উছমান (রাযিয়াল্লাহু আনহু)-এর খলীফা নির্বাচন পদ্ধতি
- হাফীযুর রহমান বিন দিলজার হোসাইন*
মানব সমাজে আদিকাল থেকে নেতা নির্বাচনের বিষয়টি চলে এসেছে। সৎ ও যোগ্য নেতৃত্ব ব্যতীত সমাজ সুন্দর ও সুচারুরূপে চলে না। তাই সুশৃঙ্খল সমাজের জন্য একজন ন্যায় বিচারক/শাসক আবশ্যক। কিন্তু কিভাবে এই নেতা নির্বাচিত হবে, সে বিষয়ে বর্তমান বিশ্বে নানা পদ্ধতি চলমান রয়েছে। কিন্তু মুসলিমদের জন্য রাসূলুল্লাহ (ﷺ) ও ছাহাবায়ে কেরামের পদ্ধতি অবলম্বনে মুসলিম সমাজে নেতা মনোনীত হলে ফেৎনা-ফাসাদ; থেকে মুক্তি পেত মানুষ। সমাজে সর্বত্র প্রবাহিত হত শান্তির সুবাতাস। নিম্নে ওছমান (রাযিয়াল্লাহু আনহু)-এর খলীফা মনোনয়নের ঘটনা উল্লেখ করা হল-
আমর ইবনু মায়মূন (রাহিমাহুল্লাহ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি ওমর ইবনুল খাত্ত্বাব (রাযিয়াল্লাহু আনহু)-কে আহত হবার কিছুদিন পূর্বে মদীনায় দেখেছি যে, তিনি হুযায়ফা ইবনুল ইয়ামান (রাযিয়াল্লাহু আনহু) ও ওছমান ইবনু হুনায়ফ (রাহিমাহুল্লাহ)-এর নিকট দাঁড়িয়ে তাঁদেরকে লক্ষ্য করে বলছেন, তোমরা এটা কী করলে? তোমরা এটা কী করলে? তোমরা কি আশঙ্কা করছ যে, তোমরা ইরাক ভূমির উপর যে কর ধার্য করেছ তা বহনে ঐ ভূখণ্ড অক্ষম? তারা বললেন, আমরা যে পরিমাণ কর ধার্য করেছি, ঐ ভূখণ্ড তা বহনে সক্ষম। এতে বাড়তি কোন বোঝা চাপানো হয়নি। তখন ওমর (রাযিয়াল্লাহু আনহু) বললেন, তোমরা আবার চিন্তা করে দেখ যে, তোমরা এ ভূখণ্ডের উপর যে কর আরোপ করেছ তা বহনে সক্ষম কি-না? বর্ণনাকারী বলেন, তাঁরা বললেন, না।
অতঃপর ওমর (রাযিয়াল্লাহু আনহু) বললেন, আল্লাহ যদি আমাকে সুস্থ রাখেন তবে ইরাকের বিধবাগণকে এমন অবস্থায় রেখে যাব, যেন তারা আমার পরে কখনো অন্য কারো মুখাপেক্ষী না হয়। বর্ণনাকারী বলেন, অতঃপর চতুর্থ দিন তিনি আহত হলেন। যেদিন ভোরে তিনি আহত হন, আমি তাঁর নিকট দাঁড়িয়ে ছিলাম এবং তাঁর ও আমার মাঝে আব্দুল্লাহ ইবনু আব্বাস (রাযিয়াল্লাহু আনহুমা) ছাড়া অন্য কেউ ছিল না। ওমর (রাযিয়াল্লাহু আনহু) দু’কাতারের মধ্য দিয়ে চলার সময় বলতেন, কাতার সোজা করে নাও। যখন কাতারে কোন ত্রুটি দেখতেন, তখন তাকবীর বলতেন। তিনি অধিকাংশ সময় সূরা ইউসুফ, সূরা নাহল অথবা এ ধরনের সূরা প্রথম রাকা‘আতে তিলাওয়াত করতেন, যেন অধিক পরিমাণে লোক প্রথম রাকা‘আতে শরীক হতে পারেন। তাকবীর বলার পরেই আমি তাঁকে বলতে শুনলাম, একটি কুকুর আমাকে আঘাত করেছে অথবা বলেন, আমাকে আক্রমণ করেছে। ঘাতক দ্রুত পলায়নের সময় দু’ধারী খঞ্জর দিয়ে ডানে বামে আঘাত করে চলছে। এভাবে তেরজনকে আহত করল। এদের মধ্যে সাতজন শহীদ হলেন।
