রাসূলুল্লাহ (ﷺ) এর হিজরত
- মূল: ফাউযিয়া বিনতে মুহাম্মাদ আল-ঊক্বাইলী
- অনুবাদ: হাফীযুর রহমান বিন দিলজার হোসাইন*
বারা ইবনু আযিব (রাযিয়াল্লাহু আনহু) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, আবূ বকর (রাযিয়াল্লাহু আনহু) আমার পিতা (আযিবের) ঘরে এলেন। তিনি আমার পিতার নিকট থেকে তেরো দিরহামের বিনিময়ে একটি হাওদা কিনলেন। আবূ বকর (রাযিয়াল্লাহু আনহু) বললেন, ‘হে আযিব! তোমার ছেলেকে (বারা’কে) হাওদাটি আমার নিকট পৌঁছে দিতে বল। আমি বারা’কে বলব না যতক্ষণ না শুনাবেন যে আপনি ও নবী করীম (ﷺ) কী করেছিলেন যখন আপনারা মক্কা হতে বেরিয়ে পড়েছিলেন? আর মক্কার মুশরিকগণ আপনাদের পিছু ধাওয়া করেছিল। আবূ বকর (রাযিয়াল্লাহু আনহু) বললেন, আমরা মক্কা হতে বেরিয়ে সারা রাত এবং পরের দিন পরের দিন দুপুর পর্যন্ত অবিরত চললাম। যতক্ষণ না সূর্য মাঝ আকাশে উঠল এবং রাস্তা নির্জন হয়ে গেল, কারো চলাফেরা ছিল না। আমি দৃষ্টি ফেললাম কোন ছায়া আছে কি না দেখার জন্য যাতে আমরা আশ্রয় নিতে পারি। তখন আমি একটি উঁচু পাথর দেখতে পেলাম যার কিছু অংশ ছায়া পড়েছিল, সূর্য তখনও সেখানে পৌঁছেনি। আমি সেখানে গেলাম এবং ছায়ার অংশটুকু ঠিক করলাম যেন নবী করীম (ﷺ) সেখানে বিশ্রাম নিতে পারেন। আমি আমার সঙ্গে থাকা পশমের চামড়া বিছিয়ে দিলাম নবী করীম (ﷺ)-এর জন্য এবং বললাম, হে আল্লাহর নবী! আপনি একটু শুয়ে পড়ুন। আমি চার পাশে পরিষ্কার করে দিলাম যাতে কিছু না থাকে।
অতঃপর তিনি (ﷺ) শুয়ে পড়লেন এবং ঘুমিয়ে গেলেন। অতঃপর আমি চারপাশে খুঁজতে বের হলাম, কেউ আমাদের খুঁজতে আসছে কি না। বর্ণনাকারী বলেন, এদিকে রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর পিপাসা পেয়েছিল। আমি একটি রাখালকে দেখতে পেলাম, যে তার ছাগলগুলো নিয়ে আমাদের ছায়ার দিকেই আসছিল, যেমনটা আমরাও এসেছিলাম। আমি তাকে বললাম, ‘হে ছেলে! তুমি কার দাস? সে বলল, আমি অমুক কুরাইশ বংশীয় লোকের, যিনি মক্কা বা মদীনার অধিবাসী। সে তার নাম বলল, আমি তাকে চিনলাম। আমি তাকে বললাম, তোমার ছাগলগুলোর মধ্যে কি কোনটা দুধ দেয়? সে বলল, হ্যাঁ। আমি বললাম, তাহলে তুমি কি আমাদের জন্য দুধ দোহন করতে পারবে? সে বলল, হ্যাঁ। আমি তাকে বললাম, একটি ছাগল ধরে আন। সে আনল। তারপর আমি তাকে বললাম, ছাগলের বুকে যেটুকু ধুলা-ময়লা ও লোম লেগে আছে তা পরিষ্কার কর। তারপর তাকে হাত পরিষ্কার করার জন্য বললাম। সে তার এক হাত দিয়ে আরেক হাত ঘসে পরিষ্কার করল। সে আমাদের জন্য দুধ দোহন করল। আমি দুধ ভর্তি এক পেয়ালা হাতে নিলাম। তখন আমার নিকট একটি পানির পাত্রও ছিল, যার মুখে একটি কাপড় বাঁধা ছিল।
