শনিবার, ০৭ মার্চ ২০২৬, ০২:০৪ অপরাহ্ন

আবূ সুফিয়ান ও হিরাক্লিয়াস 

- মূল: ফাউযিয়া বিনতে মুহাম্মাদ আল-ঊক্বাইলী 
- অনুবাদ: হাফীযুর রহমান বিন দিলজার হোসাইন* 


আব্দুল্লাহ ইবনু আব্বাস (রাযিয়াল্লাহু আনহুমা) হতে বর্ণিত, আল্লাহর রাসূল (ﷺ) কায়ছারকে ইসলামের প্রতি আহ্বান জানিয়ে চিঠি লিখেন এবং দিহইয়া কালবী (রাযিয়াল্লাহু আনহু)-এর মারফত সে চিঠি পাঠান এবং তাকে আল্লাহর রাসূল (ﷺ) নির্দেশ দেন যেন তা বছরার গভর্নরের নিকট দেয়া হয়, যাতে তিনি তা কায়ছারের নিকট পৌঁছিয়ে দেন। আল্লাহ যখন পারস্যের সৈন্য বাহিনীকে কায়ছারের এলাকা থেকে তাড়িয়ে দেন, তখন আল্লাহর অনুগ্রহের এই শুকরিয়া হিসাবে কায়ছার হিমস থেকে পায়ে হেঁটে বায়তুল মাকদাছ সফর করেন। এ সময় তাঁর নিকট আল্লাহর রাসূল (ﷺ)-এর চিঠি এসে পৌঁছলে তা পাঠ করে তিনি বললেন যে, তাঁর গোত্রের কাউকে খোঁজ কর যাতে আমি আল্লাহর রাসূল (ﷺ) সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করতে পারি। ইবনু আব্বাস (রাযিয়াল্লাহু আনহুমা) বলেন, আবূ সুফিয়ান আমাকে নিজ মুখে বলছিলেন, হিরাক্লিয়াস (রোম সম্রাট) তাঁর দরবারে আমাদের ডেকে পাঠিয়েছিলেন, যখন আমরা কুরাইশদের কিছু লোকের সঙ্গে ব্যবসা উপলক্ষে সিরিয়ায় ছিলাম। এটা তখনকার সময় যখন আল্লাহর রাসূল (ﷺ) ও কাফের কুরাইশদের মধ্যে যুদ্ধ বিরতিতে ছিলেন। হিরাক্লিয়াসের লোকেরা আমাদের খুঁজে পেয়ে নিয়ে গেল এবং আমরা তার রাজধানী ‘ইলিয়া’ (বাইতুল মাকদাসে)-তে পৌঁছলাম। সেখানে আমাদের রাজপ্রাসাদে প্রবেশ করানো হয়। তখন তিনি তাদের তাঁর বৈঠকে ডাকলেন।

কায়ছার তার সিংহাসনে বসে ছিলেন, মাথায় ছিল রাজ মুকুট। রোমের বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গ তাঁর পার্শ্বে ছিলেন। অতঃপর সে আমাদের ডাকার নির্দেশ দিলেন এবং তাঁর দোভাষীকে বললেন, তাদের জিজ্ঞাসা কর, যিনি নিজেকে নবী দাবী করেন, এদের মধ্যে তাঁর নিকটত্মীয় কে? আমি (আবূ সুফিয়ান) বললাম, ‘আমি’। তখন সে বলল, তাকে আমার নিকটে আনো। অতঃপর আমাকে তার সামনে বসানো হল এবং আমার সঙ্গীদের পিছনে রাখা হল। অতঃপর তিনি তাঁর দোভাষীকে বললেন, তোমাদের সঙ্গী যদি মিথ্যা বলে, তাহলে তোমরা তাৎক্ষণিকভাবে তাকে মিথ্যাবাদী বলবে। আবূ সুফিয়ান (রাযিয়াল্লাহু আনহু) বলেন, আল্লাহর কসম! আমি যদি এ ব্যাপারে লজ্জাবোধ না করতাম যে, আমার সাথীরা আমাকে মিথ্যাচারী বলে প্রচার করবে তাহলে তার জিজ্ঞাসার জবাবে নবী সম্পর্কে মিথ্যা বলতাম। (অতঃপর উভয়ের কথোপকথন শুরু হয়), যা নিম্নরূপ:

সম্রাট জিজ্ঞাসা করলেন, এই লোকটির (যিনি নবী দাবী করেন) বংশ কেমন?