এ অবস্থা দেখে একজন মুসলিম তার লম্বা চাদরটি ঘাতকের উপর ফেলে দিলেন। ঘাতক যখন বুঝতে পারল সে ধরা পড়ে যাবে তখন সে আত্মহত্যা করল। ওমর (রাযিয়াল্লাহু আনহু) আব্দুর রহমান ইবনু আউফ (রাযিয়াল্লাহু আনহু)-এর হাত ধরে সামনে এগিয়ে দিলেন। ওমর (রাযিয়াল্লাহু আনহু)-এর নিকটে যারা ছিল শুধু তারাই ব্যাপারটি দেখতে পেল। আর মসজিদের শেষে যারা ছিল তারা ব্যাপারটি এর অধিক বুঝতে পারল না যে, ওমর (রাযিয়াল্লাহু আনহু)-এর কণ্ঠস্বর শুনা যাচ্ছে না। তাই তারা ‘সুবহানাল্লাহ সুবহানাল্লাহ’ বলতে লাগলেন। আব্দুর রহমান ইবনু আউফ (রাযিয়াল্লাহু আনহু) তাঁদেরকে নিয়ে সংক্ষেপে ছালাত শেষ করলেন। যখন মুছল্লীগণ চলে গেলেন, তখন ওমর (রাযিয়াল্লাহু আনহু) বললেন, হে ইবনু আব্বাস (রাযিয়াল্লাহু আনহুমা)! দেখত কে আমাকে আঘাত করল? তিনি কিছুক্ষণ অনুসন্ধান করে এসে বললেন, মুগীরাহ ইবনু শু‘বাহ (রাযিয়াল্লাহু আনহু)-এর গোলাম (আবূ লুলু)। ওমর (রাযিয়াল্লাহু আনহু) জিজ্ঞাসা করলেন, ঐ কারিগর গোলামটি? তিনি বললেন, হ্যাঁ।
ওমর (রাযিয়াল্লাহু আনহু) বললেন, আল্লাহ তার সর্বনাশ করুন। আমি তার সম্পর্কে সঠিক সিদ্ধান্ত দিয়েছিলাম। আলহামদুলিল্লাহ, আল্লাহ আমার মৃত্যু ইসলামের দাবীদার কোন ব্যক্তির হাতে ঘটাননি। হে ইবনু আব্বাস! তুমি ও তোমার পিতা মদীনায় কাফের গোলামের সংখ্যা বৃদ্ধি পসন্দ করতে। আব্বাস (রাযিয়াল্লাহু আনহু)-এর নিকট অনেক অমুসলিম গোলাম ছিল। ইবনু আব্বাস (রাযিয়াল্লাহু আনহুমা) বললেন, যদি আপনি চান তবে আমি কাজ করে ফেলি অর্থাৎ আমি তাদেরকে হত্যা করে ফেলি। ওমর (রাযিয়াল্লাহু আনহু) বললেন, তুমি ভুল বলছ। কেননা তারা তোমাদের ভাষায় কথা বলে, তোমাদের ক্বিবলামুখী হয়ে ছালাত আদায় করে, তোমাদের মত হজ্জ করে। অতঃপর তাঁকে তাঁর ঘরে নেয়া হল। আমরা তাঁর সঙ্গে চললাম। মানুষের অবস্থা দৃষ্টে মনে হচ্ছিল, ইতিপূর্বে তাদের উপর এতবড় মুছীবত আর আসেনি। কেউ কেউ বলছিলেন, ভয়ের কিছু নেই। আবার কেউ বলছিলেন, আমি তার সম্পর্কে আশংকাবোধ করছি।
