বুধবার, ২২ Jul ২০২৬, ১০:৩১ অপরাহ্ন

শী‘আ মতবাদের স্বরূপ ও তাদের বিভ্রান্তি

- মূল : শায়খ মুহাম্মাদ আব্দুস সাত্তার আত-তূনসাবী
- অনুবাদ : ড. মো: আমিনুল ইসলাম*



ভূমিকা

দ্বীনের ক্ষেত্রে ঈমানের জন্য সবচেয়ে বেশী ক্ষতিকর ও বিশৃঙ্খলা সৃষ্টিকারী অন্যতম মন্দ কাজ হল রাফেযী শী‘আদের ফিতনা। তাদের ধারণা হল- শী‘আ মাযহাব ও আহলে সুন্নাত ওয়াল জামা‘আতের মধ্যে বড় ধরনের কোন পার্থক্য নেই। বরং বিরোধ হল বিভিন্ন বিষয়ের শাখা-প্রশাখায়। তাও অতি সামান্য। অথচ আহলে সুন্নাত ওয়াল জামা‘আত ও শী‘আদের মধ্যকার বিরোধটি মৌলিক এবং আক্বীদাগত। শী‘আদের আক্বীদা এতই জঘন্য যে, তার অনুসারী ব্যক্তি মুসলিম মিল্লাত থেকে খারিজ হয়ে যায়। এমনকি সাধারণ শী‘আদের অধিকাংশই শী‘আদের ভ্রান্ত আক্বীদা সম্পর্কে জানে না। কারণ যেসব মৌলিক আক্বীদার উপর শী‘আ মাযহাব নির্ভরশীল, সেগুলো সাধারণ জনসমক্ষে প্রকাশ করে না। তাছাড়া আহলে সুন্নাত ওয়াল জামা‘আতের সাধারণ অনুসারীদেরও এই মারাত্মক বিরোধ সম্পর্কে জ্ঞান নেই। তাই বিষয়টির গুরুত্ব বিবেচনায় শী‘আদের বিভ্রান্তির উপর নিম্নে আলোচনা করা হল-

শী‘আ মতবাদ

বর্তমান যুগে নাস্তিকতা, কুটিলতা, পাপাচার, বিদ‘আত, ইসলাম ও তার নিদর্শনসমূহের সমালোচনা এবং পূর্ববর্তী উম্মত তথা রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর ছাহাবী ও তাবেঈগণের নিন্দা ব্যাপকহারে ছড়িয়ে পড়েছে। বাতিলপন্থীরা তাদের ভ্রান্ত মতবাদ দ্বারা আল্লাহর বান্দাদেরকে বিপথগামী করছে এবং আল্লাহর দ্বীনকে পরিবর্তন করছে। আর ইসলামের নামে নির্লজ্জ ও মনুষ্যত্বহীনভাবে আল্লাহর কিতাবকে পরিবর্তন করছে এবং সঠিক ইসলামী জীবনবিধানের নামে ছড়িয়ে দিচ্ছে অবিশ্বাস, নাস্তিকতা, অন্যায় ও অবিচার। মূলত এগুলো সবই ফিতনা।

এই ফিতনাসমূহের সবচেয়ে ভয়ঙ্কর ও নিকৃষ্টতর দিক হল শী‘আ ফিতনা। এর দ্বারা তারা আহলে বাইত তথা নবী (ﷺ)-এর পরিবার ও ইমামদের প্রতি ভালোবাসার গান গেয়ে মূর্খ ও নির্বোধ লোকদেরকে বিপর্যয়ের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। এক্ষেত্রে তারা তাদের এই উদ্দেশ্য বাস্তবায়নের জন্য সকল আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করছে, সকল প্রকার মূল্যবান ও দামী বস্তু ব্যয় করছে এবং যাবতীয় ষড়যন্ত্র ও কুটবুদ্ধির অবতারণা করছে।

শী‘আ ফিতনার সূচনা হয়েছে মূলত ইসলাম ও মুসলিমের শত্রু আব্দুল্লাহ ইবনু সাবা ইহুদী ও তার অনুসারী যুরারা, আবূ বাসীর, আব্দুল্লাহ ইবনু ই‘আফুর, আবূ মিখনাফ লূত ইবনু ইয়াহইয়া প্রমুখ মিথ্যাবাদীদের চেষ্টা-সাধনার মাধ্যমে। তাদের সার্বিক প্রচেষ্টা হল, ইসলামের প্রকৃতরূপকে নিশ্চিহ্ন করে দেয়া এবং মুসলিমদের ঐক্যবদ্ধ সারিকে ভেঙ্গে টুকরা টুকরা করে দেয়া।