আমি (আবূ সুফিয়ান) বললাম: তিনি আমাদের মধ্যে সম্ভ্রান্ত বংশের।

সম্রাট: তাঁর পূর্বে তোমাদের মধ্য হতে কোন ব্যক্তি কখনও এমন দাবী করেছে কি?

আমি (আবূ সুফিয়ান) বললম, না।

সম্রাট: তোমরা কি তাঁকে এর পূর্বে মিথ্যাবাদী বলতে?

আবূ সুফিয়ান: না।

সম্রাট: তিনি কি কখনও বিশ্বাস ভঙ্গ করেন?

আবূ সুফিয়ান: না। তবে এখন আমরা তাঁর সঙ্গে এক চুক্তিতে রয়েছি, জানি না তিনি কী করবেন। আবূ সুফিয়ান বলেন, আমি ইচ্ছা করেও কোনো কটু কথা বলতে পারিনি যা তাঁর প্রতি নেতিবাচক ধারণা দিতে পারে, শুধু এটুকুই বলেছিলাম।

সম্রাট: তোমরা কি তাঁর সাথে যুদ্ধ করেছ?

আবূ সুফিয়ান: হ্যাঁ।

সম্রাট: যুদ্ধের ফলাফল কী?

আবূ সুফিয়ান: তাঁর ও আমাদের মধ্যে অনুষ্ঠিত যুদ্ধের ফলাফল হল বালতিতে পালাক্রমে পানি তোলার ন্যায়। অর্থাৎ কোনটায় তিনি জয়লাভ করেন এবং কোনটায় আমরা।

সম্রাট: তিনি তোমাদের কী নির্দেশ দিয়ে থাকেন?

আবূ সুফিয়ান: তিনি বলেন, তোমরা একমাত্র আল্লাহর ইবাদত কর। তাঁর সাথে কোন কিছুকে শরীক কর না। আর তোমাদের বাপ-দাদারা যা বলে বেড়াত, তা পরিত্যাগ কর। তিনি আমাদের ছালাত প্রতিষ্ঠা করতে, সর্বদা সত্য কথা বলতে, সততা, আত্মীয়তার বন্ধন অটুট রাখতে, আমানতদারী এবং প্রতিশ্রুতি পূরণ করার নির্দেশ দেন।

সম্রাট হিরাক্লিয়াস দোভাষীকে বললেন, তুমি তাকে বল, আমি তোমাকে তাঁর বংশ সম্পর্কে জিজ্ঞাস করেছি। তুমি জবাবে বলেছ, তিনি তোমাদের মধ্যে সম্ভ্রান্ত বংশজাত। প্রকৃতপক্ষে নবী-রাসূলগণ তাঁদের কওমের সম্ভ্রান্ত পরিবারে প্রেরিত হয়ে থাকেন। আমি তোমাকে জিজ্ঞাসা করেছি, তোমাদের মধ্যে কেউ কি (নবী হওয়ার) এমন দাবী করেছিল? তুমি জবাবে বলেছ, না। আমি বলতে চাই- যদি তাঁর পূর্বে এ কথা বলত, তবে অবশ্যই আমি বলতে পারতাম, তিনি এমন এক ব্যক্তি, যিনি পূর্বের কথার পুনরাবৃত্তি করেছেন। আমি জিজ্ঞাসা করেছিলাম, তাঁর পূর্ব পুরুষদের কেউ কি বাদশাহ ছিল? তুমি বলেছ না। যদি বলতে হ্যাঁ, তাহলে বলা যেত, তিনি রাজত্ব পুনরুদ্ধার করতে চাইছেন। আমি জিজ্ঞাসা করেছিলাম, তোমরা কি তাঁকে মিথ্যাবাদী বলতে? তুমি বলেছ, না। যে ব্যক্তি মানুষের ব্যাপারে কখনও মিথ্যা বলেননি, তিনি আল্লাহর ব্যাপারে কিভাবে মিথ্যা বলবে? আমি জিজ্ঞাসা করেছিলাম, প্রভাবশালী লোকেরাই তাঁর অনুসরণ করছে, না দুর্বল শ্রেণীর লোকেরা? তুমি বলেছ, দুর্বলরাই। প্রকৃতপক্ষে এ ধরনের (দুর্বল) লোকেরাই রাসূলগণের অনুসারী হয়ে থাকে। আমি জিজ্ঞাসা করেছিলাম, তাদের সংখ্যা বাড়ছে না কমছে? তুমি বলেছ, বাড়ছে। এটাই ঈমানের প্রকৃতি- তা ধীরে ধীরে বৃদ্ধি পায়।

