কালজয়ী লেখনীর ইতিকথা
-আযহারুল ইসলাম মাদানী*
ভূমিকা
জ্ঞান ও প্রজ্ঞার অন্বেষণ মানব ইতিহাসের এক শাশ্বত যাত্রা। যুগে যুগে মহাজ্ঞানীরা সেই যাত্রাপথে নিজেদের জীবন উৎসর্গ করেছেন, আর তাঁদের রচনার ফসল আজও আলোকিত করে চলেছে আমাদের পথ। তাঁরা কেবল অক্ষর বিন্যাস করেননি, বরং জ্ঞানের প্রতিটি কণা, প্রতিটি বাক্য, তাঁদের হৃদয়ের গভীর নিষ্ঠা ও ইখলাছের প্রতিচ্ছবি হয়ে উঠেছে। লাইব্রেরির নিশ্চিন্ত কোণ থেকে শুরু করে পথের কঙ্করময় ধুলোতেও তাঁরা জ্ঞানচর্চার সাধনা চালিয়েছেন। তাঁদের প্রতিটি গ্রন্থ যেন এক একটি আলোর মিনার, যা শুধু মানবজাতির পার্থিব প্রয়োজন মেটায়নি, বরং তাদের আত্মিক ও আধ্যাত্মিক পথের পাথেয় হয়ে উঠেছে। এই লেখাটি সেইসব মহান সাধকের প্রতি এক শ্রদ্ধার্ঘ্য, যাঁরা পার্থিব লোভ, খ্যাতি ও প্রতিপত্তির ঊর্ধ্বে উঠে শুধু আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে কলম ধরেছিলেন। এটি সেই জ্ঞানসাধনার গল্প, যেখানে ইখলাছ ছিল মূল ভিত্তি, ইস্তিখারা ছিল পথের দিশা এবং নিরলস পরিশ্রম ছিল সাফল্যের চাবিকাঠি। এখানে আমরা দেখব কীভাবে মহান লেখকের অমর সৃষ্টি তাঁর জন্য হয়ে ওঠে এক অফুরন্ত ছাদাক্বায়ে জারিয়াহ এবং কীভাবে তাদের বিশুদ্ধ নিয়ত তাদের রচনাগুলোকে করে তুলেছে কালজয়ী ও চিরন্তন। আসুন! আমরা সেই মহান জ্ঞান-যাত্রীদের সাধনার গল্পে ডুব দিই, যাঁরা আমাদের জন্য রেখে গেছেন এক অমূল্য জ্ঞানের ভাণ্ডার।
তবে এই জ্ঞানভাণ্ডার কীভাবে আমাদের কাছে এলো? এর পেছনের মূল চালিকাশক্তি কী ছিল? জ্ঞানকে সংরক্ষণ ও এক প্রজন্ম থেকে আরেক প্রজন্মে পৌঁছে দেয়ার অন্যতম প্রধান মাধ্যম হলো গ্রন্থ রচনা ও সংকলন। এগুলোর উপকারিতা অপরিসীম এবং এর প্রভাব সুদূরপ্রসারী। শত শত বছর ধরে পূর্বসূরিদের রচিত জ্ঞানভাণ্ডার থেকে আজও আমাদের প্রজন্ম উপকৃত হচ্ছে। যদি কোন আলেম উপকারী গ্রন্থ রচনা করে যান, তবে তা তাঁর জন্য এক চলমান ছাদাক্বাহ (ছাদাক্বায়ে জারিয়াহ)। মৃত্যুর পরেও যার ছওয়াব অব্যাহত থাকে। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা‘আলার অপার করুণা যে, এই ছওয়াব শুধু গ্রন্থ রচয়িতার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে না। বরং যারা এই গ্রন্থ প্রকাশ, মুদ্রণ, প্রচার ও শিক্ষাদানে সহযোগিতা করেন, তারাও এর ভাগীদার হন।
হারামাঈন শারীফাঈনের স্থায়ী ফাতাওয়া কমিটি (ফাতাওয়া নং ২০০০৬২) বলেছে, ‘উপকারী গ্রন্থ, যা মানুষের পার্থিব ও ধর্মীয় জীবনে কাজে আসে, তা মুদ্রণ করা একটি সৎকর্ম। এই কাজের জন্য মানুষ জীবদ্দশায় পুরস্কৃত হয় এবং তার মৃত্যুর পরেও এর ছওয়াব জারি থাকে’। এই প্রসঙ্গে রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর একটি হাদীছ বিশেষভাবে প্রণিধানযোগ্য।
عَنْ أَبِيْ هُرَيْرَةَ رَضِىَ اللهُ عَنْهُ قَالَ قَالَ رَسُوْلُ اللهِ ﷺ إِذَا مَاتَ الْإِنْسَانُ انْقَطَعَ عَنْهُ عَمَلُه اِلَّا مِنْ ثَلَاثَةِ أَشْيَاءَ مِنْ صَدَقَةٍ جَارِيَةٍ أَوْ عِلْمٍ يُنْتَفَعُ بِه أَوْ وَلَدٍ صَالِحٍ يَدْعُو لَه
আবূ হুরায়রা (রাযিয়াল্লাহু আনহু) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেন, মানুষ যখন মারা যায়, তখন তার আমল বন্ধ (নিঃশেষ) হয়ে যায়। কিন্তু তিনটি আমলের ছওয়াব (অব্যাহত থাকে): (১) ছাদাক্বায়ে জারিয়া, (২) জ্ঞান- যা থেকে মানুষ উপকৃত হতে থাকে এবং (৩) সুসন্তান- যে তার (পিতা-মাতার) জন্য দু‘আ করতে থাকে।[১]
যে ব্যক্তিই এই উপকারী জ্ঞান প্রসারে কোনভাবে অবদান রাখে, সে এই মহান প্রতিদান লাভ করে। হোক সে লেখক, শিক্ষক, প্রকাশক অথবা মুদ্রণের সঙ্গে জড়িত কোন কর্মী- প্রত্যেকেই নিজ নিজ প্রচেষ্টা ও অংশগ্রহণ অনুযায়ী এই মহৎ ছওয়াবের অংশীদার হয়।
গ্রন্থ রচনার উদ্দেশ্য
গ্রন্থ রচনা কেবল তথ্যের এক নিছক সমাবেশ নয়, বরং তা আল্লাহর পক্ষ থেকে নির্বাচিত কিছু বান্দার প্রতি এক বিশেষ নে‘মত। এটি সেই গভীর প্রজ্ঞা ও সূক্ষ্ম অন্তর্দৃষ্টির প্রকাশ, যা সবার ভাগ্যে জোটে না।
আল্লামা ইবনুল জাওযি (রাহিমাহুল্লাহ) বলেছেন, ‘গ্রন্থ রচনার উদ্দেশ্য কেবল কোন কিছুকে একত্রিত করা নয়, বরং এটি এমন কিছু রহস্য, যা আল্লাহ তাঁর বান্দাদের মধ্যে যাকে চান, তাকে প্রকাশ করেন। এরপর তিনি তাকে বিচ্ছিন্ন বিষয়গুলোকে একত্রিত করা, এলোমেলো বিষয়গুলোকে সাজানো এবং উপেক্ষিত বিষয়গুলোকে ব্যাখ্যা করার তাওফীক্ব দেন। এটিই হলো উপকারী গ্রন্থ রচনা’।[২] তিনি আরো বলেন,تصنيف العالم ولده المخلد ‘আলেমের রচিত গ্রন্থ তাঁরই অমর সন্তান’।[৩]
এই অমরত্ব কেবল লেখকের একার নয়, বরং যারা সেই জ্ঞানকে আলোর মত ছড়িয়ে দিতে সহযোগিতা করেন, তারাও এর ভাগীদার হন।
সালাফদের লিখিত বহু কিতাবের ভূমিকায় আমরা দেখতে পাই, সেই মহৎ কর্মের পেছনে লুকিয়ে আছে অন্য কোনো এক মানুষের অনুরোধ, আবেদন কিংবা পরামর্শ। তাদের নাম হয়তো ইতিহাসের পাতায় লেখা নেই, কিন্তু ইলমের প্রচার-প্রসারে তাদের সেই ভূমিকা অবশ্যই আল্লাহর কাছে ছওয়াবের কারণ হবে। তাই হয়তো বলা হয়, কারো মতামত, পরামর্শ বা প্রস্তাবকে উপেক্ষা করা উচিত নয়; কে জানে, তার পেছনেই হয়তো পাহাড়সম নেকি লুকিয়ে আছে!