শী‘আরা আলী (রাযিয়াল্লাহু আনহু) ও তাঁর পবিত্র পরিবার-পরিজনের প্রতি বিভিন্ন মিথ্যারোপ করে থাকে। অথচ তাঁরা সকলেই এর থেকে মুক্ত এবং আহলে সুন্নাত ওয়াল জামা‘আতের বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গের অন্তর্ভুক্ত। আলী (রাযিয়াল্লাহু আনহু) এবং জা‘ফর ছাদিক পর্যন্ত তাঁর পরিবার-পরিজনের সকলেই মদীনা মুনাওয়ারায় ঈমান, ইসলাম, কিতাব ও সুন্নাহ’র পরিবেশে জীবন-যাপন করেছেন। উল্লেখ্য, আমরা তাদের নির্ভরযোগ্য গ্রন্থসমূহ থেকে তাদের কতগুলো ভ্রান্ত আক্বীদা উল্লেখ কবর। অতঃপর কুরআন, হাদীছ এবং আহলে সুন্নাত ওয়াল জামা‘আতের মানহাজের আলোকে পর্যালোচনা করব। যাতে করে জনসাধারণ তাদের পথভ্রষ্টতা ও গোমরাহী সম্পর্কে তে পারে।

শী‘আদের ভ্রান্ত আক্বীদা সমূহ

ভ্রান্ত আক্বীদা-১:  আল্লাহর সাথে শিরকের আক্বীদা

(ক) মুহাম্মাদ ইবনু ইয়াকূব আল-কুলাইনী ‘উছূলুল কাফী’ গ্রন্থের মধ্যে ‘গোটা পৃথিবীর মালিক ইমাম’ নামক অধ্যায়ে আবূ আব্দুল্লাহ থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন, ‘দুনিয়া ও আখেরাত ইমামের মালিকানায়, যেখানে ইচ্ছা তিনি তা রাখেন এবং আল্লাহর কাছ থেকে পুরস্কারস্বরূপ যার কাছে ইচ্ছা তা হস্তান্তর করেন’।[১]

পর্যালোচনা

শী‘আদের উক্ত বিশ্বাস শিরকমিশ্রিত। কেননা মহান আল্লাহ বলেন, اِنَّ  الۡاَرۡضَ  لِلّٰہِ  یُوۡرِثُہَا مَنۡ یَّشَآءُ ‘যমীন তো আল্লাহরই। তিনি বান্দাদের মধ্যে যাকে ইচ্ছা তার উত্তরাধিকারী করেন’ (সূরা আল-আ‘রাফ: ১২৮)। তিনি আরো বলেন, وَ لِلّٰہِ مُلۡکُ السَّمٰوٰتِ وَ الۡاَرۡض  ‘আসমান ও যমীনের সার্বভৌম ক্ষমতা একমাত্র আল্লাহরই’ (সূরা আলে ইমরান: ১৮৯)। অন্যত্র আল্লাহ বলেন, فَلِلّٰہِ الۡاٰخِرَۃُ وَالۡاُوۡلٰی ‘বস্তুত ইহকাল ও পরকাল আল্লাহরই’ (সূরা আন-নাজম: ২৫)। لَہٗ  مُلۡکُ السَّمٰوٰتِ وَ الۡاَرۡضِ   ‘আসমান ও যমীনের সার্বভৌম ক্ষমতা একমাত্র তাঁরই’ (সূরা আল-হাদীদ: ২)। تَبٰرَکَ الَّذِیۡ  بِیَدِہِ  الۡمُلۡکُ وَ ہُوَ عَلٰی کُلِّ  شَیۡءٍ قَدِیۡرُۨ ‘মহামহিমান্বিত তিনি, সর্বময় কর্তৃত্ব যাঁর নিয়ন্ত্রণে; তিনি সর্ববিষয়ে ক্ষমতাবান’ (সূরা আল-মুলক: ১)।