আমি তোমাকে জিজ্ঞাসা করেছি, তাঁর দ্বীন গ্রহণ করার পর কেউ কি অসন্তুষ্ট হয়ে তা পরিত্যাগ করেছে? তুমি বলেছ, না। ঈমান এরূপই হয়ে থাকে, যখন তা হৃদয়ের গভীরে পৌঁছে, তখন কেউ তার প্রতি অসন্তুষ্ট হয় না। আমি তোমাকে জিজ্ঞাসা করেছিলাম, তিনি কি চুক্তি ভঙ্গ করেন? তুমি বলেছ, না। ঠিকই, রাসূলগণ কখনও চুক্তি ভঙ্গ করেন না। আমি জিজ্ঞাসা করেছিলাম, তোমাদের যুদ্ধ কেমন হয়? তুমি বলেছ, পালাক্রমে হয়। এমনটাই হয় নবীদের সাথে। এভাবেই নবীগণ পরীক্ষিত হন এবং পরিণামে তাঁদেরই অনুকূল হয়। আমি জিজ্ঞাসা করেছিলাম, তিনি তোমাদের কী বিষয়ে আদেশ করে থাকেন? তুমি বলেছ, তিনি তোমাদের আদেশ করেন যেন তোমরা আল্লাহর ইবাদত কর এবং তাঁর সঙ্গে কিছুই শরীক কর না। আর তিনি তোমাদের পিতৃপুরুষেরা যে সবের ইবাদত করত তা থেকে নিষেধ করেন আর তোমাদের নির্দেশ দেন, ছালাত আদায় করতে, ছাদাক্বা প্রদান করতে, সততা, আমানতদারী ও প্রতিশ্রুতি পূরণ করতে। এসবই নবীগণের গুণাবলী। অতঃপর হিরাক্লিয়াস বললেন, তুমি যা বলছ তা যদি সত্য হয়, তবে অচিরেই তিনি আমার এই পায়ের নিচের জায়গার মালিক হয়ে যাবেন। আমি জানতাম একজন নবী আসবেন, তবে ভাবিনি তিনি তোমাদের মধ্য থেকে হবেন। যদি আমি তাঁর নিকট যেতে পারতাম, তবে আমি অবশ্যই তাঁর সাথে সাক্ষাৎ করতাম এবং তাঁর পায়ে পানি ঢেলে দিতাম। তারপর হিরাক্লিয়াস সেই পত্র আনালেন যেটি রাসূলুল্লাহ (ﷺ) দিহিয়া আল-কালবির মাধ্যমে পাঠিয়েছিলেন। তাতে লেখা ছিল,