রাসূলুল্লাহ (ﷺ) সেই পানি দিয়ে ওযূ করতেন ও তা পান করতেন। আমি সেই পানি কিছুটা দুধের উপর ঢেলে দেই, যাতে দুধ ঠাণ্ডা হয়। আমি তাঁকে জাগানো অপসন্দ মনে করলাম। তারপর আমি রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর নিকট গিয়ে দেখি তিনি জেগে গেছেন। আমি বললাম, হে আল্লাহর রাসূল (ﷺ)! পান করুন। তিনি পান করলেন যতক্ষণ না আমি সন্তুষ্ট হলাম। অতঃপর তিনি বললেন, চলো, এবার রওনা হওয়ার সময় হয়েছে। আমি বললাম, জী, হে আল্লাহর রাসূল (ﷺ)! আমরা আবার রওনা হলাম যখন সূর্য হেলে পড়েছে। মুশরিকরা আমাদের খুঁজে ফিরছিল। তাদের মধ্যে কেউ আমাদের ধরতে পারেনি, শুধু সুরাকা ইবনু মালিক ইবনু জু‘শুম ব্যতীত। সে মদীনার নিকটে পৌঁছার সময় আমাদের পিছনে ঘোড়ায় চড়ে আসছিল। আমি বললাম, হে আল্লাহর রাসূল (ﷺ)! সুরাকা আমাদের পিছনে এসে গেছে। অতঃপর রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বললেন, ভয় পেও না, নিশ্চয় আল্লাহ আমাদের সাথে আছেন। রাসূলুল্লাহ (ﷺ) তার বিরুদ্ধে দু‘আ করলেন, তখন তার ঘোড়া এমনভাবে মাটিতে ধ্বসে পড়ল যে তার পেট পর্যন্ত মাটিতে ঢুকে গেল। বর্ণনাকারীর সন্দেহ, সুরাকা বলল, তোমরা আমার বিরুদ্ধে দু‘আ করছ। অনুগ্রহ করে দু‘আ করো না। সে আমাদের আশ্বাস দিল যে, সে মুশরিকদের ফিরিয়ে দিবে। রাসূলুল্লাহ (ﷺ) তার জন্য দু‘আ করলেন। তারপর সে যাকেই দেখত, তাকেই বলত, এদিকে কিছুই নেই এবং সবাইকে ফিরিয়ে দিত।
বারা’ (রাযিয়াল্লাহু আনহু) বলেন, এরপর আমি আবূ বকর (রাযিয়াল্লাহু আনহু)-এর মালপত্র বহন করলাম। আমরা তাঁর ঘরে পৌঁছলাম। আমি দেখলাম আবূ বকর (রাযিয়াল্লাহু আনহু)-এর মেয়ে, আয়েশা (রাযিয়াল্লাহু আনহা) জ¦রাক্রান্ত হয়ে শুয়ে আছেন। তাঁর পিতা [আবূ বকর (রাযিয়াল্লাহু আনহু)] তাঁর গালে চুমু দিয়ে বললেন, কেমন আছো, হে আমার মেয়ে? অতঃপর আমার পিতা তাঁর বিক্রয়কৃত মালামালের মূল্য বুঝিয়ে নিচ্ছিলেন’।[১]
শিক্ষণীয় বিষয়
১. মদীনায় পবিত্র হিজরত কোন দিনই কোন সাংস্কৃতিক বিলাসিতা ছিল না, ছিল না কোন ভ্রমণ বা আনন্দের উদ্দেশ্যে, কিংবা নতুন কোন জগত আবিষ্কারের প্রচেষ্টা। না, মোটেও না...এটি ছিল এক অনিবার্য সিদ্ধান্ত, এক শেষ উপায়, যখন মক্কার বিস্তীর্ণ ভূমি মুসলিমদের জন্য সংকীর্ণ হয়ে উঠেছিল এবং মানুষ তাদের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছিল...। রাসূলুল্লাহ (ﷺ) হিজরতের প্রতি বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছিলেন এবং এর সাফল্য নিশ্চিত করতে সম্পূর্ণ গোপনীয়তা বজায় রেখেছিলেন। এটি আমাদের দেখায় যে ইসলামেই পরিকল্পনা, সংগঠন এবং সুনিশ্চিত ব্যবস্থাপনার একটি গুরুত্বপূর্ণ উপস্থিতি রয়েছে।
২. সত্যনিষ্ঠ ও আন্তরিক বন্ধুত্ব এমন এক গভীরভাবে প্রভাব ফেলে, যা মানুষকে প্রিয়তম ও অমূল্য সম্পদ ত্যাগ করতেও প্রস্তুত করে তোলে।
৩. আল্লাহর দিকে আহ্বানের পথ কঠিন এবং কষ্ট ও বিপদে পরিপূর্ণ। কিন্তু যে ধৈর্য ধরে, সে সফলতা লাভ করে; আর যে অটল থাকে, সে বিজয়ী হবে। নিশ্চয় আল্লাহ তা‘আলা তাঁর নবীকে কুরাইশ কাফেরদের আঘাত ও নির্যাতন থেকে রক্ষা করেছিলেন।
