নবী করীম ﷺ-এর সাথে আনছারদের ঘটনা
- মূল : ফাউযিয়া বিনতে মুহাম্মাদ আল-উক্বাইলী
- অনুবাদ : হাফীযুর রহমান বিন দিলজার হোসাইন*
আনাস ইবনু মালিক (রাযিয়াল্লাহু আনহু) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, হুনাইনের দিন হাওয়াযিন, গাতফান ও অন্যান্য গোত্রগুলো নিজেদের ধন-সম্পদ, পশুপাল ও সন্তান-সন্ততিসহ যুদ্ধক্ষেত্রে এল।*আর নবী করীম (ﷺ) ছিল দশ হাজার (ও কিছু সংখ্যক) তুলাকা[১] সৈনিক। যুদ্ধে তারা সবাই তাঁর পাশ থেকে পিছনে সরে গেল। ফলে তিনি (ﷺ) একাকী রয়ে গেলেন। সেই সময়ে তিনি আলাদা আলাদাভাবে দু’টি ডাক দিয়েছিলেন, তিনি ডান দিক ফিরে বলেছিলেন, হে আনছারগণ! তাঁরা সবাই উত্তরে বললেন, আমরা উপস্থিত, হে আল্লাহর রাসূল (ﷺ)! আমরা আপনার সামনে আছি। আপনি সুসংবাদ নিন, আমরা আপনার সঙ্গেই আছি। এরপর তিনি বাম দিক ফিরে বলেছিলেন, হে আনছারগণ! তাঁরা সবাই উত্তরে বললেন, আমরা উপস্থিত হে আল্লাহর রাসূল (ﷺ)! আপনি সুসংবাদ নিন। আমরা আপনার সঙ্গেই আছি।
নবী করীম (ﷺ) তাঁর সাদা রঙের খচ্চরটির পিঠে ছিলেন। তিনি নিচে নেমে পড়লেন এবং বললেন, আমি আল্লাহর বান্দা এবং তাঁর রাসূল (ﷺ)। অতঃপর মুশরিকরাই পরাজিত হল। সে যুদ্ধে বিপুল পরিমাণ গনীমত হস্তগত হল। তিনি (ﷺ) সেসব সম্পদ মুহাজির এবং নও মুসলিমদের মধ্যে বন্টন করে দিলেন। আর আনছারদেরকে কিছুই দেননি। তখন আনছারদের (কেউ কেউ) বললেন, আল্লাহ তাঁর রাসূলকে ক্ষমা করুন! কঠিন মুহূর্ত আসলে ডাকা হয় আমাদেরকে, আর গনীমত দেওয়া হয় অন্যদেরকে। অথচ আমাদের তলোয়ার এখনও তাদের রক্তে ভিজে আছে। কথাটি নবী করীম (ﷺ) পর্যন্ত পৌঁছে গেল। তাই তিনি তাদেরকে একটি তাবুতে একত্রিত করে বললেন, তাদের সঙ্গে আর কাউকে ডাকলেন না। তিনি বললেন, হে আনছারগণ! এক সম্প্রদায় সম্পর্কে আমার নিকট এমন কথা পৌঁছল-এর অর্থ কী? তখন আনছারদের প্রবীন ও জ্ঞানীরা বলল, হে আল্লাহর রাসূল (ﷺ)! আমরা এমন কিছু বলিনি, আমাদের কিছু তরুন আছে, তারাই এ কথা বলেছে, যা আপনার কাছে পৌঁছেছে।
তরুনরা বলেছে, আল্লাহ তাঁর রাসূলকে ক্ষমা করুন! তিনি কুরাইশদের দান করেন, অথচ আমাদের দেন না। অথচ আমাদের তলোয়ার এখনও তাদের রক্তে ভেজা। তিনি (ﷺ) বললেন, হে আনছারগণ! আমি কুরাইশদের দিচ্ছি, যেন তাদের অন্তরকে ইসলামের প্রতি আকৃষ্ট করি। তারা সদ্য কুফর থেকে বেরিয়ে এসেছে। তোমরা কি খুশি থাকবে না যে, লোকজন দুনিয়ার ধন-সম্পদ নিয়ে ফিরে যাবে আর তোমরা (বাড়ি ফিরে যাবে) আল্লাহর রাসূল (ﷺ)-কে নিয়ে? আল্লাহর কসম! তোমরা যা নিয়ে ফিরছ, তা তাদের প্রাপ্তির চেয়ে শ্রেষ্ঠ। তখন নবী করীম (ﷺ) বললেন, যদি লোকজন একটি উপত্যকা দিয়ে চলে আর আনছারগণ একটি গিরিপথ দিয়ে চলে, তাহলে আনছারদের গিরিপথকেই গ্রহণ করে নিব।
