামের সৌন্দর্য হল অনর্থক সকল জিনিস পরিহার করা’।[৩]

আবূ বকর (রাযিয়াল্লাহু আনহু) বলতেন, فَإِنَّ أَقْوَامًا جَعَلُوا آَجَالَهُمْ لِغَيْرِهِمْ وَنَسَوْا أَنْفُسَهُمْ، فَأَنْهَاكُمْ أَنْ تَكُونُوا أَمْثَالَهُمْ ‘কিছু মানুষ তাদের জীবন অন্যদের জন্য উৎসর্গ করেছে এবং নিজেদেরকে ভুলে গেছে, তোমরা যেন তাদের মতো না হও’।[৪]

হে আল্লাহর বান্দারা! জেনে রাখো, আজকের যুগে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলো অধিকাংশ ক্ষেত্রেই মিথ্যা জীবনের প্রদর্শনীর মঞ্চে পরিণত হয়েছে। এগুলো অন্যায় তুলনার ক্ষেত্র হয়ে উঠেছে, যার কারণে অনেকের হৃদয়ে হিংসা, বিদ্বেষ ঢুকে পড়েছে। তাদের অন্তরে অসন্তুষ্টি ও রেষারেষি জন্ম নিয়েছে। মানুষ আল্লাহর দেওয়া নে‘মতের প্রতি কৃতজ্ঞতা ও শুকরিয়া প্রকাশ কমিয়ে দিয়েছে। এই সব সমস্যার মধ্যে সবচেয়ে বড় এক বিপদ হলো, সেই সব ভুয়া ও প্রতারক অ্যাকাউন্ট, যেগুলো সমাজে বিষ ছড়ায়, ফিতনা-ফ্যাসাদ ও মিথ্যা রটায়, মিথ্যা বক্তব্য বানায় ও গুজব ছড়ায়, বিশ্বস্ত আলেমদের নামে ভুল ফতোয়া ছড়িয়ে দেয়, বেতনভুক্ত কুৎসা অভিযানে লিপ্ত হয়, যাদের কাজের মধ্যে নেই ধর্মের ভয় বা নৈতিকতা। আর আশ্চর্যের বিষয় হলো, অনেক মানুষ যাচাই না করেই সেই সব ভুয়া তথ্য বিশ্বাস করে বসে, তড়িঘড়ি করে তা ছড়িয়ে দেয়, বিনা চিন্তায় শেয়ার করে ফেলে, না যায় সত্যতা যাচাই করা, না দেখে কোনটা নির্ভরযোগ্য উৎস। মহান আল্লাহ বলেন,

یٰۤاَیُّہَا  الَّذِیۡنَ اٰمَنُوۡۤا  اِنۡ جَآءَکُمۡ فَاسِقٌۢ بِنَبَاٍ فَتَبَیَّنُوۡۤا  اَنۡ  تُصِیۡبُوۡا قَوۡمًۢا بِجَہَالَۃٍ  فَتُصۡبِحُوۡا عَلٰی مَا فَعَلۡتُمۡ  نٰدِمِیۡنَ

‘হে মুমিনগণ, যদি কোনো ফাসিক্ব ব্যক্তি তোমাদের কাছে কোনো খবর নিয়ে আসে, তবে যাচাই করে নিও, যাতে তোমরা না জেনে কারো ক্ষতি করে ফেলো এবং পরে অনুতপ্ত হও’ (সূরা আল-হুজুরাত : ৬)।

হে মানুষ! একটি ভয়ঙ্কর ফিতনা রয়েছে যা নিঃসঙ্গ সময়ে মানুষের অন্তর নষ্ট করে দেয়। এই ফিতনা তখন দেখা দেয় যখন মানুষ একাকী অবস্থায়, নির্জন কোন কোণে মোবাইল ফোন নিয়ে বসে থাকে, আর তখন সে আল্লাহর সীমারেখা লঙ্ঘন করে, হারাম জিনিস দেখে, আল্লাহর আদেশ-নিষেধকে তুচ্ছ মনে করে, তাঁর নিষেধাজ্ঞাগুলোর প্রতি গুরুত্ব না দিয়ে, এমনকি ভুলে যায়, এই দৃশ্যগুলো মানুষের মধ্যে কত রোগ, অভিশাপ, নৈতিক অধঃপতন আর সময় ও জীবনের অপচয় ডেকে আনে। এমনকি তা নেক আমল নষ্ট করে দেয়। হাদীছে এসেছে,