 بِسْمِ اللهِ الرَّحْمَنِ الرَّحِيْمِ مِنْ مُحَمَّدٍ عَبْدِ اللهِ وَرَسُوْلِهِ إِلَى هِرَقْلَ عَظِيْمِ الرُّوْمِ سَلَامٌ عَلَى مَنِ اتَّبَعَ الهُدَى أَمَّا بَعْدُ فَإِنِّيْ أَدْعُوْكَ بِدِعَايَةِ الإِسْلَامِ أَسْلِمْ تَسْلَمْ وَأَسْلِمْ يُؤْتِكَ اللهُ أَجْرَكَ مَرَّتَيْنِ فَإِنْ تَوَلَّيْتَ فَعَلَيْكَ إِثْمُ الْأَرِيسِيِّيْنَ وَ {يَا أَهْلَ الكِتَابِ تَعَالَوْا إِلَى كَلِمَةٍ سَوَاءٍ بَيْنَنَا وَبَيْنَكُمْ أَلَّا نَعْبُدَ إِلَّا اللَّهَ وَلاَ نُشْرِكَ بِهِ شَيْئًا وَلاَ يَتَّخِذَ بَعْضُنَا بَعْضًا أَرْبَابًا مِنْ دُونِ اللَّهِ فَإِنْ تَوَلَّوْا فَقُولُوا اشْهَدُوا بِأَنَّا مُسْلِمُونَ} [آل عمران: ৬৪]

‘বিসমিল্লা-হির রহমা-নির রহীম’। আল্লাহর বান্দা ও রাসূল মুহাম্মাদের পক্ষ থেকে রোমের সম্রাট হিরাক্লিয়াসের প্রতি। যারা হেদায়াতের অনুসরণ করে তাদের প্রতি শান্তি বর্ষিত হোক। অতঃপর আমি আপনাকে ইসলামের দাওয়াত দিচ্ছি। ইসলাম গ্রহণ করুন, শান্তিতে থাকবেন। ইসলাম গ্রহণ করলে আল্লাহ আপনাকে দ্বিগুণ প্রতিফল দান করবেন। আর যদি আপনি মুখ ফিরিয়ে নেন তাহলে রোমের সমস্ত প্রজার (অধীনস্তদের) পাপ আপনার উপর বর্তাবে। আল্লাহ তা‘আলার বাণী,

يَا أَهْلَ الكِتَابِ تَعَالَوْا إِلَى كَلِمَةٍ سَوَاءٍ بَيْنَنَا وَبَيْنَكُمْ أَلَّا نَعْبُدَ إِلَّا اللَّهَ وَلاَ نُشْرِكَ بِهِ شَيْئًا وَلاَ يَتَّخِذَ بَعْضُنَا بَعْضًا أَرْبَابًا مِنْ دُونِ اللَّهِ فَإِنْ تَوَلَّوْا فَقُولُوا اشْهَدُوا بِأَنَّا مُسْلِمُونَ.

‘হে আহলে কিতাব! এসো! একটি কথায় আমরা একমত হই, যা আমাদের ও তোমাদের মাঝে সমান। আর তা এই যে, আমরা আল্লাহ ব্যতীত অন্য কারু ইবাদত করব না এবং তাঁর সাথে অন্য কাউকে শরীক করব না। আর আমরা আল্লাহকে ছেড়ে কেউ কাউকে প্রতিপালক হিসাবে গ্রহণ করব না। এরপর যদি তারা মুখ ফিরিয়ে নেয়, তবে তোমরা বল, তোমরা সাক্ষী থাকো যে, আমরা কেবল  আল্লাহতে সমর্পিত ‘মুসলিম’ (সূরা আলে-ইমরান: ৬৪)।

আবূ সুফিয়ান বলেন, ‘পত্র পাঠ করার পর এবং হিরাক্লিয়াস যা বললেন, তারপর পাশ্বের রোমের পদস্থ ব্যক্তিরা চিৎকার করতে লাগল এবং হৈচৈ করতে লাগল। তারা কী বলছিল তা আমি বুঝতে পারিনি এবং তারপর তার নির্দেশক্রমে আমাদের বাইরে নিয়ে যাওয়া হল। আবূ সুফিয়ান তাঁর সঙ্গীদের বললেন, আবূ কাবশার ছেলে (অর্থাৎ মুহাম্মাদ (ﷺ)-এর বিষয়টি বিরাট আকার ধারণ করেছে! এমনকি রোমের সম্রাটও তাঁকে নিয়ে চিন্তিত। আবূ সুফিয়ান বলেন, আল্লাহর কসম! অতঃপর থেকে আমি অপমানবোধ করতে লাগলাম এবং এ ব্যাপারে দৃঢ় বিশ্বাস জন্মিল যে, মুহাম্মাদ (ﷺ)-এর দাওয়াত অচিরেই বিজয় লাভ করবে, এমনকি শেষ পর্যন্ত আল্লাহ তা‘আলা আমার অন্তরে ইসলাম প্রবেশ করিয়ে দিলেন যদিও আমি শুরুতে অপছন্দ করছিলাম’।[১]