(খ) শী‘আরা আরো বিশ্বাস করে যে, ‘আলী বলেন,

أنا الأول وأنا الأخر وأنا الظاهر وأنا الباطن وأنا  وارث الأرض

‘আমিই প্রথম, আমিই শেষ, আমিই ব্যক্ত, আমিই উপরে আর আমিই নিকটে এবং আমিই যমীনের উত্তরাধিকারী’।[২]

পর্যালোচনা

এটিও ভ্রান্ত আক্বীদা। কেননা আলী (রাযিয়াল্লাহু আনহু) তা থেকে পবিত্র ও মুক্ত। এটা তাঁর উপর একটা বড় ধরনের মিথ্যা অপবাদ। তিনি এই ধরনের কথা বলতেই পারেন না। তাছাড়া আহলে সুন্নাত ওয়াল জামা‘আতের আক্বীদা হল- কেবল আল্লাহই হলেন প্রথম, শেষ, আল্লাহই উপরে, তিনি নিকটে এবং তিনি যমীনের উত্তরাধিকারী। মহান আল্লাহ বলেন, ہُوَ الۡاَوَّلُ وَ الۡاٰخِرُ وَ الظَّاہِرُ وَ الۡبَاطِنُ  ‘তিনিই আদি, তিনিই অন্ত; তিনিই সবার উপরে এবং তিনিই সবার নিকটে’ (সূরা আল-হাদীদ: ৩)। অন্যত্রম আল্লাহ তা‘আলা বলেন,  وَ لِلّٰہِ مِیۡرَاثُ السَّمٰوٰتِ وَ الۡاَرۡضِ  ‘আকাশমণ্ডলী ও পৃথিবীর মালিকানা তো আল্লাহরই’ (সূরা আল-হাদীদ: ১০)।

(গ) অনুরূপভাবে আল্লাহ তা‘আলার বাণী, وَ مَا خَلَقۡتُ الۡجِنَّ وَ الۡاِنۡسَ  اِلَّا لِیَعۡبُدُوۡنِ ‘আর আমি জিন ও মানুষকে সৃষ্টি করেছি এই জন্য যে, তারা কেবল আমারই ইবাদত করবে’ (সূরা আয-যারিয়াত: ৫৬)-এর ব্যাখ্যায় এই শী‘আ মুফাসসির বলে যে, জা‘ফর ছাদিক এই আয়াতের ব্যাখ্যায় হুসাইন (রাযিয়াল্লাহু আনহু) থেকে বর্ণনা করেন, ‘আল্লাহ জিন ও মানুষকে সৃষ্টি করেছেন যাতে তারা তাকে চিনতে পারে। কারণ তারা যখন তাকে চিনবে, তখন তারা তার ইবাদত করবে। অতঃপর তাদের একজন তাকে জিজ্ঞেস করল, চিনা-জানা বলতে কী বুঝায়? তখন সে জবাব দিল, মানুষ তাদের যামানার ইমামকে চিনবে-জানবে’।[৩]

পর্যালোচনা

উক্ত ব্যাখ্যা সঠিক নয়। বরং ভ্রান্ত ও মনগড়া। অথচ উক্ত আয়াতের ব্যাখ্যায় ইমাম কুরতুবী (৬০০-৬৭১ হি./১২০৪-১২৭৩ খ্রি.) ঢ় বলেছেন, আল্লাহ তা‘আলা বলেন, وما خلقت أهل السعادة من الجن والإنس إلا ليوحدون ‘আমি মানুষ ও জিন জাতির মধ্যে যারা সৌভাগ্যের অধিকারী তাদের সৃষ্টি করেছি কেবল তাওহীদ প্রতিষ্ঠা করার জন্য’।[৪]   

(ঘ) কুলাইনী ‘উছূলুল কাফী’ গ্রন্থে উল্লেখ করেন, ‘ইমাম মুহাম্মদ বাকের বলেন, আমরা আল্লাহর চেহারা। আমরা আল্লাহর সৃষ্টির মধ্যে তার চোখ এবং তার হাত, যা রহমতসহ তার বান্দাদের উপর সম্প্রসারিত’।[৫] অনুরূপভাবে সে বলে, ‘আমরা আল্লাহর জিহ্বা।[৬] আর আবূ আব্দুল্লাহ ন (জা‘ফর ছাদিক) থেকে বর্ণিত,