عَنْ ثَوْبَانَ رَضِىَ اللهُ عَنْهُ عَنِ النَّبِىِّ ﷺ أَنَّهُ قَالَ لَأَعْلَمَنَّ أَقْوَامًا مِنْ أُمَّتِىْ يَأْتُوْنَ يَوْمَ الْقِيَامَةِ بِحَسَنَاتٍ أَمْثَالِ جِبَالِ تِهَامَةَ بِيْضًا فَيَجْعَلُهَا اللهُ عَزَّ وَجَلَّ هَبَاءً مَنْثُورًا . قَالَ ثَوْبَانُ  يَا رَسُولَ اللهِ ﷺ صِفْهُمْ لَنَا جَلِّهِمْ لَنَا أَنْ لَا نَكُوْنَ مِنْهُمْ وَنَحْنُ لاَ نَعْلَمُ. قَالَ : أَمَا إِنَّهُمْ إِخْوَانُكُمْ وَمِنْ جِلْدَتِكُمْ وَيَأْخُذُوْنَ مِنَ اللَّيْلِ كَمَا تَأْخُذُوْنَ وَلَكِنَّهُمْ أَقْوَامٌ إِذَا خَلَوْا بِمَحَارِمِ اللهِ انْتَهَكُوهَا

ছাওবান (রাযিয়াল্লাহু আনহু) থেকে বর্ণিত, নবী করিম (ﷺ) বলেছেন, আমি অবশ্যই আমার উম্মতের এমন কিছু লোককে চিনে নেব ক্বিয়ামতের দিন, যারা পাহাড়সম (তিহামার পাহাড়ের মতো বিশাল) সাদা রঙের নেক আমল নিয়ে আসবে, কিন্তু আল্লাহ তা‘আলা সেগুলোকে ছাইয়ের মতো উড়িয়ে দেবেন। ছাওবান (রাযিয়াল্লাহু আনহু) বললেন, হে আল্লাহর রাসূল! আপনি আমাদের তাদের সম্পর্কে বর্ণনা দিন, তাদের বৈশিষ্ট্য আমাদের পরিষ্কার করে বলুন, যাতে আমরা না হয়ে যাই তাদের মধ্যে, অথচ নিজেরাও না জানি। তখন রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বললেন, তারা তোমাদেরই ভাই, তোমাদের জাতির লোক। তারা রাতের ইবাদতও করে, যেমন তোমরাও করো। কিন্তু তারা এমন এক দল, যারা একাকী হলে, আল্লাহর হারাম বিষয়সমূহ লঙ্ঘন করে।[৫]

দ্বিতীয় খুত্ববা

আল্লাহর প্রশংসা এবং রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর উপর দরূদ পাঠ করে খত্বীব বলেন, হে ঈমানদার ভাইয়েরা, নিশ্চয়ই সবচেয়ে বড় নে‘মতের মধ্যে একটি হলো, মানুষের নিজের ভুল-ত্রুটি ও গাফিলতির ব্যাপারে সচেতন হয়ে যাওয়া, এর আগেই, যে সময় সব কিছু সংশোধন করার সুযোগ হারিয়ে যাবে এবং এই উপলব্ধি হওয়া তার হৃদয়কে এমন অবস্থায় পৌঁছানোর আগেই, যখন তাতে গুনাহর কালো দাগ জমে যায় এবং তা মনকে পাথরের মতো করে ফেলে। এই ডিজিটাল জগত আর প্রযুক্তির কোলাহলের মাঝে, আমরা কতটাই না জরুরত অনুভব করি, এমন একটা ঔষধের, যা আমাদের এই অসুস্থ আসক্তি থেকে মুক্তি দেবে। তা হলো, একটু নির্জন সময় নেওয়া, যেখানে আমরা সব ডিভাইসের আওয়াজ থামিয়ে রাখি। এটা কোনোভাবেই জীবন থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়া নয়, বরং আমাদের অসামঞ্জস্য হয়ে যাওয়া জীবনের ভারসাম্য ফিরিয়ে আনার একটা উপায়। ইবনুল জাওযী (রাহিমাহুল্লাহ) বলেছেন, ‘আমি এমন কিছু দেখিনি যা হৃদয়ের জন্য একাকীত্বের চেয়ে বেশি উপকারী, যেখানে মানুষ নিজের ভুলগুলো চিনতে পারে এবং নিজের কাজের পরিণতি নিয়ে চিন্তা করতে পারে’।