শিক্ষণীয় বিষয়

(১) কাফেরদেরকে চিঠি লিখে ইসলামের দাওয়াত দেয়া জায়েয। কারণ ইসলাম শুধু নির্দিষ্ট কোন জাতি বা শ্রেণীর জন্য নয়, বরং এটি সমগ্র মানবজাতির জন্য এক সর্বজনীন আহ্বান। নবীগণ রোমান, পারস্য এবং অন্যান্য জাতির নিকট দাওয়াতপত্র প্রেরণ করেছেন।

(২) মিথ্যা বলা সম্মানিত লোকদের স্বভাব নয়। মিথ্যা বলা জাহেলী যুগেও নিন্দনীয় ছিল, ইসলামে তো তা আরও ঘৃণিত ও হারাম। আল্লামা আল-আইনী (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন,

الْعقل يحكم بقبح الْكَذِب وَهُوَ خلاف مُقْتَضى الْعقل وَلم تنقل إِبَاحَة الْكَذِب فِي مِلَّة من الْملَل

‘বুদ্ধি দ্বারা মিথ্যার কুৎসিত প্রমাণিত; এটি বুদ্ধির পরিপন্থী। কোন ধর্মে মিথ্যার অনুমতি নেই’।[২]

(৩.) নবীদের অনুসারীরা সাধারণত দরিদ্র ও নিপীড়িত শ্রেণীর মানুষ হন। আল্লাহ তা‘আলা এমনভাবে ব্যবস্থা করেছেন যেন অধিকাংশ নবী-রাসূলের অনুসারী হন সমাজের দুর্বল ও নিপীড়িত জনগণ। যেনম: রোম সম্রাট হিরাক্লিয়াস যখন আবূ সুফিয়ানকে জিজ্ঞাস করলেন, ‘নবীকে কে অনুসরণ করে, উঁচু শ্রেণীর লোকেরা, না-কি দুর্বলরাই? তখন তিনি বলেছিলেন, দুর্বলরাই। তখন হিরাক্লিয়াস বললেন, তারাই তো সবসময় রাসূলদের অনুসারী হয়ে থাকে।

দরিদ্ররা নবীদের অনুসারী হওয়ার ক্ষেত্রে আলেমগণ বলেন, ‘তাদের হৃদয় ফিতরাতের নিকটবর্তী থাকে, রাজত্ব থেকে দূরে থাকে, তাদেরকে রাজত্ব বা সম্মানের লোভ দুর্নীতিগ্রস্ত করে না। দ্বীনে তারা সম্মান ও মর্যাদা লাভ করে। যেমন: বিলাল, সুহাইব, আম্মার এবং ইবনু উম্মে মাকতুম (রাযিয়াল্লাহু আনহুম) ।[৩]