এর এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হচ্ছেন ইমাম বুখারী (রাহিমাহুল্লাহ)। তিনি নিজেই বলেন, ‘একবার আমরা ইসহাক ইবনে রাহুইয়াহ (রাহিমাহুল্লাহ)-এর মজলিসে ছিলাম। সেখানে আমাদের একজন সাথী বললেন, যদি তোমরা রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর ছহীহ সুন্নাহগুলোকে সংক্ষেপ করে একটি কিতাবে একত্র করতে! সেই কথাটি আমার হৃদয়ে এমন এক গভীর রেখা এঁকেছিল, যা থেকে জন্ম নিয়েছিল ইসলামের ইতিহাসে এক কালজয়ী রচনা- ছহীহুল বুখারী’।
একইভাবে, হাফেয ইবনে হাজার আসক্বালানী (রাহিমাহুল্লাহ) তাঁর বিখ্যাত হাদীছ বিষয়ক গ্রন্থ ‘নুখবাতুল ফিক্বর’-এর ভূমিকা লিখেছিলেন বন্ধুদের অনুরোধে। তিনি বলেন, ‘আমার কিছু বন্ধু এই বিষয়ে একটি গ্রন্থ রচনা করার জন্য আমাকে অনুরোধ করেছিল’। এই ছোট একটি অনুরোধের ফলস্বরূপই জন্ম হয়েছিল সেই অমূল্য গ্রন্থের, যা শত শত বছর ধরে হাদীছের শিক্ষার্থীদের পথ দেখাচ্ছে।
এই ঘটনাগুলো প্রমাণ করে, জ্ঞানচর্চার এই মহান পথে লেখক যেমন একনিষ্ঠ, তেমনি সেই জ্ঞানকে আলোর মত ছড়িয়ে দেয়ার পেছনের প্রতিটি ছোট অবদানও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
গ্রন্থ রচনায় ইখলাছ
গ্রন্থ রচনার নানা উদ্দেশ্য থাকতে পারে, যেমন: অর্থ উপার্জন, সম্মান লাভ, খ্যাতি অর্জন ইত্যাদি। কিন্তু আমাদের পূর্বসূরি আলেমগণ এসব উদ্দেশ্য থেকে অনেক দূরে ছিলেন। তাঁদের একমাত্র উদ্দেশ্য ছিল আল্লাহ তা‘আলার সন্তুষ্টি অর্জন।
ইমাম বুখারী (রাহিমাহুল্লাহ) তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ ‘ছহীহুল বুখারী’-এর সূচনা করেছেন উমার ইবনুল খাত্ত্বাব (রাযিয়াল্লাহু আনহু)-এর সেই প্রসিদ্ধ হাদীছ দিয়ে, যেখানে রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেন,إِنَّمَا الأَعْمَالُ بِالنِّيَّاتِ ، وَإِنَّمَا لِكُلِّ امْرِئٍ مَا نَوَى ‘সকল কাজ নিয়তের ওপর নির্ভরশীল, আর প্রতিটি মানুষ তার নিয়ত অনুযায়ীই প্রতিদান পাবে’।[৪]
ইমাম আল-কিরমানী (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন, ‘ইমাম বুখারী (রাহিমাহুল্লাহ) এই গ্রন্থটি রচনার শুরুতে এই হাদীছটি এজন্য উল্লেখ করেছেন, যাতে তিনি ঘোষণা করতে পারেন যে, এই গ্রন্থটি আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য রচিত, যেখানে কোন হীন উদ্দেশ্য বা লোক দেখানো ভাব নেই’।[৫]
হাফেয ইবনে হাজার আল-আসক্বালানী (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন, কেউ কেউ আপত্তি তুলেছিল যে, ‘আমল নিয়তের ওপর নির্ভরশীল’ এই হাদীছটি ‘ওয়াহী শুরু’ নামক অধ্যায়ের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়’। এর জবাবে ইবনে রুশাইদ (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন, ‘ইমাম বুখারী (রাহিমাহুল্লাহ)-এর উদ্দেশ্য ছিল এই গ্রন্থ রচনায় তাঁর উত্তম নিয়ত বা একনিষ্ঠতা প্রকাশ করা’।[৬]
ইমাম আল-আইনী (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন, ‘ইমাম বুখারী (রাহিমাহুল্লাহ)-এর মাধ্যমে তাঁর উদ্দেশ্যকে ইখলাছপূর্ণ করেছেন এবং নিয়তকে বিশুদ্ধ করেছেন। তিনি ইঙ্গিত দিয়েছেন যে, তিনি এই গ্রন্থটি আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য রচনা করেছেন, আর তিনি তা অর্জনও করেছেন’।[৭]
ইমাম নববী (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন, ‘ইমাম বুখারী (রাহিমাহুল্লাহ) এই হাদীছ দিয়ে তাঁর গ্রন্থ শুরু করেছেন, যদিও তিনি এর কোন শিরোনাম দেননি। এটি পূর্ববর্তী আলেমদের একটি সাধারণ রীতি ছিল, যা শিক্ষার্থীদেরকে তাদের নিয়ত বিশুদ্ধ করার জন্য সতর্ক করে’।
ইমাম ইবনে রাজাব (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন, ‘তিনি এই হাদীছ দিয়ে তাঁর গ্রন্থটি শুরু করেছেন। এর মাধ্যমে তিনি ইঙ্গিত দিয়েছেন যে, যে কোন আমল আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য না করা হলে তা বাতিল, দুনিয়া ও আখিরাতে তার কোন সুফল নেই’।[৮] আলেমগণ তাঁদের গ্রন্থ রচনার প্রধান উদ্দেশ্য হিসাবে আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের কথা উল্লেখ করেছেন।
