শনিবার, ০৭ মার্চ ২০২৬, ০১:০৫ অপরাহ্ন

ছাত্র সংসদ নির্বাচন : শিক্ষাবান্ধব, না-কি শিক্ষাকে রাজনীতিকরণের দুরভিসন্ধি?


শিক্ষাঙ্গন জাতির মেধা ও মননের উৎস। বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজসমূহ মূলত নৈতিকতা, জ্ঞানচর্চা ও গবেষণার কেন্দ্র। কিন্তু দুঃখজনকভাবে আজ সেই শিক্ষাঙ্গনই রাজনৈতিক স্বার্থসিদ্ধির মাঠে পরিণত হয়েছে। বিশেষ করে সাম্প্রতিক সময়ে ‘ছাত্র সংসদ’ নির্বাচনকে ঘিরে শিক্ষাঙ্গন জুড়ে উত্তেজনা, সহিংসতা, বিভাজন, হিংসা-বিদ্বেষ, সন্ত্রাস এবং দলীয় দখলদারিত্বের যে প্রতিযোগিতার আবহ পরিলক্ষিত হচ্ছে, তা একদিকে যেমন শিক্ষাবান্ধব নয় বরং শিক্ষাকে রাজনীতিকরণের গভীর দুরভিসন্ধি বলেই মনে হয়; অন্যদিকে শিক্ষাব্যবস্থার মূল চেতনাকেই প্রশ্নবিদ্ধ করে তুলেছে।

উপমহাদেশের প্রেক্ষাপটে একসময় ছাত্ররাজনীতি ছিল স্বাধীনতা আন্দোলন ও সামাজিক ন্যায় প্রতিষ্ঠার শক্তিশালী বাহন। শিক্ষার্থীরা নেতৃত্ব দিয়েছিল ভাষা আন্দোলনে, মুক্তিযুদ্ধে ও স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলনে। কিন্তু সেই ছাত্ররাজনীতি আজ রূপ নিয়েছে ক্ষমতার দখল, অর্থনৈতিক স্বার্থ এবং রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতার প্রতিযোগিতায়। বিশ্ববিদ্যালয়ের হলগুলো পরিণত হয়েছে দলীয় ঘাঁটিতে, গ্রন্থাগার ও গবেষণাগার পরিণত হয়েছে পোস্টার টানানোর দেয়ালে, আর ছাত্রসংগঠনগুলোর অগ্রাধিকার হয়ে উঠেছে ‘দলীয় আনুগত্য’Ñ জ্ঞানচর্চা নয়। ইসলামী দৃষ্টিকোণ থেকে শিক্ষাঙ্গন হল, ‘বাইতুল হিকমাহ’Ñ জ্ঞানের ঘর, আলোকপ্রদীপের মসজিদ। কুরআনে আল্লাহ তা‘আলা বলেন, ‘আল্লাহ তা‘আলা তোমাদের মধ্যে যারা ঈমান এনেছে এবং যাদেরকে জ্ঞান দান করা হয়েছে, তাদের মর্যাদা বাড়িয়ে দেন’ (সূরা আল-মুজাদালাহ : ১১)। এই আয়াত শিক্ষাঙ্গনের মূল উদ্দেশ্য স্পষ্ট করে দেয়Ñ জ্ঞান, চরিত্র ও দায়িত্ববোধের বিকাশ। কিন্তু বাস্তবতা হলো, ছাত্র সংসদ নির্বাচন অনেক সময় এই উদ্দেশ্যকে বিকৃত করে রাজনৈতিক ক্ষমতার খেলায় পরিণত করছে। শিক্ষাঙ্গনের রূঢ় বাস্তবতা হলো, সেখানে মতের অমিল মানেই শত্রুতা এবং নির্বাচনী প্রচারণার নামে ঘটে হিংসা, দখলদারিত্ব ও প্রাণহানি। এ অবস্থা শুধু ইসলামী নৈতিকতা বিরোধী নয়, বরং শিক্ষার মৌলিক চেতনারও পরিপন্থী। অথচ ইসলামের দ্ব্যর্থহীন ঘোষণা হলোÑ নবী করীম (ﷺ) বলেছেন, ‘সত্যিকার মুসলিম সেই ব্যক্তি, যার হাত ও জবান থেকে অন্য মুসলিম নিরাপদ থাকে’ (ছহীহ বুখারী, হা/১০)। সুতরাং ক্যাম্পাসে যদি রাজনৈতিক সংঘর্ষ, চাঁদাবাজি ও ভয়-ভীতি গভীর হয়, তাহলে এই হাদীছের বাস্তবায়ন ব্যাহত হচ্ছে। শিক্ষাঙ্গন যেখানে তরুণ মন গড়ে ওঠা উচিত, সেখানে হুমকি-ভীতি, সন্ত্রাস, দলীয় দখলদারিত্ব ও  সহিংসতা প্রবণতা এক ভয়াবহ অশনি সংকেত।

