আবূ যুর‘আ (রাযিয়াল্লাহু আনহু) এবং উম্মু যুর‘আ (রাযিয়াল্লাহু আনহা)
- মূল : ফাউযিয়া বিনতে মুহাম্মাদ আল-উক্বাইলী
- অনুবাদ : হাফীযুর রহমান বিন দিলজার হোসাইন*
আয়েশা (রাযিয়াল্লাহু আনহা) বলেন, ১১ জন মহিলা এক স্থানে একত্রিত বসল এবং সকলে মিলে এ কথার ওপর একমত হল যে, তারা নিজেদের স্বামীর ব্যাপারে কোন কিছুই গোপন রাখবে না।*
প্রথম মহিলা বলল, আমার স্বামী হচ্ছে অত্যন্ত হাল্কা-পাতলা দুর্বল উটের গোশতের মত যেন কোন পর্বতের চূড়ায় রাখা হয়েছে এবং সেখানে উঠা সহজ কাজ নয় এবং গোশতের মধ্যে এত চর্বিও নেই, যে কারণে সেখানে উঠার জন্য কেউ কষ্ট স্বীকার করবে। দ্বিতীয় জন বলল, আমি আমার স্বামী সম্পর্কে কিছু বলব না, কারণ আমি ভয় করছি যে, তার সম্পর্কে বলতে গিয়ে শেষ করা যাবে না। কেননা, যদি আমি তার সম্পর্কে বলতে যাই, তাহলে আমাকে তার সকল দুর্বলতা এবং মন্দ দিকগুলো সম্পর্কেও বলতে হবে। তৃতীয় মহিলা বলল, আমার স্বামী একজন দীর্ঘদেহী ব্যক্তি। আমি যদি তার বর্ণনা দেই (আর সে যদি তা শোনে) তাহলে সে আমাকে ত্বালাক্ব দিবে। আর যদি আমি কিছু না বলি, তাহলে সে আমাকে ঝুলন্ত অবস্থায় রাখবে। অর্থাৎ ত্বালাক্বও দেবে না, স্ত্রীর মত ব্যবহারও করবে না। চতুর্থ মহিলা বলল, আমার স্বামী হচ্ছে তিহামার রাতের মত মাঝামাঝি-অতি গরমও না, অতি ঠাণ্ডাও না, আর আমি তাকে ভয়ও করি না, আবার তার প্রতি অসন্তুষ্টও নই।
পঞ্চম মহিলা বলল, যখন আমার স্বামী ঘরে ঢুকে তখন চিতা বাঘের মত থাকে। যখন বাইরে যায় তখন সিংহের মত তার স্বভাব থাকে এবং ঘরের কোন কাজের ব্যাপারে কোন প্রশ্ন তোলে না। ষষ্ঠ মহিলা বলল, আমার স্বামী যখন খেতে বসে, তখন সব খেয়ে ফেলে। যখন পান করে, তখন সব শেষ করে। যখন নিদ্রা যায়, তখন একাই চাদর বা কাঁথা মুড়ি দিয়ে শুয়ে থাকে। এমনকি হাত বের করেও আমার খবর নেয় না। সপ্তম মহিলা বলল, আমার স্বামী হচ্ছে পথভ্রষ্ট অথবা দুর্বল মানসিকতা সম্পন্ন এবং চরম বোকা, সব রকমের দোষ তার আছে। সে তোমার মাথায় বা শরীরে অথবা উভয় স্থানে আঘাত করতে পারে। অষ্টম মহিলা বলল, আমার স্বামীর স্পর্শ হচ্ছে খড়গোশের মত এবং তার দেহের সুগন্ধি হচ্ছে যারনাব (এক প্রকার বনফুল)-এর মত। নবম মহিলা বলল, আমার স্বামী হচ্ছে অতি উচ্চ অট্টালিকার মত এবং তার তরবারি ঝুলিয়ে রাখার জন্য সে চামড়ার লম্বা ফলি পরিধান করে (অর্থাৎ সে দানশীল ও সাহসী)। তার ছাইভষ্ম প্রচুর পরিমাণের (অর্থাৎ প্রচুর মেহমান আছে এবং মেহমানদারীও হয়) এবং মানুষের জন্য তার গৃহ অবারিত। এলাকার জনগণ তার সঙ্গে সহজেই পরামর্শ করতে পারে। দশম মহিলা বলল, আমার স্বামীর নাম হল মালিক। মালিকের কী প্রশংসা আমি করব। যা প্রশংসা করব সে তার চেয়ে ঊর্ধ্বে। তার অনেক মঙ্গলময় উট আছে, তার অধিকাংশ উটকেই ঘরে রাখা হয় (অর্থাৎ মেহমানদের যব্হ করে খাওয়ানোর জন্য) এবং অল্প সংখ্যক মাঠে চরার জন্য রাখা হয়। বাঁশির শব্দ শুনলেই উটগুলো বুঝতে পারে যে, তাদেরকে মেহমানদের জন্য যব্হ করা হবে।
