বিশ্বকাপ, না-কি ধর্মযুদ্ধ : প্রয়োজন মুসলিম চেতনার উন্মেষসাধন
মুসলিম বিশ্ব আজ বহুমাত্রিক সংকটে নিমজ্জিত। একদিকে রাজনৈতিক দুর্বলতা ও শিক্ষাগত পশ্চাৎপদতা, অন্যদিকে অর্থনৈতিক পরনির্ভরশীলতা, সাংস্কৃতিক বিভ্রান্তি এবং নৈতিক অবক্ষয় মুসলিম উম্মাহকে করেছে ক্ষতবিক্ষত। এর মৌলিক কারণ হল মুসলিমদের চেতনার সংকট। আর আবেগ বা অনুভূতিই কেবল চেতনা নয়; বরং মানুষের বিশ্বাস, চিন্তা, মূল্যবোধ, দায়িত্ববোধ এবং জীবনদর্শনের সমন্বিত রূপকে চেতনা বলে। একজন মুসলিমের চেতনার কেন্দ্রবিন্দু হওয়ার কথা তাওহীদ, আল্লাহভীতি, আখিরাতের জবাবদিহিতা, উম্মাহর কল্যাণ এবং মানবতার প্রতি দায়িত্বশীলতা। কিন্তু বাস্তবে এগুলো অনেক ক্ষেত্রেই বক্তব্যে, লেখনীতে, উপদেশের বাণীতে আর নীতিবাক্যে পরিণত হয়েছে। এর পরিবর্তে স্থান করে নিয়েছে ভোগবাদ, আত্মকেন্দ্রিকতা, অন্ধ অনুকরণ এবং ক্ষণস্থায়ী জাগতিক সাফল্যের মোহ। আর প্রবৃত্তি পূজার অবাধ স্বাধীনতা তো হৃদয়কে অন্ধকারাচ্ছন্ন করে ফেলেছে। যা সফলতার পথে বড় প্রতিবন্ধকতা।
বিশ্বব্যাপী বর্তমানে ফুটবল বিশ্বকাপ উন্মাদনায় আক্রান্ত। শিক্ষক, প্রফেসর, এমপি, মন্ত্রী, সচিব, ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার সহ দেশের প্রান্তিক পর্যায় থেকে শুরু করে সকল শ্রেণী-পেশার মানুষ এমনকি একশ্রেণীর তথাকথিত আলিম সমাজও বিশ্বকাপ উদ্দীপনায় উন্মত্ত। অথচ বর্তমানে বিশ্বকাপ শুধু একটি ক্রীড়া প্রতিযোগিতার নাম নয়; এটি পৃথিবীর অন্যতম বৃহৎ সাংস্কৃতিক, অর্থনৈতিক ও মানসিক ঘটনায় পরিণত হয়েছে। প্রতি চার বছর অন্তর একটি ফুটবল টুর্নামেন্টকে ঘিরে গোটা বিশ্বের কোটি কোটি মানুষ যে আবেগ-উচ্ছ্বাস, সময়, অর্থ ও মনোযোগ ব্যয় করে, তা আধুনিক সভ্যতার বস্তুবাদী মূল্যবোধের স্পষ্ট প্রতিচ্ছবি। প্রশ্ন হল- এই বিশ্বকাপ কি নিছক একটি খেলা, না-কি এর আড়ালে চলছে বিশ্বদর্শনের এক নীরব সংঘাত, যেখানে একদিকে রয়েছে বস্তুবাদ, ভোগবাদ ও সীমাহীন ব্যক্তিস্বাধীনতার দর্শন, অন্যদিকে রয়েছে ঈমান, নৈতিকতা, জবাবদিহিতা ও আল্লাহভীতির ওপর প্রতিষ্ঠিত ইসলামী জীবনব্যবস্থা?