হে আল্লাহর বান্দারা! আমাদের দ্বীন, মধ্যপন্থা ও ভারসাম্যের দ্বীন। তাই ইবাদতের জন্য সময় রাখো, নাফসের (শরীর ও মানসিক শান্তির) জন্য বিশ্রামের সুযোগ রাখো এবং পরিবারের জন্যও অংশ নির্ধারণ করো। রাসূলুল্লাহ (ﷺ) সত্যই বলেছেন, যখন তিনি সালমান (রাযিয়াল্লাহু আনহু)-এর এই কথাকে সমর্থন করেছিলেন, যা তিনি আবূ দারদা (রাযিয়াল্লাহু আনহু)-কে বলেছিলেন, إِنَّ لِرَبِّكَ عَلَيْكَ حَقًّا ، وَلِنَفْسِكَ عَلَيْكَ حَقًّا ، وَلأَهْلِكَ عَلَيْكَ حَقًّا ، فَأَعْطِ كُلَّ ذِى حَقٍّ حَقَّهُ ‘তোমার রবের তোমার ওপর হক্ব আছে, তোমার নিজের (নাফসের) ওপর তোমার হক্ব আছে, আর তোমার পরিবারের ওপরও তোমার হক্ব আছে। তাই প্রত্যেকের হক্ব তাদের প্রাপ্য দাও’।[৬]

অতএব, হে আল্লাহর বান্দারা! আল্লাহকে ভয় করো এবং মুক্তির উপায় অবলম্বন করো। সর্বদা স্মরণে রেখো, তোমরা তোমাদের প্রভুর কাছে উপস্থাপিত হবে এবং তোমাদের অঙ্গপ্রত্যঙ্গ সম্বন্ধে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে। আল্লাহ তা‘আলা বলেন, اِنَّ السَّمۡعَ وَ الۡبَصَرَ وَ الۡفُؤَادَ  کُلُّ  اُولٰٓئِکَ کَانَ  عَنۡہُ  مَسۡـُٔوۡلًا ‘নিশ্চয়ই কান, চোখ এবং অন্তকরণ- এদের প্রতিটির ব্যাপারে সে জিজ্ঞাসিত হবে’ (সূরা আল-ইসরা : ৩৬)।

অতএব, তোমরা তোমাদের জীবনকে কাজে লাগাও এবং সময়ের সঠিক ব্যবহার করো। যে ব্যক্তি দৃঢ় বিশ্বাস রাখে, সে পরিশ্রম করে এবং চেষ্টা করে। আর যার আশা কম, সে পাথেয় গ্রহণ করে এবং প্রস্তুতি নেয়। হাদীছে এসেছে, আবূ হুরায়রা (রাযিয়াল্লাহু আনহু) বলেন, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেন, احْرِصْ عَلَى مَا يَنْفَعُكَ وَاسْتَعِنْ بِاللهِ وَلَاتَعْجِزْ ‘আর যে কাজে তোমার উপকার হবে, তার প্রতি আগ্রহ রাখ এবং আল্লাহ তা‘আলার নিকট সাহায্য কামনা কর আর  দুর্বলতা প্রদর্শন কর না’।[৭]

পরিশেষে খত্বীব মহোদয় আল্লাহর প্রশংসা এবং রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর উপর দরূদ পাঠ করেন। মুসলিম উম্মাহ ও ইসলামের জন্য দু‘আ করে বলেন। হে আল্লাহর বান্দারা! তোমরা তাঁর প্রতি দরূদ ও সালাম পাঠাও যিনি হিকমত ও হেদায়েত নিয়ে প্রেরিত হয়েছেন, সৃষ্টির মধ্যে সর্বশ্রেষ্ঠ ও সেই মহান ব্যক্তি যিনি পৃথিবীর মাটি অতিক্রম করেছেন, যেমন তোমাদের পালনকর্তা তোমাদেরকে আদেশ করেছেন। তিনি বলেন, ‘নিশ্চয়ই আল্লাহ (ঊর্ধ্ব জগতে ফেরেশতাদের মধ্যে) নবীর প্রশংসা করেন এবং তাঁর ফেরেশতাগণ নবীর জন্য দু‘আ করে। হে মুমিনগণ, তোমরাও নবীর উপর দরূদ পাঠ কর এবং তাকে যথাযথভাবে সালাম জানাও’ (সূরা আল-আহযাব : ৫৬)।