অতঃপর খেজুরের শরবত আনা হল, তিনি তা পান করলেন। কিন্তু তা তাঁর পেট হতে বেরিয়ে পড়ল। অতঃপর দুধ আনা হল, তিনি তা পান করলেন; তাও তাঁর পেট হতে বেরিয়ে পড়ল। তখন সকলেই বুঝতে পারলেন, তাঁর মৃত্যু অবশ্যম্ভাবী। আমরা তাঁর নিকট উপস্থিত হলাম। অন্যান্য লোকজনও আসতে শুরু করল। সকলেই তাঁর প্রশংসা করতে লাগল। তখন যুবক বয়সী একটি লোক এসে বলল, হে আমীরুল মুমিনীন! আপনার জন্য আল্লাহর (পক্ষ থেকে) সু-সংবাদ রয়েছে, আপনি তা গ্রহণ করুন। আপনি নবী করীম (ﷺ)-এর সাহচর্য গ্রহণ করেছেন, ইসলামের প্রাথমিক যুগেই আপনি তা গ্রহণ করেছেন, যে সম্পর্কে আপনি নিজেই অবগত আছেন অতঃপর আপনি খলীফা হয়ে ন্যায়বিচার করেছেন। অতঃপর আপনি শাহাদাত লাভ করেছেন।
ওমর (রাযিয়াল্লাহু আনহু) বললেন, আমি পসন্দ করি যে, তা আমার জন্য ক্ষতিকর বা লাভজনক না হয়ে সমান সমান হয়ে যাক। যখন যুবকটি চলে যেতে উদ্যত হল তখন তার লুঙ্গিটি মাটি ছুঁয়ে যাচ্ছিল। ওমর (রাযিয়াল্লাহু আনহু) বললেন, যুবকটিকে আমার নিকট ডেকে আন। তিনি বললেন, হে ভাতিজা! তোমার কাপড়টি উঠিয়ে নাও। এটা তোমার কাপড়ের পরিচ্ছন্নতার জন্য এবং তোমার রবের নিকটও পসন্দনীয়। হে আব্দুল্লাহ ইবনু ওমর! তুমি হিসাব করে দেখ- আমার ঋণের পরিমাণ কত। তাঁরা হিসাব করে দেখতে পেলেন ছিয়াশি হাজার (দিরহাম) বা এর কাছাকাছি। তিনি বললেন, যদি ওমরের পরিবার-পরিজনের মাল দ্বারা তা পরিশোধ হয়ে যায়, তবে তা দিয়ে পরিশোধ করে দাও। অন্যথা আদি ইবনু কা‘ব এর বংশধরদের নিকট হতে সাহায্য গ্রহণ কর। তাদের মাল দিয়েও যদি ঋণ পরিশোধ না হয় তবে কুরাইশ কবীলা হতে সাহায্য গ্রহণ করবে, এর বাইরে কারো সাহায্য গ্রহণ করবে না। আমার পক্ষ হতে তাড়াতাড়ি ঋণ আদায় করে দাও। উম্মুল মুমিনীন আয়েশা (রাযিয়াল্লাহু আনহা)-এর খিদমতে তুমি যাও এবং বল ওমর আপনাকে সালাম পাঠিয়েছে। ‘আমীরুল মুমিনীন’ শব্দটি বলবে না। কেননা এখন আমি মুমিনগণের আমীর নই। তাঁকে বল, ওমর ইবনুল খাত্ত্বাব তাঁর সাথীদ্বয়ের পাশে দাফন হবার অনুমতি চাচ্ছেন।
ইবনু ওমর (রাযিয়াল্লাহু আনহুমা) আয়েশা (রাযিয়াল্লাহু আনহা)-এর খিদমতে গিয়ে সালাম জানিয়ে প্রবেশের অনুমতি চাইলেন। তিনি বললেন, প্রবেশ কর, তিনি দেখলেন, আয়েশা (রাযিয়াল্লাহু আনহা) বসে বসে কাঁদছেন। তিনি গিয়ে বললেন, ওমর ইবনুল খাত্ত্বাব (রাযিয়াল্লাহু আনহু) আপনাকে সালাম পাঠিয়েছেন এবং তাঁর সঙ্গীদ্বয়ের পার্শ্বে দাফন হবার জন্য আপনার অনুমতি চেয়েছেন। আয়েশা (রাযিয়াল্লাহু আনহা) বললেন, তা আমার আকাক্সক্ষা ছিল। কিন্তু আজ আমি এ ব্যাপারে আমার উপরে তাঁকে অগ্রগণ্য করছি।