একাদশতম মহিলা বলল, আমার স্বামী আবূ যুর‘আ তার কথা আমি কী বললব। সে আমাকে এত অধিক গহনা দিয়েছে যে, আমার কান ভারী হয়ে গেছে, আমার বাজুতে মেদ জমেছে এবং আমি এত সন্তুষ্ট হয়েছি যে, আমি নিজেকে গর্বিত মনে করি। সে আমাকে এনেছে অত্যন্ত গরীব পরিবার থেকে, যে পরিবার ছিল মাত্র কয়েকটি বকরীর মালিক। সে আমাকে অত্যন্ত ধনী পরিবারে নিয়ে আসে, যেখানে ঘোড়ার হরেষাধ্বনি এবং উটের হাওদার আওয়াজ এবং শস্য মাড়াইয়ের খসখসানি শব্দ শোনা যায়। সে আমাকে ধন-সম্পদের মধ্যে রেখেছে। আমি যা কিছু বলতাম, সে বিদ্রুপ করত না এবং আমি নিদ্রা যেতাম এবং সকালে দেরী করে উঠতাম এবং আমি পান করতাম, অত্যন্ত তৃপ্তি সহকারে পান করতাম। আর আবূ যুর‘আর আম্মার কথা কী বলব! তার পাত্র ছিল সর্বদা পরিপূর্ণ এবং তার ঘর ছিল প্রশস্ত। আবূ যুর‘আর পুত্রের কথা কী বলব! সেও খুব ভাল ছিল। তার শয্যা এত সংকীর্ণ ছিল যে, মনে হত যেন কোষবদ্ধ তরবারি অর্থাৎ সে অত্যন্ত হালকা-পাতলা দেহের অধিকারী। তার খাদ্য হচ্ছে ছাগলের এক খানা পা।
আর আবূ যুর‘আর কন্যা সম্পর্কে বলতে হয় যে, সে কতই না ভাল। সে পিতা-মাতার সম্পূর্ণ বাধ্য সন্তান। সে অত্যন্ত সুস্বাস্থ্যের অধিকারিণী, যে কারণে সতীনরা তাকে হিংসা করে। আবূ যুর‘আর ক্রীতদাসীরও অনেক গুণ। সে আমাদের গোপন কথা কখনো প্রকাশ করত না, সে আমাদের সম্পদকে কমাত না এবং আমাদের বাসস্থানকে আবর্জনা দিয়ে ভরে রাখত না। সে মহিলা আরও বলল, একদিন দুধ দোহন করার সময় আবূ যুর‘আ বাইরে বেরিয়ে এমন একজন মহিলাকে দেখতে পেল, যার দু’টি পুত্র-সন্তান রয়েছে। ওরা মায়ের স্তন্য নিয়ে চিতা বাঘের মত খেলছিল (দুধ পান করছিল)। সে ঐ মহিলাকে দেখে আকৃষ্ট হল এবং আমাকে ত্বালাক্ব দিয়ে তাকে বিবাহ করল। এরপর আমি এক সম্মানিত ব্যক্তিকে বিবাহ করলাম। সে দ্রুতগামী ঘোড়ায় চড়ত এবং হাতে বর্শা রাখত। সে আমাকে অনেক সম্পদ দিয়েছে এবং প্রত্যেক প্রকারের গৃহপালিত জন্তু থেকে এক এক জোড়া আমাকে দিয়েছে এবং বলেছে, হে উম্মু যুর‘আ! তুমি এ সম্পদ থেকে খাও, পরিধান কর এবং উপহার দাও। মহিলা আরও বলল, সে আমাকে যা কিছু দিয়েছে, তা আবূ যুর‘আর একটি ক্ষুদ্র পাত্রও পূর্ণ করতে পারবে না (অর্থাৎ আবূ যুর‘আর সম্পদের তুলনায় তা খুবই সামান্য ছিল)।
আয়েশা (রাযিয়াল্লাহু আনহা) বলেন, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) আমাকে বললেন, আবূ যুর‘আ তার স্ত্রী উম্মু যুর‘আর জন্য যেমন আমিও তোমার প্রতি তেমন (তবে আমি কক্ষনো তোমাকে ত্বালাক্ব দিব না)’।[১]
শিক্ষনীয় বিষয়
১. অতীত জাতিসমূহের সম্পর্কে আলোচনা করা মুস্তাহাব (উত্তম)। তাদের উদাহরণ টেনে শিক্ষা গ্রহণ করা উচিত। এছাড়া মনকে প্রফুল্ল ও সতেজ রাখার জন্য বিরল ও আকর্ষণীয় ঘটনা-সংবাদ বর্ণনা করাও বৈধ। কারণ এসবের মধ্যে শিক্ষা, অভিজ্ঞতা এবং উপকারী গল্প রয়েছে, যেগুলো থেকে উপকার লাভ করা যায়।