স্মর্তব্য, শিক্ষার লক্ষ্য শুধু চাকরি পাওয়া নয়, বরং একটি জ্ঞাননির্ভর ও নৈতিকতা সম্পন্ন উন্নত সমাজ গঠন। কিন্তু যখন শিক্ষাঙ্গনে রাজনীতির অনুপ্রবেশ ঘটে দলীয় স্বার্থে, তখন শিক্ষা পরিণত হয় বিভাজনের শিকড়ে। ছাত্র সংসদ নির্বাচন তখন আর থাকে না শিক্ষার্থীদের কল্যাণে, বরং তা হয়ে দাঁড়ায় রাজনৈতিক দলগুলোর প্রভাব বিস্তারের ক্ষেত্র। নবী করীম ধ নেতৃত্ব সম্পর্কে সতর্ক করে বলেছেন, ‘যখন আমানত (দায়িত্ব) নষ্ট করা হবে, তখন ক্বিয়ামতের অপেক্ষা কর’ (ছহীহ বুখারী, হা/৬৪৯৬)। ছাত্ররাজনীতিতে এই আমানতের চেতনা ক্রমশ হারিয়ে যাচ্ছে। ক্ষমতা ও প্রভাবের লড়াইয়ে ন্যায়ের জায়গা দখল করছে অনৈতিকতা। ক্যাম্পাসে দলীয় আনুগত্য হয়ে দাঁড়িয়েছে যোগ্যতার মানদণ্ড। এ বাস্তবতা ইসলামী আদর্শ পরিপন্থী, যেখানে নেতৃত্বকে আমানত এবং দায়িত্ব হিসাবে দেখা হয়, সুযোগ বা পদমর্যাদা হিসাবে নয়। আল্লাহ তা‘আলা স্পষ্টভাবে বলেছেন, ‘আল্লাহ তোমাদের আদেশ দেন যে, তোমরা আমানত (নেতৃত্ব) তাদেরই নিকট দাও, যারা তার উপযুক্ত’ (সূরা আন-নিসা : ৫৮)। এ আয়াতের ভিত্তিতে বলা যায় যে, বর্তমান প্রেক্ষাপটে ছাত্ররাজনীতির নেতৃত্ব নির্বাচন প্রক্রিয়ায় আমানতের মূল চেতনা প্রতিফলিত হচ্ছে না। বরং এটি হয়ে উঠছে স্বার্থান্ধ নেতৃত্ব তৈরির কারখানা, যা ভবিষ্যতে জাতির রাজনীতি ও প্রশাসনে অযোগ্য নেতৃত্বের জন্ম দেয়।