তারা বলল, আমরা সন্তুষ্ট, হে আল্লাহর রাসূল (ﷺ)! নবী করীম (ﷺ) বললেন, তোমরা আমার পরে পক্ষপাত ও অবিচার দেখতে পাবে। তখন ধৈর্য ধরবে, যতক্ষণ না তোমরা আল্লাহ ও তাঁর রাসূল (ﷺ)-এর সাক্ষাৎ পাবে। তোমাদের সাক্ষাতের স্থান হবে কাওছারের হাউজে। আনাস (রাযিয়াল্লাহু আনহু) বলেন, আমরা ধৈর্য ধরিনি। বর্ণনাকারী হিশাম (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন, আমি জিজ্ঞাসা করলাম, হে আবূ হামযা (আনাস ইবনু মালিক) আপনি কি এ ঘটনার সময় উপস্থিত ছিলেন? উত্তরে তিনি বললেন, আমি তাঁর নিকট হতে কখন বা অনুপস্থিত থাকতাম’।[২]
শিক্ষনীয় বিষয়
১). নবী করীম (ﷺ)-এর হৃদয় ছিল অত্যন্ত প্রশস্ত, তিনি তাঁর প্রতি নির্দেশিত সমালোচনা ধৈর্যের সঙ্গে সহ্য করতেন। ঠিক তেমনই হওয়া উচিত- পিতার তার সন্তানের প্রতি, শিক্ষকের তার ছাত্রের প্রতি এবং ইমামের তার জামা‘আতের (সমাজের সদস্যদের) প্রতি আচরণে।
২). আনছারগণের ছিল নবী করীম (ﷺ)-এর সঙ্গে চমৎকার শিষ্টাচার ও ভদ্রতা এবং তাঁরা তাঁদের অভিযোগ প্রকাশ করতেন, অত্যন্ত কোমলভাবে ও বিনয়ে।
এই হাদীছ থেকে বোঝা যায়, কোন মানুষ যদি তার ভাই বা বন্ধুর নিকট থেকে এমন কিছু দেখে, যা তার অপছন্দনীয় বা কষ্টদায়ক, তবে সে যেন সেই বিষয়টি নিজের মনে চেপে না রাখে এবং তা গোপন না করে, যাতে তার অন্তরে কষ্ট, সংকোচ ও খারাপ ধারণা জন্ম না নেয়। বরং তার উচিত, সে ব্যক্তিকে নম্রতা ও ভদ্রতার সাথে বিষয়টি জানিয়ে দেওয়া এবং যা তার মনে কষ্ট দিয়েছে, তা স্পষ্টভাবে বলা। আর অপর ব্যক্তির উচিত, এই কথা শুনে রাগ না করা, বরং তাকে ধন্যবাদ জানানো, কারণ সে তার এমন একটি দোষের প্রতি দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে, যা তার অজানা ছিল। কারণ, একজন মুমিন হল তার মুমিন ভাইয়ের আয়না। অর্থাৎ সে তার ভাইয়ের ভুলত্রুটি দেখায়, যেমন আয়নায় নিজের মুখ দেখা যায়।
৩). নবী করীম (ﷺ) নানা বিষয়ে উত্তম নীতির (সুন্দর কৌশল) ব্যবহার করেছেন। তিনি যুক্তিনির্ভর, হৃদয়গ্রাহী আলোচনার মাধ্যমে বোঝাতেন এবং তাঁর উপদেশ ছিল অত্যন্ত প্রভাবশালী ও হৃদয় ছোঁয়া। সংলাপ বা আলাপচারিতার গুরুত্ব অত্যন্ত বড়। এটাই পরিবার ও সমাজের সংশোধনের সর্বোত্তম পথ ও শেষ্ঠ চিকিৎসা। যেখানে বিবাহ বিচ্ছেদ ঘটে, সন্তানদের চরিত্র বিপথগামী হয়, নেতা ও প্রজার মধ্যে বা কর্মকর্তা ও প্রধানের মধ্যে দূরত্ব ও বৈরিতা সৃষ্টি হয়। তা অধিকাংশ সময় ঘটে সংলাপ ও পারস্পারিক কথাবার্তার অভাবের কারণে।