২. নবী করীম (ﷺ) তাঁর স্ত্রীদের সাথে উত্তম আচরণ, নম্র ব্যবহার, মধুর কথা এবং হাস্যোজ্জ্বল চেহারার মাধ্যমে যে দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন, তা পুরুষদেরকে উৎসাহিত করে যেন তারা নিজেদের পরিবার-পরিজনের সাথে উত্তম ব্যবহার করে, তাদের সাথে আন্তরিকতা বজায় রাখে এবং আনন্দের সাথে কথাবার্তা বলে। নবী করীম (ﷺ)-এর বাণী,اسْتَوْصُوْا بِالنِّسَاءِ خَيْرًا ‘তোমরা নারীদের প্রতি কল্যাণের উপদেশ গ্রহণ কর’।[২] মানুষের জন্য তার পরিবারের সাথে সুন্দর ব্যবহার করা, তাদের সাথে মিলেমিশে থাকা এবং এমন কথাবার্তা বলা উত্তম, যা বৈধ বিষয়ের মধ্যে থেকে তাদের অন্তরে আনন্দ প্রবেশ করায়। এটি এমন একটি বিষয়, যা মানুষের জন্য কাম্য-যতক্ষণ তা হারামে উপনীত না হয়। সুতরাং একজন পুরুষের জন্য ওয়াজিব যে, সে তার পরিবারের সাথে হাস্যরস, আন্তরিকতা ও মধুর আলাপচারিতা রাখবে। তবে এটি যেন সবসময় না হয়; বরং মাঝে মাঝে, কিছু সময়ের জন্য। শর্ত হল-এটি যেন কোন হারামে না পৌঁছে যায়। যেমন-ছালাত নষ্ট করা, কোন উপকারী কাজ নষ্ট করা অথবা অতিরিক্ত সময় অপচয় করা। কারণ, রাসূলুল্লাহ (ﷺ)ও এ ধরনের কথাবার্তা শোনার জন্য সময় দিতেন, অথচ তিনি ছিলেন মানুষের মধ্যে সবচেয়ে বেশি আল্লাহর ইবাদতকারী, সবচেয়ে বেশি আল্লাহভীরু এবং আল্লাহর অধিকারের ব্যাপারে সবচেয়ে জ্ঞানী।
৩. নারীদেরকে তাদের স্বামীদের প্রতি বিশ্বস্ত থাকতে, তাদের অনুগ্রহের কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করতে এবং দৃষ্টিকে তাদের দিকেই সীমাবদ্ধ রাখতে উৎসাহিত করা হয়েছে এবং নারীর পক্ষ থেকে তার স্বামীকে এমনভাবে বর্ণনা করা, যা সে তার মধ্যে ভাল-মন্দ হিসাবে জানে- এতে কোন অসুবিধা নেই। প্রয়োজন হলে গুণাবলীর কিছু অতিরঞ্জনও করা যেতে পারে, যতক্ষণ তা শরী‘আতের দৃষ্টিতে ক্ষতিকর না হয়; কারণ তা অশালীনতার দিকে নিয়ে যেতে পারে। এটি মহান আল্লাহর পক্ষ থেকে নারীদের জন্য একটি আদব বা শিষ্টাচার, যাতে তারা তাদের স্বামীদের ব্যাপারে আল্লাহকে ভয় করে এবং তাদের ভালো দিক ও উত্তম আচরণগুলো স্মরণ করে।
৪. জ্ঞানী, বিচক্ষণ, সৎ ও মুমিন নারী যে মহান আল্লাহকে ভয় করে তাদের আদবের একটি দিক হল- সে মানুষের সামনে তার স্বামীর কথা সুন্দরভাবে উল্লেখ করে। কেউ যদি তার সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করে, তবে সে তার প্রশংসা করে এবং তার দোষত্রুটি প্রকাশ করে না; যেন আল্লাহ তা‘আলার নিকট তার মর্যাদা আরও উঁচু হয় এবং তার ছওয়াব আরও বৃদ্ধি পায়।
* পরিচালক: দারুস সালাম ইসলামী কমপ্লেক্স, পিরুজালী ময়তাপাড়া, গাযীপুর।
তথ্যসূত্র :
[১]. মুত্তাফাক্ব ‘আলাইহ, ছহীহ বুখারী, হা/৫১৮৯ ‘শব্দ বিন্যাস তাঁরই’; ছহীহ মুসলিম, হা/২৪৪৮।
[২]. মুত্তাফাক্ব ‘আলাইহ, ছহীহ বুখারী, হা/৫১৮৬; ছহীহ মুসলিম, হা/১৪৬৮ ‘শব্দ বিন্যাস তাঁরই’; মিশকাত, হা/৩২৩৮।