ইমাম আল-কিরমানী (রাহিমাহুল্লাহ) তাঁর ‘আল-কাওয়াকিবুদ দারারিয়্যু ফী শারহি ছহীহিল বুখারী’ নামক গ্রন্থের ভূমিকায় বলেন,وما توسَّلت به إلى غرض دنيوي؛ من مال، أو جاهٍ... بل جعلته لله، ولوجهه خالصًا ‘আমি এই গ্রন্থটি কোনো পার্থিব উদ্দেশ্যে রচনা করিনি, যেমন: অর্থ বা সম্মান। বরং আমি এটি আল্লাহর জন্য এবং তাঁর সন্তুষ্টির জন্য রচনা করেছি’।[৯]
ইমাম আশ-শাতিবী, যিনি ‘হিরযুল আমানী ওয়া ওজহুত তাহানী’ (حرز الأماني ووجه التهاني) কবিতার রচয়িতা, তিনি বলেন,لا يقرأ قصيدتي هذه أحدٌ إلا نفعَه الله عز وجل بها؛ لأني نظَمتها لله تعالى مخلصًا له في ذلك ‘আমার এই কবিতা যেই পাঠ করবে, আল্লাহ তাকে এর মাধ্যমে উপকৃত করবেন। কারণ আমি এটি আল্লাহর জন্য ইখলাছের সঙ্গে রচনা করেছি’।[১০]
যাঁর গ্রন্থ রচনা ছিল আল্লাহর জন্য, আল্লাহ তাঁকে মর্যাদা দিয়েছেন এবং তাঁর গ্রন্থগুলো মানুষের জন্য চিরস্থায়ী উপকারে পরিণত হয়েছে। এটি এক অনস্বীকার্য সত্য, যার বহু প্রমাণ আমাদের ইতিহাসে বিদ্যমান।
ইমাম আল-কিরমানী (রাহিমাহুল্লাহ) ‘ছহীহ বুখারী’ সম্পর্কে বলেছেন, ‘যেহেতু ইমাম বুখারী (রাহিমাহুল্লাহ) এতে তাঁর নিয়তকে বিশুদ্ধ করেছেন এবং অন্তরকে পবিত্র করেছেন, তাই আল্লাহ তা‘আলা তাঁর এই কিতাবকে ইসলামের একটি বড় নিদর্শন বানিয়েছেন’।[১১] ইমাম আল-আইনী (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন,
أُعطى هذا الكتاب ما لم يُعطَ غيرُه من كتب الإسلام، وقبِله أهل المشرق والمغرب
‘ইসলামের অন্য কোন গ্রন্থকে এমন মর্যাদা দেয়া হয়নি, যা এই কিতাবকে দেয়া হয়েছে। প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের মানুষরা এটিকে গ্রহণ করে নিয়েছে’।[১২]
ইমাম মালিক (রাহিমাহুল্লাহ) যখন ‘মুওয়াত্ত্বা’ রচনা করেন, তখন মদীনার অন্য আলেমরাও অনুরূপ গ্রন্থ রচনা করেন। তাঁকে বলা হলো, ‘আপনি এই গ্রন্থটি রচনা করে কষ্ট করেছেন, অথচ অন্যরাও আপনার মত একই ধরনের গ্রন্থ রচনা করেছে’। ইমাম মালিক (রাহিমাহুল্লাহ) বললেন, ‘তাঁরা যা রচনা করেছে তা আমার কাছে নিয়ে আসো’। যখন সেই গ্রন্থগুলো আনা হলো, তিনি সেগুলো দেখলেন এবং দূরে ছুঁড়ে ফেলে দিয়ে বললেন, لتَعْلَمُنَّ أنه لا يرتفع من هذا إلا ما أُريد به وجه الله ‘তোমরা শীঘ্রই দেখতে পাবে, এর মধ্যে কেবল সেটিই টিকে থাকবে যা আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য রচিত হয়েছে’। বাস্তবিকই, সেই কিতাবগুলো যেন কুয়ার গভীরে নিক্ষিপ্ত হয়েছিল, এরপর সেগুলোর আর কোন নাম শোনা যায়নি।[১৩]
ইমাম আল-মুযানী (রাহিমাহুল্লাহ) একদিন ইমাম শাফেঈ (রাহিমাহুল্লাহ) -এর কাছে গেলেন, যখন তিনি একটি গ্রন্থ রচনা করছিলেন। তিনি শাফেঈ (রাহিমাহুল্লাহ)-কে বললেন, ‘আল্লাহ আপনাকে রহম করুন! ইমাম মালিক এবং আবূ হানিফা (রাহিমাহুল্লাহ)-এর অনুসারীরা অনেক গ্রন্থ রচনা করেছে...’ তখন ইমাম শাফেঈ (রাহিমাহুল্লাহ) বললেন, ‘হে ইবরাহীম, আমরাও রচনা করব এবং তারাও রচনা করবে, কিন্তু যা আল্লাহর জন্য রচিত হয়েছে, তা চিরকাল টিকে থাকবে’।[১৪]
আবূ মূসা আদ-দারিরকে যখন ইমাম শাফেঈ (রাহিমাহুল্লাহ)-এর গ্রন্থগুলোর জনপ্রিয়তা সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হলো, তখন তিনি উত্তর দিলেন, ‘তিনি তাঁর জ্ঞানকে আল্লাহর উদ্দেশ্যে নিবেদন করেছিলেন, তাই আল্লাহ তাঁর মর্যাদা বাড়িয়ে দিয়েছেন’। ইমাম ইবনু কাছীর (রাহিমাহুল্লাহ) ইমাম শিরাজী (রাহিমাহুল্লাহ)-এর গ্রন্থ সম্পর্কে বলেছিলেন, ‘তাঁর ইখলাছের (একনিষ্ঠতার) বরকতে তাঁর রচিত গ্রন্থগুলো প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যে ছড়িয়ে পড়েছে’।[১৫]
এই উক্তিটি প্রমাণ করে, যখন কোন কাজ আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য করা হয়, তখন তার প্রচার ও প্রসারের দায়িত্ব আল্লাহ নিজেই নিয়ে নেন।
