শনিবার, ০৭ মার্চ ২০২৬, ১০:৪৮ পূর্বাহ্ন

উত্তপ্ত রাজনীতি ও রামাযানের আহ্বান


সময়ের বাস্তবতা অস্বীকার করার উপায় নেই। দেশজুড়ে রাজনীতির জোয়ার, বক্তব্য, পাল্টা বক্তব্য, সমালোচনা, প্রতিসমালোচনায় উত্তপ্ত জনপরিসর। প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিক মিডিয়া থেকে শুরু করে রাস্তাঘাট, চায়ের দোকান, মসজিদের আঙিনা থেকে পারিবারিক বৈঠক, সবখানেই রাজনীতির আলোচনা। এই উত্তাল পরিবেশেই আমাদের সামনে উপস্থিত হচ্ছে আত্মশুদ্ধি, সংযম ও তাক্বওয়ার মাস পবিত্র রামাযান। এই দুই বাস্তবতার সংযোগস্থলে দাঁড়িয়ে একটি মৌলিক প্রশ্ন আমাদের সামনে এসে দাঁড়ায়- রাজনৈতিক উত্তাপের ভেতরেও কি আমরা রামাযানের নৈতিক শিক্ষা ধারণ করতে পারছি?

রাজনীতি মানুষের সামাজিক জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ। রাজনীতি মানুষের অধিকার, দায়িত্ব ও সমাজব্যবস্থার সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। ইসলাম কখনোই সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন কোন জীবনব্যবস্থা নয়। ইসলাম একটি পরিপূর্ণ জীবনব্যবস্থা। মানুষের ব্যক্তিগত, পারিবারিক, সামাজিক, অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক, সামরিক, নৈতিক ও আধ্যাত্মিকসহ জীবনের সব দিকের জন্য সুস্পষ্ট দিকনির্দেশনা প্রদান করে ইসলাম। অর্থাৎ মানুষের জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত কোন ক্ষেত্রই ইসলামের নির্দেশনার বাইরে নয়। ন্যায়বিচার, আমানতদারিতা, সত্যবাদিতা, এসব ইসলামের মৌলিক শিক্ষা, যা রাজনীতিতেও অপরিহার্য। ইসলাম রাজনীতিবিমুখ কোন ধর্ম নয়; বরং ন্যায়, ইনসাফ ও আমানতের উপর প্রতিষ্ঠিত একটি পূর্ণাঙ্গ জীবনব্যবস্থা। মহান আল্লাহ বলেন, ‘নিশ্চয় আল্লাহ তোমাদেরকে আদেশ দিচ্ছেন আমানতসমূহ তার হক্বদারদের কাছে পৌঁছে দিতে। আর যখন মানুষের মধ্যে ফায়সালা করবে তখন ন্যায়ভিত্তিক ফায়সালা করবে’ (সূরা আন-নিসা : ৫৮)। এই আয়াত আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয়, ক্ষমতা, নেতৃত্ব ও সিদ্ধান্ত গ্রহণে নৈতিকতা ও ন্যায়বোধ অপরিহার্য। কিন্তু দুঃখজনক বাস্তবতা হল, রাজনীতির উত্তাপে আমরা অনেক সময় এই নৈতিক সীমারেখা অতিক্রম করে ফেলি। হত্যা, গুম, খুন, হামলা, মামলা, চাঁদাবাজি, দুর্নীতি, গালাগালি, অপবাদ, মিথ্যাচার, চরিত্রহনন এসব যেন রাজনৈতিক সংস্কৃতির অংশ হয়ে উঠছে।