‘হে আল্লাহ! আপনি মুহাম্মাদ (ﷺ) ও তাঁর পরিবারবর্গের উপর রহমত বর্ষণ করুন, যেভাবে রহমত বর্ষণ করেছেন ইবরাহীম (আলাইহিস সালাম) ও তাঁর পরিবারবর্গের প্রতি। নিশ্চয়ই আপনি প্রশংসিত ও মহা সম্মানিত। হে আল্লাহ! মুহাম্মাদ (ﷺ) ও তাঁর পরিবারবর্গের উপর বরকত অবতীর্ণ করুন, যেভাবে আপনি বরকত অবতীর্ণ করেছেন ইবরাহীম (আলাইহিস সালাম) ও তাঁর পরিবার-পরিজনের প্রতি। নিশ্চয়ই আপনি মহা প্রশংসিত ও সম্মানিত’।[৮]

হে আল্লাহ! আপনি সন্তুষ্ট হোন খোলাফায়ে রাশেদিন, সঠিক পথের নেতাগণ : আবু বকর, উমর, উসমান ও আলীর প্রতি।

হে আল্লাহ! আপনি সন্তুষ্ট হোন সকল সাহাবির প্রতি, তাবেঈনদের প্রতি এবং যারা ক্বিয়ামত পর্যন্ত তাদের অনুসরণে উত্তমভাবে চলবে, তাদের প্রতি।

আর আমাদের প্রতিও দয়া করুন আপনার অনুগ্রহ, মহত্ব ও দয়ার মাধ্যমে, হে সর্বশ্রেষ্ঠ করুণাময়। হে আল্লাহ! আপনি ইসলাম ও মুসলিমদের সম্মানিত করুন। আপনার দ্বীনের সীমানা ও নিরাপত্তা রক্ষা করুন। এই দেশকে নিরাপদ, শান্তিপূর্ণ ও সমৃদ্ধ রাখুন এবং সব মুসলিম দেশের জন্যও একই প্রার্থনা রইলো, হে বিশ্বজগতের পালনকর্তা। হে আল্লাহ! আপনি আমাদের নেতা, দ্বীন ও দেশের অভিভাবক, দুই পবিত্র মসজিদের খাদেম এবং তাঁর ওয়ালিউল আহদের (ক্রাউন প্রিন্স) জন্য তাওফীক্ব ও সঠিক সিদ্ধান্ত দান করুন। তাদেরকে আমাদের জন্য, দেশ ও জাতির জন্য, ইসলাম ও মুসলমানদের জন্য উত্তম প্রতিদান দিন। হে আল্লাহ! আপনি আমাদের নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যদের সাহায্য করুন। হে আল্লাহ! আপনি আমাদের সীমান্তরক্ষী সৈন্যদের সাহায্য করুন, তাদের হেফাজত করুন এবং আপনার তত্ত্বাবধানে রাখুন। হে আল্লাহ! আপনি কষ্টগ্রস্তদের কষ্ট দূর করুন। সংকটাপন্নদের সংকট দূর করুন, ঋণগ্রস্তদের ঋণ পরিশোধে সহায়তা করুন। আমাদের এবং সকল মুসলমানদের রোগ মুক্ত করুন। মৃতদের রহম করুন। হে আল্লাহ! আপনি ফিলিস্তিনে এবং দুনিয়ার সব প্রান্তে নির্যাতিত মুসলমানদের সাহায্য করুন। তাদের প্রতিটি দুশ্চিন্তা থেকে মুক্তি দিন, প্রতিটি সংকট থেকে পরিত্রাণ দিন, প্রতিটি বিপদ থেকে নিরাপত্তা দিন। হে আল্লাহ! আহতদের সুস্থ করুন, তাদের রক্তপাত বন্ধ করুন, তাদের হৃদয় দৃঢ় করুন। আল-আক্বসা মসজিদকে রক্ষা করুন এবং ক্বিয়ামত পর্যন্ত তাকে সম্মানিত রাখুন।