মানুষের প্রয়োজনে রচনা, সংখ্যা বৃদ্ধির জন্য নয়
আমাদের বর্তমান সময়ে, অনেক ক্ষেত্রেই গ্রন্থ রচনা মানুষের প্রকৃত প্রয়োজন মেটানোর জন্য করা হয় না। বরং, তা লেখকের আত্মপ্রচার, খ্যাতি অর্জন, অর্থ ও প্রতিপত্তি লাভ, পদ ও উপাধি পাওয়া কিংবা প্রশংসা শোনার উদ্দেশ্যে করা হয়। এ কারণেই আজকাল প্রচুর বই প্রকাশিত হচ্ছে, কিন্তু তার মধ্যে উপকারী ও ফলপ্রসূ গ্রন্থের সংখ্যা খুব কম।
এর বিপরীতে, প্রকৃত জ্ঞানীরা মানুষের প্রয়োজন মেটানোর জন্য গ্রন্থ রচনা করতেন। শাইখ ছালেহ বিন আব্দুল আযীয আলে শাইখ, ইমাম মুহাম্মাদ বিন আব্দুল ওয়াহহাব (রাহিমাহুল্লাহ)-এর গ্রন্থ সম্পর্কে বলেন, ‘তাঁর বিভিন্ন গ্রন্থ ছিল মানুষের প্রয়োজনের ওপর ভিত্তি করে, শুধু সংখ্যা বাড়ানোর জন্য বা নিজেকে জাহির করার জন্য নয়। তিনি এমন বিষয়ে লিখেছেন, যা মানুষের জন্য অপরিহার্য ছিল। তিনি কেবল লেখার জন্য লেখেননি, বরং মানুষকে আহ্বান করার জন্য লিখেছেন, আর এই দু’য়ের মধ্যে বিশাল পার্থক্য রয়েছে’।[১৬]
এই মহান দর্শনকে বাস্তব রূপ দিয়েছিলেন শাইখুল ইসলাম আহমাদ বিন আব্দুল হালিম ইবনু তাইমিয়াহ (রাহিমাহুল্লাহ)। তাঁর জন্ম হয়েছিল এমন এক সময়ে যখন মুসলিম বিশ্ব ভ্রান্ত মতবাদের ঝড়ে বিপর্যস্ত। সেই ঝড়ো হাওয়ায় ইসলামের মূল ভিত্তি যখন নড়বড়ে, তখন তিনি কলমকে তরবারীর মত শাণিত করে ভ্রান্তির প্রাসাদ ভেঙে দিয়েছিলেন। তাঁর লেখনী ছিল কেবল অক্ষর বিন্যাস নয়, বরং ছিল সত্যের এক বলিষ্ঠ উচ্চারণ। তাঁর সেই অনবদ্য রচনার কিছু উদাহরণ নিচে দেয়া হলো, যা থেকে বোঝা যায়, জ্ঞানের সাধক কীভাবে সময়ের দাবি পূরণ করেন।
- খ্রিষ্টানদের অপপ্রচারের জবাবে : তিনি লিখেছিলেন, الجواب الصحيح لمن بدل دين المسيح ‘আল-জাওয়াবুছ ছহীহ লিমান বাদ্দালা দীনাল মাসিহা’ ছিল সত্যের এক অকাট্য দলীল।
- ভ্রান্ত পথের পথিকদের জন্য : ক্বদর অস্বীকারকারী এবং ছাহাবীদের সম্মানহানি কারীদের বিরুদ্ধে তিনি রচনা করেছিলেনÑ তাঁর কালজয়ী গ্রন্থ منهاج السنة ‘মিনহাজুস সুন্নাহ’।
- যুক্তিবাদের বিভ্রান্তি খণ্ডনে : যারা অহির আলোকে যুক্তির সঙ্গে সাংঘর্ষিক মনে করত, তাদের জবাবে তিনি লিখেছিলেন, درء تعارض العقل والنقل ‘দারউ তা‘আরুযিল ‘আকল ওয়ান নাকল’।
- আল্লাহর ছিফাত বিকৃতকারীদের বিরুদ্ধে : জাহমিয়্যাহ এবং আল্লাহর ছিফাতকে অপব্যাখ্যা কারীদের জবাব দিতে তিনি কলম ধরেছিলেন,بيان تلبيس الجهمية، التدمرية ‘বায়ানু তালবিসিল জাহমিয়্যাহ আত-তাদমুরিইয়াহ’ সহ অন্যান্য গ্রন্থে।
- কাফিরদের অনুসরণকারীদের বিরুদ্ধে : যারা দ্বীন ও আচার-আচরণে কাফেরদের অনুকরণ করত, তাদের জন্য তিনি লিখেছিলেন, اقتضاء الصراط المستقيم لمخالفة أصحاب الجحيم ‘ইকতিযাউস ছিরাত্বিল মুস্তাকিম লি-মুখালাফাতি আছহাবিল জাহীম’।
- কবরপূজারী ও ছূফীদের বিরুদ্ধে : কবরপূজা এবং অসৎ ছূফীদের ভ্রান্তি খণ্ডনে তিনি রচনা করেছিলেন, قاعدة جلية فى التوسل و الوسيلة এবং الاستغاثة ‘ক্বায়িদাতুন জালিইয়াহ ফিত তাওয়াসসুল ওয়াল ওয়াসিলাহ’ এবং ‘আল-ইস্তিগাসা’-এর মতো গুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থ।
- নাস্তিক ও দার্শনিকদের জবাব : নাস্তিকদের মিথ্যা দর্শনকে তিনি চূর্ণ করেছিলেন তাঁর الصفدية এবং السبعينية ‘আস-ছাফাদিইয়াহ’ এবং ‘আস-সাবঈনিয়্যাহ’ গ্রন্থের মাধ্যমে।
- রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর সম্মান রক্ষায় : রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর প্রতি কটূক্তিকারীদের বিরুদ্ধে তাঁর কলম থেকে বেরিয়ে এসেছিল الصارم المسلول على شاتم الرسول ‘আস-ছারিমুল মাসলূল ‘আলা শাতিমির রাসুল’।
শাইখুল ইসলাম ইবনু তাইমিয়াহ (রাহিমাহুল্লাহ)-এর এই অবিস্মরণীয় অবদান প্রমাণ করে যে, প্রকৃত গ্রন্থ রচনার মূল উদ্দেশ্য ব্যক্তিগত খ্যাতি বা অর্থ নয়, বরং উম্মাহর কল্যাণ। আল্লাহ তা‘আলা এই মহান মনীষীর কবরকে জান্নাতের টুকরো বানিয়ে দিন-আমীন!