كان أمير المؤمنين صلوات الله عليه كثيرا ما يقول أنا قسيم الله بين الجنة والنار.......لقد أوتيت خصالا ما سبقني إليها أحد قبلي علمت المنايا والبلايا والأنساب وفصل الخطاب فلم  يفتني ما سبقني ولم يعزب عني ما غاب عني

‘আমীরুল মুমিনীন বেশি বেশি বলতেন, ‘জান্নাত ও জাহান্নামের মধ্যে আমি আল্লাহর পক্ষ থেকে বণ্টনকারী...। আমাকে এমন কতগুলো বৈশিষ্ট্য দেয়া হয়েছে, যা আমার পূর্বে আর কাউকে দেয়া হয়নি। আমি জানি মৃত্যু, বালা-মুছীবত, বংশ এবং বক্তৃতা-বিবৃতির ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ সম্পর্কে। সুতরাং আমার পূর্বেকার কোন বিষয় আমার জানা থেকে বাদ পড়েনি এবং আমার নিকট থেকে যা অদৃশ্য, তাও আমার কাছ থেকে অজানা থাকে না’।[৭]

পর্যালোচনা

তারা কিভাবে আল্লাহ তা‘আলার গুণাবলীকে আলী (রাযিয়াল্লাহু আনহু)-এর জন্য সাব্যস্ত করার সাহস করল? অথচ গাবেয়বের খবর একমাত্র মহান আল্লাহর জন্য নির্দিষ্ট। আল্লাহ তা‘আলা বলেন,

আল্লাহ তা‘আলা বলেন, وَ لِلّٰہِ غَیۡبُ السَّمٰوٰتِ وَ الۡاَرۡضِ وَ اِلَیۡہِ یُرۡجَعُ الۡاَمۡرُ کُلُّہٗ  فَاعۡبُدۡہُ وَ تَوَکَّلۡ عَلَیۡہِ وَ مَا رَبُّکَ بِغَافِلٍ عَمَّا تَعۡمَلُوۡنَ ‘আকাশসমূহ ও পৃথিবীর অদৃশ্য বিষয়ের জ্ঞান আল্লাহরই এবং তাঁরই কাছে সব কিছু প্রত্যাবর্তিত হবে, সুতরাং তাঁর ইবাদত কর এবং তাঁর উপর নির্ভর কর, আর তোমরা যা কর সে সম্বন্ধে তোমার প্রতিপালক অমনোযোগী নন’ (সূরা হূদ: ১২৩)। মহান আল্লাহ আরো বলেন,

وَ عِنۡدَہٗ مَفَاتِحُ الۡغَیۡبِ لَا  یَعۡلَمُہَاۤ  اِلَّا ہُوَ وَ یَعۡلَمُ مَا فِی الۡبَرِّ  وَ الۡبَحۡرِ وَ مَا تَسۡقُطُ مِنۡ وَّرَقَۃٍ  اِلَّا یَعۡلَمُہَا وَ لَا حَبَّۃٍ  فِیۡ ظُلُمٰتِ الۡاَرۡضِ وَ لَا رَطۡبٍ وَّ لَا یَابِسٍ  اِلَّا فِیۡ  کِتٰبٍ مُّبِیۡنٍ.

‘গায়েব বা অদৃশ্যের চাবিকাঠি তাঁরই (আল্লাহর) নিকট রয়েছে; তিনি ছাড়া আর কেউই তা জ্ঞাত নয়। স্থল ও জলভাগের সব কিছুই তিনি অবগত রয়েছেন, তাঁর অবগতি ব্যতীত বৃক্ষ হতে একটি পাতাও ঝরে না এবং ভূ-পৃষ্ঠের অন্ধকারের মধ্যে একটি দানাও পড়ে না, এমনিভাবে কোন সরস ও নিরস বস্তুও পতিত হয় না। সমস্ত বস্তুই সুস্পষ্ট কিতাবে লিপিবদ্ধ রয়েছে’ (সূরা আল-আন‘আম: ৫৯)।

(ঙ) ‘উছূলুল কাফী’ গ্রন্থে উল্লেখ আছে, ‘তারা (ইমামগণ) যা ইচ্ছা করে, তা হালাল করতে পারে। আবার যা ইচ্ছা করে, তা হারামও করতে পারে। আর তারা কখনও কিছুর ইচ্ছা করে না, যতক্ষণ না মহান আল্লাহ তা‘আলা ইচ্ছা করেন’।[৮]