(৪) আল্লাহ তা‘আলা নবীদের উত্তম চরিত্র দ্বারা বিশেষ মর্যাদা দিয়েছেন। নবীগণ ছিলেন সর্বোত্তম নৈতিক গুণাবলীর অধিকারী। আল্লাহ যাদেরকে তাঁর বার্তাবাহক হিসাবে মনোনীত করেছেন, তাঁদেরকে এমন নৈতিক গুণে গুণান্বিত করেছেন যা সাধারণের মাঝে বিরল। তাই হিরাক্লিয়াস আবূ সুফিয়ানকে বললেন, ‘আমি তোমার নিকট জানতে চেয়েছিলাম, সে [নবী মহাম্মাদ (ﷺ)] তোমাদেরকে কী নির্দেশ দেন? তুমি বলেছিলে, সে তোমাদের ছালাত, সত্যবাদিতা, পবিত্রতা, প্রতিশ্রুতি পূরণ এবং আমানত আদায় করার নির্দেশ দেন। হিরাক্লিয়াস তখন বললেন, এই তো নবীর বৈশিষ্ট। ইবনু মাসঊদ (রাযিয়াল্লাহু আনহু) বলেন,

إِنَّ اللهَ نَظَرَ فِي قُلُوبِ الْعِبَادِ فَوَجَدَ قَلْبَ مُحَمَّدٍ ﷺ خَيْرَ قُلُوبِ الْعِبَادِ فَاصْطَفَاهُ لِنَفْسِهِ فَابْتَعَثَهُ بِرِسَالَتِهِ

‘আল্লাহ তা‘আলা সমস্ত বান্দার অন্তরগুলো দেখলেন এবং মুহাম্মাদ (ﷺ)-এর অন্তরকে সব বান্দার মধ্যে সর্বোত্তম পেলেন, তাই তাঁকে নিজেন জন্য মনোনীত করলেন এবং তাঁকে বার্তাবাহক করে পাঠালেন’।[৪]

আর আয়েশা ছিদ্দিকা (রাযিয়াল্লাহু আনহা) যখন রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর চরিত্র বর্ণনা করতে চাইলেন,  তখন তিনি এমন কিছু খুঁজে পেলেন না, যা তাঁর চরিত্রকে ভালোভাবে এই কথা বলার থেকে যে, كَانَ خُلُقُهُ الْقُرْآنَ ‘তাঁর চরিত্রই ছিল কুরআন’।[৫]

(৫) রাসূলগণ সবসময় উত্তম চরিত্র ও নৈতিকতার প্রতি আহ্বান করেছেন। এটি আবূ সুফিয়ানের বক্তব্যে প্রতিফলিত হয়, যেখানে তিনি বলেন, ‘তিনি আমাদের সমাজ, সত্য কথা বলা ও পবিত্রতা বজায় রাখতে নির্দেশ দেন’। এ ছাড়াও নবী করীম (ﷺ) নিজেই বলেছেন, إِنَّمَا بُعِثْتُ لِأُتَمِّمَ مَكَارِمَ الْأَخْلَاقِ ‘আমি তো সুন্দ চরিত্রের পূর্ণতা সাধনের জন্যই প্রেরিত হয়েছি’।[৬]

(৬) সত্যবাদিতা নবীদের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ গুণ হিরাক্লিয়াস আবূ সুফিয়ানকে জিজ্ঞাসা করেছিলেন। তোমরা কি এর আগে তাঁকে কখনও মিথ্যাবাদি বলেছিলে? আবূ বললেন, না। এর থেকে প্রমাণ হয়, সত্যবাদিতা হল নবী-রাসূলদের অপরিহার্য বৈশিষ্ট্য। নবী-রাসূলগণ হচ্ছেন আল্লাহর পক্ষ থেকে অহিপ্রাপ্ত এবং তা মানুষের নিকট পৌঁছানোর দায়িত্বপ্রাপ্ত। তাই এটা কল্পনাও করা যায় না যে, আল্লাহ তা‘আলা কোন মিথ্যাবাদীকে নিজের বার্তাবাহক হিসাবে মনোনীত করবেন। নবী করীম (ﷺ)-কে নবুঅতের পূর্বেও সত্যবাদিতা দ্বারা চিহ্নিত করা হত এবং এই গুণের স্বীকৃতি তাঁর শত্রুরাও দিত। ছহীহ বুখারী ও মুসলিমে বর্ণিত, যখন সা‘দ ইবনু মু‘আয, উমাইয়া ইবনু খালফকে বললেন, ‘নবী করীম (ﷺ) বলেছেন, সে (উমাইয়া) নিহত হবে। তখন উমাইয়া তার স্ত্রীকে বললে, স্ত্রী বলল, وَاللهِ مَا يَكْذِبُ مُحَمَّدٌ ‘আল্লাহর কসম! মুহাম্মাদ (ﷺ) কখনো মিথ্যা বলেন না। অতঃপর উমাইয়া ভয়ে আর কোথাও বের হয়নি’।[৭] ছহীহ বুখারীতে ইবনু আব্বাস (রাযিয়াল্লাহু আনহুমা) হতে বর্ণিত, নবী করীম (ﷺ) কুরাইশদের বললেন,