আব্দুল্লাহ ইবনু ওমর (রাযিয়াল্লাহু আনহুমা) যখন ফিরে আসলেন তখন বলা হল- এই যে আব্দুল্লাহ ফিরে আসছে। তিনি বললেন, আমাকে উঠিয়ে বসাও। তখন এক ব্যক্তি তাঁকে ঠেস দিয়ে বসিয়ে ধরে রাখলেন। ওমর (রাযিয়াল্লাহু আনহু) জিজ্ঞাসা করলেন, কী সংবাদ? তিনি বললেন, আমীরুল মুমিনীন! আপনি যা কামনা করেছেন, তাই হয়েছে, তিনি অনুমতি দিয়েছেন। ওমর (রাযিয়াল্লাহু আনহু) বললেন, আলহামদুলিল্লাহ। এর চেয়ে বড় কোন বিষয় আমার নিকট ছিল না। যখন আমার মৃত্যু হয়ে যাবে তখন আমাকে উঠিয়ে নিয়ে, তাঁকে আমার সালাম জানিয়ে বলবে, ওমর ইবনুল খাত্ত্বাব আপনার অনুমতি চাচ্ছেন। যদি তিনি অনুমতি দেন, তবে আমাকে প্রবেশ করাবে আর যদি তিনি অনুমতি না দেন তবে আমাকে সাধারণ মুসলিমদের কবরস্থানে নিয়ে যাবে। এ সময় উম্মুল মুমিনীন হাফছাহ (রাযিয়াল্লাহু আনহা)-কে কতিপয় মহিলাসহ আসতে দেখে আমরা উঠে পড়লাম। হাফছাহ (রাযিয়াল্লাহু আনহা) তাঁর নিকট গিয়ে কিছুক্ষণ কাঁদলেন। অতঃপর পুরুষরা এসে প্রবেশের অনুমতি চাইলে, তিনি ঘরের ভিতর গেলে ঘরের ভেতর হতেও আমরা তাঁর কান্নার আওয়াজ শুনতে পাচ্ছিলাম। তাঁরা বললেন, হে আমীরুল মুমিনীন! আপনি অছিয়ত করুন এবং খলীফা মনোনীত করুন।
ওমর (রাযিয়াল্লাহু আনহু) বললেন, খিলাফতের জন্য এ কয়েকজন ছাড়া অন্য কাউকে আমি যোগ্যতম পাচ্ছি না, যাঁদের প্রতি নবী করীম (ﷺ) তাঁর মৃত্যুর সময় রাযী ও খুশী ছিলেন। অতঃপর তিনি তাঁদের নাম বললেন, আলী, ওছমান, যুবায়ের, ত্বালহা, সা‘দ ও আব্দুর রহমান ইবনু আউফ (রাযিয়াল্লাহু আনহুম) এবং বললেন, আব্দুল্লাহ ইবনু ওমর (রাযিয়াল্লাহু আনহুমা) তোমাদের সঙ্গে থাকবে। কিন্তু সে খিলাফত লাভ করতে পারবে না। তা ছিল শুধু সান্ত্বনা মাত্র। যদি খিলাফতের দায়িত্ব সা‘দের (রাযিয়াল্লাহু আনহু) উপর ন্যস্ত করা হয় তবে তিনি এর জন্য যোগ্যতম ব্যক্তি। আর যদি তোমাদের মধ্যে অন্য কেউ খলীফা নির্বাচিত হন তবে তিনি যেন সর্ববিষয়ে সা‘দের সাহায্য ও পরামর্শ গ্রহণ করেন। আমি তাঁকে অযোগ্যতা বা খিয়ানতের কারণে অপসারণ করিনি।