পক্ষান্তরে রামাযান আমাদের শেখায় সম্পূর্ণ বিপরীত শিক্ষা। রামাযান কেবল পানাহার থেকে বিরত থাকার নাম নয়; বরং জিহ্বা, দৃষ্টি, চিন্তা ও আচরণকে সংযত করার মাস। রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি মিথ্যা কথা ও তার ওপর আমল করা পরিত্যাগ করে না, তার পানাহার বর্জনে আল্লাহর কোন প্রয়োজন নেই’ (ছহীহ বুখারী, হা/১৯০৩)। এই হাদীছ আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয়, নৈতিকতা ছাড়া ইবাদতও তার প্রকৃত উদ্দেশ্য হারায়। রাজনৈতিক মতভেদ থাকবে, এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু মতভেদ আর বিদ্বেষ এক নয়। ভিন্নমত থাকা সত্ত্বেও শালীনতা, সহনশীলতা ও ন্যায়বোধ বজায় রাখা ইসলামের শিক্ষা। রামাযান আমাদের সেই চরিত্র গঠনের সুযোগ এনে দেয়, যেখানে আমরা প্রতিপক্ষকে শত্রু নয়, বরং ভিন্নমতাবলম্বী মানুষ হিসাবে দেখতে শিখি। এক্ষেত্রে বড় প্রয়োজন আত্মসমালোচনার। আমরা কি রাজনৈতিক অবস্থান নিতে গিয়ে আমাদের ঈমানি দায়িত্ব ভুলে যাচ্ছি? আমরা কি দলীয় আনুগত্যকে সত্য ও ন্যায়ের ওপরে স্থান দিচ্ছি? রামাযান আসছে এই প্রশ্নগুলোর মুখোমুখি দাঁড় করানোর জন্যই। এই পবিত্র মাস আমাদের আহ্বান জানায়, ব্যক্তিগত ও সামষ্টিক জীবনে নৈতিকতার পুনর্জাগরণ ঘটাতে। রাজনীতি হোক মানুষের কল্যাণের মাধ্যম, বিভাজনের হাতিয়ার নয়। বক্তব্য হোক যুক্তিনির্ভর, ভাষা হোক সংযত, উদ্দেশ্য হোক আল্লাহর সন্তুষ্টি। শেষ পর্যন্ত মনে রাখতে হবে, রাজনীতি সময়ের প্রয়োজন, কিন্তু নৈতিকতা চিরন্তন দায়িত্ব। আর রামাযান সেই দায়িত্ব নতুন করে স্মরণ করিয়ে দেয়ার এক অনন্য সুযোগ। এই রামাযান হোক আমাদের জন্য আত্মশুদ্ধির মাস, যেখানে আমরা উত্তেজনার বদলে সংযম, বিদ্বেষের বদলে ন্যায় এবং বিভেদের বদলে দায়িত্বশীলতার পথে ফিরে আসি।

রামাযান হলো আত্মসংযমের মাস। এটি যেমন তাক্বওয়া ও সংযম লাভের মাধ্যম, তেমনি ব্যক্তির পরিশুদ্ধ আচার-আচরণ ও তার উন্নত জীবনেরও চূড়ান্ত ঠিকানা। রামাযানের ছিয়াম মানব সত্তাকে গঠন করে, ক্বিয়াম ব্যক্তিত্বকে উজ্জ্বল করে এবং কুরআন আত্মার সততা ও নিষ্কলুষতা আনয়ন করে। রামাযান বরকত, মাগফিরাত ও নাজাতের মাস। ইবাদতের মূল উৎস ও সুবর্ণ মৌসুম। এই মাসেই নাযিল হয়েছে মানবতার চূড়ান্ত সংবিধান আল-কুরআন। যার কারণে ইসলাম পেয়েছে সর্বশ্রেষ্ঠ মর্যাদায় অভিষিক্ত। যে কিতাবের দিক-দিগন্তে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে অসংখ্য মর্যাদা লাভের অফুরন্ত সুযোগ। এ মাসের আগমনে আসমান, রহমত ও জান্নাতের দরজাসমূহ খুলে দেয়া হয়, জাহান্নামের দরজাসমূহ বন্ধ করা হয়, শয়তানদের বেড়ি পরানো হয়। সুতরাং বরকত, অনুগ্রহ ও জান্নাত লাভের প্রত্যাশায় এবং জাহান্নাম থেকে দূরে থাকার অভিপ্রায়ে প্রত্যেক মুসলিমের স্বীয় প্রবৃত্তিকে শিকলবদ্ধ করা ব্যতীত রামাযানে সফলতার বিকল্প কোন পথ-ঘাট নেই। এ মাস তাদের জন্য প্রতিদান ও প্রতিযোগিতার ময়দান, যারা এর মর্যাদা অনুভব করেছে। এটি তাদের জন্য আলো ছড়ানোর উৎস, যারা এর রহস্য অনুধাবন করেছে। এটি মুক্তির মৌসুম তাদের জন্য, যারা তাদের উদ্দেশ্যকে খালিছ করেছে। এছাড়া তাদের জন্য এটি ঈমানের উদ্যান, যাদের অন্তর পবিত্র ও চিন্তা আলোকিত। অতএব হৃদয়কে নির্মল ও প্রশান্ত করে এবং আত্মাকে স্বচ্ছ ও সজীব করে রামাযানের প্রস্তুতি ও নানাবিধ কর্মসূচী গ্রহণ করতে হবে। দিনের বেলা ছিয়াম এবং রাতের ক্বিয়ামের সাথে সাথে মাসব্যাপী দু‘আ, যিকর, কুরআন তেলাওয়াত, রাতের ইবাদত, আল্লাহর দিকে অগ্রগামী হয়ে ও পাপ কাজ পরিত্যাগ করে, গুনাহর জন্য ক্ষমা চাওয়া, বেশি বেশি দান-ছাদাক্বাহ করার মাধ্যমে, কামনা-বাসনা নিয়ন্ত্রণ করে, প্রবৃত্তির লাগাম টেনে এবং জিহ্বাকে সংযত করে আত্মশুদ্ধির বন্দোবস্ত করতে হবে।