গ্রন্থ রচনার পূর্বে ইস্তিখারা
জ্ঞান সাধনার এক পবিত্র দিক হলো, এর প্রতিটি পদক্ষেপে স্রষ্টার কাছে দিকনির্দেশনা চাওয়া। আমাদের পূর্বসূরি আলেমগণের মাঝে এটি এক প্রচলিত ও গভীর রীতি ছিল যে, তাঁরা কোন গ্রন্থ রচনার পূর্বে আল্লাহর কাছে ইস্তিখারা (সিদ্ধান্ত গ্রহণের জন্য আল্লাহর কাছে সাহায্য চাওয়া) করতেন। এর মাধ্যমে তাঁরা নিশ্চিত হতে চাইতেন যে, তাঁদের এই প্রচেষ্টা আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য এবং তা মানুষের জন্য কল্যাণকর হবে।
ইমাম ইবনে আকিল (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন, ‘ইমাম শিরাজী (রাহিমাহুল্লাহ) কোন একটি মাসআলা লিপিবদ্ধ করার পূর্বে দু’রাক‘আত ছালাত আদায় করে নিতেন’।[১৭] তাঁর এই অভ্যাস থেকে বোঝা যায়, জ্ঞানের প্রতিটি ক্ষুদ্র অংশেও তিনি আল্লাহর সাহায্য কামনা করতেন।
ইমাম ইবনে জারির আত-তাবারী (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন, استخرت الله تعالى في عمل كتب التفسير ‘তাফসীর গ্রন্থ রচনার পূর্বে আমি আল্লাহর কাছে ইস্তিখারা করেছিলাম’।[১৮] তিনি জানতেন যে, আল্লাহর পবিত্র কালামের ব্যাখ্যা করা এক বিশাল দায়িত্ব, তাই তিনি এ পথে আল্লাহর নির্দেশনা চেয়েছেন। ইমাম ইবনে খুযায়মা (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন,
كنتُ إذا أردت أن أصنِّفَ الشيء، دخلت الصلاة مستخيرًا حتى يفتح لي فيها، ثم أبتدئ التصنيف
‘আমি যখনই কোন কিছু রচনা করতে চাইতাম, তখন আমি ইস্তিখারার নিয়তে ছালাতে দাঁড়াতাম, যতক্ষণ না আল্লাহ আমার জন্য পথ খুলে দিতেন। এরপর আমি লেখা শুরু করতাম’।[১৯] এটি তাঁর দৃঢ় বিশ্বাসের প্রতিচ্ছবি যে, জ্ঞান আল্লাহর পক্ষ থেকে আসে।
কাযী ইবনে আবি ইয়া‘লা (রাহিমাহুল্লাহ) তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ ‘তাবাকাত আল-হানাবিলা’-এর ভূমিকায় বলেন,هذا كتاب استخَرنا الله في تأليفه ‘এই গ্রন্থটি রচনার পূর্বে আমরা আল্লাহর কাছে ইস্তিখারা করেছিলাম’।[২০] এর মাধ্যমে তিনি ঘোষণা করেছেন যে, এই কাজটি মানবীয় মেধার চেয়েও আল্লাহর ইচ্ছার ওপর অধিক নির্ভরশীল।
হাফেয ইবনে রজব (রাহিমাহুল্লাহ) তাঁর গ্রন্থ ‘লাতাইফ আল-মা‘আরিফ’-এর ভূমিকায় বলেন, ‘আমি এই গ্রন্থটি সংকলনের জন্য আল্লাহর কাছে ইস্তিখারা করেছি’।[২১]
গ্রন্থ রচনার পূর্বে আল্লাহর কাছে সাহায্য প্রার্থনা
মানুষ যখন নিজের মেধা ও সামর্থ্যরে ওপর অতিরিক্ত আস্থা রাখে এবং স্রষ্টার কাছে নিজেকে দরিদ্র মনে করে না, তখন তার পতন অবশ্যম্ভাবী। তাই, প্রকৃত জ্ঞানীরা তাদের প্রতিটি পদক্ষেপে, বিশেষ করে গ্রন্থ রচনার মত বিশাল কাজে, আল্লাহর কাছে সাহায্য চাইতেন। তাঁদের দৃঢ় বিশ্বাস ছিল, আল্লাহর সাহায্য ছাড়া কোন মহৎ কাজই সম্ভব নয়। ইবনু জারির আত-তাবারী (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন,سألت الله العون على ما نويته من تصنيف التفسير، قبل أن أعملَه بثلاث سنين، فأعانني ‘তাফসীর গ্রন্থ রচনার তিন বছর আগে থেকেই আমি আল্লাহর কাছে সাহায্য চেয়েছিলাম, আর আল্লাহ আমাকে সাহায্য করেছেন’।[২২]
কাযী ইবনে আবী ইয়া‘লা (রাহিমাহুল্লাহ) তাঁর গ্রন্থ ‘তাবাকাত আল-হানাবিলা’-এর ভূমিকায় বলেন, ‘এই গ্রন্থটি রচনার জন্য আমরা আল্লাহর কাছে সাহায্য চেয়েছি’।[২৩] ইমাম আল-হাকিম (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন,شربتُ ماء زمزم، وسألت الله أن يرزقني حُسن التصنيف ‘আমি যমযমের পানি পান করেছি এবং আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করেছি, যাতে তিনি আমাকে সুন্দরভাবে গ্রন্থ রচনার সামর্থ্য দেন’।[২৪]
গ্রন্থ প্রকাশে তাড়াহুড়ো নয়
আলেমগণ তাঁদের রচিত গ্রন্থ প্রকাশের ক্ষেত্রে কোন তাড়াহুড়ো করতেন না। তাঁরা জানতেন, জ্ঞানের ফল পাকার জন্য সময় প্রয়োজন। ইমাম ইবনে জামা‘আহ (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন, ‘কোন গ্রন্থ পরিমার্জন ও বারবার পর্যালোচনা না করে তা প্রকাশ করা উচিত নয়’।[২৫] এই নীতিতেই তাঁরা কাজ করেছেন। ইমাম বুখারী (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন,صنَّفت كتبي ثلاث مرات ‘আমি আমার গ্রন্থগুলো তিনবার রচনা করেছি’।[২৬] অর্থাৎ তিনি তিনবার সেগুলোকে সংশোধন ও পরিমার্জন করেছেন।