لَوْ أَخْبَرْتُكُمْ أَنَّ خَيْلًا بِالوَادِي تُرِيدُ أَنْ تُغِيرَ عَلَيْكُمْ أَكُنْتُمْ مُصَدِّقِيَّ؟ قَالُوا نَعَمْ مَا جَرَّبْنَا عَلَيْكَ إِلَّا صِدْقًا

‘আমি যদি তোমাদেরকে বলি যে, শত্রুসৈন্য উপত্যকায় চলে এসেছে, তারা তোমাদের উপর হঠাৎ আক্রমণ করতে প্রস্তুত, তোমরা কি আমাকে বিশ্বাস করবে? তারা বলল, হ্যাঁ, আমরা আপনাকে সর্বদা সত্য পেয়েছি’।[৮]

(৭) ধনী ও মহান ব্যক্তিদের জন্য সত্য গ্রহণ করা কঠিন হয়, কারণ ইসলাম গ্রহণ করলে তাদের কিছু বিশেষ সুবিধা বা মর্যাদা চলে যেতে পারে। যেমন, হিরাক্লিয়াস যদি ইসলাম গ্রহণ করতেন, তবে তিনি এক সাধারণ মুসলমানে পরিণত হতেন, তার রাজত্ব হারিয়ে যেত। এই কারণে অনেক ধনী ও সম্মানিত ব্যক্তিরা সত্য ও ইসলাম থেকে বিমুখ হন। এর পিছরে প্রধান কারণ দু’টি। যথা: (১) ধন-সম্পদের আসক্তি, (২) অজ্ঞতা। নবী করীম (ﷺ) বলেন,

مَا ذِئْبَانِ جَائِعَانِ أُرْسِلَا فِي غَنَمٍ بِأَفْسَدَ لَهَا مِنْ حِرْصِ المَرْءِ عَلَى المَالِ وَالشَّرَفِ لِدِينِهِ

‘দু’টি ক্ষুধার্ত নেকড়ে বাঘকে ছাগলের মধ্যে ছেড়ে দেয়া অত বেশী ধ্বংসকর নয়, যত না বেশী মাল ও মর্যাদার লোভ মানুষের দ্বীনের জন্য ধ্বংসকর’।[৯] অর্থাৎ ধন-সম্পদ ও মর্যাদার প্রতি অতিরিক্ত লোভ মানুষের ধর্মীয় চরিত্র ও আখলাকের জন্য নেকড়ে বাঘের চেয়েও ভয়ানক। এটি একটি খুব গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।

(৮) যখন ঈমানের মাধুর্য কারো অন্তরে প্রবেশ করে (প্রকৃত ঈমান অন্তরে স্থান পায়), তখন সে আর পথভ্রষ্ট হয় না। এজন্য অনেক মানুষ যারা দ্বীন থেকে সরে গেছেন, তাদের অন্তরে প্রকৃত ঈমানের স্বাদই প্রবেশ করেনি অথবা সেই ঈমানের মাধুর্য তাদের অন্তরে স্থায়ী হয়নি। এ কারণেই তারা বিপথগামী হয়ে পড়ে।

(৯) যে ব্যক্তি অন্যকে পথভ্রষ্ট করার কারণ হয়, সে নিজের গুনাহর পাশাপাশি অন্যের গুনাহর অংশও বহন করবে। আল্লাহ তা‘আলা বলেন, وَلَيَحْمِلُنَّ أَثْقَالَهُمْ وَأَثْقَالًا مَعَ أَثْقَالِهِمْ  ‘তারা অবশ্যই নিজেদের পাপভার বহন করবে এবং সেই সোথে অন্যদের পাপভার’ (সূরা আল-আনকাবূত: ১৩)।