রামাযানের আগমন ঘটছে। অতএব হে মুসলিম! ফিরে আসুন পরম করুণাময় আল্লাহর দিকে এবং নবীর প্রদর্শিত পথে। ছিয়ামের এই মাসকে গনীমত হিসাবে গ্রহণ করুন এবং জান্নাতের পথে দ্রুত গতিতে চলার প্রচেষ্টা করুন। মহান আল্লাহ আমাদেরকে আসন্ন রামাযানে আত্মশুদ্ধির মাধ্যমে উত্তপ্ত রাজনীতিকে স্থায়ী নৈতিকতার চাদরে মাড়িয়ে দিনে এবং জান্নাতুল ফেরদাঊসের জন্য কবুল করুন-আমীন!!


رَبَّنَا تَقَبَّلۡ مِنَّا اِنَّکَ اَنۡتَ السَّیۡعُ الۡعَلِیۡمُ





উত্তম চরিত্রের দুর্ভিক্ষ ও পরিত্রাণের উপায় - ফাতাওয়া বোর্ড, মাসিক আল-ইখলাছ
ইসলামের দৃষ্টিতে ছবি, মূর্তি ও ভাস্কর্য - সম্পাদকীয়
প্রতারণার পরিণাম - সম্পাদকীয়
রামাযান থেকে আমরা কী শিক্ষা নিব? - সম্পাদকীয়
ত্বাগূতী রাজনীতি অভিশাপ ও করুণ পরিণতি - ড. মুযাফফর বিন মুহসিন
আলেমের মর্যাদা - সম্পাদকীয়
খ্রিষ্টান মিশনারী : হুমকির মুখে ইসলাম ও বাংলাদেশ - সম্পাদকীয়
মুনাফিক্বী আচরণ : দ্বীনদারিতার মুখোশে কুফরী চর্চা - সম্পাদকীয়
যুদ্ধ বিধ্বস্ত পৃথিবী: কূটনৈতিক বিজয়, না-কি আদর্শের পরাজয় - সম্পাদকীয়
পাশ্চাত্য দর্শন: সমাজ বিপ্লবের পথে চরম অন্তরায়! - সম্পাদকীয়
অসুস্থ রাজনীতি ও তার কুপ্রভাব - সম্পাদকীয়
শৃঙ্খলাপূর্ণ উন্নত সমাজ কাঠামো কাম্য - সম্পাদকীয়

সর্বশেষ প্রবন্ধ

ফেসবুক পেজ