গ্রন্থ রচনার কঠোর সাধনা
সত্যিকারের গ্রন্থ রচনা একটি কঠিন কাজ, যা বিশাল শ্রম ও দীর্ঘ সময়ের দাবি রাখে। এমন অনেক গ্রন্থ আছে, যা সম্পূর্ণ হতে বহু বছর লেগেছে। তবে এই নিয়ম থেকে ব্যতিক্রমও দেখা যায়, যখন আল্লাহ কোন বান্দাকে এক অসাধারণ প্রতিভা দান করেন। যেমন, শাইখুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়া (রাহিমাহুল্লাহ)। তাঁর সম্পর্কে বলা হয়, তিনি তাঁর মহান গ্রন্থ ‘আল-আক্বীদা আল-ওয়াসিতিয়াহ’ মাগরিব ও এশার মধ্যবর্তী সময়ে এক বৈঠকেই রচনা করেছিলেন। এটি আল্লাহর এক বিশেষ অনুগ্রহ, যা তিনি যাকে চান তাকেই দান করেন। তবে অনেক পণ্ডিত তাঁদের জীবনের দীর্ঘ সময় ব্যয় করেছেন গ্রন্থ রচনায়। এমন কয়েকজন মহান ব্যক্তির কথা নিচে উল্লেখ করা হলো:
১. ইমাম মালিক (রাহিমাহুল্লাহ) তাঁর বিখ্যাত ‘মুওয়াত্ত্বা’ গ্রন্থটি রচনার জন্য চল্লিশ বছর সময় ব্যয় করেন। যখন তাঁর ছাত্ররা বইটি মাত্র চল্লিশ দিনে পড়ে শেষ করে, তখন তিনি বলেন, ‘আমি যে গ্রন্থটি চল্লিশ বছরে রচনা করেছি, তোমরা তা চল্লিশ দিনে শেষ করে ফেলেছ! তোমাদের পক্ষে এর গভীরতা বোঝা কঠিন’।[২৭]
২. ইমাম আবু উবাইদ আল-কাসিম বিন সাল্লাম (রাহিমাহুল্লাহ) তাঁর গ্রন্থ “غريب الحديث” রচনাতেও দীর্ঘ সময় ব্যয় করেছেন।
৩. হাফেয ইবনে হাজার আসক্বালানী (রাহিমাহুল্লাহ) তাঁর কালজয়ী الإصابة فى تمييز الصحابة” গ্রন্থটি প্রায় চল্লিশ বছর ধরে রচনা করেছেন। তিনি এই কাজ শুরু করেন ৮০৯ হিজরিতে এবং শেষ করেন ৮৪৭ হিজরিতে।
৪. শাইখ মুহাম্মাদ বিন তাহির ইবনে আশূর (রাহিমাহুল্লাহ) তাঁর বিখ্যাত তাফসীর গ্রন্থ “التحرير والتنوير” রচনা করতে ঊনচল্লিশ বছর ও ছয় মাস সময় লেগেছিল। তিনি নিজেই গ্রন্থের শেষে উল্লেখ করেছেন যে, এই সময়ে তিনি নানা ব্যস্ততা ও অন্যান্য কাজেও জড়িত ছিলেন।
৫. আসামা বিন মুনকিদের বই “العصا” যার প্রকৃত নাম “الاعتبار”। এই মহাকাব্যিক গ্রন্থটিতে তিনি জীবনের দীর্ঘ চল্লিশ বছর ধরে তাঁর আত্মজীবনী এবং ক্রুসেডের সময়কার অভিজ্ঞতাগুলো লিপিবদ্ধ করেছেন, যা আজও জ্ঞানপিপাসুদের কাছে এক অমূল্য সম্পদ।
৬. ইমাম ইবনে আব্দুল বার্র (রাহিমাহুল্লাহ): তাঁর অমর গ্রন্থ “التمهيد” রচনা করতে ত্রিশটি বসন্ত পার করে দিয়েছেন।
৭. ইমাম আল-মিযি (রাহিমাহুল্লাহ): “تهذيب الكمال” -এর মত বিশাল কাজ শেষ করতে তাঁরও লেগেছিল তিরিশ বছরের কঠোর পরিশ্রম।
৮. মুহাম্মাদ হামযা আল-ফানারি আর-রুমি: أصول الفقه নিয়ে লেখা তাঁর একটি গ্রন্থ ত্রিশ বছর ধরে রচিত হয়েছিল।
৯. হাফেয ইবনে হাজার আসক্বালানী (রাহিমাহুল্লাহ): তাঁর কালজয়ী ‘ফাৎহুল বারী’ গ্রন্থটি, যা ছহীহ বুখারীর ব্যাখ্যা, তা রচনা করতে পঁচিশ বছরেরও বেশিসময় লেগেছিল। ৮১৭ হিজরীতে শুরু করে ৮৪২ এ শেষ করেন।
১০. শাইখ মুহাম্মাদ আব্দুল খালেক (রাহিমাহুল্লাহ): ‘দিরাসাত লি-উসলুব আল-কুরআন’ বইটি লিখতে তিনি পঁচিশ বছরের বেশি সময় দিয়েছেন।
১১. ইমাম আল-মুযানী (রাহিমাহুল্লাহ): ফিক্বহ শাস্ত্রের সারসংক্ষেপ নিয়ে তাঁর বইটি শেষ করতে বিশটি বছর লেগেছিল।
১২. ইমাম মুসলিম ইবনে আল-হাজ্জাজ (রাহিমাহুল্লাহ): তাঁর বিখ্যাত ‘ছহীহ’ গ্রন্থটি শেষ করতে পনেরো বছর ধরে অবিরাম পরিশ্রম করে গেছেন।
১৩. আজ-যাজ্জাজ (রাহিমাহুল্লাহ): ব্যাকরণবিদ হিসাবে পরিচিত এই মহান পণ্ডিত ‘মা‘আনি আল-কুরআন’ বইটি লিখতে পনেরো বছর সময় ব্যয় করেছেন।
১৪. ইমাম মুহাম্মদ আস-সাজিস্তানী (রাহিমাহুল্লাহ): ‘নুযহাত আল-কুলুব’ রচনা করতেও পনেরো বছর লেগেছিল।
১৫. ইমাম আশ-শিরাজি (রাহিমাহুল্লাহ): ফিক্বহ শাস্ত্রের ‘আল-মুহাজ্জাব’ বইটি লিখতে তাঁর ১৪ বছর সময় লাগে।
১৬. শায়খ আবু ইসহাক আল-শিরাজী (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন, আমি ‘আল-মুহাদ্দাব’ গ্রন্থটি লেখা শুরু করি ৪৫৫ হিজরি সনে এবং এটি শেষ করি ৪৬৯ হিজরি সনের রজব মাসের শেষ রোববার।[২৮]