ছাত্র সংসদের মৌলিক উদ্দেশ্য হলÑ এটি তরুণ নেতৃত্ব গড়ে তোলে। কিন্তু বাস্তবতা হলÑ অধিকাংশ ক্ষেত্রেই এই নেতৃত্ব গঠিত হয় রাজনৈতিক দলের ছায়াতলে, যোগ্যতা নয় বরং আনুগত্যের ভিত্তিতে। ফলে জন্ম নেয় এক বিকৃত সংস্কৃতি, যেখানে নীতি নয়, বরং ‘দলের চাহিদা’ই সাফল্যের মাপকাঠি। অথচ ইসলামে ছাত্ররাজনীতি পুরোপুরি নিষিদ্ধ নয়। কেননা ইসলামী রাষ্ট্র ও সমাজ গঠনে তরুণ প্রজন্মের ভূমিকা ছিল অনন্য ও অপরিসীম। নবী করীম (ﷺ)-এর যুগে যে রাজনৈতিক সচেতনতা, ন্যায়ভিত্তিক প্রশাসন ও নেতৃত্বের আদর্শ প্রতিষ্ঠিত হয়েছিলÑ তার মূল চালিকাশক্তি ছিলেন নবীন ছাহাবীগণ। তাদের রাজনৈতিক প্রজ্ঞা, নেতৃত্বগুণ, আনুগত্য, ন্যায়বোধ ও আত্মত্যাগ পরবর্তী প্রজন্মের জন্য হয়ে আছে চিরন্তন শিক্ষার উৎস। নবী করীম (ﷺ) তরুণ ছাহাবীদের মাঝে নেতৃত্বের উপযুক্ততা দেখে তাদেরকে গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক দায়িত্বে নিযুক্ত করেছিলেন। যেমনÑ মুছ‘আব ইবনু উমায়র (রাযিয়াল্লাহু আনহু) ছিলেন ইসলামের প্রথম রাজনৈতিক প্রতিনিধি। তিনি কূটনীতি, দাওয়াহ ও সামাজিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে অসাধারণ ভূমিকা রাখেন (সীরাহ ইবনু হিশাম, ২/২৮১-২৮২)। উসামা ইবনু যায়েদ (রাযিয়াল্লাহু আনহু) সর্বকনিষ্ঠ সেনাপতি ও রাজনৈতিক প্রতিনিধি। রাসূল (ﷺ) মৃত্যুশয্যায় থাকা অবস্থায় তাঁকে রোমান সীমান্তে সেনাবাহিনীর সর্বাধিনায়ক নিযুক্ত করেন। বয়স তখন মাত্র ১৮-২০ বছর (সুবুলুল হুদা ওয়ার রাশাদ, ১২/২৪১)। এটি প্রমাণ করে যে, ইসলামে বয়স নয় বরং যোগ্যতা, আমানত ও নেতৃত্বগুণই রাজনৈতিক দায়িত্বের মাপকাঠি। আলী (রাযিয়াল্লাহু আনহু) তরুণ বয়সে শাসন ও বিচার প্রশাসনের দায়িত্বে ছিলেন। খাইবার বিজয়, হিজরতের রাতের আত্মত্যাগ এবং নবী (ﷺ)-এর দাওয়াতী ও প্রশাসনিক কাজসমূহে অংশগ্রহণÑ সবই তাঁর রাজনৈতিক প্রজ্ঞার পরিচায়ক। খুলাফায়ে রাশেদীন তরুণ ছাহাবীদের রাষ্ট্রীয় প্রশাসনে নিয়োগের মাধ্যমে তাদের রাজনৈতিক যোগ্যতাকে বাস্তব রূপ দেন। উমর ইবনুল খাত্তাব (রাযিয়াল্লাহু আনহু) তরুণদের নীতি-নির্ধারণী পদে স্থান দিয়েছিলেন। যেমন, আব্দুল্লাহ ইবনু আব্বাস, আব্দুল্লাহ ইবনুল আমর প্রমুখকে উপদেষ্টা পরিষদে যুক্ত করেন। উল্লেখ্য, মুছ‘আব ইবনু উমায়ের (রাযিয়াল্লাহু আনহু) সহ ছাহাবীগণ যুবক বয়সে দাওয়াহর নেতৃত্বে ছিলেন, কিন্তু তাদের লক্ষ্য ছিল শিক্ষা ও মানবিক উন্নয়ন, দলীয় আধিপত্য নয়।