চার বছর আগে কাতার এক ব্যতিক্রম বিশ্বকাপ আয়োজন করেছিল। বহু আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম স্বীকার করতে বাধ্য হয়েছিল যে, কাতার বিশ্বকাপ শুধু ফুটবলের নয়; এটি ইসলামী সংস্কৃতি, উন্নত আতিথেয়তা এবং মুসলিম পরিচয়েরও একটি বৈশ্বিক প্রদর্শনীতে রূপ নিয়েছিল। কুরআনের আয়াত ও হাদীছের প্রদর্শন, মসজিদ পরিচিতি, ইসলামের ওপর উন্মুক্ত আলোচনা, দাওয়াহ কার্যক্রম, প্রকাশ্য মদ্যপানের ওপর সীমাবদ্ধতা এবং সমকামিতা ও এলজিবিটিকিউের মত মহাপাপকে সম্পূর্ণরূপে নিষিদ্ধ করে পারিবারিক মূল্যবোধের প্রতি গুরুত্বারোপ-এসব বিষয় বিশ্বমঞ্চে নতুন আলোচনার জন্ম দিয়েছিল। অনেক অমুসলিম প্রথমবারের মত ইসলামের সৌন্দর্য, শালীনতা ও নৈতিকতার সঙ্গে পরিচিত হওয়ার সুযোগ পেয়েছিল। অনেক মানুষ ইসলামের ছায়াতলে আশ্রয়ও নিয়েছিল। যদিও বিশ্বকাপের মত আন্তর্জাতিক ইভেন্ট আয়োজন করার বিষয়টি ভিন্ন প্রসঙ্গ। পক্ষান্তরে এবারের বিশ্বকাপকে ঘিরে ভয়ংকর বাস্তবতা পরিলক্ষিত হচ্ছে। যা রীতিমত ক্রসেড বা ধর্মযুদ্ধ বললেও অত্যুক্তি হবে না। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের তথ্য মতে, পর্যটকদের জন্য ফ্রী কনডম বিতরণ, উন্মুক্ত রাত্রিজাপনের স্বাধীনতা, নারী-পুরুষের অবাধ মেলামেশা, মাদক ব্যবহারের ক্ষেত্রে শিথিলতা, জুয়া ও বেটিং শিল্পের ব্যাপক সম্প্রসারণ এবং ভোগবাদী বিনোদন সংস্কৃতির বিস্তৃত আয়োজনকে বিশ্বকাপের অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসাবে তুলে ধরা হচ্ছে। যা কাতারে আয়োজিত বিশ্বকাপের বিপরীতে পাশ্চাত্য রাষ্ট্রের নোংরা ও অনৈতিক চেতনার পক্ষে যুদ্ধ ঘোষণার শামিল। কাতার ইসলামের সৌন্দর্য ও দাওয়াহ সম্প্রসারণে বিশ্বকাপের বিভিন্ন ইভেন্ট তৈরি করেছে। পক্ষান্তরে যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও মেক্সিকো কর্তৃক আয়োজিত এবারের বিশ্বকাপে বস্তুবাদ, ভোগবাদ ও প্রবৃত্তি পূজার ছড়াছড়ি। একদিকে নীতি-নৈতিকতার প্রচার অন্যদিকে অশ্লীলতা ও নোংরামির প্রচার। যা ধর্মযুদ্ধেরই নতুন সংস্করণ!