হে আল্লাহর বান্দারা! আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা‘আলা ন্যায়বিচার, সদাচরণ এবং আত্মীয়স্বজনকে তাদের প্রাপ্য দেওয়ার নির্দেশ দেন। তিনি অশ্লীলতা, মন্দ কাজ ও সীমালঙ্ঘন নিষেধ করেন। তিনি তোমাদের উপদেশ দেন যাতে তোমরা উপকৃত হও। অতএব, তোমরা আল্লাহকে স্মরণ করো, মহান, শ্রেষ্ঠ, দয়ালু ও করুণাময় আল্লাহ তোমাদের স্মরণ করবেন। আর আল্লাহর স্মরণই সর্বশ্রেষ্ঠ। আল্লাহ জানেন তোমরা কী করছ।


তথ্যসূত্র :
[১]. ছহীহ বুখারী, হা/৬৪১২।
[২]. ইবনুল কাইয়্যিম, আল-ফাওয়াইদ, ১ম খণ্ড (বৈরূত : দারু ইবনি হাযম, ৪র্থ সংস্করণ, ২০১৯ হি.) পৃ. ৪৪।
[৩]. তিরমিযী, হা/২৩১৭; মুওয়াত্ত্বা মালেক, হা/৩৩৫২; মুসনাদে আহমাদ, হা/১৭৩৭।
[৪]. মুছান্নাফ ইবনু আবি শায়বাহ, হা/৩৭১৫০, ১৯তম খণ্ড, পৃ. ২৯৫।
[৫]. ইবনু মাজাহ, হা/৪২৪৫, সনদ ছহীহ।
[৬]. ছহীহ বুখারী, হা/৬১৩৯।
[৭]. ছহীহ মুসলিম, হা/২৬৬৪ ।
[৮]. ছহীহ বুখারী, হা/৩৩৭০; ছহীহ মুসলিম, হা/৪০৬; মুসতাদরাক হাকিম, হা/৪৭১০; তিরমিযী, হা/৪৮৩; নাসাঈ, হা/১২৮৭; ইবনু মাজাহ, হা/৯০৪; মিশকাত, হা/৯১৯।




প্রসঙ্গসমূহ »: খুত্ববাতুল হারামাইন
ক্রোধ সংবরণ করার গুরুত্ব - অনুবাদ : হারূনুর রশীদ ত্রিশালী আল-মাদানী
ফিতনার সময় রাসূূলুল্লাহ (ﷺ)-এর মানহাজ - অনুবাদ : হারূনুর রশীদ ত্রিশালী আল-মাদানী
তাক্বওয়া ও তার বহিঃপ্রকাশ - অনুবাদ : শায়খ মতিউর রহমান মাদানী
ছহীহ আক্বীদার গুরুত্ব - অনুবাদ : শায়খ মতিউর রহমান মাদানী
সদাচরণ-ই হচ্ছে দ্বীন - অনুবাদ : শায়খ মতিউর রহমান মাদানী
প্রিয় নবী (ﷺ)-এর প্রশংসনীয় গুণাবলী - অনুবাদ : শায়খ মতিউর রহমান মাদানী
সর্বত্রই আল্লাহকে ভয় করুন - অনুবাদ : হারূনুর রশীদ ত্রিশালী আল-মাদানী
কষ্টের পরেই সুখ আছে - অনুবাদ : হারূনুর রশীদ ত্রিশালী আল-মাদানী
প্রজ্ঞাপূর্ণ উপদেশসমূহ - অনুবাদ : শায়খ মতিউর রহমান মাদানী
দ্বীন মানেই হচ্ছে শুভকামনা - অনুবাদ : হারূনুর রশীদ ত্রিশালী আল-মাদানী
আল্লাহর অস্তিত্বে দৃঢ় বিশ্বাস পোষণ করা - অনুবাদ : হারূনুর রশীদ ত্রিশালী আল-মাদানী
আরাফাহর খুৎবাহ - অনুবাদ : ড. মুহাম্মাদ মানজুরে এলাহী

সর্বশেষ প্রবন্ধ

ফেসবুক পেজ