আমার পরের খলীফাকে আমি অছিয়ত করছি, তিনি যেন প্রথম যুগের মুহাজিরগণের অধিকার সম্পর্কে সচেতন থাকেন, তাদের মান-সম্মান রক্ষায় সচেষ্ট থাকেন। আমি তাঁকে আনছার ছাহাবীগণ, যাঁরা মুহাজিরগণের আসার আগে এই এই নগরীতে (মদীনায়) বসবাস করে আসছেন এবং ঈমান এনেছেন, তাঁদের প্রতি সদ্ব্যবহার করার অছিয়ত করছি। তাঁদের মধ্যে নেককারগণের ওযর-আপত্তি যেন গ্রহণ করা হয় এবং তাঁদের মধ্যে কারোর ভুল-ত্রুটি হলে তা যেন ক্ষমা করে দেয়া হয়। আমি তাঁকে এ অছিয়তও করছি যে, তিনি যেন রাজ্যের বিভিন্ন শহরের অধিবাসীদের প্রতি সদ্ব্যবহার করেন। কেননা তাঁরাও ইসলামের হিফাযতকারী এবং তাঁরাই ধন-সম্পদের যোগানদাতা। তারাই শত্রুদের চোখের কাটা। তাদের হতে তাদের সন্তুষ্টির ভিত্তিতে কেবল তাদের প্রয়োজনের অতিরিক্ত সম্পদ যেন যাকাত আদায় করা হয়। আমি তাঁকে পল্লীবাসীদের প্রতি সদ্ব্যবহার করারও অছিয়ত করছি। কেননা তারাই আরবের ভিত্তি এবং ইসলামের মূল শক্তি। তাদের প্রয়োজনের অতিরিক্ত সম্পদ এনে তাদের দরিদ্রদের মধ্যে যেন বিলিয়ে দেয়া হয়। আমি তাঁকে আল্লাহ ও তাঁর রাসূল (ﷺ)-এর যিম্মীদের (অমুসলিম সম্প্রদায়) বিষয়ে অছিয়ত করছি যে, তাদের সঙ্গে কৃত অঙ্গীকার যেন পূরণ করা হয়। তাদের পক্ষাবলম্বনে যেন যুদ্ধ করা হয়, তাদের শক্তি-সামর্থ্যরে অধিক জিযিয়া যেন চাপানো না হয়।
(বর্ণনাকারী বলেন) ওমর (রাযিয়াল্লাহু আনহু)-এর মৃত্যু হয়ে গেলে আমরা তাঁর লাশ নিয়ে পয়ে হেঁটে চললাম। আব্দুল্লাহ ইবনু ওমর (রাযিয়াল্লাহু আনহুমা) আয়েশা (রাযিয়াল্লাহু আনহা)-কে সালাম করলেন এবং বললেন, ওমর ইবনুল খাত্ত্বাব (রাযিয়াল্লাহু আনহু) অনুমতি চাচ্ছেন। আয়েশা (রাযিয়াল্লাহু আনহা) বললেন, তাকে প্রবেশ করাও। অতঃপর তাঁকে প্রবেশ করানো হল এবং তাঁর সঙ্গীদ্বয়ের পার্শ্বে দাফন করা হল। যখন তাঁর দাফন শেষ করা হল, তখন ঐ ব্যক্তিবর্গ একত্রিত হলেন। তখন আব্দুর রহমান (রাযিয়াল্লাহু আনহু) বললেন, তোমরা তোমাদের বিষয়টি তোমাদের মধ্য হতে তিনজনের উপর ছেড়ে দাও। তখন যুবায়ের (রাযিয়াল্লাহু আনহু) বললেন, আমি আমার বিষয়টি আলী (রাযিয়াল্লাহু আনহু)-এর উপর অর্পণ করলাম। ত্বালহা (রাযিয়াল্লাহু আনহু) বললেন, আমার বিষয়টি ওছমান (রাযিয়াল্লাহু আনহু)-এর উপর ন্যস্ত করলাম।