শিক্ষাঙ্গনে প্রয়োজন ইসলামী চেতনায় উদ্বুদ্ধ এক নতুন ছাত্ররাজনীতিÑ যেখানে থাকবে জ্ঞানচর্চা, সততা, নেতৃত্ব, ও নৈতিকতার প্রশিক্ষণ। শিক্ষা প্রতিষ্ঠান হবে আদর্শ মানুষ গড়ার ক্ষেত্র, রাজনীতির দখলদারিত্বের যুদ্ধক্ষেত্র নয়। আমরা চাই এমন এক ছাত্র সংসদ নির্বাচন, যা হবে ন্যায্য, স্বচ্ছ ও নৈতিক নেতৃত্ব গঠনের কেন্দ্র। যেখানে প্রতিযোগিতা হবে চিন্তা, নীতি ও সেবারÑ সংঘর্ষ নয়। যেখানে ছাত্রনেতারা হবে সেবক, শাসক নয়। ইসলামী শিক্ষাব্যবস্থা আমাদের শিক্ষা দেয়Ñ নেতৃত্ব চাওয়া নয়, বরং দায়িত্ব নেয়া; ক্ষমতার লোভ নয়, বরং জবাবদিহিতার ভয়। তাই ইসলামী সমাজে ছাত্ররাজনীতি তখনই কল্যাণকর, যখন তা ইসলামী মূল্যবোধের আলোকে পরিচালিত হয়। অন্যথা এটি হয়ে ওঠে শিক্ষাকে রাজনীতিকরণের দুরভিসন্ধি, যা জাতির ভবিষ্যৎকে বিপন্ন করে তোলে।

পরিশেষে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নিকট আহ্বান হলÑ শিক্ষাঙ্গনের শিক্ষা প্রশাসন, শিক্ষক, অভিভাবক ও রাষ্ট্রীয় নেতৃত্ব একসাথে কাজ করে এমন একটি পরিবেশ গড়ে তুলুন, যেখানে শিক্ষা হবে নৈতিক, নেতৃত্ব হবে সেবামূলক, আর রাজনীতি হবে ইনসাফ ও জ্ঞানের আলোকিত মঞ্চ। মহান আল্লাহ তরুণ প্রজন্মকে হিদায়াত দান করুন, তারা যেন জ্ঞান ও ন্যায়ের ভিত্তিতে নেতৃত্বের যোগ্যতা অর্জন করতে পারে। মহান আল্লাহ আমাদের সবাইকে শিক্ষা, ন্যায় ও শান্তির পথে পরিচালিত করুন। আমীন!




প্রসঙ্গসমূহ »: সম্পাদকীয়
দুর্নীতি : সমাজ বিধ্বংসী মারণাস্ত্র - সম্পাদকীয়
উত্তপ্ত রাজনীতি ও রামাযানের আহ্বান - সম্পাদকীয়
সাম্রাজ্যবাদী ষড়যন্ত্র: বাস্তবতা ও পরামর্শ - সম্পাদকীয়
অসুস্থ রাজনীতি ও তার কুপ্রভাব - সম্পাদকীয়
মধ্যপ্রাচ্যে আমেরিকার পরাজয় : - সম্পাদকীয়
যুদ্ধ বিধ্বস্ত পৃথিবী: কূটনৈতিক বিজয়, না-কি আদর্শের পরাজয় - সম্পাদকীয়
প্রচলিত রাজনীতি ও মানবতার করুণ পরিণতি - ড. মুযাফফর বিন মুহসিন
পাশ্চাত্য দর্শন: সমাজ বিপ্লবের পথে চরম অন্তরায়! - সম্পাদকীয়
বাবরি মসজিদের রায় : ইতিহাসের জঘন্য অধ্যায় - সম্পাদকীয়
সালাফী মানহাজ : পরিচিতি ও অনুসরণের আবশ্যকতা - সম্পাদকীয়
সমকামিতার ভয়ঙ্কর পরিণতি - সম্পাদকীয়
তাওহীদ সম্পর্কে জানা আবশ্যক কেন? - সম্পাদকীয়

সর্বশেষ প্রবন্ধ

ফেসবুক পেজ