৪. আবূ বকর (রাযিয়াল্লাহু আনহু)-এর মর্যাদা ও ফযীলত এখানেই প্রকাশ পায় যে, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) হিজরতের মত একটি সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ ও কঠিন সফরের জন্য তাঁকে সঙ্গী হিসাবে বেছে নিয়েছিলেন, সকল ছাহাবীর মধ্য ধেকে কেবল তাঁকেই। এই নির্বাচন একটি মহান বার্তা বহন করে; তিনি ছিলেন ছাহাবীদের মধ্যে সবচেয়ে দৃঢ় ঈমানদার, সাহসী, মর্যাদাসম্পন্ন এবং কষ্ট সহ্য করতে সক্ষম ব্যক্তি, যিনি বিপদের সময়ও অটলভাবে দাঁড়িয়ে থাকতেন।
৫. আবূ বকর (রাযিয়াল্লাহু আনহু)-এর পক্ষ থেকে রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর প্রতি দয়া, ভালোবাসা ও সহানুভূতির স্পষ্ট প্রকাশ ঘটে এই হিজরতের সময়। তিনি যেকোন উপায়ে নবী করীম (ﷺ)-কে রক্ষা করার জন্য সচেষ্ট ছিলেন, এমনকি একান্ত একা তিনি তাঁর আরাম-আয়েশ নিশ্চিত করার জন্য চেষ্টা করেছেন। তাঁর এই নিবেদন ভালোবাসা ও ত্যাগের এক অনন্য দৃষ্টান্ত। ইবনু আদী ও ইবনু আসাকির যুহরীর সূত্রে এবং হাকে তাঁর আল-মুস্তাদরাক (৩য় খণ্ড, হা/৪৪৬১, পৃ. ৮২)-এ আনাস (রাযিয়াল্লাহু আনহু) থেকে বর্ণনা করেছেন, তিনি বলেন, ‘রাসূলুল্লাহ (ﷺ) হাসান ইবনু ছাবিতকে জিজ্ঞাসা করলেন, তুমি কি আবূ বকর সম্পর্কে কিছু কবিতা বলেছ? তিনি বললেন, ‘হ্যাঁ’। নবী করীম (ﷺ) বললেন, বল, আমি শুনি। তখন হাসান ইবনু ছাবিত (রাযিয়াল্লাহু আনহু) বললেন,
وَثَانِيَ اثْنَيْنِ فِي الْغَارِ الْمَنِيفِ وَقَدْ ... طَافَ الْعَدُوُّ بِهِ إِذْ صَاعَدَ الْجَبَلَا
‘তিনি ছিলেন সেই গুহার দ্বিতীয় সঙ্গী, সম্মানিত গুহায় যখন শত্রুরা তাঁকে ঘিরে ফেলেছিল, আর তিনি উঠে গিয়েছিলেন পাহাড়ের চূড়ায়।
وَكَانَ حِبَّ رَسُولِ اللهِ قَدْ عَلِمُوا ... مِنَ الْبَرِيَّةِ لَمْ يَعْدِلْ بِهِ رَجُلًا
‘তিনি ছিলেন রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর প্রিয়তম, এ কথা সবাই জানে সৃষ্টিজগতে (মানবজাতির মধ্যে) কেউ তাঁকে সমতুল্য মনে করেনি। রাসূলুল্লাহ (ﷺ) এতটাই হাসলেন যে তাঁর দাঁতের অগ্রভাগগুলো দেখা গেল। অতঃপর তিনি বললেন, হে হাসান! তুমি সত্যই বলেছ, ঠিক তেমনই।
৬. নবী করীম (ﷺ)-এর আল্লাহর উপর গভীর তাওয়াক্কুল (ভরসা) এবং সবকিছু তাঁরই হাতে ছেড়ে দেয়ার অতুলনীয় দৃষ্টান্ত.....
একজন সত্যিকার মুমিন আল্লাহ তা‘আলার উপর সুন্দরভাবে তাওয়াক্কুল (ভরসা) করে। আর আল্লাহ্র উপর সুন্দর তাওয়াক্কুল মানে হলো-হৃদয়ের গভীর থেকে আন্তরিকভাবে বিশ্বাস রাখা যে, যাবতীয় ক্ষতি থেকে রক্ষা পাওয়া এবং সকল কল্যাণ লাভ একমাত্র আল্লাহর ইচ্ছার উপরই নির্ভরশীল। সেই মুমিনের অন্তর বিশ্বাস করে- আল্লাহ ব্যতীত কেউ দান করতে পারে না, আল্লাহ ব্যতীত কেউ কিছু রোধ করতে পারে না, আল্লাহ ছাড়া কেউ ক্ষতি করতে পারে না এবং আল্লাহ ছাড়া কেউ উপকার করতে পারে না। আল্লাহ তা‘আলা বলেন, وَمَنْ يَتَّقِ اللّٰهَ يَجْعَلْ لَهُ مَخْرَجًا ‘বস্তুত যে ব্যক্তি আল্লাহকে ভয় করে, আল্লাহ তার জন্য উপায় বের করে দেন’ (সূরা আত-ত্বালাক্ব: ২)।
*পরিচালক: দারুস সালাম ইসলামী কমপ্লেক্স, পিরুজালী ময়তাপাড়া, গাযীপুর।
তথ্যসূত্র :
[১]. ছহীহ বুখারী, হা/২৪৩৯, ৩৬১৫, ৩৬৫২; ছহীহ মুসলিম, হা/২০০৯।
প্রসঙ্গসমূহ »:
শিক্ষণীয় ঘটনা