১৭. শায়খ আবু ইসহাক আল-শিরাজী (রাহিমাহুল্লাহ) ‘আল-মুহাদ্দাব’ গ্রন্থটি রচনায় চৌদ্দ বছর সময় ব্যয় করেছিলেন।
১৮. ইমাম আস-সারখাসী (রাহিমাহুল্লাহ): ‘আল-মাবসুত’ নামক বিশাল গ্রন্থটি শেষ করতে তিনি পনেরোটি বছর ধরে নিরলস কাজ করেছেন।
এই মহাপুরুষদের প্রত্যেকেই তাঁদের জীবন উৎসর্গ করে গেছেন জ্ঞান ও সত্যের সন্ধানে। তাঁদের এই দীর্ঘ সাধনার ফসলগুলো আজও আমাদের পথ দেখায় এবং নতুন প্রজন্মের জন্য প্রেরণার উৎস হয়ে আছে।
আর জ্ঞানসাধনার পথে দারিদ্র্য যে কোন বাধা নয়, তার এক অনন্য দৃষ্টান্ত রেখে গেছেন শাইখ নাছিরুদ্দীন আলবানী (রাহিমাহুল্লাহ)। প্রথম জীবনে চরম দারিদ্র্যের মাঝেও তাঁর জ্ঞানান্বেষণের নেশা ছিল অপ্রতিরোধ্য। তাঁর এক ছাত্র শাইখ মাশহূর হাসান (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন, শাইখ আলবানী যখন ‘সিলসিলা যঈফাহ’-এর পঞ্চম খণ্ডের পাণ্ডুলিপি সম্পাদনার জন্য আমাকে দিয়েছিলেন, আমি অবাক হয়ে দেখি, তিনি চিনি, চাল এবং অন্যান্য পণ্যের পরিত্যক্ত প্যাকেটের লাল রঙের কাগজে তা লিখেছিলেন! এই দৃশ্য দেখে আমি নিজেকে সামলাতে না পেরে কেঁদে ফেলেছিলাম। শাইখ আমার ক্রন্দনের কারণ জিজ্ঞেস করে বলেছিলেন, ‘দেখ, আমার কাছে তখন ভালো কাগজ কেনার মত প্রয়োজনীয় অর্থ ছিল না’। তাঁর আরেক ছাত্র আবু মু‘আবিয়া বৈরূতীর ভাষ্যমতে, দারিদ্র্যের কারণে তিনি রাস্তার পরিত্যক্ত কাগজ কুড়িয়ে তাতে লিখতেন এবং একসময় সস্তা হওয়ায় কেজি দরে পরিত্যক্ত কাগজ কিনে নিতেন’। এই ঘটনাগুলো প্রমাণ করে, জ্ঞান সাধনার পথে কোন বাধাই বড় নয়; কেবল প্রয়োজন নিরবচ্ছিন্ন ইখলাছ এবং ইস্পাত কঠিন মনোবল।
ড. আব্দুর রহমান আল-উছায়মীন (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন, ‘আমি প্রতিদিন নতুন কিছু আবিষ্কার করি, আর যত গভীরে যাই, ততই বুঝতে পারি যে, আমার গবেষণা সবেমাত্র শুরু হয়েছে। তাই আল্লাহর কাছে কৃতজ্ঞ যে, আমি আমার প্রাথমিক গবেষণাগুলো প্রকাশ করিনি, যদিও তা অনেক বেশি এবং উপকারী ছিল। কারণ, ধৈর্যশীল গবেষণা ও গভীর অনুসন্ধান আরও বেশি উপকারী ও ফলপ্রসূ’।
উচ্চমানের জন্য কঠোর পরিশ্রম
আলেমগণ তাঁদের রচিত গ্রন্থগুলোকে মানসম্মত করার জন্য ব্যাপক পরিশ্রম করতেন। ইমাম আত-ত্বাবারানী (রাহিমাহুল্লাহ) তাঁর ‘আল-মু‘জামুল আওসাত্ব’ গ্রন্থটি সম্পর্কে বলেন, ‘এই কিতাবটি আমার প্রাণ, কারণ এর জন্য আমাকে অনেক কষ্ট করতে হয়েছে’।[২৯] ইমাম আল-মুযানী (রাহিমাহুল্লাহ) তাঁর أصول الفقه গ্রন্থ সম্পর্কে বলেন, ‘আমি এটি রচনা করতে বিশ বছর ব্যয় করেছি এবং তিনবার লিখেছি ও পরিবর্তন করেছি’।
গ্রন্থ রচনায় আলেমদের মতামত গ্রহণ
গ্রন্থ রচনার পর আলেমগণ এটি বিশেষজ্ঞদের কাছে পেশ করতেন। ইমাম বুখারী (রাহিমাহুল্লাহ) তাঁর ‘ছহীহ’ গ্রন্থটি রচনার পর ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বল (রাহিমাহুল্লাহ), ইয়াহইয়া ইবনে মা‘ঈন (রাহিমাহুল্লাহ) এবং আলী ইবনে আল-মাদীনী (রাহিমাহুল্লাহ)-এর কাছে পেশ করেন। তাঁরা এটি পসন্দ করেন এবং এর বিশুদ্ধতার সাক্ষ্য দেন। ইমাম ইবনে মাজাহ আল-কাযভিনী (রাহিমাহুল্লাহ) তাঁর ‘সুনান’ গ্রন্থটি আবু যুর‘আ আর-রাযির কাছে পেশ করেন। ইমাম আবূ দাঊদ আস-সিজিস্তানী (রাহিমাহুল্লাহ) তাঁর ‘সুনান’ গ্রন্থটি ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বল (রাহিমাহুল্লাহ)-এর কাছে পেশ করেন।
গ্রন্থের উপকারের জন্য প্রার্থনা
লেখক হিসাবে তাঁদের প্রচেষ্টা শেষ হওয়ার পর তাঁরা আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করতেন, যেন তাঁদের গ্রন্থগুলো মানুষের জন্য উপকারী হয়। ইমাম বুখারী (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন, ‘আমি আশা করি, আল্লাহ এই গ্রন্থগুলো দ্বারা মুসলিমদেরকে বরকত দেবেন’।[৩০]
হাফেয ইবনে রজব (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন, ‘ইমাম তিরমিযী (রাহিমাহুল্লাহ) তাঁর ‘আল-ইলাল’ গ্রন্থটি সমাপ্ত করার পর আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করেছেন, যেন তিনি তার দ্বারা উপকার দান করেন এবং রহমতের মাধ্যমে এটিকে তাঁর জন্য ক্ষতিকর না করেন’।