* পরিচালক: দারুস সালাম ইসলামী কমপ্লেক্স, পিরুজালী ময়তাপাড়া, গাযীপুর।

তথ্যসূত্র :
[১]. ছহীহ বুখারী, হা/২৯৪০, ২৯৪১।
[২]. ঊমদাতুল ক্বারী শরহু ছহীহিল বুখারী, ১ম খণ্ড, পৃ. ৮৫।
[৩]. আযওয়াউল বায়ান, ৮ম খণ্ড, পৃ. ৪৩৩।
[৪]. মুসনাদে আহমাদ, হা/৩৬০০, শু‘আইব আরনাউত্ব (রাহিমাহুল্লাহ) হাদীছটির সনদ হাসান বলেছেন।
[৫]. মুসনাদে আহমাদ, হা/২৫৩৪১ শু‘আইব আরনাউত্ব (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন, ছহীহ বুখারী ও ছহীহ মুসলিমের শর্তানুযায়ী হাদীছটির সনদ ছহীহ।
[৬]. সিলসিলা ছহীহাহ, হা/৪৫, আলবানী (রাহিমাহুল্লাহ) হাদীছটিকে ছহীহ বলেছেন।
[৭]. ছহীহ বুখারী, হা/৩৬৩২, ৩৯৫০।
[৮]. ছহীহ বুখারী, হা/৪৭৭০; মিশকাত, হা/৫৩৭২।
[৯]. তিরমিযী, হা/২৩৭৬; মিশকাত, হা/৫১৮১, আলবানী (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন, হাদীছটির সনদ ছহীহ।




প্রসঙ্গসমূহ »: শিক্ষণীয় ঘটনা
কুরআন-সুন্নাহর শিক্ষণীয় ঘটনা (১ম বর্ষ, ৭ম সংখ্যা) - আল-ইখলাছ ডেস্ক
রাসূলুল্লাহ (ﷺ) এর হিজরত - অনুবাদ : হাফীযুর রহমান বিন দিলজার হোসাইন
নবী করীম (ﷺ)-এর শাফা‘আত - অনুবাদ : হাফীযুর রহমান বিন দিলজার হোসাইন
কুরআন-সুন্নাহর শিক্ষণীয় ঘটনা (১১তম পর্ব) - আল-ইখলাছ ডেস্ক
কুরআন-সুন্নাহর শিক্ষণীয় ঘটনা (১২তম পর্ব) - আল-ইখলাছ ডেস্ক
মাযলূমের বদদু‘আ ও তোমার সাক্ষ্যের ভিত্তি কী? - আল-ইখলাছ ডেস্ক
মূসা ও খাযির (আলাইহিমাস সালাম)-এর কাহিনী - আল-ইখলাছ ডেস্ক
হাজেরা এবং তাঁর ছেলে ইসমাঈল (আলাইহিস সালাম) - অনুবাদ : হাফীযুর রহমান বিন দিলজার হোসাইন
কুরআন-সুন্নাহর শিক্ষণীয় ঘটনা (১ম বর্ষ, ৫ম সংখ্যা) - আল-ইখলাছ ডেস্ক
কা‘ব ইবনু মালিক (রাযিয়াল্লাহু আনহু)-এর তাওবাহ - অনুবাদ : হাফীযুর রহমান বিন দিলজার হোসাইন
বান্দার প্রতি আল্লাহর দয়া ও অনুগ্রহ - মুহাম্মাদ জাহিদুল ইসলাম
কুরআন-সুন্নাহর শিক্ষণীয় ঘটনা (১ম বর্ষ, ৬ষ্ঠ সংখ্যা) - আল-ইখলাছ ডেস্ক

সর্বশেষ প্রবন্ধ

ফেসবুক পেজ