পর্যালোচনা

তাদের উক্ত আক্বীদাও ভ্রান্ত। কেননা আল্লাহ তা‘আলা তাঁর রাসূলকে উদ্দেশ্য করে বলেন, یٰۤاَیُّہَا النَّبِیُّ  لِمَ  تُحَرِّمُ مَاۤ  اَحَلَّ اللّٰہُ  لَکَ  ‘হে নবী! আল্লাহ যা আপনার জন্য হালাল করেছেন, তা আপনি কেন হারাম করলেন’ (সূরা আত-তাহরীম: ১)। সুতরাং আল্লাহ যখন তাঁর রাসূলকে হালাল জিনিসকে হারাম করার কারণে সতর্ক করে দিয়েছেন, তখন নবী (ﷺ) ব্যতীত অন্যের দ্বারা তা কী করে সম্ভব হতে পারে?

(চ) কুলাইনী তার গ্রন্থের কোন এক অধ্যায়ে আরও উল্লেখ করেন, ‘ইমামগণ জানেন যে, তারা কখন মারা যাবেন। আর তারা তাদের ইচ্ছা অনুযায়ী মারা যাবেন।

পর্যালোচনা

অথচ আল্লাহ তা‘আলা বলেন, قُلۡ لَّا یَعۡلَمُ مَنۡ فِی السَّمٰوٰتِ وَ الۡاَرۡضِ الۡغَیۡبَ  اِلَّا اللّٰہُ ‘(হে নবী!) আপনি বলুন, আল্লাহ ব্যতীত আকাশমণ্ডলী ও পৃথিবীতে কেউই অদৃশ্য বা গায়েবী বিষয়সমূহের জ্ঞান রাখে না’ (সূরা আন-নাম্ল: ৬৫)। মহান আল্লাহ আরও বলেন, وَ عِنۡدَہٗ مَفَاتِحُ الۡغَیۡبِ لَا  یَعۡلَمُہَاۤ  اِلَّا ہُوَ ‘আর অদৃশ্যের চাবিকাঠি তাঁরই নিকট রয়েছে, তিনি ব্যতীত অন্য কেউ তা জানে না’ (সূরা আল-আন‘আম: ৫৯)।  কিন্তু শী‘আরা তাদের ইমামদেরকে অদৃশ্যের জ্ঞানের ব্যাপারে আল্লাহর সাথে শরীক করে।

ভ্রান্ত আক্বীদা-২ : দ্বাদশ ইমাম নিষ্পাপ।

মুহাম্মাদ ইবনু ইয়াকূব আল-কুলাইনী তার ‘উছূলুল কাফী’ গ্রন্থের মধ্যে উল্লেখ করেছেন, আবু আব্দুল্লাহ থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, ‘আলী যা কিছু নিয়ে এসেছেন, তা গ্রহণ করব এবং যা থেকে নিষেধ করেছেন, তা থেকে বিরত থাকব। তিনি (আলী) মুহাম্মাদ (ﷺ)-এর মত মর্যাদাসম্পন্ন। আর মুহাম্মাদ (ﷺ)-এর মর্যাদা আল্লাহর সকল সৃষ্টির উপর স্বীকৃত। কেউ আলীর কথার উপর কথা বলা যেন আল্লাহ ও তার রাসূলের উপর কথা বলা। আর আলীর কোন কথার বিরুদ্ধাচারণ করা আল্লাহর সাথে শিরক করার পর্যায়ে। ...

وكذلك يجري لأئمة الهدى واحدا بعد واحد جعلهم الله أركان الأرض أن تميد بأهلها-حجته البالغة على من فوق الأرض ومن تحت الثرى وكان أمير المؤمنين صلوات الله عليه كثيرا ما يقول أنا قسيم الله بين الجنة والنار أنا الفاروق الأكبر أنا صاحب العصا والميسم ولقد أقرت لي جميع الملائكة والروح والرسل بمثل ما أقروا به لمحمد ولقد حملت على مثل حمولته وهي حمولة الرب