অনেক মনীষীই পথের ক্লান্তি আর প্রতিকূলতাকে জ্ঞানচর্চার সুযোগে পরিণত করেছেন। লাইব্রেরির আরাম উপেক্ষা করে, ইমাম ইবনুল কাইয়িম (রাহিমাহুল্লাহ) তাঁর সফরকালেই রচনা করে গেছেন সেই মহৎ গ্রন্থ ‘যাদুল মা‘আদ ফি খাইরি মা‘আদ’, যা আজও আমাদের পথের দিশা।
এই আলোচনায় আমরা দেখলাম যে, গ্রন্থ রচনা কেবল কিছু তথ্য একত্র করার নাম নয়, বরং এটি এক পবিত্র সাধনা। এটি এমন এক গভীর প্রচেষ্টা, যেখানে লেখক তাঁর জীবনের শ্রেষ্ঠ সম্পদ, অর্থাৎ মেধা, সময় এবং ইখলাছকে উৎসর্গ করেন। ইমাম ইবনুল জাওযী (রাহিমাহুল্লাহ)-এর কথায়, ‘আলেমের রচিত গ্রন্থ তাঁরই অমর সন্তান’-এই উক্তিটি যেন এর বাস্তব প্রতিচ্ছবি। যখন কোন গ্রন্থ আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য রচিত হয়, তখন তার প্রচার ও প্রসারের দায়িত্ব আল্লাহ নিজেই নিয়ে নেন। ইমাম মালিক (রাহিমাহুল্লাহ), ইমাম বুখারী (রাহিমাহুল্লাহ), ইমাম শাফেঈ (রাহিমাহুল্লাহ) এবং আরও অসংখ্য মনীষীর জীবন থেকে আমরা দেখতে পাই, তাঁদের বিশুদ্ধ নিয়ত এবং কঠোর পরিশ্রম তাঁদের গ্রন্থগুলোকে কালজয়ী করে তুলেছে।
আজকের এই যুগে যখন বইয়ের সংখ্যা বাড়ছে, তখন এর গুণগত মান নিয়ে প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক। আমাদের পূর্বসূরিদের আদর্শ থেকে আমাদের শিক্ষা নেয়া উচিত যে, একটি উপকারী ও ফলপ্রসূ গ্রন্থ রচনার জন্য প্রয়োজন খ্যাতি বা অর্থের লোভ থেকে মুক্ত থাকা। প্রয়োজন আল্লাহর কাছে ইস্তিখারা করা, তাঁর সাহায্য প্রার্থনা করা এবং কঠোর পরিশ্রমের মাধ্যমে গ্রন্থটিকে ত্রুটিমুক্ত করা।
পরিশেষে বলা যায়, যে ব্যক্তি জ্ঞানচর্চার এই মহান পথে নিজেকে উৎসর্গ করে, তার জন্য দুনিয়া ও আখিরাতে রয়েছে অফুরন্ত প্রতিদান। একজন লেখকের অমর সৃষ্টি কেবল তাঁর পার্থিব জীবনের সমাপ্তি ঘটলেও তার জ্ঞান ও ছওয়াব প্রবহমান থাকে। তাই, আসুন আমরাও জ্ঞানচর্চা ও তার প্রসারে নিজেদের উৎসর্গ করি, যেন আমাদের কর্মও এক চলমান ছাদাক্বায়ে জারিয়াহ হয়ে ওঠে, যা আমাদের মৃত্যুর পরেও আমাদের জন্য কল্যাণের দুয়ার খুলে দেবে।
* ভাইস প্রিন্সিপ্যাল, দারুল হুদা ইসলামী কমপ্লেক্স, বাঘা, রাজশাহী।
তথ্যসূত্র :
[১]. ছহীহ মুসলিম, হা/১৬৩১।
[২]. সাইদুল খাতের, ১ম খণ্ড, পৃ. ২৪২।
[৩]. প্রাগুক্ত, ১ম খণ্ড, পৃ. ৩৪।
[৪]. ছহীহ বুখারী, হা/১।
[৫]. কিরমানী, আল-কাওয়াকিবুদ দারারিয়্যু ফী শারহি ছহীহিল বুখারী, ১ম খণ্ড, পৃ. ২৩।
[৬]. ইবনু হাজার আসক্বালানী, ফাৎহুল বারী, ১ম খণ্ড, পৃ. ১০।
[৭]. বদরুদ্দীন আইনী, উমদাতুল কারী, ১ম খণ্ড, পৃ. ২২।
[৮]. ইবনু রজব হাম্বলী, জামিঊল ‘ঊলূম ওয়াল হাকাম, ১ম খণ্ড, পৃ. ৩১।
[৯]. আল-কাওয়াকিবুদ দারারিয়্যু ফী শারহি ছহীহিল বুখারী, ১ম খণ্ড, পৃ. ৬।
[১০]. ইনবাহুর রওয়াতি ‘আলা আনবাহিন নাজাতি, ৪র্থ খণ্ড, পৃ. ১৬১।
[১১]. কিরমানী, আল-কাওয়াকিবুদ দারারিয়্যু ফী শারহি ছহীহিল বুখারী, ১ম খণ্ড, পৃ. ২৩।
[১২]. বদরুদ্দীন আইনী, উমদাতুল কারী, ১ম খণ্ড, পৃ. ২২।
[১৩]. আত-তামহীদ, ১ম খণ্ড, পৃ. ৮৬।
[১৪]. বায়হাক্বী, মানাকিবুশ শাফী, ১ম খণ্ড, পৃ. ১৭৭।
[১৫]. তবাকাশুশ শাফিইয়্যাহ, ১ম খণ্ড, পৃ. ৪২৭।
[১৬]. আত-তামহীদ, শারহু কিতাবুত তাওহীদ, ১ম খণ্ড, পৃ. ৮।
[১৭]. তাবাকাশুশ শাফিইয়্যাহ, ১ম খণ্ড, পৃ. ৪৬২।
[১৮]. মু’জামুল আদাবা, ৬ষ্ঠ খণ্ড, পৃ. ২৪৫৩।
[১৯]. যাহাবী, তারিখুল ইসলাম, ৭ম খণ্ড, পৃ. ২৪৪।
[২০]. তাবাকাতুল হানাবালা, ১ম খণ্ড, পৃ. ৪।
[২১]. লাতাইফুল মাআরিফ, ১ম খণ্ড, পৃ. ২২।
[২২]. তারিখ দামেস্ক, ৫২তম খণ্ড, পৃ. ১৯৭।
[২৩]. তাবাকাতুল হানাবালা, ১ম খণ্ড, পৃ. ৪।
[২৪]. তাবাকাতুল ফুকাহাউশ শাফিইয়্যাহ, ১ম খণ্ড, পৃ. ১৯৯।
[২৫]. তাযকিরাতুস সামে’, ১ম খণ্ড, পৃ. ৩০।
[২৬]. আত-তাওযীহ লি শারহিল জামেঊস ছহীহ, ১ম খণ্ড, পৃ. ৭৯।
[২৭]. তারতীবুল মাদারিক, ১ম খণ্ড, পৃ. ১০৩।
[২৮]. তাবাকাত আল-ফুকাহা আল-শাফি’ইয়াহ, ১ম খণ্ড, পৃ. ৩০৯।
[২৯]. যাহবী, তারিখুল ইসলাম, ৮ম খণ্ড, পৃ. ১৪৩।
[৩০]. নববী, তাহযীবুল আসমাই ওয়াল লুগাত, ১ম খণ্ড, পৃ. ৭৫।