৪). নবী করীম (ﷺ) তাঁর দাওয়াতের সহচর আনছারদের যে কোমল ভর্ৎসনা করেছেন, তা আসলে তাঁর তাদের প্রতি গভীর ভালোবাসারই প্রমাণ। তিনি তাদের অবস্থা, মানসিক কষ্ট ও অবস্থার প্রতি গভীরভাবে মনযোগ দিতেন। তাদের দুঃখে তিনি কষ্ট পেতেন, তাদের ক্ষতকে অনুভব করতেন।
৫). আজকাল দাওয়াতী কাজের বহু নেতা এ বিষয়ে গাফিল। তুমি দেখবে- বহু বছর পার হয়ে যায়, তবুও তারা সেই সহযোগীদের প্রতি প্রশংসা প্রকাশ করে না। যারা তাদের কঠিন সময়ে পাশে দাঁড়িয়েছিলেন, সহযোগিতা করেছিলেন। অন্যদের প্রশংসা করা বা তাদের ভাল কাজের স্বীকৃতি দেওয়া নিন্দনীয় নয়, যদি সেই প্রশংসা সত্য হয়, চাটুকারিতা বা ভণ্ডামি না হয়। যে ব্যক্তি কখনো অন্যের প্রশংসা করে না, তাদের উত্তম কাজ ও উপকারী প্রচেষ্টার জন্য কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে না, সে যেন এক কঠিন পাথর, যে জানে না কীভাবে কৃতজ্ঞতা বা প্রশংসা করতে হয়।
৬). এই হৃদয়গ্রাহী ঘটনার সময় নবী করীম (ﷺ) চাইলে বলতে পারতেন, আমি আল্লাহর রাসূল (ﷺ)! তোমাদের আমার আনুগত্য করা ওয়াজিব। আমার কথা শোনা এবং পালন করা। কিন্তু তিনি তা করেননি। বরং কোমল ভর্ৎসনা ও মমতাপূর্ণ উপদেশের মাধ্যমে তাঁদের হৃদয়কে শোধন করেছেন। যে কেউ কোমল হৃদয়ের অধিকারী ছিলেন, যখন এ ঘটনা শুনতেন, আনছারদের সঙ্গে তিনিও কেঁদে ফেলতেন। রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর সেই কোমল ও হৃদয়গ্রাহী বাক্যগুলো আনছারদের হৃদয়ে গভীরভাবে ছুঁয়ে যায়। তাদের মনে থাকা সকল কল্পনা, সন্দেহ ও দুশ্চিন্তা দূর হয়ে যায় এবং তারা কান্নায় ভেঙ্গে পড়ে-নবী করীম (ﷺ)-এর ভালোবাসায়, তাদের ভাগে যা এসেছে, তাতে আনন্দে ও সন্তুষ্টিতে। তাদের কান্না কেবল আনন্দেরই ছিল না, বরং নিজের প্রতি অনুসোচনারও ছিল। যে সামান্য কল্পনা বা মনঃকষ্ট তাদের মনে এসেছিল গনীমতের বন্টন নিয়ে। তাদের প্রিয় নবী (ﷺ)-এর তুলনায় সম্পদ ও গনীমতের মূল্যই বা কী? এর চেয়ে বড় ভালোবাসা ও আনুগত্যের প্রমাণ আর কী হতে পারে? আর কখনো কি সম্পদ ছিল রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর মাপকাঠিতে ভালোবাসা ও মর্যাদার প্রমাণ হিসেবে?
* পরিচালক: দারুস সালাম ইসলামী কমপ্লেক্স, পিরুজালী ময়তাপাড়া, গাযীপুর।
তথ্যসূত্র :
[১]. ইবনু হাজার আসক্বালানী (রাহিমাহুল্লাহ) ও কিরমানী প্রভৃতি হাদীছবেত্তাগণের মতে তুলাকা শব্দের পূর্বে একটি ওয়াও উহ্য রয়েছে। অর্থাৎ দশ হাজার মুহাজির ও আনছার এবং মুক্তিপ্রাপ্ত লোকজন- অনুবাদক।
[২]. ছহীহ বুখারী, হা/৪৩৩৭; ছহীহ মুসলিম, হা/১০৫৯।