সা‘দ (রাযিয়াল্লাহু আনহু) বললেন, আমার বিষয়টি আব্দুর রহমান ইবনু আউফ (রাযিয়াল্লাহু আনহু)-এর উপর ন্যস্ত করলাম। অতঃপর আব্দুর রহমান ইবনু আউফ (রাযিয়াল্লাহু আনহু) ওছমান ও আলী (রাযিয়াল্লাহু আনহুমা)-কে বললেন, আপনাদের দু’জনের মধ্যেকার কে এই দায়িত্ব হতে অব্যাহতি পেতে ইচ্ছা করেন? এ দায়িত্ব অপরজনের উপর অর্পণ করব। আল্লাহ ও ইসলামের হক আদায় করা তাঁর অন্যতম দায়িত্ব হবে। কে অধিকতর যোগ্য সে সম্পর্কে দু’জনেরই চিন্তা করা উচিত। তাঁরা চুপ থাকলেন। তখন আব্দুর রহমান ইবনু আউফ (রাযিয়াল্লাহু আনহু) নিজেই বললেন, আপনারা এ দায়িত্ব আমার উপর ন্যস্ত করতে পারেন কি? আল্লাহকে সাক্ষী রেখে বলছি, আমি আপনাদের মধ্যকার যোগ্যতম ব্যক্তিকে নির্বাচিত করতে একটুও ত্রুটি করব না। তাঁরা উভয়ে বললেন, হ্যাঁ। তাঁদের একজনের হাত ধরে বললেন, রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর সঙ্গে আপনার যে ঘনিষ্ট আত্মীয়তা এবং ইসলাম গ্রহণে অগ্রগামিতা আছে তা আপনিও ভালভাবে জানেন। আল্লাহর ওয়াস্তে এটা আপনার জন্য যরূরী হবে যে, যদি আপনাকে খলীফা মনোনীত করি তাহলে আপনি ইনছাফ প্রতিষ্ঠা করবেন। আর যদি ওছমান (রাযিয়াল্লাহু আনহু)-কে মনোনীত করি তবে আপনি তাঁর কথা শুনবেন এবং তাঁর প্রতি অনুগত থাকবেন। অতঃপর তিনি অপরজনের সঙ্গে একান্তে অনুরূপ কথা বললেন। এভাবে অঙ্গীকার গ্রহণ করে তিনি বললেন, হে ওছমান (রাযিয়াল্লাহু আনহু)! আপনার হাত বাড়িয়ে দিন। আব্দুর রহমান ইবনু আউফ (রাযিয়াল্লাহু আনহু) তাঁর হাতে বায়‘আত করলেন। অতঃপর মদীনাবাসীগণ এগিয়ে এসে সকলেই বায়‘আত করলেন’।[১]
শিক্ষনীয় বিষয়
১. ইমাম কাতার ঠিক করার জন্য কাতারের মধ্যে গমন করতে পারেন।
২. ছালাত ছেড়ে দিয়ে শত্রুকে ধরার চেষ্টা করা যায়।
৩. মুছল্লীরা যাতে ছালাতে শরীক হতে পারে সে জন্য প্রথম রাক‘আতে দীর্ঘ কিরাআত পাঠ করা যায়।
৪. ইমাম অসুস্থ হলে মুছল্লীদের মধ্যে থেকে কাউকে ইমামতির দায়িত্ব দেয়া যায়।
৫. কোন কর্মীর মাঝে ত্রুটি দেখলে নেতা সংশোধন করে দিবেন।
৬. কারো ঋণ থাকলে ঋণ পরিশোধের জন্য ওয়ারিছদের তাকীদ করা।
৭. মুত্তাক্বী-পরহেযগার ব্যক্তির পার্শ্ববর্তী স্থানে কবরস্থ হওয়ার আশা করা যায়।
৮. নেতা তার পরবর্তী দায়িত্বশীল মনোনয়নের জন্য শূরা পরিষদ গঠন করে দিয়ে যাবেন। সেই সাথে তিনি পরবর্তী দায়িত্বশীলকে অছিয়ত করে যাবেন।
৯. জনগণের উপরে সাধ্যাতীত করারোপ করা উচিত নয়।
১০. শূরার মাধ্যমে নেতা বা খলীফা মনোনীত হলে তার আনুগত্য করা সকলের জন্য আবশ্যক হয়ে যায়।
* পরিচালক: দারুস সালাম ইসলামী কমপ্লেক্স, পিরুজালী ময়তাপাড়া, গাজীপুর।
তথ্যসূত্র :
[১]. ছহীহ বুখারী, হা/৩৭০০।