আধুনিক বিশ্বে সবচেয়ে বড় সংকট হল নৈতিক ও আত্মিক সংকটের। ফলে বিশ্বকাপ একদিকে যেমন বৃহত্তর সাংস্কৃতিক অংশে পরিণত হচ্ছে, তেমনি মানুষকে বিনোদনের মাধ্যমে এমন এক জীবনদর্শনের দিকে ঠেলে দিচ্ছে, যার কেন্দ্রে আল্লাহ নয়, প্রবৃত্তি; যার ভিত্তি তাক্বওয়া নয়, ভোগবাদিতা; যার লক্ষ্য আখিরাত নয়, তাৎক্ষণিক আনন্দ। এই খেলাকে কেন্দ্র করে বিশ্বব্যাপী জুয়াশিল্প শত শত বিলিয়ন ডলারের বাজারে পরিণত হয়েছে। লক্ষ লক্ষ তরুণ অর্থনৈতিক ক্ষতি, আসক্তি এবং পারিবারিক সংকটে পতিত হচ্ছে। একইভাবে মাদক, যৌন স্বাধীনতা এবং তারকাপূজার সংস্কৃতি এমনভাবে উপস্থাপন করা হচ্ছে যেন এগুলো আধুনিকতার অপরিহার্য অংশ। অথচ ইসলামের দৃষ্টিতে এগুলো মানুষের ব্যক্তি, পরিবার এবং সমাজ ধ্বংসের মূল হাতিয়ার। কেননা ঘণ্টার পর ঘণ্টা ফুটবল ম্যাচ একজন মানুষকে তার প্রকৃত পরিচয় ভুলিয়ে দেয়। যখন একজন মুসলিম খেলোয়াড়দের পরিসংখ্যান, নাম ও পরিচয় মুখস্থ রাখে, কিন্তু নিজের দ্বীনের মৌলিক জ্ঞান জানে না; যখন একটি গোলের আনন্দে উল্লাসে ফেটে পড়ে, কিন্তু ফজরের ছালাতে উপস্থিত হতে কষ্ট অনুভব করে; যখন বিদেশি তারকাদের প্রতি আনুগত্য জন্ম নেয়, অথচ উম্মাহর দুঃখ-কষ্ট তাকে স্পর্শ করে না- তখন বুঝার আর বাকি থাকে না যে, সংকটটি খেলার নয়, চেতনার।
আফসোসের বিষয় হল- প্রাকটিসিং অনেক মুসলিমও এমন কথা বলছে যে, ধর্মের সাথে ফুটবল বিনোদনকে মিলানো ঠিক হবে না! বস্তুবাদ আর প্রবৃত্তি পূজা আজকের মুসলিম যুবকদের মানসিকতা কোন্ লেবেলে পৌছেছে এই একটি তার প্রমাণ। পরিস্থিতি এমন পর্যায় দাঁড়িয়েছে যে, আজকের মুসলিম সমাজ ঈমানের উপর প্রবৃত্তিকে, কুরআনের উপর বিনোদনকে এবং আখিরাতের উপর দুনিয়াকে প্রাধান্য দিচ্ছে। ফলে খেল-তামাশা ও বিনোদনে লক্ষ মানুষের সমাগম পক্ষান্তরে দ্বীনি কাজে সেই তুলনায় মানুষের উপস্থিতি নেই বললেই চলে। হতভাগা মুসলিম জাতির কী এক করুণ পরিণতি!
পরিশেষে বলতে চাই, মুমিনগণ প্রতিযোগিতা করে আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের, খেল-তামাশা কিংবা বিনোদনের নয়। যার পুরস্কার কোন সোনার ট্রফি নয়; বরং এমন জান্নাত, যার প্রশস্ততা আসমান ও যমীনের সমান। অতএব হে মুসলিম তরুণ-নওজোয়ান! তুমি কি উন্নত চেতনা বিকিয়ে দিয়ে ক্ষণস্থায়ী উল্লাস ও বিশ্বকাপ উত্তেজনার দর্শক হবে, না-কি ঈমান, জ্ঞান ও তাক্বওয়ার আলোকে নিজেদের এবং আগামী প্রজন্মকে রক্ষা করার সংগ্রামে অবতীর্ণ হব? ভিনদেশী সংস্কৃতির উন্মাদনায় হারিয়ে যাবে, না-কি মুসলিম সংস্কৃতির রক্ষার আন্দোলন করবে? অতএব আসুন! চেতনার সংকটকে উপলব্ধি করি এবং মুসলিম চেতনার উন্মেষসাধনে আত্মনিয়োগ করি। মহান আল্লাহ সহায় হোন-আমীন!!
رَبَّنَا تَقَبَّلۡ مِنَّا اِنَّکَ اَنۡتَ السَّیۡعُ الۡعَلِیۡمُ
প্রসঙ্গসমূহ »:
সম্পাদকীয়