উত্তর : প্রয়োজনে আছরের পর ঘুমাতে পারে। কারণ আছরের পর ঘুমানোর ব্যাপারে প্রশংসা বা নিন্দা কোনটিই রাসূল (ﷺ) থেকে এবং ছাহাবায়ে কেরাম হ থেকেও এ বিষয়ে কোন ছহীহ বর্ণনা প্রমাণিত নয়। তবে এর নিন্দা সম্পর্কে অসংখ্য মনগড়া (জাল) হাদীছ সমাজে প্রচলিত আছে। যেমন, আছরের পর ঘুমানোর নিন্দা সম্পর্কে মানুষের মুখে মুখে একটি জাল হাদীছ প্রচলিত আছে- ‘যে ব্যক্তি আছরের পর ঘুমায়, তার বুদ্ধি-বিবেচনা নষ্ট হয়ে যায়, তখন সে যেন নিজেকেই দোষারোপ করে’। এর সনদে খালিদ ইবনুল কাসিম নামে মিথ্যুক বর্ণনাকারী আছে (সিলসিলাতুল হাদীছ আদ-যঈফাহ, ১/১১২ পৃ., হাদীছ নং-৩৯; আয-যু‘আফা ওয়াল মাজরূহীন, ১/২৮৩ পৃ.; আল-মাওযূ‘আত, ৩/৬৯ পৃ.)।
তবে সালাফদের অনেকেই আছরের পর ঘুমানো অপসন্দ করতেন। ছাহাবী খাওয়াত ইবনু জুবাইর (রাযিয়াল্লাহু আনহু) দিনের শেষভাগে (আছরের পর) ঘুমানোকে ‘হুমক’ বা নির্বুদ্ধিতা বা বোকামির কাজ বলে উল্লেখ করতেন। এছাড়া তাবিঈ মাকহূল (রাহিমাহুল্লাহ) আছরের পর ঘুমানো অপসন্দ করতেন এবং আশঙ্কা করতেন যে, এর ফলে মানুষের মধ্যে ওয়াসওয়াসা (কুমন্ত্রণা বা মানসিক অস্থিরতা) সৃষ্টি হতে পারে (মুছান্নাফ ইবনু আবী শাইবা, ৫/৩৩৯ পৃ.)। আর আল-মারওয়াযী (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন, ‘আমি ইমাম আহমাদ ইবনে হাম্বাল (রাহিমাহুল্লাহ)-কে একজন মানুষের জন্য আছরের পর ঘুমানো অপসন্দ করতে শুনেছি। তিনি তার বুদ্ধি-বিবেচনার উপর ক্ষতির আশঙ্কা করতেন’ (আল-আদাব আশ-শারইয়্যাহ, ৩/১৫৯; ত্বাবাকাতুল হানাবিলাহ, ১/২২ পৃ.)।
ইমাম ইবনুল ক্বাইয়িম (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন, ‘দিনের বেলায় অতিরিক্ত ঘুম স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর। এটি শরীরে আর্দ্রতাজনিত রোগ ও সর্দি-কাশির মত সমস্যা সৃষ্টি করে, চেহারার উজ্জ্বলতা নষ্ট করে, প্লীহা (spleen)-এর সমস্যা সৃষ্টি করে, স্নায়ুকে দুর্বল করে, অলসতা আনে এবং যৌনশক্তি দুর্বল করে। তবে গ্রীষ্মকালে দুপুরের প্রচণ্ড গরমের সময় (ক্বাইলুলাহ) ঘুম এর ব্যতিক্রম (যাদুল মা‘আদ, ৪/২১৯ পৃ.)। দিনের ঘুমের মধ্যে সবচেয়ে ক্ষতিকর হল- দিনের শুরুতে (সকালে) ঘুমানো। আর তার চেয়েও বেশি ক্ষতিকর হল- আছরের পর দিনের শেষভাগে ঘুমানো। তিনি আরও উল্লেখ করেন, আব্দুল্লাহ ইবনু আব্বাস (রাযিয়াল্লাহু আনহুমা) তাঁর এক পুত্রকে সকালবেলায় ঘুমাতে দেখে বলেছিলেন, ‘উঠে পড়! তুমি কি এমন সময় ঘুমাচ্ছ, যখন রিযিক্ব বণ্টন করা হয়?’ এরপর ইবনুল ক্বাইয়িম (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন, কিছু সালাফ বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি আছরের পর ঘুমায়, তার বুদ্ধি-বিবেচনা ক্ষতিগ্রস্ত হয়, তখন সে যেন নিজেকেই দোষারোপ করে’ (এ বিষয়ে আরও বিস্তারিত জানতে দেখুন- মাতালিবু উলিন নূহা, ১/৬২; গিযাউল আলবাব, ২/৩৫৮; কাশ্শাফুল কিনা‘, ১/৭৯; আল-আদাব আশ-শারইয়্যাহ (ইবন মুফলিহ), ৩/১৫৯; শারহু মা‘আনিল আছার, ১/৯৯ পৃ.)।
তবে আছরের পর ঘুমানো জায়েয। কারণ মূলনীতি হল- الأصل هو الإباحة ، ولم يرد النهي عنه في حديث صحيح ‘কোন বিষয়ের বৈধতা বহাল থাকবে যতক্ষণ না তার নিষেধাজ্ঞার ছহীহ প্রমাণ পাওয়া যায়’। আছরের পর ঘুমানোর নিষেধাজ্ঞা সম্পর্কে কোন ছহীহ হাদীছ বর্ণিত হয়নি। শারঈ বিধান ছহীহ হাদীছের ভিত্তিতে গ্রহণ করা হয়, দুর্বল হাদীছ, জাল হাদীছ বা মানুষের ব্যক্তিগত মতামতের ভিত্তিতে নয়।
শাইখ মুহাম্মাদ নাছিরুদ্দীন আলবানী (রাহিমাহুল্লাহ) মিশরের প্রসিদ্ধ ফক্বীহ লাইছ ইবনু সা‘দ-এর আছরের পর ঘুমানোর নিষেধাজ্ঞা অস্বীকার করার ঘটনা উল্লেখ করার পর বলেন, ‘লাইছের এই জবাবটি আমার খুবই ভালো লেগেছে। কারণ এটি তাঁর গভীর ফিক্বহ ও জ্ঞানের পরিচয় বহন করে। এতে আশ্চর্যের কিছু নেই, কেননা তিনি মুসলিমদের একজন ইমাম এবং সুপরিচিত ফক্বীহ ছিলেন। আমি জানি, বর্তমানে অনেক শাইখ আছেন যারা আছরের পর ঘুমানো থেকে বিরত থাকেন, যদিও তাদের এ ঘুমের প্রয়োজন থাকে। যখন তাদের বলা হয় যে, এ বিষয়ে বর্ণিত হাদীছটি দুর্বল, তখন তারা সঙ্গে সঙ্গে উত্তর দেন, ‘ফাযায়িলুল আ‘মল (সৎকর্মের ফযীলত) বিষয়ে দুর্বল হাদীছের উপর আমল করা যায়’ (সিলসিলাতুল আহাদীছ আদ-যঈফাহ, হা/৩৯)। সুতরাং লক্ষ্য করুন, সালাফদের ফিক্বহ ও পরবর্তীদের জ্ঞানের মধ্যে কত পার্থক্য!” সঊদী আরবের স্থায়ী ফাতাওয়া কমিটির আলিমগণ বলেন, ‘আছরের পর ঘুমানো এমন একটি অভ্যাস, যা কিছু মানুষ করে থাকে। এতে কোন অসুবিধা নেই। আর আছরের পর ঘুমানো থেকে নিষেধ করার ব্যাপারে যে হাদীছগুলো বর্ণিত হয়েছে, সেগুলো ছহীহ নয়’ (ফাতাওয়া আল-লাজনাহ আদ-দায়িমাহ, ২৬/১৪৮ পৃ.)। এ মতটিই অধিক গ্রহণযোগ্য মত। কারণ আছরের পর ঘুমানোর নিষেধাজ্ঞা সম্পর্কে নবী (ﷺ) থেকে কোন ছহীহ হাদীছ প্রমাণিত নয়।
প্রশ্নকারী : মুজাহিদ, গাইবান্ধা।