‘অনুরূপভাবে এ বিধান বহাল থাকবে ক্রমান্বয়ে আগত হেদায়াতের ইমামদের বেলায়ও। আল্লাহ তাদেরকে যমীনের স্তম্ভ বানিয়েছেন, যাতে যমীন তার অধিবাসীদের নিয়ে স্থিতিশীল থাকতে পারে এবং যমীনের উপরে ও নীচে যারা আছেন, তাদের জন্য তাঁর পরিপূর্ণ দলীল বানিয়েছেন। আর আমীরুল মুমিনীন বেশি বেশি বলতেন, জান্নাত ও জাহান্নামের মধ্যে আমি আল্লাহর বণ্টনকারী; আমি সত্য-মিথ্যার বড় পার্থক্যকারী; আমি লাঠি ও লৌহযন্ত্রের অধিকারী। আর আমাকে স্বীকৃতি দিয়েছে সকল ফেরেশতা, জিবরীল এবং রাসূলগণ, যেমনিভাবে তারা মুহাম্মাদ (ﷺ)-কে স্বীকৃতি দিয়েছেন। আর আমি তার (দায়িত্বের) বোঝার মতই বোঝা বহন করেছি; আর সেই বোঝাটি হল রব তথা প্রতিপালকের বোঝা’।[৯] 

কুলাইনী আরও উল্লেখ করেন, ইমাম জা‘ফর ছাদিক বলেন, ‘আমরা আল্লাহর জ্ঞানভাণ্ডার; আমরা আল্লাহর আদেশের ব্যাখ্যা; আমরা নিষ্পাপ জাতি। আল্লাহ তা‘আলা আমাদের আনুগত্য করতে নির্দেশ দিয়েছেন এবং আমাদের বিরুদ্ধাচরণ করতে নিষেধ করেছেন। আমরা আসমানের নীচে এবং যমীনের উপরে আল্লাহর পরিপূর্ণ দলীল’।[১০]

ইমামদের আনুগত্য ফরয হওয়ার ব্যাপারে আবূ সাবাহ থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, আমি আবু আব্দুল্লাহকে বলতে শুনেছি,

أشهد أن عليا إمام فرض الله طاعته وأن الحسن إمام فرض الله طاعته وأن الحسين إمام فرض الله طاعته وأن علي بن الحسين إمام فرض الله طاعته وأن محمد بن علي إمام فرض الله طاعته

‘আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, আলী ইমাম, আল্লাহ তার আনুগত্য করাকে ফরয করে দিয়েছেন। আর নিশ্চয় হাসান ইমাম; আল্লাহ তার আনুগত্য করাকে ফরয করে দিয়েছেন এবং হুসাইনও ইমাম, আল্লাহ তার আনুগত্য করাকে ফরয করে দিয়েছেন। আলী ইবনু হুসাইন ইমাম, আল্লাহ তার আনুগত্য করাকে ফরয করে দিয়েছেন এবং মুহাম্মাদ ইবনু আলীও ইমাম; আল্লাহ তার আনুগত্য করাকে ফরয করে দিয়েছেন’।[১১]

পর্যালোচনা

শী‘আগণ তাদের নিজেদের মনগড়া মতে ইমামতের (নেতৃত্বের) অর্থ আবিষ্কার করেছে। এমনকি তারা ইমামকে আল্লাহর নবীদের মত নিষ্পাপ মনে করে এবং তারা তাকে অদৃশ্যজগতের জ্ঞানের অধিকারী মনে করে। তারা তাদের এই লক্ষ্যকে বাস্তবায়নের জন্য অসংখ্য মিথ্যা ও বানোয়াট বর্ণনা উপস্থাপন করে। অথচ বাস্তব ও সত্য কথা হচ্ছে, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) একমাত্র অনুসরণীয় ব্যক্তিত্ব।

এই ইমাম শব্দটি নিষ্পাপ হওয়া, অদৃশ্যজগতের জ্ঞান রাখা এবং বিভিন্ন বিষয়ে হস্তক্ষেপ করার ক্ষমতা থাকতে হবে এমনটি দাবি করে না। আর তাদের নিকট শরী‘আতের এমন কোন প্রমাণ নেই, যার দ্বারা তারা ইমামের জন্য যেসব গুণাবলী নির্ধারণ করেছে, তা প্রমাণ করতে পারে। তবে হ্যাঁ, আল্লাহর কিতাব চারটি স্তর বিন্যাস করেছে। যেমন আল্লাহ তা‘আলার বাণী,

وَ مَنۡ یُّطِعِ اللّٰہَ وَ الرَّسُوۡلَ فَاُولٰٓئِکَ مَعَ الَّذِیۡنَ اَنۡعَمَ اللّٰہُ عَلَیۡہِمۡ مِّنَ النَّبِیّٖنَ وَ الصِّدِّیۡقِیۡنَ وَ الشُّہَدَآءِ وَ الصّٰلِحِیۡنَ ۚ وَ حَسُنَ اُولٰٓئِکَ رَفِیۡقًا

‘আর কেউ আল্লাহ এবং রাসূলের আনুগত্য করলে সে নবী, সত্যনিষ্ঠ, শহীদ ও সৎকর্মপরায়ণগণ যাদের প্রতি আল্লাহ অনুগ্রহ করেছেন, তাদের সঙ্গী হবে এবং তারা কত উত্তম সঙ্গী’ (সূরা আন-নিসা: ৬৯)।

এই চার স্তরের মধ্যে ইমামতের পদ নেই, যা শী‘আরা আবিষ্কার করেছে এবং তাদের মাযহাবের ভিত্তি হিসাবে প্রতিষ্ঠিত করেছে। অথচ আলী ও তাঁর পরিবার-পরিজন (রাযিয়াল্লাহু আনহুম) (তার আনুগত্য করা ফরয অথবা সে নিষ্পাপ) এই অর্থে ইমাম হওয়ার তীব্র প্রতিবাদ করেছেন। কারণ উছমান (রাযিয়াল্লাহু আনহু)-এর শাহাদাতের পর যখন জনগণ আলী (রাযিয়াল্লাহু আনহু)-এর হাতে আনুগত্যের শপথ নিতে চাইল এবং তারা বলল, আপনি আপনার হাত প্রসারিত করুন, আমরা আপনার নিকট আপনার খেলাফতের অধীনে থাকার জন্য আনুগত্যের শপথ গ্রহণ করব; তখন তিনি বললেন, তোমরা আমাকে মাফ কর (মুক্তি দাও) এবং আমি ভিন্ন অন্য একজনকে খোঁজ করে বের কর। আর তোমরা যদি আমাকে রুখছত দাও, তবে আমি তোমাদের মত একজন হব এবং তোমরা যাকে তোমাদের শাসনক্ষমতা দান করবে, আমি আলী তোমাদের চেয়ে বেশি তার কথা শুনব এবং তার আনুগত্য করব। আর আমার চেয়ে তোমাদের ভাল আমীরের জন্য আমি হব উত্তম সাহায্যকারী।[১২]

অতএব ইমামত (আল্লাহর পক্ষ থেকে) নির্দেশিত কোন ফরয বিষয়ের অন্তর্ভুক্ত নয়, যার কারণে রাফেযী ও শী‘আরা রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর ছাহাবীগণকে কাফির বলে আখ্যায়িত করেছে। রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর যেসব গুণাবলী আমরা বিশ্বাস করে থাকি, সেগুলো নিম্নরূপ: মহান আল্লাহ বলেন, وَ مَاۤ  اَرۡسَلۡنٰکَ اِلَّا رَحۡمَۃً  لِّلۡعٰلَمِیۡنَ ‘আমরা তো আপনাকে বিশ্বজগতের প্রতি কেবল রহমতরূপেই প্রেরণ করেছি’ (সূরা আল-আম্বিয়া: ১০৭)। অন্যত্র আল্লাহ তা‘আলা বলেন, وَ مَاۤ  اَرۡسَلۡنٰکَ  اِلَّا کَآفَّۃً  لِّلنَّاسِ بَشِیۡرًا وَّ نَذِیۡرًا ‘আমি তো আপনাকে সমগ্র মানবজাতির প্রতি সুসংবাদদাতা ও সতর্ককারীরূপে প্রেরণ করেছি’ (সূরা সাবা: ২৮)। قُلۡ یٰۤاَیُّہَا النَّاسُ اِنِّیۡ رَسُوۡلُ اللّٰہِ اِلَیۡکُمۡ جَمِیۡعًا ‘(হে নবী!) আপনি বলুন, হে মানুষ! আমরা তোমাদের সকলের জন্য আল্লাহর রাসূল’ (সূরা আল-আ‘রাফ: ১৫৮)। تَبٰرَکَ الَّذِیۡ نَزَّلَ الۡفُرۡقَانَ عَلٰی عَبۡدِہٖ لِیَکُوۡنَ  لِلۡعٰلَمِیۡنَ  نَذِیۡرَا ‘কত বরকতময় তিনি, যিনি তাঁর বান্দার প্রতি ফুরক্বান অবতীর্ণ করেছেন; যাতে সে সৃষ্টিকুলের জন্য সতর্ককারী হতে পারে’ (সূরা আল-ফুরক্বান: ১৫৮)।

(ইনশাআল্লাহ চলবে)


* ভাইস প্রিন্সিপ্যাল, গাজিমোড়া আলিয়া মাদরাসা, লাকসাম, কুমিল্লা।

তথ্যসূত্র :
[১]. উছূলুল কাফী, পৃ. ২৫৯ (ভারত ছাপা)।
[২]. রিজালু কাশী, পৃ. ১৩৮ (ভারত ছাপা)।
[৩]. তারজমাতু মাক্ববূল আহমাদ, পৃ. ১০৪৩।
[৪]. শামসুদ্দীন আল-কুরতুবী, আল-জামে‘ঈ লি আহকামিল কুরআন, তাহক্বীক্ব : হিশাম সামীর আল-বুখারী, (রিয়ায, সঊদী আরব : দারু আলিমিল কুতুব, ১৪২৩ হি./২০০৩ খ্রি.), ১৭ তম খণ্ড, পৃ. ৫৫।
[৫]. উছূলুল কাফী, পৃ. ৮৩।
[৬]. প্রাগুক্ত, পৃ. ৮৪।
[৭]. প্রাগুক্ত, পৃ. ১১৭।
[৮]. তরজমাতু মাকবুল আহমাদ, পৃ. ১৭৮।
[৯]. উছূলুল কাফী, পৃ. ১১৭; ওয়ালীদ কামাল শুকুর, আক্বীদাতুশ শী‘আতি ওয়া তারিখিহুমুল আসওয়াদ, পৃ. ৩।
[১০]. উছূলুল কাফী, পৃ. ১৬৫; আক্বীদাতুশ শী‘আতি ওয়া তারিখিহুমুল আসওয়াদ, পৃ. ৪।
[১১]. প্রাগুক্ত, পৃ. ১০৯।
[১২]. নাহজুল বালাগাহ, ১ম খণ্ড, পৃ. ১৮৩। এই গ্রন্থটি শী‘আদের গ্রন্থসমূহের মধ্যে অন্যতম, যার উপর তারা নির্ভর করে থাকে।




শী‘আ মতবাদের স্বরূপ ও তাদের বিভ্রান্তি - অনুবাদ : ড. মো: আমিনুল ইসলাম
রাজনৈতিক সংস্কার - ড. মুহাম্মাদ বযলুর রহমান
উপদেশ প্রদানের আদব ও শর্তসমূহ - আল-ইখলাছ ডেস্ক
কোটা নয়, মেধাই হোক প্রকৃত মূল্যায়ন - ড. মুহাম্মাদ বযলুর রহমান
ইসলামী রাষ্ট্রে আইন ও বিচার ব্যবস্থার স্বরূপ - হাসিবুর রহমান বুখারী
বিদ‘আতীদের ব্যাপারে সালাফীদের অবস্থান - ওমর ফারুক বিন মুসলিমুদ্দীন
ইসকনের বর্বরতা, ভারতে মুসলিম বিদ্বেষ অখণ্ড ভারত প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন - তানযীল আহমাদ
শী‘আ মতবাদের স্বরূপ ও তাদের বিভ্রান্তি (২য় কিস্তি) - অনুবাদ : ড. মো: আমিনুল ইসলাম
মুসলিমদের সাহায্য করা ও তার পদ্ধতি - শায়খ মতিউর রহমান মাদানী
মুসলিম নারীর সৌন্দর্য ও বিয়েতে পর্দাবিধি - মাহদী হাসান মানিক
ধর্মীয় সংস্কারের স্বরূপ ও প্রকৃতি - ড. মুহাম্মাদ বযলুর রহমান
কালজয়ী লেখনীর ইতিকথা - আযহারুল ইসলাম

সর্বশেষ প্রবন্ধ

ফেসবুক পেজ